পুরাতন সংবাদ: April 4th, 2017

ব্যাটে বলে ‘সাধারণ’ বাংলাদেশ, হার ছয় উইকেটে

স্পোর্টস ডেস্ক :
বিশ ওভারের ম্যাচে বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। সেই প্রমাণ আবারও রাখল টাইগাররা। image-27160কলম্বোতে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ব্যাট-বলে অতি সাধারণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশের। হারতে হয়েছে ছয় উইকেটের বিশাল ব্যবধানে। এই হারে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ বিস্তারিত

দাঁড়িয়ে থাকা

Aka-dariea-Thakaসেলিনা হোসেন

তিন বছর বয়সে রূপশ্রী বাবাকে হারিয়েছে। ও এখন একুশ বছর বয়সের তরুণী। লেখাপড়া শেষ করে চাকরিতে ঢোকার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে।
বাবার কোনো স্মৃতি ওর নেই। মা বলেছে, ওর নামটি বাবা রেখেছে। ওর জন্য এটুকু একটি সম্বল। নিজেকে ফিরে দেখার সময় এই সম্বল সহযোগিতা করে। বিশেষ করে সম্পর্কের ভালো-মন্দের হিসেবে। রূপশ্রীর বেড়ে ওঠা এই সূত্র ধরে এগোয়। রূপশ্রী মনে করে, নাম রাখার সম্বল ওর দিনযাপনের খুঁটিনাটিতে সঞ্চয় মাত্র।
সার্টিফিকেটে বাবার নাম ব্যবহার ওর পরিচয়। সৈয়দ সিকান্দার শাজাহান বর্তমানে ওর কাছে এই পরিচয়ই মাত্র। যার অনুভব জীবনের কোনো জায়গা আলোকিত করে না, তাকে আর নাম দিয়ে কত স্মরণে রাখা যায়। এই ভাবনায় রূপশ্রী দমে থাকে। বুঝে নেয় মৃত্যুর কাছে পরাজিত মানুষ ও। এই ভাবনা ওকে বিষণ্ণ করে রাখে। বাবা ওর স্মৃতিতে নেই, এটা ও আর ভাবতে পারে না। ওর এখন কান্না পায়।
বান্ধবী কণা প্রায়ই বলে, এভাবে বেঁচে থাকা জটিল করার দরকার কী? খালাম্মাকে বলব তোকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে।
খালাম্মা! মানে আমার মা!
বাঁধভাঙা হাসিতে ঘর ভরিয়ে দিয়ে ও কণাকে বলে, প্রতিদিনের দেখা মায়ের চেহারাও আমার কাছে অস্পষ্ট।
অস্পষ্ট! চেঁচিয়ে ওঠে কণা। আসলে তোকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতেই হবে। খালাম্মাকে আজই বলব।
না। চেঁচিয়ে ওঠে রূপশ্রী। একসময় নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আমার জীবনে বাবার আড়াল হয়ে যাওয়া একরকম, মায়ের আড়াল হয়ে থাকা আর একরকম।
কণা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, তোর মতো এমন মেয়ে আমি দুটো দেখিনি। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যাদের কারো বাবা নেই, কারো মা। তারা তোর মতো কথা বলে না।
ওরা ভাবতে শেখেনি।
বুঝেছি, তুই কি গল্প লিখবি, নাকি কবিতা? ওই খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে মাথা
ঘামাস কেন?
বুঝবি না। এসবই অভিজ্ঞতা। আমার দুনিয়া নিয়ে আমিই তো মাথা ঘামাব, নাকি অন্যরা ঘামাবে?
কণা হাল ছেড়ে দেওয়া স্বরে বলে, জানি না বাপু। এও বুঝি না যে, এত সম্পর্ক আবিষ্কারের ধান্দা কেন তোর মধ্যে।
ধান্দা? বাজে কথা বলবি না কণা।
আমি বলি, এসব ভাবনা ছাড়। আমাদের এখন অনেক কিছু করতে হবে। এসব ভাবনায় তলিয়ে গেলে উঠে দাঁড়াতে পারবি না।
তুই দেখি আমার সঙ্গে ভালোই মাস্টারি করছিস।
আমি তোর বান্ধবী, টিচার না। যা বলার তা তোর ভালোর জন্য বলছি। আমি যা ভাবি তা আমি ছাড়তে পারব না। তোর আর আমার জীবন একই রেললাইনে ছোটে না। তোর রেললাইন আলাদা, আমার রেললাইন আলাদা।
বুঝেছি, গল্প লিখবি। লিখ, লিখে ধন্য হ।
কণা ওকে ভেংচি কেটেছিল। তারপর খিলখিল হাসিতে ভরিয়ে দিয়ে বলেছিল, এখন আমাদের প্রেম করার সময়। এসব আজেবাজে ভাবনার সময় নয়।
রূপশ্রী চোখে আগুন ছড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিল। কণা হাসতে-হাসতে বলেছিল, চোখ রাঙাস না। তোর কাউকে পছন্দ হয়নি রূপশ্রী?
ও আগুন-চোখেই বলেছিল, হয়েছে।
সত্যি? বলিসনি তো।
এটা ঢোল পিটিয়ে বলার জিনিস নয়।
বাববা, তুই দেখছি সেয়ানা মেয়ে। অবশ্যই, সেয়ানা তো হবিই। এতকিছু যার মাথায়, সে সেয়ানা হবে না তো কী হবে।
রূপশ্রীর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে কণা নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তড়িঘড়ি বলে, যাই। রেগে আছিস। এরপর মার লাগাবি।
চলে যায় কণা।
বাড়ির দরজায় চুপচাপ বসে থাকে রূপশ্রী।
তিনতলা এই বাড়িটি বানিয়েছে ওর নানা। ওর জন্মের আগে বানানো হয়েছিল। রূপশ্রীর মনে হয় এই বাড়ির মধ্যে মাটির মায়া আছে। সামনে ছোট্ট একটি বাগান আছে। বাগানে কয়েক রঙের জবা ফুলের গাছ আছে। কামিনী ফুলের ঝাড় আছে। মৌসুমি ফুল লাগানো হয়। ওর বেশি ভালো লাগে, যখন লাল রঙের তরুলতা ফুল ফোটে। মাঝে-মাঝে ছোট ফুলগুলো গুচ্ছ বানিয়ে চুলে গুঁজে রাখে।
এই বাগানটি রূপশ্রীর নানা-নানির শখ। এই বয়সেও দুজন বেশ খুনসুটি করে। বাগানে দাঁড়িয়ে ওর নানা লাল জবা ফুল নানির খোঁপায় গুঁজে দেয়। ও বেশ মজা পায়। দুজনের বয়সের কথা মনে হয় ওর। একদিন নানাকে জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন, আমার বয়স ছিয়াত্তর। তোর নানির বয়স একাত্তর।
ও ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলেছিল, তোমাদের এত্ত বয়স হয়েছে। তোমরা কিন্তু বুড়ো হওনি।
হইনি? বেশ বলেছিস।
মোহসিন মিয়া নাতনির দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসি হাসে। রূপশ্রী তার দুহাত জড়িয়ে ধরে বলে, তোমরা কি প্রেম করে বিয়ে করেছিলে নানা?
আমরা কি তোদের মতো খোলা হাওয়ায় বড় হয়েছি যে প্রেম করে বিয়ে করব?
বুঝেছি, বলেই হাসতে থাকে রূপশ্রী।
কী বুঝেছিস, বল?
বুঝেছি, তখন প্রেম করা হয়নি বলে তোমরা এখন প্রেম করছ।
মেয়েটা একটা পাক্কুবড়ি।
ঠিক বলেছি কিনা বলো?
বলেছিস।
এরপর শুরু হয় নানা-নাতনির হাসি। পরে হাসিতে যোগ দিয়েছিল নানি হানুফা বেগম। এরপর খালা দিলরুবা। বাড়িতে আর কেউ ছিল না। থাকলে হয়তো তারাও হাসিতে যোগ দিত। এমন একটি হাসির সময় কখনো-কখনো রূপশ্রীকে সম্পর্কের সূত্রের বাইরে নিয়ে যায়। ও তখন বুঝতে পারে, নানা-নানি ওর কাছে আড়াল হয়ে থাকে না। নানা-নানি ওর জীবনে আলো।
ও গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে ওর স্বপ্নের বাগানে এসে দাঁড়ায় রূপক। ওর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূচনা হয়েছে। রূপক বলেছে, আমাদের ভালোবাসায় খাদ থাকবে না। আমাদের ভালোবাসা হবে ভরাট জমিন।
রূপশ্রী চোখ উজ্জ্বল করে বলেছিল, জমিন? জমিন কি খোলা প্রান্তর থাকবে? শূন্য? ধুলোয় ভরা?
মোটেই না। জমিনে ভালোবাসার সরোবর থাকবে। সেখানে পদ্মফুল ফুটবে।
আর?
প্রেমের খুনসুটি পাখি থাকবে।
আর?
অভিমানের পোকামাকড় থাকবে।
আর?
বিরহের কাঁকড়া-কাছিম থাকবে।
আর?
দুঃখের বৃষ্টি থাকবে।
আর?
সন্তানের গাছগাছালি থাকবে।
এটুকু বলার পরই হা-হা হো-হো করে হেসেছিল দুজনে। রূপশ্রীর ভীষণ ভালো লেগেছিল সে-মুহূর্তের রূপককে। ও ভেবে দেখেছিল, সম্পর্কের ওই গিট্ঠু যদি শক্ত হয় তাহলে রূপকের চেহারা ওর সামনে অস্পষ্ট হবে না। ও প্রতিদিনের জীবনে থাকুক বা না থাকুক তাতে কিছু যাবে-আসবে না। রূপশ্রী একা-একা খুশিতে ভরে ওঠে। দুই লাফে তরুলতার ফুলের লতার কাছে যায়। লতাগাছটিতে অনেক ফুল ফুটে আছে। কয়েকটি ফুল ছিঁড়ে গুছি বানিয়ে নিজের চুলের ক্লিপের সঙ্গে গেঁথে রাখে। খুশিতে ওর চঞ্চলতা বাড়ে। বেশ লাগে ভাবতে যে, ওরা চাইলে অল্প সময়ের মধ্যে বিয়ে করতে পারবে। শুরু হবে সংসার। নতুন জীবন। রূপকের চাকরি হয়েছে একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সে। ও নিজে ঢুকবে কোথাও। আপাতত যা পাওয়া যায় সেখানে, তারপর পছন্দমতো কোথাও ঢোকার চেষ্টা করবে। ওর পছন্দ শিক্ষকতা। কোনো কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের সঙ্গে দিন কাটাবে। পড়ালেখা শেখানো আর ওদের হাসিমুখ দেখা। এভাবে নিজের শৈশব দেখা নিশ্চিত হবে, যে-শৈশবের স্মৃতি সবচেয়ে বেশি নানা-নানির সঙ্গে সম্পর্কের গিট্ঠু।
রূপশ্রী আবার দরজায় এসে বসে।
মৃদু বাতাস ওর শরীরে পরশ বুলায়। বদলে যায় ওর ভাবনার জগৎ। প্রবল ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে মনে করে কত-কত বছর পরে এমন একটি দিন ওকে আনন্দ দিচ্ছে। শৈশবে নিয়ে গেল ওকে। আহ, এভাবে একটা দিন আর একটা দিনের ভেতরে প্রবেশ করে। এভাবে এক জীবন অন্য জীবন হয়ে যায়। আনন্দের রং বদলায়। অন্ধকারও রঙিন হয়। মায়ের চেহারা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার চিন্তা যে নিগূঢ় অন্ধকার হয়, সেখান থেকে এভাবেই বেরিয়ে আসা হয়। ছোটবেলায় নানা-নানি ওকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিল। হাতির পিঠে উঠিয়েছিল। মাহুতকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল হাতির পিঠে। চিড়িয়াখানার বড় গাছগুলোর নিচে ঘুরতে-ঘুরতে অনেক পাখি দেখেছিল। হাতির সঙ্গে-সঙ্গে হাঁটতে থাকা নানা-নানির হাসিমুখ দেখেছিল। সেদিকে তাকিয়ে হাত নাড়ার কথা ভুলে গিয়েছিল ও। হাঁ করে তাকিয়ে ছিল গাছের ডালে বসে থাকা দশ-বারোটা
কাকের দিকে। তখন ওর বয়স ছিল ছয়, নানি মাঝে-মাঝে বলে, ছয় বছর বয়সে তোকে আমরা হাতির পিঠে উঠিয়েছিলাম। হাতির পিঠে বসে থাকা সোনামণিকে একটি পরির মতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল এক্ষুনি বুঝি ডানা মেলে উড়ে যাবে। এমন স্মৃতি মায়ের সঙ্গে নেই। ওর কোনো কিছুতে মাকে ও বিরক্ত হতে দেখেছে। সেই চোখ কোঁচকানো, ভুরু কোঁচকানো চেহারা ও ক্রমাগত ওর সামনে থেকে সরিয়েছে। আড়াল হয়েছে মায়ের চেহারা। মাঝে-মাঝে মনে হয়, এই বাড়িতে যখন ও থাকবে না, তখন ও মাকে চিনতে পারবে না। প্রতিদিন দেখার পরও তো মা আড়াল হয়ে যায়, প্রতিদিন না দেখলে সেটা মুছে যাবে – এমন ভাবনা নিয়ে রূপশ্রী বিষণ্ণ হয়ে যায়। যে আনন্দ একটু আগে উৎসব মনে হয়েছিল সেটুকু এখন শ্মশান। দাউ-দাউ জ্বলছে আগুন এবং পুড়ছে।
মুহূর্তে টুনটুন শব্দ হলে তাকিয়ে দেখে সাদা জবাফুলের গাছটার ডালে লাফাচ্ছে টুনটুনি পাখি। কোথাও কোনো পাখি নেই। ও ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখে। সময়টা পড়ন্ত বিকেল।
গেট খুলে ওর মা ঢোকে। হাসনা বেগম।
ঢোকার পরে গেট বন্ধ করে। সারাদিন অফিস করার পরে চেহারায় ক্লামিত্ম। হাতে একগাদা কাগজপত্র। কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ। গুটিগুটি পায়ে বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। একদম মেয়ের মুখোমুখি। রূপশ্রী দরজা ছেড়ে নড়ে না। হাসনা বেগম পাশের জায়গা দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারবে। যদিও লম্বায় খাটো মোটাসোটা এই মহিলার চলতে-ফিরতে কষ্ট হয়; কিন্তু কণ্ঠের ঝাঁজ চড়া।
প্রথম প্রশ্ন করে, এভাবে বসে রয়েছিস যে?
রূপশ্রী কথা বলে না। তার মুখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়।
কথা বলছিস না যে?
ইচ্ছে করছে না।
চুলে ফুল গুঁজেছিস কেন?
আমার খুশি।
এই ফুলের যা ছিরি, তাও আবার তোর ভালো লাগে? ছিঃ –
তোমার গোলাপ পছন্দ। ওই ফুল আমার সহ্য হয় না। ওই ফুলকে পরপর লাগে। আপন মনে হয় না।
তোর কাছে আপন হওয়া কঠিন।
হাসনা বেগম ওর পাশ দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। রূপশ্রী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে। ড্রইংরুম পেরিয়ে নিজের ঘরে গেল হাসনা বেগম। এটা রূপশ্রীরও ঘর। নানাবাড়িতে ওকে আলাদা একটি ঘর দেওয়ার মতো ঘর আর নেই। বাড়ির কোথাও ওর বাবার ছবি নেই। ওর মা রাখতে দেয়নি। বলে, কোনো লুচ্চার ছবি দেয়ালে ঝুলবে না। ছোটবেলা থেকে এসব শব্দ শুনতে-শুনতে বড় হয়েছে। বড় হয়ে জেনেছে, ওর মাকে রেখে ওর বাবা আর একটি বিয়ে করেছিল।
রূপশ্রী দরজা ছেড়ে বাগানে নেমে আসে। ভাবে, রূপক ওকে যেভাবে প্রেমের কথা বলে, ওর মা কি এমন প্রেমের কথা শোনেনি?
নিশ্চয় শুনেছে কিংবা শোনেনি। দুটোই হতে পারে। নানি বলেছে, মাকে কোনো একজন প্রেমের কথা বলেছিল। একটি মেয়ে আছে জেনে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। বলেছে, পরের মেয়ের বোঝা ঘাড়ে নিতে পারবে না। মায়ের ভাষায় এই লোকটিও লুচ্চা। রূপশ্রী সাদা রঙের জবা ফুল ছিঁড়ে চুলে গোঁজে। কণা জিজ্ঞেস করেছিল, তোর সামনে থাকা মা আড়াল হয় কী করে? সে তো তোর বেঁচে থাকার সঙ্গী।
সঙ্গী? চোখের দেখা দেখলেই কি সঙ্গী হয়? মনের দেখাও লাগে।
মা তো তোকে বড় করেছে।
আমি নানা-নানির কাছে বড় হয়েছি। নানা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত। নিয়ে আসত। নানি টিফিন বক্সে খাবার দিত। ঘরের পড়াশোনা করাত; মা আমার স্মৃতির মানুষ না।
ঘুমপাড়ানি গান শুনিসনি?
জানি না। ও ধমক দিয়ে বলেছিল, আমার স্মৃতি নেই।
কণা তাকিয়ে থেকে বলেছিল, এভাবে বেঁচে থাকা খুব কষ্টের।
কষ্ট! রূপশ্রী শব্দটা উচ্চারণ করে।
বাগানে সন্ধ্যা নেমেছে। দিনের আলো ফুরিয়েছে। ওর নানি ঘরের বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। বাগানে আলো-আঁধারির ধুপছায়া। রূপশ্রী হেঁটে গেটের কাছে আসে। গেট খুলে রাস্তায় দাঁড়ায়। মানুষ চলাচল করছে। দু-চারটে রিকশা যাচ্ছে। ও অন্যমনস্ক স্বরে বলে, কষ্ট! দিন দশেক ধরে রূপক ঢাকায় নেই। ও এয়ারলাইন্সের কাজে সিঙ্গাপুরে গেছে। নিঃসঙ্গতার কষ্ট ওর বুকের ভেতরে ঘুরপাক খায়। ও বেশ কিছুক্ষণ রাস্তা দেখে ভেতরে ঢোকে। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পরে রূপক ওকে একবারও ফোন করেনি। ওখানকার ফোন নম্বর না জানার কারণে রূপশ্রী নিজেও যোগাযোগ করতে পারেনি। প্রবল মন খারাপ নিয়ে ও বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
তখন বেজে ওঠে ফোন।
কে ফোন করেছে সেটা দেখার আগ্রহ প্রকাশ না করে ও ফোন ধরে।
হ্যালো।
আমি রূপক সোনাবরু।
ওহ রূপক! তোমার খবর না পেয়ে আমি তো মরেই যাচ্ছিলাম।
ওপাশ থেকে শোনা যায় হা-হা হাসি।
রূপ সোনাবরু, মরণ কি এতই সহজ!
তুমি কেমন আছো রূপক?
ভালো আছি, খুব ভালো আছি। নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন অফিস – সব মিলিয়ে আনন্দে আছি।
আমাকে মিস করোনি?
মিস করার সময়ই তো পাইনি। রাতে ঘরে ফিরে কী খাব এসব নিয়ে ব্যস্ত থেকে, অনেক রাতে ঘরে ফিরে ঢাকা আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে।
ও তাই। রূপশ্রীর বিষণ্ণ কণ্ঠ ওর নিজের কাছেই বেমানান শোনায়। রূপক দূরে আছে, যোগাযোগ করেনি ভাবতে ওর চোখ ভিজে যায়।
ভেসে আসে রূপকের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। রূপশ্রীর বিষণ্ণ কণ্ঠ উপেক্ষা করে এই হাসির তোড় ওর মন আরো খারাপ করে দেয়।
তোমাকে একটি জরুরি কথা বলার জন্য ফোন করেছি সোনাবরু। তুমি এখন কী করছ?
বাগানে দাঁড়িয়ে আছি।
সন্ধ্যা হয়েছে না? তোমার সঙ্গে আর কে আছে?
কেউ নেই। আমি একা।
ভালোই হয়েছে।
তোমার জরুরি কথা কী?
আমার এই অফিসে পোস্টিং হয়েছে। আমি ঠিক করেছি এখানেই থেকে যাব। আপাতত কয়েক বছর দেশে ফিরব না।
দেশে ফিরবে না? তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না? তুমি আমাকে মিস করবে না?
আবার হা-হা হাসি। হাসির তোড় ছড়িয়ে যায় রূপশ্রীর পুরো শরীরে। ও ভয়ে-আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে। রূপককে অচেনা মনে হয় ওর। হাসি থামিয়ে কথা বলে রূপক।
তোমার সঙ্গে আমার প্রেমের স্মৃতি আমার বুকে সোনার খনি হয়ে থাকবে রূপশ্রী সোনাবরু। আমি তোমাকে মিস করছি না। সামনে আমার নতুন জীবন।
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ফোনের লাইন। রূপশ্রীর সামনে থেকে আড়াল হয়ে যায় রূপক। ও আকাশে উড়িয়ে দেয় একটি শব্দ, লুচ্চা।

