প্রবাসীদের নিরাপত্তা জোরদার করুন

দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকরা বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাজনিত সঙ্কটে পড়েন। নিরাপত্তাহীনতার কারণ ও ধরন একেক দেশে একেক রকম। সম্প্রতি বাংলাদেশীদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রতিমাসেই দেশটির বিভিন্ন স্থানে দুষ্কৃতকারীদের হাতে একাধিক বাংলাদেশী নিহত হচ্ছেন। বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা প্রদানে দেশটির সরকারের কাছে একাধিকবার আবেদনের পরও এ বিষয়ে সাড়া মিলছে না। গত চার মাসে দেশটিতে নিহত হয়েছেন ১০ বাংলাদেশী। ২০১৫ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন চলছে। তারপর থেকেই অভিবাসীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বেসরকারী উদ্যোগে বিদেশ গিয়ে নানাভাবে প্রতারিত হতে হয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী জনশক্তিকে। বেতন-ভাতা নিয়ে প্রবঞ্চনা, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, অবৈধ হিসেবে পরিগণিত হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপনে বাধ্য হতে হয় তাদের। দেশের জন্য ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জনকারী প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে বার বার কথা ওঠে। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বা নিয়োগকর্তার দেশের সরকার তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কতটুকু খেয়াল রাখে, সেটা প্রশ্ন। বেশকিছু দেশে শ্রমিকদের ভালমন্দ দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং আছে। এসব উইং-এ লেবার এ্যাটাশেও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, থাকার জায়গাসহ নানা ইস্যুতে শ্রমিকরা দূতাবাসে অভিযোগ করলেও তাতে ফল হয় না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, বর্তমানে প্রায় ৯৬ লাখ বাংলাদেশী অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের ১৬০টি দেশে কর্মরত আছেন। তবে এই সংখ্যা আরও বেশি, এক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি নামক সোনার হরিণের সন্ধানে এ পর্যন্ত যে কতজন প্রাণ দিয়েছেন তার হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট দফতর ও মন্ত্রণালয়ে।
প্রবাসীদের কল্যাণে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন-২০১৭’ খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বোর্ডের কর্মতালিকা দীর্ঘ হলেও বাস্তবে সুফল কতটুকু মিলছে? এই বোর্ড অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণার্থে প্রকল্প গ্রহণ ও পরিচালনা করবে; প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের কল্যাণার্থে তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দেবে; প্রবাসীদের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন, ইন্স্যুরেন্সের অর্থ ও সার্ভিস বেনিফিট আদায়ে সহায়তা করবে; প্রবাসী কর্মীদের মেধাবী সন্তানদের বৃত্তি প্রদান ও তাদের আইনী সহায়তা দেবে; প্রবাসী কর্মীদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করবে। এছাড়া বিদেশে কর্মরত কোন নারী অভিবাসী বিপদগ্রস্ত বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা, চিকিৎসা ও আইনী সহায়তা প্রদান করা; দেশে প্রত্যাগত নারী অভিবাসী কর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা এবং নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তার জন্য দেশে কিংবা বিদেশে সেফ হোম প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা হবে প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডের কাজ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বোর্ডের সক্রিয়তা এখনও দৃশ্যমান হচ্ছে না কেন? বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশের মানুষের বিপদে-আপদে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস আন্তরিকভাবে তৎপর হবেÑ এটাই দেশবাসীর চাওয়া।