মানহীন ঔষধে বাজার ভরপুর

ঔষুধের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ দিন দিন দুর্লভ ও দুর্মূল্য হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও গ্যাস্ট্রিকের ঔষুধের। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে তো বটেই, এমনকি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরাও আজকাল ওষুধ কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। গত সপ্তাহে কয়েকটি নামী-দামী গ্রুপের দুই শতাধিক ঔষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে দফায় দফায়। এক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে ১০ থেকে প্রায় ৩শ’ শতাংশ পর্যন্ত। এ অভিযোগ পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের। তাদের মতে, দাম বাড়ানোর আগে বাজারে ঔষুধ সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই জিম্মি হয়ে পড়ে তাদের নিকট। আরও অভিযোগ আছে, ঔষুধ কোম্পানিগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্তৃপক্ষ তথা ঔষুধ প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই তা করে থাকে। ব্যয়বহুল ও উচ্চাভিলাষী বিপণননীতি ও অধিক মুনাফার আশায় গত কয়েক মাস ধরে অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে ঔষুধের দাম। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষুধ প্রশাসন অধিদফতর এক্ষেত্রে প্রায় নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। অথচ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটা কাম্য নয় কোন অবস্থাতেই।
বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে কয়েকটি খাত নিয়ে গর্ববোধ করতে পারে ঔষুধশিল্প তার অন্যতম। বর্তমানে এ শিল্প খাতটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চলেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ ঔষুধ উৎপাদিত হয় দেশেই। আরও যা শ্লাঘার বিষয় তা হলো, বিশ্বের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশে উৎপাদিত ঔষুধ রফতানিও হচ্ছে। সম্প্রতি দু’একটি নামী কোম্পানির ঔষুধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সে দেশের এফডিএ’র অনুমোদনও পেয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, কয়েকটি নামী-দামী ওষুধ কোম্পানির পাশাপাশি কিছু অখ্যাত কোম্পাানিও আছে, যারা তৈরি করছে মানহীন ওষুধ। কোন কোন কোম্পানির ভেজাল ওষুধ খেয়ে শিশুসহ বয়স্কদের মৃত্যুর অভিযোগও আছে। অভিযুক্ত কোম্পানির মালিকদের জেল-জরিমানাসহ কারখানাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দুঃখজনক হলো, এরপরও মানহীন ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতকরণের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে। মূলত এসব হয়েছে ওষুধের দাম বাড়ার কারণেই।

ওষুধশিল্প একটি স্পর্শকাতর বিষয়। মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্নটি এর সঙ্গে জড়িত ওতপ্রোতভাবে। পাশাপাশি খাদ্য ও পথ্যের বিষয়টিও প্রসঙ্গত উঠতে পারে। ভেজাল খাদ্য যেমন মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে; অনুরূপ ভেজাল ও নকল-মানহীন ওষুধ বিপন্ন করে তুলতে পারে মানুষের জীবনকে। আর তাই ওষুধের মান ও দাম নিয়ে হেলাফেলা তথা শৈথিল্য প্রদর্শনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। উন্নত বিশ্বে ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় কঠোরভাবে। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এ্যান্ড ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ একটি আদর্শ উদাহরণ। বাংলাদেশেও অনুরূপ আদলে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরকারী সংস্থা গঠন করা যেতে পারে, যারা সর্বদাই ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট থাকবে।
ওষুধনীতি অনুযায়ী ১৪০০ জেনেরিক আইটেমের মধ্যে ১২০০ ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ওষুধ কোম্পানিগুলো। মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের দায় সরকার তথা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের। ১৯৯৪ সালের ওষুধনীতিতে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বর্তায় কোম্পানিগুলোর কাছে। আর এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো যথেচ্ছ মুনাফার মনোভাব নিয়ে নানা কারসাজির মাধ্যমে বাড়িয়ে দিচ্ছে ওষুধের দাম। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের বসে থাকার সুযোগ নেই। অতঃপর ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে তারা জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেই প্রত্যাশা।