নদীটি ও জারুল গাছ

দেবেশ রায়
2নদীছুট বলে কাকে?
যে-জায়গা থেকে সেই জায়গার নদী ছুটে গিয়েছে। জায়গা না হয়ে মানুষও হতে পারে।
যে-মানুষ থেকে তার নদী ছুটে গিয়েছে।
মানুষ না হয়ে একটা গাছও হতে পারে।
যে-গাছের তলা থেকে তার নদী ছুটে গিয়েছে। গাছটা তো নদীর পাড়ে এক বিরল ভঙ্গিতে বরাবর ছিল। অতবড় একটা জারুল গাছ নদীর একটা আড়ড়ির ওপর এখন খাড়া থাকতে পারে? তার তলার মাটি নদী খেয়ে নিয়েছে, আর কী
আশ্চর্য, পাড়টা যেখানে উঁচিয়ে উঠেছে ঠিক তার তলা থেকে নদী তার পাড়ভাঙা থামিয়ে দিয়েছে। আবার সেই উচলটা যেখানে গড়িয়ে গেছে পাড়ে, সেখানে আবার পাড় খাওয়া শুরু করেছে নদী। যেন, জারুল গাছটাকে শিকড় গাড়তেই ওই উচলটুকু ছাড়। জারুলও তা বোঝে। সে শিকড় চাড়িয়ে দিয়েছে মাটিতে, মাটির ভিতরের মাটি আঁকড়াতে-আঁকড়াতে – মাটি না হলে এতবড় গাছের ওজন বইবে কে? কিন্তু তার কা- ক্রমেই নদীর ওপর কেৎরে গেছে আর কা–র যে-জায়গা থেকে ডালপালা বেরোতে শুরু করেছে সেখান থেকে তার আকাশজোড়া মাথা একেবারে নদীর ওপরে, যেন নদীর স্রোতের সমান্তরাল হয়ে উঠেছে।
বা, জারুল যেন নদীতে রাতদিন, দিনরাত, তার নিজের ছায়া দেখেই যায়।
বা, নদী যেন জারুলের সেই ছায়া রাতদিন, দিনরাত, নিজের জলে বয়ে-বয়ে স্থির হয়ে থাকে।
কী অদ্ভুত, না?
নদী তো বয়েই যাচ্ছে। না বইলে তো নদী আর নদী থাকে না। বড়জোর হাওড় হয়ে যায়। জারুলের ছায়া নিয়ে নদী বয়ে যায় অথচ ছায়াটা নড়ে না। বরং সূর্য ওঠার পর থেকে পরের সূর্য ওঠা পর্যন্ত জারুল তার অত বড় মাথার ছায়া তার নদীর ওপর দিয়ে ঘোরাতেই থাকে। জারুলের শিকড় তো মাটিতে গাড়া। সে তো ইচ্ছে করলেও নিজেকে এড়াতে পারবে না। তেমন ইচ্ছে তার হবেই-বা কেন? অমন কোনো ইচ্ছে তৈরি হওয়ার মত মনই নেই জারুলের। বা, কোনো গাছেরই। কিন্তু জারুলের মাথার ওপরে, ও নদীর ওপরেও, ও দেখা যায় না এমন অপারে, যে-আকাশ, আর সেই আকাশে যে-আলো, সূর্যের, রোদের, চাঁদের, মেঘের, তারার, ছায়াপথের, বজ্রপাতের, বিদ্যুতের, সেইসব আলো তো নদীর ওপর, জলের ওপর, স্রোতের ওপর জারুলের ছায়াটাকে সরিয়ে-সরিয়ে দেয় আর নদীর জল ও স্রোত যে সেই নানা রকমের আলোর প্রতিফলন ঘন করে তোলে বা পাতলা করে তোলে, তাতে এমনটাই তো সত্য হয়ে ওঠে যে, ওই নদীর জলে ছায়াময় জারুল, নদীর স্রোতে, নিশিদিন ভেসেই আছে, ভেসেই আছে, যেন জারুলের শিকড়টা মাটিতে গাঁথা না, যেন জারুল নদীর জলের ভিতরই তার শিকড় চাড়িয়ে দিয়েছে। আকাশের তারারাই যখন আলোর একমাত্র উৎস আর সেই তারারা সারা রাত জুড়ে যে তাদের জায়গা বদলায় – তাতে জলের ভিতরের জারুলের ছায়াটাও জায়গা বদলায়। নদীর ভিতরের দূরের কোনো নৌকো থেকে যখন কেউ পাড়ের দিকে তাকায়, তখন সে এমন অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখেই নিজে কোথায় আছে, তার একটা আন্দাজ চোখের পলক ফেলে করে নিতে পারে – ওই তো নদীর ভিতর জারুল গাছটা বুড়ো আঙুলের মত খাড়া হয়ে আছে। বুড়ো আঙুলটা কার – সেটা অবিশ্যি খুব স্পষ্ট নয়, মানুষজন স্পষ্ট করে উপমা দেয় না, অস্পষ্টতাকে উপমায় বোঝে, নিজের মনে রাখার জন্য ভাবা। জারুল গাছটা বুড়ো আঙুলের মতই মনে হতে পারে, যদি চার-আঙুল জোড়া রেখে বুড়ো আঙুলটাকে আলাদা করা যায় – ফাঁকগুলো হয়ে যায় নদী আর বুড়ো আঙুলটা জারুলের সীমানা। আর নদীটা তাকে বাঁচিয়ে রেখে, তাকে নিজের ভিতর রেখে তাকে ঘিরে আবার ভাঙা পাড়ের দিকে ঘুরে যায়। ওই জারুল গাছ নদীর অতটা ভিতর থেকে নিশানা দেয় এমন এক অদ্ভুত বাঁকের, যেখানে নদী তার গাছ ভাঙে নি। যে-গাছ নদীও ভাঙে না, সে তো শুধু গাছ হতে পারে না। তার ওপর কোনো কিছু ভর করে, এমন কোনো কিছু যা নদীও জানে। নদীও যে-গাছকে মান দেয়, মানুষজন তো তাকে মান দেবেই, যদি মানুষ বুঝতে পারে যে, এ-গাছের ওপর ভর আছে। এমন ভর বুঝতে মানুষ সবসময়ই এতই তৈরি থাকে!
নদীর ভাঙনের ফলে পাড়ের গ্রাম খালি করে, মানুষজন যখন বেশ প্রান্তরের মত জায়গা নদীছাড় দিয়ে সরে গিয়ে নতুন গ্রাম বসায় পুরনো গ্রামেরই নামে, আর নিজেদেরই তৈরি প্রান্তরের সীমায় সেই জারুল গাছের মাথা ফণা উঁচিয়ে নদীকে তার পাড় ভাঙতে নিষেধ করছে বলে দেখে – তখন আর তার মানতে বাধা কোথায় যে জারুল গাছটাতে কিছু ভর আছে। একই জন নদীর ভিতর থেকে জারুল গাছটাকে বুড়ো আঙুলের উপমায় দেখে, তার প্রান্তরের প্রান্ত থেকে কেউটে সাপের ফণার উপমায় দেখে।
গাছ আর নদীর সম্পর্ক দেখা ও বোঝার যেন শেষ নেই। মানুষজন সেই জারুল গাছটাকে তাদের মত করে যখন পুজো দেয় তখন নদী আর গাছের ভিতর কোনো পার্থক্য করে না। শুধু নিজের অজ্ঞানতা স্বীকার করতে চায়। সেটাই যেন পুজো – আমি যা জানি না। তেমন পূজার কোনো রীতিনীতি তৈরি হয় না। যেন, রীতিনীতি তৈরিই থাকে। চৈত্র মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে বারুণী পূজার দিন যেখানে যে-জল থাকে, খাল-বিল-পুকুর-ডোবা-হাওড়-বাঁওড় – ছোট, বড়, সরু, মোটা, জ্যান্ত, মরা, নতুন, পুরনো, সব নদী হয়ে যায়, সেই নিজের নদীতে স্নান করতে হয়, মেলা বসাতে হয়। যার যে-নদী, সেখানেই তার বারুণী। চৈত্র তো সবচেয়ে খরার সময়। সেই শুখার সময় নিজের জলের কাছে পুজো দিয়ে বলতে হয় – তার এই জলটুকুতে যেন মেঘ ভেঙে পড়ে – যখন মেঘ আসবে, তার এই জলটুকুতে যেন বান ডাকে – যখন বান আসবে, তার এই জলটুকু যেন তার পাড় ভাঙে – যখন ভাঙন আসবে, তার এই জলটুকু যেন তার ঘরে ঢোকে – যখন জল আসবে।
এমন বারুণী পুজোর দিন ওই চৈত্র মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর দিন এই বুড়ো আঙুল ও কেউটিয়া বাঁকের কাছে গ্রামের মানুষজন নদীকে পূজা দেয়, জারুল গাছটাকেও দেয়। জারুল গাছের পাতা দিয়ে নৌকো বানিয়ে নদীতে ভাসায় আর নদীর জল দিয়ে জারুলের কা- ধুয়ে দেয়। আলাদা মন্ত্রও পড়ে – ‘যাও নদী, বও গিয়া/ যাও জারুল, খাড়াও গিয়া/ নদীরে ছায়া দিয়ো জারুল/ জারুলরে বাঁক দিয়ো নদী।’
এই এমন জারুলের তলা থেকে নদী যদি ছুটে যায়, তা হলে নদীছুট জারুলের দশা কী দাঁড়ায়?
জারুলের তো আর-কোনো নিজের বাঁচাই থাকে না। সে তো আর-দশটা জারুল গাছের মত একটা জারুল গাছ ছিল না। সে তো মাঝনদী থেকে ছিল বুড়ো আঙুলের মত জারুল। সে খাড়া থাকত আর তাকে ঘিরে, কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে, নদীর ভাঙন চলত। সেই ভাঙা পাড়ে মাটির কোন গভীরে শিকড় আঁকড়ে, নদীর কোন ভিতরে ছায়া ফেলার খেলাই তো থাকল না। নতুন এক ভাঙনের প্রান্তরের সীমা থেকে ফণা তুলে নদীকে শাসনের ভরসাই তো থাকল না। জারুলের তো কোনো নিজের মত করে বাঁচাই থাকল না।
নদীর ছুটে-যাওয়া প্রথমে বা একবারে বোঝা যায় না।
কোনো এক বড় বন্যায় হয়তো নদী নতুন দিকে বয়ে যায়। সে তো পুরনো খাতে তার জল ধরছে না বলেই নতুন একটা খাতে বয়ে যাওয়া। বান নেমে গেলে, তো আর নতুন খাতের দরকারই পড়বে না – তখন নদী তার পুরনো খাতেই বইবে – পুরনো মানে, চিরকালের খাতে, যেন সব পুরনোই চিরকালের। এক-বছরে যদি ঘরের ওপর মেঘ ভেঙে পড়ে বাড়িঘর ভেঙে ভাসিয়ে দেয়, তা হলেই কি সেই বাড়িঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া যায়? এক বর্ষায় মেঘ ভেঙেছে বলে কি পরের বর্ষাতেও মেঘ ভাঙবে? এক বন্যায় নদীর জল অন্য খাতে গেছে বলেই কি পরের বছরও নদীর অন্য খাত দরকার হবে? নদীর খাত তো নদীর বাড়িঘর।
মানুষজন নিজে বুঝে নিতে উপমা খোঁজে।
কিন্তু নদীর স্রোত তো সে-উপমা মেনে চলে না।
বড় বানার জল বওয়াতে নতুন খাতে নদীর জল যে-বয়ে গেছে, সেই বয়ে যাওয়ার বেগ তো নদীর স্বাভাবিক গতির দশগুণ-একশগুণ। সেই দশগুণ-একশগুণ স্রোতের ধাক্কায় নতুন খাতের তলার মাটি উপড়ে গেছে। সেই দশগুণ-একশগুণ স্রোতের ধাক্কায় নতুন খাতের ডান-বাঁ দুদিকের সব নতুন পাড় নতুন নদীতে ভেঙে পড়ে নদীর নতুন স্রোতকে পথ করে দিয়েছে। আর দুটো পাড় তৈরি করতে-করতে ভাঙতে-ভাঙতে নদী যেন গোটা একটা নদী হয়ে বহু দূরের আর-এক অপেক্ষমাণ নদীতে গিয়ে পড়ে তার স্রোতে নিজের স্রোত ঢালে।
পুরনো নদীর মানুষজন, গাছপালা, জারুল গাছ কিছুতেই মানতে চায় না, নদী চলে গেছে, তারা নদীছুট হয়ে পড়ে আছে। পরের বর্ষায় নিশ্চয় নদী ফিরে আসবে। কেন আসবে না? তারও পরের বর্ষায়?
তারপর নদীর পুরনো খাতে পুরনো জল আটকা পড়ে যায়। কোনো স্রোত থাকে না, ঢেউ থাকে না, জল কালো হয়ে যায় কিন্তু জল থাকে বেশ গভীর। তাতে কোত্থেকে সব ভাল-ভাল নতুন-নতুন মাছের সংসার হয়। হয়তো পুরনো নদীর জলেই এই মাছরা ছিল – বাঁওড় হয়ে যাবার পর স্থির জলে তাদের সংসার বড় হয়েছে, নতুন হয়েছে। পুকুরের চাইতে বড়, দিঘির চাইতেও লম্বা, নদীর চাইতে অনেক নিশ্চিত। কোনো অজানা নেই, নদীর মত কোনো অনিশ্চয় নেই, ভাঙন নেই, স্রোত হারানো নেই, মাছচাষ করার, ধরার কাজ সহজ, রয়েসয়ে করা যায়। যেন নদী নিজে সরে গিয়ে বাঁওড় বানিয়ে দিয়ে গেল – তাতে উপকারই হল। বসত পাকা হল, বাণিজ্যও বাড়ল। এত লাভের মধ্যে খরচের খাতায় তো এক নদী।
কিন্তু জারুল গাছটার কী হল?
জারুল গাছটা তো নদীর একেবারে ভিতর থেকে আকাশে উঠেছিল। সত্যি করেই একেবারে ভিতর থেকে নদীর একেবারে ভিতর থেকে, নদীর জলের একেবারে ভিতর থেকে। মাটি না হলে তো আর মাটির ভিতরে কোনো গাছই শিকড় গাড়তে পারে না। সে দূর্বাঘাসই হোক, তুলসী গাছই হোক আর ধান গাছই হোক। ধান গাছের মত ফলনের গাছ যাতে মাটির ভিতর শিকড় চাড়াতে পারে সেই জন্য শীত শেষ হওয়ার আগে থেকে মাটি চষা শুরু হয়। লাঙল দিয়ে জমিটায় যে একটা শক্তপোক্ত আস্তর পড়েছে আর সেই আস্তরে গর্ত খুঁড়ে-খুঁড়ে পোকামাকড়, ছোট-বড় লালকালো সব পিঁপড়ে যে বাসা বেঁধেছে, কোনো-কোনো জায়গার মাটি যে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে গেছে, কিছু ছোটখাটো ঝোপও যে গজিয়েছে ধানকাটা মাঠে – সেসব লাঙলের খোঁচায় উপড়ে দিয়ে মাঠটাকে এবড়োখেবড়ো করে দিতে হয়, যাতে, যদি একটা বৃষ্টি পায়, তা হলে মাঠটা কাদা-কাদা হয়ে থাকে। ধানচারা রোয়া গাড়তে তো সেই শ্রাবণের শেষ। কিন্তু সব চেষ্টা রোয়া গাড়ার পর ধানের ওইটুকু রোয়া যেন শিকড় গজিয়ে তুলতে পারে। রোয়া ধানের শিকড়? সে তো ফুঁ দিলে উড়ে যায়, রক্ত নেই, সাদা। কিন্তু সেই শিকড়ই তো মাটির তলার মাটিকে আঁকড়াবে, আঁকড়ে মাটির তলা থেকে রস শুষে মাটির ওপরে তার ল্যাতপেতে কা– পাঠাবে আর মাটির তলার মাটিটাকে আঁকড়ে ধরবে যাতে সেই মাটিও ওইটুকু একটা শিকড়কে খাড়া রাখার জন্য একটু-একটু চাপ দেবে। এই কাজটা যাতে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে ঘটে তার জন্যই তো যত মেহনত।
জারুল গাছের তো ক্ষেত হয় না। জারুল গাছ তো একা গাছ। কিন্তু তাকেও তো খাড়া থাকতে হয় মাটির ভিতরে শিকড় ঢুকিয়ে, মাটি আঁকড়েই। জারুল গাছ তো বড় গাছ – তার শিকড়ের জোর থাকে, কাঁটা থাকে, তাকে ছিঁড়ে ফেলতে গেলে গায়ের জোর লাগে, আর যদি-বা ছেঁড়া যায়, যে ছেঁড়ে তার আঙুলেও কাঁটা ঢুকে যায় আর যদি তার হাতের চেটো শক্ত আর খড়খড়ে হয়ে গিয়ে না থাকে, তা হলে, শিকড় যে ছেঁড়ে, যদি কেউ ছেঁড়ে, তা হলে রক্তারক্তিও ঘটে। তবে, কোথাও একটা জারুল গাছের চারা দেখলে সেটা উপড়ে ছিঁড়ে ফেলতে যাবেই-বা কেন একজন। বরং কেউ-কেউ তো জমি থাকলে জারুল গাছের চারা পুঁতে দেয় – জারুল তো লাভের গাছ, একটা বড় জারুলের দাম কত? কিন্তু জারুল তো বুনোও খানিকটা। কোথায় কোন নদীপাড়ে কিংবা প্রান্তরের মধ্যে বা গ্রামের শেষ আলে, শিকড় গেঁথে বড় হয়ে উঠতে থাকে, নিজেরই জোরে মাটির ভিতরে শিকড় চাড়াতে-চাড়াতে। জারুল গাছ লাগাবে বলে কেউ তো আর
তিন-চার মাস ধরে ক্ষেত তৈরি করে না। এই নদীও তো এই জারুলকে নিমন্ত্রণ করে তার পাড়ে শিকড় চাড়াতে বলে নি।
কেন এই জারুল এই নদীপাড়েই শিকড় চাড়িয়েছিল তার কোনো হিসেব হয় না।
কিন্তু যখন ওই নদী এই জারুলের পাড়টা ভাঙতে শুরু করে, তার একটা সোজা হিসেব হয়। নদী যখন পাড় ভাঙে তখন কি নদী কোনো হিসেব কষতে পারে – পাড়ে কী-কী পড়ছে তার ভাঙনের মুখে? নদীর কি কোনো বাছাই থাকতে পারে? নদীর জল আর স্রোত তার পথ কেটে চলেছে। সেই পাড়টা ভেঙে সে একটা ঢাল পাবে বলে পাড় ভাঙছে। মন্দিরও ভাঙছে, রাজবাড়িও ভাঙছে, প্রান্তরও ভাঙছে। নদীর পাড়-ভাঙার মধ্যে নদীর কোনো ইচ্ছেও কাজ করে না, কোনো লক্ষ্যও কাজ করে না।
নদী তো মাটির ঢাল মেনে বয়ে যায়। আর, তার জল তো স্রোতের নিয়মে ঢাল তৈরি করে বা খুঁজে পায়। সে-স্রোত তো তৈরি হয় – নদীর খাত জুড়ে কত বৃষ্টির জল কত সময়ের মধ্যে জমা হয়েছে, কোন হিমবাহ থেকে কতটা জল, কতটা জল, গলে, কতটা সময়ে নদীর এই খাতে নেমে এসেছে। এসব তো হিসেব-নিকেশে বের করে ফেলা যায়।
এমন বের করার মধ্যে একটা ভুল নিশ্চয়তা কাজ করে, যা সব সময়ই নদীর খাতভাঙা, পাড়ভাঙা, পাহাড়ভাঙার পর সক্রিয় হয়। সেই নিশ্চয়তা নদীর বা নদীগুলির এমন ব্যবহারকেও কেমন স্বাভাবিক করে দিতে পারে যখন এমন কী পাহাড়ের মাথা ভেঙে পড়ে, এমন কী গিরিপথ লুপ্ত হয়ে যায় গিরিস্রোতের তলে, এমন কী পর্বতশিখর ভেঙে পড়ে আটকে দেয় পাহাড় থেকে স্রোতের নেমে আসার পথ, যখন ড্যাম ফেটে যায় জলের চাপে, জল যেন রুদ্ধতার প্রতিশোধ নেয়। নদী প্রতিশোধ নেয়।
অথচ এমন প্রতিশোধ ক্ষমতাকেও প্রতিরোধ্য ভেবে নিয়ে মানুষ সেই নদীর পাড়ে তার ঘরবসত বানিয়ে নদীর ওপর জীবনের স্বভাব আরোপ করে।
যেন, নদীর ইচ্ছে আছে, স্বভাব আছে, রাগ আছে, অভিমান আছে, সন্ন্যাস আছে, আসক্তি আছে, ঔদাস্য আছে, নিয়তিও আছে। নদী যেন কাছে আসতে পারে, দূরে চলে যেতে পারে, ফিরেও আসতে পারে, নিজের মুখটাকে শরীরের গতির উল্টো দিকে ফেরাতে পারে, ফিরিয়ে রাখতেও পারে, হারিয়েও যেতে পারে, নিজেরই একটা অংশ লুকিয়ে ফেলতে পারে – নিজের সম্পূর্ণতা নষ্ট করে, নিজের প্রকাশ্যতা দিয়ে সব গোপনতা শেষ করে দিতে পারে, মাটির তলা দিয়ে তার অন্য একটা যাত্রাও থাকতে পারে, সেই অমত্মঃসলিলা নদীর সঙ্গে ভূতলে প্রবহমান নদীর কোনো সম্পর্ক না-ই থাকতে পারে, আবার বিপরীত সম্পর্কও থাকতে পারে।
এই জারুল তো আর বেছে-টেছে পছন্দ করে এই নদীর স্রোতের ভিতরের মাটিতে তার শিকড় চাড়ায় নি। যখন জারুলের চারাটা মাথা চাড়িয়েছিল তখন হয়তো স্রোত এখানে ছিলই না। নদী যেমন বর্ষায়-বর্ষায় পাড় বদলাতে পারে, জারুলের মত বড় গাছ, বা কোনো গাছই, তো আর এক জন্মে তার জায়গা বদলাতে পারে না। যেখানে তার চারা প্রথম গজায়, সেখানেই তার মাথা আকাশ ছোঁয়, দিক আড়াল করে, আকাশ ও জল থেকে যত রকম আলো তাকে বেয়ে নামে ও ওঠে তার সঙ্গে মিলিয়ে সেই জলেস্থলে তার ছায়া নানা আকারে তৈরি হতে থাকে ও মুছে যেতে থাকে – জারুলের তো সারা জীবনের ব্যাপার আর তার সারা জীবন তো একটাই জীবন। নদীরও সারা জীবনেরই ব্যাপার বটে কিন্তু নদীর সারা জীবন তো অনেক জীবনের ব্যাপার। নদী যখন জারুলের বাঁ-হাতি জমি ভাঙছিল তখন তো সবাই-ই দিন গুনত, কবে নদী জারুলের মাটির তলার শিকড় উপড়াবে। তবে নদী আর নদীপাড়ের গাছ দেখা মানুষজনও জানত যে, জারুলের শিকড় ওপড়াতে নদীর সময় লাগবে। জারুলের শিকড় মাটির অনেক গভীরে জালের মত ছড়ানো ও জড়ানো। কুড়ুল দিয়ে, করাত দিয়ে, কা- থেকে কেটে নামাতেও, এমন একটা সারা জীবনের জারুল গাছে, সময় নেয়, যদিও সেই কাটাকুটি তো চোখের সামনে দেখা যায়, মাপা যায় ও যখন যেমন দরকার কাটাকুটির ধরন তত বদলানো যায়। দড়ি দিয়ে তার মাথার ডালগুলোকে, মাটিতে, যেদিকে জারুলের মাথাটা ফেললে সুবিধে, সেদিকের মাঠে পোঁতা খুঁটোর সঙ্গে বেঁধে, একটা টানা তৈরি করা যায়। সে তো জারুল উৎপাটন নয়, জারুল কেটে বের করা। মাটির তলার যে-শিকড় জারুলের এত বড় আকারের ওজনকে মাটিতে ছড়িয়ে দেয়, সেই শিকড়টাকে মাটিতেই, মাটির ভিতরেই, রেখে দেওয়া হয়।
আর, নদী তো সেই শিকড়টাকেই মাটি থেকে ছিঁড়বে – নইলে নদী পথ পাবে কী করে। নদীর এমন গাছ-উপড়নো যারা এক-আধবার দেখেছে, বা শুনেছে, বা কাছাকাছি কোনো নদীর পাড়ে, দেখে এসেছে যে অমন এক মহীরুহ নদীর জলে পঁচিশ বছর পরেও কেমন ঝুলে আছে, যেন বাজ পড়ে তাকে ওপর থেকে তলায় দোফালা করে দিয়েছে। কিন্তু বাজ তো ওপর থেকে পড়ে নি, বাজ নদীর স্রোতের ভিতর থেকে সেই মহাবৃক্ষের মাথা পর্যন্ত উঠে আকাশে মিলিয়ে গেছে। সেই মহাদ্রম্নম সেই বজ্রছিন্ন শরীর নিয়ে এখনো, আজও, পঁচিশ বছর, সেই স্রোতে দাঁড়িয়ে আছে।
নদী যে জারুলের তলায় মাটিতে ঘা না দিয়ে, কয়েক হাত শান্ত থেকে, পাড়ের ওপর ঝাঁপায়, তাতে লোকজন যেন একটা যুদ্ধের আঁচ পায় – জলের তলে সে-যুদ্ধ চলছিল জারুলের শিকড় আর নদীর স্রোতের ভিতর। ওই লোকজনের মধ্যে এমনও কেউ-কেউ তো নদীর ভিতরের মাটি এক-ডুবে তুলে নিয়ে আসে শীতের সময়, তাদেরও কেউ-কেউ এমন সাক্ষ্যও দেয় যে, জারুলের দুটো মোটা শিকড় নদীর তলায় বাঁধের মত খাড়া – স্রোত যাতে জারুলের ভিত না কাটে। কিন্তু সেসব তো এমন সাক্ষ্য, যার কোনো প্রমাণ দরকার হয় না। প্রমাণ ছাড়াই লোকজন খুব তাড়াতাড়ি মেনে নেয়, মেনে নেওয়াটা এতই জরুরি হয়ে ওঠে। এমন একটা যুক্তির আভাস পেলে, লোকজন, জারুলের ভিটেটাকে স্রোতের ভিতর থেকে বুড়ো আঙুলের মত, বা প্রান্তরের প্রান্ত থেকে কেউটের ফণার মত, দেখতে পারে ও বারুণী স্নানের দিন নদীর জল দিয়ে জারুলের কা- ধুয়ে জারুল-পাতার নৌকো বানিয়ে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিতে পারে। উপমা তৈরি করতে হলে ও সেই উপমার প্রশ্রয়ে নদীর পাড়-ভাঙার মত সাম্বৎসরিক নিত্য ঘটনাকে নিজেদের নিত্য বোধবুদ্ধির বাইরের ব্যাপার বলে মেনে নিতে চাইলে, এমন কোনো সাক্ষ্যকে যুক্তিযুক্ত মনে করে নিতেই হয় যে, নদীর অতল তলে, জারুল, তার শিকড়ের বাঁধ বেঁধে রেখেছে।
সেই অতল তলের অদৃশ্য শিকড়, নদী ও জারুলকে নিয়ে যে-বিশ্বাস তৈরি করে তুলেছে সে-বিশ্বাস কখনো ভাঙে না। সেই বিশ্বাসকে অভগ্ন ও অখ- রাখতে আরো কত নতুন বিশ্বাস তৈরি হতে থাকে। বিশ্বাস তখনই বিশ্বাস হয়ে ওঠে যখন তা পুরুষানুক্রমিক হয়। বিশ্বাসের কোনো বিনাশ হতে দিতে নেই। একটা বিশ্বাস তৈরি হতে – কত জন্ম কেটে যায়। সব জন্মেই তো নতুন করে একটা বিশ্বাস জন্মাতে পারে না। মানুষকে বাপ-পিতামহের বিশ্বাস নিয়েই জীবন চালাতে হয় ও জীবন শেষ হওয়ার আগেই নিজের ছেলেপুলে নাতি-নাতনিদের সেই বিশ্বাস জানিয়ে দিতে হয়। যদি তোমার ভাগ্যে থাকে, তা হলে তোমার নিজের জীবনে পাওয়া কোনো বিশ্বাসও তার সঙ্গে যুক্ত করতে পারো। কিন্তু সেই বিশ্বাসটা যে পাবেই এমন ভরসা করো না।
বিশ্বাস ছাড়া তো মানুষের এক দ-ও চলে না। সব বিশ্বাসই তো আড়াল থেকে আসে। তুমি তো দেখছ – আকাশ জুড়ে জ্বলজ্বলে দিন, পিঠের চামড়া পুড়ে কুঁচকে যাচ্ছে সে-রোদে, সেই পোড়া শরীর তো একটু আরাম পেতে গাছের তলায় দাঁড়ায় – চেনাজানা তেপান্তর, পায়ের পার হওয়ারও সাবেকি অভ্যেস, গাছ তো ছায়া দেয় একজনকে একটু ছায়া দিতেই। যে-আকাশ রোদ দিচ্ছিল, সেই আকাশই ছায়া দিচ্ছিল, এমন সব কথা মনে আসতে শুরু করলে, তাকে এমন নদীর স্রোতের মতই সে-কথাগুলোকে মনে আসতে দিতে হয়, যে-নদীর ভিতরে পাহাড়-পর্বতের কোনো বন্যা ঢুকে পড়ে নদীর নিজের জলের সঙ্গে মিশে যায় নি। আবার যদি মনে আসে যে, আকাশই রোদ ঢালছিল আর গাছটাই ছায়া বিছিয়েছিল, তাকেও মনে আসতে দাও এমন, যেন রোদ-দেওয়া আর ছায়া-দেয়া একটাই কাজ, আকাশও ছায়া দেয়, গাছও রোদ দেয়। আবার যখন কোনো মাঝরাতের অন্ধকারে, ওই প্রান্তরটাই তোমাকে পেরোতে হয় পায়ের অভ্যেসে, আর নাকের গন্ধ নেওয়ার জোরে, তখন, যদিও আকাশ থেকে জলই পড়ছিল অঝোর, তবু, যেমন রোদ থেকে, তেমনি ওই অঝোর ঝরণ থেকেও একটু বাঁচতে তো সেই চেনা গাছের তলাতে তোমাকে দাঁড়াতেই হয়। মনের অভ্যাসে। আর সেই গাছটার মাথা দিয়ে কোনো বাজ তোমাকে মাটিতে গেঁথে দেয়। তখন গেঁথে যেতে-যেতেই তোমাকে ভাবতে হয় ওই তেপান্তরের বৃষ্টি, তেপান্তরের গাছ, আর তেপান্তরের বজ্রপাত একটাই ঘটনা। গাছ যেমন তেপান্তরে মাথা উঁচিয়ে ছিল, তুমিও তেমনি সবচেয়ে মাথা উঁচু করে থাকতে পারতে এই গাছেরই মত সবচেয়ে উঁচু, থাকতে পারতে বজ্রটাকে মাথায় নিতে। এই সব কখনো মাপামাপি করতে নেই। মাপামাপি করলেই বিশ্বাসে চিড় ধরে যায়। বিশ্বাসে চিড় ধরতে দিলেই তো অনেক রকমের সর্বনাশ। যে-বিশ্বাসগুলো বাপ
ঠাকুরদার কাছ থেকে পেয়েছ, সেগুলোরও সর্বনাশ, আর যে-বিশ্বাসগুলো তুমি নিজেই পেতে পারতে, সেগুলোরও সর্বনাশ। নদী, মানুষ, ভাঙনের মুখেও বেঁচে থাকা জারুল গাছ, সরে-যাওয়া নদীর বুকেও জারুল গাছের ঝুঁকে থাকা, নদীর অতল তলেজারুল গাছের অদৃশ্য দুই মোটা শিকড়ের বাঁধের স্রোতশাসন – যাতে সেই ভাঙনের স্রোত জারুল গাছের শিকড়ের মাটি থেকে দূরে থাকে, নদীর ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা, চৈত্র মাসের কৃষ্ণ-চতুর্দশীতে যেখানে যে-জল আছে, তাকেই নদী করে নিয়ে তারই পাড়ে বারুণী মেলা।
এখন চৈত্র মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে সেই নদীর পাড়ে ছেড়ে-যাওয়া নদীর জল যে-বাঁওড় হয়ে পড়ে আছে, শাদা স্রোত হয়ে গেছে কালো জল, মানুষের বসতভাঙা যে-নদী হয়ে গেছে কালো রঙের মাছের সংসার, সেই নদীর ফিরে আসার জন্য সেই বাঁওড়ের পাড়ের বালুভূমি নির্জন ও অপেক্ষমাণ নদীতল হয়ে আছে – যেন নদী যখন ফিরবে তখন পুরো নদীটাকে সে বুকে নিয়ে নদীর জলের তলায় আবার আত্মগোপনে চলে যেতে পারবে ও সেই আত্মগোপনে জারুল গাছের সেই দুটো মোটা শিকড়ও থাকবে স্রোতের বিরুদ্ধে বাঁধ হিসেবে।
নদীর ওপর দিয়ে যেসব হাওয়া বয়ে এসে, জারুল গাছের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে, অষ্টপ্রহর এমন একটা দিকভুল তৈরি করতে থাকত, যেন জারুল গাছটাই তার ডালপালা পাতা-পল্লব থেকে হাওয়াদের ন-দশ দিকে বইয়ে দিচ্ছে আর সেই জলমেশানো হাওয়া জারুল গাছের পাতাগুলোকে ধুইয়ে দিয়ে সব সময় এমন ঝলমলে রাখত, এমন কাঁপিয়ে রাখত, যে, মনে হত, তারা, পাতাগুলো এইমাত্র মাটির হাওয়াহীন, আলোহীন অন্ধকার থেকে মাটির ওপরে উঠে এল – এখন তো সেই হাওয়া নেই। জারুল গাছের ডালপালা পাতা-পল্লব কা–শিখর পুরু ধুলোয় এমন ঢাকা যে চৈত্র মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে বারুণী মেলার দিন সেই পাতাগুলো তুলে এনে, সেগুলোকে সেই-নদীর ফেলে-যাওয়া বাঁওড় হয়ে-থাকা কালো জলে ধুয়ে নিতে হয়, তাতেও সেই পাতার স্তবক থেকে শুধু কাদাই বেরোয়। বাঁওড়ের কাদা জল আর জারুলের পাতার ধুলো ধুয়ে দেবে কী করে। সেই মোটা হয়ে যাওয়া জারুলপাতা দিয়েই বারুণী পুজোর নৌকো বানাতে হয়। পুজোর পর সেই পাতার নৌকো বাঁওড়ের কালো জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। নৌকোগুলো ভাসে। কিন্তু বাঁওড়ের জলে তো স্রোত নেই, তাই নৌকো এগোয় না। দুই হাতের পাতায় জল তুলে জল ঢেলে, জারুলপাতার নৌকোগুলোতে পুরনো নদীর গতি আনতে হয়, নতুন করে ফিরে আসা নদীর ঢেউয়ের ধাক্কা দিতে হয়, আর বারুণী পুজোর গানটা গাইতে হয় –
যাও নদী, বও গিয়া।
যাও জারুল, খাড়াও গিয়া।
জারুল, নদীরে দিও ছায়া
নদী, জারুলরে দিও হাওয়া।
জারুল, নদীরে দিও ঘাট
নদী, জারুলরে দিও বাঁক।
বারুণী পূজার দিন, যার যা জল, হাতের আঁজলা-ঘটি, কুয়ো-ডোবা-পুকুর-দিঘি-খাল-বিল-হাওড়-বাঁওড়ের, ছোট-বড়-সরু-মোটা-মজা-সোঁতা-নতুন-পুরনো-খাত-ডালা-খাত-হারানো, ফিরে-আসা নানা আকারের আর স্বভাবের – সব জল, নদী হয়ে যায়। বারুণী পুজোয় যার যা সুর, তাইতেই গাইতে হয় – আমার এই জলখানে মেঘ ভাঙ্গি পড়ুক,
আমার এই জলের ভিতর বানা ঢুকি পড়ুক,
আমার এই জল যেন পাড় ভাঙ্গে,
আমার এই জলখান যেন আমাক ভাসায়
আমার এই জারুল গাছখান যেন খাড়ি থাকে।

