নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসন সমস্যা

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হচ্ছে বাসস্থান। মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে তার বাসস্থান তথা আবাসনের চাহিদাও। তবে এই চাহিদা সবচেয়ে বেশি শহরকেন্দ্রিক। একথা সত্য যে, দেশের আবাসন খাতে গত তিন দশকে একটা বিপ্লব ঘটেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ কয়েকটি বড় শহরে এই বিপ্লব চোখে পড়ার মতো। তাই গুরুত্বের বিচারে ক্রমবর্ধমান শহরায়ন ও নাগরিক জীবনে আবাসনই অন্যতম নাগরিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে আলো ছড়ানো এই আবাসনশিল্প ডুবছে নানা সঙ্কটে। উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা। সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ না পাওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ কম। ফ্ল্যাট ও জমির রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বেশি হওয়ায় বাড়ছে হতাশা। আবাসনের সহযোগী বা লিঙ্কেজ শিল্পেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে দেশের আবাসন ব্যবসার অবস্থা খুবই নাজুক বলা যায়।
আবাসন খাতের সঙ্কট নিরসনে তেমন কোন পদক্ষেপই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিদ্যুত ও জ্বালানি সঙ্কটসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে প্রায় দেড় দশক ধরে আবাসন খাতে মন্দার প্রভাব প্রকট। ফলে আবাসন খাতের উদ্যোক্তা ও গ্রাহকরা আশার আলো দেখতে পারছেন না। এতে এই খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। রিহ্যাবের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক দশকে জিডিপিতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসাসহ আবাসন খাতের অবদান প্রতি বছরই ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০১ সালে যেখানে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান ছিল জিডিপির ৮.৬৩ ভাগ, সেখানে ২০১০ সালে এসে তা ৭.২০ ভাগে নেমে এসেছে। ২০১০ সালের পর আবাসন খাতের সঙ্কট আরও সঙ্কটাপন্ন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এ সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বলা হচ্ছে আবাসন খাতে ব্যাংক ঋণে জটিলতা, উচ্চ সুদ হার, গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগে অনিশ্চয়তা, সময়ক্ষেপণ ও নানাবিধ হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা আবাসন খাতের বাজার চাঙ্গা হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়।
বাংলাদেশে আবাসন খাতের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। রয়েছে সহায়ক অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আবাসন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রভাব পড়বে এসব সহায়ক শিল্পে। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে। অর্থনীতির গতি হ্রাস পাবে। এই খাতটিকে সুষ্ঠু নিয়মের মধ্যে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা। এতে শুধু বিনিয়োগ বন্ধ হওয়া নয়, আগামী দিনের আবাসন সঙ্কট মোকাবেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই ক্ষেত্রে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। শুধু নীতিমালাই নয়, বিনিয়োগকারী বা ক্রেতা-বিক্রেতাদের হয়রানি ও ঝুঁকি দূর করার বাস্তব উদ্যোগও এই ক্ষেত্রে জরুরী।
ঢাকা শহরের কথাই ধরা যাক, এখানে প্রায় ২ কোটি মানুষের শহরে অপরিকল্পিত ও অপ্রতুল আবাসন ব্যবস্থার কারণে নাগরিক বিড়ম্বনা ও পরিবেশগত সমস্যার ব্যাপকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এসব দূর করে একটি সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ে তোলায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শহরকেন্দ্রিক আবাসন খাত নিয়ে যেতে হবে গ্রামাঞ্চলেও। গ্রামাঞ্চলে আবাসন খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খুব একটা আগ্রহ নেই। এই ব্যাপারে সরকারের নজর দেয়া দরকার। মনে রাখা দরকার আবাসন খাতের বড় চ্যালেঞ্জ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসনে অর্থায়ন চাহিদা মেটানো। গ্রামাঞ্চলের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন আইনী কাঠামো নেই। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। সরকার এগিয়ে এলে বেসরকারী উদ্যোক্তারাও এ ব্যাপারে আগ্রহী হবে। দূর হবে আবাসন সঙ্কট।