বিভাগ: ফিচার

ছোট ভাইকে জিম্মি করে চোখের সামনে বড় ভাইকে খুন, প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ, জড়িতদের গ্রেফতার দাবী

স্টাফ রিপোর্টার :
বন্দরবাজার থেকে ছোট ভাইকে তোলে নিয়ে জিম্মি করে রেখে বড় ভাই ছাত্রলীগকর্মীকে জাকারিয়াকে ডেকে নিয়ে Kilছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত জাকারিয়া মোহম্মদ মাসুম (২৪) সুনামগঞ্জ দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের মাসুক মিয়ার ছেলে। বর্তমানে জাকারিয়া বিস্তারিত

সৈয়দপুর : একটি আধ্যাত্মিক গ্রাম

অধ্যক্ষ সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ

সু জলা সুফলা, শস্য-শ্যামলা সুন্দর লীলাভূমি মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এ দেশের প্রায় পঁচিশ হাজার গ্রাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জালের মত। বিশ্ব মানচিত্রের ক্ষুদ্র এ ভূ-খণ্ড বাংলার একটি সু-প্রাচীন অঞ্চল হযরত শাহজালাল রহ. এর স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমি, দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ আধ্যত্মিক শহর সিলেট। বৃহত্তর সিলেটের পশ্চিমাংশে ধানের দেশ, ভাটির দেশ নামে খ্যাত সুনামগঞ্জ একটি অতিপরিচিত একটি নাম। সুনামগঞ্জের আট আউলিয়ার স্মৃত বিজড়িত জগন্নাথপুর উপজেলার একপ্রান্ত জুড়ে নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে অবস্থান করছে ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক গ্রাম সৈয়দপুর।
সিলেটের ইতিহাসের সাথে এ গ্রামের ইতিহাস জড়িত। এই ঐতিহ্যবাহী গ্রামে আগমন করে বসতি স্থাপন করেছিলেন হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অন্যতম সঙ্গীয় সাথী হযরত শাহ সৈয়দ আলা উদ্দীন (রহ.) এর চার পুত্রের অন্যতম হযরত শাহ সৈয়দ শামসুদ্দীন (রহ.)। যিনি ছিলেন একজন আলেমেদীন। হযরত শাহজালাল মযররদে ইয়ামনি (রহ.) এর সিলেট আগমনকে কেন্দ্র করে সিলেটে যেসব ঘটনা-কারামত প্রকাশিত হয়েছিল, শাহ সৈয়দ শামসুদ্দীন (রহ.) এর আগমনে তেমনি কিছু ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। শাহজালাল (রহ.) এর আগমনে শ্রীহট্ট হয়েছে জালালাবাদ, হয়েছে শান্তির নীড়, আধ্যাত্মিক রাজধানী। শাহ শামছুদ্দীন (রহ.) এর আগমনে তেমনিভাবে গ্রামের পূর্বনাম কৃষ্ণপুর থেকে হয়েছে সৈয়দপুর, শতভাগ মুসলমানের গ্রাম, সু-প্রতিষ্ঠিত লাভ করেছে সুনামগঞ্জ মহকুমা তথা বৃহত্তর সিলেটের একটি আধ্যাত্মিক গ্রাম হিসেবে।
ঐতিহাসিকদের মতে-হযরত শাহজালাল (রহ.) রাজা গৌড়গবিন্দের হাত থেকে সিলেটকে উদ্ধারের পর বৃহত্তর সিলেটে ইসলামের প্রচার প্রসারে তাঁর সঙ্গীয়দের ছড়িয়ে দিতে মনোনিবেশ করেন। সঙ্গীয় আউলিয়াগণ মুর্শিদের নির্দেশ ও ইঙ্গিতে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে দীনের স্বার্থে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় শাহ সৈয়দ শামসুদ্দীন (রহ.) স্বীয় মুর্শিদের নির্দেশক্রমে মাগেরেবের নামাজের ওয়াক্ত সামনে নিয়ে সিলেট থেকে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে সুরমার তীর দিয়ে পায়ে হেঁটে অগ্রসর হতে থাকেন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় যখন মাগরেব নামাজের ওয়াক্ত হয় তখন তিনি একটি খাল/নদীর তীরে ওজু করে নামাজের প্রস্তুতি নেন। যে নদী বা খালে ওযু করেছিলেন, সে খালটি ওজুর খাল নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে এ খালকে সকলেই উজার খাল হিসেবে চিনেন। যে নদীর তীরে তিনি মাগরেবের নামায আদায় করেছিলেন, মাগরেব নামাজের নামানুসারে ঐ নদীর নামকরণ করা হয় মাগরেবা নদী। কালক্রমে সে নদী লোকমূখে  মাগুরা নদী হিসেবে খ্যাত হয়েছে। সৈয়দ শাহ শামসুদ্দীন (রহ.) স্বীয় মুর্শিদের নির্দেশ মোতাবেক ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যস্থল নির্বাচন করলেন জগন্নাথপুরের কৃষ্ণপুর গ্রামকে। কৃষ্ণপুর গ্রাম ছিল সম্পূর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম। শাহ সৈয়দ শামছুদ্দীন (রহ.) এর ইসলাম প্রচারে ব্রতী হয়ে অত্র এলাকার ভিন্ন ধর্মাবলম্বি সাধারণ জনগণ ইসলামের দাওয়াত কবুল করতে থাকে। দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি পায়। এক সময়ে হয়ে ওঠে বৃহত্তর সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমপ্রদায়ের গ্রাম হিসেবে। মুসলিম উর্বর এই গ্রামের সংবাদ বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে বহু মুসলিম পরিবার এ গ্রামে বসতি স্থাপন শুরু করেন। এমনিভাবে সৈয়দপুর গ্রামে আগমন করেন শাহ সৈয়দ ‘আলা উদ্দীন (রহ.) এর দুই ছেলে শাহ সৈয়দ তাজ উদ্দীন (রহ.) এর বংশের তিনজন উত্তরপুরুষ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সৈয়দপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। শাহ সৈয়দ রোকন উদ্দীন (রহ.)-এর বংশ ধরের কয়েক পরিবার তাছাড়া সৈয়দ ওমর সমরকন্দি (রহ.) সহ আরও অনেক বংশের লোকদের আগমনে সৈয়দপুর গ্রাম হয়ে উঠে বৃহত্তর সিলেটের মুসলিম অধ্যুষিত বৃহত্তর গ্রাম। ছয়টি পাড়ায় বিভক্ত সৈয়দপুর গ্রামে সৈয়দ বংশের লোকদের একত্রে বসবাস করার সুবাদে সৈয়দপুর গ্রাম সম্পর্কে বিভিন্ন লোকজন বলে থাকেন-‘সৈয়দপুরের সকলেই সৈয়দ।’ বাস্তবে গ্রামের বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সৈয়দ বংশের লোক ছাড়াও রয়েছেন দাউদ কোরেশীর বংশধর, শেখ লেদু, করম আলী আখুঞ্জির বংশধর, খান বংশ, মল্লিক বংশ, শেখ বংশ, শিকদার বংশ ও মির্জা বংশের লোকসহ আরও অনেক বংশের লোকজন সৈয়দপুরে বসবাস শুরু করেন এবং তাঁদের বংশধররা অদ্যাবধি গ্রামের ঐতিহ্যের অংশিদার হয়েছেন। কালের বিবর্তনে অনেক কৃতিপুরুষের পদচারণায় মুখরিত ও উজ্জল হয়ে ওঠেছে গ্রামটি। বহু ওলী-আউলিয়া, পীর, ছুফি-সাধক, শিক্ষক, হাফেজ-আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিছ, মুফাস্সর, কবি সাহিত্যিক, লেখক জন্ম নিয়েছেন এ গ্রামে।
ঐীতহাসিক আধ্যাত্মিক গ্রাম সৈয়দপুরে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক ক্ষণজন্মা কৃতিপুরুষ। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সারাটা জীবন দীনের জন্য নিজেকে ওয়াকফ করেছেন, আনেকেই শিক্ষা বিস্তারে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন, আবার অনেকেই মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল কলেজ এবং সামাজিক কাজে নিজেদের ধন-সম্পদ ওয়াকফ করে দিয়ে নিজের মালিকানা থেকে হস্তান্তর করে দিয়েছেন, আবার অনেকেই সারাটাজীবন শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন, অনেকেই কলম সৈনিক হিসেবে তাঁর ক্ষুরধার লিখনীর মাধ্যমে দেশ ও সমাজকে সহযোগিতা করেছেন, আবার অনেকেই সারাটাজীবন সামাজিক বিচার-পঞ্চায়েত কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাছাড়া এ গ্রামেরই কৃতিপুরুষদের মধ্যে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে রয়েছে অনেকের কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা। অনেকেই দেশের জন্য বার বার জেল কেটেছেন। এদরে মধ্যে রয়েছেন-পীর-আউলিয়া, আলেম, শিক্ষক, দেশপ্রেমিক, মৌলভী, মুনশী, সরকারী-বেসরকারী চাকুরীজীবী, পেশাজীবী, কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবীদ, দানবীর, সমাজসেবী। তাঁরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব অবস্থানে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং প্রত্যেকেই ছিলেন এককজন সৎ, নিষ্ঠা ও প্রাজ্ঞ।
গুণীজনদের অনেকেই দুনিয়া ছেড়ে পরলোক গমন করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন- শাহ সৈয়দ শামছুদ্দীন রহ. দরগাহ জামে মসজিদ ও তৎসংলগ্ন ইদগাহের খতীব ও ইমাম মেীলভী সৈয়দ ফখরুল্লাহ, নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর গৃহশিক্ষক সৈয়দ হাফিজ আলী, বানিয়াচং রাজপরিবারের গৃহ শিক্ষক মো. শুকুর উল্লাহ, বর্ধমান উচ্চতর আদালতের সাবেক প্রধান বিচারপতি দেওয়ান সৈয়দ ওয়াসিল আলী, সিপাহী বিপ্লবপূর্ব বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা কেরামত আলী জৌনপুরীর অন্যতম খলীফা সৈয়দ ওজীহ উল্লাহ, দেওয়ান হাছন রাজার ওস্তাদ মৌলভী মোহাম্মদ গোলাম হায়দার, জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান আজরফের ওস্তাদ মৌলভী সৈয়দ এমদাদ আলী, ফরাজী আন্দোলনের বার বার কারাবরণকারী মজলুম নেতা সৈয়দপুর শামছিয়া আলীয়া মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী সৈয়দ শরাফত আলী, বিশিষ্ট কবি সৈয়দ আশহর আলী চৌধুরী, বিশিষ্ট সাধক ও মরমী কবি পীর মজির উদ্দীন, বিশিষ্ট শিক্ষানূরাগী হাজী সৈয়দ আমতর আলী, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা কবি সৈয়দা ছামিনা ভানু, পীর কারী সৈয়দ কলন্দর আলী, মৌলভী ইউছুব খান, মুহাম্মাদ রহিম খান, বিশিষ্ট আলেমে দীন মৌলভী মোঃ আব্দুল ওয়াহাব, মেীলভী সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ উরফে বড় মৌলভী, মাস্টার সৈয়দ আবদাল মিয়া, প্রখ্যাত আলেমে দীন কাজী সৈয়দ আব্দুর রউফ, শায়খুল ‘আরব ওয়াল ‘আযম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী এর খলীফা সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসা প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সৈয়দ তখলিছ হোসাইন, আজাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, শায়খুল ‘আরব ওয়াল ‘আযম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী এর খলীফা সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসা প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী সৈয়দ আব্দুল খালিক, খেলাফত আন্দোলন ও আজাদী আন্দোলনের আসাম প্রাদেশিক শীর্ষ নেতা, একাধিকবার কারাবরণকারী মাওলানা সৈয়দ জমিলূল হক উরফে জেলি মৌলভী, ফাজিলে দেওবন্দ মাওলানা সৈয়দ আবুল হোসেন, মৌলভী সৈয়দ কিয়াছত আলী, হাফিজ সৈয়দ আকবর আলী, সুনামগঞ্জ মহকুমার মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বি এ বি টি মাস্টার সৈয়দ হাফিজুর রহমান, তৎকালীন সিলেটের প্রথম মুন্সেফ সৈয়দ আওলাদ হোসেন, সৈয়দ মুনসিফ আলী অডিটর, সৈয়দ ইনসাফ আলী অডিটর, মো, মুতিউর রহমান অডিটর, মাওলানা সৈয়দ আব্দুজ জহুর উরফে পণ্ডিতসাব, পীর সৈয়দ আফসর আলী, পীর মো. মনফর উদ্দীন, পীর সৈয়দ আব্দুল জব্বার উরফে জব্বারশাহ, বিশিষ্ট আলেমে দীন হাফিজ সৈয়দ আফতাব আলী, মাস্টার সৈয়দ রুশন আলী, কাজী মল্লিক জহির উদ্দীন, মাস্টার মো: ইয়াসিন উল্লাহ, বিশিষ্ট আলেমেদীন মাওলানা সৈয়দ হাবিবুর রহমান, বিশিষ্ট সাংবাদিক সাহিত্যিক সৈয়দ শাহাদত হোসেন, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও লেখক মাওলানা কাজী সৈয়দ আশরফুল হক আকিক, সিলেট জেলার প্রথম সারির সাংবাদিক সৈয়দ উসমান আলী সারং, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল মান্নান, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসার স্বনামধন্য উস্তাদ মাওলানা সৈয়দ আব্দুল ওয়াহিদ, মাস্টার সৈয়দা দুরুকসিন্দা ভানু, বিশিষ্ট শিক্ষানূরাগী মাস্টার সৈয়দ মন্তেশর আলী, মাস্টার সৈয়দ নুজিবুল্লাহ, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল গুণীজনদের অনেকেই দুনিয়া ছেড়ে পরলোক গমন করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন- শাহ সৈয়দ শামছুদ্দীন রহ. দরগাহ জামে মসজিদ ও তৎসংলগ্ন ইদগাহের খতীব ও ইমাম মেীলভী সৈয়দ ফখরুল্লাহ, নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর গৃহ শিক্ষক সৈয়দ হাফিজ আলী, বানিয়াচং রাজপরিবারের গৃহ শিক্ষক মো. শুকুর উল্লাহ, বর্ধমান উচ্চতর আদালতের সাবেক প্রধান বিচারপতি দেওয়ান সৈয়দ ওয়াসিল আলী, সিপাহী বিপ্লবপূর্ব বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা কেরামত আলী জৌনপুরীর অন্যতম খলীফা সৈয়দ ওজীহ উল্লাহ, দেওয়ান হাছন রাজার ওস্তাদ মৌলভী মোহাম্মদ গোলাম হায়দার, জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান আজরফের ওস্তাদ মৌলভী সৈয়দ এমদাদ আলী, ফরাজী আন্দোলনের বার বার কারাবরণকারী মজলুম নেতা সৈয়দপুর শামছিয়া আলীয়া মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী সৈয়দ শরাফত আলী, বিশিষ্ট কবি সৈয়দ আশহর আলী চৌধুরী, বিশিষ্ট সাধক ও মরমী কবি পীর মজির উদ্দীন, বিশিষ্ট শিক্ষানূরাগী হাজী সৈয়দ আমতর আলী, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা কবি সৈয়দা ছামিনা ভানু, পীর কারী সৈয়দ কলন্দর আলী, মৌলভী ইউছুব খান, মুহাম্মাদ রহিম খান, বিশিষ্ট আলেমে দীন মৌলভী মোঃ আব্দুল ওয়াহাব, মেীলভী সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ উরফে বড় মৌলভী, মাস্টার সৈয়দ আবদাল মিয়া, প্রখ্যাত আলেমে দীন কাজী সৈয়দ আব্দুর রউফ, শায়খুল ‘আরব ওয়াল ‘আযম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী এর খলীফা সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসা প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সৈয়দ তখলিছ হোসাইন, আজাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, শায়খুল ‘আরব ওয়াল ‘আযম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী এর খলীফা সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসা প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী সৈয়দ আব্দুল খালিক, খেলাফত আন্দোলন ও আজাদী আন্দোলনের আসাম প্রাদেশিক শীর্ষ নেতা, একাধিকবার কারাবরণকারী মাওলানা সৈয়দ জমিলূল হক উরফে জেলি মৌলভী, ফাজিলে দেওবন্দ মাওলানা সৈয়দ আবুল হোসেন, মৌলভী সৈয়দ কিয়াছত আলী, হাফিজ সৈয়দ আকবর আলী, সুনামগঞ্জ মহকুমার মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বি এ বি টি মাস্টার সৈয়দ হাফিজুর রহমান, তৎকালীন সিলেটের প্রথম মুন্সেফ সৈয়দ আওলাদ হোসেন, সৈয়দ মুনসিফ আলী অডিটর, সৈয়দ ইনসাফ আলী অডিটর, মো, মুতিউর রহমান অডিটর, মাওলানা সৈয়দ আব্দুজ জহুর উরফে পণ্ডিতসাব, পীর সৈয়দ আফসর আলী, পীর মো. মনফর উদ্দীন, পীর সৈয়দ আব্দুল জব্বার উরফে জব্বারশাহ, বিশিষ্ট আলেমে দীন হাফিজ সৈয়দ আফতাব আলী, মাস্টার সৈয়দ রুশন আলী, কাজী মল্লিক জহির উদ্দীন, মাস্টার মো: ইয়াসিন উল্লাহ, বিশিষ্ট আলেমেদীন মাওলানা সৈয়দ হাবিবুর রহমান, বিশিষ্ট সাংবাদিক সাহিত্যিক সৈয়দ শাহাদত হোসেন, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও লেখক মাওলানা কাজী সৈয়দ আশরফুল হক আকিক, সিলেট জেলার প্রথম সারির সাংবাদিক সৈয়দ উসমান আলী সারং, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল মান্নান, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসার স্বনামধন্য উস্তাদ মাওলানা সৈয়দ আব্দুল ওয়াহিদ, মাস্টার সৈয়দা দুরুকসিন্দা ভানু, বিশিষ্ট শিক্ষানূরাগী মাস্টার সৈয়দ মন্তেশর আলী, মাস্টার সৈয়দ নুজিবুল্লাহ, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল মুনিম, মাস্টার সৈয়দ শফিকুল হক, সৈয়দপুর দরগাহ জামে মসজিদের দীর্ঘদিনের সাবেক খতীব ও সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসা হেড মাওলানা মাওলানা সৈয়দ রফিকুল হক, মাওলানা শেখ মো. আব্দুল হক, মাস্টার সৈয়দ মাহমুদ আলী, মাস্টার মো. ইলিয়াছ হোসেন কোরেশী, মাস্টার সৈয়দ আরজু মিয়া, মাস্টার সৈয়দ নূরুল হক ছুফি, সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসার সাবেক মুহতামিম ও দরগাহ জামে মসজিদের সাবেক খতীব হাফিজ মাওলানা সৈয়দ আবু সাঈদ, সৈয়দপুর দারুল হাদীস, মাদরাসার স্বনামধন্য মুহতামিম হাফিজ মাওলানা সৈয়দ মনযুর আহমদ, সৈয়দপুর দরগাহ জামে মসজিদের দীর্ঘ দিনের ইমাম হাফিজ সৈয়দ বশারত আলী, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসা দীর্ঘ দিনের প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ সদিকুল হক, মাওলানা সৈয়দ লুৎফুর রহমান, সাবেক বিভাগীয় একাউন্ট অফিসার সৈয়দ আরজুমন্দ আলী, সাবেক শিক্ষা উপপরিচালক সৈয়দ মুজিবুর রহমান, মাস্টার সৈয়দ আরবাব হোসেন, মাস্টার সৈয়দ মাহতাব আলী, সাবেক স্কুল পরিদর্শক সৈয়দ শাহ আলম চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সৈয়দ শফিকুল বারী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক সৈয়দ আব্দুল মালিক, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল মতিন, ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল ওয়াহাব, মাস্টার সৈয়দ মস্তফা আহমদ, মাস্টার সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসা ওয়াকফ স্টেটের মোতাওয়াল্লী কাজী মাওলানা সৈয়দ মুস্তাক আহমদ, মাওলানা সৈয়দ ইজাদ আলী, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাক্তার সৈয়দ শাহ আনওয়ার চৌধুরী, ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল হক, ডাক্তার সৈয়দ মহীউদ্দীন, মাস্টার সৈয়দ জিল্লুল হক, মাস্টার সৈয়দ আবুল খায়ের, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসা স্বনাধন্য উস্তাদ হাফিজ মোঃ আইয়ুব আলী, মাওলানা সৈয়দ মুজাহিদ আলী, মাস্টার সৈয়দ আব্দুস সালাম, মাস্টার সৈয়দ আসকর আলী, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল হান্নান, মাস্টার সৈয়দ আব্দুল মতিন, সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসার স্বানামধন্য মুহতামিম হাফিজ মাওলানা সৈয়দ মুতিউর রহমান, মাস্টার সৈয়দ তফজ্জুল হোসেন উরফে তৈমুছ আলী, মাস্টার সৈয়দা নূরজাহান, মাস্টার সৈয়দা জিনতুন নেছা, সাবেক মাদক সিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কন্ট্রোলার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট সৈয়দ কবির আহমদ, বিশিষ্ট প্রকৌশলী সৈয়দ মুক্তাদির আলী, সৈয়দপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মাস্টার সৈয়দ নাজমুল হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক উপ-পরিচালক সৈয়দ আলী আসগর, বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধা সৈয়দ ইবন হাসান, মাস্টার সৈয়দ মহতাজ আহমদ, মাস্টার মলিক মো. সিদ্দিক আহমদ, বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধা শেখ মো. হারুনরশীদ, কারী হাফিজ মো. আব্দুল হেকিম, মাস্টার মো. আব্দুস সালাম মির্জা, কারী সৈয়দ আব্দুশ শহীদ, মাস্টার সৈয়দ রুহুল আমীন, মাস্টার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মাস্টার সৈয়দ মিজানুর রহমান সেতু, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আলী, সৈয়দপুর চেীধুরী বাড়ীর জামে মসজিদের সাবেক ইমাম মাওলানা সৈয়দ মুতাহির আলী, বিশিষ্ট আলেমে দীন সৈয়দপুর দারুল হাদীস মাদরাসার স্বনামধন্য মুহাদ্দীস মাওলানা সৈয়দ মুস্তাকিম আলী, মাওলানা মো. মকদ্দুস আলী, কারী মো. আব্দুর রউফ, ডাক্তার সৈয়দ দবির আহমদ, মাস্টার সৈয়দ সিবতুল আমিীন, সৈয়দপুর আদর্শ কলেজের প্রভাষক, সৈয়দপুর সাধারণ পাঠাগরের পরিচালক মো: আব্দুস সবুর, বিশিষ্ট আলেমেদীন সৈয়দ ফতেহ আহমদ, সৈয়দপুর শামছিয়া বালিকা মাদরাসা মুহতামিম মাওলানা সৈয়দ আখতার হোসাইন প্রমুখ।
এছাড়াও এ গ্রামের রয়েছেন অনেক বিশিষ্ট সমাজ সেবক, রাজনীতিবীদ এবং শিক্ষানূরাগী, তাদের অনেকেই আজ ইহজগত ত্যাগ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব অবস্থানে কৃতিত্বের দাবীদার। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিবর্গ হলেন-বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সেবক যথাক্রমে-মৌলভী মো. আব্দুল মজিদ শিকদার, মিয়া সৈয়দ আজমল আলী চৌধুরী, সৈয়দ আঞ্জব আলী চৌধুরী, সৈয়দ সাব্দুল আলী, মৌলভী মল্লিক নাজিম উদ্দীন, হাজী সৈয়দ হছরত উল্লাহ, মুন্সি সৈয়দ সরকুম আলী, হাজী সৈয়দ শমসেদ আলী, সৈয়দ হারিছ আলী, সৈয়দ ওয়ারিছ আলী, হাজী মো. গোলাম রব্বানী, সৈয়দ ওয়াজিদ আলী, সৈয়দ জরাবত আলী, সৈয়দ আব্দুল আহাদ, মো. জবান উল্লাহ, মো. ইয়াকুব উল্লাহ, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ সৈয়দ আহবাব আলী, বিশিষ্ট সমাজ সেবক সৈয়দ কমলা মিয়া, মুনশি সৈয়দ শামছুল হক, মো. উমরা খান, সৈয়দ ইসরাক আলী, সৈয়দ ইউনুছ আলী, মুন্সি সৈয়দ নূর মিয়া, সৈয়দ আব্দুল মুহিত, সৈয়দ ফয়জুল্লাহ, সৈয়দ সিদ্দীক আহমদ উরফ গেদা মিয়া, সৈয়দ রাছ উদ্দীন আহমদ, সৈয়দপুর আলীয়া মাদরাসার ওয়াকফ স্টেটের মোতাওয়াল্লী হাজী মো. আবুল বশর কোরেশী ও হাজী মো. আসাব আলী, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মেম্বার হাজী সৈয়দ আলী আহমদ, হাজী মো. আসকির হোসেন কোরেশী, হাজী সৈয়দ মনির আহমদ(মনির দর্জি), হাজী শেখ মো. কমরু মিয়া, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ফখরুল, সাবেক চেয়ারম্যান মো. আব্দুল খালিক, বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ মলিক আব্দুল মুসাব্বির, মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙ্গালীদের অন্যতম সংগঠক সৈয়দ আলবাব হোসেন, সৈয়দ ওহিদ উদ্দীন আহমদ, বিশিষ্ট সমাজ সেবক সাবেক মেম্বার হাজী সৈয়দ আব্দুর রহমান, হাজী সৈয়দ কনু মিয়া, হাজী সৈয়দ আব্দুল মানিক, হাজী সৈয়দ বশির মিয়া, হাজী সৈয়দ দিলু মিয়া, হাজী মো. কাছা মিয়া কোরেশী, সাবেক মেম্বার সৈয়দ হাসিন আলী, হাজী সৈয়দ আসকর হোসেন বাদশা, হাজী মো. আব্দুল মতিন, সাবেক মেম্বার হাফিজ সৈয়দ সুফি মিয়া, সাবেক মেম্বার হাজী মোঃ আব্দুল হক, মেম্বার সৈয়দ আসকর হোসেন, সৈয়দ শাহনূর আহমদ, সৈয়দ কামাল মিয়া, সাবেক মেম্বার সৈয়দ ফরাজ মিয়া, হাফিজ সৈয়দ সাজ্জাদুর রহমান, মো. খছরুজ্জামান প্রমুখ।
ঐতিহাসিক গ্রামটি আপন বৈশিষ্ট্য এবং স্বকীয় মহিমায় দেশ ও জাতির উন্নয়নে বিস্তর অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। গ্রামের বর্তমান তথ্যানুযায়ী প্রতি নজর রাখলে আমাদের যে বাস্তবসম্মত দৃশ্য ভেসে ওঠে তা নিম্নরূপ-
গ্রামের আদি নাম-কৃষ্ণপুর, বর্তমান নাম-সৈয়দপুর, আয়তন-প্রায় ১৫ মাইল, জনসংখ্যা প্রায়-৩২০০০, মৌজা-৭টি, পাড়া-মহল্লা-৬টি, জামে মসজিদ-৮টি, পাঞ্জেগানা মসজিদ-৩০টি, দাওরায়ে হাদীস মাদরাসা ২টি, (১টি বালক, ১টি বালিকা), আলিম মাদরাসা ১টি, কলেজ ১টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২টি (১টি বালক-বালিকা, ১টি বালিকা, মহিলা মাদরাসা ১টি, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়-৫টি, কিন্ডারগার্টেন ৩টি, নূরানী-৪টি, দারুল কুরআন হিফজখানা ১টি, প্রাক প্রাথমিক ১টি, সবাহী মক্তব ১৫টি, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এস এস সি প্রোগ্রাম সেন্টার ১টি, শিক্ষার হার-৯৫%, পোষ্ট অফিস ১টি, ইউনিয়ন অফিস ১টি, বাজার ১টি, ব্যাংক -৩টি, ব্যাংক বোথ ২টি, গ্রন্থাগার-৬টি, সামাজিক সংগঠন ১০টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ১টি, ক্রীড়া সংগঠন/ক্লাব ৮টি, কারখানা/মেইল ৪টি।
তাছাড়া দেশ বিদেশে রয়েছেন আনেক কৃতি সন্তানেরা। প্রবাসে যেসব গুণীজন রয়েছেন- সরকারী-বেসরকারী চাকুরীজীবী, কমিউনিটি নেতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব তাঁদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে দেশে অবস্থানরত কৃতিসন্তানদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো-দাওরায়ে হাদী/কামিল পাশ ১৮৫জন, হাফেজে কুরআন ১৬০জন, স্নাতকোত্তর ১২০জন, স্নাতক ৮৫জন, এম বিবিএস ডাক্তার ১৮জন, প্রকৌশলী ৭জন, ব্যাংকার ১৫জন, ব্যারিষ্টার ও আইনজীবী ২১জন, বিসিএস ক্যাডার ১২জন, সরকারী চাকুরীজীবী ৬৫জন, বেসরকারী চাকুরীজীবী ১৩৫জন, অবসরপ্রাপ্ত চাকুরীজীবী সরকারী/বেসরকারী ৪২জন, কবি সাহিত্যিক ২১জন, সাংবাদিক ১৫জন।
কালের আবর্তে নিজস্ব ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে সৈয়দপুরের রয়েছে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সব দিক দিয়ে রয়েছে গ্রামের আলাদা বৈশিষ্ট্য। সৈয়দপুর গ্রামের বড় অংশ প্রবাসে অবস্থানরত আছেন। তাঁদের মধ্যে অনেক আলেম, হাফিজ, শিক্ষক, চাকুরীজীবী, পেশাজীবী, রাজনীতিবীদ, কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক সৃষ্টি হয়েছেন। যাদের সার্বিক সহযোগিতায় গ্রামের মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রবাসীরা গ্রামের সার্বিক উন্নয়নে সদা তৎপর। প্রবাসীরা গ্রামকে করেছে উন্নত। গ্রামের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে প্রবাসীদের সার্বিক সহযোগিতা অনস্মীকার্য। আমরা প্রবাসীদের শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট কৃতি গুণীদের তালিকা সংগ্রহ কাজ করে যাচ্ছি। প্রবাসীরা আমাদের তথ্য সংগ্রহ কাজে সহযোগিতা করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
পরিশেষে বলা যায়, বহুগুণে গুণান্বিত গ্রামের নাম সৈয়দপুর। দেশের সরকার অনুমোদিত আদর্শ গ্রামের সকল কাইটেরিয়া পূরণ করে গ্রামকে একটি আদর্শ গ্রামে নির্বাচন ও নির্ধারণ করতে সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

জননেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ॥ শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান এবং না বলা কিছু কথা

52202_qqqআল-হেলাল

“আমি এমন একটি শাসনতন্ত্র চেয়েছিলাম যা দেশের দুই অংশের পক্ষেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। আমি এমন শাসনতন্ত্র চাইনি যা দেশের এ অংশের স্বার্থের উদগ্র তাগিদে অন্য অংশের স্বার্থের পরিপন্থী হবে। আমি সত্যিই এমন একটি শাসনতন্ত্রের জন্য উদগ্রীব হয়ে থেকেছিলাম যার ফলে পরোক্ষ নির্বাচনের যুগের অবসান হবে। জনগণের কাছে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে থাকার আমলের হাত থেকে আমরা রেহাই পাবো। আমি যতশীঘ্র সম্ভব দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন চেয়েছিলাম। আমি বলতে চেয়েছিলাম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান আর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পার্লামেন্ট গঠিত হওয়ার পরই দেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব। তার এক মুহূর্ত আগেও নয়”। ১৯৫৬ সালের ৩১ জানুয়ারী করাচিতে তদানীন্তন গণ পরিষদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শাসনতন্ত্র বিলের উপর বক্তৃতা দানকালে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছরের ব্যবধানে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো পাকিস্তানের জনকদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব গণতন্ত্রের মানসপুত্র অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা পার্লামেন্টারী রাজনীতির প্রবক্তা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গাইড লাইনগুলো অনুসরণ না করায় এক পাকিস্তানের অখন্ডতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে এদেশে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের মধ্যে দিয়ে মহান নেতা সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্ন যারা পূরণ করে কিংবদন্তী হয়ে আছেন তাদের মধ্যে একজন অন্যতম সংবিধান প্রণেতার নাম সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। ভারতের সংবিধান প্রণেতা অম্ভিতকার ছাড়াও ১৯৩৭ সালে বৃটিশ শাসিত অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তুলসী রঞ্জন গোস্বামী, শরৎচন্দ্র বসু ও সরদার বাহাদুর খান গংদেরকে সেরা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে জ্ঞান গরীমা বিদ্যা বুদ্ধি অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পূর্বসূরীতো বটেই বর্তমান সময়ে সমসাময়িক বিশ্বের সকল পার্লামেন্টারিয়ানদের মধ্যে সেরাদের সেরা হয়ে স্বমহিমায় জাতীয় সংসদে প্রতিভার স্বাক্ষর অক্ষুণœ রেখেছিলেন। ৮ম বারের নির্বাচিত এরকম একজন পার্লামেন্টারিয়ানের অস্তিত্ব বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসতো বটেই বরং দুনিয়ার কোথায়ও নেই। মূলত এ কারণেই তিনি বিশ্ব শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান। একজন বিশ্ববরেণ্য পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এর কাছেও এক সময় তার ব্যপ্তি সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের পর বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সরকার গঠন করলে ঐ নির্বাচনে মাত্র ৫০৫ ভোটে তাঁকে পরাজিত হতে হয়। মাত্র কয়েকটা দিন সংসদ অধিবেশনে তাঁর অনুপস্থিতি থাকলেও ঐ সময়ে তাকে দলের নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যদেরকে সংসদের রীতিনীতি কার্যপ্রণালী ও বিধিবিধান সম্পর্কে ক্লাস প্রদান করতে দেখা গেছে। নির্বাচিত পার্লামেন্টারিয়ানদের গুরু হওয়ার সৌভাগ্যও তার ভাগ্যে জুটিছিলো। প্রকৃতির আনুকূল্যে হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং ও আজমেরীগঞ্জ) আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শরীফ উদ্দিন মাস্টারের মৃত্যুজনিত কারণে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তিনি ঐ বছরই জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বন্যেরা যেমন বনে সুন্দর শিশুরা যেমন মাতৃকোলে তেমনি সুরঞ্জিত সুন্দর পার্লামেন্টে। তাঁকে বাদ দিয়ে সংসদের অধিবেশন যেন কল্পনাতীত।
সুরঞ্জিতের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি বই লেখার জন্য স্থানীয় দিরাই উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি আলতাব উদ্দিন ও সাংবাদিক নেসারুল হক খোকনসহ তাঁর অগণিত ভক্ত ও অনুরক্তরা আমাকে অনুরোধ জানালে ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর “জননেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান” নামে আমার সম্পাদনায় ১৬ পৃষ্ঠার একটি আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশিত হয়।  গভীর সমুদ্র সম্পর্কে লেখনীর মারফতে যেমন সবকিছু তুলে ধরা সম্ভব হয়না তেমনি সুরঞ্জিত সেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের খতিয়ান দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বাসস প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান তালুকদার, আমি ও সাংবাদিক নেসারুল হক খোকন যেহেতু আমাদের সাংবাদিকতা জীবনের একটি বেশীর ভাগ সময় তাঁর সাথে অতিবাহিত করেছি সেহেতু এ কাজটি আমাকেই করতে হয়েছে। তাই শত ব্যস্ততার মধ্যে এ কাজটিকে আমি আমার আন্তরিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ করে নিয়েছিলাম। যতদূর জানতে পেরেছি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এলাকার সকল শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে দুখু সেন নামে পরিচিত। বন্ধু বান্ধবরা তাকে মা বাবার দেয়া এ ডাকনামেই ডাকতেন। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তার সমর্থনে দিরাই বাজারে সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায় আসেন তৎকালীন বিরোধী দলের ন্যাপের নেত্রী বাংলার অগ্নিকন্যা বর্তমান মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। ঐ সময়ের নির্বাচনী প্রচারপত্রে প্রার্থী হিসেবে তার নামটি দুখু সেন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হাওরাঞ্চলে পাক ওয়াটার ওয়েজ লঞ্চযোগে গণসংযোগে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সময় দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জ আসনে জাতীয় পরিষদে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে সাবেক মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ও প্রাদেশিক পরিষদে সাবেক মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাসকে দিরাই বাজারের নির্বাচনী সভামঞ্চে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। জাতীয় পরিষদে সামাদ আজাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ন্যাপের গুলজার আহমদ ও পিডিপির গোলাম জিলানী চৌধুরী অন্যদিকে প্রাদেশিক পরিষদে মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাসের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ন্যাপের সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, পিডিপির আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান, কমিউনিষ্ট পার্টির কমরেড প্রসূণ কান্তি রায় বরুণ রায়। নির্বাচনে বিপুল ভোটে অপেক্ষাকৃত ৩ জনপ্রিয় প্রার্থীকে হারিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথমবার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য পদে নির্বাচিত হন। সারা বাংলাদেশে ঐ সময় একমাত্র বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের পার্লামেন্টে সংবিধান রচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
সুরঞ্জিত সেন এর পিতা ডাঃ দেবেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত ছিলেন একজন শিক্ষিত মার্জিত রুচিশীল ভদ্রলোক। যিনি চিকিৎসায় আর্ত মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। আপন সন্তানের ন্যায় পরের ছেলেদেরকেও আদর যতেœর মাধ্যমে আপন করে নেয়ার বাস্তব ঘটনায় তাঁর মমতাময়ী মাতা শ্রীমতি সুমতিবালা সেনগুপ্ত এর প্রশংসায় পঞ্চমুখর এলাকার সকল মানুষ। ফরিদপুরের কন্যা হওয়া স্বত্ত্বেও তার সুযোগ্য সহধর্মীনি ড. জয়া সেনগুপ্ত আন্তরিক আত্মীয়তা ও আপ্যায়নে নির্বাচনী এলাকার জনগণের পাশাপাশি বৃহত্তর সিলেটবাসীর মনে শ্রদ্ধার আসন করে নিয়েছেন। তাদের একমাত্র পুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত কানাডা থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চতর ডিগ্রীধারী সুশিক্ষিত যুবক। সেন পরিবারের একমাত্র পুত্রবধূ রাখী মৈত্রী ভৌমিক কিশোরগঞ্জের কন্যা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পিতা মাতার মৃত্যুর পর সুরঞ্জিত সেনের আপন সহোদর ও একমাত্র বোন এলাকার অন্যান্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পদাংক অনুসরণ করে কলকাতায় চলে যান। কিন্তু মা মাটি ও মমত্ববোধের প্রতি অসম্ভব মোহে মোহিত সুরঞ্জিত থেকে যান পিতৃগৃহে।
দুখু সেনের পূর্ণ ও সার্টিফিকেট নাম সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। দিরাই শাল্লা নির্বাচনী এলাকার এই কৃতি সন্তানের প্রকৃত জন্ম তারিখ ও সাল হচ্ছে ১৯৩৯ সালের ৯ ফেব্র“য়ারী। লেখাপড়ায় ব্যাক অব স্টাডি হওয়ায় তার জন্ম তারিখ সাল পরিবর্তনক্রমে উল্লেখ করা হয় ১৯৪৫ সালের ৫ই মে তারিখে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন তার পিতার কর্মস্থল জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তাঁর পিতা তৎকালীন জামালগঞ্জ ও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর তৃতীয় শ্রেণীর সরকারী কর্মচারী ছিলেন। দিরাই উপজেলা সদরের আনোয়ারপুর নয়াহাটি গ্রাম হচ্ছে তার স্থায়ী নিবাস। তিনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন স্থানীয় দিরাই আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি, সিলেটের এমসি কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ পাস করেন। সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে আইন পাস করে তিনি ১৯৭৩ সালে সুর্প্রীম কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ক্ষমতাসীন পাক সরকারের আমলে সুনামগঞ্জ কলেজে কনজারভেটিভ প্রগ্রেসিভ পার্টির একক আধিপত্য ছিল। এ দলের আধিপত্য ভেঙ্গে দিয়ে সুশীল দত্ত, গুলজার আহমদ, কাজল দাস, গোলাম রব্বানী, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও আলী ইউনুছ প্রমুখ প্রতিভাবান ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়নের মজবুত ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকাবস্থায় ১৯৬৯ সালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারী দলের নেতাকর্মীরা দিরাই উপজেলা সদরে তার উপর সন্ত্রাসী হামলা করে। এর প্রতিবাদে দিরাই বাজারে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি গোলাম রব্বানীসহ মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। এ প্রতিবাদ সভাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জীবনের প্রথম রাজনৈতিক সভামঞ্চের বক্তৃতায় স্থানীয় জনগণ ও প্রকৃতির আশীর্বাদ কুড়িয়ে নেন তিনি। অন্যায়ের প্রতিবাদী ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। “দুখু সেন জিন্দাবাদ, দুখু তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে” শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় ভাটির জনপদ। দিরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল কদ্দুছ বলেন, তিনি আমাদের ৪ বছরের সিনিয়র ছাত্র ছিলেন। এমসি কলেজে হিন্দু হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতেন তিনি। এ সময় কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজিত গান কবিতা নাটকসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যমণি ছিলেন তিনি। সে সময় দিরাই থানার ধনাঢ্য অভিজাত ঘরের শিক্ষিত ছাত্র যুবকেরা নাটক যাত্রা ও গানের অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নাটক বিশেষ করে সিরাজউদ্দোল্লাহ ও মোহনলাল চরিত্রে অভিনয় করে তাকে সুনাম অর্জন করতে দেখেছেন অনেকে। সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস আওয়ামীলীগ নেতা বেলায়েত হোসেন বলেন, কলেজে অধ্যয়নকালে সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রতি অসম্ভব আগ্রহ ছিল তার। তৎকালীন তুখোড় বক্তা বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক গবেষক প্রকাশক সাংবাদিক আব্দুল আই হাছনপছন্দ স্যারের নেতৃত্বে মহকুমা সদরে যতগুলো নাটক ও সাংস্কৃতিক আড্ডা অনুষ্ঠিত হতো সবগুলো আড্ডার প্রাণ ছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। বিভিন্ন যাত্রা নাটকের সংলাপ তিনি এত বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতেন যা শোনার জন্য শ্রোতা দর্শকরা ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুণতো। ১৯৬৫-৬৬ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় জগন্নাথ হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। রাজনৈতিক মঞ্চে বক্তৃতা দানকালে কখনও তাকে কোন কাগজপত্রের সাহায্য নিতে হয়নি। পররাষ্ট্র নীতিসহ যেকোন কঠিন বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তৃতা দেন তিনি। গ্রাম গঞ্জের মানুষ তার জনসভার কথা শুনলেই বগলে ছাতা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে থানা সদরে এসে তার বক্তৃতা শুনতেন। তিনি জীবনে অসংখ্য বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু কখনও ভাবাবেগ বা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হননি। তাছাড়া যা তিনি করতে পারবেন না বলে মনে করতেন এইরূপ মিথ্যা ওয়াদাও তিনি কখনও করেননি। আজ পর্যন্ত তার সম্পূর্ণ বক্তৃতা বিবৃতি ঘেটে কেউ দেখাতে পারেননি তিনি বিরোধী দলে থাকাকালে যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন ক্ষমতায় এসে তা ভুলে গেছেন। মডেল মানুষ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন হতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নেতাকর্মীদের শিক্ষা গ্রহণের যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। সংসদের নির্বাচনের পূর্বে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে গণ সংযোগ এর পাশাপাশি হাটেবাজারে ছোট ছোট সভা করে সর্বশেষ নির্বাচনী সমাবেশ করতেন থানা সদরে। জনসভাগুলোতে তিল ধারনের কোন ঠাই থাকতো না। মানুষের উপস্থিতি হতো বেশী। হৈ হুল্লোড় উত্তেজনা শ্লোগান এর কমতি হতো না কোথায়ও। যেই মাইকে তাঁর নাম ঘোষণা হতো তখনই দাঁড়িয়ে থাকা সমবেত জনতা মুহূর্তের মধ্যে বসে যেতো। মিশেলী অথচ সকলের বোধগম্য আশ্চর্য্য সাবলীল গতিশীল মিষ্টি কথায় বক্তৃতা দিতেন তিনি। এত লোক থাকলেও কেউ টু শব্দটি করতো না। বিশাল জনসমুদ্র তাঁর প্রত্যেকটি কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ করতো। তাহার বাচনভঙ্গিতে থাকতো যাদু। এমন সরস সুন্দর সাবলীল ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক বক্তৃতা তিনি ছাড়া বাংলাদেশে আর কেউ দিতে পারে বলে দিরাই শাল্লার জনগণ কখনও মনে করেন না। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের হাজার হাজার মিছিল মিটিং সমাবেশ করতে গিয়ে সমাবেশে লোক শ্রোতা আনার জন্য তাকে কখনও কোন টাকা খরচ করতে হয়নি। কখনও টাকা দিয়ে তাকে ভোট ক্রয় করতে হয়নি। একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া স্বত্তেও তিনি কথায় কথায় ইনশাল্লাহ, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনের প্রযোজ্য আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তৃতা করে অনেক সময় সমবেত জনতাকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিতেন। মুসলমানদের বৈবাহিক অনুষ্ঠান ও ঈদুল আযহার সময় বাড়ী বাড়ীতে পেটপুরে গরুর মাংস ভক্ষণ করতেন। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ও বিপুল কর্মশক্তির অধিকারী এই মানুষটি থামতে জানতেন না। বাধা আসলে আরোও এগিয়ে চলতেন। দীর্ঘ বিশ্রাম বহনকারী আরামপ্রিয়ও ছিলেননা তিনি। কর্মহীন জীবন আর বিলাসের গৌরব কখনও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। জীবনের সংগ্রামে তিনি ফুটাতে চেয়েছিলেন একটি ফুটন্ত গোলাপ। সেবার সাধনায় যে গোলাপ হবে উজ্জল, শত কাঁটার লাঞ্ছনা সহ্য করেও জন্মগত অধিকার আদায়ের বাসনায় সেটি হবে আলোকিত এরকম একটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় সমাজ গঠনই ছিল তার অঙ্গীকার। ঈর্ষণীয় দৈহিক সৌন্দর্যের গঠন আর অগাধ মানসিক শক্তির অধিকারী এই নেতাকে ভাটি অঞ্চলের মানুষ অমিততেজী সিংহপুরুষ হিসেবেই জানেন।
প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে তিনি অন্যতম। দেশের গণমানুষ তাকে এক নামে চেনে ও জানে। আত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া ও আশা আকাক্সক্ষার কথা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারতেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের মূল আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চিন্তাধারার জীবন জোয়ার সৃষ্টি এবং পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থাকে সুসংহত করে সার্থক গণতন্ত্রের পথে পরিচালনার কাজে তিনি সর্বদাই নিয়োজিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে সংবিধানের বুকে কুঠারাঘাত করে খুনী মোস্তাকসহ সামরিক সরকাররা ক্ষমতা দখল করে তাঁকে নীতিচ্যুত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। উপ-রাষ্ট্রপতি, উপ-প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার ও আইনমন্ত্রীর প্রস্তাব দিয়েও তাকে সামরিক সরকারগুলো নীতিচ্যুত করতে পারেনি। মূলধারার সাথে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছেন সবসময়। দল পরিবর্তন করলেও তিনি কখনও নীতির পরিবর্তন করেননি। নিজেকে বিক্রি করে দেননি স্বৈরাচারী রাজনীতির মন্ত্রীত্ব গ্রহণ বা অন্য কোন লোভলালসার কাছে।
তিনি একজন চারণ রাজনীতিবিদ। বড় বড় রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তৃতা করা, রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ, আলোচনা এবং স্বীয় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক বিস্তৃতির ব্যপারে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সফর এর মধ্যে দিয়ে তিনি সীমাহীনভাবে নিয়োজিত ছিলেন। আইনজীবী হিসেবেও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। যার পক্ষ সমর্থন করতেন তার স্বার্থ রক্ষার তাগিদে আদালত কক্ষে তিনি আইনের যে ক্ষুরধার বাকযুদ্ধ পরিচালনা করতেন তা সত্যিই ছিল বিস্ময়কর। আইনের নির্ধারিত গন্ডীর মধ্যে নিজেকে সীমিত রেখেও তিনি যে বজ্রভাষায় বক্তৃতা করতেন তাতে গোটা আদালত কক্ষে এক অদ্ভুত আলোড়নের সৃষ্টি হতো বলে তার সমসাময়িক আইনজীবীরা জানান। তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক ফাঁকিবাজী বা লুকোচুরি বলতেও কিছু ছিল না। তিনি যা ভাবতেন এবং যা সত্য ও যুক্তিসঙ্গত মনে করতেন তা অকপটে বলার সৎসাহস তার ছিল। মাওলানা ভাসানীর মতো দেশে হক কথা বলার রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ও অন্যতম। প্রয়োজনে নিজ দলের বিরুদ্ধেও ন্যায় কথা বলতে তিনি দ্বিধাবোধ করেননি।
আজীবন স্রোতের প্রতিকূলে রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ একাধিকবারের বিরোধী দলীয় এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন উন্নয়নকামী রাজনীতিবিদও বটে। হাওর অধ্যুষিত বিশাল নির্বাচনী এলাকায় বিদ্যুতায়ন, পাকা সড়ক যোগাযোগ স্থাপন, স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদ মাদ্রাসা মন্দির ছাড়াও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনেক উন্নয়নের নজীরও রেখে গেছেন তিনি।
সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সংসদীয় রাজনীতির প্রিয় গণমানুষের একজন প্রাণের শাসক। আন্তরিকতা দিয়ে তিনি অন্যের মনকে কাছে টেনে নিতেন। একাজে আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কারো সাহায্য তাকে কখনও নিতে হয়নি। নিজেদের ক্ষমতা গদিকে টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানী করার প্রবণতার ঘোর বিরোধীও তিনি। বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টে প্রবর্তিত সকল কালাকানুনের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তিনি। ন্যায়নীতি, ন্যায়বিচার, আইনের অনুশাসন, মানবতা ও মানবীয় মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিচালনার পক্ষপাতি ছিলেন সবসময়। মূলত এ কারণেই সর্বজনীন গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর নিরলস সাধনা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ন্যায় তিনিও একজন প্রচারবিমুখ দানশীল মানুষ। ৮ম বারের এমপি হিসেবে সৎপথে থেকে সাধ্যমতো আয়ের সাথে সাথে দান করেছেন বদান্যতার সাথে। তাঁর নিকট যুক্তিসঙ্গত সাহায্য চাইতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছে এ রকম লোক কমই পাওয়া যাবে। তিনি কোন সময় তার নীরব দানের কথা অন্য কারও নিকট প্রকাশ করতেন না। আবার কাজ করে দিয়েছেন এরকম কম লোকই আছেন যারা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া নিবাসী প্রখ্যাত সাধক কবি, ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলনের বিপ্লবী নায়ক, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের মহান সংগঠক, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ৭০ এর নির্বাচনে স্বাধীনতার প্রতীক নৌকা ও জাতির জনকের পক্ষে গণসঙ্গীত পরিবেশনকারী নিবেদিত প্রয়াত মরমী কবি গানের স¤্রাট কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন) জীবনের শেষ গানে প্রিয় মানুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেয়েছেন,
“ভালমন্দ সব করে মালিকে দয়ার আছে কে।।
কেউরে ফকির কেউরে বাদশাহী কেউ ভক্তে পায় শাহানশাহী
কেউতো আল্লাহর রাহে চলছে দুনিয়াতে।।
কেউর পরনে শাড়ি ছিঁড়া কেউর পরনে ছিরা ত্যানা
জাত বাঁচেনা সম্মান কেমনে ঢাকে।।
কেউ ঘুমাইতে পায়না চাটি সর্বদায় বিছানা মাটি
বালিশ বানায় নিজের হাত দুইটিকে।।
কেউ থাকে কুঁড়ে ঘরে কেউ থাকে তেতালার উপরে
জাঁক মারতাছে দিয়া লেপ তোষকে।।
গিয়া ঢাকা শহরেতে পড়লাম টাকার সংকটেতে
মনের দুঃখ কইলাম সেনবাবুকে।
নিয়া বাবুর গাড়িতে ভর্তি করে দেন পিজিতে
অপারেশন করান এই লোকটিকে।।
আমার কত ভাগ্যের জোর আদায় করি খোদার শুকুর
বাঁচাইলেন কঠিন ব্যাধি থেকে।।
কয় কবি কামাল পাশা, অকূলে মুর্শিদ ভরসা
ধনপ্রাণ বিলাইবো মোর আল্লাকে”।।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন সুবক্তা। সংসদীয় দলের প্রতিনিধি দলনেতা হিসেবে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন অর্ধ দুনিয়া। সফল রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সার্বক্ষণিক সুযোগ্য পার্লামেন্টারিয়ান ছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রবিশেষে বিরোধীদলের ভরসাস্থল ছিলেন তিনি। উচিত কথায় সকল দলমতের মানুষকে তিনি সহজেই তার প্রতি আকৃষ্ট করতেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যেমন “নেতাকে যেমন দেখিয়াছি শীর্ষক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন,“জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে এত বেশী বিরল চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়াছিলো যে, তাহার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গেলে কয়েক খন্ড পুস্তক রচনার প্রয়োজন”। সুদীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর তাঁহার সংস্পর্শে থাকার ফলে আমার মনের কোনে তাঁহার যে ছবিটি অংকিত হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তাহা কোন সাধারণ মানুষের নহে। বরং একজন প্রায় অতি মহা মানবের”। অনুরূপভাবে একজন অনুসারী ¯েœহের পাত্র হিসেবে শ্রদ্ধেয় কাকা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপির ক্ষেত্রে আমার বক্তব্যও তাই। আমার ২৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় তাঁহার মধ্যে আমি যে,মানুষটির পরিচয় পেয়েছি তা থেকে বুঝতে পেরেছি একজন অসাধারণ অপ্রতিদ্বন্দ্বী অজেয় আলোকিত ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন তিনি।
ভারতের গণপরিষদে কংগ্রেসের বহু সংখ্যক বক্তার সামনে দাঁড়িয়ে মুসলিম লীগের পক্ষে যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একমাত্র বক্তা ছিলেন তেমনি ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সবকটি অধিবেশনে জাতির জনকের সামনে দাঁড়িয়ে একমাত্র বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে সারাদেশ তথা জাতির প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান ও বক্তা হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন সুনামগঞ্জের প্রাণপুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ৩০ লক্ষ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই সংবিধানের আদর্শ হবে স্বাধীনতা স্বায়ত্বশাসন ও গণতস্ত্র এবং এর মূলনীতি হবে সেই নীতি যে নীতির দ্বারা বাংলাদেশের জনগণই হইবে তাহাদের ভাগ্য নিয়ন্তা।
সাংবিধানিক রাজনীতির পথ ধরে দেশে শোসনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কাক্সিক্ষত স্বপ্নকে লালন করে আত্মবিশ্বাস আর ভালোবাসায় তিনি যে দীর্ঘ রাজনীতির পথ অতিক্রম করেছেন ৫ ফেব্র“য়ারী রবিবার ভোরে তার অকাল মৃত্যুতে সেই পথ কতটুকু পিচ্ছিল বা বাধাগ্রস্ত হবে সে প্রশ্ন আজ সকলের।
উল্লেখ্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭০ সালে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে সুনামগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকার (দিরাই-শাল্লা) প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এমপিএ, ১৯৭৯ সালে দোয়াত কলম প্রতীক নিয়ে একতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে, ১৯৮৬ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এনএপি ও ৮ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে, ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রী দলের মনোনয়নে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে নিজ আসন থেকে ৫০৫ ভোটে পরাজিত হলেও পরবর্তীতে হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে উপ-নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। এই সময় জাতীয় সংসদে ও সরকারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা পদে মন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে নিজ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনে ১০ বার সংসদ নির্বাচনে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ৮বার তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত এমপি হিসেবে বিশ্বব্যপী সুনাম অর্জন করেন। ২বার তাকে পরাজিত করানো হয় নানা ষড়যন্ত্র ও কুট কৌশলের আশ্রয়ে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশে প্রগতির রাজনীতিতে দুর্দন্ড প্রতাপে বিচরণকারী সপ্তম জাতীয় নেতা। সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য পদে দায়িত্ব পালন ছাড়াও এই দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামীলীগের পার্লামেন্টারী মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যও ছিলেন আমৃত্যু।
১৯৭০ সালের নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তার কাছে বঙ্গবন্ধুর তারবার্তা পৌছলে তিনি স্থানীয়ভাবে দিরাই শাল্লা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে কিছুদিনের মধ্যেই চলে যান ভারতীয় সীমান্ত টেকেরঘাট ও বালাটে। সেখানে গড়ে তোলেন ৫নং সাবসেক্টর। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে টেকেরঘাট সাবসেক্টর গঠন করে তিনি প্রথমে এই সাবসেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় এক হাজারেরও অধিক ছাত্র যুবককে সশস্ত্র ট্রেনিং দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণ করেন। দেশকে স্বাধীন ও শত্র“মুক্ত করতে নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে রণাঙ্গনে শত্র“র বিরুদ্ধে প্রকাশ্য লড়াই ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনী সভায় শাল্লা উপজেলার সভামঞ্চে, পরবর্তীতে দিরাই উপজেলা সদরে ও ঢাকায় আওয়ামীলীগের জনসভায় পর পর তিনবার গ্রেনেড বোমা হামলার শিকার হন তিনি। রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে এক বছরের ব্যবধানে মন্ত্রীত্ব থেকে তাকে সরে যেতে বাধ্য করা এবং তার উপর আনীত অপবাদকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন তার নির্বাচনী এলাকার জনগণ। দেশ জাতি ও দলের জন্য তার অপরিসীম ত্যাগ, ভালোবাসা ও সক্রিয় অবদান রাখার পরও তাকে উপযুক্ত মূল্যায়ন করেনি বলে দাবী দিরাই শাল্লাবাসীর।
পরিশেষে এটুকুই বলবো, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শুধু শুধু একটি নাম নয় একটি ইতিহাস,একটি জীবন্ত কিংবদন্তীর নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সাধনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সততা সাম্য উদার মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাণপুরুষ। সম্প্রীতির রাজনীতির মডেল মানুষ হিসেবে বাংলার আপামর জনসাধারণকে অন্যায় অত্যাচার, বঞ্চনা বৈষম্য ও শোসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে দখল করে নিয়েছেন মর্যাদার আসন। পার্লামেন্টারী রাজনীতির গুরু হিসেবে তার সফল অগ্রযাত্রা ছিলো। আন্তর্জাতিক রাজনীতির রোনাল্ডো, জাতীয় রাজনীতির হেডমাস্টার, আঞ্চলিক রাজনীতির চান্সেলর, উন্নয়নের রাজনীতির উজ্জল নক্ষত্র, ইতিবাচক রাজনীতির কিংম্যাকার, অভিজ্ঞতার রাজনীতির সোহরাওয়ার্দী, বিদ্রোহের রাজনীতির ভাসানী, সাহসের রাজনীতির শেরেবাংলা, জনপ্রিয়তার রাজনীতির জাতীয় নেতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির রাজা, ভাটি অঞ্চলের রাজনীতির সিংহপুরুষ এবং সর্বশেষ জাতির জনকের আদর্শে অণুপ্রাণিত বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেশপ্রেমিক খাঁটি বাঙালি রাজনীতিবিদ ইত্যাদি যে বিশেষণে বিশেষায়িত করা হউকনা কেন যোগ্যতার রাজনীতিতে তিনি সবসময়ই তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী অনুসরণীয়, অজেয় ও অনুকরণীয়। একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও চারণ সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সফলতাকে প্রেরণায়, তাঁর আলোয় সকলকে উদ্ভাসিত করতে সর্বোপরি তাকে জানার ও মানার মনোভাবকে সকলের মাঝে তুলে ধরার অভিপ্রায়ে আমি প্রকাশ করেছিলাম, “জননেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টেরিয়ান” আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটি। তিনি যে সংসদে দাঁড়িয়ে একদিন বলেছিলেন, আজীবন এই সরকারকে মানুষ মনে রাখবে। আমি মনে করি সুরঞ্জিত সেন গুপ্তও আজীবন বাংলার জনগণের হৃদয়ের মণিকোঠায় অমর হয়ে থাকবেন। আজ যোগাযোগ মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মুখে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত নাম্বার ওয়ান পার্লামেন্টারিয়ান কথাটি শুনে আমার অসম্ভব ভাল লেগেছে। আমি এ মহান নেতার বিদেহী আত্মার শান্তি ও তাঁর শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।