এই গাড়ি, ওই গাড়ি

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

বাড়ির অদূরে নদী, নদীর উপরে ব্রিজ, ব্রিজের উপরে
ঝমাঝম শব্দ তুলে এতক্ষণে যার
নদীটিকে পেরিয়ে যাবার কথা ছিল, সেই যাত্রীতে-বোঝাই
প্যাসেঞ্জার-গাড়ি আজকে এখনো এ-পাড়ে
ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

মাঝে-মাঝে সিটি দিচ্ছে অবশ্য। তা দিক।
আসল কথাটা এই যে, সামনে ওই সিগন্যালের বাতি
যতক্ষণ না নিষেধের রক্তবর্ণ ছেড়ে
আবার সবুজ হচ্ছে, ঠিক ততক্ষণই
এ-গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকবে, এক-পা এগোবে না।

জায়গাটা তো ইতিমধ্যে মোটামুটি চেনা
হয়ে গেছে। তাই বলি যে, চলতে-চলতে আস্ত একটা ট্রেন
হঠাৎ এইখানে এসে থেমে রইল, এমন ঘটনা
একবারও দেখিনি এর আগে।
তা হলে আজকেই বা একে থেমে থাকতে বলা হলো কেন?
এর কি তবে ফুরিয়েছে দম?

আচমকা উত্তর পাই আমার ভাবনার। ঝমাঝম
শব্দ তুলে নদীর ও-পার থেকে দুরন্ত গতিতে
সেতুটি পেরিয়ে আসে ঝকঝকে নতুন ট্রেন, যার
সামনের ফলকে লেখা : রাজধানী এক্সপ্রেস।… ওরে বাবা,

ওর জন্য না-দাঁড়ালে কার জন্য দাঁড়াবে ছ্যাকড়া প্যাসেঞ্জার-গাড়ি?
ওর টিকিটের দাম কি বেশি নয়?
ঢের বেশি বলেই তো দেখি বাদবাকি গাড়িকে
নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে ওকে রাস্তা ছেড়ে দিতে হয়।

আমিহীন আমার ছায়া

ওমর কায়সার

আমার আড়াল থেকে ওরা বেরিয়ে এসেছে
হেঁটে গেছে
সীমানা চিহ্নের বাঁধ ভেঙে
চলে গেছে কোন পরবাসে।

আমিহীন আমার ছায়ারা
পথে প্রান্তে ঘুরে ঘুরে
কোনো ব্যস্ত কোলাহলে থমকে দাঁড়িয়েছে।
অথবা নির্জনতার অতীব প্রাচীন কোনো গোলকধাঁধায় হারিয়েছে পথ।

কিংবা কোনো ঘুমন্ত নদীর বাঁকে আড়ি পেতে
দু-একটা বেদনার গানে
আমারই প্রতিচ্ছবি কল্লোলিত হতে দেখে
ওরা ফিরে গেছে।

নদীর সংগীত থেকে বহুদূরে
প্রান্তরের ধুলোর ভিতর মিশে থাকা
পালাগান আর বিরহ মাড়িয়ে
দিন ও রাতের বহু পুরনো কথার ঝাঁপি পেরিয়ে পেরিয়ে
গাছের বাকলে লেখা পুঁথির স্মৃতিকে
গোপনে কাঁদিয়ে ওরা নিখোঁজ হয়েছে।

হয়তো নির্জনে পাহাড়ের কোনো ঝরনার প্রবাহে
রাংরাঙের একটি পালক ভেসে যেতে দেখে
বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

সাহারায় বালির ঘূর্ণনে
প্রেইরির তৃণের ডগায়
পৃথিবীর এখানে-সেখানে
বস্ত্ত ও অবস্ত্তর খেলা
নিমেষে নিঃশেষ করে
চলে গেছে অন্য ছায়াপথে – তারার গহিনে?

কেউ কি দেখেছো সেই শেষ দৃশ্যটুকু
শেষ বিন্দু দুচোখের জলে অদৃশ্য লবণ আর অনিদ্রাকে
আমাকে, আমাকে
আর আমার ছায়াকে?

দুটি কবিতা

শিহাব সরকার

এই নিয়ে রাত দুপুরে গ্লাস-ভাঙা

কে কাকে মধ্যে রেখে না ঘুরে যায়
কী না ঘোরে, ঘোরে সবকিছু, আমি ও তুমি

মানুষ পতঙ্গ জন্তু জীব পাখি জলকণা,
ঘোরে গ্রহতারা, কবে থেকে কেন ঘোরে
আখড়ার উঠানে বসে বৃদ্ধ বাউল দিশাহারা।

দেখি সূর্য ঘোরে, পৃথিবী নিশ্চল
শনি মঙ্গল বুধ সমুদ্রে অস্ত যায় প্রতি সন্ধ্যায়,
অথচ মূলকথা পৃথিবী সূর্যের বলয়ে ঘোরে

তবু আজো কারো কারো খটকা
সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে ভোর থেকে দিনান্তে
গ্যালিলিকে বনমানুষেরা তাড়িয়ে বেড়ায়

আমাদের অমল ও নীলার ছয় মাস
নতুন সংসার, মিনি-ফ্ল্যাট, বার্নিশে পেইন্টে ভুরভুর
কে কাকে মধ্যে রেখে ঘুরেছে,
এই নিয়ে রাতদুপুরে গ্লাস-ভাঙা, রক্তারক্তি
নৈঃশব্দ্যের বাজনায় নাচছে ব্যালেরিনা।

ভোরে শূন্য বিছানা। অমল পড়ে নীলার চিঠি।
সাধুর পদ্মাসনে তত্ত্বের বিদ্যুৎ

পাহাড়প্রান্তে বা ভাঙনের কিনারে।
পেছনে অমাবস্যায় অলীক জোনাকিরা
অশরীরীদের কানাকানি চাপা হাসি
এখনই সময় মূল তত্ত্ব রচনার।

পর্বতচূড়ায় বা অচেনা বন্দরে
জাহাজের ভেঁপু সমুদ্রসারস, প্রমোদভবনে
নারীর থাবায় অসহায় নাবিকেরা
এ-সময়ে জীবন নিয়ে আরো তত্ত্ব …
পথহাঁটুরে সাধুরা তাঁবুতে ধ্যানাসীন
ভুবন-ভাসানো জ্যোৎস্নায় সাদা বিড়াল,
রাত্রি গাঢ় হতে হতে পৃথিবী অন্য ভুবন,
সাধুর পদ্মাসনে তত্ত্বের বিদ্যুৎ।

