বিভাগ: ইসলামের আলো

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাখিয়াছি মর্মন্তদ শাস্তি। আর মানুষ অকল্যাণ কামনা করে; যেইভাবে কল্যাণ কামনা করে; মানুষ তো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রিয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৭:১০-১১’’।
বস্তুতান্ত্রিক নাস্তিকতা মানবজাতির জন্য ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অকল্যাণকর, যা ইসলাম পছন্দ করে না; কিন্তু পাশ্চাত্য জগৎ ও অন্যান্য দেশে এমন কি মুসলিম দেশেও তাদের অনুসারীরা সে দিকেই ধেয়ে চলেছে। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু উহারা নহে, যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৩:১-৩।’’
দরিদ্র ও দারিদ্র্য সম্পর্কে ইসলাম ঃ ১. মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য: বৈষয়িক দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে ইসলামী ধারণা প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের জেনে নেয়া প্রয়োজন আল্লাহ্ কেন মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে। আমি উহাদের নিকট হইতে জীবিকা চাহি না এবং ইহাও চাহি না যে, উহারা আমার আহার্য যোগাইবে। আল্লাহই তো রিয্ক দান করেন এবং তিনি প্রবল, পরাক্রান্ত’’। ‘‘আল-কুরআন, ৫১:৫৬-৫৮।’’
আল্লাহ্ প্রতিটি প্রাণীর জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলেন: ‘‘সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করিবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করিবে যাহাতে তোমরা সফলকাম হও’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬২:১০।’’ তিনি আরোও বলেন: ‘‘তোমরা কি দেখ না, আল্লাহ্ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সমস্তই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁহার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিয়াছেন? মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতাবশত আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে, তাহাদের না আছে পথনির্দেশক আর না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩১:২০।’’ আল্লাহ্ মানুষকে নির্দেশ করেন: ‘‘তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করিয়া দিয়াছেন; অতএব তোমরা উহার দিগ-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁহার প্রদত্ত জীবনোপকরণ হইতে আহার্য গ্রহণ কর; পুনরুত্থান তো তাঁহারই নিকট’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬৭:১৫।’’ অতঃপর আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহিও না। আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৮:৭৭।’’ এ ভাবে পৃথিবীতে রিয্ক অন্বেষণ, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন ও অপরের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে আখিরাতে সফলকাম হওয়ার জন্য আল্লাহর ইবাদত্ করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
২. দরিদ্র ও দারিদ্র্যের ইসলামী ধারণা: ইসলামী জীবন দর্শনে দারিদ্র্যকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: (ক) আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য এবং (খ) বস্তুগত দারিদ্র্য। ইসলাম যদিও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় তবুও এ বিষয় উপেক্ষা করেনি যে, মানুষের জন্য সে পরিমাণ পার্থিব সম্পদ অর্জন করা প্রয়োজন, যে পরিমাণ সম্পদ না থাকলে আল্লাহ্র ইবাদতে সম্পদের ঘাটতি জনিত উদ্বেগ উৎকন্ঠার কারণে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ বলেন: “আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না”। “আল-কুরআন, ২৮:৭৭” অর্থাৎ সে পরিমাণ অর্জিত বস্তুগত সম্পদও পৃথিবীতে পার্থিব চিন্তামুক্ত মনে পারলৌকিক কল্যাণ ও সাফল্য লাভে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনে তাঁর ইবাদতের পথ সুগম করার জন্যই ব্যয় করতে হবে। আমরা এখানে এ দু’প্রকার দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনা করব।
ক. আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য: ইসলামের দৃষ্টিতে এই দুনিয়ায় সীমিত কালের জীবন যাপনের মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো পারলৌকিক অনন্ত জীবনের মুক্তির পাথেয় সঞ্চয় করা। মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো আল্লাহ্ সৃষ্ট এই সীমাহীন বিশ্বজগতের জ্ঞান আহরণ করা, যাতে তারা আল্লাহ্র দরবারে পৌঁছতে পারে এবং সেখানে তারা সেই সব প্রিয় মহামানবদের সান্নিধ্য লাভ করতে পারে যারা আল্লাহ্র সীমাহীন সৌন্দর্যের সাক্ষ্য দানে যথোপযুক্ত। এই অবস্থান লাভই তাদের জন্য সৌভাগ্যের চূড়ান্ত পর্যায় এবং এটাই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তাদের জন্য মহাপুরস্কার-জান্নাত বা বেহেশ্ত। পরকালে এই অবস্থান লাভের জন্যই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানেই তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে।
এ দুনিয়ায় মানুষ দু’টি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: একটি আত্মার বিকাশের পক্ষে যা কিছু ক্ষতিকর সে সকল কারণ থেকে আত্মরক্ষা করা এবং আত্মার বিকাশের ও পরিপূর্ণতার সহায়ক বিষয়গুলো ও নির্ধারণ করা। অপরটি দেহের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে আত্মরক্ষা করা ও দেহের সুস্থতা রক্ষার পন্থাগুলো অবলম্বন করা। আল্লাহ্ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও তাঁর পরিচয় লাভ করা এবং তাঁকে ভালবাসাই আত্মার আহার। এ বিষয়ে মানুষ যত বেশি যতœবান হবে ততই আত্মা পরিপুষ্ট হবে এবং তা তার জন্য ইহলৌকি ও পারলৌকিক মঙ্গল। অপরদিকে দেহের পরিপুষ্টি ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজন খাদ্য ও প্রয়োজনবোধে চিকিৎসা। মনে রাখা দরকার, দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। আত্মার জন্যই দেহের প্রয়োজন এবং এ দুনিয়াতেই আত্মার পরিপুষ্টির কর্ষণ করতে হবে।
“দুনিয়ার মোহমায়ার অন্ত নাই। তবে মনে করিও না যে, দুনিয়ার যাবতীয় পদার্থই মন্দ এবং ক্ষতিকর; বরং দুনিয়ায় এমন কতগুলি বস্তু আছে যাহা বস্তুতঃ পারলৌকিক পদার্থ। যেমন, সৎজ্ঞান ও সৎকর্ম। এইগুলি দুনিয়ার অন্তর্গত হইলেও ইহা দুনিয়ার পদার্থের মধ্যে পরিগণিত নহে। এই দুইটি বস্তু মানবাত্মার সহিত পরকাল পর্যন্ত যাইবে”। “ইমাম গাযালী, হুজ্জাতুল ইসলাম, কিমিয়ায়ে সাআদাত, ঢাকা: অনুবাদক: মাওলানা নূরুর রহমান, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১৯৯৫, খ. ১, পৃ. ৮৬-৯৩”
দুনিয়ার ধনদৌলত ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: “দেখ, তোমরাই তো তাহারা যাহাদিগকে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করিতে বলা হইয়াছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করিতেছ। যাহারা কার্পণ্য করে তাহারা তো কার্পণ্য করে নিজেদেরই প্রতি। আল্লাহ্ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। “আল-কুরআন, ৪৭:৩৮” এই পৃথিবীতে সত্য-জ্ঞানচক্ষু উন্মিলনের তাগিদ দিয়ে আল্লাহ্ আলো বলেন: “আর যে ব্যক্তি এইখানে অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট”। “আল-কুরআন, ১৭:৭২” আল্লাহ্ প্রদত্ত পরম সত্য-জ্ঞানহীন লোক ইহকালে আত্মা বিনষ্টকারী বলে ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই দরিদ্র, পার্থিব ধন-সম্পত্তি তার যাই থাক না কেন। মানুষের এই আধ্যাত্মিক দারিদ্র্যের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ বলেন: “যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। “আল-কুরআন, ৪৭:৩৮” আল্লাহ্ পুণ্যাত্মার বিকাশপ্রাপ্ত, আধ্যাত্মিক চর্চা ও জ্ঞান সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত জাতির উপরই আস্থা রাখেন এবং তাদের পছন্দ করেন পারলৌকিক সম্পদহীন আড়ম্বরপূর্ণ পার্থিব জীবন যাপনকারী আত্মিক দরিদ্রের উপর নয়। তাই আল্লাহ্ বলেন: “যাহারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের চেয়ে ভালবাসে মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহ্র পথ হইতে এবং আল্লাহ্র পথ বক্র করিতে চাহে; উহারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রহিয়াছে”। “আল-কুরআন, ১৪:৩”
খ. বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য: ইসলামের দৃষ্টিতে বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে আলোচনার আগে আমাদের সংসার বিরাগী বা যুহ্দ এবং আসলেও যারা বস্তুগতভাবে দারিদ্র্য তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে।
প্রকৃত সংসার বিরাগী বা যুহ্দ: এ বিষয়ে ইমাম গাযালী র.-এর ভাষ্য হলো: “যে ব্যক্তি বদান্যতা বা দানশীলতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে অথবা পারলৌকিক সৌভাগ্য অন্বেষণ ভিন্ন অপরকোন পার্থিব উদ্দেশ্যে সংসার ত্যাগ করিয়াছে, তাহাকে প্রকৃত যাহিদ বা সংসার বিরাগী বলা যাইবে না। আবার, কেবল পারলৌকিক শান্তির বিনিময়ে ইহকাল বিক্রয় করা তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষগণের নিকট নিতান্ত দুর্বল তুচ্ছ ধরনের ‘যুহদ’ বা বৈরাগ্য। পূর্ণ ও প্রকৃত যাহিদ সেই ব্যক্তিকেই বলা যাইতে পারে, যিনি ইহলোকের ভোগ-বিলাসের প্রতি যেমন অমনোযোগী, তদ্রƒপ পরলোকের চিরস্থায়ী ভোগ-বিলাস এবং সুখ-শান্তি হইতেও অমনোযোগী। অর্থাৎ তিনি পার্থিব সুখ-শান্তির বিনিময়ে পারলৌকিক শান্তি ভোগ করিতেও অনিচ্ছুক। …..ইহলোকের বিনিময়ে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বেহেশ্ত পাইতে ইচ্ছুক না হইয়া উভয় জগতের বিনিময়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলাকে পাইতে চান এবং তাঁহারই দর্শন ও পরিচয়লব্ধ আনন্দে পরিতৃপ্ত থাকিতে উৎসুক হন। একমাত্র আল্লাহ তাআলার সত্তা ব্যতীত অন্য সমস্ত পদার্থই তাঁহাদের দৃষ্টিতে নিতান্ত তুচ্ছ এবং নগণ্য বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। আল্লাহ্ তাআলার তত্ত্বজ্ঞানে যাহারা পরিপক্কতা লাভ করিয়াছেন কেবল তাহারাই এই শ্রেণীর ‘যাহিদ’ হইতে পারেন। এই শ্রেণীর সংসার বিরাগী লোক সাংসারিক ধনৈশ্বর্য হইতে পলায়ন না করিলেও ক্ষতি নাই; বরং তাঁহারা মাল-আসবাব পাইলেই গ্রহণ করিয়া থাকেন এবং নিজের জন্য কিছু না রাখিয়া যথাসময়ে যথাস্থানে ব্যয় করিয়া ফেলেন এবং উপযুক্ত প্রাপককে দান করিয়া থাকেন”। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-১৫৭”। এ ধরনের ‘যাহিদ’-এর দৃষ্টান্ত উসমান রা. ও আয়েশা রা.। বিপুল ধন-ভান্ডার হাতে পেয়েও উসমান রা. সমস্ত ধন উপযুক্ত প্রাপকের হাতে তুলে দিয়ে নিজে নিতান্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। আয়েশা রা. লক্ষ মুদ্রা হাতে পেয়ে সমস্ত মুদ্রাই দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছেন এবং রোযা ইফতারের পর নিজের আহারের জন্য একটি মুদ্রাও গোশ্ত ক্রয়ে ব্যয় করেন নি। (অসমাপ্ত)