বিশ্বের দেশে দেশে ভাষাতত্ত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

পৃথিবীতে কত ভাষা আছে? তিন হাজার না তার চেয়ে বেশি? পৃথিবীর এই হাজার হাজার ভাষা আর তাদের অসংখ্য উপভাষাগুলোর উদ্ভব কি একটি আদিম ভাষা থেকে? ঐ সব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষা কোনগুলো, তাদের বয়স কত, কোন আদিম ভাষা কখন কোন অঞ্চলে কোন মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল? এসব প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর আমরা দিতে পারব না, কারণ অনেক অনুসন্ধান করেও সব কথা জানা যায়নি। কত ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে কে জানে? আর তার সাথে সাথে কত মানুষের কতো চিন্তা, কত ভাবনা, কত অভিজ্ঞতা? সভ্যতার যেমন উত্থান আছে পতন আছে ভাষারও হয়তো তেমনি কিন্তু অনেক সভ্যতা, অনেক জাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথচ তাদের ভাষা ধ্বংসে হয়ে যায়নি, আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতার স্মৃতিকে বহন করে টিকে আছে কোন কোন ভাষা, তবে একটি ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলে একটি জাতিও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
একটি ভাষা বলতে আমরা কি বুঝি? ভাষা বলতে আমরা বুঝি ছোট বা বড় একটি জনসমষ্টির ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম বা মৌখিক যোগাযোগের বাহনকে। পুঁথির ভাষা তো মুখের ভাষাকে ধরে রাখারই প্রয়াস মাত্র। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এমন অনেক ছোট ছোট ভাষাগোষ্ঠী আছে যাদের সদস্য সংখ্যা কয়েকশতের বেশি নয় এবং দ্রুত ঐসব ভাষা অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বা মৃত ভাষায় পরিণত হতে চলেছে। আবার এমনও দেখা যায় যে ক্ষুদ্র একটি অঞ্চলের ভাষা পৃথিবীর বিরাট অংশ জুড়ে আধিপত্য করছে। যেমনÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের ভাষার একক আধিপত্য। ভাষার পৃথিবী এক আশ্চর্য পৃথিবী কারণ ভাষার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক, ধর্মীয়, জাতীয় সীমারেখা নেই, একই ভাষা বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন জাতির মাতৃভাষা হতে পারে আবার একটি ভাষা কেবল একটি দেশের একটি জাতির, একটি ধর্মের মানুষের ভাষাও হতে পারে।
ভাষা ও জাতীয়তা সর্বদা একাত্ম নয় তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা সম্পর্কিত হতেও পারে। যে জাতি বিজাতি দ্বারা বিজিত ও শাসিত সে জাতির ভাষা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বঞ্চিত। অনেক সময় সে ভাষা বিদেশি শাসক দ্বারা অবদমিত অথচ হয়তো সেই অবহেলিত ও নিষ্পেষিত ভাষাই ঐ জাতির সংস্কৃতি এবং জাতীয় অধিকারের প্রতীক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা আমরা দেখেছি। অন্য দেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে। দেশ বিভাগের সময় পোল্যান্ড এবং রুশ জারের অধীনে ফিনল্যান্ড ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঐতিহাসিক ঘটনা। আবার একই ভাষা একাধিক জাতির জাতীয় ও মাতৃভাষা হতে পারে। স্প্যানিশ বিজয়ে ফলে দক্ষিণ আমেরিকার বহু রাষ্ট্র এবং মধ্য আমেরিকার মেক্সিকোতে স্প্যানিশ ভাষা সে মর্যাদা পেয়েছে। একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার অধীনস্ত একটি রাষ্ট্রে আবার একাধিক ভাষা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করতে পারে, সুইটজারল্যান্ডে ফরাসি, জার্মান ও ইটালীয় ভাষা, বেলজিয়ামে ফ্লেমিশ এবং ফরাসি ভাষা, কানাডায় ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা যে মর্যাদার অধিকারী।
ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মধ্যে সীমারেখা কিন্তু সর্বদা স্পষ্ট নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে নরওয়ে ডেনমার্কের অধীনে ছিল বলে ডেনো-নরওয়েজিয়ান নামে যে সাহিত্যিক ভাষাটি গড়ে উঠেছিল, তা ঐ দুই দেশের সাহিত্যকর্মেই ব্যবহৃত হতো, বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেন যে ভাষায় তার বিখ্যাত নাটকগুলো রচনা করেছিলেন। আজও একজন সুদক্ষ ডেনমার্কবাসী একজন নরওয়েজিয়ানের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে পারেন। নরওয়ে ডেনমার্ক থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করলে দুই দেশের ভাষার বিকাশ ঘটে স্বাধীনভাবে ফলে আধুনিক নরওয়ে ও ডেনমার্কের ভাষা আলাদা কিন্তু ভাষা দুটি বিবর্তনের ইতিহাসে যথার্থই স্বতন্ত্র কিনা সে প্রশ্ন উঠতে পারে। বেলজিয়ামের জার্মানভাষীদের ফ্লেমিশ এবং হল্যান্ডের ডাচ ভাষা নিয়েও একই প্রশ্ন তোলা চলে। একজন ফ্লেমিশভাষীর পক্ষে হল্যান্ড গিয়ে কথাবার্তা চালাতে কোনো অসুবিধে নেই। স্পষ্ট রাজনৈতিক সীমারেখা থাকা সত্ত্বেও ঐসব ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিক সীমারেখা অস্পষ্ট।
একই অঞ্চলে একই ভাষার মধ্যে ভৌগলিক বৈচিত্য উপেক্ষণীয় নয়, ভাষার এই বৈশিষ্ট্যকেই আমরা উপভাষা বলে থাকি। বিস্তীর্ণ ভূখন্ডে সম্প্রসারিত একটি ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক পার্থক্য কখনো-কখনো ব্যাপক। স্কটল্যান্ড ও গ্রেট ব্রিটেনের ভাষার কথা ধরা যাক। স্কটল্যান্ডের একটি স্থানীয় ও নিজস্ব সাহিত্যিক ভাষা আছে, এ ভাষা ইংল্যান্ডের শিষ্ট ইংরেজি ভাষা থেকে পৃথক। চতুর্দশ শতক থেকে বর্তমান কাল অবধি বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিক ঐ ভাষা ব্যবহার করে আসছেন; ঐ ভাষার নিজস্ব অভিধানও রয়েছে। স্কটিশ উচ্চভূমিতে প্রাচীন কেল্টিক ভাষার অস্তিত্বের কারণেই স্কটল্যান্ডের ভাষায় ঐ পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান প্রভাবের ফলে অ্যাংলো-স্যাক্সন উপভাষাগুলো তাদের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিল। এখন প্রশ্ন হলো স্কটিশ ভাষা কি একটি স্বতন্ত্র ভাষা না ইংরেজি ভাষার অন্তর্গত একটি উপভাষা? উত্তরাঞ্চলের ভাষার সঙ্গে ইংল্যান্ডের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার গভীর যোগসূত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের পার্থক্য উপেক্ষণীয় নয়। রবার্ট বার্নস বা আলেকজান্ডার গ্রে-র কবিতায় ঐ বিশেষ ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বস্তুত, ভাষা এবং উপভাষার মধ্যে সীমারেখা টানা সর্বদা সম্ভবপর নয়। যখন একই ভাষা কিছু পার্থক্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন মানুষের মুখের ভাষারূপে গৃহীত হয় তখন ভাষাগত ঐক্যের কথা বলা চলে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ভাষার সঙ্গে দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সঙ্গতি থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। উপরি-উক্ত পটভূমিকায় আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার পরিচয় দেবার চেষ্টা করবো।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা ” ইউরোপের প্রায় সমগ্র এবং এশিয়ার অনেকটা জুড়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠী প্রচলিত। খ্রিস্টের জন্মেরও কয়েক হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়া থেকে উদ্ভুত হয়ে যে ভাষা একদিকে ইউরোপে এবং অন্যদিকে পারস্য ও ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় পারস্য ও ভারতবর্ষে আগত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার দুটি শাখার মধ্যে এতই সাদৃশ্য ছিল যে তাদের ইন্দো-ইরানীয় বলা হতো। পরে ঐতিহাসিক কারণে কালের বিবর্তনে পারস্য ও ভারতবর্ষে আগত ভাষার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বিকাশ ঘটে। ইরানীর শাখার আধুনিক বিবর্তন ফারসি, ভারতবর্ষে আগত ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-ইরানীয় ভাষার নাম ইন্দো-আর্যভাষা। আর্য-ভাষার প্রাচীন রূপ বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষায়, মধ্যরূপ পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় আর আধুনিক রূপ পাঞ্জাবি, সিন্ধি, রাজস্থানি, মারাঠি, গুজরাটি, সিংহলি, হিন্দি-উর্দু বা হিন্দুস্তানি, উড়িয়া, বাংলা, আসামি ইত্যাদি ভাষা।
প্রাচীন ভারতবর্ষের ভাষার সঙ্গে আশ্চর্য সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় লিথু ও লেটিশ নামক একজোড়া উত্তর-মধ্য ইউরোপীয় ভাষার, এই দুটি ভাষা নিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর বাল্টিক শাখা গঠিত। বাল্টিকের প্রতিবেশী শাখা স্লাভিক, এই স্লাভিক শাখার ভাষাগুলো পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার বি¯তৃত অঞ্চলে ছড়ানো। পোলিশ, চেক, স্লোভাক ভাষা নিয়ে পশ্চিম স্লাভিক, বুলগেরীয়, সার্বো-ক্রোশীয় নিয়ে দক্ষিণ স্লাভিক বা বলকান রুশ ভাষা নিয়ে পূর্ব স্লাভিক উপশাখা গঠিত। রুশ ভাষা স্লাভিক ভাষাগুলোর মধ্যে সর্বাধিকম প্রচলিত। ইন্দো-ইরানীয় ও আর্য, বাল্টিক এবং স্লাভিক শাখা নিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর শতম শাখা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হেলেনিক, পুরাতন এথেন্স নগরীর সভ্যতার ভাষা এটিক এ-ভাষারই অন্তর্গত। হেলেনিক শাখার গ্রিক ভাষা দীর্ঘদিন পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগের বাহন ছিল। সাহিত্য ও সভ্যতার বাহন হিসেবে গ্রিক ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ইতালিক ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর আর একটি উল্লেখযোগ্য ভাষা, গ্রিসের মতো প্রাচীন ইতালির ভাষাও বিভিন্ন উপভাষার সমন্বয়, যার একটি ওসকান আর একটি উমব্রিয়ান; কিন্তু ইতালীয় উপভাষাগুলোর মধ্যে লাতিন আর সব উপভাষাকে ছাড়িয়ে কেবল ইতালিতেই নয় সমগ্র বিশ্বে সঙ্গত করণেই খ্যাতি অর্জন করেছে। লাতিন কেবল অমর সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবেই নয় সঙ্গে সঙ্গে বিশাল রোমক সাম্রাজ্যের সরকারি ও সামরিক ভাষা হিসেবেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। প্রাচীন বা ক্লাসিকাল লাতিন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষারূপে আর চলিত লাতিন সাধারণ সৈনিক, ব্যবসায়ী ও উপনিবেশ স্থাপনকারীদের ভাষা হিসেবে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঐ ভাষাই কালের বিবর্তনে বর্তমানকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাতীয় ভাষায় পরিণত হয়। রুমানীয়, ইতালীয়, ইতালি, পর্তুগিজ, স্পেন, ফ্রান্স-এর ভাষা রোমান্স শাখাভুক্ত; আধুনিক রুমানীয়, ইতালীয়, পর্তুগিজ, স্প্যানিস এবং ফরাসি ভাষা যার নিদর্শন। স্প্যানিস ভাষা আবার দক্ষিণ বা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে আর পর্তুগিজ ভাষা ব্রাজিলে বিস্তারিত।
ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর জার্মানিক শাখাও বহুল বি¯তৃত। আইনল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইটজারল্যান্ড, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতে এই শাখার ভাষাগুলো জাতীয় ভাষা। ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর কেল্টিক শাখা এক সময়ে চেকোস্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ জার্মানি, উত্তর ইতালি, ফ্রান্স এবং বিট্রিশ দ্বীপপুঞ্জে চালু ছিল। আজও এ ভাষার স্বাক্ষর পাওয়া যায় আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে, স্কটল্যান্ডের উত্তর উচ্চ ভূমিতে, ওয়েলস্-এ আর ফ্রান্সের ব্রিটানিতে। ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর দুইটি শাখা আলবেনীয় এবং আরমেনীয় আজও জীবিত ভাষা কিন্তু হিট্টি আজ একটি মৃত ভাষা।
ফিনো-উগ্রিক এবং বাস্ক : ইউরোপের ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠী বহির্ভূত ফিনিশ, ইস্টোনীয় এবং হাঙ্গেরীয় ভাষা ফিনো শাখাভুক্ত আর ল্যাপিস, পারসিয়ান ও উত্তর সাইবেরিয়ার স্যামোয়েড ভাষা উগ্রিক শাখাভুক্ত। বাস্ক ভাষা স্পেন ও ফ্রান্সে প্রচলিত।
সেমেটিক-হামিটিক : সেমেটিক ভাষা পুরাতন বিশ্বের আশিরীয় এবং ব্যাবিলোনীয় সভ্যতার বাহন ছিল। বাইবেলের পুরাতন টেস্টামেন্টের ভাষা হিব্র“ সেমেটিক শাখার। আরবি ভাষাও সেমেটিক শাখাভুক্ত, পবিত্র কোরআন শরীফের, ইসলাম ধর্মের এবং বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। হামিটিক ভাষা প্রাচীন মিসরের আর আধুনিক হামিটিক ভাষা উত্তর ও মধ্য আফ্রিকায় প্রচলিত। ইথিওপিয়ার আবিসিনিয়ার ভাষা এ শাখাভুক্ত।
আল্টাইক এবং পোলিও-সাইবেরীয় : মধ্য এশিয়ার আল্টাই পার্বত্য অঞ্চল থেকে উদ্ভুত এ গোষ্ঠীর শাখা তুরস্কের তুর্কি ভাষা এবং মঙ্গোল তুঙ্গুজ ভাষা। সাইবেরিয়ার উত্তর পূর্বের ইয়াকুত ভাষা, সাইবেরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের কাজাক, উজবেক এবং তুর্কমেন ভাষাও এ শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সিনো-টিবেটান : চীনা ভাষা এ গোষ্ঠীর প্রধান শাখা, পৃথিবীর বৃহত্তম জনগোষ্ঠী চীনা ভাষাভাষী। চীনা ভাষাকে অবশ্য অনেকে একটি মাত্র ভাষা না বলে কয়েকটি ভাষা বলেছেন কারণ চীনের এক অঞ্চলের মানুষ আরেক অঞ্চলের ভাষা বুঝতে পারেন না। তবে চৈনিক লিখন প্রণালী চীনা ভাষার ঐক্য ও যোগসূত্রের বাহন। তিব্বতি ও বার্মি ভাষা চীনা ভাষার সঙ্গে বংশগতভাবে সম্পর্কিত, এসব ভাষার শাখা-প্রশাখা ভারতীয় উপমহাদেশ ও চীনের মধ্যবর্তী ভূখন্ডে বা ইন্দো-চীনে প্রচলিত। কোরীয় ভাষার সাদৃশ্য রয়েছে তিব্বতি ও বার্মি ভাষার সঙ্গে জাপানি ভাষার লিখন প্রণালী চীনা লিখন প্রণালীর মতোই যদিও জাপানি ভাষার ইতিহাস পৃথক। মালয়-পলিনেশীয় ভাষা মাদাগাস্কার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বি¯তৃত। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের ভাষা আবার ভিন্ন বংশজাত। ভারতে আর্য ভাষা বহির্ভূত ভাষা গোষ্ঠী হলো দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠী, তামিল, তেলেগু, কানাড়া, মালায়ালাম এ শাখার ভাষা। ককেশাস ভাষা ককেশাসের পার্বত্য অঞ্চলে প্রচলিত, জর্জিয়ান ভাষা এ শাখাভুক্ত।
আফ্রিকার ভাষা : উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে পূর্ব আফ্রিকার গিনি উপসাগর পর্যন্ত বি¯তৃত অঞ্চলের বহু ভাষা সুডানিজ-গিনি শাখাভুক্ত। আরো দক্ষিণ ভাগে প্রচলিত বান্টু শাখা, যে শাখার ভাষাগুলো মধ্য আফ্রিকার বি¯তৃত অঞ্চলে ছড়ানো। দক্ষিণ আফ্রিকার আঞ্চলিক ভাষাগুলো খোইন নামে পরিচিত, এর দুটি শাখা-একটি বুশম্যান অপরটি হটেনটট।
আমে রেড ইন্ডিয়ান ভাষা : পশ্চিম গোলার্ধের প্রাচীন ভাষাসসমূহকে ইদানীং আমে রেড ইন্ডিয়ান ভাষা বলা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার কানাডার উত্তর থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বি¯তৃত অঞ্চলে পশ্চিমী উপনিবেশ স্থাপনের পূর্বে আদিবাসীদের বা রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে প্রচলিত অসংখ্য ভাষা মোটামুটিভাবে ছয়টি শ্রেণিতে বিন্যস্ত। এক্সিমো-এলিউশিয়ান শাখা এলিউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর কানাডা এবং গ্রীণল্যান্ডে প্রচলিত। এলগোনকুইন-ওয়াকাশ শাখা- দক্ষিণ কানাডা ও উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূভাগে ছড়ানো ছিল। হোকা-সিউ শাখা- উত্তর আমেরিকা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বি¯তৃত। না-দেনে শাখা-পশ্চিম কানাডা ও আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের ভাষা। পেনুশিয়া শাখা-ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ওরিগন এবং ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের ভাষা। উটো-আজটেক শাখা-পশ্চিম আমেরিকা, মধ্য মেক্সিকো এবং পানামা পর্যন্ত সম্প্রসারিত।
উপরোল্লিখিত রেড ইন্ডিয়ান ভাষাগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল উটো-আজটেক ভাষা গোষ্ঠী। এ গোষ্ঠীর নাহুয়াটল ভাষা আজটেক সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রভাষা ছিল। দক্ষিণ মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ভাষা ছিল মায়া-সোকো, মায়া সভ্যতার ভাষা। আরওয়াক শাখা এন্টিলেসে প্রচলিত ছিল এবং এ শাখার ভাষা এক সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ জুড়ে ছিল। কারিব ছিল আমাজনের উত্তরাঞ্চলের ভাষা আর কিচুয়া পেরুর ইন্কা সভ্যতার ভাষা। আজটেক, মায়া এবং ইন্কা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সমৃদ্ধ প্রচীন সভ্যতা।
পৃথিবীর ভাষাসমূহের উপরি-উক্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে বোঝা যায়, এ বিশ্বে বিচিত্র ও অসংখ্য ভাষা প্রচলিত, কতো ভাষা বিলুপ্ত আবার কতো ভাষা বি¯তৃত ভৌগলিক অঞ্চলে বিপুল মানব গোষ্ঠীতে প্রাসারিত। ভাষা বিস্তারের প্রধান উপায় যেমন এক ভাষাভাষী জাতি কর্তৃক অপর ভাষাভাষী অঞ্চল বিজয় তেমনি ভাষা বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ এক ভাষাভাষী জাতির কাছে অপর ভাষাভাষী জাতির পরাজয়। বিজয়ী এবং বিজিত জাতির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল বিজয়ী ও বিজিত জাতির ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিবর্তন, বিশেষত বিজিত ভাষার ভবিষ্যৎ। বর্তমানে বিভিন্ন পাশ্চাত্য উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করে তাদের উপেক্ষিত, অনাদৃত, অবহেলিত ভাষাসমূহকে দ্রুত উন্নত করার কাজে ব্যাপৃত। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে বর্তমানে জাতীয় ভাষাগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে আদৃত হয়েছে। এসব দেশে বোধগম্য কারণেই ভাষা জাতীয় স্বাধীনতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদাবোধের প্রতীক। বাংলাদেশেও বাংলা ভাষা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদাবোধের প্রতীক।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