এভাবে অনেক কবিতা এবং পদ্য
শুঁড়িখানার আঙিনায়ও কবিতার ফুল।

চাবি এবং ভালোবাসা

PervezusRobinus_1227982714_1-L10759482aaহরিশংকর জলদাস

দাদুর চার ছেলে, দুই মেয়ে। এটা জীবিতদের হিসেব। মৃতের সংখ্যা কম নয়। তিন। যে ছেলের নামে দাদু পরিচিত, সে ছেলে মারা গেছেন। লোকে দাদুকে হরকিশোরের বাপ বলে ডাকত। গাঁ-গেরামে এরকমই রেওয়াজ। সন্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত নাম ধরে ডাকাডাকি। সন্তান হলেই নাম বদলে যাওয়া। তখন চন্দ্রকান্ত, সুশীল, মিলন নয়, তখন – নেপালের বাবা, বিশাখার বাপ – এসব। সন্তানের নামের মধ্যে মা-বাপের নাম হারিয়ে যাওয়া।
সেই রীতিতে দাদুর নামও পাল্টে গিয়েছিল। তাঁর নাম যে কী, অনেকটা বয়স পর্যন্ত আমি জানতে পারিনি। তিনি আমাদের কাছে দাদু, গ্রামবাসীর কাছে হরকিশোরের বাপ।
কিশোর শব্দটির প্রতি দাদু সমীরকিশোরের টান ছিল ভীষণ। মেয়েদের বেলায় রানি। ছেলেদের নাম রেখেছিলেন – হরকিশোর, রূপকিশোর, সঞ্জীবকিশোর, রামকিশোর, সঞ্জয়কিশোর। এসব নামের ক্ষেত্রে কিশোর খাটে কিনা সেদিকে নজর নেই দাদুর, যত দুর্বলতা কিশোরের প্রতি। রবীন্দ্রনাথদের যেমন নাথ, বঙ্কিমদের চন্দ্র, তেমনি দাদুদের কিশোর। বিয়ের পর তাঁর সন্তানদের কৈশোরত্ব থাকবে কিনা, সেদিকটা ভাবেননি দাদু। মেয়েদের নামের শেষে রানি যুক্ত করে বড় তৃপ্তি পেয়েছিলেন। মেয়েদের নাম রেখেছিলেন তুলসীরানি, বৃন্দারানি।
খুব ছোট একটা চাকরি করতেন দাদু তাঁর প্রথম জীবনে। কুবস্টিল নামে একটা কারখানা বসেছিল আমাদের গাঁ থেকে এক গ্রাম পরের গাঁয়ে। দাদু খুব বেশি পড়ালেখা জানতেন না। ওই কারখানায় জাপানি ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করত। সুন্দর সুন্দর বাংলো টাইপের ঘরে থাকত তারা। দাদু তাদের দেখভালের চাকরি করত। বাবাদের ওরকমই বলতেন দাদু। কিন্তু বহু বছর পরে জানা গেছে – দাদু ওখানে সুইপারের চাকরি করতেন।
তবে এজন্য দাদুর কোনো আফসোস ছিল না। তাঁর যত কষ্ট, সব ছেলে সমানভাবে মানুষ না হওয়ার জন্য। আমার বাবা ছিল দাদুর জীবিত ছেলেদের মধ্যে দ্বিতীয়। সঞ্জীবকিশোর অন্য ভাইদের তুলনায় বেশ বেশিই লেখাপড়া করেছিল।
আমার জেঠা রূপকিশোরের থলথলে শরীর। গৌরবর্ণ। ফর্সা রঙের জন্যই বোধহয় দাদু তাঁর এই ছেলেটির নাম রেখেছিলেন রূপকিশোর। পড়াশোনা খুব বেশিদূর করেননি জেঠা। মাধ্যমিক পাস করেই নাটকের দিকে ঝুঁকেছিলেন। গান-বাদ্য – এগুলোতেই জেঠার যত তৃপ্তি। কোনোদিন রাগ করতে দেখিনি জেঠাকে। কী একটা ভাবের মধ্যে হাঁটাচলা করতেন তিনি। অন্যান্য ভাই আর ভ্রাতৃবধূরা যখন ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ঝগড়াঝাঁটিতে লিপ্ত, জেঠু তখন নির্বিকার। ভাইয়েরা তাঁকে মধ্যস্থতা মানলে তিনি বলতেন, ‘এসব আমাকে বুঝিয়ে তেমন লাভ নেই, নিজেদের সমস্যা নিজেরা মিটিয়ে নাও।’
রামকিশোর কাকা বলত, ‘তোমার স্বার্থও জড়িয়ে আছে এখানে।’
‘আমার স্বার্থ?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন জেঠু।
‘হ্যাঁ দাদা, এ ব্যাপারে তুমি কথা না বললে তোমারও সমূহ ক্ষতি হবে।’ রামকিশোর কাকা আবার বলত।
চোখ দুটোকে সামান্য খুলে জেঠু বলতেন, ‘কী রকম ক্ষতি বুঝতে পারছি না রামকিশোর।’
‘সঞ্জয় বেল্লিকটা পুকুরপাড় দখল করে ঘর তুলছে। বলে নাকি মুরগির খামার দেবে।’ বলল রামকিশোর কাকা।
‘এ তো ভালো কথা। বাউন্ডুলে স্বভাবের সঞ্জয়। চিরদিন কিছুই করল না। ঘুরে বেড়িয়ে আর আড্ডা মেরে কাটাল। এখন যদি তার সুমতি হয়, তাতে তোমার ক্ষতি কী রামকিশোর, বুঝতে পারছি না।’ মৃদু গলায় রূপকিশোর জেঠু বললেন।
এবার রামকিশোর কাকা গলায় একটু ঝাঁঝ ঢেলে বলল, ‘তুমি চিরটাকাল এরকমই থেকে গেলে দাদা।’ তারপর নিজেকে সংযত করে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘দাদা, ওই পুকুরপাড়টা তো শুধু ওর না, আমাদের সবার। এই যে ঘরটা বাঁধার উদ্যোগ নিচ্ছে, বাধা না দিলে শেষ পর্যন্ত ওই জায়গাটা তো সঞ্জয়েরই দখলে চলে যাবে। শেষে কি ওই পুকুরপাড়টা ভাগবাটোয়ারায় আসবে?’
জেঠু বলেন, ‘তো আমাকে কী করতে হবে বল রামকিশোর?’
রামকিশোর কাকা বলে, ‘বাবা নেই আমাদের। থাকলে তার কাছেই বিচার চাইতাম। তুমি বড় ভাই। সঞ্জয়ের এই অন্যায়ের বিচার তোমার কাছে না চেয়ে কার কাছে চাইব, বলো দাদা?’
জেঠু বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকেন। তারপর করুণ চোখে রামকিশোর কাকার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘দেখ রাম, আমার কোনো ছেলেপুলে নেই। বয়সও কম হলো না আমার। তোরা দয়া করে দোকানটা আমাকে দিয়েছিস। ওই দোকানেই আমাদের সংসার চলে যায়। ওসব জায়গাজমির প্রতি আমার কোনো লোভ নেই। তোদের ছেলেমেয়ে আছে। সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলে এর একটা বিহিত কর। পারলে পাড়ার দু-একজনকে ডাক। আমাকে আর এতে জড়াস না ভাই।’
রামকিশোর কাকার হতাশ চোখে জেঠার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
দাদু চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টের পর বড় রাস্তার ধারে একটা চাল-ডালের দোকান দিয়েছিলেন। একটা সুন্দর গদিও তৈরি করিয়েছিলেন। ওখানে আয়েস করে বসে চাল-ডাল বিক্রি করতেন দাদু। দোকানে ভবতোষ নামের এক কর্মচারী ছিল। ও-ই দোকানের সবকিছু দেখাশোনা করত।
গোড়ালি ঢাকা ধুতি পরতেন দাদু। গায়ে ফতুয়া। ধবধবে সাদা। পেছন দিকে চুল আঁচড়াতেন। প্রতি রাতে দিদিমা দাদুর মাথায় তেল ঘষে দিতেন। ফলে দাদুর মুখম-লে সর্বদা তেল-চকচকে একটা আভা থাকত। সুইপারের চাকরি করার বেদনাটা চাল-ডালের গদিতে বসে দাদু ভুলতে চেয়েছিলেন।
শেষের দিকে দাদু রূপকিশোর জেঠুকে সঙ্গে করে দোকানে নিয়ে যেতেন। তাঁর আসনের পাশে ছোট্ট একটা গদি তৈরি করিয়ে জেঠুকে সেখানে বসতে দিয়েছিলেন। মাস তিনেক ছেলেকে বেশ কড়া চোখে পরখ করে নিয়েছিলেন দাদু।
একদিন ক্যাশবাক্সটা তাঁর দিকে ঠেলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে হিসেবপত্রটা তুই দেখবি রূপকিশোর। আমি এইখানে বসে-বসে তোকে দেখে যাব।’
অন্যান্য ছেলের তুলনায় জেঠুকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন দাদু।
তো দাদুর মৃত্যুর পর এই দোকানের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। সঞ্জয় কাকা চাইল – দোকানটা তার দখলে নিতে। বাবারও লোভ ছিল দোকানটার প্রতি। এক রাতে মায়ের সঙ্গে কথোপকথনে বুঝেছিলাম আমি।
মা বলেছিল, ‘তুমি এরকম চুপচাপ থাকলে কি চলবে? এত টাকার দোকান! সঞ্জয় নাকি দোকানটা আত্মসাৎ করতে চাইছে। তোমারও তো হক আছে ওই দোকানে। শ্বশুরের সম্পত্তির ওপর তো তোমাদের চার ভাইয়ের সমান দাবি।’
‘তা তো জানি। কিন্তু দোকানটা তো এতদিন দাদাই চালিয়েছে। আমাদের চেয়ে দাদাকেই বেশি পছন্দ করত বাবা। দোকানটার প্রতি আমারও যে লোভ নেই, এমন নয়। কিন্তু দাদাকে একথা বলি কী করে?’
‘কেন, সঞ্জয় যদি বলতে পারে, তুমি বলতে পারবে না কেন?’ মা গলা উঁচিয়ে বলেছিল সে রাতে।
‘দেখো, সঞ্জয় বেয়াড়া ধরনের। তার উদ্ধত আচরণ বাবাকে ক্ষুব্ধ করত। বাবা মুখে কিছু বলত না সত্যি, কিন্তু তার ওপর বাবা যে ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিল, তা বাবার চেহারা দেখে বোঝা যেত। আর যা-ই করি, সঞ্জয়ের মতো বেয়াদবি করতে পারব না।’
বাবার কথাবার্তা শুনে মা সে রাতে চুপ মেরে গিয়েছিল।
দাদু থাকতে-থাকতেই উঠানের চারদিকে চারটা ঘর উঠেছিল। চার ছেলেকে ওই চারটা ঘর বুঝিয়ে দিয়েছিলেন দাদু। ওখানেই জেঠা-কাকারা সপরিবারে থাকতেন। দাদুর খুব বেশি সহায়সম্পত্তি ছিল না। বড় একটা বাস্ত্তভিটে, বিশাল একটা পুকুর, পুকুরের চারপাশে বাঁশঝাড়, শিমুলগাছ, শিরীষগাছ – এসব। পুকুর বা পুকুরপাড় ছেলেদের মধ্যে ভাগটাগও করে দিয়ে যাননি দাদু। ভিটেটাতেও পরবর্তীকালে যে যার মতো করে ঘরদোর বানিয়ে নিয়েছে। আমার বাবা দক্ষিণ হালিশহর হাইস্কুলে হেডমাস্টারি করত। বিএ পাস করেই মাস্টারিতে ঢুকেছিল বাবা। পরে প্রয়োজনে বিএডটাও করেছিল। রামকিশোর কাকা আবু তাহের অ্যান্ড কোং-এ ক্যাশিয়ারের চাকরি করত। বাবার চাপে রামকিশোর কাকা আইএ পাস করেছিল। সঞ্জয় কাকা কিছু না করেই জীবনটা কাটিয়ে দিল প্রায়। কিছু না করে বললে অবশ্য ভুল হবে, কিছু তো একটা করতই সঞ্জয় কাকা। সে টাউটগিরি।
পাড়ায় কে পাকা ঘর বানাচ্ছে, প্রতিবেশীকে উস্কে দিল সঞ্জয় কাকা – কিরে সাধন, চুপচাপ বসে আছিস যে! যদু কাকার ছাদটা কোথায় এসে পড়বে, বুঝতে পারছিস না? তোর তিন ফুট জায়গা তো যদু কাকার দখলে চলে যাবে রে। কিছু একটা কর।
গরিব সাধন কাঁচুমাচু করে বলল, আমারও সেরকম মনে হচ্ছে দাদা। কিন্তু কী করতে পারি আমি?
কাকা বলল – কী করতে পারিস মানে! চল আমার সঙ্গে, থানায় চল। জিডি কর যদু কাকার নামে। তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল!
সাধন বলল – আমি অশিক্ষিত গরিব মানুষ, থানায় যেতে আমার ভয় করছে দাদা।
তোর ভয়ের কিছু নেই। ওসির সঙ্গে আমার ভালো জানাশোনা। কিছু টাকা খরচ করতে হবে, এই যা। ধমকের সুরে সঞ্জয় কাকা বলে।
এইভাবে টুপাইস কামায় সঞ্জয় কাকা। কাকিটাও সেরকম। বাঘের সঙ্গে যেমন বাঘিনী, শেয়ালের সঙ্গে শেয়ালিনী, তেমনি সঞ্জয় কাকার সঙ্গে অমিতা কাকি। দুজনে মিলে বাড়িটাকে সর্বদা উত্তপ্ত করে রাখে।
এই অমিতা কাকি আর সঞ্জয় কাকা দোকানের মালিকানা নিয়ে একদিন গ-গোলটা পাকিয়ে বসল। সকাল থেকে হইচই। জেঠা দোকানে, বাবা স্কুলে, রামকিশোর কাকা চাকরিতে। ফাঁকা মাঠ। রূপকিশোর জেঠার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করল দুজনে – বাপের সম্পত্তি একা লুটেপুটে খাচ্ছে দাদা। বউ বলল – আক্কেল থাকলে কি এরকম করে কেউ? ভাইয়ালি সম্পত্তি একা ভোগ করে? কাকা বলল – লেড়া নাই, লেড়কি নাই, তার এত দরকার কী দোকানের? ছেলেমেয়ে নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। দোকানটা ছেড়ে দিতে বলো আমাকে।
শেষের কথাটা যে বড় বউদিকে উদ্দেশ করে বলা, সেটা বড় বউদি বুঝতে পারেন। কিন্তু মুখে কিছুই বলেন না বড় বউদি। একেবারেই নির্ভেজাল নারী তিনি। কিছুটা স্বভাবগুণে, অনেকটা জেঠুর প্রভাবে সাদাসিধে একজন নরম-সরল নারীতে পরিণত হয়েছেন জেঠি।
দেবরের হাউকাউয়ের কোনো জবাব দিলেন না জেঠিমা। উপরন্তু সঞ্জয় কাকার বাড়ির দিকের জানালাটা বন্ধ করে দিলেন।
জেঠি জেঠাকে বড় ভালোবাসেন। সন্তানাদি না হওয়ার কারণে সে ভালোবাসা আরো গাঢ় হয়েছে। জেঠুর দিবানিদ্রার অভ্যাস আছে। একদিন কী কারণে জেঠুদের দরজাটা একটু ফাঁক করা ছিল। ওই ফাঁক দিয়ে এক দুপুরে দেখলাম – জেঠু চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন, জেঠির বাম হাতে হাতপাখা। আর ডান হাত দিয়ে জেঠুর চুলবিরল মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন।
সঞ্জয় কাকা আর কাকির হইহলস্না শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। না জানি জেঠু কী রকম কষ্ট পান! কোনো না কোনোভাবে তো ওদের হলস্নাবাজির কথা জেঠুর কানে যাবেই। আর কেউ বলুক না বলুক, জেঠিমা তো বলবেনই। মাকে দেখেছি – সংসারে টুকরাটাকরা কিছু একটা ঘটলেই বাবা স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই নামতাপড়া শুরু করে। নামতায় তো নির্দিষ্ট গ– আছে, দুই একে দুই, দুই দুগুণে চার, তিন দুগুণে ছয়। কিন্তু মায়ের নামতায় সেরকম গ– নেই। তিলকে তাল বানায় যেমন অনেকে, মায়ের নামতাতেও দুই দুগুণে ছয়, ছয় দুগুণে বত্রিশ। বলছিলাম – বানিয়ে বানিয়ে বলে মা তৎক্ষণাৎই বাবার মাথা গরম করে ছাড়ে। জেঠিমার কাছে তা-ই আশা করেছিলাম আমি। কিন্তু কী আশ্চর্য, জেঠিমা সেদিনের কথা কিছুই বলেননি জেঠুকে। নইলে কেন সাত দিনেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না জেঠু।
সাত দিন পর এক সন্ধ্যায় দোকান থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন জেঠু। সাধারণত দোকানের হিসেবপাতি চুকিয়ে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে তাঁর দশটা বেজে যায়। সেদিন তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। ভাইপো-ভাইঝিদের মধ্যে জেঠু আমাকে বেশি ভালোবাসেন। আমিও। তো আমি জেঠুকে দেখতে গিয়েছিলাম তাঁর ঘরে। ‘শরীর খারাপ জেঠু?’ আমার কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠেছিলেন জেঠু, ‘দূর পাগলা, অসুখ করবে কেন? ভালো আছি আমি। যা যা, তোর বাপকে একটু ডেকে দে। বলবি – আমি ডেকেছি। আর হ্যাঁ, তোর রামকাকু আর সঞ্জয়কাকুকেও একটু ডেকে দিস।’
আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। জেঠু হঠাৎ করে সবাইকে নিজ ঘরে ডেকে পাঠাচ্ছেন কেন? ভয়ংকর কিছু কি? দ্বিধান্বিত পায়ে ঘরের দিকে হেঁটে গিয়েছিলাম আমি।
হয়েছে কী, আমাদের প্রতিবেশী যতীন ম-ল দাদুর কাছে চালের বস্তা কিনতে গিয়েছিল সেদিন বিকেলে। কথায় কথায় সঞ্জয় কাকা আর তার বউয়ের চেঁচামেচির কথা জানিয়ে দিয়েছিল। যতীন ম-ল এটা বলতে ভুল করেনি যে, কাকা-কাকির হাউকাউটা মূলত চাল-ডালের দোকানটাকে ঘিরে।
সেই সন্ধ্যায় বাবা আর কাকারা জেঠুর ঘরে এলে দোকানের চাবিটা টেবিলের মাঝখানে রেখেছিলেন জেঠু। টেবিলের চারদিকে চার ভাই বসেছিলেন।
জেঠু বলেছিলেন, ‘আমি আর দোকানটা চালাতে পারছি নারে। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তোদের মধ্যে কেউ দোকানটার দায়িত্ব নে।’
জেঠুর কথা শুনে সঞ্জয় কাকার লোভী চোখ চকচক করে উঠেছিল। ডান হাতটা টেবিলের ওপর তুলেও ছিল। কী বুঝে আবার হাতটা টেবিলের নিচে গুটিয়ে নিয়েছিল সঞ্জয় কাকা।
বাবা আর রামকিশোর কাকা বউদের কল্যাণে সেদিন-সেদিনই সঞ্জয় কাকার দুর্ব্যবহারের কথা জেনে গিয়েছিল। দাদার প্রতিক্রিয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষা করে ছিল তারা।
আজকে দাদার কথা শুনে রামকিশোর কাকাই প্রথমে কথা বলে উঠল, ‘কী বলছ দাদা তুমি? আমরা চালাব দোকান! এ দোকান তো তোমার দাদা!’
বাবা নীরস গলায় বলেছিল, ‘রামকিশোর ঠিকই বলেছে দাদা, এ দোকান তোমার।’
জেঠা মৃদু গলায় বলেছিলেন, ‘দোকানটা বাবার সম্পত্তি। তোদের সবার অধিকার আছে ওই দোকানের ওপর।’
রামকিশোর কাকা বলেছিল, ‘দেখো দাদা, আমরা সবাই চাকরি করি। তুমি করো না। ওই দোকানের আয় দিয়ে তোমার সংসার চলে। তুমি কি বলো তোমাকে আমরা পথে বসাই!’
এই সময় সঞ্জয় কাকা বলে ওঠে, ‘আমি করি না। আমি কোনো চাকরি করি না।’
সদ্বুদ্ধি বাবার মাথায় উদয় হলো। বলল, ‘তুই চাকরি না করলে কী হবে, তোর ইনকাম আমাদের কারো চেয়ে কম না।’ মেজদার কথা শুনে সঞ্জয় কাকা চুপ মেরে গেল।
রামকিশোর কাকা বলল, ‘শোনো দাদা, এই দোকান তোমার। তোমার কিছু হলে বউদির। বউদি তখন দোকানটা নিয়ে যা ইচ্ছে তা-ই করবে। এই দোকানের ওপর আমাদের কোনো দাবি নেই।’
‘আমার আছে।’ কঠিন গলায় বলে উঠল সঞ্জয় কাকা।
রামকিশোর কাকা বলল, ‘ঠিক আছে, তোর দাবি মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। দাদা তোকে বিশ হাজার টাকা দেবে দোকানের মালিকানা হস্তান্তর বাবদ। কালকে আমি স্ট্যাম্প নিয়ে আসব। ওই স্ট্যাম্পে আমরা সবাই স্বাক্ষর করব। আমাদের কোনো টাকা দিতে হবে না দাদা। তুমি সঞ্জয়কে টাকাটা দিতে পারবে তো দাদা?’
রামকিশোর কাকার কথা শুনে জেঠু মস্নøান একটু হেসেছিলেন।
পরদিন সন্ধ্যায় একইরকমভাবে ডাইনিং টেবিলটা ঘিরে সব ভাই বসেছিলেন। রামকিশোর কাকা উকিলকে দিয়ে দলিলটা একেবারে লিখিয়ে নিয়ে এসেছিল। সঞ্জয় কাকাকে বিশ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে, তা-ও লেখা ছিল দলিলে। তিন ভাই দলিলে স্বাক্ষরও করেছিল।
সেই সন্ধ্যায় সঞ্জয় কাকাকে বিশ হাজার টাকা দেওয়া ছাড়া আরো একটা কাজ করেছিলেন জেঠু। ঘরের ভেতর থেকে জেঠু টাকার তিনটে বান্ডেল নিয়ে এসেছিলেন। একটা বান্ডেল সঞ্জয় কাকাকে দিয়ে আর দুটো বান্ডেল বাবা আর রামকিশোর কাকার দিকে এগিয়ে ধরেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি কারো ঋণ নিয়ে মরতে চাই না ভাইয়েরা। তোরাই ঠিক করেছিস – বিশ হাজার দিলে দোকানের মালিকানাস্বত্ব ছাড়বে সঞ্জয়। সঞ্জয় শর্তটা মেনেও নিয়েছে। নইলে টাকাটা সে নিত না। ভাবলাম – তোদের ঋণটাও রাখব কেন? ঋণ নিয়ে মরতে চাই না আমি।’ বলতে বলতে কেঁদে দিয়েছিলেন জেঠু।
সে রাতে প্রত্যেক ভাই বিশ হাজার টাকার বান্ডেল নিয়ে যার যার ঘরে ফিরে গিয়েছিল।
ওই ঘটনার পর খুব বেশি বছর বাঁচেননি জেঠু। জেঠিমার মৃত্যুর পর একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। দূর সম্পর্কের এক পিসি জেঠুর রান্নাবান্নার দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আধাপেট খেয়ে পাত থেকে উঠে যেতেন জেঠু। আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘জানিস প্রত্যুষ, তোর জেঠির হাতের রান্না ছাড়া আর কারো রান্না খেতে রুচি লাগে না আমার।’
তো আমার রূপকিশোর জেঠু একদিন মারা গেলেন। শ্রাদ্ধশামিত্মও চুকে গেল একদিন।
তারপর এক দুপুরে সমীরকিশোরের উঠানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হলো। তিন ভাইয়ের হাতের কাছে যা ছিল, তাই নিয়ে মারামারিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্যান্য ভাইয়ের পক্ষে তাদের ছেলেমেয়েরা, স্ত্রীরা যোগ দিলো।
জেঠা গেছেন, জেঠি গেছেন। দোকান আছে। দোকানের চাবি আছে। এই চাবির মালিক কে হবে এখন – এই নিয়ে তিন ভাইয়ের মধ্যে লাঠালাঠি।
আমি উঠানের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখে যেতে লাগলাম, স্বর্গ থেকে রূপকিশোর জেঠুও হয়তো।

ঝাঁপতাল

সুহিতা সুলতানা

এক স্বপ্নের রাতে জল ও জালের খেলা দেখতে গিয়ে
ধীবরের জালের ভেতরে দেখেছি আমি তার চাঁদমুখ
মায়ার ফাঁদে আসি জলে নেমেছি তাকে ছুঁতেও
পারিনি। প্রতিরাতে অপাপবিদ্ধ আলো হয়ে ঘূর্ণায়িত
নাভির ভেতরে তৃষ্ণার নদী হয়ে ভাসিয়ে নেয়
ঝাঁপতাল। মগ্নতার ওপারে ডুবসাঁতার খেলে নীল
ফড়িঙের ডানা। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে
ঘনীভূত হতে থাকে বিষাদের কালো ছায়া

দুই
আমার মনের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে ভোরের দোয়েল পাখি
যাকে ভালোবাসি আমি সে তো থাকে অন্য কোনোখানে
প্রতিদিন জীবন থেকে যখন একটি করে দিন কমে যেতে
থাকে তখন ভাঙা কাচের টুকরো ক্রমশ অপেক্ষা
এবং অনুতাপের মধ্যে গড়িয়ে গড়িয়ে যায়

তিন
সন্ধ্যার আনো নিভে গেলে তোমাকে মনে পড়ে আবার
সমুদ্রপাড়ের ছেলে তুমি ভালোবাসা ঢের বোঝো…
এই নাও অর্ধেক জীবন তোমাকে দিলাম। এটা কি ভুল
নাকি আগুনের বিমর্ষ বিরাগ? নাগরিক জীবনের সব
কোলাহল ছেড়ে মন চাই যেদিকে দুচোখে যায় চলে যাই