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

দরিদ্র ও দারিদ্র্য বর্তমান বিশ্বে একটি অন্যতম আলোচিত বিষয়। এ বিষয়ে পাশ্চাত্যের বস্তুগত ধারণার সাথে ইসলামী ধারণার কোন মিল নেই। ইসলাম ইহকাল এবং পরকালের কল্যাণে ধন-সম্পদ অর্জন ও ব্যয় করতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনে পারলৌকিক বিষয়াদি তেমন প্রাসঙ্গিক বলে ধরা হয় না। যুগে যুগে মুসলমানদের মধ্যে এমনও দেখা গেছে এবং এখনো হয়তো বা তেমন মুসলমান খুঁজে পাওয়া যাবে যারা পারলৌকিক কল্যাণ কামনায় বা কেবল আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ইহলোকে বিত্তশালী হওয়া প্রয়োজন মনে করেন না। এরা প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হয়েও জৌলুস-হীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত। আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতে বিঘœ ঘটতে পারে বিবেচনা করে ইহলৌকিক ভোগ-বিলাস তাঁরা এড়িয়ে চলেন। যেটুকু বৈষয়িক সম্পদ হাতে না রাখলে আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদতে মনের একাগ্রতা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে সামান্যটুকু হাতে রেখেই তাঁরা তুষ্ট। বৈষয়িকভাবে তাঁরা নিতান্তই দরিদ্র জীবন যাপন করলেও আত্মার পরিপুষ্টি ও সমৃদ্ধিতে তাঁরা অনেক মহান এবং উন্নত। এই উন্নত ও মহান আত্মা তাঁরা মহান আল্লাহ্র প্রতি নিবেদন করেন। কিন্তু তাই বলে ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শায়িত করে না, যেমন হালাল পথে অর্জিত ধনও প্রয়োজনাতিরিক্ত নিজ অধিকারে রাখাকে প্রশ্রয় দেয় না। শরীয়তের বিধান অনুসারে উত্তরাধিকার বিধি ও যাকাত প্রদানের মাধ্যমে হালাল সম্পদের সুসমবণ্টনে ইসলাম বিশ্বাসী। ইসলাম দারিদ্র্যকে ভালবাসে, তবে দারিদ্র্যকে কামনা করেনা। এ নিবন্ধে দরিদ্র ও দারিদ্র্যকে প্রথমত পশ্চিমা বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ এবং দ্বিতীয়ত ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে এটাই দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিই উত্তম। নিবন্ধটি সাজানো হয়েছে এভাবে-দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা, দরিদ্র ও দারিদ্র্য সম্পর্কে ইসলাম, ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ।
আমরা সচরাচর দরিদ্র ও দারিদ্র্য শব্দ দুটি পশ্চিমা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে থাকি। এই বিবেচনায় বস্তুগত দারিদ্র্যই প্রাধান্য পেয়ে থাকে যা মূলত বস্তুগত সম্পদের মালিকানা ও ভোগ বিলাসের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলাম দরিদ্র ও দারিদ্র্যকে কেবল সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে দরিদ্রকে মূলতঃ দু’ভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে: (১) বৈষয়িক বা বস্তুগত দরিদ্র এবং (২) আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য। দ্বিতীয় প্রকারের দরিদ্র যা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে সম্পৃক্ত তা পশ্চিমা অর্থনৈতিক আলোচনায় তেমন একটা প্রাধান্য পায় না। এমন কি বস্তুগত দরিদ্র নিরসনের উপায় অবলম্বনের ক্ষেত্রেও যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক বিধিবিধান মেনে চলতে হয়, তার উপরও পশ্চিমা অর্থনীতি তেমন গুরুত্ব আরোপ করে না। আল্লাহ বলেন: “তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না”। “আল-কুরআন, ৪;২৯” ইসলাম এ ক্ষেত্রে মানবজাতিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়, কারণ ইহকালই শেষ কথা নয়। ইহকালের কর্মকান্ডের জন্য প্রত্যেককে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। তাই ইহকাল ও পরকালে কল্যাণকর এমন আর্থিক জীবন যাপনের প্রতি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আল্লাহ বলেন: “মানুষের মধ্যে যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে ইহকালেই দাও বস্তুত পরকালে তাহাদের জন্য কোন অংশ নাই। আর তাহাদের মধ্যে যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও এবং আখিরাতে কল্যাণ দাও এবং আমাদিগকে অগ্নির শাস্তি হইতে রক্ষা কর-তাহারা যা অর্জন করিয়াছে তাহার প্রাপ্য অংশ তাহাদেরই। বস্তুতঃ আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।” “আল-কুরআন, ২:২০০-২০২” অধিকন্তু আল্লাহ আরো বলেন: “পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত আর কিছুই নয় এবং যাহারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাহাদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন কর না?” “আল-কুরআন, ৬:৩২” কেননা “জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে”। “আল-কুরআন, ৩:১৮৫” “এবং তোমাদের মৃত্যু হইলে অথবা তোমরা নিহত হইলে আল্লাহরই নিকট তোমাদিগকে একত্র করা হইবে।” “আল-কুরআন, ৩:১৫৮” আল্লাহ বলেন: “শুধু আমাকে ভয় কর”। “আল-কুরআন, ৫:৩” সুতরাং এ আল্লাহভীতিই পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে কল্যাণ ও সাফল্য অর্জনের প্রধান নিয়ামক। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদেরকে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে হবে, পশ্চিমা নীতি-আদর্শহীন বস্তুগত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।
দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা ঃ ১. দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা: পাশ্চাত্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা অনুযায়ী দারিদ্র্যের পরিমাপ কি কেবল জনপ্রতি প্রয়োজনীয় কেলরি (ঈধষড়ৎরব) গ্রহণের মাত্রার ভিত্তিতে শরীর ঠিক রেখে বেঁচে থাকাটাই জরুরি বুঝতে হবে? নাকি জীবনের সাথে যুক্ত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ইত্যাদিরও প্রয়োজন আছে? এ ছাড়াও যে বিষয়টি অধিক বিবেচনার দাবি রাখে তা হলো দারিদ্র্যের ধারণাটি কি দেশ কালের প্রেক্ষিতে ‘অবিমিশ্র’ (অনংড়ষঁঃব), ‘আপেক্ষিক’ (জবষধঃরাব), নাকি ‘পরিবর্তনশীল’ (উুহধসরপ)? অর্থাৎ দরিদ্র কি এমন একটি প্রপঞ্চ (চযবহড়সবহড়হ) যা সামাজিক ও ঐতিহাসিক পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা নির্ধারিত, নাকি এমন একটি অবস্থান যা কতিপয় সর্বকালীন স্থির সূচক (ঝঃধঃরপ ওহফবী) দ্বারা নির্ধারিত।
যে আর্থিক অবস্থাকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে দারিদ্র্য বলা হত না, আজকের সমাজব্যবস্থায় তাকে দারিদ্র্য বলতে কেউ দ্বিধা করবে না। সমাজে যদি কমবেশি সকলেই একই জীবনযাত্রার মান ভোগ করে তবে সেখানে কেউ কাউকে দরিদ্র বলার সুযোগ থাকে না। সে সমাজে কেউ নিজেকে দরিদ্র ভাবারও কারণ থাকে না। অপরদিকে, কোন দেশ বা সমাজের ভেতরে কিংবা বাইরের কোন দেশে যদি ধন বৈষম্য থাকে এবং সমাজের একটি অংশ অপর অংশের তুলনায় অধিক বিত্তশালী বা ধনী হয়, তাহলে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অংশটির অবস্থান নির্ধারিত হয়ে যায়। অর্থাৎ দারিদ্র্যের অনুভূতি সমাজে বা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ধন বৈষম্যের মাত্রার উপর নির্ভরশীল।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “দারিদ্র্য সীমারেখা (ঢ়ড়াবৎঃু ষরহব) হয়েছে প্রতি বয়স্ক মানুষের জন্য বার্ষিক ১০,৮৩০ ডলার এবং চারজনের একটি পরিবারের বার্ষিক ২২,০৫০ ডলার আয়ের নিরিখে”। “মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩ তম সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০” অপরদিকে, ইধহমষধফবংয, রিঃয ধ ২০০০ মৎড়ংং হধঃরড়হধষ রহপড়সব ঢ়বৎ পধঢ়রঃধ ড়ভ লঁংঃ $৩৮০ যিরপয ধঃ ঢ়ঁৎপযধংরহম ঢ়ড়বিৎ ঢ়ধৎরঃু নবপড়সবং $১,৬০৫০ ঢ়বৎ পধঢ়রঃধ ধহফ রিঃয ধ (পঁৎৎবহঃ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ড়ভ ১৬০ সরষষরড়হ) ধহফ রিঃয ২৯% ড়ভ ঃযব ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ষরাব ড়হ ষবংং ঃযধহ $১ ধ ফধু (ড়ৎ ষবংং ঃযধহ $৩৬৫ ঢ়বৎ ুবধৎ) ধহফ ৭৮% ষরাব ড়হ ষবংং ঃযধহ $২ ধ ফধু (ড়ৎ ষবংং ঃযধহ $৭৩০ ঢ়বৎ ুবধৎ)। “ঞড়ফধৎড়, গরপযধবষ চ. ধহফ ঝঃবঢ়যবহ ঈ. ঝসরঃয, ঊপড়হড়সরপ উবাবষড়ঢ়সবহঃ, উবষযর: ঊরমযঃ ঊফঁপধঃরড়হ, চঁনষরংযবফ নু চবধৎংড়হ ঊফঁপধঃরড়হ (ঝরহমধঢ়ড়ৎব) চঃব., ওহফরধহ ইৎধহপয,শ ২০০৮, ঢ়. ৫০৩” এ হিসেবের ভিত্তিতে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে গড়ে চার সদস্য বিশিষ্ট প্রায় চার কোটি পরিবারের প্রতিটির বাৎসরিক আয় প্রায় ৬,৬০০ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মোট পরিবার সংখ্যার ২৯% অর্থাৎ ১.১৬ কোটি পরিবারের (জনপ্রতি দৈনিক ১ মার্কিন ডলারের কম হিসেবে) বার্ষিক আয় ১,৪৬০ মার্কিন ডলারের কম এবং ৭৮% অর্থাৎ ৩.১২ কোটি পরিবারের (জনপ্রতি দৈনিক ২ মার্কিন ডলারের কম হিসেবে) বার্ষিক আয় ২,৯২০ মার্কিন ডলার। এ হিসেব থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, মার্কিন মুল্লুকের যে সকল বয়স্ক সদস্য দারিদ্র্য সীমায় অবস্থান করছে তারা বাংলাদেশের গড়পরতা চার সদস্য বিশিষ্ট যে কোন পরিবারের তুলনায় সচ্ছল। আবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে সকল চার সদস্য বিশিষ্ট পরিবার বার্ষিক ২,৯২০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা কম আয় নিয়ে জীবন যাপন করছে তারা চার সদস্যের ঐ সকল পরিবারের তুলনায় সচ্ছল যাদের বার্ষিক আয় ১,৪৬০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা কম, যদিও এটা সত্য যে, উভয় শ্রেণীর বার্ষিক আয়ের পরিবারগুলোই মার্কিন মানদন্ডে চরম দারিদ্র্য জীবন যাপন করছে। “বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানবেতর জীবনধারা যেমন দেখি, সে রকম দারিদ্র্য আমেরিকায় চোখে পড়েনি কোথাও। এর কারণ, বিকশিত বাজার অর্থনীতির দেশ আমেরিকায় আর আমাদের দেশের জাতীয় বা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমারেখা এক নয়’’। ‘‘মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩ তম সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০’’ এ থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, দারিদ্র্য সীমায় অবস্থানরত মার্কিন মুল্লুকের বয়স্ক সদস্য ও চার সদস্য বিশিষ্ট পরিবারগুলোর বার্ষিক আয় বাংলাদেশের অধিকাংশ সচ্ছল পরিবার ও সদস্যদের সমান্তরাল বা বেশি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ভেবে দেখুন, ‘‘সে প্রস্তর যুুগের আদিম সাম্যবাদী সমাজে, যখন সব মানুষ অতি অল্প পরিমাণ সম্পন্ন হলেও সমাজের মোট জীবন-উপকরণ সবাই মিলে সমান ভাগ করে নিয়ে জীবন যাপন করত, তখন কি কেউ নিজেকে দরিদ্র (কিংবা ধনী) বলে অনুভব করত? এসব বিবেচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দারিদ্র হলো একাধারে একটি বস্তুনির্ভর বাস্তবতা এবং তার চেয়েও বেশি, তা হলো একটি সামাজিক অনুভব যা সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্বারা কালপরিক্রমায় একেক মাত্রায় ও রূপে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সমাজে বৈষম্যের মাত্রা দ্বারা বহুলাংশেই দারিদ্র্যের চেহারা ও অনুভব নির্ধারিত হয়’’। ‘‘সেলিম, মুজাহিদুল ইসলাম, ক্ষুদ্রঋণের জন্য ‘খাই-খালাসী আইন’ প্রয়োজন, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২২তম সংখ্যা, ২২ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০।’’
এ ধরনের ধন বৈষম্য ইসলাম সমর্থন করে না: ‘‘আল্লাহ্ জীবনোপকরণে তোমাদের কাহাকেও কাহারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাহাদিগকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে তাহারা তাহাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদিগকে নিজেদের জীবনোপকরণ হইতে এমন কিছু দেয় না যাহাতে উহারা এ বিষয়ে তাহাদের সমান হইয়া যায়। তবে কি তাহারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করে?’’ ‘‘আল-কুরআন, ১৬:৭১।’’ এ থেকে এটাই অনুমিত হয় যে, ইসলাম ধন-সম্পদের ব্যক্তি মালিকানায় আস্থা রেখেই এর শরীয়া ভিত্তিক সমবণ্টনে বিশ্বাস।
২. পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণ: এ কারণ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে সংক্ষেপে বলা যায়- ঞযব পড়ৎহবৎংঃড়হব ড়ভ ঃযব পধঢ়রঃধষরংঃ সড়ফব ড়ভ ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ রং, যড়বিাবৎ, ঃযব ভধপঃ ঃযধঃ ড়ঁৎ ঢ়ৎবংবহঃ ংড়পরধষ ড়ৎফবৎ বহধনষবং ঃযব পধঢ়রঃধষরংঃং ঃড় নুঁ ঃযব ষধনড়ঁৎ ঢ়ড়বিৎ ড়ভ ঃযব ড়িৎশবৎ ধঃ রঃং াধষঁব, নঁঃ ঃড় বীঃৎধপঃ ভৎড়স রঃ সঁপয সড়ৎব ঃযধহ রঃং াধষঁব নু সধশরহম ঃযব ড়িৎশবৎ ড়িৎশ ষড়হমবৎ ঃযধহ রং হবপবংংধৎু ঃড় ৎবঢ়ৎড়ফঁপব ঃযব ঢ়ৎরপব ঢ়ধরফ ভড়ৎ ঃযব ষধনড়ঁৎ ঢ়ড়বিৎ. ঞযব ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব মার্কস-এর ভাষায়: [ঞযব] রহপৎবসবহঃ ড়ৎ বীপবংং ড়াবৎ ঃযব ড়ৎরমরহধষ াধষঁব ও পধষষ ‘ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব.’ ঞযব াধষঁব ড়ৎরমরহধষষু ধফাধহপবফ, ঃযবৎবভড়ৎব, হড়ঃ ড়হষু ৎবসধরহং রহঃধপঃ যিরষব রহ পরৎপঁষধঃরড়হ, নঁঃ ধফফং ঃড় রঃংবষভ ধ ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব ড়ৎ বীঢ়ধহফং রঃংবষভ. ওঃ রং ঃযরং সড়াবসবহঃ ঃযধঃ পড়হাবৎঃং রহঃড় পধঢ়রঃধষ. ঝঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব …. ংঢ়ষরঃং ঁঢ় রহঃড় াধৎরড়ঁং ঢ়ধৎঃং. ওঃং ভৎধমসবহঃং ভধষষ ঃড় াধৎরড়ঁং পধঃবমড়ৎরবং ড়ভ ঢ়বৎংড়হং, ধহফ ঃধশব াধৎরড়ঁং ভড়ৎসং, রহফবঢ়বহফবহঃ ঃযব ড়হব ড়ভ ঃযব ড়ঃযবৎ, ংঁপয ধং ঢ়ৎড়ভরঃ, রহঃবৎবংঃ [র.ব. টংঁৎু], সবৎপযধহঃং’ ঢ়ৎড়ভরঃং, ৎবহঃ, ্ প. …. ডযধঃবাবৎ নব ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হ ড়ভ ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব ঃযব রহফঁংঃৎরধষরংঃ পধঢ়রঃধষরংঃ ৎবঃধরহ ভড়ৎ যরসংবষভ, ড়ৎ ুরবষফং ঁঢ় ঃড় ড়ঃযবৎং, যব রং ঃযব ড়হব যিড়, রহ ঃযব ভরৎংঃ রহংঃধহপব, ধঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃবং রঃ.’’ ঠরফব. গধৎী, ঈধঢ়রঃধষ. ঠড়ষ. ও. ১৯৪৮. চঢ়. ১৪৯, ৫২৯-৫৩০’’ ঢ়ৎড়ফঁপবফ রহ ঃযরং ভধংযরড়হ রং ফরারফবফ ধসড়হম ঃযব যিড়ষব পষধংং ড়ভ পধঢ়ঃধষরংঃং ধহফ ষধহফড়হিবৎং, ঃড়মবঃযবৎ রিঃয ঃযবরৎ ঢ়ধরফ ংবৎাধহঃং, ভৎড়স ঃযব চড়ঢ়ব ঃড় ঃযব কবরংবৎ ফড়হি ঃড় ঃযব হরমযঃ ধিঃপযসধহ ধহফ নবষষড়.ি ডব ধৎব হড়ঃ পড়হপবৎহবফ যবৎব রিঃয যড়ি ঃযরং ফরংঃৎরনঁঃরড়হ পড়সবং ধনড়ঁঃ নঁঃ ঃযরং সঁপয রং পবৎঃধরহ: ঃযধঃ ধষষ ঃযড়ংব যিড় ফড় হড়ঃ ড়িৎশ পধহ ষরাব ড়হষু ড়হ ঃযব ঢ়রপশরহমং ভৎড়স ঃযরং ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব, যিরপয ৎবধপয ঃযবস রহ ড়হব ধিু ড়ৎ ধহড়ঃযবৎ.’’ গধৎী, কধৎষ, ঋৎবফবৎরপশ ঊহমবষং, ঝবষবপঃবফ ডড়ৎশং, গড়ংপড়:ি ঋড়ৎবরমহ খধহমঁধমবং চঁনষরংযরহম ঐড়ঁংব, ১৯৬২. ঠড়ষ. ও, ঢ়. ৫৫৮.’’
পুঁজিবাদী অর্থনীতির এ জাতীয় শ্রম-শোষণ ইসলামী অর্থনীতিতে নৈতিকতা পরিপন্থী। ‘‘দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকেদের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদের জন্য মাপিয়া অথবা ওজন করিয়া দেয়, তখন কম দেয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ৮৩:১-৩’’। আরো বলা হয়েছে, ‘‘শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের টালবাহানা করা জুলুম।’’ ‘‘মান্নান অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল ও অন্যান্য সম্পাদিত, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০০. পৃ. ৪৯৯ এই গ্রন্থে হাদিসটি বুখারী ও মুসলিম, সূত্র: মিশকাত, পৃ. ২৫১ থেকে উদ্ধৃত।’’ আল্লাহ্ বলেন: ‘‘প্রতিশ্র“তি পালন করিও; নিশ্চয় প্রতিশ্র“তি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হইবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৭:৩৪।’’ শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক আদায়ে টালবাহানাকারীকে আল্লাহ্র দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।
৩. পাশ্চাত্যের বস্তুতান্ত্রিক ব্যস্ততা: পুঁজিবাদে বস্তুগত সম্পদ আহরণে তৎপর পাশ্চাত্যের মডেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ‘‘আমেরিকা জোর গলায় দাবি করে, তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবার, বন্ধু ও বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় হয় বস্তুগত নানা সংগ্রহ ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা পূরণের জন্য। কোন না কোন ভাবে আমেরিকানরা বাজারের দাস হয়ে পড়ছে। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্ব জুড়েই ক্রমশ বেশি বেশি মানুষ এই ভাগ্য বরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’’। ‘‘মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩তম, সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০’’। এ বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক্ অবহিত: ‘‘মানুষ ধন-সম্পদ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪১:৪৯’’। সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল-কুরআনের সাবধান বাণী: ‘‘হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহ্র প্রতিশ্র“তি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদিগকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই আল্লাহ্ সম্পর্কে তোমাদিগকে প্রবঞ্চিত না করে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩৫:৫।’’ পাশ্চাত্যের বস্তুগত কল্যাণ সাধনায় ত্বরাপ্রিয় ব্যস্ত পরলোকে বিশ্বাসহীন মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের অকল্যাণ করে বসে: এবং যাহারা আখিরাতে ঈমান আনে না তাহাদের জন্য প্রস্তুত (অসমাপ্ত)

কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলাম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আনয়নের আহবান জানাতে হবে। এ বিষয়ে লুকমান হাকীমের উপদেশগুলো প্রণিধানযোগ্য। যা প্রতিটি মানবসন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ়, কর্মকে পরিশুদ্ধ, চরিত্রকে সংশোধন ও সামাজিক শিষ্টাচারকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। আল-কুরআনে উক্ত উপদেশাবলি চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, (হে নবী, স্মরণ করো) যখন লুকমান তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললো,  হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় শিরক গুরুতর অপরাধ।
এভাবে অভিভাবকগণ পর্যায়ক্রমে সন্তানদের সামনে ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো যেমন আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতের প্রতিটি পর্যায় যেমন কবর, হাশর, জান্নাত, জাহান্নাম এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের পরিচয় অত্যন্ত সুন্দর ও যৌক্তিকভাবে তুলে ধরে সেগুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন। ফলে সন্তানের ঈমান হবে সুদৃঢ়। আর ঈমান দৃঢ় ও শিরকমুক্ত হলে নৈতিক গুণাবলি অর্জন তার জন্য অত্যন্ত সহজ হবে।
জ্ঞান মানুষের অমূল্য সম্পদ। মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই মানবিক গুণাবলি  উৎকর্ষিত ও বিকশিত হয়। যে জ্ঞানের উৎকর্ষিত ও বিকশিত হয়। যে জ্ঞানের  কল্যাণেই মানবজাতি সমগ্র জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন। সেটি হলো কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান। আল-কুরআন সকল জ্ঞানের উৎস। হাদীস তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে সকল মুসলিমের জন্য আবশ্যক করে দিযেছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, জ্ঞানার্জন সকল মুসলিমের উপর ফরজ।
বস্তুত জ্ঞানার্জন দীনকে ভালভাবে উপলব্ধি করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দীনের কল্যাণ ও উৎকর্ষ নির্ভর করে জ্ঞানার্জনের উপর। একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই আল্লাহকে সত্যিকারার্থে ভয় করে তাঁর আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করে। যেমন আল-কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাহদের মধ্যে কেবল বিদ্বানগণই আল্লাহকে ভয় করে। সুতরাং মাতা-পিতা সন্তানকে ঈমানের শিক্ষা  প্রদানের পর ইসলামের যথার্থ জ্ঞান দান করবেন এবং তাদের অনুসন্ধিৎসাকে জাগিয়ে তুলবেন। যাতে করে তারা অর্জিত জ্ঞানের  দ্বারা ভাল-মন্দের, ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে এবং নিজেদেরকে বিরত রাখতে পারে অপরাধকর্ম থেকে।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ইবাদতের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। ইবাদত বলা হয় চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতা সহকারে আল্লাহর আনুগত্য করা। ব্যাপক অর্থে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করার নামই ইবাদত। ইসলামের মৌলিক ইবাদত যথাক্রমে সালাত, সিয়াম, হজ্ব, যাকাত প্রত্যেকটিই মানুষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপন করেছে এাবং প্রত্যেকটিরই চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষকে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ও অপরাধ প্রবণতা থেকে মুক্ত করে কেবলমাত্র এক আল্লাহর অনুগত বান্দাহ বানানো। যেমন সালাত মহান আল্লাহর সাথে তাঁর বান্দাহদের গভীর সম্পর্ক স্থাপন ও আত্মসমর্পণের ভাবধারা সৃষ্টি করে। যা তাদেরকে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে বাধা দেয়। আলা-কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হয়। যা মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”
এভাবেই ইবাদত পালনের মাধ্যমে যাবতীয় অপরাধকর্ম থেকে বিরত থাকার মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায় ইসলাম। মাতা-পিতা শৈশবকাল থেকেই সন্তানদের সালাত, সিয়ামসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদত অনুশীলনের ব্যবস্থা করবেন। যাতে করে তারা কুপ্রবৃত্তি বা শয়তানের প্ররোচণায় অপরাধ কর্মে লিপ্ত না হয় এবং পরবর্তী  জীবনে ইবাদত পালনে অভ্যস্ত হয়। শিশু-কিশোরদের উপর সালাত ফরয না হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স.) সন্তানদেরকে সালাত আদারে ব্যাপারে অভিভাবকদের নির্দেশ এবং প্রয়োজনে প্রহারের অনুমতি দিয়ে বলেন, “তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছরে পদার্পণ করলে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিবে। দশ বছর বয়সে সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার করবে এবং তাদের জন্য  আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করবে।”
চরিত্র মানুষের উত্তম ভূষণ। মানুষের আচার-আচারণ ও দৈনন্দিন কাজ-কর্মের মধ্য দিয়ে যে স্বভাব প্রকাশিত হয় তাকে আখলাক বা চরিত্র বলে। বিশ্ববরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইমাম গাযালী (রহ.) চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘চরিত্র হলো মানব মনে প্রোথিত এমন অবস্থা, যা থেকে কোন কর্ম চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অনায়াসে প্রকাশিত হয়। আর মানুষের আচার-আচরণ ও কাজ-কর্ম সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আদর্শের আলোকে গড়ে উঠলে তাকে বলা হয় নৈতিকতা। শৈশবকাল থেকেই মূলত নৈতিকতা বিকশিত হওয়া শুরু হয় এবং কৈশোরকালের শেষ পর্যায়ে গিয়ে চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে। “সাধন কুমার বিশ্বাস ও সুনতা বিশ্বাস, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও নির্দেশনা, শিশু-কিশোরের নৈতিকতার উন্নয়নে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য। মা-বাবা নৈতিকতা মেনে চললে এবং শিক্ষা দিলে শিশু-কিশোররা তা অনুকরণ করে মেনে চলতে শিখবে। এভাবে তারা চরিত্র গঠনের নৈতিক গুণাবলী অর্জন করতে পারলে কিশোর অপরাধ প্রবণতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত চরিত্র গঠনের উত্তম গুণাবলী যেমন তাক্ওয়া, লজ্জাশীলতা, সত্যবাদিতা, ওয়াদা পালন, আমানতদারিতা, সবর, ইহসান, বিনয়, নম্রতা, উদারতা ও দানশীলতা প্রভৃতি গুণাবলী পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানকে শিক্ষা দানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। এ ক্ষেত্রে সন্তানকে উদ্দেশ্য করে লুকমান (আ.) এর উপদেশগুলো সকল পিতা-মাতার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে। যা আল-কুরআনে সুন্দরভাবে উল্লিখিত হয়েছে, “হে প্রিয় বৎস!  সালাত কায়েম করবে, ভাল কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজে নিষেধ করবে এবং বিপদ-আপদে ধৈর্য্য ধারণ করবে, এটিই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ। অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করবে না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণা করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন উদ্ধত অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করবে সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করবে; নিশ্চয়ই স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (স.) সন্তানদেরকে শৈশবকাল থেকে শিষ্টাচার শিক্ষা প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আর যখন সন্তান ছয় বছর বয়সে পদার্পণ করবে, তখন তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিবে।’
পিতা-মাতা সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করার শিক্ষা দিবেন যেমন খাবার, পানাহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও গৃহে প্রবেশের শিষ্টাচার সহ যাবতীয় আদব শিখাবেন। যা তাদের নৈতিকমান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এ প্রসঙ্গে ‘উমার ইবন আবী সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, আমি শৈশবকালে রাসূলুল্লাহ (স.) এর গৃহে ছিলাম। আমার হাত খাবার পাত্রের চতুর্দিকে যাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) আমাকে বললেন, “হে বালক! আল্লাহর নাম বলো, ডান হাতে খাও এবং নিজের সম্মুখ হতে খাও। এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শিশু-কিশোরদের সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়াও শিশু যে পরিবেশে মানুষ হবে সে পরিবেশটিকে যথাসম্ভব সবদিক থেকে স্বাস্থ্যসম্মত করে তুলতে হবে। অভাব-অনটন, পারিবারিক সমস্যা, পিতা-মাতার কলহ-দ্বন্দ্ব যেন সন্তানদেরকে স্পর্শ না করে সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। শিশু-কিশোরদেরকে অশ্লীল বিনোদন থেকে দূরে রাখতে সুস্থ গঠনমূলক চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে যেমন উপকারী খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আনন্দ ভ্রমণ প্রভৃতি। তাদের নিত্যসঙ্গী, খেলাধূলার সাথী ও বন্ধু-বান্ধব যাতে সুনির্বাচিত হয় সেদিকে পিতা-মাতাকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা বন্ধু ভাল না হলে জীবন-জগৎ ও পরকাল সবই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এজন্যই ইসলাম বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বনের গুরুত্বারোপ করেছে।
এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলুল্লাহ (স.) কে ভাল লোকদের সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “নিজেকে তুমি তাদেরই সংস্পর্শে রাখবে যারা সকালে ও সন্ধ্যায় আহবান কারে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরে নিয়ো না; যার চিত্তকে বা অন্তরকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না”। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর স্বভাব চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়, কাজেই তোমাদের মধ্যে যারা বন্ধু গ্রহণ করবে, তারা যেন পর্যবেক্ষণ করে তা গ্রহণ করে”।
শিশু-কিশোররা যে সমাজে বসবাস করে সে সমাজেরও রয়েছে অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। সমাজে যদি অন্যায়-অনাচার অবাধে চলতে থাকে, তাহলে শিশু-কিশোররা তা অনুসরণ করে অপরাধ প্রবণ হতে পারে। ফলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সমাজ থেকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ করতে হলে কেবলমাত্র শিশু সমাজকে উন্নত করলেই চলবে না; বরং সমগ্র সমাজের উন্নয়ন করতে হবে। সমাজের নৈতিক আদর্শ, পারস্পরিক আচরন, কর্তব্যপরায়ণতা, সামাজিক সচেতনতা প্রভৃতির মান্নোয়ন হলে স্বাভাবিকভাবেই তখন অপরাধ সমাজ থেকে লুপ্ত হয়ে যাবে। এজন্যই ইসলাম সমাজে বসবাসরত সকল মানুষের মৌলিক অধিকারে নিশ্চয়তা বিধান করেছে। সমাজের সকল সদস্যের মধ্যে সৌহার্দ-সম্প্রীতি বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, দুরবর্তী সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না”।
ইসলাম সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়-অবিচার, অপকর্ম প্রতিরোধ করে সমাজকে স্থিতিশীল, শান্তিময় ও কল্যাণকর রাখার জন্য ভাল কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের বাধা প্রদানের কর্মসূচী কার্যকর করার আহবান জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা মুসলিম সমাজকে লক্ষ্য করে বলেন, “তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল অবশ্যই হতে হবে, যারা মানুষদেরকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজ হতে বিরত রাখবে”। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা কল্যাণকর ও আল্লাহ ভীতির কাজে পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে না”।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (স.) সমাজে অন্যায়, অপকর্ম হতে দেখলে তা প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যায় ও গর্হিত কাজ করতে দেখলে সে যেন তা তার হাত দিয়ে (বল প্রয়োগের মাধ্যমে) প্রতিহত করে। এতে সক্ষম না হলে সে যেন তার মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে) প্রতিহত করে, তাতেও সক্ষম না হলে সে যেন তার অন্তর দিয়ে তা (অপছন্দ করে/মূলোৎপাটনের পরিকল্পনা করে) প্রতিহত করার চেষ্টা করে। আর এটি হলো ঈমানের দুর্বলতম অবস্থা”।
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, সমাজের একজন সদস্য হিসেবে মু’মিনের দায়িত্ব হলো নিজে সৎকর্ম সম্পাদন করবে ও অসৎকর্ম থেকে বিরত থাকবে এবং অন্যকেও ভাল কাজে উৎসাহ দিবে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। সমাজের বৃহত্তর পরিসরে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন, সমাজ সেবামূলক সংগঠন, ধর্মীয় সংগঠন ও ক্রীড়া বিষয়কে সংগঠন শিশু-কিশোরদের আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব সর্বাপেক্ষা বেশী।
মানব জীবনে শিক্ষা একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। মহান স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগতের পরিচয় লাভের জন্য শিক্ষা গ্রহণ আবশ্যক। আল্লাহকে চিনতে হলে এবং তাঁকে সঠিকভাবে মানতে হলে শিক্ষা লাভের বিকল্প নেই। এছাড়াও শিক্ষার মাধ্যমেই শিশু-কিশোরদের মানবিক বৃত্তিগুলো বিকশিত হয়। তাদের মেধা, মনন ও রুচি উৎকর্ষ লাভ করে এবং আচার-আচরণ হয় পরিশীলিত ও মার্জিত। পারিবারিক গন্ডি পেরিয়ে শিশু-কিশোররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে এবং এখানেই তাদের শিক্ষার মূল ভিত রচিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষায়তনে শিশু যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, পরবর্তী জীবনে তার চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণে তাই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। শিশু-কিশোররা তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের  কাছ থেকে যা শিখে তাই তার হৃদয়ে অঙ্কিত হয়। পারিবারিক পরিবেশে যদি এর সমর্থন মিলে তাহলে তা তার চরিত্রে প্রোথিত হয়ে যায়। অতএব, অভিভাবক যদি মনে করেন যে, নৈতিকতা সম্পন্ন করে তিনি তার সন্তানকে গড়ে তুলবেন তাহলে তাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, নিয়ম-শৃঙ্খলা, সহপাঠী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার আচরণ; তাদের জীবন-দর্শন, তাদের সাথে স্পর্ক, শিক্ষার বিষয়বস্তু ও পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়গুলো ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেননা এগুলো শিক্ষার্থীর আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত তাবি’ঈ মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীন (রহ.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই ইলম হচ্ছে দীন। সুতরাং কার নিকট থেকে দীন গ্রহণ করছ তা  সতর্কতার সাথে দেখে নিবে’। (অসমাপ্ত)

কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলাম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন মোবাইল, ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, ইউটিউবের ন্যায় গণমাধ্যমগুলো শিশু-কিশোরদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। তাই উক্ত গণমাধ্যমগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকরা যথেষ্ট সচেতন না হলে কোমলমতি শিশু-কিশোররা অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। বিশেষ করে কুরুচিপূর্ণ যৌন আবেগে ভরপুর ম্যাগাজিন ও পত্রিকা কিশোর-কিশোরীদের মন-মানসিকতার উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। যৌন রসে সিক্ত সিনেমা, বিজ্ঞাপন চিত্র, ফ্যাশন শো-এর নামে টেলিভিশনে প্রদর্শিত যৌন আবেদনময়ী অনুষ্ঠানমালা আবেগপ্রবণ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ও মানসিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বিপথগামী করে তোলে। এছাড়া টেলিভিশনে প্রদর্শিত দুঃসাহসিক অভিযাত্রার সিরিয়াল, ভায়োলেন্স এবং অপরাধের নানা কলা-কৌশল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিশোর-কিশোরীরা অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।
মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্তিও অনেক ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধের উৎপত্তি ঘটায়। মাদকদ্রব্য ক্রয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। এছাড়াও মাদকদ্রব্য পাচার ও বিপণনের কাজে কিশোর-কিশোরীরা জড়িত থাকার কারণে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটতে পারে এবং দেখা দিতে পারে নানা ধরনের অপরাধ। এজন্যই মাদকদ্রব্যকে বলা হয়েছে, সকল প্রকার খারাপ কাজের সূতিকাগার।। কেননা মাদকাসক্ত ব্যক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তার মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয় ঘটে। ফলে সে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী-শিশু নির্যাতন, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, আত্মহত্যা, পকেটমারা ইত্যাদি বড় বড় সামাজিক  অপরাধে জড়িয়ে  পড়ে। সর্বোপরি মাদকাসক্তি মানষকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিমুখ করে রাখে এবং পারস্পরিক শত্র“তা সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দেয়। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, “শয়তান চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্র“তা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে, আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?
মদপানের ভয়াবহতা ও অনিষ্টতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘উছমান রা. বলেন, ‘পূর্ববর্তীকালে একজন ভালো লোক সর্বদা ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকত। একজন মহিলা হিংসার বশবর্তী হয়ে তার ক্ষতি করার ইচ্ছা করলো। তখন সে তার দাসী পাঠিয়ে লোকটিকে ডেকে আনল। লোকটি মহিলার ঘরে প্রবেশ করলে সে দরজা বন্ধ করে দিল। একজন সুন্দরী মহিলা, একটি সুদর্শন বালক ও এক পেয়ালা মদ দেখিয়ে মহিলাটি বললো, আমি প্রস্তাব করব, তার কোন একটি গ্রহণ না করলে তোমার মুক্তি নেই। হয় এই সুন্দরী মহিলার সাথে ব্যভিচার করতে হবে, নয়তো এ সুদর্শন বালককে হত্যা করতে হবে, আর না হয় মদ পান করতে হবে। লোকটি ভেবে দেখল, তিনটি অপরাধের মধ্যে মদ পান অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধ। অতএব, লোকটি মদ পান করার সিদ্ধান্ত নিলো। অতঃপর সে বললো, আমাকে মদ দাও। তখন তাকে মদ পান করতে দেযা হলো। সে অধিক মদ পান করে সম্পূর্ণভাবে মাতাল হয়ে গেল। এরপর সে ঐ সুন্দরী মহিলার সাথে ব্যভিচার করলো এবং এক পর্যয়ে বালটিকেও হত্যা করলো।’ উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে বুঝাযায় যে, মদ পানকারী শুধু নির্দিষ্ট একটি অপরাধের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তার দ্বারা অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।
আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাবে মানসিক গুণাবলীর সুষ্ঠু বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অভাবে শিশু-কিশোররা অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠে। এজন্যই প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড “সিগমুন্ড ফ্রয়েড, ঝরমসঁহফ ঋৎঁফ, ১৮৫৬ সালের ৬ই মে মোরাভিয়ার অন্তর্গত ফ্রাইবার্গ নামক একটি ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জেকর ফ্রয়েড এবং মাতার নাম এ্যামিলিয়া নাথানস। তিনি ১৮৭৩ সালে ১৭ বছর বয়সে ডাক্তারী পড়তে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৮৮১ সালে ২৫ বছর বয়সে ডাক্তারী পাশ করে ডক্টর অব মেডিসিন উপাধি লাভ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি মারা যান। অবদমিত কামনাকে অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ব্যাপারে বার্ট্রান্ড রাসেলের মন্তব্যটিও প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “বেশির ভাগ নিষ্ঠুরতার জন্ম হয় শৈশবকালীন বঞ্চনা এবং নিপীড়নের কারণে। মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হলে মনের কোমল অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে তার বদলে জন্ম নেয় হিংসা, নিষ্ঠুরতা এবং ধ্বংসাত্মক মনোভাব। এছাড়া ব্যক্তিগত আবেগীয় সমস্যাও কিশোর অপরাধের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের কিশোররা খুব সহজেই অনিয়ন্ত্রিত আবেগে আক্রান্ত হয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও  চাহিদা পুরণের মাধ্যমে সুখ ও সন্তুষ্টি লাভে সচেষ্ট হয় এবং অপরাধ সংঘটন করে। এজন্যই মার্কিন মনোবিজ্ঞানী হিলে ও ব্র“নার কিশোর অপরাধের জন্য বাধাগ্রস্ত আবেগকে দায়ী করেছেন।
কিশোর অপরাধ সংঘটনে উপর্যুক্ত কারণগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সক্রিয় থাকতে পারে। তবে কিশোর অপরাধের প্রধান ও মূল কারণ হলো মানসিক। কেননা মানুষের প্রতিটি কর্মই মনের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়ে থাকে। আর মানসিক বিকাশ সঠিক ও সুন্দর প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন না হলে শিশু-কিশোরদের আচরণে বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং তাকে অপরাধ প্রবণতার দিকে ধাবিত করে। মানব মন মহান আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এর সুষ্ঠু লালন ও বিকাশ সাধন করলে তা ভাল কাজ সম্পাদন করে। আর লালন পালন ও বিকাশ সাধনে ত্র“টি হলে তা দ্বারা মন্দ কর্ম বা অপরাধ সংঘটিত হয়। মনের এ বিপরীতমুখী দ্বিবিধ আচরণের বাস্তব তত্ত্ব তুলে ধরে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “প্রাণের শপথ, আর শপথ সে সত্তার, যিনি তাকে সুসংহত করেছেন। অতঃপর তাকে দিয়েছেন ভাল-মন্দের অনুভূতি। যে তাকে পরিচ্ছন্ন রেখেছে, সে নিশ্চিত কল্যাণ লাভ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে মলিন করেছে।  নু’মান ইবন বাশীর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, “সাবধান শুনে রেখো,  দেহ বা শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে, যখন তা সুস্থ ও ভাল থাকে তখন সমস্ত দেহ ও শরীর ভাল থাকে এবং তা যখন নষ্ট ও বিকৃত হয়ে যায় তখন সমস্ত দেহ ও শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেটি হলো ক্বালব বা অন্তর।
কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমন্ডিত। সঠিক পন্থায় শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ না হওয়ার কারণেই মূলত কিশোর অপরাধ সংঘটিত হয়। এ ছাড়াও যে সব কারণে এই ব্যাধির সৃষ্টি হয়, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কিশোর অপরাধ প্রতিকার করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ইসলাম সর্বজনস্বীকৃত প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগের মাধ্যমে তা প্রতিকার করেছে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ইসলাম বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। আর সংশোধনমূলক ব্যবস্থায় নিয়েছে বাস্তবসম্মত নানা পদক্ষেপ।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বলতে বুঝায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে যাতে প্রথম থেকেই অপরাধ  প্রবণতার সৃষ্টি না হয়, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করা। যেসব কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দেখা দেয়, সেগুলোকে আগে থেকে দূর করাই এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। “সাধন কুমার বিশ্বাস ও সুনীতা বিশ্বাস, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও নির্দেশনা, মানবজীবন কতগুলো স্তর বা ধাপের সমষ্টি। জীবন পরিক্রমায় এই স্তর বা ধাপ অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হয়। শিশু-কিশোরদের জীবন-প্রকৃতি বড়দের থেকে আলাদা। তাদের চাহিদা এবং বিকাশকালীন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও ভিন্নতর বিধায় পরিবেশ পরিস্থিতি শিকার হয়ে তারা যেন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য যেসব কার্যকারণ অপরাধকর্মে লিপ্ত হতে তাদেরকে উৎসাহিত করে অথবা তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় কিংবা তাদেরকে তা করতে বাধ্য করে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে অপরাধ সংঘটনের পূর্বেই তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছে ইসলাম। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর কতিপয় আবশ্যকীয় দায়িত্বারোপ করেছে, যা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের উত্তম স্থান হলো পরিবার। জন্মের পর শিশু পারিবারিক পরিবেশে মাতা-পিতার সংস্পর্শে আসে। শিশুর সামাজিক জ ীবনের ভিত্তি পরিবারেই রচিত হয়। তাই তাদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এ জন্যই ইসলাম শৈশবকাল থেকে ঈমানের শিক্ষা, ‘ইবাদতের অনুশীলন, ইসলামের যথার্থ জ্ঞানার্জন ও নৈতিকতা উন্নয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে পরিবারের উপরে। যাতে করে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ শিশু-কিশোররা অপরাধমুক্ত থাকতে পারে। আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে এবং তাদের পরিজনদের অপরাধমুক্ত জীবনযাপন করার মাধ্যমে জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।
উক্ত আয়াতের তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত মুফাস্সির ইমাম কুরতুবী রহ. লিখেছেন যে, আমাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার পরিজনদের ইসলামী জীবন ব্যবস্থা, সমস্ত কল্যাণকর জ্ঞান ও অপরিহার্য শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া আমাদের কর্তব্য। অনুরূপভাবে মহানবীর স. হাদীসেও শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু বিকাশ ও সামাজিকীকরণে পরিবারের দায়িত্বের বিষয়টি নির্দেশিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, “প্রত্যেকেই নিজ পরিবারের লোকদের তত্ত্বাবধায়ক এবং সে নিজের অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর স্ত্রী তার স্বামীর সংসার ও তার সন্তানাদির অভিভাবক। তার এ দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। রাসূলুল্লাহ স. আরো বলেছেন, “পিতা তার নিজের সন্তানকে যা কিছু দান করেন তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ভাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। অতএব, বলা  যায় যে, কিশোর-কিশোরীর আচরণ ও ব্যক্তিত্বের  উন্নয়নে পরিবার সর্বাধিক অনুকূল পরিবেশ যোগায়। বিশেষ করে এক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভূমিকা অপরিসীম। কেননা তারাই শিশু-কিশোরের সামনে বহির্বিশ্বে বাতায়ন প্রথম  উন্মুক্ত করে দেয় এবং সন্তানের অনুপম চরিত্র গঠনের কার্যকর অবদান রাখতে পারেন।
ঈমান “ঈমান শব্দের অর্থ হলো বিশ্বাস করা। পরিভাষায় রাসূলুল্লাহ স. তাঁর মহান রবের থেকে যা নিয়ে এসেছেন তা মনেপ্রাণে গ্রহণ ও বিশ্বাস করাকে ঈমান বলে। মানব জীবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ মানবজাতিকে ঈমানের দিকে দা’ওয়াত দিয়েছেন। জাগতিক জীবনের প্রকৃত শান্তি, বিশুদ্ধ জীবনযাত্রা, সামগ্রিক কল্যাণ ও পারলৌকিক উক্তি ইত্যাদি সবকিছুর সফলতা প্রকৃত অর্থে ঈমানের বিশুদ্ধতার উপরই নির্ভরশীল। ঈমান হলো সকল প্রকার অপরাধ প্রতিরোধক। অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ঈমানের ভূমিকা অপরিসীম। যার হৃদয় মনে ঈমান সক্রিয় ও জাগরুক থাকে, সে কখনোই কুরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধান লংঘন করে অপরাধে লিপ্ত হতে পারে না। তবে ঈমান যেমন মানুষকে আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত বানায়, তেমনি কুফর বানায় শয়তানের অনুসারী। যারা নিজেদেরকে শয়তানের অনুসারীতে পরিণত করবে তারাই শয়তানের প্ররোচণায় সকল প্রকারের পাপকর্ম ও অপরাধে লিপ্ত হতে বাধ্য হবে। আল্লাহ ঈমানদারদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলো না। কেননা যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের নীতি গ্রহণ করবে, শয়তান তাকে অশ্লীলতা ও অপরাধমূলক কর্মেরই আদেশ করবে।
কেবলমাত্র ঈমানই পারে মানুষকে খারাপ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে। এ জন্যই শিশু-সন্তান যখন প্রথম কথা বলতে শুরু করে, তখন ঈমানের প্রশিক্ষণ হিসেবে পিতা-মাতার উচিত, সন্তানের মুখ দ্বারা সর্বপ্রথম আল্লাহর নাম উচ্চারণ করানো। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বলা হয়েছে, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের প্রথম কথা শুরু করবে এই বলে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।
একদা রাসুলুল্লাহ স. জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম? জবাবে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করা। এছাড়াও সন্তানদেরকে আল্লাহর সৃষ্টি জগতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে যুক্তির মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন তথা ঈমান (অসমাপ্ত)

কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলাম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

শিশু-কিশোররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির উপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির উন্নতি। শিশু-কিশোরদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের একটি অংশ কোন কারণে অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম হুমকি ও সুস্থ সমাজ জীবনের প্রতিবন্ধক হোক তা কারো কাম্য নয়। এজন্যই ইসলাম শিশু-কিশোরদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে এবং অপরাধমুক্ত জীবন-যাপনের উপস্থাপন করেছে সর্বজননীন ও কল্যাণকর নীতিমালা। যা  বাস্তবে কার্যকর করতে পারলে পরিবার পেতে পারে কাক্সিক্ষত প্রশান্তি এবং দেশ ও জাতি লাভ করতে পারে অমূল্য সম্পদ। মায়ানমার ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, শ্রীলংকা ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, ভারত ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, পাকিস্তান ৭ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত, ফিলিপাইন ৯ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, থাইল্যান্ড ৭ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত, জাপান ১৪ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত, ইংল্যান্ড ৮ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত, ফ্রান্স ১৩ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, পোল্যান্ড ১৩ াথেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, অস্ট্রিয়া ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত, জার্মানী ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত।
কিশোর অপরাধের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন বিষয়। তথাপিও অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিশোর অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের প্রয়াস চালিয়েছেন। যা অপরাধের নানাবিধ সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা লাভে সহায়ক। কিশোর অপরাধের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আরনল্ড টয়েনবী অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমানের ধর্মহীনতাই অন্যান্য অপরাধের ন্যায় কিশোর অপরাধের কারণ। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের জনক কার্লমার্কস এর মতে, কিশোর অপরাধসহ সব ধরনের অপরাধের মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রভাব। আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের জনক সিজার লোমব্রোসো কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে জৈবিক প্রভাবকে দায়ী করেছেন। সমাজবিজ্ঞানী হিলি এবং ব্রোনার (ঐবধষু ধহফ ইৎড়হহবৎ) কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন।  বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড কিশোর অপরাধের কারণ অনুসন্ধানে বাহ্যিক পরিবেশের পরিবর্তে মানুষের মনোজগতের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
বংশগতি বা উত্তরাধিকার সূত্রে  প্রাপ্ত জৈবিক বৈশিষ্ট্য কিশোর অপরাধের অন্যতম একটি কারণ। শিশু উত্তরাধিকার সূত্রে যে দৈহিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য লাভ করে সেটিই তার বংশগতি। জীববিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, ব্যক্তির মন-মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি, আচার-ব্যবহার, চিন্তাধারা  প্রভৃতি বিষয় বংশগতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে থাকে। জন্মগতভাবে শারীরিক ও মানসিক ত্র“টি শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে তারা অস্বাভাবিক আচরণ ও অপরাধমূলক কর্মে জড়িয়ে পড়ে। জন্মগত শারীরিক ও মানসিক ত্র“টিগুলো যেমন মাথার খুলি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট বা বড়, গাঢ় ও ঘন ভ্রু, চেপ্টা নাক, প্রশস্ত হাতের তালু, প্রশস্ত কান, ঘন চুল, লম্বা বাহু, চোখ বসা, হাত-পায়ে অতিরিক্ত আঙ্গুল, সংকীর্ণ কপাল, অসামঞ্জস্য দাঁত, দুর্বল চিত্ত, ক্ষীণ বুদ্ধি, আত্ম-নিয়ন্ত্রণহীন, অসৎ প্রকৃতি ও বেদনার প্রতি অতি সংবেদনশীলতা ইত্যাদি। উপর্যুক্ত ত্র“টিগুলো থেকে পাঁচটি ত্র“টি শিশু-কিশোরের মধ্যে বিদ্যমান থাকলে অপরাধকর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড. ঐবধষু শিকাগো শহরে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কিশোর অপরাধীদের ৩১% এর দৈহিক বিকাশ অস্বাভাবিক। এছাড়াও ইতালিতে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, দৈহিক অক্ষমতা দূর করা গেলে কিশোরদের অপরাধমূলক আচরণ থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। তবে  কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে বংশগতিকে দায়ী করলে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, একই ব্যক্তির একাধিক সন্তানের মধ্যে ভিন্নধর্মী আচরণের জন্য কী কারণ দায়ী? যদি বংশগতিকেই অপরাধের কারণ মনে করা হয়, তাহলে মানুষ কেন তার কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে? কেননা বংশগতির বিষয়ে মানুষের কোন হাত নেই। আর  আল্লাহ তা’আলার নীতি হলো  একজনের ভার অন্য জনের উপর চাপিয়ে না দেয়া। এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি অপরের পাপের বোঝা বহন করবে না। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন, তোমরা কিছুই জানতে না। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “প্রত্যেক সন্তান ফিতরাত বা স্বভাব ধর্মের উপর জন্মগ্রহণ করে।” উপর্যুক্ত আয়াতসমূহ ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, বংশগতি কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী নয়।
কিশোর অপরাধ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবসময় পরিবারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। কেননা পরিবার মানুষের আদি সংগঠন এবং সমাজ জীবনের মূল ভিত্তি। পরিবারের সূচনা হয় স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক বন্ধনের মাধ্যমে। আর পারিবারিক পরিমন্ডলে সন্তানের জন্ম হয় এবং বিকাশ লাভ করে। সন্তানের স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশের জন্য পিতামাতার মধ্যে সম্প্রীতিময় দাম্পত্য জীবন একান্ত অপরিহার্য। পিতা-মাতার মধ্যে মনোমালিন্য ও কলহ বিবাদ থাকলে সন্তানের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা পরিণামে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। অনুরূপভাবে পরিবারের অন্যান্য সদস্য যদি অনৈতিক বা সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকে তাহলে পরিবারে কিশোর অপরাধ সমস্যা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। তেমনিভাবে ভগ্ন পরিবার ও কিশোর অপরাধের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেননা ভগ্ন পরিবারে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরিবারের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শিশু-কিশোররা ত্র“টিপূর্ণ আচার-আচরণ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে উঠে। অন্যদিকে বাসস্থানের অনুপযুক্ত পরিবেশ কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যেমন নিম্নমানের গৃহায়ণ ও বস্তি এলাকার পরিবেশে শিশু-কিশোররা জীবনের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে বিচ্যুত আচরণ দ্বারা তারা তাদের আশা আকাক্সক্ষা ও চাহিদা পূরণে সচেষ্ট হয়। এভাবেই বাসস্থানের খারাপ পরিবেশ কিশোর-কিশোরীদের অপরাধ প্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়।
অর্থনৈতিক অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কিশোর অপরাধের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। দরিদ্রতা ও সম্পদের প্রাচুর্য উভয়ই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কিশোর অপরাধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দরিদ্রতার কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে কিশোররা বিভিন্ন প্রকারের অপরাধে লিপ্ত হয়ে থাকে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ (স.) কুফরীর পাশাপাশি দরিদ্রতা থেকেও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কুফরী ও দরিদ্রতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, দরিদ্রতা কুফরী ডেকে আনে। তেমনিভাবে সম্পদের প্রাচুর্যের অপব্যবহার শিশু-কিশোরদেরকে অন্যায়, অপকর্ম ও অপরাধে লিপ্ত হতে সহায়তা করে। মহান আল্লাহ এ বাস্তবতাকে স্মরণ করে দিয়ে বলেন,  আল্লাহ তার বান্দাদেরকে জীবনোপকরণে প্রাচুর্য দিলে তারা জমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। কিশোর অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক সামাজিক পরিবেশের প্রভাব অপরিসীম। বিধায় আবাসিক পরিবেশ, সঙ্গীরে প্রভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূর্বলতা, সামাজিক শোষণ-বঞ্চনা ইত্যাদি সামাজিক উপাদানগুলো শিশু-কিশোরদের আচরণে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।শিশু-কিশোরদের নৈতিক ও সামাজিক আচরণের উপর আবাসিক পরিবেশের  প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এজন্যই বাসস্থানের অনুপযুক্ত পরিবেশ (যেমন ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকা) কিশোর-কিশোরীদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ধাবিত করতে পারে। বিভিন্ন আবাসিক এলাকার উপর পরিচালিত গবেষণামূলক জরিপে প্রতীয়মান হয় যে, বস্তি এলাকার বিরাজমান সামাজিক পরিবেশই অপরাধমূলক আচরণের জন্য অনেকাংশে দায়ী। কেননা বস্তি এলাকার লোকজন সাধারণত অস্থায়ী বাসিন্দা হয়  এবং তারা ঘন ঘন বাসস্থান পরিবর্তন করে। তাদের পরস্পরের মধ্যে সামাজিক সংযোগ ও সংহতি থাকে না। এরূপ পরিবেশে শিশুরা গৃহের বাইরে অবাধে অপরাধমূলক আচরণে লিপ্ত হয়।
কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে সঙ্গদলের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিশোর-কিশোরীরা এই বয়সে পরিবারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চলতে চায় এবং পাড়া-প্রতিবেশী. খেলার সাথী ও সমবয়সীদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এধরনের সম্পর্কের মাধ্যমে শিশু-কিশোররা অত্যন্ত সহজে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে পারে, যা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন বা পরিবার-পরিজনের নিকট থেকে তা করতে পারে না। সুতরাং সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে কেউ অসৎ প্রকৃতির বা অপরাধপ্রবণ থাকলে তাদের প্রভাবে অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠে। রাসূলুল্লাহ স. ভাল ও খারাপ প্রকৃতির সঙ্গীর সাথে উঠা-বসার বাস্তব পরিণতি উপমার মাধ্যমে তুলে ধরে বলেন, ভাল মানুষের সাহচর্য লাভকারী ব্যক্তি মিসক সুগন্ধিদ্রব্য বিক্রেতার ন্যায়। সে যদি তোমাকে মিসক নাও দেয়, তবে এর একটু ঘ্রাণ তোমার নিকট পৌঁছবেই। আর মন্দ লোকের  সাহচর্য অবলম্বনকারী কর্মকারের ন্যায়। কর্মকারের হাপরের ময়লা তোমার গায়ে না লাগলেও একটু ধোয়া হয়েও তোমার গায়ে লাগবে।
সামাজিক পরিবেশে পরিবারের ভূমিকার পরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব শিশু-কিশোরদের জীবনে অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে এ সকল প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যেমন শিক্ষকের বিষয়জ্ঞান, সততা, আন্তরিকতা, ছাত্র শিক্ষকের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, ছাত্র-ছাত্রীর নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চেতনা কার্যত অনুপস্থিত। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের জন্য গঠনমূলক চিত্তবিনোদন, খেলা-ধূলার সুযোগ সুবিধা ও শিক্ষকদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির অভাবও প্রকট। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম ও শিক্ষা পদ্ধতি শিশু-কিশোরদের রুচি ও সামর্থ্যরে অনুপযোগী হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তারা নানা অপরাধমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে নিজেদের মানসিক তৃপ্তি লাভ করার চেষ্টা করে। যেমন স্কুল পালিয়ে তারা রাস্তায় ঘোরাফিরা করে এবং ইভটিজিং, আত্মহত্যা, মাদকদ্রব্য গ্রহণ ও বিপণনসহ নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে জটিল আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় উপযুক্ত শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও পেশা গ্রহণে ব্যর্থ কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের সামঞ্জস্য  বিধান করতে না পারার কারণে সামাজিক শোষণ বঞ্চনার শিকার হয়। ফলে তাদের মনে তীব্র হতাশা ও নৈরোশ্য দানা বাঁধে, যা এক পর্যায়ে সমাজের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও আক্রোশে রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে এই ব্যর্থ কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এবং অপরাধমূলক আচার আচরণে লিপ্ত হয়।
কিশোর অপরাধের সাথে ভৌগোলিক পরিবেশের এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন মরু এবং গ্রীষ্ম প্রধান এলাকার মানুষ সাধারণত রুক্ষ্ম স্বভাবের ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে থাকে। এ ছাড়াও অরণ্যে ঘেরা দুর্গম পাহাড়ী  এলাকা, চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার কিশোর-কিশোরীরা তুলনামূলক অপরাধপ্রবণ হয়। অপরাধবিজ্ঞানী ডেক্সটারের মতানুযায়ী, বায়ূর চাপের সাথে মানুষের স্নায়ুবিক চাপ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এবং তার ফলে ব্যারোমিটারে পারদের উঠা-নামার সাথে অপরাধ প্রবণতার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। অন্যদিকে জলবায়ূর প্রভাবজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার অনেক শিশু-কিশোর পারিবারিক পরিবেশের বাইরে উদ্বাস্তু ও ভাসমান হিসেবে বেড়ে উঠে। বিধায় জীবনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এসব কিশোরের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ঘন ঘন কর্মসংস্থান পরিবর্তন :  পিতা-মাতার ঘন ঘন কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে শিশু-কিশোররা নতুন নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সংস্পর্শে এসে সহজেই তা অনুসরণ করতে পারে না এবং তাদের ব্যক্তিত্ব অসম্পূর্ণভাবে বেড়ে উঠে। ফলে এটি শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতার জন্ম দেয়। (অসমাপ্ত)