এক নজরে সিলেটের প্রাচীন জৈন্তা রাজ্যের ইতিবৃত্ত

মোহাম্মদ মোশতাক চৌধুরী

জৈন্তা বা জৈন্তিয়া একটি অতি প্রাচীন স্বাধীন ও সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। বর্তমান সিলেট জেলার উত্তর পূর্বাংশে জৈন্তাপুর উপজেলা, কানাইঘাট উপজেলা, গোয়াইনঘাট উপজেলা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দুটি ইউনিয়ন সমেত সমতল ভূমির ১৭ পরগণা, সমগ্র জৈন্তিয়া পাহাড় এবং আসামের নওগ^া জেলার কিয়দাংশ নিয়ে এই রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন এ রাজ্যের গোড়াপত্তন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। কারো কারো মতে, একদশ শতাব্দীতে জৈন্তিয়ায় কামদেব নামক এক নৃপতি রাজত্ব করতেন বলে জানা যায়। তবে এর অফিসিয়েল লিখিত কোন ইতিহাস গ্রন্থ বা দলিল না থাকায় কিংবদন্তি ও জনশ্র“তি এবং পরবর্তীতে আব্দুল আজিজ গং লিখিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে জানা যায় যে, প্রথমে হিন্দু নৃপতিদের দ্বারা এ রাজ্য শাসিত হত। হিন্দু নৃপতি গণ যথাক্রমে ০১) কেদাশ্বর রায়, ২) ধনেশ্বর রায়, ৩) কন্দর্প রায়, ৪) জয়ন্ত রায়। তবে এদের শাসনকাল সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়নি। একাদশ শতাব্দীতে কামদেব নামক এক রাজা শাসন করেছিলেন বলে জানা যায় এবং তাকে জৈন্তা রাজ্যের প্রথম শাসক বা রাজা হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ার কারণে একাদশ শতাব্দীতে জৈন্তা রাজ্যের উৎপত্তি বলে ধরে নেওয়া হয়। জৈমিনি মহাভারত গ্রন্থের উদ্ধৃতি অনুসারে এ রাজ্যের বয়স প্রায় পাঁচ হাজার বছর। কোন কোন গবেষকদের মতে, প্রথমে যে ৪-জন হিন্দু রাজার নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রাজা জয়ন্ত রায় প্রথম এ রাজ্যে রাজত্ব করেন বলে জানা যায় এবং তার নামানুাসারেই অর্থাৎ জয়ন্ত থেকে পরিবর্তিত হয়ে জৈন্তা মতান্তরে জৈন্তিয়া নামের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ঘটে। মিষ্টার গেইট লিখিত আসামের ইতিহাস গ্রন্থেও এ ধরণের বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে।
প্রাচীন জৈন্তা রাজ্যের রাজধানী ছিল খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের নরতিয়াং নামক স্থানে। পরবর্তীতে রাজা লক্ষ্মী নারায়ণের সময় ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা সদরের নিজপাট নামক অঞ্চলে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। রাজ্যের রাজকীয় প্রতীক হিসেবে সিংহের প্রতিমূর্তি ব্যবহার করা হতো। জৈন্তা রাজ্যের আলাদা মুদ্রা ছিল। জৈন্তা রাজা কর্তৃক ১৫৮৫ খ্রিষ্ঠাব্দে ভারতের অহম রাজ্যের রাজাকে লিখা এক চিঠির বক্তব্য অনুসারে জৈন্তা রাজ্যের ভাষা ছিল “বাংলা”। এ রাজ্যের প্রাচীন রাজধানীতে এখনো অনেক প্রত্মতাত্ত্বিক নির্দশন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেঘালিথিক পাথর। যাহা দৈর্ঘ্যে ৭-৮ ফুট এবং প্রস্থে ৩-৪ ফুট এবং এগুলোর পেছনে দাড়ানো অবস্থায় ৮-১০ ফুট লম্বা চোখা আকৃতির পাথর রয়েছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে যে এতো বিশাল আকারের পাথর দেশের কোথাও আছে কি না সন্দেহ। এগুলোর মধ্য থেকে কমপক্ষে একটি পাথর ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে। আমি এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
প্রাচীন জৈন্তা রাজ্যের অফিসিয়েল কোন লিখিত তথ্যাদি বা ইতিহাস অপ্রতুল হওয়ায়, অনুসন্ধানীরা ও গবেষকরা জনশ্র“তি, শিলালিপি, শিলাস্মৃতি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যের বিভিন্ন গ্রন্থাদি পর্যালোচনা করে ইতিহাসে এ রাজ্যের স্থান করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং বর্তমানেও তা চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান ও গবেষণা থেকে পরিলক্ষিত হয়ে যে, জৈন্তরাজ্যের শৌর্যবীর্য এবং প্রশাসনিক কাঠামো সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। বলা যেতে পারে মোগলরা যখন সমস্ত উপমহাদেশে তাদের শাসন-শোষণ অব্যাহত রেখেছিল তখনও জৈন্তা রাজ্যের সিংহপুরুষরা জৈন্তা রাজ্য স্বাধীন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাছাড়াও দীর্ঘদিন ব্যাপী শিয়ালের মত ধূর্ত ইংলিশরা উপমহাদেশের সমস্ত এলাকা দখলে নিলেও জৈন্তা রাজ্য কাবুতে নিতে পারে নি।
সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইংলিশ রবার্ট লিন্ডসে তার আত্মজীবনী গ্রন্থে জৈন্তা রাজ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের সীমান্তের নিকটতম প্রতিবেশী জৈন্তা রাজ্যের খাসিয়া রাজা ছিলেন বেশ সুসভ্য এবং শক্তিশালী। উল্লেখ্য যে, ইংলিশ প্রতিনিধি রাবার্ট লিন্ডসে সিলেটের রেসিডেন্ট হিসেবে ১৭৭৮ খ্রিষ্ঠাব্দে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৭৭৮ থেকে ১৯৩৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত বহুবার জৈন্তা রাজার সৈন্যদের সাথে ইংলিশরা যুদ্ধে লিপ্ত হয় কিন্তু কখনো পরাজিত করতে পারেননি। অবশেষে ১৮৩৫ খ্রিষ্ঠাব্দে রাজা ইন্দ্র সিংহকে বন্দি করে কপট মিথ্যাবাদি ইংলিশরা রাজ্যটি দখল করে নেয় এবং এর সাথে সাথে জৈন্তার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয় এবং রচিত হয় এক কালো অধ্যায়ের।
জৈন্তা রাজ্যের এক অনন্য কিংবদন্তী হল সমতল ভূমির ১৭ পরগণার সালিশ কমিটি বা কমিটমেন্ট, যা আজো সামাজিক ন্যায়বিচার আচারের কাজে ও ঝগড়া বিবাদ মীমাংসার কাজে প্রতীয়মান হয়। এতদঅঞ্চলে কোন সমস্যা বা ঝগড়াঝাটি হলে ১৭ পরগণার মুরব্বিরা বসেই সমাধান করে দিতেন এবং সকলেই বিনা বাক্যে তা মেনে নিতো, এখনো বিভিন্ন সময়ে তা প্রতীয়মান হয়। সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এমন প্রত্যয় বিরলই বলা চলে। বিভিন্ন লেখকের লেখা থেকে ২৩-জন রাজার নাম সংগ্রহ করা গেছে। তারা হলেন:
১। রাজা পর্বত রায়, ২। রাজ মাঝ গোসাই, ৩। রাজা বুড়া পর্বত রায়, ৪। রাজা প্রথম বড় গোসাই, ৫। রাজা বিজয় মানিক, ৬। রাজা ধন মানিক, ৭। রাজা যশো মানিক, ৮। প্রতাপ রায়, ৯। রাজা সুন্দর রায়, ১০। ছোট পর্বত রায়, ১১। রাজা যশোমন্ত রায়, ১২। রাজা বান সিংহ, ১৩। রাজা প্রতাপ সিংহ, ১৪। রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ, ১৫। রাজা রামসিংহ, ১৬। রাজা জয়ন্ত নারায়ণ, ১৭। রাজা দ্বিতীয় বড় গোসাই, ১৮। রাজা চত্র সিংহ, ১৯। রাজা যাত্রা নারায়ণ সিংহ, ২০। রাজা বিজয় সিংহ, ২১। রাজা লক্ষ্মী সিংহ, ২২। রাজা দ্বিতীয় রাম সিংহ, ২৩। রাজা ইন্দ্র সিংহ।

লেখক :লেখক ও কলামিস্ট।

ইসলামী ঐক্য : প্রসঙ্গ ফুলতলীর পীরছাহেব (র.)

Fultoli+Saheb-aমুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী

‘ফুলতলী’ বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ জকিগঞ্জের একটি স্থানের নাম। এই স্থানেই জন্মগ্রহণ করেছেন প্রখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্ব কোরআন শরীফের একনিষ্ঠ খাদেম হযরত মাওলানা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (র.)। মূলত তাঁকে কেন্দ্র করেই ‘ফুলতলা’ থেকে ফুলতলী শব্দটির উৎপত্তি।  আজকের সময়ে ‘ফুলতলী’ শব্দটি বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি লাভ করেছে, তাকে কেন্দ্রকরেই। তাই ‘ছাহেব কিবলা ফুলতলী’ একটি নাম, একটি ইতিহাসই নয়, ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। ১৯১৩ সালে এই ফুলপ্রস্ফুটিত হয়ে সিলেটসহ বিশ্বভুবনকে করে তুলে আলোকিত। ফুলতলীর পীরসাহেব (র.) ঐতিহ্যগত দিক দিয়েও ছিলেন একজন সম্মানী খান্দানের সুযোগ্য উত্তরসূরী। মহান দরবেশ হযরত শাহজালাল (রহ.) এর বংশীয় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আধ্যাত্মিক, সিয়াসি ও কোরআনী শিক্ষার দিক দিয়ে তিনি শহীদে বালাকোট হযরত সৈয়দ আহমদ বেরলভী (র.) এর বিপ্লবী চেতনার অধিকারী। এছাড়া উপমহাদেশ থেকে বৃটিশ বিতাড়ণ আন্দোলনে মরহুম ফুলতলী (র.) বিপুল অবদান রেখে গেছেন। তবে আমার নিকট তাঁর জীবনের সবচাইতে বেশী প্রভাব বিস্তারকারী বিষয় হলো দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া। যা বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও আলোকিত একটি সংগঠনে রূপ নিয়েছে। যার পরশে লাখো বদি আদম পবিত্র কোরআনের বিশুদ্ধ তেলাওয়াত শিখেছেন। আমি ২০০০ সালে সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদরাসা থেকে দারুল ক্বিরাতের ছাত্র হিসেবে রাবে জামাতের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে সুবহানীঘাট কেন্দ্রে যাওয়ার পরে সর্বপ্রথম ফুলতলী (র.) কে প্রথম দেখি।  সম্ভবত একই বছর তিনি লন্ডনের একটি সংস্থা কর্তৃক “শামসুল উলামা’’ উপাধি পেয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করার দিন ‘কাফেলায়ে লতিফিয়া, সিলেট সদর’ এর আহবায়ক হিসেবে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনায় গিয়েছিলাম। সেদিন তাকে সরাসরি দেখা সম্ভব হয়নি। পবর্তীতে সুবহানীঘাট ইয়াকুবিয়া মাদরাসা ও দক্ষিণ সুরমার মোমিন খলায় তাকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো। ২০০১ সালে শাবিপ্রবির হল নামকরণ বিরোধী আন্দোলনে আল্লামা নুর উদ্দীন আহমদ গহরপুরী, এম সাইফুর রহমানসহ সিলেটের বিশিষ্ট জনের সাথে একই কাতারে দেখেছি ফুলতলী (র.)কে।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের পর ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা চরম ভাবে পরাজিত হয়। ফলে স্তিমিত হয়ে পড়ে আজাদী আন্দোলনের অগ্রযাত্রা। এ বিপর্যয় মুসলমানদের চরম হতাশ করেছিল। এরপর আঠারো শতকে মুসলমানদের ঈমান আকীদা রক্ষা আর বৃটিশদের গোলামীর জিঞ্জির ভাঙতে সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভী হুঙ্কার ছাড়েন। তাঁর ডাকে মুসলমানরা একত্রিত হয়। শুরু হয় আজাদীর আন্দোলন। এক পর্যায়ে বালাকোটের ময়দানে ১৮৩১ সালে শহীদ হন সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.)। তবে রয়ে যায় বালাকোটের জিহাদী চেতনা। এই চেতনাকে ধারণ করেই পরবর্তীতে উপমহাদেশে মুক্তির আন্দোলন ত্বরান্বিত হয়েছিল। এ চেতনাই পরবর্তীতে মুসলমানদের সকল আন্দোলন সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আজকের সময়ে যারা শহীদে বালাকোট ও ফুলতলী (র.) এর অনুসারী বলে আমরা যারা দাবী করি তাদের উচিত পূর্বসূরীদের আদর্শ অনুসরণে বালাকোটের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সর্বপ্রকার বাতিল অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ওহাবী, দেওবন্দি আর ফুলতলী বলে বিচ্ছিন্ন থাকলে চলবে না, অতীতের আকাবির বুর্যুগদের পথ অনুসরণ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা বিশ্বাসীদের একই মঞ্চে এসে দাঁড়াতে হবে। আর না হয় আহলে হাদীস, লা-মাযহাবী ফেতনাসহ বহুমুখি ইসলাম বিদ্বেষী, নাস্তিক্যবাদ আমাদেরকে আবারো পরাধীনও ধর্ম-কর্মহীন করে তুলবে! তাই সময় থাকতে সচেতন হতে হবে। আজ যদি ফুলতলীর পীর সাহেব জীবিত থাকতেন আমার বিশ্বাস তিনি জাতিকে নাস্তিক্যবাদী ফেতনা থেকে সজাগ থাকার জন্য মহা ঐক্যের ডাক দিতেন। কিন্তু তিনি পৃথিবীতে নেই, তাই তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরীদেরকেই সেই রাহবরের ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না-২০০৫ সালে টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (র.) এর ডাকে আহূত ঐতিহাসিক লংমার্চে মরহুম ফুলতলী (র.) সর্মথন দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে তিনি যে কাজ করতে আগ্রহী সেই প্রমাণ দেখিয়ে গেছেন। এছাড়া শাবিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নামে হলের নামকরণ বিরোধী আন্দোলন, ইরাকে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে সম্মিলিত আন্দোলনে মরহুম খতীব মাওলানা উবাযদুল হক (র.), মাওলানা নুর উদ্দীন আহমদ গহরপুরী, মাওলানা শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (র.), ফখরে মিল্লাত মুহিউদ্দীন খান (র.) এর সাথে একই মঞ্চে দেখা গেছে।
এ সম্পর্কে জমিয়ত নেতা অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ১৯৯৪ সালে তসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশ যখন উত্তাল। সিলেটসহ সারা দেশ আন্দোলন তুঙ্গে, তখন সর্বদলীয় উলামায়ে কেরামের এক যৌথ প্রতিবাদ সভা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিলেটস্থ ফুলতলী সাহেবের বাসভবনে এক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ইমামে মদনী ছদরে জমিয়ত আল্লামা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া উপস্থিত ছিলেন। এ সময় হযরত ফুলতলীরপীর সাহেব শায়খে কৌড়িয়াকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘ভাইসাহেব, আমার বাড়ীতে যাওয়ার দাওয়াত গ্রহণ করেন।’ তখন শায়খে কৌড়িয়া সানন্দে দাওয়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তী বৃহস্পতিবার হযরত শায়খে কৌড়িয়া, মাওলানা শফিকুল হক আমকুনী, মাওলানা মনছুরুল হাসান রায়পুরীসহ আমরা চারজন রওয়ানা দিলাম জকিগঞ্জ হযরত ফুলতলীর পীরসাহেব বাড়ীর উদ্দেশ্যে। আমরা সেখানে পৌঁছে তাঁর বাড়ীতে জোহরের নামাজ আদায় করলাম। নামাজ পড়ে ফুলতলী সাহেবের বিশেষ মেহমান হিসেবে যখন আমরা দস্তরখানে খাওয়ার জন্য বসলাম, তখন ফুলতলী সাহেব নিজ হাতে আমাদেরকে আপ্যায়নের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শায়খে কৌড়িয়া (র.) ও মাওলানা আমকুনী এক চৌকিতে এবং আমরা সবাই চেয়ার-টেবিলে খেতে বসলাম। তখন হযরত ফুলতলী সাহেব নিজ আসন ছেড়ে নিজ হাতে পরিবেশন করে খাওয়ালেন। এক পর্যায়ে হযরত ফুলতলী সাহেব বললেন, ভাই সাহেব অর্থাৎ শায়খে কৌড়িয়া (রহ.) আমার বাড়ীর খানা অত্যন্ত পিয়র। নিজের পুকুরের মাছ এবং খাঁটি দুধ, নিজলোকদের হাতের রান্না তরকারী। নিঃসন্দেহে খান, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না ইনশাআল্লাহ! খাওয়া দাওয়ার পর ফুলতলী সাহেবের (প্রাইভেট গাড়ী) পাজেরো জিপের সামনের সিটে শায়খে কৌড়িয়া ও পিছনে হযরত পীর সাহেব ফুলতলী একসাথে জকিগঞ্জের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ প্রতিবাদ সমাবেশে যোগদান করেন। সেই দিন শায়খে কৌড়িয়া (রহ.) এর প্রতি হযরত ফুলতলী সাহেবের ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন দেখে ভীষণ অভিভূত হয়েছিলাম। তারপর ২০০৫ সালের ১০ মার্চ ফখরে মিল্লাত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) এর আহ্বানকৃত লংমার্চ সফলে হযরত ফুলতলী সাহেব (রহ.) ও তাঁর পরিবারের অবস্থান ছিলো ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। আমি ও আইয়ুরী হুজুর (মাওলানা আব্দুল মছব্বির আইয়ুবী) ফুলতলী সাহেব (রহ.) এর নিকট খান সাহেব হুজুরের সালাম ও লংমার্চের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য তাঁর বাড়ী যাই। রাত তখন ১০টা। পীর সাহেব তখন খাস কামরায় আরাম করছিলেন। খান সাহেব হুজুরের নাম শোনার পর তিনি আমাদের খাস কামরায় ডাকলেন এবং লংমার্চে কামিয়াবীর জন্য দোয়া করলেন। পরিবারের সকলকে এবং তাঁর মুহিব্বিন মতালম্বিদের লংমার্চ সফলের জন্য সর্বাত্মক সহযোতিার জন্য বলে দিলেন এবং লংমার্চ কাফেলায় ঢাকা থেকে আগত সকল ভি.আই.পি মেহমানদের মেহমানদারীর ব্যবস্থা খুব সুন্দর সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দিয়েছিলেন হযরত ফুলতলী ছাহেব নিজ তত্ত্বাবধানে।’
উইকিপিডিয়ায় ফুলতলী ছাহেব কিবলা:
সংক্ষিপ্ত পরিচয়: মাওলানা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ১৩২১ বাংলার ফাল্গুন মাসে অর্থাৎ ১৯১৩ সালের প্রথম দিকে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।  তার পিতার নাম মুফতি আব্দুল মজিদ। তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ কামাল (রহ.) এর বংশধর ছিলেন।
শিক্ষাজীবন :  শিক্ষাজীবনের প্রারম্ভে তিনি তার চাচাতো ভাই ফাতির আলীর নিকট লেখা পড়া করেন। অত:পর ফুলতলী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে তিনি বদরপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর রামপুর আলিয়া ও মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় হাদীস শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। ১৩৫৫ হিজরীতে তিনি মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় ১ম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে হাদীস শরীফের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন। তার গুরুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আল্লামা খলিলুল্লাহ রামপুরী ও আল্লামা ওয়াজিহুদ্দীন রামপুরী (রহ.)। এ ছাড়া তিনি শাহ আব্দুর রউফ করমপুরী (রহ.) ও শায়খুল কুররা আহমদ হেজাযী (রহ.) এর নিকট থেকে ইলমে কিরাতের সনদ অর্জন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি শায়খুল কূররার নিকট থেকে ইলমে কিরাতের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন।
কর্মজীবন : ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি বদরপুর আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সাল থেকে গাছবাড়ী জামেউল উলুম মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। এ সময় মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সৎপুর, ইছামতি ও বাদেদেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদ্রাসায় হাদীস শাস্ত্র অধ্যাপনা করেন। এ ছাড়া তিনি শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাষ্ট। দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠা করেন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
তরীকত : ফুলতলী (রহ.) ছিলেন তরীকায়ে কাদেরিয়া, চিশতীয়া, নক্সবন্দীয়া, মুজাদ্দেদিয়া ও মুহাম্মদিয়ার একজন মুর্শিদ। তিনি আজীবন উপরিউক্ত তরীকা সমূহের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর তরিকতের সিলিসিলা নিম্নরূপঃ
মাওলানা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.), শাহ ইয়া’কুব বদরপুরী (রহ.), হাফিজ আহমদ জৌনপুরী (রহ.), কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.), সৈয়দ আহমাদ শহীদ ব্রেলভী (রহ.), শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.), শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)।
রচনাবলী: আত তানভীর আলাত তাফসীর
মুন্তাখাবুস সিয়র
আনওয়ারুছ ছালিকীন
আল খুতবাতুল ইয়াাকুবিয়া
নালায়ে কলন্দর
শাজরায়ে তাইয়্যিবাহ
আল কাউলুছ ছাদীদ।
তার লেখা অনেক উর্দু ও আরবি গ্রন্থ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে রয়েছে। এছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের পাঠ্যসূচিতেও তার অনেক গ্রন্থ রয়েছে।
সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান :  দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাষ্ট,  বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ,  বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামীয়া
দারুল হাদীস লতিফিয়া, ইউ. কে, লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি , দারুল হাদীস লতিফিয়াহ।
উত্তরসূরী : পীরছাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁর অনুসারীরা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মনোনীত করেছেন তাঁর বড় ছেলে মাওলানা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরীকে।  ইমাদ উদ্দীন প্রাথমিক জীবনে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭৮ সালে সৎপুর কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকাকালে চাকুরী ছেড়ে স্থায়ী ভাবে গ্রামের বাড়ীতে চলে আসেন। এরপর অবৈতনিকভাবে ইছামতি কামিল মাদ্রাসা ও পরে বাদেদেওরাইল কামিল মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। পিতার ইন্তেকালের পর থেকে তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ভক্ত ও অনুসারীদেরকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।
ইন্তেকাল : আল্লামা ফুলতলী রহ. ১৬ জানুয়ারী ২০০৮ সালে সিলেট শহরে ইন্তেকাল করেন।