ভ্রম ও আবিষ্কার, নিজের সঙ্গে কথা

হিরণ মিত্র
তথাকথিত আকারহীন আকার, চোখের সামনে ভেসে-ওঠা একটা জটিল ক্রিয়া। সাধারণ যুক্তিহীন, কতগুলো আকার, পরতে-পরতে ভেসে বেড়াতে লাগল, কখনো কাছে এলো, কখনো দূরে সরে গেল, অ-দেখা, স্রোতের টানে, কী এক গতি, অদৃশ্যে ক্রিয়া করে চলেছে। এমন সব অল্প বয়সে, সেইভাবে ঘটত না। যা প্রবীণ বয়সে ঘটতে লাগল। যুক্তিগুলো শিথিল হয়ে যেতে লাগল। যেভাবে বেঁচে থাকা, নিশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যান্ত্রিক বাধ্যতামূলক, শরীর বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো, রূপ বয়ে নিয়ে যাওয়া। একি রূপের বোঝা? অথবা রূপের সঙ্গে নতুন বোঝাপড়া? নতুন দৃশ্য কথোপকথন? কাদের প্রভাব? কেন এমন ভঙ্গি? আশ্বস্ত হওয়ার, আশ্রয় পাওয়ার ভঙ্গিটাই বা কী?
আধা শহরে, যেখানে আমার জন্ম, কৈশোর কাটানো, সেখানে জটিলতা প্রায় নেই, বিচিত্র এক স্বপ্ন আছে। ভবিষ্যৎ বলে কিছু একটা কাল্পনিক ব্যাপার আছে। একসময় জানা গেল, ওসব কিছুই নেই, ফিরে দেখারও নেই, সামনে দেখারও নেই। গাথা বা মিথ নির্মাণই আসল নির্মাণ। সেই নির্মাণে কিছু উপলক্ষ লাগে। এই মাত্র।
মনের নানা আলো-আঁধার নানা রূপ দেখাতে পারে, এই ভাবনারও জন্ম জানা ছিল না। হঠাৎই পাওয়া। একসময় রূপকে স্বীকার করে নেওয়া। এই স্বীকার করে নেওয়ারও কোনো পূর্ব প্রস্তাব ছিল কিনা বলা যাচ্ছে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আকারে-আকারে সংঘাত, যাপন-বিচিত্রতা, মনুষ্যজন, তাদের আচার-ব্যবহার, নানা মাধ্যমের নিজস্ব নিয়ম, বে-নিয়ম, এগুলো প্রতিপাদ্য হয়ে যেতে লাগল অজান্তেই। তবে ওইভাবেই দেখা যাক। সামনের রাস্তাটা আঁধারে, রহস্যের জাল বুনছে। ওই পথটাই শ্রেয়, উত্তেজনা আছে, অনিশ্চয়তা আছে, বৈচিত্র আছে, একটা সুখ-অনুভব আছে। মিশে গেলাম ওই জলের স্রোতে।
আশ্রয় কেউ দেয়ও না, আশ্রয় কেউ পায়ও না। একটা দৃশ্য আশ্রয়ের কল্পনা আমরা বানিয়ে তুলি। ভাবি মাথার ওপর ছাদ আছে। আসলে ভ্রম। একবার কলকাতার বইমেলায়, অনেক ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে ঢেকে রাখা, যে-জায়গাটায় পৌঁছলাম, সেখানটায় কোনো ছাউনি ছিল না। কালো আকাশ ছিল। কিন্তু আমি সারাক্ষণ ভেবে গেলাম, একটা ছাদের তলায় বসে আছি। একবারও মনে হয়নি একটা ছাদহীন, কালো আকাশ, কল্পিত ছাদ বনে আছে। বহু পরে উঠে পড়ার আগে, হঠাৎই বুঝলাম, মহাশূন্য একটা প্রকা- ছাদ। আমার চিত্র অনুষঙ্গ এমনই হঠাৎ আবিষ্কার। হঠাৎ একদিন জানলাম, আসলে আমি চিত্রীই নই। চিত্র নামক কিছু দৃশ্য অভ্যাস হয়তো আছে, ছবির মতো দেখতে কিছু ছবি হয়তো আমি আঁকি, আসলে যা সবই ভ্রম, কালো আকাশ। মহাশূন্য! তেমনি ভাস্কর্য রচনা, এরকমই ভ্রম। শিল্পীরা মশকরা করে, ভৎর্সনা করে। মানুষজন, দর্শক, তারাও এই ভ্রমে আক্রান্ত। তারাও ভাবে, ওগুলো ছবি। আসলে ছবির মতো দেখতে। যাঁরা শিল্পী, যাঁদের কদর আছে, বাজারদরও আছে, তাঁদের দেখে, আমরা নিজেদের মধ্যে অমন ছাদ রচনা করি। মূল্যমান ঠিক করি। দর্শক খুঁজি। সবই ভ্রম।
এই চিত্র-ভ্রম নানা চিত্র দেখায়। একটি বাদামের খাদ্য বা মূল বস্ত্ত সেই খোসার ভেতরে থাকে। বাইরের খোসাকে বর্জন করা হয়। তাকে ভাঙতে হয়। কিছু পাওয়ার জন্য কিছু ভেঙে ফেলা। আমরা তথাকথিত শিল্পীরা, শিল্পবোধ পাওয়ার জন্য এমন করেই নিজেদের ভাঙি। আমরা হয়ে যাই খোসা, ভেতরের ফলটি উপভোগ করেন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা। সেই প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ধারণ করার জন্য এমন সামাজিক আধার, খোসা, আবর্জনার প্রয়োজন পড়ে। খোসা বোধ নিয়ে নিজেদের কাজের আবর্জনার মধ্যে থাকতে-থাকতে, ভ্রমকে সত্য বলে চিহ্নিত করতে-করতে, লক্ষ করি, খোসার গায়ের বিচিত্র কারুকার্য। ভেতরের ফলটি কেমন, তার গন্ধ কেমন, স্বাদ কেমন সেসব ভাবনা পাশে সরিয়ে রেখে, খোসার গায়ের অপূর্ব চিত্র, ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখে যাই। মোহিত হই। ইচ্ছে করে না, ফলটি হাত দিয়ে ভাঙি। ওই নকশার ছন্দকে কোনোভাবে বিঘ্নিত করি, চিত্ররসের আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করি। এসব কিছুই ইচ্ছে করে না। অনন্তকাল ওই নকশা, কারুকার্য, হাতে ধরে বসে থাকি। আমার আর চিত্রী হওয়া হয়ে ওঠে না।
শিল্পী, প্রতিষ্ঠিত, প্রথিতযশা, এসব কথার মধ্যে একটা শেস্নষ আছে, হয়তো সত্য, হয়তো সত্য না, একটা না-পাওয়ার বেদনা যেন উঁকি মারছে। কিন্তু সেই বেদনা থেকে চিত্র জন্মায় না। এই বেদনা বা দুঃখ কোনো যথার্থ প্রকাশ নয়। যেভাবে খোসার গায়ের কারুকার্য আমাকে মোহিত করে, সেভাবেই, দৃশ্য জন্মায় আমার মধ্যে কোনো যুক্তি বা পূর্বাপর ভূমিকা ছাড়াই। কেমন শূন্যতায় দৃশ্য দেখিয়ে যায় দৃশ্য। একটি ছোট্ট গ্রামে গিয়েছি একটি অনুষ্ঠানে। হঠাৎ অনুরোধ এলো, দৃশ্য রচনার। এগিয়ে এলো একটি সাদা ক্যানভাস, এবং কিছু রং। কোনো প্রস্ত্ততি ছিল না, ভাবনাও দানা বাঁধেনি। তাকিয়ে দেখলাম, বেশ কিছুটা, শুধু ঘন পারস্য দেশীয় নীল রং সামনে পড়ে আছে। একটা মোটা দেয়াল রং করার তুলিও চোখে পড়ল। এক খাবলা ঘন নীল সাদা ক্যানভাসের ওপর দিকটায় মাখিয়ে দিলাম। বেশ একটা আকাশ-চেতনা জেগে উঠল। তুলিটা জলে ধুয়ে, নিচের অংশটা ভিজিয়ে দিলাম। হালকা জোলো, নীলচে রঙের প্রলেপ পড়ল। সেই প্রলেপের ওপর একটা তুলির পেছনের অংশ দিয়ে কিছুটা রং ছেঁচে তুলে দিতে চাইলাম। একটা গাছের বেড়ে ওঠার আকৃতি, রেখা টেনে-টেনে, কর্কশ রেখা। গাছ ডালপালা মেলে থাকার চেহারা নিল। পাওয়া গেল সামান্য লাল রং, আঙুল দিয়ে বুলিয়ে দিলাম গাছের গায়ে। জল ধুয়ে ছায়ার মতো, রং গড়িয়ে পড়ল, ওই ভেজা নীলচে অংশে। আমি আঁকিনি এই দৃশ্য। দৃশ্য আমাকে আঁকল। কোনো প্রতিষ্ঠা ছাড়াই। গিয়েছিলাম প্রাকৃতিক দৃশ্যভরা ছোট্ট সুন্দর একটা গ্রামে। মনুষ্যজনের আতিথেয়তা, অমন সবুজ ধানক্ষেত, হাওয়ার দোলা, গাছপালার মতো ছবি, নিজের মতো জেগে ছিল। আমি অংশ নিলাম তাতে। আমার কৌতূহল, ঔৎসুক্য, ভালোলাগা, মনের স্বস্তি, পড়ে থাকা পারস্য দেশীয় নীল, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই, একটা অনুভবে নিয়ে যায়। সে-ই ঠিক করে দেয়, কতটা আঁকা হবে, কোথায় ইতি টানা হবে, সে-দৃশ্য কতটা ভাসমান থাকবে। স্মৃতি, স্বপ্ন সবই এমন ভাসমান। তার কাল নেই। সময়-চেতনা নেই, মুখ অস্পষ্ট।
আমরাও এই শরীরে কাল-চেতনাহীন, অস্পষ্ট মুখে বাস করে যাই দু-দন্ড। স্পর্শ করতে চাই, একটা আস্তর। আঁকড়ে ধরি ভ্রমকে; রূপের ভ্রম, দৃশ্যের ভ্রম, সম্পর্কের ভ্রম, এমনকি আলো ও আঁধারের ভ্রমকেও।
শিল্প প্রতিষ্ঠা তাই একটা ভ্রম। তবু এই ক্রিয়া থেকে আমাদের নিরস্ত করা গেল না। তা শুধু ভ্রমকে উন্মোচনের জন্য নয়, তাকে প্রশ্ন করার জন্যও নয়, তার মোহে মোহিত হওয়ার জন্যও নয়, এক আবিষ্টতা। একটা আরামবোধ। সেই বিবরণ। একটা সরুগলি। রেললাইনের ধারে। দিনে দুবার ট্রেন যায়। সারাদিন সুনসান লাইনটা একা থাকে। ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। দোকানি গরম বড় একটা চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিলো। একপাশে পড়ে থাকা গুঁড়িটার ওপর গিয়ে বসলাম। চুমুক দিলাম চায়ে। আঃ! এমনই বড়ই আরাম চিত্র রচনায়। চিত্র বাতিলে।
শুধু জেগে থাকে একটা বোধ। রচনায় ছুঁয়ে থাকে। কোনো পূর্বপরিকল্পনা নেই। কখনো সাদা আকাশ, কখনো কালো আকাশ, দৃশ্য তার মতো ডানা মেলে। কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, কোনো নির্দিষ্ট ছক নেই।
কোনো একজন ভিনদেশি শিল্পী বলেছিল, অন্ধকার আকাশে পাখি যেমন চোখে না দেখলেও পৌঁছে যায় তার গন্তব্যস্থলে, তেমনি বিমূর্ততা রূপ খুঁজে নেয়। কিন্তু একথা তার জানা ছিল না, ওই পাখি বয়ে চলেছে এক অদৃশ্য চৌম্বক ক্ষেত্র, যা তাকে তার অভীপ্সায় পৌঁছে দিচ্ছে। কিন্তু বিমূর্ততারও এমন কোনো অভীপ্সা নেই। হয়তো কোনো অদৃশ্য চৌম্বক ক্ষেত্র তারও মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আছে। এই প্রতিষ্ঠা সেই প্রতিষ্ঠা নয়, এটাই যা তফাৎ।
এই প্রতিষ্ঠাকে আবিষ্কার করার মধ্যে, অংশ নেওয়ার মধ্যেই জন্ম নেয় ওই পারস্য নীল, রক্তলাল, অন্ধকার-কালো, অতিউজ্জ্বল সাদা, মধ্যাহ্নের হলুদ, ঢলেপড়া সূর্য আলোর কমলা, ধন্যবাদ তাদের, প্রণাম।
দুই
নিজের সম্বন্ধে ধারণা, আর তাকে ঘিরে উপলব্ধি, মন্তব্য এ নিয়ে কিছুকাল আগে লেখার পর কয়েকদিন কেটে যায়। এক সকালে হঠাৎ ঘুম ভেঙে আবার নিজের সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। এই ব্যক্তিগত ভাবনা প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল না।
ইতোমধ্যে দেখা করতে আসা, দিল্লিনিবাসী দূরের এক বন্ধুকে পড়ে শোনাই। দর্শনের ছাত্র, এই ছেলেটি একসময় আমাকে নানা প্রশ্ন করে বিব্রত করত। কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা মজা, সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে উৎসাহ দিত। ভালো লাগত, আসলে প্রশ্নই তো উত্তর। একটা সময় ডিসকোর্স চালু ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে। কবি, গাইয়ে-বাজিয়েদের সঙ্গে চিত্র-আলোচনা। ভাবনার নানা স্রোত বইতো তখন। পারিপার্শ্বের সঙ্গে কথা চালানো।
একজন যে-মাপেরই শিল্পী হোক, বা যে এই চর্চায় ব্যস্ত, তার তাগিদ কোথা থেকে আসে। মোটিভেশন। একতরফা, একক চেষ্টায়। নিজস্ব কল্পনায়, শুধু শিল্পের জন্ম হয় না। ‘অপর’ এক বিশেষ অবস্থান নিয়ে থাকে। এই ‘অপর’কে স্বীকার করে নেওয়া, তার উপস্থিতি অহরহ টের পাওয়া, তার দ্বারা উসকানি পাওয়ার আগ্রহ, আমার দীর্ঘদিনের চাহিদা, ইদানীং সেই চাহিদা বিশেষ আর পূরণ হচ্ছে না। প্রশ্ন করে কেউ আমাকে আর বিব্রত করছে না। উসকানি বা প্রভোকেশনের অভাব টের পাচ্ছি দিন-দিন।
ওপরের এই ভাবনা বিশেষ স্বীকৃত নয় শিল্পমহলে। শিল্পী সাধারণ অর্থে নিজের সিদ্ধিতে যখন পৌঁছান তখন তাঁর সমস্ত কর্মই বিশেষ প্রকাশ হয়ে ওঠার কথা। আমার ভাবনা এখান থেকেই বাঁক নেয়। আমি একটা ঘর্ষণ ক্রিয়াকে তার জন্মের উৎস হিসেবে দেখি। বিরোধ, বিত-া, নানা অভিমুখ, শিল্পের মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে – এটা আমার বিশ্বাস।
জীবন সাধারণভাবে বয়ে চলে। তার নিজস্ব এক ছন্দ ও চাহিদা আছে। পরিপার্শ্ব যেমনই হোক, ভিন্ন-ভিন্ন সমাজ, তার আচার, আচরণ ছায়া ফেলতে চায়, শিল্পের চৌহদ্দিতে। তবু কি ছায়া ফেলে? চেতনা একটা বড় ভূমিকা নেয়। চেতন, অব-চেতন, স-চেতন। নানা অবস্থানে নিয়ে যায় শিল্পীকে। আমি রচনার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি, স্বপ্নে ভিন্ন বাস্তব দেখা দেয়। ভিন্ন রচনা আমাকেই রচনা করতে থাকে। আমি স্বপ্নে তার সঙ্গ দিই।
হতাশা, ক্ষক্ষাভ, উষ্মা, এসব ব্যবহারিক বাহ্যিক, অভিপ্রকাশ তখন গৌণ। রচনার অমোঘ আকর্ষণ। চৌম্বক ক্ষেত্র, দ্রম্নত নিয়ে যায়, অনাবিষ্কৃত একটা ক্ষেত্রভূমিতে, যেখানে জমে আছে বিস্ময়। অপার বিস্ময়, কৌতূহলই আসল সূত্র। বৌদ্ধিক ও দার্শনিক অনুভব। এ সবকিছুর অলক্ষক্ষ্য ক্রিয়া করে যায়। অনেক গভীর থেকে উঠে আসে বোধ, উপলব্ধি, দৃশ্য, রেখার গতি, তার ছন্দ, রঙের মনস্তত্ত্বের নানা কাহিনি। সাধারণভাবে একনজরে একে উপলব্ধি নাও করা যেতে পারে, আবার চকিতে সে কিছু সংকেত, কিছু বার্তা হাওয়ার ঝাপটার মতো ছড়িয়ে দিয়ে যেতেও পারে, মূল বিষয় মন ও শরীরের এক তালে, ছন্দে, পরিপূরক হয়ে ওঠা। আমি দর্শক হিসেবে কতটা আগ্রহী, ওই ভাষা ওই সংকেতকে স্পর্শ করার জন্য? ছুঁয়ে দেখার আনন্দ আমাকে কতটা বিভোর করে। সমস্যার শুরু এই সূত্র থেকেই। একটা বৃত্ত সম্পূর্ণতা পাওয়ার আগ্রহ আমার মধ্যে থেকেই যায়।
দর্শকও একজন শিল্পী। সেও রচনাকার। আমি শিল্পী হয়তো মধ্যস্থতা করছি। আমার রচনাটির উপলক্ষ করে। শিল্প, শিল্পী ও দর্শকের অদৃশ্য বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় তখনই, যখন সে আগ্রহভরে অংশ নেয় আমার শিল্পকর্মটির সামনে। এ-কথা বোঝাতে হয়তো আমি অসমর্থ, আমার প্রিয় দর্শকদের যে দীর্ঘপ্রক্রিয়া, উপলব্ধি, পরিশ্রম ঘিরে আছে, একটি শিল্পকর্মের শরীরে, তাকে এক লহমায় হঠাৎ করে বুঝে ওঠার কিছু অন্তরায় আছে।
চিত্র নির্বাক। আক্ষরিক অর্থে। কিন্তু সত্যিই কি সে নির্বাক? তার ভাষা দৃশ্যভাষা, দৃশ্যেরও সংলাপ আছে। তারও স্বর প্রক্ষেপণ আছে। বহুদূর বিসত্মৃত হয় সেই প্রক্ষেপণ। দর্শক তাই একপ্রকার শ্রোতাও। সেও পাঠ নেয় শিল্পকর্মের। যেসব ইন্দ্রিয়, তার যে ভিন্ন-ভিন্ন ক্রিয়া, শারীরিক, তারাও সীমাকে অতিক্রম করে। সে নানা ভূমিকা নিতে থাকে। এই অভ্যাস, এই চর্চা, এই রীতির অভাব আজ ঘটেছে বলে, শিল্প তাৎক্ষণিক, সংবাদসর্বস্ব, উত্তেজক, যৌন উত্তেজক নানা পন্থাকে আশ্রয় করছে। শিল্পের মধ্যে স্থিতি হারিয়ে যাচ্ছে। আমার হতাশা তাই নির্দিষ্ট।
আমার চিত্র-রচনার উৎস বেশ কিছুটা বিচিত্র, প্রথাবিরুদ্ধ। দীর্ঘ নানা নৃত্য বা অভিনয় কর্মশালায় যুক্ত থাকতে-থাকতে, শরীরী ভাষা আমার দৃশ্যভাষার চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছে। সবকিছুই তখন অনুষ্ঠান মনে হতে থাকে।
চিরাচরিত শিল্প অভ্যাসের বাইরে, একটা উঠোনের জন্ম হয়। যেখানে ঘটে যেতে থাকে জীবনের নানা বাঁকের অপ্রচলিত অভিপ্রকাশ। কখনো অক্ষরের রূপে, কখনো স্থাপত্যের রূপে, কখনো আলো-আঁধারের রহস্যের রূপে, তারা নিজেদের দেখিয়েই চলল। প্রচলিত বিমূর্ত রচনা নিয়ে যে ধারণা, অর্থাৎ সাযুজ্যকে স্তরে-স্তরে বিনির্মাণ করতে-করতে মিতব্যয়ী বিমূর্ততার জন্ম, যাকে পরিভাষায় বলে প্রসেস অব এলিমিনেশন, আমার কাজ ঠিক তার বিপরীতে, প্রসেস অব অ্যাডিং বা সংযুক্তিকরণের মধ্য দিয়ে রূপ-আবিষ্কার, বিস্মিত হওয়া প্রাণশক্তিকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া। সেখানেই বিতর্ক, সেখানেই বিপত্তি।
বিশ্ব জুড়ে এর কোনো জাতিভেদ নেই। নানা সমাজের নানা সংস্কার হয়তো আছে, সমাজের সংস্কৃতির ছায়া নিশ্চয়ই পড়ে, দৃশ্য রচনায়, কিন্তু মনের গহনে, যে-অনুভবের জগৎ আশ্রয় নিয়ে আছে, তার সঙ্গে সহবাস করতে হয়। এই সহবাসে অপূর্ব এক ছন্দের সন্ধান পাওয়া যায়। যে-ছন্দায়িত থাকে, প্রতি মুহূর্তেই, তাকে বিশেষভাবে, বিশেষ মুহূর্তে খুঁজে নিতে হয় না, সেই ছন্দকে। সে স্বতঃস্ফূর্ততায় ভরপুর বলেই, আপনাআপনি ভঙ্গিমায় জাগ্রত থাকে। থাকতে বাধ্য হয়।
বিষাদ, ভারাক্রান্ত মন, বিচ্ছিন্নতা, তাকে আরো গহনে ভিন্ন আবিষ্কারে কৌতূহলী করে তোলে।
সে তখন নিজের রচনাতেই আবিষ্কার করে, যেন জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে জেগে থাকা এক দ্বীপপুঞ্জকে। দর্শক সেই নাম-না-জানা দ্বীপের হাজারো অজানা পথে নিজেকে আবিষ্কার করতে-করতে অনুভবের ভিন্ন মাত্রায় যাত্রা করে। এমনি আমি ভেবে যাই। এই আকাক্সক্ষায় কোনো খাদ নেই। কোনো বানানো অসিস্ত নেই। যদিও কথিত আছে আমাদের সমস্ত মননই এক প্রক্ষেপণ। প্রক্ষেপিত উইশফুল থিংকিং, আমাদের বিভ্রান্ত করে তবু আমরা নিরস্ত হই না।
‘শিল্প কী এবং কেন’র সঙ্গে শিল্পী এমনই অংশ হয়ে ওঠে। তার আর অন্য অসিস্ত কল্পনা করা যায় না। এক রাতে স্বপ্নে কথা বলছিলাম কোনো এক মুখচেনা যায় না, এমন ব্যক্তির সঙ্গে। বোঝাতে চাইছিলাম দূরসমুদ্রে জেলে মানুষটি একটি সামান্য নৌকাতে কীভাবে ভার সামলে চলেছে, উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যেও। বলছিলাম, তখন মানুষটি সমুদ্র বনে গেছে। সমুদ্র কি কখনো সমুদ্রে ডুবে যায়? এই যে মানুষটি যে প্রকৃতির অংশ সমস্ত সমুদ্রকে ধারণ করেছে শরীরে, দীর্ঘ অভ্যাসে, দীর্ঘ যাপনে এমন এক অপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী সে! তেমনি চিত্র, চিত্রীকে চিত্র বানায়। দীর্ঘ যাত্রাপথে, বিভেদ ভুলে চিত্রে সমস্ত গুণ ধারণ করে নেয়। চিত্রীর নিজের মধ্যে অন্তত এটাই তার অভীপ্সা, চাহিদা। তা পূরণ হবে কি হবে না, তার জন্য অনন্ত অপেক্ষা, তার।
চিত্র থেকে চিত্রী যেমন বিচ্ছিন্ন হয়, তেমনি একাত্ম হওয়া। এই ক্রিয়া, প্রক্রিয়াই তাকে জাগ্রত করে রাখে, দীর্ঘ জীবন দেয়, মৃত্যুর পরেও।