মানব জীবনে কুরআন হাদীস

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সূরা-কিরাত পাঠ করার  পর হাঁটুতে হাত রেখে মস্তক অবনত করতে হয় অর্থাৎ রুকুতে যেতে হয়। রুকুতে তিনবার সুবহানা রাব্বিয়া আজীম তাসবীহ পড়তে হয়: অতঃপর সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় বলতে হয়। সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ। এ সময়ে দু’হাতকে সোজাভাবে শরীরের দু’পাশে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। এর পরেই আসে সিজদা। সিজদায় কপাল, নাক ও হাতের তালুকে মাটিতে রাখতে হয়। মনে মনে তিনবার বলতে হয় সুবহানা রাব্বিয়াল আলা। এরপর বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় কিছু সময় বসে আবার সিজদায় যেতে হয়। এবং তাসবীহ পাঠ করার পর আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। একজন ব্যক্তির এই বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা, ইহরাম বাঁধা, সূরা-বিরাআত পড়া, নত হওয়া, পর পর দু’বার সিজদায় যাওয়া এসব কিছুর নাম হল রাকআত।
দ্বিতীয় রাকআতে প্রথম রাক’আতের মতো সূরা-কিরাত পড়তে হয়, রুকু-সিজদায় যেতে হয়, তাসবীহ বলতে হয়। শুধু পার্থক্য এই যে, দ্বিতীয় রাকআতে সে সেজাদা থেকে উঠে দাঁড়ায় না। বরং নির্দিষ্ট ভঙ্গিমায় বসে আত্তাহিয়াতু পাঠ করতে হয়।
সালাত আদায়ের জন্য যদি কিবলার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না যায়, তাহলে অনুমানে যে কোন দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা যাবে। আর আল্লাহ তো সর্বত্রই বিরাজমান। তবে সালাত আদায় করতে হবে খুবই ধীরস্থিরভাবে ও মনোযোগ সহকারে। দাঁড়ান অবস্থায় দৃষ্টি থাকতে হবে সিজদার সময় যেখানে কপাল ঠেকবে ঠিক সে স্থানে, আর রুকুর সময় দৃষ্টি থাকবে দু’পায়ের সম্মুখ ভাগে। ডান বাম অথবা উপরের দিকে তাকানো যাবে না। অনুরূপভাবে অহেতুকভাবে নড়াচড়া বা আগ-পিছ করা যাবে না। সর্বক্ষণ স্থির থাকতে হবে, রুকু-সিজদায় যেতে হবে নির্ধারিত ভঙ্গিমায়। দৈনন্দিন জীবনের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজে আইন। পূর্ণবয়স্ক প্রতিটি মানুষের জন্য এটা ফরজ। আর জানায়ায় সালাত ফরযে কিফায়া। সমাজের কিছু সংখ্যক লোক এ সালাত আদায় করলে অন্যদেরটা আদায় হয়ে যায়। আর কেউ যদি এ সালাত না পড়ে তাহলে সমাজের সবাইকে গুনাহগার হতে হয়।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত অপেক্ষা জানাযার সালাত খানিকটা ভিন্নতর। জানাযায় সালাতেও ওযু করতে হয। কিবলামুখী হতে হয়, নিয়ত করতে হয়, সূরা-কিরাত পড়তে হয়। কিন্তু এখানে রুকু-সিজদায় যেতে হয় না, বা তাশাহুদের ভঙ্গিমায় বসতে হয় না। সালাত আদায় করতে হয় চার তকবীরে। প্রথমে আল্লাহু আকবর বলার পর সানা, সূরা ফাতিহা ও অন্য যে কোন একটি সূরা তেলাওয়াত করতে হয়। দ্বিতীয় তকবীরের পর নবী করীম (সা)-র উপরে দরূদ পাঠ ও সমস্ত মু’মিন মুসলমানের জন্য মোনাজাত করা হয়। তৃতীয় তকবীরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়। চতুর্থ তকবীরের পর সালাম ফিরিযে জানাযার সালাত শেষ করতে হয়। কেউ অসুস্থ ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে এবং দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে সমর্থ না হলে সে তার সুবিধা অনুসারে বসে বা শুয়ে সালাত আদায় করবে। শুয়ে সালাত আদায় করার সময় সে নিয়ম মাফিক সূরা-ক্বিরাত ও দোয়া দরূদ পাঠ করবে। আর কল্পনায় রুকু-সিজদায় যাবে। তাতেই তার সালাত আদায় হয়ে যাবে। অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী অবস্থায় একজন মুসলমান বসে এমনকি শুয়েও নামায আদায় করতে পারে। বসে নামাজ পড়ার সময় সে এমনভাবে রুকুতে যাবে যাতে কপাল পানি স্পর্শ না করে। যদি শুয়ে শুয়ে নামাজ পড়তেই হয়, তাহলে সে পর্যায়ক্রমে দাঁড়ান, রুকু, সিজাদ ও তাশাহুদের কথা স্মরণ করবে। আর বিভিন্ন পর্যায়ে যে সমস্ত দোয়া-দরূদ তেলাওয়াত করতে হয়, মনে মনে সেগুলি তেলায়াত করতে হবে। তাতেই তার সালাত আদায়  হয়ে যাবে।
কেউ যখন সফরে থাকে তখন সে চার রাক’আতের পরিবর্তে দুই রাক’আত ফরজ পড়ে থাকে। আবার বিশেষ পরিস্থিতে সময়ের স্বল্পতা বা প্রচন্ড চাপের মুখে থাকলে দু’ওয়াক্তের সালাতকে একত্রে আদায় করতে পারে। যেমন দুপুর থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে যে কোন সময় যোহর ও আছর এর মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করা যায়। হজ্বের সময় আরাফাতে ও মুজদালিফায় এ ভাবে সালাত আদায় করতে হয়।
মাযহাব : ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বিভিন্নতা ক্ষেত্রে মুসলমাদের মধ্যে প্রধানত তিনটি সম্প্রদায় রয়েছে-সুন্নী, শিয়া ও খারিজী। সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আবার বিভিন্ন দল বা মাযহাব রয়েছে। যেমন সুন্নীদের মধ্যে রয়েছে চারটি মাযহাব ঃ হানাফী, শাফী, মালেকী ও হাম্বলী। বিভিন্ন সম্প্রদায় বা মাযহাবের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ বা আচরণ ও অনুষ্ঠানগত বৈষম্য ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। এখানে শুধু এটুকুই বলে রাখা যথেষ্ট যে নেতৃস্থানীয় ফকীহ ও মুজতাহিদগণ তাদের নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে নবী করীম (সা.) এর বাণী ও আচার-আচরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। আমল করেছেন তদনুসারে। এখান থেকেই ফকীহগণের মধ্যে এক একটি মতের সূত্র পাত ঘটে। ধর্ম বিশারদগণের অনুসারীদের নিয়ে গড়ে উঠে এক একটি মযহাব। বস্তুতপক্ষে কোন সম্প্রদায় বা মাযহাবেই নতুন কোন ধর্মবিশ্বাস বা আচারণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেনি। সকল সম্প্রদায়ের বা মাযহাবের ভিত্তিমূলে রয়েছে হাদীস।
কখনো কখনো নবী করীম (সা.) নিজেই বিশেষ কোন কাজ বা কাজের ধারাকে পাল্টে ফেলতেন। কখনো এ পরিবর্তন সম্পর্কে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতেন। যেমন-গোড়ার দিকে সালাতে রুকু করার সময় তিনি দুটি হাত নিচের দিকে সোজা ঝুলিয়ে রাখতেন। কিন্তু পরবর্তীতে হাত দুটি হাঁটুর উপর রাখতে শুরু করেন। এবং হাত ঝুলিয়ে রাখার বিধান বাতিল বলে ঘোষণা দেন। কখনো আবার এ জাতীয় পরিবর্তন সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকতেন। নবী করীম (সা.) এর কোন কোন আমল বা কাজের সম্মতি সম্পর্কে আলোচনা উত্থাপিত হয় নবীজীর ওফাতের কয়েক পুরুষ পরে। তখন ধর্ম-বিশারদগণের মধ্যে দেখা দেয় মতপার্থক্য। এখান থেকেই সৃষ্টি হয় দল-উপদলের। অর্থাৎ সুন্নতের বিভিন্নতার সূত্র ধরেই ফকীহগণের মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। আর সে কারণেই কোন সম্প্রদায়ের জন্য অন্য সম্প্রদায়ের মতবাদকে  উপেক্ষা করার অধিকার নেই। এখানে বলে রাখা আবশ্যক যে কোন একটি কাজ নবী করীম (সা.) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সম্পন্ন করলেও কখন কিভাবে পরিবর্তন করেছেন, সবক্ষেত্রে তার ধারাবাহিক কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। যদি থাকত তা হলে স্বাভাবিক নিয়মেই পরের নিয়ম দিয়ে পূর্বের নিয়ম বাতিল হয়ে যেত। ফলে নবী করীম (সা.) একবার যে নিয়মটি পালন করেছেন, যেটার ব্যাপারে তিনি কখনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নি, সেটাও একটা সুন্নত। আর এ সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য নিয়ম-কানুন।
নবী করীম (সা.) এর যতগুলো উপাধি আছে তার মধ্যে একটি হল হাবীবুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর বন্ধু। কুরআন মজীদে আরো স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মধ্যে রয়েছে অনুকরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ (৩১ ঃ ২১)। এ আয়াতের ব্যাখায় বলা যেতে পারে, আল্লাহ তা’আলা আশা করেন যে, মুসলমানরা প্রিয় নবী (সা.) এর সমস্ত আচার-আচরণের উপর আমল করবে। এমনকি তিনি অনিয়মিতভাবে যে কাজ করেছেন, অর্থাৎ শুরুতে যা করেছেন কিন্তু পরে করেননি, অথবা শুরুতে করেননি, কিন্তু পরে করেছেন তার কোনটাই বাদ যাবে না। এভাবেই মুসলমানরা একই কাজ বিভিন্ন ভাবে সম্পন্ন করবে, কিন্তু তাদের কোনটাই সুন্নতের বাইরে যাবে না। আল্লাহ তা’আলা যে বিভিন্ন সম্প্রদায় বা মাযহাব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নবী করীম (সা.)-এর সমস্ত কাজকে একটি স্থায়ী রূপ দিয়েছেন। আর সে কারণেই সমস্ত মাযহাবে মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা থাকতে হবে। কেউ কারো প্রতি অসুহিষ্ণু হতে পরে না।
সালাতের আরবির ব্যবহার : এটা জানা কথা যে, মুসলমানরা আরবি ভাষায় সালাত আদায় করে থাকে। তাদের দোয়া-দরুদ পাঠ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল সব কিছুর ভাষা রীতি আরবি। আরব-অনারব, এমনকি যে সমস্ত এলাকার মুসলমান আরবি জানে না বা বোঝে না, তাদেরও সালাতের ভাষা আরবি। নবী করীম (সা.) এর আমলে এ নিয়মটি চালু ছিল। চৌদ্দ শ’ বছর পর এখনও এ নিয়ম অব্যাহত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে। জান্নাতের ভাষাও হবে আরবি। আপাত দৃষ্টিতে এটাকে খুবই স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত মনে হবে যে, একজন লোক যে ভাষা বোঝে, সে ভাষাতেই আল্লাহ তা’আলার দরবারে আবেদন-নিবেদন জানাবে। আর এটা জানা কথা যে, মাতৃভাষাই হল ইবাদত-বন্দেগী করবার ও তাসবীহর উত্তম মাধ্যম। সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, একজন মুসলমান যে ভাষায় কথা বলে সেটাই হবে তার সালাতের ভাষা। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সাধারণ বিচার-বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করলে এ ধরনের যুক্তির অসারতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
প্রথমেই আসে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। কুরআনুল করীমের বর্ণনা অনুসারে, নবী করীম (সা.) এর পবিত্র স্ত্রীগণকে বলা হয় উম্মুল মু’মিনীন। অর্থাৎ মু’মিনদের মাতা। তাঁদের সবারই মুখের ভাষা ছিল আরবি। সে বিবেচনায় সকল মুসলমানের মাতৃভাষাও আরবি। সুতরাং মাতৃভাষায় দোয়া-দরূদ তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করতে আপত্তি উঠবে কেন? কারো কারো জন্য এ যুক্তি পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। তাদের জনা আবশ্যক যে, ইসলামী আকীদা অনুসারে কুরআন হল আল্লাহর কালাম। কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত অনেক। নফল ইবাদতের মধ্যে এটা সর্বোত্তম ইবাদত। কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে একজন মুসলমান মূলত আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্যে পৌছে এবং এটাই একজন মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য। এটা যেন আল্লাহর দরবারে পৌছার একটি পথ। বৈদ্যুতিক তারের মধ্য দিয়ে বাল্বে যেভাবে আলো সঞ্চারিত হয় এও যেন ঠিক তাই। যারা অধিকতর বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন তাদের জন্য বলা আবশ্যক যে, দোয়া হল আল্লাহ তা’আলার দরবারে আবেদন-নিবেদন করার একটা মাধ্যম। এটা একজনের একান্ত নিজস্ব ও ব্যক্তিগত ব্যাপার। যে কোন ভাষায় বা ভঙ্গিমায় আল্লাহর কাছে নিবেদন করা যায়। এমনকি দোয়া বা মোনাজাতে ব্যক্তি যা ইচ্ছা তাই চাইতে পারে। এ ব্যাপারে তার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। এখানে বান্দা এককভাবে স্রষ্টার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। আর সালাতের বিষয়টি এর ঠিক উল্টো। এখানে আল্লাহ তা’আলার হক আদায় করার ব্যাপারটা মুখ্য। এটা আদায় করতে হয় সম্মিলিতভাবে, জামাআত সহকারে। ফলে সালাতে কেউ নিজস্ব পছন্দ অনুসারে চলতে পারে না। সালাতের নিজস্ব একটি ভঙ্গিমা ও পদ্ধতি রয়েছে। রয়েছে আরকান-আহকাম। জামাআতে ফরয আদায় করা একাকী সালাত আদায় করার চেয়ে অধিক সাওয়াবের। যদি ইসলাম বিশেষ কোন অঞ্চল, গোত্র বা জাতির জন্য নির্ধারিত হত, তাহলে মুসলমানরা অবশ্যই আঞ্চলিক, জাতীয় বা গোত্রীয় ভাষায় ধর্ম চর্চা করতে পারত। কিন্তু ইসলাম একটি সার্বজনীন ও চিরন্তন ধর্ম। ইসলামের আবেদন বিশেষ কোন অঞ্চল গোত্র বা কালের বন্ধনে আবদ্ধ নয়। বরং মুসলমানরা অংসখ্য ভাষায় কথা বলে। তারা বসবাস করে বিভিন্ন গোত্র ও অঞ্চলে। বর্তমান সময়ে আমাদের জীবন অধিকতর বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে। বর্তমান বিশ্বের প্রায় সবগুলো শহরেই মুসলমানদের সাক্ষাৎ মেলে। তারা সে সমস্ত শহরের স্থায়ী অধিবাসী অথবা সফরকারী যেভাবেই থাক না কেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে।  ধরে নেই যে, একজন ইংরেজ চীনদেশ সফরে গেল। চীনা ভাষার একটি অক্ষরও সে বুঝে না। পথ চলতে চলতে হঠাৎ করেই সে শুনতে পেল ‘চিং চ্যাং চাং’-স্বাভাবিকভাবেই সে এর অর্থ বুঝেবে না। এর কারণও জানতে পারবে না। আর এটা যদি ‘আল্লাহু আকবর’ শব্দের আঞ্চলিক পরিভাষা হয় তাহলে হয়ত সে শুক্রবারের জুম্মার নামাজ থেকে বঞ্চিত হবে। অথবা বঞ্চিত হবে অন্য কোন ওয়াক্তের সালাত থেকে।
বলে রাখা আবশ্যক যে, চীন দেশের মসজিদগুলো ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা প্রাচ্যের মসজিদগুলোর  মতো নয়, এমন কি এখানকার মসজিদগুলোর কোন মীনার নেই। ফলে মসজিদ দেখেও সালাতে হাজির হওয়া সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে একজন চীনদেশীয় মুসলমান যদি অন্য কোন দেশে যায়, এবং সে দেশের মুসলমানরা যদি আঞ্চলিক ভাষায় ইবাদত-বন্দেগী করে, তাহলে সেও জামাআত থেকে বঞ্চিত হবে। নিজে মুসলমান হয়েও সেখানকার মুসলমানদের সঙ্গে কোন মিল খুঁজে পাবে না। আর সে  কারণেই ধর্ম চিরন্তন, যার আবেদন স্থান, কালভেদে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে, তার এমন কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকবে যা সকল অনুসারীদের মধ্যে স্পষ্টভাবে বিরাজমান। বস্তুত সালাতের জন্য অভিন্ন আযান ধ্বনি এবং সালাতের নিয়ম-কানুনগুলো এমনি বৈশিষ্ট্যে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে যে, কখনো কখনো দু’টি ভাষার মধ্যে এমনি কিছু শব্দ থাকে যেগুলো শ্রবণের দিক থাকে একই ধরনের। কিন্তু তাদের আন্তর্নিহিত অর্থ সম্পূর্ণরূপে পরস্পর বিরোধী। কখনো কখনো আবার একটি ভাষার একটি সাধারণ শব্দ অন্য ভাষায় খুবই জঘন্য অর্থে ব্যবহৃত হয়। যে ভাষার সঙ্গে আমাদের পরিচিতি যত কম, সে ভাষার ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। আর আল্লাহ তা’আলার ইবাদ-বন্দেগীর ক্ষেত্রে যদি এমন কিছু শব্দ চলে আসে তাহলে সেটা হবে খুবই দুঃখজনক এবং আদবের মস্তবড় বড়খেলাফ। কিন্তু কেউ যদি বাল্যবয়স থেকেই একটি ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে, তাহলে অনায়াসেই এ জাতীয় অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিকে পরিহার করা যায়। সে ক্ষেত্রে একজন অনারবও যদি আরবি ভাষায় দোয়া-দরূদ তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করে তাতেও কোন সমস্যা হতে পারে না। কখনো কখনো এমন সব পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, যখন একজন ব্যক্তি কোন ভাষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবে। তখন ইংরেজ হয়ত ফরাসী, রাশিয়ান বা অন্যকোন ভাষায় সালাত আদায় করতে অস্বীকার করবে। রাজনৈতিক এমনকি ব্যক্তিগত কারণেও  কারো মধ্যে এ রকম অনাগ্রহ জন্মাতে পারে। কিন্তু আরবি কুরআন হাদীসের ভাষা। ফলে যে কোন মুসলমানেরই এ ভাষার প্রতি রয়েছে  আন্তরিক শ্রদ্ধা ও একটি স্বভাবজাত আকর্ষণ। এমতাবস্থায় আরবিভাষী কারো প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি হলেও কুরআনোর ভাষার প্রতি সবাই থাকে আন্তরিক।
বস্তুতপক্ষে আরব জাতির ভাষা হিসাবে আরবির কোন গুরুত্ব নেই। বরং গুরুত্ব এ কারণে যে, নবী করীম (সা.) এ ভাষায় কথা বলতেন, উম্মুল মু’মিনীনের মুখের ভাষা আরবি। সর্বোপরি আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র কালামকে মানুষের নিকট পৌছে দেওয়ার মাধ্যম হিসাবে আরবি ভাষাকে নির্বাচন করেছেন। সমধর্মাবলম্বীদের মধ্যকার ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিকে জোরদার করার জন্য নতুন পন্থা ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করা আবশ্যক। সেক্ষেত্রে ঐক্য বজায় রাখার জন্য বর্তমানে যে ব্যবস্থা বা উপকরণ চালু রয়েছে তাকে উপেক্ষা করার প্রশ্নটি একান্তই অযৌক্তিক। ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও ইবাদত-বন্দেগীতে একটি সাধারণ ভাষা ব্যবহারে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। উদাহরণ হিসাবে আন্তর্জাতিক সভা সম্মেলনের কথা বলা যেতে পারে। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে কেউ তার খেয়ালখুশি ও ইচ্ছামত যে কোন বক্তব্য রাখতে পারে না। যদি কেউ এমনটি করেও থাকে, তাহলে তার বক্তব্য দুর্বোধ্য হয়ে উঠবে। সভার মূল উদ্দেশ্যই তাতে পন্ড হয়ে যাবে। আর সে কারণেই তার বক্তব্যকে অবশ্যই সম্মেলন কর্তৃক স্বীকৃত কোনো ভাষার অনুবাদ করার সুযোগ দিতে হয়। এ ব্যাপারে কেউ কোন রকম আপত্তি তুলতে পারে না। অর্থাৎ তার মাতৃভাষা যাই থাক না কেন, তাকে সর্বজন গ্রহণযোগ্য বিশেষ কোন ভাষার উপর নির্ভর করতে হয়। আরো বলা যেতে পারে কোন অনুবাদই কখনো মূল রচনার সমতুল্য হতে পারে না। তাই দেখা যায় যে, ইতিমধ্যে কুরআনুল করীমের বেশ কিছু ইংরেজি তরজমা প্রকাশিত হলেও এখনো অনেকে নতুনভাবে তরজমা করার উদ্যোগে নিচ্ছেন। নতুনভাবে তরজমা করার উদ্যোগ নেওয়ার সময় সবাই বলেন অতীতের তরজমাগুলোর চাইতে বর্তমান তরজমাটি ভালো, আরো সাবলীল। অনুবাদের জন্য নতুন উদ্যাগ গ্রহণ করতে হচ্ছে এ উদ্যোগে কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। শুধুমাত্র কুরআনুল করীমে ইংরেজি তরজমার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোন গ্রন্থের যে কোন ভাষার তরজমার ক্ষেত্রেই একথা সত্য। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে মূল ভাষা আরবিকে বাদ দিয়ে ত্র“টিপূর্ণ তরজমা দিয়ে সালাত  আদায় করা কি ঠিক হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে যে, অন্যান্য ধর্মে বিভিন্ন ভাষায় ইবাদত-বন্দেগীর সুযোগ থাকলে ইসলাম ধর্মে থাকবে না কেন? এ প্রসঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে যে দুনিয়ার কোন ধর্মগ্রন্থই এখন আর মূল ভাষায় অর্থাৎ ধর্মগ্রন্থ নাযিল হয়েছিল সে ভাষায় পাওয়া যায় না। আবার কিছু গ্রন্থ আছে যার অনুবাদ মূলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তো নয়ই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কজাত চিন্তা থেকে সংযোজিত। এগুলো হয় অনূদিত অবস্থায় অথবা মূল গ্রন্থের অংশ বিশেষরূপে আমাদের হাতে পৌছেছে। ইয়াহূদী, খৃষ্টান এবং অন্য যে কোন ধর্মের জন্য একথা সত্য। এর ব্যতিক্রম ঘটছে একমাত্র কুরআনুল করীমের ক্ষেত্রে। কুরআনুল করীম যে ভাষায় এবং যতটুকু অবতীর্ণ হয়েছিল, এখনো তা মূল ভাষায় এবং অপরিবর্তিত রয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে ইসলামীক কায়দায় দৈনন্দিন জীবনের পরিকল্পনা এবং গন্ডিরেখার পথে চলার তাওফিক দান করুন-আমীন। (সমাপ্ত)