চির অমর আল্লামা ফুলতলী (র.)

Allama Fultaliমোঃ শামসুল ইসলাম সাদিক

আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের মুকুটহীন স¤্রাট হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (রহ.) এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম উত্তরসূরি হযরত শাহ কামালের বংশধর এবং ইসলামিক চিন্তা-চেতনার প্রচার ও প্রসারে ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতিমান প্রাণপুরুষ শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (র.) এক জীবন্ত ইতিহাস, গৌরবের কিংবদন্তি। সত্য-ন্যায় এবং আহলে সুন্নাতওয়াল জামাতের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন, পাশাপাশি জ্ঞানের আলো বিতরণে নিরলস চেষ্টা করেছেন। দার্শনিক ব্রাট্রান্ড রাসেল একটি ভালো জীবন বলতে জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত জীবনকেই বুঝিয়েছেন। শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী (র.) তাঁর সমগ্র জীবন প্রবাহে জ্ঞানের প্রচার-প্রসার এবং সত্য সুন্দরের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
ফুলতলী (র.) আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তায় ও বিশ্বাসে অনিন্দ্য সুন্দর উপাসনা আর বলিষ্ঠ ও প্রখর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী সবার মাঝে ছড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুণাবলী আমাদেরকে সঠিক পথ চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি ছিলেন একজন যুগ শ্রেষ্ঠ খ্যাতিমান আলেম। তাঁর আপাদমস্তক ছিল রাসূল (সা.) এর আদর্শে উদ্ভাসিত। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী প্রত্যেক নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত এবং মজলুম মানুষের পক্ষে সু-উচ্চ কন্ঠস্বর।
তিনি ছিলেন জালিম ও রাসূলে পাক (সা.) এর শত্র“দের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশেষ করে তাগুতের বিরুদ্ধে তাঁর সময়োপযোগী এবং সাহসী কন্ঠ ছিল ধারালো তরবারির চেয়েও কঠোর। রাসূলে পাক (সা.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত এ মহান ব্যক্তির মাঝে ছিল প্রেম, প্রীতি, ¯েœহের ও ভালোবাসার মধুর সুর, অনাচার নির্যাতনের এবং সকল বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক। তিনি কখনো ছিলেন কোমল আবার কখনো কঠোর এক প্রাচীর। ইসলাম প্রচারে তথা আল্লাহ তায়ালার দ্বীন কায়েম করতে এবং রাসূল (সা.) এর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় অগ্রসৈনিক।
ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় ফুলতলী (র.) এর চরিত্র, আচার-আচরণ ও ব্যবহার ছিল ন¤্রতা ও ভদ্রতায় পরিপূর্ণ। জীবনের ঊষালগ্ন থেকে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম জাতির ক্রান্তিকালের উত্তরণের চিন্তা মাথায় নিয়ে যারা সামনে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে দীপ্ত কঠিন শপথে আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব ফুলতলী (র.) এর অভিযাত্রা অন্যতম। তিনি পবিত্র কোরআন ও হাদিসকে সামনে রেখে বাতিলের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যান।
কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস সহ ধর্মীয় প্রত্যেক কিতাবের মর্মবাণী উপলব্ধি করে সফলতা ও কৃতিত্বের সাথে উপস্থাপন করে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাবিদের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ঈমান আক্বিদা রক্ষার আন্দোলনে তাকে পাওয়া যেত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো। বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী নামে পরিচিত সিলেটের মুকুটহীন স¤্রাট হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (রহ.)-এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ কামালের নয়নের মধ্যমণি হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (র.) ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল, অবিচল, নিরহংকার, খোদাভীরু, শান্তিপ্রিয় রাসূল প্রেমিক। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যকার শান্তি সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ইসলামি চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে তিনি সু-লেখক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, মিষ্টভাষি সুবক্তা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্যতম বীর সিপাহসালার শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী (র.)-এর অন্যতম চিন্তার চেতনার হাতিয়ার আনোয়ারুস সালিকিন অথবা নালায়ে কলন্দর নামে কাব্যগ্রন্থ দু’টি বরেণ্য কবিদের চেয়ে কম নয়? এছাড়া পবিত্র আল কুরআন সহিহ শুদ্ধভাবে তেলাওয়াতের জন্য তাঁর অন্যতম একটি রচনা হল আল কাউলুস ছাদীদ। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে ফুলতলী (র.) কে ভাবিয়ে তুলেছিল অনেক। তাই তিনি প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত লতিফিয়া এতিমখানা বাদে দেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসা, সোবহানীঘাট কামিল মাদরাসা, বৃদ্ধনিবাস প্রকল্প, ফ্রি ডিসপেনসারী, লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষক সংগঠন জমিয়তুল মোদারিছীন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পবিত্র আল কুরআন বিশুদ্ধভাবে পড়ার সাড়া জাগানো দারুল ক্বিরাত মাজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও অনেক অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে মুসলিম হৃদয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আশি দশকের সৈয়দপুরে বাতিলপন্থীদের হাতে রক্তেরঞ্জিত হয়েও ফুলতলী (র.)কে রাসূল (সা.)-এর আদর্শ হতে একবিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত করতে পারেনি। আজও তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তাচেতনার বাইরে গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার দুঃসাহস, নোংরা রাজনীতি অথবা আত্মীয়তার সুযোগ নিয়ে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার অপচেষ্টা অবশ্যই সফল হবে না। কেননা পবিত্র কোরআনের ভাষায় সত্য সমাগত আর মিথ্যা বিতাড়িত। কাজেই কোনো মিথ্যা ষড়যন্ত্র কোনো কালেই জয়ী হয়নি, আর কখনো হতে পারে না।
ক্ষণস্থায়ী জীবনের ইতি ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আল্লাহতায়ালার তাঁর প্রিয় বান্দাদের কাছে আজরাঈল যখন হাজির হন তখন তারা পরম আনন্দে মাওলার দিকে পাড়ি জমান। ঠিক এভাবে পাড়ি জমান মাওলার সান্নিধ্যে ১৫ জানুয়ারি ২০০৮ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে প্রায় ২টা ৯ মিনিটের সময় ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বীর সিপাহসালার সুন্নতে নববীর আদর্শ শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (র.) মাওলার ইশারায় প্রভুর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বরেণ্য এই ব্যক্তির ইন্তেকালে দেশ-বিদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। চারদিকে শোকার্ত মানুষের ঢল। প্রত্যেক আপামর জনসাধারণ ছুটেছেন প্রিয় রাহবারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ফুলতলীর বালাই হাওরের প্রান্তরে। ১৬ জানুয়ারি লক্ষ লক্ষ জনতা তাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মান জানাতে জমায়েত হতে থাকেন ফুলতলী ছাহেব বাড়ি। ভক্তদের আহাজারি আর কান্নায় ভারি হয় গোটা ফুলতলী বালাই হাওরের পরিবেশ। প্রিয় মুর্শিদের ইচ্ছা মোতাবেক তাকে নিজ বাড়ির মসজিদের উত্তর দিকে দাফন করা হয়। চির অমর মহান এই ওলি এ পৃথিবীতে আর কখনো ফিরে আসবেন না। তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি জাগরুক থাকবে হাজার বছর ধরে।
আমার স্বপ্নে কল্পনায় ও শ্রদ্ধায় চির অমর আল্লামা ফুলতলী (র.) আমার আস্থার ও ভালোবাসার প্রতীক। এটি আজ আর কোনো ব্যক্তির নাম নয় একটি সংকল্পের, একটি আদর্শের, একটি সংগ্রামের, একটি লক্ষ্যের, একটি সোনালী ইতিহাসের নাম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানবতা আজ নির্বাক, গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত, চারদিকে আজ মুসলমানদের লাশ আর লাশ, বারুদের গন্ধে চরম শূন্যতায়, বিশেষ করে বার্মার মুসলিম জাতি হতাশায় স্থবিরতার মাঝে আল্লাহর নেক ওলির হুংকার কে স্মরণ করছি। আজ যেন আমরা তাঁর রেখে যাওয়া রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করতে পারি। মহান সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামীনের দরবারে এই প্রার্থনা করছি।