বাল্যকাল

52446e7038769-Untitled-1অ তী ন  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

এই বুড়ো বয়সে আর প্রাক-যৌবনের কথা আমার ঠিকঠাক মনে নেই। সম্ভবত আমি সবে বহরমপুর থেকে কলকাতায় জীবিকার খোঁজে চলে এসেছি। তখন তরুণ এক যুবক। এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি – আত্মীয়স্বজনের বাসায় উঠি। থাকি খাই। আমার সমুদ্র মানুষ বইটি তখন মিত্রালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশক গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য সস্নেহে বইটি প্রকাশ করেছেন। এবং দুশো টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। মানিক স্মৃতি পুরস্কারেও সম্মানিত হয় বইটি। মতি নন্দী পান প্রথম পুরস্কার, দ্বিতীয় পুরস্কার পান পূর্ণেন্দু পত্রী, তৃতীয় পুরস্কারের জন্য আমি নির্বাচিত হই। উল্টোরথ পত্রিকার এই প্রতিযোগিতা এবং তৃতীয় পুরস্কার আমার সাহিত্যজীবনের প্রথম ধাপ বলা যেতে পারে। বহরমপুরের হবু সাহিত্যিকদের কাছে এজন্য আমি ঋণী। তাঁদের প্রেরণাতেই আমার উপন্যাস রচনা। তাঁদেরই একজন পা-ুলিপিটি উল্টোরথ পত্রিকা অফিসে কলকাতায় এসে জমা দেন।
আর সেইসব প্রিয় বন্ধু বেঁচে আছে কিনা জানা নেই। তাঁদের কারো সঙ্গে আমার আর যোগাযোগও নেই। কখনো বহরমপুরে গেলে খোঁজ যে না করেছি তাও নয়, আমার বন্ধুরা অধিকাংশই পিডবিস্নউডির কোয়ার্টারের বাসিন্দা। আমার বন্ধু প্রশান্ত কান্তি সেনগুপ্তর দাদা পিডব্লিউডির হেডক্লার্ক সম্ভবত।
প্রথমদিকে খোঁজখবর নিতে পিডব্লিউডির অফিসেও গেছি। কারো খোঁজ পাইনি। শুধু একজন হদিস দেয় – প্রশান্ত বিয়ে করেছে, কোনো এক বেসিক কলেজের প্রিন্সিপাল সে। তাও আবার উত্তরবঙ্গে। আমার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গেও সেই যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আজ পর্যন্ত আমার আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। এই নগণ্য লেখকের এই বেদনার কথা বড় গভীর। প্রশান্ত না থাকলে আমার লেখকসত্তা যে বন্ধ্যা তাও বুঝি। আর লেখা থেকে আর্থিক উপার্জন ক্রমশ বাড়তে থাকে। রয়েলটি থেকেও ভালো আয় হয়। স্কুলের বেতন যতই সামান্য হোক, বেতনে আমাদের ভালোই চলে যায়। কিন্তু বিধি বাম, স্কুলের চাকরিটি কপালে সইল না।
আবার বাসাবদল। আবার বাড়ি ফিরে আসা। তবে ইতোমধ্যে স্ত্রীর একটি চাকরি জুটে গেল – শ্যামবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। কলকাতায় এসে, মহারাজকুমার সোমেন নন্দীর সঙ্গে দেখা – বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে আলাপ, তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই তিনি তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে দেখা করতে বলেন।
কাশিমবাজার রাজবাটিতে একটি অংশে আমার দুই নাবালক পুত্রসহ আমি এবং আমার স্ত্রীর থাকার বন্দোবস্ত করে দেন তিনি।
কাশিমবাজার হাউসের একপ্রান্তে তিনটি ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
সেখানেই আমার দুই পুত্র বড় হয়েছে – কাশিমবাজারের এই রাজপরিবারটির পূর্বপুরুষ মহারাজ মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী, তাঁর প্রচুর দানধ্যানের খ্যাতি আছে। মহারাজকুমার সোমেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর সঙ্গে বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে আলাপ। তারপর সখ্য। তিনি বললেন, তোমার লেখা আমি পত্রপত্রিকায় পড়েছি।
এখন কী লিখছ!
কী যে বলি! বললাম থাকারই সংস্থান নেই। দেশে স্ত্রী-পুত্রকে রেখে এসেছি।
– তোমার পুত্রদের পড়াশোনা –
কিছু বলতে পারি না, চুপ করে থাকি।
তিনি সোজা বলে দিলেন, আমি তোমার লেখা পড়েছি। আর কোথাও ছোটাছুটি করবে না – তাঁর ক্যালকাটা অফিস থেকে কাউকে ডেকে পাঠালেন – তিনি এলে বললেন, বাগানের সংলগ্ন ঘরগুলোতে ও থাকবে। ওর স্ত্রী-পুত্ররাও থাকবে। কথাবার্তা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে আছি। এত বড় রাজপ্রাসাদের কোনো এক অংশে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো কাজের কথা বলছেন না। শুধু ওঠার সময় বললেন, পরেশবাবুকে বলে দেবেন, এখন থেকে এই ছেলেটি কলার প্রিন্টিংয়ে ম্যানেজারের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে।
বাড়িটা রাজবাড়ি – তার দুপাশে বিশালমতি দোতলা রাজপ্রাসাদ। স্বপ্ন না সত্যি, বিশ্বাস করতে পারছি না।
অগত্যা কলকাতা। মহারাজকুমার সোমেন্দ্র চন্দ্র নন্দী বলেছিলেন কোনো অসুবিধা হলে আমার কাছে চলে এসো – সেই থেকে কাশিমবাজার হাউসে আশ্রয়। তাঁর কলার প্রিন্টিং কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার।
সেখানেও গণ্ডগোল। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন।
মিছিল-মিটিং-অনশন যাবতীয় অস্ত্র প্রয়োগের ফল লকআউট। মাসের পর মাস লকআউট, বেতন নেই, থাকার জায়গা নেই,
মা-বাবা, ভাই-বোন এবং স্ত্রী-পুত্র পরিবার, নিঃস্ব এক মানুষ। বাধ্য হয়ে রাজবাড়ি ছাড়তে হয়। বাগুইহাটির দিকে বাসা ভাড়া নিয়ে চলে আসি।
ঠিক এই সময়েই কবি মনীন্দ্র রায় অমৃত পত্রিকায় একটি ধারাবাহিক উপন্যাস শুরু করতে বলেন। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটি সেই থেকে ধারাবাহিক শুরু হয়। ধারাবাহিক লেখার ফলে লেখক হিসেবে স্বীকৃতিও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
প্রথমে মিত্রালয় প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় সমুদ্র মানুষ, তারপর সমুদ্র পাখির কান্না – এবং অমৃত, দেশ, আনন্দবাজার, যুগান্তর পত্রিকায় তখন নিয়মিত লেখক।
এত বেশি লেখার চাপ সবসময় বহন করতে-করতে লেখক ছাপও পড়ে গেল। করুনা প্রকাশনী, আনন্দ – আরও সব প্রকাশকের আগ্রহে বইও প্রকাশ হতে থাকে এবং ক্রমশ এভাবেই নিয়মিত লেখক বলে চিহ্নিত হই।
ততদিনে বিমল করেরও এক আস্থাভাজন লেখক।
কার্জন পার্কে প্রায় বিকেলেই হবু লেখকদের একটি আড্ডাও বসে। বিমল কর সেই আড্ডার মধ্যমণি। আমরা যাঁরা হবু লেখক তাঁরাই এই আড্ডার প্রাণ বলা যায়। বিমলদার প্রিয় কেসি দাসের দোকান থেকে জলযোগ সেরে সাঁজবেলায় আমরা সব হবু লেখকরা গোল হয়ে বসতাম। কার্জন পার্কে, বিমলদা আড্ডা সেরে আমাকে নিয়ে বাস ধরতেন। কলেজ স্ট্রিটে নামতাম। তারপর আনন্দ পাবলিশার্সের বাদলের (বাদল বসু) অফিসে আর এক প্রস্ত আড্ডা, শেষবেলায় বিমলদা আর আমি একই বাসে রওনা দিতাম।
একাদশীর সকালেই নদীর ঘাটে নৌকা এসে ভিড়ত শীতলক্ষার বাবুদের ঘাটে। ভরা নদী – শীতলক্ষা নদী তখন সমুদ্র হয়ে যেত। এপার-ওপার অদৃশ্য হয়ে যেত – জোয়ারের সময় জল বাড়ত, ভাটার সময় নদীর চরের দু-একটা বেলা ঘাসের মাথা দেখা যেত।
জল কমে গেলে নদীতে ভাটা শুরু, জল বাড়লে নদীতে জোয়ার এসে যায়।
এই জোয়ার-ভাটার সুযোগে জলে ফেলা ডালপালার ঝোপে শ্যাওলা খেতে মাছেরা উঠে আসত নদী থেকে। ঠিক জল নেমে যাওয়ার মুখে সেঁচা বাঁশের বেড়া দিয়ে জলে ফেলা ডালপালা ঘিরে ফেলা হতো। পাঁচ-সাত দিন অন্তর-অন্তর জলে ফেলা ডালপালা ঘিরে মাছ ধরার কৌতূহলে আমরা সুকুমারদাকে জ্বালিয়ে মারতাম। কবে ফের ডালপালা তুলে মাছ ধরা হবে। এই এক কৌতূহল।
পূজার কদিন আমাদের বাড়ি-বাড়ি পূজা দেখা, বাড়ি-বাড়ি পূজার প্রসাদ গ্রহণ, নিরন্তর ষষ্ঠী থেকে দশমী বাড়ি-বাড়ি এই প্রসাদ গ্রহণে আমাদের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। মুড়াপাড়ায় বড়-বড় জমিদার তাদের আমলাদের ছেলেপেলেদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত রাখত।
পঞ্চমীতে মুড়াপাড়া যেতাম। একাদশীর দিন নৌকায় বাড়ি ফিরতাম।
আমাদের বাড়িতে গৃহদেবতার নিত্যপূজা ছাড়াও কার্তিক পূজা হতো ঘটা করে। আশ্বিন-কার্তিক বলতে গেলে পূজার মাসই বলা যায়। ঠাকুরদা মারা গেলেন। আশ্বিনের এক রাতে, পুবের ঘরে মা আমাদের নিয়ে থাকতেন। তিনি আমাদের ডেকে তুললেন।
ঘুম থেকে উঠে দেখি উঠোনে ঠাকুরদা শুয়ে আছেন। তিনি যে মৃত বোঝার বয়স ছিল না, এইটুকু শুধু মনে আছে। ভোররাতের দিকে বেশ ঠান্ডা পড়ায় ঠাকুরদার পাশে বসে ছিলাম। কখন ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম লেপের নিচে। পুকুরপাড়ে ঠাকুরদাকে নিয়ে যাওয়া হয়। আত্মীয়স্বজনে ভর্তি বাড়িটা। পুকুরের দক্ষিণপাড়ে ঠাকুরদার দাহ হয়।
ঠাকুরদা মারা গেছেন, আত্মীয়স্বজনে ভর্তি বাড়ি। বাড়ির সবাই আছে। কেবল আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেল ছেলেটা! – মুখাগ্নির সময় টের পাওয়া গেল, বাড়ির সেই ছেলেটা লেপের নিচে ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।
নিখোঁজ থাকার পেছনে আমারও দোষ নেই।
ঠাকুরদার মৃত্যু নিয়ে সবাই ব্যস্ত। অঞ্চলের বিখ্যাত কবিরাজ তারিণী সেন ঘণ্টায়-ঘণ্টায় ওষুধ পালটে দিচ্ছেন। ঠাকুরদার আচ্ছন্ন অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
আমি সেই যে ঠাকুরদার পাশে বসেছিলাম, বসেই আছি।
রাত বাড়লে কখন ঠাকুরদার পাশে লেপ টেনে শুয়ে পড়েছি খেয়াল নেই – আত্মীয়স্বজনের তো শেষ নেই – শত হলেও আমার ঠাকুরদা বড় কর্তা বলে চিহ্নিত – আবার বহু মানুষের গুরুঠাকুর – খবর তো এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না।
খবর ছড়ায়।
লোকজন লাইন দিয়ে উঠে আসছে।
আমার ঠাকুরদা কারো গুরুঠাকুর, আবার কারো রাজপুরোহিত। মুড়াপাড়ার জমিদার দীনেশবাবু ঘোড়ায় চড়ে চলে এসেছেন, জমিদার তারকবাবুর হাতিও দূরে দেখা যাচ্ছে, তিনিও বোধহয় আসছেন – বাইরের উঠোনে সামিয়ানা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণের ঘরে শিষ্য এবং যজমানদের ভিড়। জায়গা হচ্ছে না। পুকরপাড়ে অর্জুনগাছের ছায়ায় শতরঞ্চি বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে – পুকুরের দক্ষিণপাড়ে ভিড়।
আমাদের রনাদা, ধনাদার একদ- বিশ্রাম নেই। নানা প্রকারের হুঁকো, জাত বিচারে হুঁকোর বন্দোবস্ত – সেজন্য রমণীদা সম্মান্দির বাড়ি থেকে চলে এসেছেন – তিমি কাকা, ভবানী জেঠা, চিনি কাকা, বংশের যে যেখানে আছে সবাই হাজির।
একমাত্র বড় জেঠামশাই দক্ষিণের ঘরে একা নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছেন।
ঠিক একা বলা যাবে না। তবে তিনি কারো সঙ্গে কথা বলছেন না।
তিনি তাঁর মতো ইজিচেয়ারে পা তুলে আরাম উপভোগ করছেন।
মানুষ মরে গেলে ঘরে রাখতে নেই।
আমার ঠাকুরদার ঊর্ধ্বশ্বাস উঠে গেছে। রাতের দিকেই যায়-যায় অবস্থা, দীনবন্ধু কাকা তাঁর শিয়রে বসে আছেন। আত্মার কী ইচ্ছে কেউ জানে না। কেবল একটা বিষয়েই সকলের নজর, আত্মা যেন ঘরের ভেতরে দেহত্যাগ না করে।
ঠাকুরদাকে সেজন্যে উঠোনে রাখা হয়েছে – মুক্ত হাওয়া, মুক্ত আকাশের নিচে তাঁর প্রাণবায়ু অনন্তের সঙ্গে মিলে যাক – এই ইচ্ছা বাবা-কাকাদের। সম্মান্দির বাড়ি থেকে ভবানী জেঠা খবর পেয়ে রওনা দিয়েছেন। ছয় ক্রোশ রাস্তা তাঁকে হেঁটে আসতে হবে। ঠাকুরদার নির্দিষ্ট আমগাছের গোড়ায় দুজন লোক বসে আছে। হাতে কুড়ুল। গাছটাকে কাটা হবে, তারপর চেলাকাঠ করে ঠাকুরদাকে শুইয়ে দেবে চেলা কাঠের ওপর।
বল হরি, হরি বল।
ঠাকুরদাকে তোলা হচ্ছে –
বাবা-কাকারা বারবার আমার খোঁজ করছেন।
ভোলা গেল কোনখানে?
ভোলা গেল কোথায়?
রাতে বেশ ঠান্ডা পড়েছে।
আমিও ঠান্ডায় কিছুটা কাতর। একমাত্র ঠাকুরদার লেপের তলায় কিছুটা উষ্ণতা আছে। প্রথমে পা ঢুকিয়ে দিতেই টের পেলাম বেশ আরামদায়ক বোধ হচ্ছে। গ্রামের মানুষজনের ভিড় সারাবাড়িতে, ঠাকুরদার যজমান গ্রামের পর গ্রাম ছড়িয়ে আছে – ঠাকুরদার অন্তিমকালের যে আর দেরি নেই – হেঁচকি থেমে গেলেই শেষ – প্রাণবায়ুকে দেখা যায় কিনা জানা নেই। তবু আমার কৌতূহল ঠাকুরদার প্রাণবায়ু শরীর থেকে বের হবার সময় যদি জোনাকি পোকার মতো খপ করে ধরে ফেলা যায়, যাবেটা কোথায়।
যখন বুঁদ হয়ে আছি – হেঁচকি থেমে গেল – সারা বাড়িময় ঠাকুরদাকে ঘিরে রেখেছিল যারা, তারা আর মুহূর্ত দেরি করলেন না – বল হরি, হরি বল, বলে বিছানার চার কোনায় ধরে পুকুরপাড়ে হাঁটা দিলো –
বড়দা চেঁচাচ্ছে, এই ভোলা পৈঠায় বসে থাকলি কেন!
ছোটকাকা চেঁচাচ্ছে, কান্নার সময় পাওয়া যাবে, আগে এদিকে আয়।
বাবার বিছানা ধর।
আমরা নাতিরা, ঘিরে ফেললাম ঠাকুরদার বিছানা। ব্রাহ্মণের মৃতদেহ ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায় সেই আতঙ্কও কম নয়। মৃতের স্পর্শ যেন কোনো অব্রাহ্মণ না পায়, বামুনের মড়া বামুনকেই বহন করতে হবে – দীনবন্ধু কাকার তদারকিতে অর্জুনগাছের নিচে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – লাহুরচরের শীতল চক্রবর্তী সঙ্গে আছেন। শ্মশানের খালকাটা সবে শেষ করছেন তিনি।
একটি আস্ত আমগাছের গুঁড়ি ফালা-ফালা করে দীনবন্ধু কাকার নির্দেশে চিতা সাজানো হচ্ছে। পাটকাঠির আঁটি নামে-নামে বিলি করা হচ্ছে – অর্থাৎ আমরা সবাই হাতে পাটকাঠির আঁটি নিয়ে প্রস্ত্তত। এখনো মেলা কাজ বাকি।
আমার বড় জেঠিমা দুদু কাকাকে বললেন, আপনার ঠাকুরভাই তো কাল ফেরেননি।
আমার পাগল জেঠামশাই খুশিমতো গাঁয়ে-গাঁয়ে ঘুরে বেড়ান, গ্রামের পর গ্রাম সব আমাদের যজমান। আমার সেজ জেঠামশাই এবং বাবা মুড়াপাড়ার জমিদারি সেরেস্তায় আছেন, তাদেরও খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে মৃত্যু নিশ্চিত নয়। উপসর্গ দেখে মৃত্যু স্থির করতে হয়, শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলেই যে মৃত্যু হয়, আমার ঠাকুরদার বেলায় তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
আমার ঠাকুরমা ঠাকুরদার শিয়রে আজ দুদিন টানা বসে আছেন।
তাঁর শাঁখা-সিঁদুর মুছে দিতে হবে।
ঠাকুরদার প্রাণবায়ু গত হলেই কাজটা করার কথা।
গোপাটে সকাল থেকেই লোক জমায়েত হচ্ছে – শত হলেও আমার দাদু এ-অঞ্চলের ঠাকুরকর্তা, শুভ সময় কখন একমাত্র তিনিই বলে দিতে পারেন, তাঁর নির্দেশমতো সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত স্থির হয়।
পঞ্জিকার পাতা উলটে তিনি কাউকে বলে দেন। সূর্যোদয়, সূর্যাসেত্মর সময় জানার জন্য সকাল থেকেই লোক সমাগম হতে থাকে।
আমাদের বাড়ির সামনে উঠোন, পেছনে উঠোন – তাছাড়া অন্দরের উঠোনও একটি আছে। অন্দরের উঠোনের দুপাশে দুটো ঘর। একটা নিরামিষ ঘর আর একটি আমিষ ঘর।
বড় জেঠিমা নিরামিষ ঘরে ঠাকুরমার নিরামিষ রান্নার বন্দোবস্ত করে থাকেন। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর নিরামিষ ঘরের দায়িত্ব এই দুজনের। অর্থাৎ আমার ঠাকুরমা, নয় জেঠিমা। – সবারই বয়েস হয়েছে। তারপরের ধাপে, আমার ধন-জেঠিমা – শেষের ধাপে রাঙ্গা কাকিমা, ছোট জেঠিমা – এসব নানা ধাপে নিরামিষ-আমিষ রান্না হয়। আমার মেলা জেঠিমা-কাকিমা। বাবা-জেঠারা প্রবাসে থাকেন, দুদু কাকা বাড়ির গৃহকর্তা। তাঁর-ই অনুশাসনে সংসার চলে।
আমাদের ভাইবোন মেলা।
খুড়তুতো, জেঠতুতো ভাইবোন মিলে আমরা আঠারোজন।
ছোট কাকার স্ত্রী গর্ভবতী।
অন্দরের উঠোনে একটি চিরস্থায়ী অসুজ ঘর তৈরিই থাকে।
কাকিমা-জেঠিমারা প্রয়োজনমতো সেই অসুজ-ঘরে ঢুকে যান।
বাবা-জেঠারা কিংবা কাকারা অধিকাংশই প্রবাসে, শুধু দুদু কাকা বাড়ির গৃহকর্তা – জমিজমা দেখাশোনার ভার তাঁর ওপর। আমরা কেউ-কেউ সম্মান্দির বাড়িতেও বড় হয়েছি। পাশের গাঁয়ের মাইনর স্কুলের পাঠ শেষ করে সম্মান্দির বাড়িতে চলে যাই। একইসঙ্গে ঠাকুরভাইও যান। আমার ছোটদাদু রামচন্দ্র মুড়াপাড়ার জমিদারিতে কাজে ঢুকেছিলেন – আমার বাবাকেও তিনি সঙ্গে নিয়ে যান। সেই থেকে বাবাও তাঁর খুড়ামশাইয়ের সঙ্গে থেকে জমিদারির আদায়পত্রের কাজ শিখে নেন।