ঈদুল আযহার তাৎপর্য ও কুরবানীর শিক্ষা

কে.এম. মিনহাজ উদ্দিন

মানব জাতি আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব। এই মানব জাতি বিভিন্ন জাতি ও ধর্মে বিভক্ত। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব আছে। আছে আনন্দ মুখরিত দিন। তেমনি ভাবে মুসলমানদেরও আছে দু’টি উৎসব আনন্দের দিন। একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর, অপরটি ঈদুল আযহা। এ দেশের বৃহত্তম জনসমষ্টির কাছে ঈদ এমনই এক আনন্দঘন অনুষ্ঠান। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার অনুষ্ঠান এটি। ধনী-গরীব বলে কোন পার্থক্য নেই এ দিনে। এ দিনের আনন্দ কোন ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠির নয়। এ দিনের আনন্দ সকলের। ঈদের দিন এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সাথে হিংসাদ্বেষ ভুলে মিলে যায়। শত্র“তা ভুলে বুকে বুকে জড়িয়ে অনুভাব করে এক বেহেস্তি সুখ। এক মুসলমান আরেক মুসলমানদের সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার এক মহা সুযোগ সৃষ্টি করে ঈদ। ঈদুল আযহা মুসলিম সমাজের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল আযহার অপর নাম কুরবানীর ঈদ। আরবী শব্দ ‘কুরবাতুন’ বা ‘কুরবান’ থেকে কুরবানী শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতি বছর চন্দ্র মাসের ১০ই জিলহজ্ব ঈদুল আযহা বিশ্বের মুসলমানদের নিকট উপস্থিত হয় কুরবানীর অফুরন্ত আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে। এ দিনে বিশ্বের লাখো কোটি মুসলমান বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আল্লাহর নৈক্যট লাভের আশায় হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর প্রবর্তিত ত্যাগ ও কুরবানীর আদর্শকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন- “সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম কর এবং কুরবানী কর”। (সুরা আল-কাউছার-২) হাদীস শরীফে হযরত যায়ের ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেছেন, একবার রাসূল (আ.) এর সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কুরবানী কি জিনিস? উত্তরে তিনি বলিলেন, এটা তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর সুন্নাত। (ইবনে মাজা ও আহমদ) ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ পালনের একটি বেনজির ইতিহাস রয়েছে। আল্লাহ পাক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আম্বিয়া-ই কেরামকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করেছেন, তাদের মধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর পরীক্ষা উল্লেখযোগ্য ও চিরস্মরণীয়। তাঁর পরীক্ষা সমূহের মধ্যে স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানীর নির্দেশ দেওয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন অগ্নি পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহীম (আ.) ইসমাঈল (আ.) এবং হযরত হাজেরা অর্থাৎ গোটা পরিবারটিই আল্লাহর নির্দেশকে যথাযথভাবে পালন করেছিলেন। আল্লাহ পাক হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর কুরবানী কবুল করলেন। ইসমাঈল (আ.) জাবেহ হলেন না, ইসমাঈল (আ.) এর স্থলে বেহেস্ত থেকে আনীত দুম্বা যবেহ হয়ে গেল। আল্লাহর নির্দেশ পালনে তাদের জীবনের মায়া মমতা আদৌ স্থান পায়নি। তাঁরা আল্লাহর অসাধারণ প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও আনুগত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর অন্তরের কুরবানী কবুল করে পুত্র ইসমাঈল (আ.) এর জীবন উপহার দিয়ে পশু কুরবানীর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত এ সুন্নাত জারি করে দিয়েছেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) হতে কিয়ামত পর্যন্ত এটা সুন্নাতে ইব্রাহীমী হিসেবে চালু থাকবে। সেই ঘটনা স্মরণ করে প্রতি বছর বিশ্বের মুসলমানগণ ঈদুল আযহা উদ্যাপন করে থাকে। জিলহজ্ব মাসের দশম তারিখে কোন ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্যের সমান দ্রব্যাদির মালিক হয় তাহলে প্রত্যেক স্বাধীন ও ধনি মুসলমানের ওপর কুরবানী দেওয়া ওয়াজীব। ঈদুল আযহার তাৎপর্য ও কুরবানীর মহাত্ম্যের প্রতি গুরুত্বরোপ করে মহা নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করেনা সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’। রাসূল (সা.) মদীনা শরীফে ১০ বছর অবস্থান কালে প্রতি বছরই কুরবানী দিয়েছেন।- তিরমিযী। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.)  বরেছেন, কুরবানীর দিনে আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত (কুরবানী করা) অপেক্ষা প্রিয়তর কোনো কাজ নেই। অবশ্যই কিয়ামতের দিন (কুরবানী দাতার পাল্লায়) কুরবানী পশু তাঁর শিং, পশম ও তাঁর ক্ষুরসহ হাজির হবে। কুরবানীর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে পৌছে যায়। তাই তোমরা প্রফুল্ল মনে কুরবানী কর। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)। গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগল ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা যায়। অন্য কোন  জন্তু দ্বারা কুরবানী করা অনুমোদন ইসলামে নেই। একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের পক্ষে এবং গরু, মহিষ ও উট দ্বারা সাতজনের পক্ষে কুরবানী করা যায়। তবে কুরবানীর পশু নির্ধারিত বয়েসের হতে হবে। যেমন- ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক বছর, গরু, মহিষ দু’বছর এবং উট পাঁচ বৎসর বয়সি হতে হবে। কারোকারো মতে ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছয় মাসের হলেও কুরবানী জায়েয হবে যদি এগুলো দেখতে এক বছর বয়সের মতো দেখায়।
কুরবানী পশুগুলোর দৈহিক ত্র“টি থেকে মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়। যেমন- কানা, খোড়া, কান কাটা, লেজ কাটা, শিং ভাঙ্গা ও পাগল পশু দ্বারা কুরবানী করা নাজায়েয। দুর্বল, মজ্জা শুকিয়ে গেছে বা হেঁটে কুরবানীর স্থানে যেতে পারেনা এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা ঠিক হবে না। কুরবানী দাতা নিজ হাতে কুরবানী পশু জবেহ করা উত্তম, তবে প্রয়োজনে অন্য লোক দ্বারাও জবেহ করা যেতে পারে। কুরবানী গোশত নিজেও খেতে পারবে এবং অন্যকেও খাওয়াতে পারবে। যাকে খুশি থাকে প্রদান করতে পারবে। তবে গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং অপর এক ভাগ দরিদ্র, নি:স্বদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া মুস্তাহার। নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমরা মোটা-তাজা পশু দ্বারা কুরবানী কর। কেননা এ পশু ফুলসিরাতে তোমাদের সওয়ারী হবে। রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, হে ফাতিমা আপন কুরবানীর নিকট  যাও। কুরবানীর প্রথম রক্ত বিন্দুতে তোমার সমস্ত গোনাহ মাফ হবে এবং জন্তুটি কিয়ামতের দিন সমুদয় রক্ত, মাংস ও শিং নিয়ে উপস্থিত হবে এবং তোমার আমলের পাল্লা ৭০ গুণ ভারি হবে। মানুষের জীবনে সকল জিনিসের চেয়ে আল্লাহ এবং তার নির্দেশকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া শিক্ষা রয়েছে কুরবানীতে। কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা প্রভৃতি খোদাপ্রেম বিরোধী রিপুগুলোকে আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ অনুযায়ী বশ ও দমন করার শিক্ষাও রয়েছে কুরবানীতে। প্রতি বছর আমাদের মাঝে ঈদুল আযহা ও কুরবানীর ঈদ ফিরে আসে ত্যাগের মহিমা ও আদর্শ নিয়ে। ত্যাগ ছাড়া কখনোই কল্যাণকর কিছু অর্জন করা যায় না। ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে প্রশান্তি ও অফুরন্ত রহমত। কুরবানী অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ করা, তাই আমাদেরকে চিন্তা করে দেখতে হবে যে, আমরা কি আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা লোভ-লালসা, মিথ্যা, অনাচার, অবিচার, অত্যাচার, জুলুম, হানাহানি, স্বার্থপরতা, দাম্ভিকতা, আত্মম্ভরিতা, অহমিকা, দুর্নীতি, সুদ, ঘোষ, গিবদ, পরনিন্দা, হিংসা, বিদ্বেষ, চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী ইত্যাদিকে কুরবানী দিতে তথা ত্যাগ করতে পারছি কি না, না কি ঈদকে মুসলমানের একটি নিছক ধর্মীয় আমোদ- ফূর্তি, দিবস হিসেবেই গ্রহণ করছি। কুরবানীর মাধ্যমে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) যে ত্যাগের আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তাঁর সুন্নাত হিসেবে কুরবানী পালন করা যেন আমাদের জন্য কেবল গোশত খাওয়াতেই পরিণত না হয়। মহান আল্লাহর এই বাণীর কথা অবশ্যই আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না উহাদের গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাক্ওয়া তথা খোদাভীতি- (সুরা হজ্ব- ৩৭) কুরবানী একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রেজামন্দি হাসিলের উদ্দেশ্যে করতে হবে। এতে কোন রকম সামাজিকতা লোক দেখানো বা দামের প্রতিযোগিতা দেখানো হলে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হবে না। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যার ইরশাদ হচ্ছে, হে রাসূল (সা.) আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও মরণ বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য উৎসর্গকৃত। (সুরা- আন’আম- ১৬২) ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ থেকে আমরা এটাই শিক্ষা নিতে পারি আমাদের আশপাশে যারা গরীব-দুঃখী, অভাবি, অসহায়, যাকাত প্রদানের মাধ্যমে আমরা তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঈদের আনন্দে শরীক করে  নিতে পারি। তাহলে ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ সবাইকে ছুঁয়ে যাক- এটাই ঐকান্তিক কামনা।

মহিমান্বিত হজ্ব-কুরবানীর চেতনায় শিরক ও নাস্তিকতামুক্ত সমাজ গড়ুন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