তাবলীগ জামাত : সিলেটে ইজতেমার একাল-সেকাল

মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী

তাবলীগ জামাত একটি ইসলাম ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা।
সাধারণত মানুষকে আখিরাত, ঈমান, আমল-এর কথা বলে দ্বীনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। প্রথমে তিনদিন এর পর যথাক্রমে সাতদিন ও চল্লিশদিন-এর জন্য আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত-এর কাজে উদ্বুদ্ধ করা হয়ে থাকে। তাবলীগ জামাত-এর মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় ৬টি উসুল বা মূলনীতিকে। এগুলো হলো: কালিমা, নামাজ, ইল্ম ও যিকির, একরামুল মুসলিমিন বা মুসলমানদের সহায়তা করা, সহিহ নিয়ত বা বিশুদ্ধ মনোবাঞ্ছা, এবং তাবলীগ বা ইসলামের দাওয়াত।
উৎপত্তি : ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য আল্লাহ পৃথিবীতে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর শেষ বাণীবাহক, তাঁর পরে আর কোনো নবী বা রাসূল আসবেন না, তাই মুহাম্মদ (সা:) বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মুসলমানদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্বটি দিয়ে যান উম্মতের উপর। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে:  তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা  হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)
তার চেয়ে ভাল কথা আর কি হতে পারে, যে মানুযকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)
প্রচলিত তাবলীগ জামাতের প্রবর্তক:
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুহাম্মদ (সা:) এর ইন্তেকালের পর তাঁর আদর্শস্নাত সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের মাধ্যমে ইসলামী জীবন বিধান প্রচার ও প্রসারের কার্যক্রম আরো বিস্তৃতি লাভ করে। কিন্তু মুসলিম শাসকদের ক্ষমতা বিলুপ্তির পর ইসলামী প্রচার কার্যক্রমে ভাটা পড়তে থাকে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য মুসলিম মনীষীদের প্রচেষ্টাও অব্যাহত ছিল। এমনই পরিস্থিতিতে মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস (র.) ভারতের দিল্লীতে তাবলীগ জামাতের সূচনা করেন । এবং তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে তাবলীগ জামাত একটি বহুল প্রচারিত আন্দোলনে রূপ নেয়। সারা বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া তাবলীগ জামাতের অন্যতম উদ্দেশ্য। মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস (র.) এর পিতার নাম মাওলানা ইসমাইল (র.)।
জন্মস্থান : ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশের মুযাফ্ফর নগর জেলার অন্তর্গত কান্ধলা নামক শহরে ১৩০৩ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবকাল নিজ নানার বাড়ি কান্ধলায় এবং নিজ পিতা হযরত মাওলানা ইসমাইল সাহেব (রহ.) এর সান্নিধ্যে দিল্লীর নিজামুদ্দীনে অতিবাহিত করেন। তখন তার পুরো পরিবার কান্ধলায় অবস্থান করছিলো। পরিবারের নারী-পুরুষ সকল সদস্যবৃন্দের মধ্যে ঈর্ষনীয় ধর্মপরায়ণতা ছিল। সদাসর্বদাই তারা অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরে মশগুল থাকতেন। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী শৈশবেই কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় গভীর মনযোগী ছিলেন। প্রতি দিনের সব পড়া শেষ করে বাকি সময় যিকির ও অন্যান্য অযিফায় কাটিয়ে দিতেন। শেষ রাত্রে নিয়মিত তাহাজ্জুদ, নামাজ, যিকির, দুআ ও রোনাজারি-আহাজারিতে নিমগ্ন থাকতেন। শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (র.) এর কাছে হাদীস পড়ার জন্য ১৩২৬ হিজরীতে দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন এবং শাইখুল হিন্দ (রহ:) এর কাছে বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফ পড়েন। হজরত রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী (র.) তাকে বাইয়াত করান। শিক্ষাজীবন সমাপ্তের পর ১৩২৮ হিজরিতে মাওলানা ইলয়াস (র.) সাহারানপুর মাযাহিরুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৩৩০ হিজরি মোতাবেক ১৭ এপ্রিল ১৯১২ সালে তিনি মামা মৌলভী রওফুল হাসান সাহেবের কন্যাকে বিবাহ করেন। ১৩৩৩ হিজরিতে হজ্ব পালনের জন্য তিনি মক্কা শরীফ গমন করেন। মেঝ ভাই ও বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি ভক্ত ও অনুরক্তদের অনুরোধে বস্তি নিযামুদ্দিনে অবস্থিত মসজিদ ও মাদ্রাসার সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর ১৯২০ সালে তিনি ভারতের মেওয়াত অঞ্চল থেকে তাবলীগী দাওয়াতের সূচনা করেন। এটি দিল্লীর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি ছিল ‘মেও’ জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। বর্তমানে গোরগাঁও, আলাওয়ার, ভরতপুর ও মথুরার কিছু অংশ নিয়ে মেওয়াত এলাকা বিস্তৃত। এমন একটি এলাকা থেকেই তাবলীগ জামাতের বিস্ময়কর সূচনা। ১৩৪৪ হিজরিতে দ্বিতীয় হজ্ব থেকে ফিরে এসে তিনি দাওয়াতের ধারা বদলিয়ে গাশত শুরু করলেন। তারপর তাবলীগ জামাতের বিকাশের কথা অনেকেরই জানা। জীবনের শেষ দিকে মাওলানা ইলিয়াস (র.) ইলম ও ফিকিরের প্রতি তাকিদ ও তারগীব দিতে লাগলেন। যারা অশিক্ষিত, তাদের প্রতি বেশি দরদ দেখালেন। যাকাত আদায় করা ও তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার ওপর জোর দিলেন।
আল্লামা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ:) এর ইন্তেকালের পর শায়খুল হিন্দ (রহ:) এর পরামর্শে খলীল আহমদ সাহরানপুরী (র.)
এর সাথে ইসলাহী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার বিশেষ তত্ত্বাবধানে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা সাধন করেন ও খেলাফত লাভ করেন। ১৯৪৪ সালের ১২ জুলাই মৃত্যুর একদিন আগে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কাল কি বৃহস্পতিবার? বলা হলো ‘জ্বি হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, আমার কাপড়-চোপড় দেখে নাও কোনো নাপাকি আছে কিনা। নেই শুনে খুশি হলেন। ভোররাতে ফজরের আযানের কিছুক্ষণ আগে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বিশ্ব ইজতেমা :
‘তাবলীগ’ অনুসারীদের একটি বৃহত্তম সমাবেশ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। তাবলীগ আরবী শব্দ, বালাগ শব্দ থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোকে তাবলীগ বলে। তাবলীগ আদর্শ যিনি পৌঁছেন, তাকে মুবাল্লিগ বলে। বিশ্বনবী (স.) এ প্রেক্ষিতে বলেছেন, ‘আমার পক্ষ হতে একটিমাত্র বাণী হলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’
প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবৎ টঙ্গিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। ইতোপূর্বে ঢাকার কাকরাইল মসজিদ ও সংলগ্ন রমনা উদ্যানের একাংশে অনুষ্ঠিত হতো এ সমাবেশ। ইজতেমার ইতিহাস তালাশ করলে জানা যায়, বাংলাদেশে ইজতেমা অনুষ্ঠানের প্রায় ৩/৪ যুগ পূর্বে ভারতের সাহরানপুর এলাকায় এ মহতী কাজের গোড়াপত্তন ঘটে। বর্তমান ধারায় এ তাবলীগী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা ইলয়াস (রহ.)। ১৯২০ সালে তিনি প্রচলিত তাবলীগ আন্দোলন শুরু করেন।
তাবলীগ জামায়াতের সদর দফতর দিল্লীতে থাকা সত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়া হয়।
ভারতের মুম্বাই ও ভূপালে এবং হালে পাকিস্তানের রায় বেন্ডে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হলেও জনসমাগমের বিচারে টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমাই বড় এবং বিশ্ব দরবারে বিশ্ব ইজতেমা বলতে বাংলাদেশের টঙ্গিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমাকেই বুঝায়।
তাবলীগের কার্যক্রম এখন বিশ্বের সর্বত্র। হযরত মাওলানা আবদুল আজিজ (রহ.) এর মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে বাংলাদেশে তাবলীগ শুরু হয়। তারপর ১৯৪৬ সলে বিশ্ব ইজতেমা সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের তাবলীগের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে (রমনা পার্কের পাশে অবস্থিত একটি মসজিদ)। পরে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা শুরু হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গির পাগারে এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সালে টঙ্গির ভবেরপাড়া তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব ইজতেমা সেই থেকে এ পর্যন্ত সেখানেই ১৬০ একর জায়গায় তাবলীগের সর্ববৃহৎ ইজতেমা বা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ২২ কিলোমিটার উত্তরে তুরাগ নদীর তীরে প্রতিবছর তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। সুদীর্ঘ সাড়ে তিন যুগ ধরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে । ২০১১ সাল থেকে এক সাথে এতো ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্কুলান না হওয়ায় দু’ পর্বে ইজতেমা চলার সিদ্ধান্ত হয়। যখন বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের প্রচেষ্টা শুরু হয়, তখন এর নাম ছিলো শুধুই ইজতেমা। যা অনুষ্ঠিত হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকে ধীরে ধীরে এগুতে এগুতেই আজকের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। যে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে বিশ্বের প্রায় একশটি রাষ্ট্রের তাবলীগ প্রতিনিধিরা। শিল্পনগরী টঙ্গীতে ইজতেমাকে স্থানান্তরিত করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর সে বছর থেকেই তাবলীগ জামাতের এই মহাসম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ নামে খ্যাতি অর্জন করে। মুসলমানদের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ঐক্যের প্রেরণার অভাবনীয় নজির বিশ্ব ইজতেমায়ও দেখা যায়। সত্যিই তা মুসলিম ঐক্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। পুণ্যভূমি মক্কা-মদীনার পর তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা পরিচিতি লাভ করে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিলনকেন্দ্র হিসেবে।
যতটুকু জানা যায়, ইজতেমা নিয়ন্ত্রণকারী তাবলীগ জামাতের কোনো সংবিধান নেই। অলিখিত সংবিধানও নেই। লিখিত আইন, বিধিবিধান ও উপবিধি কিছুই নেই। তারপরও এ আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল আন্দোলন। তাবলীগ জামাতের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। এটিকে বলা হয় মজলিসে শুরা। এ কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ২১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও বহু ব্যক্তি এ কমিটির মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাবলীগে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি অবদান রেখেছেন, তারাই এ কমিটির আলোচনায় কথাবার্তা বলেন। তবে কে কতো বেশি অবদান রেখেছেন, তা’ নির্ধারণেরও মাপকাঠি নেই। তাবলীগ আন্দোলনে ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কোনো প্রতিযোগিতা নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।  তাবলীগ আন্দোলন ও বিশ্ব ইজতেমার কোনো প্রেস রিলিজ, প্রকাশনা, প্রচার শাখা নেই। বিশ্ব ইজতেমা কোন তারিখে অনুষ্ঠিত হবে, তা’ উল্লেখ করে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করা হয় না। কোনো লিফলেট-পোস্টার ছাপানো হয় না। তবুও লাখ লাখ মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের আগে বিশ্ব ইজতেমায় সমবেত হন। ইজতেমা ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশ্যে কে বক্তব্য রাখছেন, তার নাম ঘোষণা করা হয় না। এ ক্ষেত্রে তাবলীগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ “কে বলছেন সে দিকে তাকিও না, কী বলেছে সেদিকে লক্ষ্য করো” হাদিসকেই ফলো করে থাকেন।
বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগ তৈরি করে। আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। বিশেষ করে তিনদিনব্যাপী (উভয় পর্বে) ইজতেমার শেষ দিনের মোনাজাতে অংশ নেয়ার জন্যে যেভাবে মানুষ পাগলের মতো ছুটে যায়, তা’ সত্যিই যে একটি প্রচন্ড ইসলামী আবেগ ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ তা’ অস্বীকার করার জো নেই। এতে কেউ শরীক হতে না পারলে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। বিশ্ব ইজতেমার শেষ দিন কার্যত টঙ্গীকেন্দ্রিক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এর প্রভাব এতোটুকু গড়ায় যে, দেশের প্রেসিডেন্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ কমপক্ষে একবার সেখানে বিশেষত মুনাজাতের দিন হাজিরা দিতে যান।
সিলেটে ইজতেমা :
দীর্ঘ প্রায় তিন যুগপরে তাবলীগ জামাতের সিলেট জেলা ইজতেমা চলতি  ডিসেম্বর মাসের  ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ শুরু হচ্ছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ১ নম্বর মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের সুনামগঞ্জ-তেমুখি বাইপাস সড়কের পাশের মাঠে সিলেট জেলা ইজতেমার সবধরনের আয়োজন সম্পন্ন।  ইজতেমা নিয়ে প্রতিটি মসজিদে তাবলীগ জামাতের সিলেট জেলার সকল হালকার ৩ চিল্লার সাথী সহ নতুন ও পুরাতন সাথীগণ এই ইজতেমার দাওয়াত তথা প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সিলেটের মারকাজ মসজিদ খোজার খলার মুরব্বীগণ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিলেটে অনুষ্ঠিতব্য ইজতেমায় বয়ান করবেন ভারতের দিল্লি ও ঢাকার কাকরাইল মসজিদের তাবলীগ জামাতের মুরব্বীগণ। বিশ্ব ইজতেমায় যারা বয়ান করেন তারাই সিলেটের এই ইজতেমায় বয়ান করবেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুসল্লিগণ আসবেন। সিলেটের জনগণ তুলনামূলক বেশী ধর্মপ্রাণ হওয়ায় এবং পর্যটক বা ভ্রমণ পিপাসু লোকজনের কাছে ভ্রমণের জন্য কাক্সিক্ষত এই সিলেট এসব কারণে এবাবের ইজতেমায় বেশী মুসল্লীর উপস্থিতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যতটুকু জানাগেছে, শাহজালাল, শাহপরানের উত্তরসূরীরা টঙ্গির তুরাগ তীরের পরিবর্তে এবার তাদের মিলন মেলা সুরামা নদীর তীরেই অনুষ্ঠিত হবে। সিলেটে ৩৬ বছর পর শুরু হচ্ছে ইজতেমা। মুসল্লিদের কলরব আর ‘আমিন’ ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে এবার মুখরিত হবে আধ্যাত্মিক রাজধানী  সিলেট। এ ইজতেমায় জেলার অন্তত ১২ লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে ইজতেমার মাঠে গেলে জানা গেল, ৬শ’ কেদার (প্রায় ২০০ একর) জমির উপর সিলেট জেলার ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ মানুষের যাতে কোনো কষ্ট না হয়, সেজন্য প্যান্ডেল দিয়ে সাজানো হচ্ছে বিশাল মাঠ। ওই মাঠে ১১টি খিত্তা থাকবে। এ ছাড়া মাঠের দক্ষিণ পাশে ৫ থেকে ৬ হাজার মুসল্লির যাতে এক সাথে ওজু করতে পারেন, সেজন্য থাকছে বিশাল ওজুখানা। এই ওজুখানা ছাড়াও আরো ৩৫ থেকে ৪০টি ছোট ওজু খানার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাঠের একপাশে অন্তত ২ হাজার শৌচাগার থাকবে; ৫টি গভীর নলকূপসহ প্রায় ১২ থেকে ১৫টি নলকূপ বসানোর ব্যবস্থা রয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক জানান, ইজতেমার জন্য আমরা সার্বিক সহযোগিতা করছি। নলকূপ বসানো, বিদ্যুতের ব্যবস্থা, রাস্তা করা এবং রাস্তার উন্নয়নসহ প্রায় অধিকাংশ কাজে জেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে। মুসল্লিরা যাতে সুন্দরভাবে ইজতেমায় অংশ নিতে পারেন, সেজন্য পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন সার্বিক দিকে দৃষ্টি রাখছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, ইতোমধ্যে দুটি গভীর নলকূপ দেওয়া হয়েছে। পানির ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। লাইট দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতা থাকবে।
কোন খিত্তায় কারা :
সিলেট ইজতেমা মাঠের মানচিত্রে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কোন খিত্তায় কোন কোন এলাকার মানুষ অংশ নিতে হবে। মুসল্লীদের সুবিধার্থে ও পাঠকদের জন্য বিষয়টি তুলে ধরলো। মাঠের পশ্চিমদিকে ১ নম্বর খিত্তাতে রয়েছে মিম্বর। এই খিত্তায় কানাইঘাট উপজেলা ও খাদিমপাড়া ইউনিয়নের এলাকার মুসল্লীরা অংশ নিবেন।
২ নম্বর খিত্তাতে গোয়াইনঘাট উপজেলা ও সিলাম ইউনিয়নের মুসল্লীরা অংশ নিবেন।
৩ নম্বর খিত্তাতে জৈন্তাপুর উপজেলা ও হাটখোলা ইউনিয়নের মুসল্লীরা অংশ নিতে হবে।
৪ নম্বর খিত্তাতে অংশ নিতে হবে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা ও জালালাবাদ ইউনিয়নের মুসল্লীরা।
৫ নম্বর খিত্তাতে থাকবেন গোলাপগঞ্জ উপজেলা এবং টুকেরবাজার ও কান্দিগাঁও ইউনিয়নের মুসল্লীবৃন্দ।
৬ নম্বর খিত্তাতে থাকবেন বালাগঞ্জ উপজেলা ও জালালপুর ইউনিয়নের সাথীরা।
৭ নম্বর খিত্তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বিশ্বনাথ উপজেলা ও মোগলগাঁও ইউনিয়নের সাথীদের জন্য।
৮ নম্বর খিত্তাতে থাকবে ওসমানীনগর উপজেলা ও দাউদপুর ইউনিয়নের মুসল্লীবৃন্দ।
৯ নম্বর খিত্তাতে থাকবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও খাদিমনগর ইউনিয়নের মুসল্লীবৃন্দ।
১০ নম্বর খিত্তাতে থাকবেন বিয়ানীবাজার উপজেলা এবং লালাবাজার ও তেতলি ইউনিয়নের মুসল্লীবৃন্দ।
১১ নম্বর খিত্তাতে থাকবেন জকিগঞ্জ উপজেলা ও মোগালাবাজার ইউনিয়নের মুসল্লীবৃন্দ।
তবলীগ জামাতের একাধিক কর্মী জানান, জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে টঙ্গীর তুরাগ নদীর পারে দু’ধাপে ৩২টি জেলার বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। তুরাগ তীরের এক সপ্তাহ আগে সিলেটের ইজতেমা হওয়ায় অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। সিলেটের ইজতেমায় বিপুল সংখ্যক বিদেশি মুসল্লিরও সমাগম ঘটবে জানিয়ে তাঁরা বলেন, আল্লাহর নামে কোনো কাজ শুরু করলে তা আটকে থাকে না। এর কারণ হচ্ছে, সিলেটের তাবলীগের মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩ দিনের ইজতেমা হবে। এজন্য কোনো সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কিংবা কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব কাউকে দেয়া হয়নি। কোনো টাকার ব্যবস্থা ছাড়াই ইজতেমার মাঠের কাজ শুরু হয়। আল্লাহর নামের জন্য এবং দ্বীনের কাজে সওয়াবের আশায় সাধারণ মানুষ, দিনমজুর, গাড়ী চালক, রিক্সা ড্রাইভার, বিভিন্ন মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন,মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকলেই সহযোগিতা করছেন। যে যে ভাবে পারছেন স্বেচ্ছায় সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। কোনো শ্রমিক টাকায় আনা হয়নি। মানুষ নিজ উদ্যোগে শ্রম দিয়ে ইজতেমার মাঠ মুসল্লিদের জন্য তৈরী করে দিচ্ছেন। সকলেই কাজ করছেন বিনা পারিশ্রমিকে। কেউ কেউ বাঁশ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। আবার কেউ কেউ বাঁশ বাঁধার সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করছেন। অনেকে আবার স্বেচ্ছা শ্রম দিয়ে সহযোগীতা করছেন। সিলেটের জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন এবং রাজনৈতিক নেতারাও বিভিন্ন কাজ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর নামের কাজে শামিল হচ্ছেন।
ইজতেমার মাঠের কাজ পরিদর্শন করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি এডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ প্রমুখ। আশফাক আহমদ জানান, প্রশাসনের সাথে বৈঠক হয়েছে। ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, সবশ্রেণি-পেশার মানুষ সিলেটের ইজতেমা সফল করতে এগিয়ে এসেছেন। সদর উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের পানি দেয়া হবে, ইতোমধ্যে গভীর নলকূপ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রোলার দিয়ে মাঠের মাটি সমান করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে আশফাক আহমদ বলেন, আল্লাহর নামের কাজে আল্লাহর মেহেরবাণী সবচেয়ে বেশি থাকে। গত কয়েকদিন আগে এ মাঠের মাটি একেবারেই নরম ছিল। এখন পুরো শক্ত হয়ে গেছে। তাবলীগ জামাতের আমীর আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আল্লাহর মেহেরবাণীতে সব কাজ চলছে। তিনি বলেন, তিন দিন ইজতেমা চলবে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ হবে আখেরি মুনাজাত। ইজতেমা শেষে অনেক মুসল্লি আল্লাহর রাস্তায় সময় কাঠাতে চিল্লায় যাবেন। তিনি বলেন, বিদেশি মেহমানদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখার চেষ্টা করা হবে। তাঁদের জন্য আলাদা প্যান্ডেল করে তাঁবু দিয়ে ইবাদত করার সুযোগ করে দেয়া হবে। যারা মাঠে থাকতে অসুবিধা মনে  করবেন, তাঁদেরকে পার্শ্ববর্তী মসজিদে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। ইজতেমার আয়োজনের মূল কারণ হচ্ছে, আল্লাহর পথে সময় দেয়া, রাসূল (স.) এর দেয়া নির্দেশ মোতাবেক পথ চলা ও অনুসরণ করে দিনের দাওয়াত রাসূল (স.) এর উম্মতদের কাছে পৌছে দেয়া। তিনি বলেন, সিলেটের ইজতেমা সফল করতে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ অর্থ ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন এই দুআ সব সময় করি।
তাবলীগের অপর এক মুরব্বি সৈয়দ ইব্রাহিম জানান, ৩২ বছর পর সিলেটে ইজতেমা হচ্ছে। এর আগে আগে ১৯৬৫ ও ১৯৮৪ সালে সিলেট জেলার সুরমা নদীর দক্ষিণ তীর সংলগ্ন টেকনিক্যাল মাঠে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথমবার আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা ইউসূফ জি (রহ:) এবং দ্বিতীয়বার আখেরী মোনাজাত করেন মাওলানা এনামুল হাসান (রহ:)। তিনি বলেন শেষবার ৮৪ সালে পলিটেকনিক মাঠে জেলা পর্যায়ে একটি ইজতেমা হয়েছিল। এবার ৩২ বছর পর সিলেটের ইজতেমা সফল করতে সবাই এগিয়ে এসেছেন। শীর্ষ মুরুব্বিদের নতুন সিদ্ধান্তে চলতি বছরের বিশ্ব ইজতেমায় দেশের যে ৩২টি জেলা বাদ পড়ে, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব ইজতেমার দুই পর্বে সেই ৩২ জেলার তবলীগ জামাত সদস্যরা অংশ নেবেন।