আসলে আমি দুটো বাড়িতেই বড় হয়েছি।
দেশভাগ হয়ে যাওয়ায় প্রথমে রাইনাদি বাড়ির সবাই হিন্দুস্থানে রওনা হয়ে যান।
তবে দেশের বাড়ির দুই বাড়িরই কাকা-জেঠারা দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায় হিন্দুস্থানে রওনা হয়ে যান। তখন বর্ষাকাল – দুটো তিন মালস্না নৌকায় মা, কাকিমা-জেঠিমারা যে-যার প্রিয় টুকিটাকি জিনিসপত্র সব নৌকায় তুলে নেন। বাকি তৈজসপত্র অ-দামে কু-দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আমার ঠাকুরদার বদ্রি হুঁকোটির প্রতি টোডারবাগের হাজি আবদুলস্নাহর চিরদিনই লোভ ছিল। ঠাকুরমা হাজি আবদুলস্নাহকে ডেকে বললেন, নে, রেখে দে। আমাদের কথা মনে হলে টিকা জ্বেলে মনের সুখে হুঁকো টানিস।
সোনা-জেঠামশাই বাদ সাধলেন।
না দেওয়া যাবে না, বংশের হুঁকো আর যা-ই করা যাক তোদের দেওয়া যাবে না।
হুঁকোটি আমাদের সঙ্গেই যাবে। সব স্মৃতিই বিনাশ, বাপ-ঠাকুরদার স্মৃতি এই বদ্রি হুঁকো কিছুতেই দেওয়া যাবে না।
বাড়িঘর সবই বিক্রি হয়ে গেছে – টিনের চালগুলি আমরা নৌকায় ওঠার আগে খুলে ফেলা হলো।
অবশ্য আমরা তখন গয়না নৌকায় – ফাউসার খালে তিন মালস্না নৌকা দুটি নোঙর ফেলে আছে – বাড়ির কোষা নৌকাটিতেও তোলা হয়েছে বড়-বড় টিনের বাক্স – টিনের চাল খুলে দেওয়া হলে আমরা গিয়ে গয়না নৌকায় আশ্রয় নিলাম। বদুরুজ্জা সাহেব আমাদের ঘরবাড়ি ক্রয় করেছেন। তাঁর বাড়ির লোকজন যে-যার ভাগমতো ঘরে-ঘরে ঢুকে গেছে – নৌকায় বসে কিছু-কিছু দৃশ্য দেখা যায়। আমার খুবই কান্না পাচ্ছিল, মা-জেঠিমারাও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। জাফরুলস্না সাহেব বললেন, দেশ তো অদৃশ্য হয়ে যায় না। মন খারাপ লাগলে ঘুরে যাবেন – থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হবে না। আপনেরা আমাগো চিরকালের মেমান – তা কি ভোলা যায়! দেশ ভাগ হয়েছে তো কী হয়েছে – দিল তো ভাগ হয় নাই।
আমরা তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। বড়দা এবং আমি থাকি সম্মান্দির বাড়িতে। বড়দা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। দেশ ভেঙে যাচ্ছে – বড়দার মানে উমাশঙ্কর পরীক্ষায় বারবারই ফেল করার অভ্যাস।
আমরা দুজনেই একসঙ্গে টেস্ট পরীক্ষা দিই। তখন রাইনাদির বাড়ি থাকি।
রাইনাদির বাড়ির অস্তিত্বও আর নেই।
বদুরুজ্জা সাহেব তাঁর পরিবার নিয়ে আমাদের বাড়িতে উঠে গেছেন। বাবা গৃহদেবতা গলায় ঝুলিয়ে হিন্দুস্থানে রওনা হয়ে গেছেন। আমাদের টেস্ট পরীক্ষা হলেই আমরাও চলে যাব। পাকিস্তানে থাকার আর প্রয়োজন নেই। আমাদের ঠাকুর দেবতা মেলা, রাধা গোবিন্দের বড়-বড় দুটো পেতলের মূর্তি, শালগ্রাম শীলা, একটি নৃসিংহ কবচ, আমার দুদু কাকা গলায় ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে
বের হয়ে গেলেন। ঠাকুর দেবতারাও আমাদের সঙ্গে দেশছাড়া হলেন।
এখন আমাদের সম্বল একমাত্র আমার মেজকাকা। তিনি বহরমপুরে থাকেন, একটি প্রাচীন শ্যাওলাধরা বাড়ি আমাদের বসবাসের জন্য ব্যবস্থা করা হলো। বহরমপুর শহরে থাকেন তিনি।
শহরে মাস্টারদা বললেই তাঁকে সবাই চিনত। মেজকাকা খাদি- ভা-ারে খাগড়ার বাজারে একটি সেলাই কল সম্বল করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জ্ঞান কাকা খাদি-ভা-ারের মালিক। তিনি স্বদেশি, মেজকাকার তিনি আশ্রয়দাতা।
বহরমপুরের নতুন বাজারে তালই বাবুর একটি অতিকায় লজঝড়ে দুতালা বাড়ি। মেজকাকা সেই বাড়ির দোতলায় একটি অংশে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে থাকতেন। নিজের বসবাস থেকে উচ্ছেদ হওয়া যে কত মর্মান্তিক বাড়িটিতে থাকার সময় টের পেয়েছিলাম।
মেজকাকার নির্দেশেই ঘরবাড়ি বিক্রি। খাদি-ভা-ারের এককোনায় একটি সেলাই কল নিয়ে তাঁর দর্জির দোকান।
দোকানটি খোলা, বন্ধ করা, ধূপ-ধুনো দেওয়া, ঘর ঝাঁট দেওয়ার কাজ আমার মেজকাকাই করেন। দোকানে তাকে-তাকে সাজানো থাকে সিল্ক, তসর, মটকার থান। আমার কাকা এককোনায় একটি সেলাই কল সম্বল করে খদ্দেরের আশায় বসে থাকেন।
খদ্দের হচ্ছে লক্ষ্মী। তার মনোরঞ্জন করাও কাজ তাঁর। জ্ঞান কাকা সকালের দিকে একবার আসেন।
লাল মলাটের একটি খাতায় দৈনিক বেচাকেনার হিসাব থাকে। তাছাড়া খদ্দেরদের মাপমতো পাঞ্জাবি, হাফশার্ট, বেস্নজার মাপ নিয়ে খাতায় লেখা হয়।
জ্ঞান কাকা অবসর বুঝে আসেন। খাতাটি উলটেপালটে দেখেন – এই পর্যন্ত, তারপর জ্ঞান কাকা এলে শহরের গণ্যমান্য লোকেরাও ভিড় করেন। জ্ঞান কাকা রাজনীতি করেন। তিনি কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক, তাঁকে নানাজনের আবদারও মেটাতে হয়।
জ্ঞান কাকা কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক। তাঁর দায়িত্বের শেষ নেই। মিছিল, মিটিং এবং আলোচনা চলে। আমার মেজকাকার নির্দেশেই পেয়ালাভর্তি চা আসে। সকালে তিনি দোকানে বসেই পার্টির কাজকর্মের তদারকি করেন।
মেজকাকার সামনে সেলাইকল।
খাতায় খদ্দেরদের নাম লেখা, ডেলিভারির দিন উল্লেখ করতে হয়।
খাদি-ভা-ারের খ্যাতিও কম নয়।
আসলে খাদির শার্ট-পাঞ্জাবির ওয়েস্ট কোট কার কবে ডেলিভারি সব কিছুই ফর্দমতো দিতে হয়। এজন্য খাদি-ভা-ারের সুনামও আছে – কাজের ভিড় লেগেই থাকে। আমার কাকার ফুরসত থাকে না।
এরপরে আছে বাড়ির বাজার – কাকা থলে হাতে ঢুকলে বাজারও হয়ে যায়। কাকার চেলারা খুব সস্তায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী থলেয় ভরে দেন। দোকান ফেলে কাকাই জ্ঞান কাকার বাজার করে দেন। তিনি একবার উঁকি দিয়ে দেখেনও না, কী বাজার হলো!
হরিহর সব জানে।
হরিহর আমার ছোট কাকা – তাঁর কাজ শেষে তিনি জ্ঞান কাকার টুকিটাকি কাজও করে দেন।
দেশভাগের সঙ্গে-সঙ্গে পূর্ববঙ্গ থেকে লক্ষ-লক্ষ মানুষ রেল কিংবা হাঁটাপথে হিন্দুস্থানে ঢুকতে শুরু করেছে। যে-যেখানে খালি জায়গা পাচ্ছে দলবেঁধে বসে পড়ছে। কারো কিছু বলার নেই। রিফুজি বললেই সাত খুন মাফ।
আমরাও ট্রেনে-বাসে উঠে পড়তাম। টিকিট চাইলে এককথা – রিফুজি।
রিফুজি বললেই কারো কিছু বলার সাহস থাকত না। তবে কাশিমবাজারের আদি রাজবাড়িতে ঢুকতে কেউ সাহস পায়নি। রাজবাড়ির তহশিলদার খাকির হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট পরে আমাদের কলোনিতে ঘুরে বেড়াত।
রাজার আমবাগান, সুমিষ্ট আম – তবে জমির অধিকার পাওয়ার জন্য রাজবাড়ির অফিসে কিছুটা অর্থ দিতে হতো। সেই অর্থের বিনিময়ে রাজবাড়ির সিল দেওয়া রসিদ মিলত। জমির অধিকার সেই যে বর্তাল, আর কার ক্ষমতা আছে জমি থেকে রিফুজিদের উৎখাত করে।
আমার জেঠামশাই রাজবাড়ির অফিসে গিয়ে পঁচিশ বিঘা জমির বন্দোবস্ত করেছেন। রাজবাড়ির সিল দেওয়া একটি কাগজে তার উল্লেখ আছে। পঁচিশ বিঘা জমির মালিকানা উপেন্দ্র ব্যানার্জির এবং তাঁর সহোদর ভাইরা ভোগ করবে।
আমার জেঠামশাই সেই জমি ভাইদের নামে বিলি-বণ্টন করার পর আমাদের নিজস্ব বসবাসের জায়গা স্থির হয়। পঁচিশ বিঘার জমিটি বনজঙ্গলে ভর্তি। জঙ্গলের ভেতর বড়-বড় শালগাছের মেলা। জেঠামশাই সব জমিই ভাইদের নামে-নামে ভাগ করে দেন।
প্রায় তিন বিঘা করে জমি ভাইদের নামে-নামে, বাকি জমি গৃহদেবতার নামে –
আমার দুদু কাকা গৃহদেবতার পূজারি। আপাতত তাঁরই অধিকার।
এদেশে আসার পরই জেঠামশাই ভাইদের ডেকে বলেছেন – আমাদের একান্নবর্তী সংসার কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি। যে-যার মতো অন্নসংস্থানের দায় তোমাদের সবার।
পরিবারে বলতে গেলে কোনো উপার্জন নেই। ছোট কাকা কংগ্রেসের জেলা অফিসের দেখাশোনা করতেন – জ্ঞান কাকা বললেন, হরিহর জেলা অফিসের দেখাশোনা করে। তাঁর একটা নির্দিষ্ট মাইনে থাকলে আমাদের পরিবারে সুবিধে হবে।
জেঠামশাই মাথা চুলকে বললেন, দাদা একটা কথা আছে।
কী কথা!
এঁদের সবারই যদি কোনো কাজের ব্যবস্থা হয়।
জ্ঞান কাকার অসীম ক্ষমতা। তিনি ইচ্ছা করলে পারেন।
দ্যাখ হরিহর সবই করা যায়। তবে এই নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
প্রতিক্রিয়া হলেও কিছু করার নেই।
বাবা শুনে বললেন, আমার চলে যাবে। দেশ থেকে যজমানরা চিঠি লিখেছে, তারাও চলে আসতে চায়। সবাই চলে এলে
পুজো-আর্চা করে কিছু আয় হতে পারে।
সংসারে বাবা-মা, ছোট দুটো ভাইবোনও আছে, কলোনিতে আমাদের যজমানরা আছে, তাদের পুজো-আর্চা আছে – কথা আছে প্রতাপ চন্দ্রও চলে আসছে, তাঁর গৃহদেবতার পূজা আছে। দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায় কে কোথায় যাচ্ছে কিছুই ঠিক নেই, সবাই চ্যাটার্জি-ব্যানার্জি হয়ে আছে, চেনা বামুনের বড় অভাব, এইতো শ্যামবাবুর সঙ্গে দেখা, তিনি বললেন চেনা বামুন ছাড়া কাকে অন্নপূর্ণার সেবাইত করি বলুন তো – এই চেনা বামুনের হিসেব দেখতে গেলে, আমার বাবা, জেঠা-কাকারা একটা বিশ্বাসের জায়গা আগেই ঠিক করে ফেলেছে।
বামুনের কাজের অভাব হয় না – আমাদের কলোনিতে, একঘর বামুন, তাঁর খোঁজখবর সবাই রাখে। এদেশে এসেই দুটো দুর্গাপূজার ভার পেয়ে গেছে সে। দেশ থেকে ফুরফুর করে মানুষজন ঢুকে যাচ্ছে। তাদের কথা, সব তো হলো, মেয়ের বিয়ে ঠিক হচ্ছে – চেনা বামুন না পেলে হয়!
মেজকাকা বলেছেন, আমার দাদারা সবাই তো দেশ থেকে চলে আসছে – চেনা বামুনের অভাব হবে না।
আমার বাবা দেশেও পুজো-আর্চা করতেন। এদেশে এসেই তিনি প্রথমে একটি পঞ্জিকা কিনে ফেললেন। বিবাহের দিনক্ষণ বলে কথা। শুভ-অশুভ বলে কথা। বাবা পঞ্জিকা দেখে সব বলে দিতেন – শুভ-অশুভ দিন তাঁর কথাতেই স্থির হতো। তিনি গীতার সব শেস্নাক মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। তাঁর জীবনচর্চায় একজন খাঁটি বামুনের লক্ষণগুলি স্পষ্ট ছিল।
মাথায় খাটো চুল – শিখাটি সুবৃহৎ, পৈতা ধবধবে সাদা।
তবে মাথায় শিখা রাখতে রাজি হতাম না।
বাবা জোরজার করলে বলতাম, শিখা না রাখলে কিছু হয় না বাবা।
তবু পৈতার সময় আমার জেঠামশাইর নির্দেশ, শিখাটিকে তুচ্ছ করতে নেই। বামুনের শিখা নেই হয় নাকি।
হয়।
গোঁয়ার্তুমি করবে না। শিখা না থাকলে তুমি বামুনের সন্তান কে বিশ্বাস করবে!
সবাই বিশ্বাস করবে।
কী করে সম্ভব।
গলায় পৈতা আছে না।
গলায় পৈতা থাকলেই হলো।
ওটা তো জামার নিচে থাকবে। তোমার গলায় পৈতা আছে বুঝবে কী করে।
ঠিক বুঝবে। আপনাকে আমার পৈতা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
বাবা বললেন, গুরুজনদের কথা শুনতে হয়। গুরুজনের অবাধ্য হতে নেই। অবাধ্য হলে ঈশ্বর কুপিত হন।
পৈতা না থাকলে একসময় তুমি মূক-বধির হয়ে যাবে।
ভয় পেতাম। সত্যি যদি মূক-বধির হয়ে যাই।
আমাদের সেই পূর্ববঙ্গের গ্রামে এমনিতেই বামুন ঠাকুরের অভাব। লক্ষ্মীপূজায় সরস্বতীপূজায় বামুনেরও অভাব। ঘরে-ঘরে পূজা – লক্ষ্মীর সরা ঘরে-ঘরে আসত। একজন বামুন ঠাকুর চাই। আমার শৈশবেই উপনয়নের কাজটি সারা হয়ে যায়। ফলে আমিও বামুন ঠাকুর হয়ে গেছি, ঘরে-ঘরে কোজাগরি লক্ষ্মীপূজা – গাঁয়ে দু-ঘর মাত্র বামুনের পরিবার, আর পাশের গ্রামগুলিও হিন্দুপ্রধান। হিন্দুদের আলাদা গ্রাম, মুসলমানদের আলাদা গ্রাম।
জাতকুল দেখে বাড়িঘর। হিন্দুগ্রামে কোনো মুসলমানের বসবাস ছিল না – পাশের টোডারবাগ গ্রামটিতে মুসলমানরা ঘরবাড়ি করে বসবাস করত। আমাদের গায়ে কোনো মুসলমান পরিবার ছিল না। মুসলমানরা ছিল অচ্ছুত। তবে বিপদে-আপদে মুসলমানরাই ছিল রক্ষাকর্তা।
হিন্দু-মুসলমানের আলাদা অবস্থান, অথচ ঝগড়া-বিবাদে হিন্দু মাতববরদের ওপর ভরসা ছিল মুসলমানদের। মুসলমানদের ওপরও যথেষ্ট ভরসা রাখত হিন্দুরা।
অথচ আমাদের বাড়িতে, শুধু আমাদের বাড়ি কেন, যে-কোনো সম্পন্ন হিন্দু পরিবারের বিশ্বস্ত কাজের মানুষ ছিলেন এঁরাই।
বাড়ির বউ বাপের বাড়ি যাবে – সঙ্গে যাবে কে।
সঙ্গে যাবে রহমান। সে ধনবউকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।
আমার মনে আছে, মামারবাড়ি যাওয়ার সময় মা রনাদাকে ডেকে পাঠাতেন। রনাদা যে পারিশ্রমিক পাবেন জানতেন।
পোটলা-পুঁটলি তিনি মাথায় তুলে নিতেন। আমি-বড়দা তুলে দিতাম। তারপর বাড়ি থেকে নেমে মাঠে পড়তাম। বড়দিনের ছুটিতে মা আমাদের নিয়ে বাপের বাড়ি যাবেন, কিংবা অষ্টমী স্নানে যাবেন, সঙ্গে পাহারাদার আমাদের রনাদা। এত বিশ্বাসী তিনি, টাকা-পয়সাও তার কাছে থাকত। রনা-ধনা দুই ভাই আমাদের বাড়ির দক্ষিণের ঘরে থাকতেন। ঘরের তক্তপোশে থাকতেন আমাদের মাস্টারমশাই, মেঝেতে মাদুর পেতে শুতেন রনাদা।
বাড়ির চার ভিটিতে চারটি চৌচালা ঘর। দক্ষিণের ঘরের সংলগ্ন ঠাকুরঘর।
দক্ষিণের ঘরটি বৈঠকখানা হিসেবে রাখা হয়েছে। পুবের ঘরটিতে থাকেন বড় জেঠিমা। আমার জেঠামশাই নিখোঁজ। এতে বাড়িতে কোনো ত্রাস নেই। জেঠামশাইর স্বভাবই এরকমের। দু-একদিন তার কোনো খোঁজ থাকে না।
তাঁর মাথা খারাপ আছে।
আগে আমরা নানা জায়গায় খোঁজ করতাম, আমার ঠাকুরভাই, অর্থাৎ আমাদের বড়দা খুঁজতে বের হতো, দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় একটা ইজিচেয়ার পাতা থাকত।
ইজিচেয়ারটি জেঠামশাইয়ের নিজস্ব – বাড়িতে থাকলে জেঠামশাই ইজিচেয়ারটিতেই লম্বা হয়ে শুয়ে থাকেন। এক-দুদিন ঠিকঠাকই চলে তাঁর। বাড়িতে জেঠামশাই থাকলে তাঁকে দেখাশোনার ভার আমাদের ওপরেই থাকত। তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপন্ন। তাঁর চিকিৎসারও শেষ ছিল না। সাধু-সন্ন্যাসী এলে রাতের আশ্রয় আমাদের দক্ষিণঘর।
আমাদের স্যারও দক্ষিণের ঘরে থাকেন। আমাদের পড়াশোনাও সে-ঘরেই হয়।
একটা বড় টেবিল, টেবিলের চারপাশে চেয়ার, সকালে আমরা পাঁচ ভাই, খুড়তুতো, জেঠতুতো ভাই মিলে আমরা পাঁচজন, সকালে এবং রাতে পড়াশোনা হয় এই ঘরে।
জেঠামশাই বাড়ি থাকলে বারান্দায় একটি ইজিচেয়ার পাতা থাকে। জেঠামশাইর দখলে এই ইজিচেয়ারটি। তিনি বাড়ি থাকলে ইজিচেয়ারে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকেন। ঘরের ভেতরে জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাই মিলে পড়াশোনায় মগ্ন থাকি। সকালে তাঁর অধীনেই থাকতে হয়। রাতেও। রাত দশটার পর আমাদের ছুটি।
এ-বছর আমার এক পিসতুতো দাদাও হাজির। আমাদের বাড়িতেই তার পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়েছে। কলাগাছিয়া স্কুলে তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে।
কলাগাছিয়া মাইনর স্কুলের পড়া শেষ হলেই আমরা বাড়িছাড়া হতাম। বড়দা উমাশঙ্কর এবং আমি সম্মান্দির বাড়িতে চলে গেছিলাম। আমার চিনি কাকিমা তাঁর ছেলেমেয়েদের কলকাতায় ফের নিয়ে গেছেন। হাতিবাগানে বোম পড়ায় কলকাতা শহর খালি হয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। বোমা পড়ার আতঙ্ক আর নেই। তবে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় আবার যে-যার জায়গায় – চিনি কাকিমাও কলকাতায় ফিরে গেলেন। সঙ্গে রেখা, কালী, দুলাল, শুধু ধনঠাকুরমা বাড়িতে থাকলেন। আমি ঠাকুরভাই আছি – আমরা পানাম স্কুলের ছাত্র। সম্মান্দির বাড়ি থেকে রাইনাদির বাড়ির দূরত্ব চার ক্রোশের মতো। ধনঠাকুরমা আমাদের নিয়ে সম্মান্দির বাড়িতে থেকে গেলেন। টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে আমিও চলে যাব।
আমার সহোদর দাদা চন্দ্রশেখর চলে গেল মামারবাড়ি মনোহরদি। দুপতারা হাইস্কুলে তাকে ভর্তি করে ছিলেন আমার দাদু। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছারখার হয়ে গেল। আমি আর বড়দা আছি সম্মান্দির বাড়িতে, আমার দাদা চন্দ্রশেখর আছেন আমার মামারবাড়ি মনোহরদি গ্রামে। দক্ষিণের ঘর খালি – শিক্ষক অনিল পাকরাশি – যার শাসনে আমরা বড় হচ্ছিলাম, তিনিও এক সকালে বিদায় নিলেন।
দেশে কী যে হচ্ছে!