কুরবানী মুসলিম মিল্লাতের ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় এক ইবাদত। এটি হজ্বের একটি অংশ। অবশ্য হজ্ব অনুষ্ঠান ছাড়াও গোটা বিশ্বের মুসলমানগণ ঈদুল আজহা শেষে কুরবানী করে থাকেন। শুধু কুরবানী নয় গোটা হজ্ব অনুষ্ঠানটিই ঐতিহাসিক চেতনাসমৃদ্ধ একটি ইবাদাত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহ্র নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভূক্ত।’’ (সূরা ২ বাকারা: ১৫৮) মনে রাখা প্রয়োজন কুরবানী ও হজ্বের ঐতিহাসিক চেতনাকে বিস্মৃত রেখে পালন করা হলে এ এক ব্যর্থ কসরত ছাড়া আর কিছু ফায়েদা বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। এ জন্য হজ্বের প্রতিটি হুকুম পালন কালে অবশ্যই এর ঐতিহাসিক চেতনাকে সামনে নিয়ে পালন করতে হবে। এজন্য হজ্বের প্রতিটি হুকুম পালন কালে অবশ্যই এর ঐতিহাসিক চেতনাকে সামনে নিয়ে পালন করতে হবে। অন্যথায় হজ্ব অনুষ্ঠান স্রেফ একটি অনুষ্ঠানই থেকে যাবে। হজ্বের প্রায় সবক’টি অনুষ্ঠানের পিছনে মুসলিম মিল্লাতের অবিসংবাদিত নেতা হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর সহধর্মিনী বিবি হাজেরা সহ তাঁদের সংগ্রামমুখর জীবনের একান্ত সহযোগী তাঁরই সুযোগ্য পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) এবং তাঁদের সম্মিলিত দু’আর ফসল শেষ নবী রাসূলে আকরাম (সা.) এর ত্যাগ ও কুরবানীর ইতিহাস বিজড়িত। যারা আল্লাহর মেহমান হয়ে আল্লাহর ঘরের কাছে যাবেন তাঁরা হৃদয়ের কান পেতে শুনবেন, সেখানকার আকাশ-বাতাসে নাস্তিক ও শিরকের মুলোৎপাটনকারী এ দু’জন সংগ্রামী মানুষের দোয়া এখনো গুঞ্জরিত হচ্ছে। মক্কা ও মদীনার অলি-গলি, মাঠ-ঘাট ও ধূ-ধূ মরুভূমির পরতে পরতে এবং হজ্বের সমগ্র পরিবেশে রাসূল (সা.) এর সংগ্রামমুখর জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। মনের চক্ষু দিয়ে দেখবেন মক্কা, মদীনা ও তায়েফের রাস্তায় এখনো মানবতার দরদী নবী (সা.) ও হযরত বেলালের লাল রক্তের কাঁচা দাগ যেন এখনো শুকায়নি। রাতের আঁধারে অনুভব করবেন, ঐ বুঝি মহাকালের সফল রাষ্ট্রনায়ক, সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী ওমরে ফারুক (রা.) ক্ষুধার্ত দু:খী মানুষের খোঁজে বেরিয়েছেন অথবা ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেয়ার নিমিত্তে বস্তা পিঠে পথ চলছেন। উহুদের প্রান্তরকে এখনো কাঁপিয়ে তুলে হক-বাতিলের দ্বন্দ্বে শাহাদাত বরণকারী রাসূলের অতি প্রিয়জন ও সম্মানিত চাচাজান বীর সেনানী আমির হামজা (রা.)। জান্নাতুল বাকিতে দেখবেন নাস্তিক ও শিরক উচ্ছেদে শত শত সাহাবায়ে কেরামের শাহাদাতের নযরানার উজ্ব¡ল নির্দশন আজো জ্বল জ্বল করছে। মিনায় কুরবানীর প্রাক্কালে চোখের সামনে নিয়ে আসবেন নাস্তিক ও শিরকের মূলোৎপটানকারী পিতা ও পুত্র তথা হযরত ইবরাহীম (আ.) ও পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগ ও আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তব নমুনার ইতিহাস।
এ প্রবন্ধে শুধুমাত্র কুরবানীর আলোচনাই করতে চাই। কারণ এটি এমন এক চেতনার নাম যা আল্লাহর ঘরের মেহমান সম্মানিত হজ্ব যাত্রী সহ সকল মুসলমানের জন্য সমভাবে কাজে আসবে। সম্মানিত হজ্বযাত্রী ও কুরবানকারীদের অনুরোধ করব প্রবন্ধটি সামান্য সময়ের জন্য হলেও পড়ে নিবেন এবং নাস্তিক ও শিরক উচ্ছেদে ও ইসলামী আন্দোলনে নিজেদেরকে উদ্দীপ্ত করবেন। আমরা যে পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে প্রতিবছর কুরবানী করি এটি মূলত একটি প্রতিকী কুরবানী। কিন্তু ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসলে আমরা দেখতে পাই এর আগে আরো কতগুলো কুরবানী রয়ে গেছে। ঐ কুরবানীগুলো না দেয়া পর্যন্ত এ শেষ কুরবানী দেয়ার অধিকার কারো নেই। অবশ্য কুরবানী আমরা দিয়ে যেতে পারবো ঠিকই এবং দিয়ে যাচ্ছিও বটে কিন্তু তা আমাদের জীবনকে কতটুকু প্রভাবান্বিত করতে পারছে তার বাস্তব ফলাফল তো আমাদের সামনেই আছে। কই কোথাও তো পরিবর্তনের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয় না। সুতরাং কুরবানীর সার্থকতা তখনই পাওয়া যাবে যদি নিম্নের কুরবানীগুলো আগে দেয়া যায়। সেই কুরবানীগুলো ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনাদের সামনে পেশ করা হলো:
প্রথম কুরবানী ঃ প্রথমত সকল প্রকার মিথ্যা প্রভু তথা তাগুত, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি বিভাগে প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে প্রভু সেজে বসে আছে, তাদের আনুগত্যের গলায় ছুরি চালাতে হবে। তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে এক ও লা-শরিক আল্লাহর কাছে নি:শর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে বা পরিপূর্ণ মুসলিম হতে হবে। সকল প্রকার তাগুত থেকে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহর দিকে রুজু হতে হবে। হযরত ইবরাহিম (আ.) সে কাজটিই আগে করেছিলেন। তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটি ছিল পুরোহিত পরিবার, যে পরিবার নক্ষত্র পূজায় দেশবাসীর নেতৃত্ব দিতো। যে পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেন সে সমাজটি ছিল আপাদমস্তক নাস্তিক, শিরক ও মূর্তি পূজায় নিমজ্বিত। প্রথমত: তিনি নিজ জাতি ও পরিবারের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেননি দ্বিতীয়ত: পৈতৃক মন্দিরের পৌরহিত্যের মহাসম্মানিত গদিটি তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল, যেখানে বসলে তিনি অনায়াসেই জাতির নেতা বনে যেতেন। চারদিক থেকে নযর-নিয়ায এসে জড় হত এবং জনগণ ভক্তি-শ্রদ্ধা ভরে মাথানত ও হাত জোড় করে বসত। সাধারণ মানুষ হতে বাদশাহ পর্যন্ত সকলকে আজ্ঞানুবর্তী গোলাম বানিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু এ বিরাট স্বার্থের উপর পদাঘাত করে সত্যের জন্য দুনিয়া জোড়া বিপদের গর্ভে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি মহান সৃষ্টিকর্তা ও প্রভুর সন্ধানে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্রকে বাতিল প্রভু ভেবে ভেবে অবশেষে যখন সত্যের আলোর সন্ধান পেলেন, তখন নিজ জাতি ও পরিবারকে উদাত্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন: ‘‘তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক বলে মনে কর তাদের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই।’’ তিনি আরো বললেন: ‘‘আমি সবদিক হতে মুখ ফিরিয়ে বিশেষভাবে কেবল সেই মহান সত্তাকেই ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য নির্দিষ্ট করলাম, যিনি সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের মধ্যে শামিল নহি।’’ এ পূর্ণাঙ্গ মানুষটি যৌবনের শুরুতেই যখন আল্লাহকে চিনতে পারলেন তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে বললেন: ‘‘ইসলাম গ্রহণ কর- স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ কর, আমার দাসত্ব স্বীকার কর। তিনি উত্তরে পরিষ্কার ভাষায় বললেন: আমি ইসলাম কবুল করলাম, আমি সারাজাহানের প্রভুর উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করলাম, নিজেকে তাঁর নিকট সোপর্দ করলাম। এটাই ছিল তাঁর প্রথম কুরবানী। এটাই হলো তাঁর প্রথম ছুরি চালানো যা তিনি পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুকরণ, বংশীয় ও জাতীয় গোঁড়ামীর উপর এবং নিজের প্রবৃত্তির সে সকল দুর্বলতার উপর চালিয়েছেন, যার কারণে মানুষ নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে নিজ পরিবেশ ও সমাজের সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়। তখন পরিবেশ ও সমাজ তার তাগুত সেজে বসে। এ সুযোগে তাগুত মানুষের প্রতিটি বিষয়ে নেতৃত্ব দেয়। যেমন ‘নাফস’ এক ধরণের তাগুত। মানুষের পুরো জীবনের লাগাম নাফস নামক তাগুতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় তার সামগ্রিক কর্মকান্ড তাগুত তার খেয়াল-খুশি মত পরিচালনা করে।
দ্বিতীয় কুরবানী ঃ দ্বিতীয়ত একমাত্র আল্লাহর প্রভুত্ব কায়েমের নিমিত্তে নিজের দেশ ও জাতিকে অসংখ্য মিথ্যা রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এজন্য মানুষকে দাওয়াত প্রদান করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ জন্য কায়েমী স্বার্থবাদীসহ দুনিয়ার তাবত তাগুতী শক্তি কমর বেঁধে বিরোধিতায় নেমে যাবে। হেন অস্ত্র নেই যা তারা তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না। তখন আল্লাহতে পূর্ণ তায়াক্কুল রেখে নিজের গন্তব্য পানে পূর্ণ শক্তিতে ছুটে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে কোন প্রকার হতোদ্যম, হীনমন্যতা প্রকারান্তরে তাগুতকেই সাহায্য করার নামান্তর। হযরত ইবরাহিম (আ.) যে পরিবার ও সমাজ এবং পরিবেশে আগমন করেছিলেন তার পুরোটাই নাস্তিক ও শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমন কি রাষ্ট্রশক্তি পুরিপূর্ণভাবে নাস্তিক ও শিরকের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। তিনি আরো জানতেন যে তাওহীদের সন্ধান তিনি পেয়েছেন তা এরা কখনো মেনে নেবে না। বরং এ জন্য তাঁকে কঠিন নির্যাতন ও শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। তবু তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে উঠে দাঁড়ালেন। রাত-দিন তিনি কেবল একটি চিন্তা করতে থাকলেন, দুনিয়ার মানুষকে অসংখ্য রবের গোলামীর নাগপাশ হতে মুক্ত করে কীভাবে এক আল্লাহর বান্দায় পরিণত করা যায়। তিনি প্রথমে নিজের পিতাকে, নিজের খান্দানকে, নিজের জাতিকে, এমনকি রাজাকে পর্যন্ত নাস্তিক ও শিরক থেকে বিরত থাকতে এবং তাওহীদের আকীদা কবুল করতে দাওয়াত দিলেন। এর ফলশ্র“তিতে তিনি একদিকে একা অপরদিকে গোটা দেশ ও জাতি তাঁর মোকাবেলায় এক সারিতে এসে দাঁড়ালো। কিন্তু এর পরও হতোদ্যম হননি, তার মুখ অবসন্ন হয়নি। তখন সিদ্ধান্ত হলো আগুনে পুড়িয়ে মারার। তাতেও তিনি বিরত হলেন না। বরং এ কাজের জন্য লেলিহান অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে পছন্দ করলেন। এটা তাঁর দ্বিতীয় কুরবানী। সুতরাং প্রতিটি হজ্ব যাত্রী ও কুরবানকারীদেরকে যে কোন পরিবেশে নাস্তিক ও শিরক উচ্ছেদ ও তাওহীদের দাওয়াত দানের জন্য দাঁড়াতে হবে। সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকতে পারে। এ সমস্ত আশঙ্কার গলায় ছুরি চালাতে হবে।
তৃতীয় কুরবানী ঃ তৃতীয়ত নাস্তিক ও শিরকমুক্ত সমাজ কায়েমের আন্দোলনের জন্য নিজেদের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ ও লোভ-লালসার গলায় ছুরি চালাতে হবে। ইসলামের জন্য আল্লাহর জন্য প্রয়োজনে নিজের মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করার মানসিকতা থাকতে হবে। যুুগে যুগে কালে কালে আল্লাহর প্রিয়জনেরা এ পথ অবলম্বন করার অসংখ্য নজির দেখতে পাওয়া যায়। মানবতার মহান বন্ধুকেও (সা.) এ পথ অবলম্বন করতে দেখেছি। হযরত ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে বাঁচার সম্ভব হলো না। তাওহীদের জন্য তিনি বহিষ্কৃত জীবনই পছন্দ করলেন। তাওহীদের দাওয়াতের জন্য তিনি দেশের পর দেশ ঘুরতে থাকলেন। কিন্তু চারদিকে নাস্তিক ও শিরক আর শিরকের অনুসারী থাকায় কোথাও তিনি ঠাঁই পেলেন না। তিনি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর ও হিযাযে গিয়েছেন। মোট কথা আরাম আয়েশকে পিছনে ঠেলে দিয়ে গোটা জীবনই দেশ দেশান্তরের মাটি যাচাই করেছেন। নিজ বাড়ি, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো ছিল। কিন্তু এগুলোর প্রতি লোভাতুর হননি। তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার দুর্বার স্পৃহা তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরিয়েছে। এ টি তাঁর তৃতীয় কুরবানী। আমাদেরকেও নিজ বাড়ি, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্যের লোভকে সংবরণ করে তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার নিমিত্তে দাঁড়াতে হবে।
শেষ ও চূড়ান্ত কুরবানী ঃ দেশত্যাগ ও নির্বাসনের দু:খ-কষ্ট ভোগ করার পর বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ্ তাকে সন্তান দান করলেন। তিনি তাঁর জন্যও একই ধর্ম ও কর্তব্য ঠিক করলেন। সব কঠিন পরীক্ষায় পাস করার পর আরো একটি পরীক্ষা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত হযরত ইবরাহিম (আ.) সবকিছু অপেক্ষা রাব্বুল আলামীনকেই বেশি ভালবাসেন কিনা, তার ফয়সালা হতে পারত না। তাই বৃদ্ধ বয়সে একেবারে নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তার সন্তান লাভ হয়েছিল সে প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে পারেন কি না তারই পরীক্ষা নেয়া হলো। পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। তখন চূড়ান্তরূপে ঘোষণা করা হলো যে, এখন তুমি প্রকৃত মুসলিম হওয়ার দাবীকে সত্য বলে প্রমাণ করেছ। এক্ষণে তোমাকে সারা পৃথিবীর ইমাম বা নেতা বানানো যায়। আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছে: ‘‘এবং যখন ইবরাহীমকে তাঁর রব কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন এবং সেসব পরীক্ষায় ঠিকভাবে উত্তীর্ণ হলেন তখন তাকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, আমি তোমাকে সমগ্র মানুষের ইমাম বা নেতা নিযুক্ত করছি। তিনি বললেন, আমার বংশধরদের সম্পর্কে কি হুকুম? আল্লাহ তায়ালা বললেন জালেমদের জন্য আমার ওয়াদা প্রযোজ্য নয়।’’ (সূরা ২ বাকারা, আয়াত: ১২৪)
এ আয়তের আলোকে প্রশ্ন রাখতে চাই কারা আজ সারা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে? আর কেনই বা এমনটি হলো? এর উত্তর খুব সহজ। তাহলো আমরা প্রথম তিনটি কুরবানীর প্রতি ভ্রƒক্ষেপ না করে প্রতিবছর কুরবানী করে থাকি। এটি উল্লিখিত আয়াতের আলোকে নিজের ওপর এক মস্তবড় জুলুম। আল্লাহর ওয়াদা কখনো জালিমের জন্য প্রযোজ্য নয়। নিজেদের জুলুমের পরিণাম হিসেবে পৃথিবীর নেতৃত্ব আজ অন্যদের হাতে চলে গেছে। ইসলামের অন্যান্য ইবাদাতের মতই এটি একটি স্রেফ আনুষ্ঠানিক আনন্দ-ফূর্তির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। হজ্ব ও কুরবানীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আজ নি®প্রভ এক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়ে গেছে। এ সংকট উত্তরণের জন্য আমাদেরকে কাল বিলম্ব না করে এখনি প্রথম তিনটি কুরবানীর দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। নিজের সকল প্রকার চেষ্টা ও সাধনাকে সে দিকে কেন্দ্রিভূত করতে হবে। এ আলোচনায় আমরা একটি বিষয় বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠতে দেখি, তা হলো, ‘নাস্তিক ও শিরক’। কুরবানী ও গোটা হজ্বের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘নাস্তিক ও শিরক’ উচ্ছেদ। সুতরাং আসুন নিম্নলিখিত শিক্ষাগুলো প্রথমত নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করি, দ্বিতীয়ত: দেশ ও জাতির চরিত্রকে নাস্তিক ও শিরকমুক্ত করে তাওহীদের দিকে নিয়ে যাই।
নাস্তিক ও শিরক উচ্ছেদ করা: নাস্তিক ও শিরক দু’টি জুলুম। নাস্তিক ও শিরকের গুনাহ আল্লাহ তা’আলা তাওবা ছাড়া কখনো মাফ করবেন না। নাস্তিক ও শিরক সমস্ত নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়। এ নাস্তিক শিরক বর্তমানে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় এ নাস্তিক ও শিরককে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে যে, নাস্তিক ও শিরকমুক্ত জীবন ও সমাজ গঠন করার জন্যই হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তাছাড়া হজ্বের মৌসুমে মহান আল্লাহর সম্মানিত মেহমান হিসেবে তালবিয়া পাঠে বলা হচ্ছে ‘‘আমি উপস্থিত। আমি এসেছি, তোমার কোন শরীক নাই, আমি তোমারই নিকটে এসেছি। তুমি একক-কেহই তোমার শরীক নাই।’’ এ কথাটিকে বাস্ত জীবনে রূপায়ন করতে হবে। অন্যথায় এটি এক ধরণের মোনাফেকী আচরণ হবে।
দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে, পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা: জন্মসূত্রে মুসলমান নয় বরং একজন পরিপূর্ণ মুসলিম হতে হবে, সারাজাহানের প্রভুর উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে, নিজেকে তার নিকট সোপর্দ করতে হবে। জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে। শুধু মাত্র পাঁচওয়াক্ত নামাযে আল্লাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করা হলো কিন্তু জীবনের বিশাল অংশকে মানুষের তৈরি আদর্শের হাতে সোপর্দ করলে তিনি মুসলিম নন বরং একজন খাঁটি মুনাফিক। প্রতি নামাযেই অসংখ্য বার বলা হচ্ছে; ‘‘আমরা তোমারই গোলামী করি আর তোমারই সাহায্য চাই’’। অথচ নামাযের বাইরে তার বিপরীত কাজ করা হচ্ছে। এ এক মিথ্যাচার ছাড়া কি হতে পারে? আর এ মিথ্যাচারকে বিশ্ব সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে বলা হয়: ‘‘হে প্রভু তোমার ডাকে আমি উপস্থিত। আমি এসেছি, তোমার কোন শরীক নাই, আমি তোমারই নিকটে এসেছি। সকল প্রশংসা একমাত্র তোমার জন্যে। সব নিয়ামত তোমারই দান, রাজত্ব আর প্রভুত্ব সবই তোমার। তুমি একক-কেহই তোমার শরীক নাই।’’ অথচ বাস্তবক্ষেত্রে তার বিপরীত কার্য পরিলক্ষিত হয়। এ ধরণের দ্বিমুখী নীতি বা মুনাফেকী আচরণ আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিত্যাগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে বাস্তবক্ষেত্রে নাস্তিক ও শিরক উচ্ছেদ করে আল্লাহর সার্বভৌম প্রতিষ্ঠার কোন প্রচেষ্টা ও ভূমিকাই আমাদের না থাকে, তবে আল্লাহর ঘরে উপস্থিত হয়ে যতই তালবিয়া পাঠ তথা ‘লাব্বায়িক’ বলা হোক না কেন, আল্লাহর হাজিরা খাতায় তাকে অনুপস্থিতই ধরা হবে। কারণ তার কথা ও কাজে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
হজ্ব ও কুরবানী চেতনার অনুধাবন করা: প্রথমেই বলা হয়েছে যে, হজ্বের অনুষ্ঠানগুলো ঐতিহাসিক চেতনাকে সামনে রেখে পালন করতে হবে। আর এ চেতনাকে হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) ন্যায় নাস্তিক ও শিরক উচ্ছেদ এবং মানুষকে অসংখ্য মিথ্যা রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার আপোষহীন সংগ্রামের কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং এ সংগ্রাম নিজ নিজ এলাকায় ছড়িয়ে দেয়ার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবেই হজ্ব ও কুরবানীর সার্থকর্তা ও সুফল পাওয়া যাবে। আল্লাহ্ আমাদের তাওফীক দিন-আমীন।

মহান হজ্বের শ্রেষ্ঠত্বের ঐতিহাসিক প্রমাণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