দেওয়ান হাসন রাজা একটি ইতিহাস

hason-raza-2# এম এ আসাদ চৌধুরী #

১৮৫৪ সালের ২১শে ডিসেম্বর মোতাবেক ৭ই পৌষ ১২৬১ বাংলা, তৎকালিন সিলেটের লক্ষণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে দেওয়ান আলী রাজার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্ববিখ্যাত বাউল সাধক, মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজা। হাসন রাজা জমিদার পরিবারের সন্তান, তাঁর পিতা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার, আলী রাজা তাঁর খালাতো ভাই আমির বখশ চৌধুরীর নিঃসন্তান বিধবা হুরমত জাহান বিবিকে পরিণত বয়সে বিবাহ করেন। হুরমত বিবির গর্ভেই হাসন রাজার জন্ম। আলী রাজা তাঁর পুত্র ওবায়দুর রাজার পরামর্শে তাঁর নামানুসারেই হাসন রাজার নাম রাখেন অহিদুর রাজা।
মরমী সম্রাট হাসন রাজার পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাদের মধ্য থেকে একজন বীরেন্দ্র চন্দ্র সিংহদেব মতান্তরে বাবু রায় চৌধুরী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হাসন রাজার পূর্ব পুরুষদের অধিবাস ছিলো অযোধ্যায়, সিলেট আসার পূর্বে তাঁরা দক্ষিণ বঙ্গের যশোর জেলার অধিবাসী ছিলন। প্রায় দুই শতাব্দীর পূর্বকথা! মরমী সাধক হাসন রাজার বাল্যকাল। তখনকার সিলেটে আরবী ও ফারসি ভাষার চর্চা ছিলো খুব প্রবল। সিলেটে ডেপুটি কমিশনার অফিসের নাজির আব্দুল্লাহ বলে এক বিখ্যাত ফার্সি ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শে তাঁর নাম রাখা হয় হাসন রাজা যার অর্থ সুন্দর রাজা। হাসন রাজা দেখতে সুদর্শন ছিলেন, মাজহারুদ্দীন ভূঁইয়া বলেন “বহু লোকের মধ্যে চোখে পড়ে এমন সৌমদর্শন ছিলেন হাসন রাজা, চারি হাত উঁচু দেহ, দীর্ঘভুজ ধারালো নাসিকা, জ্যোতির্ময় পিঙ্গল চোখ এবং এক মাথা কবিচুল, পারসিক সুফি কবিদের একখানা চেহারা চোখের সামনে ভাসতো” বস্তুত এ সকল কারণেই তাঁর নাম রাখা হয় ‘হাসন’। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞদের মতে তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন নি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত।
হাসন রাজা সহজ সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিলেন। হাসন রাজা স্বভাবত খুব সৌখিন ছিলেন। গৌরবময় হাসন ইতিহাসের যৌবন পর্বে ললনামুহ একটি কালো অধ্যায়! প্রতিবছর বিশেষ করে বর্ষার সময় নৃত্যগীতের ব্যবস্থা সহ তিনি নৌভ্রমণে চলে যেতেন এবং বেশ কিছু কাল ভোগ বিলাসে নিমজ্জিত থাকতেন। এরই মধ্যে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে তিনি প্রচুর গান রচনা করেছেন। নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে এসব গান গাওয়া হত।
হাসন রাজা পাখি ভালোবাসতেন ‘কুড়া’ ছিলো তাঁর প্রিয় পাখি। তিনি ঘোড়াও পোষতেন, তাঁর প্রিয় দু’টি ঘোড়ার নাম ছিলো ‘জং বাহাদুর’ ও ‘চাঁন্দমুশকি’।
সৌখিনতায় বিভোর হাসন রাজা এক সময় প্রজা বিমুখী নিষ্ঠুর অত্যাচারী রাজা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে উঠেন! হাসন রাজা দাপটের সাথে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন, কিন্তু এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দর্শন হাসন রাজার জীবন পাল্টে দিলো! মনের দোয়ার খুলে গেলো! চরিত্রে এলো এক সৌম্যভাব! বিলাসিতা ছেড়ে দিলেন! জমকালো পোষাক পরা ছেড়ে দিলেন! শুধু বহির্জগৎ নয় বরং অন্তর্জগতেও এলো বিরাট পরিবর্তন। এক ধরনের বৈরাগ্যতা বিরাজ করতে থাকলো তাঁর অন্তঃকরণে! সর্বসাধারণের খোঁজ নেয়া হয়ে উঠলো তাঁর প্রতিদিনের কাজ। সকল কাজের উপর ছিলো তাঁর গান রচনা। কালক্রমে মগ্ন হলেন প্রভুপ্রেমে। তাঁর সকল ধ্যান ধারণা গান হয়ে প্রকাশ পেতে লাগলো, সেই গানে তিনি সুরারোপ করতেন এভাবে–
“লোকে বলে, বলেরে, ঘর বাড়ি বালা নায় আমার/ কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের ই মাঝার?/ বালা করি ঘর বানাইয়া ক’দিন রইমু আর/ আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার”।
এভাবে প্রকাশ পেতে লাগলো তাঁর বৈরাগ্য ভাব। হাসন রাজা সম্পূর্ণ বদলে গেলেন, জীব হত্যাও ছেড়ে দিলেন। কেবল মানব সেবা নয় জীব সেবাতেও মন দিলেন তিনি। ডাকসাইটে রাজা এককালে ‘চন্ড হাসন’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু এবার তিনি হলেন ‘নম্র হাসন’। মরমী সাধক হাসন রাজার চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর গানে। হাসন রাজা সর্বমোট কতটি গান রচনা করেছেন তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে ‘উদাস হাসন’ গ্রন্থে তাঁর ২০৬ টি গান সংকলিত হয়েছে। এর বাইরে কিছু গান ‘হাসন রাজার তিন পুরুষ’ ও ‘আল ইসলাহ’ সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অনেক গান এখনো সিলেট ও সুনামগঞ্জের মানুষের মুখে শুনা যায়। কালের আবর্তনে তাঁর অনেক গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মরমী গানের ছক-বাঁধা বিষয় ধারাকে অনুসরণ করেই হাসনের গান রচিত। প্রভুভক্তি, জগৎ জীবনের অনিত্যতা ও প্রমোদমত্ত মানুষের সাধন ভজনে অক্ষমতার খেদোক্তিই তাঁর গানে প্রধানত প্রতিফলিত হয়েছে। কোথাও নিজেকে দীনহীন বলেছেন, আবার তিনি যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে বাঁধা ঘুড়ি সে কথাও ব্যক্ত করেছেন এই বলে “গুড্ডি উড়াইলো মোরে মৌলার হাতের ডুরি, হাসন রাজারে যেমনে ফিরায় তেমনে দিয়া ফিরি”। এরকম হাজারো আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মোপলব্ধির ভিতর দিয়েই হাসন রাজা মরমী সাধনলোকের সন্ধান পেয়েছেন। হাসন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন, আর তাঁর সহচরবৃন্দ বা নায়েব গোমস্তা সে সব লিখে রাখতেন। তাঁর স্বভাবকবিত্ব এসব গানে জন্ম নিত।
পরিমার্জনের সুযোগ খুব একটা মিলতো না। তাই কখনো কখনো তাঁর গানে অসংলগ্নতা, গ্রাম্যতা, ছন্দপতন ও শব্দ প্রয়োগে অসতর্কতা লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য এই ত্রুটি সত্যেও হাসন রাজার গানে অনেক উজ্জ্বল পংক্তি, মনোহর উপমা, চিত্রকল্পের সাক্ষাৎ মিলে! তাঁর কিছু গান বিশেষত “লোকে বলে, বলেরে, ঘর বাড়ি বালা নায় আমার” “মাটিরো পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে” “সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানইলো” “কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে” “মরণ কথা স্মরণ হইলোনা হাসন রাজা তোর” ইত্যাদি সমাদৃত ও লোক প্রিয় শুধু নয় বরং এগুলো সঙ্গীত সাহিত্যের মর্যাদাও লাভ করেছে।
কালের বহমানতায় মাত্র ৬৭ বছর বয়সে ১৯২২ইং সালের ৬ই ডিসেম্বর মোতাবেক ২২ অগ্রহায়ণ ১৩২৯বাং, বাউল সাধক, মরমী কবি দেওয়ান অহিদুর রাজা উরফে হাসন রাজা মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে ইহধাম ত্যাগ করেন। হাসন রাজার জীবন সমাপ্তির সাথে সাথে সমাপ্তি ঘটে একটি ইতিহাসেরও। হ্যাঁ হাসন রাজা শুধুই একজন বাউল বা মরমী সাধক নন, বর্তমান প্রজন্মের জন্য হাসন রাজা একটি ইতিহাসও বটে।
হাসন রাজার জীবন, সাধনা, দর্শন সবকিছুতেই নব প্রজন্মের জন্য রয়েছে অনেক শিক্ষণীয় ও অনুস্মরণীয় বিষয়াবলী। অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশের একটি অরাজনৈতিক কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের জাতীয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ কবি সভা’ এর সিলেট জেলা শাখার পক্ষ থেকে মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে আয়োজন করেছে হাসন রাজা উৎসব ও লেখক সম্মিলন ‘১৬ এর, আগামি ২৩ ডিসেম্বর ১৬ শুক্রবার সকাল ৯ ঘটিকা থেকে রাত ১১ ঘটিকা পর্যন্ত তিনধাপে অনুষ্ঠিত হবে এই অনুষ্ঠানটি। আশা করি এই অনুষ্ঠান সিলেটের নতুন প্রজন্মের কাছে দেওয়ান হাসন রাজাকে আবারো নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিবে এবং হাসন প্রেমিদের মনে আরো একবার হাসন প্রেম জাগরিত করবে। এই প্রত্যাশা।

স্বাধীনতা : আত্মসত্তার মুখোমুখি

cms-somewhereinblog-netসৈয়দ মবনু

আমরা স্বাধীন–এ কথাটা কতোখানি সত্যি? একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের নাম কি স্বাধীনতা? স্বাধীনতার অর্থ কিংবা সংজ্ঞা কী? এসব প্রশ্ন প্রায়ই কাজ করে আমাদের অন্তরে। আমরা জবাব খুঁজে পাই না কিংবা পেলেও সেই জবাবে তৃপ্ত হতে পারি না। কীভাবে তৃপ্ত হবো; যদি বৃটিশ-ভারত-পাকিস্তান আমলের বাংলার সাথে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের চারিত্রিক কোনো ব্যবধান দেখতে না পাই? পূর্বের অবস্থায় থাকার জন্যে কি আমরা এতো রক্ত আর প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলাম? আমি ইতোপূর্বে বেশ কিছু লেখায় বলেছি, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা লড়েছেন তাঁদের স্বপ্ন নিয়ে অভিলাষীদের মতানৈক্য থাকতে পারে, তবে তাঁদের স্বাধীনতার স্বপ্নে কোনো খাদ ছিলো না। দীর্ঘ সময়ের মুক্তিযোদ্ধাদের চিন্তা-চেতনায় আদর্শগত মতানৈক্য থাকতেই পারে, তবে স্বপ্ন তাঁদের একটাই ছিলো — স্বাধীনতা। আদর্শিক ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁরা এ দেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্থিতিশীল দেখার স্বপ্নে অভিন্ন ছিলেন বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। তাঁরা হয়তো এমন দেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে নাগরিকরা সুখের দিনে স্বাধীনভাবে হাসতে ও দুঃখের দিনে স্বাধীনভাবে কাঁদতে পারেন। তাঁদের এই স্বপ্নটা আমরা পরবর্তীরা কতোখানি বাস্তাবায়িত করতে পেরেছি, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। আমাদের ভাবতে হবে, একটি স্বাধীন দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রতি নজর দিলে কেনো আজ হতাশ হয়ে চোখ ফেরাতে হয়? কেনো এই স্বাধীন দেশের কবি লিখতে বাধ্য হলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব?’ কেনো দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনকে কবি বললেন — ‘ডাকাতদের গ্রাম?’ কেনো স্বাধীন দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি-চিকিৎসা-বাসস্থান-আইন-শৃঙ্খলা-সততা-মানবতা-ঈমানদারির অবনতি জাতীয় পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করলো? কেনো একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে ভিক্ষুক পর্যন্ত নিরাপত্তার অভাবে আতঙ্কিত হতে হয়? এতোসব সমস্যা একটি স্বাধীন দেশে জন্ম নিলো কীভাবে, তা শুধু সরকার কিংবা নেতাদের ভাবনার বিষয় নয়, ভাবতে হবে প্রতিটি নাগরিককেই। একেবারে কেউ যে ভাবছেন না, আমরা তা কিন্তু বলছি না। তবে ভাবনার সারাৎসার থেকে এখনো সমাধানের পথ বেরিয়ে আসে নি। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাবনায় আদর্শগত, চিন্তাগত, অভিজ্ঞতার সারৎসারগত মতানৈক্য থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে প্রকৃত দেশপ্রেম থাকলে সকল মতানৈক্যের ঊর্ধ্বে ওঠে ভাবনাসমূহের সমন্বয় করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। অবশ্য এ জন্যে সরকারের পদক্ষেপটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি এবং দলের ঊর্ধ্বে ওঠে মূল সমন্বয়কারীর দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সরকার, বিরোধীদল এবং সাধারণ নাগরিক দেশ-জাতির উন্নয়নের স্বার্থে আলোচনার টেবিলে বসে সমন্বয়ের ঐকমত্যে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। উন্নয়নের পথে মৌলিক সমস্যাগুলো সর্বপ্রকার সংকীর্ণতার ঊর্র্ধ্বে দাঁড়িয়ে প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে, অতঃপর সাধ্যানুসারে বিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা আবশ্যক। বর্তমান বাংলাদেশে যাঁরা দেশ ও জাতির সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবছেন, তাঁদের আদর্শগত মতানৈক্যগুলো প্রধানত তিনটি চিন্তায় বিভক্ত: ডান, বাম এবং ইসলামিক। এই তিন ধারার চিন্তকেরা বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যাগুলোর যে মঞ্চসমূহ চিহ্নিত করেছেন, যথাক্রমে সেগুলো হলো: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক। এখানে যে যাঁর মতো করে মত প্রকাশ করেছেন। একটি বাগানের মূল আকর্ষণ হতে পারে বহুজাতিক ফুলের অস্তিত্ব, একটি দেশের মৌলিকত্ব হতে পারে ভিন্নমতের ধারণ। কে, কোথা থেকে, কীভাবে দেখছেন, তা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত। আবার একজন একটি জিনিসকে সময়সাপেক্ষে বিভিন্নভাবে দেখতে পারেন। শিল্পী মুনেট তাঁর বাড়ির পাশের সেতুকে জীবনের তিন সময়ে তিনভাবে দেখেছেন। যৌবনে অঙ্কিত সেতুটি স্পষ্ট সেতু হিসেবে তুলিতে প্রস্ফূটিত হলেও মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অঙ্কিত সেতুকে ধোঁয়া ছাড়া কিছুই মনে হয় না। চিকিৎসকদের ভাষ্যানুযায়ী বৃদ্ধ বয়সে শিল্পী মুনেটের চোখে অসুখ হয়ে গিয়েছিলো। এই যে তিনি ঝাপসা সেতু অঙ্কন করেছেন, তা প্রকৃতপক্ষে তাঁর ব্যক্তিগত চোখের অসুবিধার কারণে। তবু শিল্পীর হাতের তুলিতে ভিন্ন আকর্ষণ রয়েছে। যে কোনো জাতি কিংবা সমাজে ভিন্ন মত ভিন্ন চিন্তা থাকা স্রোতশীলতার পরিচয়। ভিন্নমতের বিজ্ঞজনেরা বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন এগুলোতে দেশের অন্তর্গত সমস্যার স্পষ্ট ইঙ্গিত অবশ্যই পাওয়া যায়। যাঁরা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন, তাঁদেরকে এগুলো ধারণ করতে হবে। সবগুলো মানতে হবে তা আবশ্যক নয়, তবে জানতে হবে। আমরা জানি যে, আধুনিক নগর-রাষ্ট্রের নির্বাহী হয় প্রধানত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত: ১. প্রশাসন, ২. রাজনৈতিক কিংবা সামরিক সরকার, ৩. রাজনৈতিক বিরোধীদল। যদিও গণতান্ত্রিকরা বলে থাকেন, জনগণই রাষ্ট্রের মূল পরিচালক। কিন্তু কথাটা বর্তমান পৃথিবীর কোথাও বাস্তবে কার্যকর আছে বলে মনে হয় না। আমরা প্রচলিত বিশ্বের তাত্ত্বিক আলোচনায় কিংবা প্রশাসনিক বাস্তব কর্মে জনগণের ক্ষমতা বলতে শুধু ভোটকে দেখতে পাচ্ছি, তবে তাও যদি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে, প্রশাসনিক পরিচালকেরা প্রকৃতপক্ষে দেশের মূল পরিচালক। এখানে রাজনৈতিক সরকার প্রশাসনিক সরকারের কাছে সর্বদাই দায়বদ্ধ থাকেন। রাজনৈতিক সরকারের অবস্থান গাছের বাকলের মতো অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল, আর প্রশাসনিক সরকারের অবস্থান স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদী। রাজনৈতিক বিরোধীদল মূলত ছায়া সরকারের ভূমিকায় থাকার কথা ছিলো। একটি সরকারের রাষ্ট্র-পরিচালনার জন্যে যেমন মন্ত্রিপরিষদ থাকে, তেমনি বিরোধীদলেরও ছায়া মন্ত্রিপরিষদ থাকা প্রয়োজন। বিরোধীদলের মন্ত্রীদের দায়িত্ব হলো, সরকারি মন্ত্রীদের কর্মসূচিসমূহ পর্যবেক্ষণ করা। মোটকথা প্রশাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিচালনা, মন্ত্রীদের দায়িত্ব প্রশাসনের কাজগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা এবং রাজনৈতিক সরকারের সাথে প্রশাসনিক সরকারের সমন্বয় করা, আর রাজনৈতিক সরকারের কাজ হলো এমপি এবং বিরোধীদলের সাথে মন্ত্রীদের কাজের সমন্বয় করা, বিরোধীদলের কাজ হলো সরকারের সাথে জনগণের সমন্বয় করা এবং জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কাজে সরকার উদ্যোগী হলে সরকারকে সাবধান করে দেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি এখনো গড়ে উঠে নি। এই সমন্বয়ভিত্তিক রাজনীতি যেসব দেশে রয়েছে সেসব দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আমরা দেখতে পাই। অস্থিতিশীল রাজনীতি যে কোনো দেশের উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক এবং তা বাংলাদেশের একটি মৌলিক সমস্যা। আমাদের দেশে এ সমস্যা সৃষ্টির পেছনে জাতীয়, আন্তর্জাতিক এবং ঐতিহাসিক অনেকগুলো কারণ অবশ্য আছে। এ কারণসমূহ সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করে পদক্ষেপ না নিলে সমস্যার মৌলিক সমাধান করা যাবে না। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক সমস্যা মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্যে সাধারণত দায়ী করা হয় পুঁজিবাদী বিশ্বের অশুভ দৃষ্টিকে। এ কথার সাথে আমরা দ্বিমত করবো না, তবে সাথে সাথে আমরা আমাদের সরকার এবং জনগণকে এজন্যে প্রধান দায়ী বলে মনে করতে পারি। কারণ, আমরা যদি নিজেদের ব্যাপারে সচেতন এবং দেশপ্রেমিক থাকতাম তবে বাইরের শত্র“ মৌলিক সমস্যা সৃষ্টিতে ব্যর্থ হতো। বাইরের শত্র“দের এজেন্ডাগুলো তো বাস্তবায়িত হয় আমাদের কারো-না-কারো মাধ্যমে। এ কথা কি অস্বীকার করা যাবে যে, অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সর্বক্ষেত্রে তৈরি করে রেখেছে মূলত দেশীয় বিশ্বাসঘাতকরাই। আমাদের রাজনীতিকরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিংবা কাগজের মধ্যে আদর্শিক সংঘাতের কথা বললেও প্রকৃত পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে, আদর্শিক ব্যাপারটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গৌণ। রাজনীতিতে আদর্শিক মতানৈক্য আর দল এবং ব্যক্তিগত সংঘাত এক জিনিস নয়। আমাদের মতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ার মূল উৎস দলগত রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত স্বার্থিক সংঘাত। যেহেতু প্রেক্ষাপট পরির্তন হয় নি তাই নতুন করে এই মূহূর্তে কিছু না বলে শুধু বলতে চাই আমাদেরকে অন্তরে দেশপ্রেম জাগ্রত করে মাঠে কাজে নামতে হবে। হাতে অনেক কাজ। সময়ের খুবই অভাব। স্বার্থপর আর ভণ্ডরা মুখোশের নিচে বসে দেশটার মূল কাঠামো ক্ষয় করে দিচ্ছে। বর্তমানে নেতৃত্বহীন আমরা গোটা জাতি। আমাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে। নিজে না পারলে সন্তানকে প্রস্তুত করে গড়তে হবে। এগিয়ে যেতে হবে। থেমে থাকার সুযোগ নেই। দেশের স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র কাজটিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আসুন, নতুন শপথে দেশ গড়ার জন্যে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ি।