এমন এক সুন্দর দেশ, যার অর্জুনগাছের ছায়ায় আমার ঠাকুরদার দাহপর্ব সারা হয়েছে। চারপাশের মুসলমান গ্রাম থেকে লোকের ভিড়। লাদুরচর থেকে ঝেঁটিয়ে সব মানুষজন দাহ পর্বে যোগদান করেছিল – মুসলমান গ্রাম থেকেও লোক ভেঙে পড়েছিল, কারণ দাহ প্রক্রিয়া দেখার কৌতূহল সবার – একজন মানুষকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া সহজ কথা নয়।
ঠাকুরমার নির্দেশ, তাঁর মৃত্যুর পর অর্জুনগাছের নিচেই যেন দাহকার্য করা হয় – আমাদের বাড়ির যেকোনো মৃত্যুর দাহকার্য সম্পাদনে এই অর্জুনগাছটি নির্দিষ্ট ছিল – এলাকায় দু-ঘর ব্রাহ্মণের বাস। বাকি গ্রামগুলি হিন্দুপ্রধান। তাদের দাহকার্য হতো দন্দের ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে। শুধু আমাদের নিজস্ব শ্মশান পুকুরপাড়ের অর্জুনগাছটার নিচে – আমার ঠাকুরদা-ঠাকুরমার চিতাও অর্জুনগাছটার নিচে।
আমাদের বাড়িটা লোকজনে ভর্তি। আত্মীয়স্বজনে সবসময় ভর্তি থাকত। বালি থেকে মেজপিসি এসে থেকে গেলেন মাসের পর মাস। আমার পিসেমশাই বেকার। চরসিন্দুর চিনির কলে তিনি চাকরি করতেন। কথায়-কথায় দু-মাস, ন-মাসের জন্য বিনা নোটিশে চিনির কলটি বন্ধ হয়ে যেত। আমার পিসিমা তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন।
উত্তরের বড় ঘরে থাকতেন ঠাকুরমা – ঠাকুরমার ঘরে সবাই আশ্রয় নিত। সুবৃহৎ এই চৌচালা ঘরটির খোপে-খোপে আমার পিসিরা বিনা নোটিশে এসে উঠতেন। ঠাকুরদা বেঁচে নেই – ঠাকুরমার ঘরে প্রয়োজনে আমরাও শুতাম। দক্ষিণের ঘরে পড়াশোনা – দক্ষিণের ঘরে স্যার থাকেন – তাঁর নিজস্ব একটি তক্তপোশ আছে, শতরঞ্চি পাতা আছে। বিছানার এক প্রান্তে সারি-সারি বই। আমাদের স্যার আইএ পাস – তাঁর ইচ্ছে তিনি প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দেবেন – দিলেনও, পাশ করেও গেলেন। স্কুলের হেডমাস্টারও হয়ে গেলেন।
আমরা স্কুলে যেতাম আমাদের স্যারের সঙ্গে। স্যারের দায়িত্ব আমাদের সামলানো। যেমন তিনি সকালে ঘরে-ঘরে দরজায় নাড়া দিয়ে আমাদের সতর্ক করে দিতেন –
তিনি বলতেন, ওঠ এবার। বেলা কিন্তু কম হয়নি।
আমার মা জেঠি কাকিমারা এতে খুব একটা খুশি ছিলেন না – প্রাণভরে যে একটু ঘুমোবেন তারও উপায় ছিল না। আমার কাকিমা জেঠিমারা খুবই বিরক্ত হতেন। কিন্তু স্যারের মুখের ওপর কারো কথা বলার সাহস নেই। বাবা-কাকা-জেঠারা প্রবাসে। আমরা এতগুলি ভাইবোন। আমরা মেলা ভাইবোন –
আমাদের বোনেরা পড়াশোনার তাড়া থেকে ছাড় পেত। তারা পছন্দমতো বই নিয়ে পড়তে বসত। পড়তেই বসত না কেউ-কেউ। এত সকালে আমাদের ঘুম ভাঙে না।
রাতে দশটার আগে ছুটি পাই না।
ঠিক দশটায় রান্নাঘরে পিঁড়ি পড়ত।
পিঁড়ি পড়ার শব্দ শোনা যেত দক্ষিণের ঘর থেকে।
এই শব্দ শোনার প্রতীক্ষায় আমরা কান খাড়া করে রাখতাম।
অথবা, স্যার বাইরে যাব।
বাইরে যাব বললেই তিনি ছেড়ে দিতেন।
ছেড়ে না দিয়েও উপায় নেই।
কারণ কার ছোট বাইরের, কার বড় বাইরের দরকার, প্রকৃতির ডাককে উপেক্ষা করা যায় না। তিনি বিনা দ্বিধায় বলতেন, যাও।
আমরাও এই ছুতোয় বের হয়ে দেখতাম রান্নাঘরে পাত পড়ার আয়োজন হয়েছে কিনা।
এক নম্বর শান্তি।
ছোট বাইরের তাগিদ শান্তিরই বেশি। তবে একবার, বেশি হলে দুবার বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিলত।
রাত দশটা পর্যন্ত স্যার আমাদের পড়ায় বসিয়ে রাখতেন।
একান্নবর্তী পরিবারে আমাদের জেঠিমা, মা, কাকিমারা পালা করে নিরামিষ-আমিষের ঘর সামলাতেন।
তবে আমার বড় জেঠামশাই – দিনের বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির দক্ষিণের ঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে থাকতেন।
পড়ার ঘরে ইজিচেয়ারেও তিনি শুয়ে থাকতেন।
আমার বড় জেঠামশাই মর্জি হলে সকালে খেতেন, মর্জি না হলে সকালেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন।
আমার জেঠিমা চেঁচামেচি শুরু করতেন।
ওরে অচল, দ্যাখ তোর জেঠামশাই কোথায় যাচ্ছে।
আমার সোনাভাই, অর্থাৎ আমাদের মেজদাই জেঠামশাইকে রুখে দিতে পারত।
কোথায় যাবেন!
জেঠামশাই কোনো জবাব দিতেন না।
জেঠামশাই নিজের মতো হাঁটা দিতেন।
আমার বড়দা উমাশঙ্কর বইটই ফেলে দৌড়ে আসত।
জেঠামশাইকে আগলে বলত, আপনি আমাদের পড়তেও দেবেন না। আমরা পাশ করব কী করে!
জেঠামশাইয়ের কেমন তখন বোধোদয় হতো।
তিনি ভালো মানুষ হয়ে যেতেন।
সুবোধ বালকের মতো ঠাকুরভাইয়ের হাত ধরে দক্ষিণের ঘরের দিকে হাঁটা দিতেন।
তাঁকে একটা টুলে বসিয়ে দিয়ে সামনে একটা বই খুলে দিলেই তিনি শান্ত।
যেন কত মনোযোগী ছাত্র।
মুশকিল ছিল সেই বইটি আর তার কাছ থেকে ফেরত নেওয়া যেত না।
আমরা এজন্য একটি অপ্রয়োজনীয় অথবা গল্পের বই হাতের কাছে রেডি রাখতাম।
স্কুল খোলা থাকলে আমরা গৃহশিক্ষকের আওতায় চলে যেতাম।
তাঁর কথাই শেষ কথা।
স্কুল শনিবারে হাফ, রবিবার বন্ধ –
মাস্টারমশাই শনিবারে সকালেই সব গোছগাছ করে রাখতেন। স্কুল থেকে ফিরেই তিনি তাঁর পোটলা-পুঁটলি – পোটলা-পুঁটলি বলতে একটি কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, তাতে একটি গামছা, একখানা ধুতি, দু-একটি বই, অথবা সাপ্তাহিক পরীক্ষার কখনো মাসিক পরীক্ষার খাতার বান্ডিল এসব নিয়ে দেশে যেতেন। আর সোমবার সকালে সোজা স্কুলে। টিফিনে খাবার দোকান থেকে জিলিপি আর একঠোঙা মুড়ি এনে খেতেন।
স্কুল ছুটি হলে আমাদের সঙ্গেই ফিরতেন। দেশ থেকে বাড়ির ফলপাকুড় যা-ই কিছু মিলত, যেমন লটকন ফল – টক মিষ্টি এবং সুস্বাদু, আমাদের খুব প্রিয় – তিনি আনতেন।
এদিকটায় আমাদের বাড়িতে কামরাঙা ফলের গাছ থাকলেও লটকন ফলের গাছ ছিল না। লটকন ফলের এক-একটি কোয়া মুখে ফেলে দিলে সারা মুখ রসে ভরে যেত।
টক-মিষ্টি-ঝাল এই ফলের স্বাদ না খেলে বোঝা যায় না।
কখনো-কখনো বিশাল বাতাবিলেবু, এতটা দূর থেকে, চার-পাঁচ ক্রোশের কম নয় রাস্তাটি, তাঁর ছাত্রদেরও নিজ গৃহের এবং তাঁর নিজ হাতে লাগানো গাছের সুস্বাদু ফল খাওয়াতে না পারলে তিনি তৃপ্তি পেতেন না।
কিরে কেমন মিষ্টি।
উলস্নাস, পড়ার চেয়ে খাদ্যরসিকের পর্বটি আমাদের কাছে খুবই মধুর ছিল। পড়া না পারলে, অঙ্ক ঠিক না হলে, বেত্রাঘাতেরও শেষ থাকে না। তিনিই আবার বাড়ির ফলপাকুড় তাঁর ছাত্রদের না খাওয়াতে পারলে মনোকষ্টে ভুগতেন।
– দহিপুরি নিয়ে এলেন একবার।
খাদ্যবস্ত্তটি আমাদের বাড়িতে একদম অচেনা –
অথচ গৃহশিক্ষক নিয়ে এসেছেন, তাঁর মান-মর্যাদা রক্ষা করতে হয় – দুধের পায়েশ, তাতে পুলি পিঠা সেদ্ধ দিয়ে খাদ্যবস্ত্তটি তৈরি।
দেশ থেকে ফিরে স্যার আমাদের হাতে দিয়ে বলতেন – যা নিয়ে যা, ঠাইনদির হাতে দিবি।
আমার ঠাকুরমা যতœ করে তাঁর নিরামিষ ঘরে রেখে দিতেন। আমাদের রাক্ষুসে স্বভাব – কখন বেমালুম হজম করে ফেলব ঠাকুমরার এই আতংক – নিরামিষ ঘরে দরজা বন্ধ করে একটি তালাও ঝুলিয়ে দিতেন।
নিরামিষ ঘরটি একেবারে আলাদা – আমরাও খুশিমতো নিরামিষ ঘরে ঢুকতে পারতাম না। ঠাকুরমার ছিল একটাই
অভিযোগ – সারা রাজ্যের গু-মুত মাড়িয়ে নিরামিষ ঘরে ঢোকা যায় না।
ঠাকুরমার কথা না শুনলে বউমাদের শাসাতেন, আসুক উপেন, সে এর কী বিহিত করে দেখি – আমার কাকিমারা এবং আমার জেঠিমার এক কথা, মা এরা ছেলেমানুষ, এদের ওপর রাগ করে আপনি খাবেন না, তা হয়? তারপরই আমাদের ডাক পড়ত, জেঠামশাই বাড়ি এলেই বিধান জারি করতেন।
আমরা ভীতসন্তস্ত্র হয়ে থাকতাম। আমাদের মাস্টারমশাইকেও হাজির থাকতে হতো।
জেঠামশাই বলতেন, মাস্টার তোমার ছাত্ররা একদম কথা শুনছে না –
নিরামিষ ঘরে বাসি কাপড়ে ঢোকা নিষেধ। তোমার ছাত্ররা আমার মাকে নরকে পাঠাতে চায় – মার এমনই অভিযোগ। ভালোমন্দ খাবার যেমন পুলি পিঠা কিংবা পাটিসাপটার পায়েশ কিংবা আসটে পিঠার দুধেসেদ্ধ পায়েশও বাটিসুদ্ধ গায়েব হয়ে যাচ্ছে। কে খায়, কারা খায় দেখবে না!
বইটি হাতে ধরিয়ে দিলেই তিনি খুশি।
তাঁর আর কোথাও যাওয়ার কথা মনে থাকত না।
তিনি আমাদের খাতা-কলম নিয়ে টেবিলে বসে পড়তেন।
স্যার আমাদের তক্তপোশে বসে বলতেন, কী হলো তোরা পড়ছিস না কেন!
আর তখনই আমরা উচ্চৈঃস্বরে পড়তে শুরু করতাম।
আমরা উচ্চৈঃস্বরে না পড়লে আমার মা-জেঠিরা মনে করতেন, আমরা পড়ছি না।
খুব বেশি উচ্চৈঃস্বরে পড়লে আমাদের মা-জেঠিরা ভাবতেন, তাদের ছেলেরা ঠিকঠাক পড়াশোনা করছে। তাদের ছেলেরা খুব মনোযোগী ছাত্র।
আমরা পাঁচ ভাই একসঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে পড়লে মাস্টারমশাইয়ের কান ঝালাপালা হয়ে যেত।
তিনি ম্রিয়মাণ গলায় বলতেন, আর একটু আসেত্ম পড়লে হয় না! এটা তো হাটবাজার নয়।
স্যার একদিন সোজাসুজি জেঠিমাকে বললেন, বউঠান জোরে-জোরে পড়লেই পড়া হয় না।
জেঠিমা বললেন, তা হলে কীভাবে পড়াশোনা হয়!
আসেত্ম পড়লেও পড়াশোনা হয়।
আসেত্ম পড়লে পড়া মনে থাকে না।
আমার দুদুকাকার এক কথা – তোমাদের পুত্ররা পড়ছে কি না মাস্টারই ভালো বুঝবে। তোমাদের খবরদারি করতে হবে না।
দুদুকাকা সোজা বলে দিলেন, সবাই খবরদারি করলে চলে! যার যা কাজ। মাস্টার বুঝবে তারা পড়ছে কি পড়ছে না। পরীক্ষা তোমরা দেবে না – ছেলেরা দেবে। মনে-মনে পড়লেও পাশ করা যায় সেটা কি বোঝ!
জেঠিমা রেগে বলতেন, আমরা কিছুই বুঝি না। সব বোঝো তোমরা।
বাড়িটায় মেলা ঘর। ছোটকাকা, মেজকাকা বহরমপুরে থাকেন। ছোটকাকার বিয়ে হয়নি। আমার ঠাকুরমার এটি একটি বড় দায়। তিনি বেঁচে আছেন। ছোটকাকার কোনো গতি হয়নি বলে ছোটকে বিয়ে দিতে পারলেই তিনি দায়মুক্ত।
আমার ঠাকুরমার পুত্রসন্তান, অর্থাৎ আমার কাকা-জেঠা মিলে তারা ছয় ভাই, দুই পিসি আমাদের। বড় পিসির বিয়ে হয়েছে বনদুর্গাপুরে।
জঙ্গলের দেশ।
জঙ্গলে বাঘ-ভালুকও দেখা যায়। আমার পিসতুতো দাদা সুধীর বলতেন, রাতেই বেশি ভয়।
সুধীরকে আমরা চিনিদাদা ডাকতাম। সুধীর মানে আমার চিনিদা সেই দুর্গম এলাকা থেকে উঠে এসেছে। পূবাইল ইস্টিশনে নেমে পাঁচ ক্রোশ হাঁটলে গ্রামটির খোঁজ পাওয়া যায়। আমাদের গ্রামে কোনো বাঘ-ভালুকের উপদ্রব ছিল না। তবে বর্ষাকালে অজগর সাপের উৎপাত হতো।
শীতের সময় কচুরিপানায় পুকুরগুলি ভরে থাকত। তার ভিতর অজগর সাপের বসবাসের সুবন্দোবস্ত ছিল। কবিরাজ দাদা অমূল্য সেনের একটি বন্দুক ছিল।
আমাদের অসুখে-বিসুখে কবিরাজ দাদাই সম্বল। কবিরাজ দাদার গলায় কণ্ঠি ছিল। তুলসির মালা গলায় জড়িয়ে রাখতেন। পরিবারটি পরম বৈষ্ণব।
আমাকে আর ঠাকুরভাইকে ছোট দাদু সঙ্গে করে নিয়ে আসেন।
তাঁর পুত্র রাসমোহন রেলে বড় চাকরি করেন। তিনি লোকো ফোরম্যান – তাঁকে সোজা চিঠি – পত্রপাঠ যেন আমার রাঙ্গাকাকা আরো একশ টাকা বেশি মনি-
অর্ডারে পাঠায়। কারণ রাইনাদির বাড়ি থেকে উমা আর ভোলাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, পানাম হাইস্কুলে ভর্তিও করে দিয়েছেন। আমার বাবা-জেঠাদের অভিভাবক তিনি। তাঁর কথার ওপর কথা নাই। আমার রাঙ্গাকাকা পিতার আদেশ শিরোধার্য করে প্রতিমাসে আরো একশ টাকা বেশি পাঠাতে শুরু করেন।
বাড়িঘর থাকলেও জমিজমা বেশি ছিল না। রনাদা, ধনাদা পুবের ঘরেই থাকতেন। তক্তপোশে আমি আর ঠাকুরভাই শুতাম। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় দুলাল, রেখা এবং চিনিকাকিমা কলকাতায় কাকার কাছে রওনা হয়ে গেলেন।
বাড়িটা আরো খালি হয়ে গেল।
সম্মান্দির বাড়িতে তখন ধনঠাকুরমা থাকেন। আমি আর ঠাকুরভাই থাকি। সন্ধ্যা পিসি থাকে।
আমার উপনয়ন হয় ন-বছর বয়সে। দু-বেলা সন্ধ্যা আহ্নিকের সঙ্গে প্রয়োজনে, গৃহদেবতার পূজার দায়ও আমার থাকে। ঠাকুরভাই অর্থাৎ উমাশঙ্কর কোনো কারণে রাইনাদির বাড়ি গেলে, গৃহদেবতার পূজার ভার পড়ত আমার ওপরে। আমার বাবা, অথবা সোনা-জেঠামশাই কেউ না কেউ বাড়িতে এসে হাজির হতো।
ঠাকুরের নিত্যপূজা আছে।
তার সন্ধ্যারতি আছে। পেনা কাকার ওপরে পূজার ভার বর্তাল। কিন্তু বেশিদিন এই ভার বহন করতে হয়নি তাঁকে। আমার রাঙ্গাকাকার চিঠি এসে হাজির।
চিঠিটি লেখা হয়েছে সোনা জেঠামশাইকে –
পূজনীয়েষু, সোনাভাই আপনি শতকোটি প্রণাম নেবেন। রেলে পেনার জন্য একটি চাকরি ঠিক করেছি।
তাকে পত্রপাঠ লামডিং চলে আসতে বলেছি – রেলে লোক নিয়োগ হচ্ছে, এই সুযোগ, সবই আপনার অনুমতিসাপেক্ষি।
এক দুপুরে মুড়াপাড়া থেকে আমার সোনা জেঠামশাই এসে হাজির। রাত থাকতেই বোধহয় মুড়াপাড়া থেকে তিনি রওনা হয়েছিলেন – পেনা চাকরি নিয়ে চলে গেলে বাড়ির গৃহদেবতার কী উপায়! তার পূজা-আর্চা কে করে! ঠাকুরভাই উমাশঙ্কর ক্লাস এইটে পড়ে, আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, আর আছে গঙ্গাদা, একমাত্র রনাদা-ধনাদাকে এ-বাড়িতে নিয়ে আসা যেতে পারে। তাদের কোনো একজন থাকলেও হয়।
অবশ্য আমার ধনঠাকুরমার কাছে এটা কোনো সমস্যাই নয়। উমা-ভোলা আছে – ওদের উপনয়ন হয়ে গেছে। ওরা ঠিক পারবে।
প্রথম দিকে আমার খুব অসুবিধা হতো। মন্ত্রপাঠ ঠিকঠাক হতো না, গণেশের পূজা দিয়ে মন্ত্রপাঠ শুরু হতো। ঠাকুরের সিংহাসনে পূজা পাঠের একটি বই থাকত।
ঠাকুরঘর আমার ঠাকুরভাই সামলাতেন – তবে মাঝে-মাঝে আমাকেও ঠেকা কাজ চালিয়ে দিতে হতো, আমার সোনা জেঠামশাই বলে গেছেন, সর্বাগ্রে গণেশের পূজা দেবে, তারপর পঞ্চদেবতার পূজা শেষ করে পূজা-পাঠের কাজ শেষ করবে।
কোথাও ঠেকে গেলে দশবার গায়িত্রী জপ করলেই পূজার ত্র“টি খন্ডন হয়ে যাবে।
আমি সবই পারতাম। ফুল, বেলপাতা ঠিকঠাক দেবতাদের মন্ত্রপাঠ শেষে দিতেও পারতাম, যেখানে অসুবিধা হতো ঠাকুরের সিংহাসন থেকে পূজাবিধি বইটির সাহায্য নিতাম।
সাধারণভাবে ঠাকুরপূজা আমার বড়দা অর্থাৎ উমাশঙ্করই করতেন। পেনাকাকা যদ্দিন ছিলেন তিনি করতেন, পেনাকাকার রেলে চাকরি হয়ে যাওয়ায় এবং পা-ু নামে কোনো এক সুদূর অঞ্চলে চলে যাওয়ায় আমার বড়দার ওপর গৃহদেবতার পূজার ভার বর্তাল।
ঠাকুরভাইয়ের জ্বরজ্বালা হলে আমার ওপর গৃহদেবতার পূজার ভার পড়ত।
আমার বাবা পূজাপাঠের কিছু শর্টকাট বিধির ব্যবস্থা করে দেওয়ায় আমার পক্ষেও গৃহদেবতার পূজার কোনো আর অসুবিধা থাকল না।
যদি মনে হয় মন্ত্রপাঠে কোথাও গোলমাল হয়ে গেছে, দশবার গায়িত্রী মন্ত্র জপ করে তার সংশোধন হতে পারে।
এভাবে আমি এবং বড়দা ঠাকুর পূজা থেকে গরুর গোয়াল সামলাতাম। গঙ্গাদা জমিজমার তদারকি করতেন। গরু সনাতনিকে জাবনা দেওয়া থেকে গোয়ালের সব কাজ করার দায়িত্ব তাঁর। আমার ধনঠাকুরমা নিরামিষ ঘর সামলাতেন – সন্ধ্যাপিসির বিয়ে হয়ে গেলে আমরা দু-ভাই আমি এবং উমাশঙ্করের জলে পড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। রাইনাদির বাড়ি চলে যেতে পারি, সেখানে মা, জেঠিমা-কাকিমারা আছেন, তবে সেখান থেকে হাইস্কুলের দূরত্ব তিন ক্রোশের মতো। পড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আমাদের বাড়িতে ঠাকুর-দেবতার উপদ্রব এমনিতেই একটু বেশিমাত্রায়। নিত্যপূজার সঙ্গে ষষ্ঠী সংক্রান্তি, কার্তিক পূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজা এসব তো আছেই, তার ওপর দোল উপলক্ষে ছোটখাটো একটি মচ্ছবের আয়োজন থাকত।
আমাদের বাড়িটা তো যে সে বাড়ি নয়, ঠাকুরবাড়ি বললে এক ডাকে সবাই বুঝত কোন বাড়ির কথা বলা হচ্ছে।
তুমি কেডারে বাবা।
আমি ঠাকুরবাড়ির ছেলে।
ঠাকুরবাড়ির ছেলে বললেই সব দোষ খন্ডন।
স্কুলের পথে আস্তানা সাবের দরগা। দরগার চারপাশ বনজঙ্গলে ভর্তি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ঠাকুরঘরে মাথা ঠুকতে হয়। দরগার কাছে এলে সেখানেও মাথা ঠুকতে হয়। দরগার মাজারে পরীক্ষার আগে মোমবাতিও জ্বেলে দিই। পরীক্ষায় ফেল-পাশ সবই এসব দেবতার হাতে। তাঁদের কৃপা হলে পাশ।
কৃপা না হলে ফেল।
এসব কারণেই মাথা ঠুকে না গেলে ফেল-পাশের খচখচানি থাকত।
কোনো কারণে আস্তানা সাবের দরগায় মাথা না ঠুকে যাওয়া যায় না। মাথা না ঠুকে গেলে পরীক্ষা খারাপ হতে পারে।
আমাদের ফেল-পাশের জন্য ঠাকুর দেবতার যেমন প্রয়োজন, তেমনি আস্তানা সাবের দরগায়ও মোমবাতি জ্বেলে দিতাম। পরীক্ষায় ফেল-পাশের এই গ্যারান্টি বাবা-কাকারাই স্থির করে দিয়েছেন। বাজার-সওদায় এক প্যাকেট মোমবাতির তালিকা থাকত।
আমাদের গাঁয়ে বিয়ে অন্নপ্রাশনে আস্তানা সাবের মাজারে সবাই সারি-সারি মোমবাতি জ্বেলে দিত সন্ধ্যায়।