মহান আল্লাহর বিশ্ব-সাম্রাজ্যে মুসলমান শ্রেষ্ঠ জাতি। মুসলমানের জীবন বিধান হলো ইসলাম। ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি। তা হলো- ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্ব। হজ্ব হলো বাস্তব জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যারা হজ্ব করে তারা স্বচক্ষে আল্লাহর নিদর্শনাবলীসমূহ অবলোকন করে ঈমানের পরিপক্কতা লাভ করে। আল্লাহর ঘর তোয়াফকারী হাজীদের আল্লাহর মেহমান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কাবাঘর, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহীম, মিনা, সাফা মারুয়া, মুজদালিফা, জামরাহ, আরাফাহসহ আল-কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সফর করে একজন মুসলমান তার বাস্তব জীবনে আল্লাহ এবং মোহাম্মদ (সাঃ) কে মেনে নিতে সর্বোচ্চ সুযোগ পায়। মহানবী (সাঃ) তাঁর শ্রেষ্ঠ ঈমানিয়াত দ্বারা সেই শ্রেষ্ঠ ইবাদত হজ্ব গুরুত্বের সাথে সম্পন্ন করেছেন। হজ্বের তাৎপর্য তুলে ধরে ব্যাপকভাবে অগণিত বাণী রেখে গিয়েছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে সেই মহামূল্যবান হাদীসসমূহ গুরুত্বের সাথে সংকলন করা হলো।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন: রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞাসা করা হল, “সর্বোত্তম কাজ কোনটা? তিনি বললেন: আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আবার জিজ্ঞেস করা হল; এর পর কোনটা? তিনি বললেন: আল্লাহর পথে জিহাদ। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো: এরপর কোনটা? তিনি বললেন; নিষ্কলুষ হজ্ব। (বুখারী ও মুসলিম) ইবনে হাব্বান থেকে বর্ণিত: রাসূল (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ আমল হলো, এমন পরিপক্ক ঈমান, যার সাথে কোন সন্দেহের মিশ্রণ ঘটেনি। এমন সশস্ত্র জেহাদ যার ভেতরে কোন চুরি বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি এবং এমন হজ্ব, যাতে কোন গুনাহর কাজ হয়নি। হযরত আবু হোরায়রা (রা:) বলেছেন: একটা নিষ্কলুষ হজ্ব এক বছরের গুনাহের কাফফারা স্বরূপ অর্থাৎ মাফ হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। মাবরুর হজ্ব: কেউ কেউ বলেছেন, মাবরুর হজ্ব হচ্ছে এমন হজ্ব, যার ভেতরে কোন গুনাহ সংঘটিত হয় না। অন্য বর্ণনায় আছে, মাবরুর হজ্বের বৈশিষ্ট হলো, মানুষকে আহার করানো এবং ভাল কথা বলা। অন্যদের কথায়- আহার করানো এবং ছালামের বিস্তার ঘটানো।
আবু হোরায়রার (রা:) বর্ণিত অন্য হাদীস মতে রাসূল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি হজ¦ করল এবং রফাস (অর্থাৎ কোন ধরনের যৌন তৎপরতায় লিপ্ত হল না) করল না এবং গুণাহর কাজও করল না, সে এমন ভাবে পাপমুক্ত হয়ে গেল যেমন সদ্য প্রসূত সন্তান তার জন্মের দিনে পাপমুক্ত থাকে। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)। হযরত আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত আরেক হাদীসের মতে রাসূল (সাঃ) বলেছেন- এক উমরা থেকে আর এক উমরা পর্যন্ত যত গুণাহ করা হয়, উমরার কারণে সেগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। আর নিষ্কলুষ হজে¦র প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)
তিরমিযীতে বলা হয়েছে- হজ্বে মাবরুর হচ্ছে-অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করা হবে। ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় রয়েছে- “রফাস” মানে নরনারীর সম্পর্কজনিত কোন তৎপরতা। আযহারী বলেন- পুরুষ নারীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করে এমন যে কোন ব্যাপার। সহবাস, অশ্লীলতা, পুরুষ কর্তৃক নারীকে যৌন বিষয়ে কিছু বলা। বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী ইত্যাদি হাদীসে বর্ণিত আবু হোরায়রা (রা:) বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন- এক উমরা থেকে আর এক উমরা পর্যন্ত যত গুণা করা হয় সেগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। আর নিষ্কলুষ হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। ইসবাহানীর বর্ণনায় আরো আছে, হজ¦কারী যখনই সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলে, তখনই তাকে একটা সুসংবাদ দেয়া হয়।
মুসলিম ও ইবনে খুযায়মায় বর্ণিত, হযরত ইবনে শামমাছা (রা:) বলেন: একবার আমরা হযরত আমর ইবনুল আস (রা:) এর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি তখন মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কাঁদলেন। তারপর বললেন- যখন আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলাম গ্রহণের প্রেরণা জাগিয়ে তুললেন, তখন আমি রাসল (সাঃ) এর কাছে হাজির হলাম। তারপর বললাম, হে রাসূলুল্লাহ আপনার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার কাছে বয়াত করব (অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করব) তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আমি হাত গুটিয়ে নিলাম। রাসূল (সাঃ) বললেন- কি ব্যাপার, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম, যেন আমার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হয়। রাসূল (সাঃ) বললেন- ওহে আমর, তুমি কি জান না, ইসলাম গ্রহণ অতীতের সমস্ত গুণাহ নষ্ট করে দেয়। হিজরত অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়ে দেয় এবং হজ্ব অতীতের পাপ মোচন করে দেয়। তাবারানীতে বর্ণিত হাদীসে হযরত আলীর (রা:) ছেলে হাসান (রা:) বলেন- একব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে বললো, আমি দুর্বল ও ভীরু। রাসূল (সাঃ) বললেন- তাহলে এমন জেহাদে যোগদান কর, যাতে অস্ত্রশস্ত্র থাকে না। তা হচ্ছে হজ্ব। বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত আয়েশা (রা:) বলেন- আমি রাসূল (সাঃ) কে বললাম, আমরা মনে করি জেহাদ সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। তাহলে আমরা কি জেহাদ করবো না? রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমরা মহিলাদের জন্য শ্রেষ্ঠ আমল হচ্ছে কলুষমুক্ত হজ্ব।
ইবনে খুযায়মার রেওয়ায়েতের ভাষা হলো, হযরত আয়েশা বলেন, আমি জিজ্ঞেস  করলাম: মহিলাদের কি জেহাদ করতে হবে? রাসূল (সাঃ) বললেন- তাদের এমন জেহাদ  করতে হবে যাতে সশস্ত্র লড়াই নেই। তা হচ্ছে হজ্ব ও উমরা। নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হযরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বললেন- বৃদ্ধ, দুর্বল ও স্ত্রীলোকের জেহাদ হলো হজ্ব ও উমরা।
আহমাদ, তাবারানী ও বায়হাকীতে বর্ণিত হযরত আমর ইবনে আবাসা (রা:) বর্ণিত। এক ব্যক্তি বললো: হে আল্লাহর রাসূল, ইসলাম কি? রাসূল (সাঃ) বললেন- আল্লাহর কাছে তোমার মনের আত্মসমর্পণ করা এবং তোমার জিহবা ও হাতের কষ্ট থেকে মুসলমানদের নিরাপদ থাকা। ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের ইসলাম উত্তম? রাসূল (সাঃ) বললেন- ঈমান আনা। সে জিজ্ঞেস করলো: ঈমান কি? তিনি বললেন- আল্লাহ তায়ালা, তার ফেরেশতাগণ তার কিতাবসমূহ তার রাসূলগণ এবং মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে ঈমান আনা। সে জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের ঈমান উত্তম? তিনি বললেন: হিজরত করা। সে জিজ্ঞেস করলো: হিজরত কি? তিনি বললেন: অন্যায় ও অসত্যকে বর্জন করা। সে জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের হিজরত উত্তম? তিনি বললেন- জিহাদ। সে জিজ্ঞেস করলো: জিহাদ কি? তিনি বললেন- যখন তুমি কাফেরদের আক্রমণের শিকার হবে, তখন তাদের সাথে যুদ্ধ করবে এটাই জিহাদ। সে জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের জিহাদ উত্তম? তিনি বললেন: যে জিহাদে মুজাহিদের রক্ত ঝরে ও ঘোড়া মারা যায়। রাসূল (সাঃ) বললেন- এরপর দুটো কাজ এমন রয়েছে, যা সকল কাজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ: গুনাহমুক্ত হজ্ব ও গুনাহমুক্ত উমরা।
আহমাদ, তাবরানী, ইবনে খুযায়মা, বায়হাকী হাকেম এ বর্ণিত হযরত জাবের থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন- গুনাহমুক্ত হজে¦র বদলা জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। জিজ্ঞেস করা হল গুনাহমুক্ত হজ¦ কিভাবে আদায় করা যায়? তিনি বললেন- মানুষকে খাওয়ানো ও ভাল কথা বলার মাধ্যমে? অর্থাৎ হজ্বের সফরে থাকা বলে। তিরমিযী, ইবনে খুযায়মা ও ইবনে হাব্বানে বর্ণিত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: হজ্ব ও উমরার মাঝে দীর্ঘ বিরতি না দিয়ে একটার পর অপরটা আদায় কর, তাহলে দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে দেবে। যেমন কামারের চুল্লি লোহার মরিচা এবং স্বর্ণকারের চুল্লি স্বর্ণ ও রূপার খাদ দূর করে। গুনাহমুক্ত হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। তাবরানীতে বর্ণিত, হযরত আব্দুল্লাহ বিন জায়াদ (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসুল (সাঃ) বলেছেন- তোমরা হজ্ব কর, কেননা পানি যেমন ময়লা ধুয়ে দেয়, তেমনি হজ্ব গুণাহকে ধুয়ে পরিষ্কার করে।
বাযখারে বর্ণিত হযরত আবু মুছা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলছেন- হজ্ব সমাপনকারী তার পরিবার পরিজনের মধ্য থেকে চারশত জনের পক্ষে সুপারিশ করতে পারবে এবং সদ্য প্রসূত শিশুর মতো নিজের সমস্ত গুনাহ থেকে অব্যাহতি পাবে। ইবনে খুযায়মা থেকে বর্ণিত হযরাত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন- রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হযরত আদম (আঃ) ভারত থেকে পায়ে হেঁটে এক হাজার বার কাবা শরীফে এসেছেন। কখনও কোন সওয়ারীতে আরোহন করেননি।
বাযযারের বর্ণনায় আছে হযরত জাবের (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন যারা হজ¦ ও উমরা করে, তারা আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তিনি তাদেরকে আমন্ত্রণ করেন। তারা সেই আমন্ত্রণের সাড়া দেয়। আর তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তাদেরকে তা প্রদান করেন। বাযযার, তাবরানী ইবনে মাজার বর্ণনা মতে, হযরত ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহর পথে জেহাদকারী এবং হজ্ব ও উমরাকারী আল্লাহর প্রতিনিধি। তিনি তাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তারা তাতে সাড়া দিয়েছেন। তারা আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি তা তাদেরকে দেন। বাযযার তাবরানী, ইবনে খুযায়মা ও হাকেম থেকে বর্ণিত। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হজ্বকারীর গুনাহ মাফ করা হয় এবং সে যার যার গুনাহ মাফ চায় তাদেরকেও মাফ করা হয়। ইবনে হাববান, ইবনে খুযায়যা, তাবারানী, বাযযার ও হাকেম থেকে প্রাপ্ত হযরত ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন- এই ঘর (পবিত্র কাবা) দ্বারা তোমরা উপকৃত হও। কেননা এ ঘর দু’বার ধ্বংস করা হয়েছে এবং তৃতীয়বারে তাকে তুলে নেয়া হবে।
তাবারানীর বর্ণনা মতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত, যখন আল্লাহ তায়ালা আদম (আ:) কে বেহেশত থেকে নামালেন, তখন তাকে বললেন- আমি তোমার সাথে সাথে এমন একটা ঘর নামাবো, যার চার পাশে তওয়াফ করা হবে যেমন আমার আরশের চারপাশে তওয়াফ করা হয় এবং তার কাছে নামায পড়া হবে, যেমন আমার আরশের কাছে নামায পড়া হয়। তারপর যখন বন্যার সময় এল, তখন এই ঘরকে ওপরে তুলে নেয়া হলো। নবীগন এই ঘরের কাছে গিয়ে হজ¦ করতেন, কিন্তু তার স্থানটা চিনতেন না। অত:পর এই জায়গায় আল্লাহ হযরত ইব্রাহীমকে বসবাস করালেন। তিনি পাঁচটা পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবা ঘর নির্মাণ করলেন। পাঁচটি পাহাড় হল- হেরা, ছাবীর, লেকমন, তুর ও খায়ের। সুতরাং তোমরা যত বেশি পারো এই ঘর দ্বারা উপকৃত হও।
ইসবাহানীর বর্ণনায়, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হজ্ব আদায়ে ত্বরিত উদ্যোগী হও। অর্থাৎ ফরজ হজ্ব দ্রুত আদায় কর। কেননা কখন কি বাধা বিঘœ এসে পড়বে কেউ জানো না। ইসবাহানীতে আরো বর্ণিত। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) বর্ণনা করেন। রাসূল (সাঃ) বলেছেন-আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ:) কে ওহীর মারফত বললেন- হে আদম, তোমার কোন অঘটন ঘটার আগে এই ঘরে হজ্ব আদায় করে নাও। আদম (সাঃ) বললেন- হে আমার প্রতিপালক, আমার কী অঘটন ঘটবে? আল্লাহ বললেন- সে তুমি জান না। মৃত্যু হতে পারে। আদম (আঃ) বললেন- মৃত্যু আবার কী? আমার বংশ ধরের মধ্যে কাকে আমি আমার দায়িত্ব হস্তান্তর করবো? আল্লাহ বললেন- আকাশ ও পৃথিবীর কাছে পেশ কর।
আদম (আঃ) প্রথমে আকাশের কাছে তাঁর দায়িত্ব পেশ করলেন। সে ঐ দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পৃথিবীর কাছে পেশ করলেন। সেও তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড় পর্বতের কাছে তা পেশ করলেন। সেও অস্বীকার করলো। অবশেষে এই দায়িত্ব গ্রহণ করলো তার সেই ছেলে, যে নিজের ভাইকে হত্যা করেছিল। এরপর হযরত আদম (আঃ) ভারতবর্ষ থেকে হজ্বের উদ্দেশ্যে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে তিনি যেখানেই পানাহার করার জন্য যাত্রা বিরতি করলেন, সেখানেই পরবর্তীকালে জনবসতি গড়ে উঠলো। এক সময় তিনি মক্কা শরীফে এলেন। এখানে ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানালো। তারা বললেন- হে আদম, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।
আপনার হজ্ব নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হোক। আমরা আপনার দুই হাজার বছর আগে এই ঘরে হজ্ব করেছি। রাসূল (সাঃ) বললেন- সেদিন কাবা ঘর লাল রং এর ইয়াকুত পাথর দিয়ে নির্মিত ছিল এবং ভেতরে ফাঁকা ছিল। যে তাওয়াফ করতো, যে ঘরের ভেতরে যারা আছে তাদেরকে দেখতে পেত। কাবা ঘরের তখন দুটো দরজা ছিল। আদম (আঃ) তার হজ্ব সমাধা করলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে ওহী যোগে জিজ্ঞেস করলেন- হে আদম, তোমার হজ্ব আদায় সম্পন্ন করেছ? আদম বললেন- হে আমার প্রভু, করেছি।

মানব জীবনে কুরআন হাদীস

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

কোন ধর্ম যদি বিশেষ কোন গোত্র বা বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট করা না হয় অথবা সীমবদ্ধ না থাকে কোন ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে, বরং ধর্মের লক্ষ্য যদি হয় বিশ্ব জগতের সমগ্র জনগোষ্ঠী তা হলে দু’ভাবে সে ধর্ম গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয়ত জন্মগত সূত্রে। জন্মসূত্রে ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রশ্নটি গৌণ।
স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতনভাবে একটি ধর্মকে পরিহার করে এবং আরেকটি ধর্ম গ্রহণ করে। কোন ধর্ম গ্রহণ বা বর্জন করার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে তার পছন্দ-অপছন্দের উপর নির্ভর করে। এ প্রসঙ্গে নবী করীম (সা) বলেছেন যে, “তাকে মুখে ঘোষণা দিতে হবে এবং অন্তরে বিশ্বাস করতে হবে।” স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে প্রথমে গোসল করার মধ্য দিয়ে অবিশ্বাস এবং অজ্ঞতার কালিমা দূরীভূত হয়। অতঃপর সে দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ঘোষণা দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) তাঁর রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ।
হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে, কোন লোক ইসলাম গ্রহণ করলে প্রিয়নবী (সা) তাঁর পূর্ব নাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। যদি দেখা যেত যে, তাঁর নামের সঙ্গে অনৈসলামিক কোন ধ্যান-ধারণা জড়িয়ে আছে, অথবা তার না কা’বার পূজারী, সূর্যের পূজারী, ভ্রান্ত পথের অনুসারী অথবা এ জাতীয় কোন অর্থ বহন করে, তাহলে সে নামগুলো পাল্টিয়ে সুবিধাজনক একটি নতুন নাম ঠিক করে দিতেন। বর্তমান সময়ে নওমুসলিমগণ পূর্ব নামের সঙ্গে একটি আরবি নাম যোগ করে থাকেন।
নবী করীম (সা) এর মাতৃভাষা আরবি। তাঁর স্ত্রীগণ উন্মুল মু’মিনীন বা মুসলমানদের মাতা হিসাবে পরিচিত। তাঁরাও আরবি ভাষায় কথা বলতেন। সে হিসাবে প্রতিটি মুসলমানের একটি মাতৃভাষা আরবি। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, আরবি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জগতের মাতৃভাষা। সে কারণেই আরবি ভাষা লেখা, বিশেষকরে মূল আরবিতে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে পারাটা প্রত্যেক মুসলমানের একটি পবিত্র দায়িত্ব।
মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার মাধ্যমে একটি শিশু ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকে। ভূমিষ্ট হওয়ার পর পরই তার ডানকানে আযান এবং বাম কানে আকামত দেওয়া হয়। অর্থাৎ জন্মগ্রহণ করার পর প্রথমেই সে শুনতে পায় আল্লাহর একত্মবাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান এবং আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী ও নিজের কল্যাণের জন্য আহ্বানের কথা। আযানের সময় তাকে শোনান হয় যে, আল্লাহ মহান; আমি শপথ গ্রহণ পূর্বক সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ (মাবুদ) বা উপাস্য নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল। সালাতের জন্য এসো, কল্যাণের জন্য এসো, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ (মা’বুদ)নেই। আকামতের সময় তাকে আযানের সব কথাই শোনানো হয়। তাকে আরো শোনানো হয় যে, ওহে সালাতের সময়  সমুপস্থিত।
বাল্যজীবন ঃ শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর প্রথম চুল কেটে সমস্ত চুলের সমপরিমাণ ওজন রূপা বা টাকা গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। যাদের সঙ্গতি আছে তারা ছাগল বা ভেড়া যবাই করে এবং সেই গোশত দিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও গরীব-দুঃখীদের আপ্যায়ন করে থাকে। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে বলে আকীকা। এরপরেই আসে পুত্র সন্তানকে খাতনা (মুসলমানী) করানোর প্রসঙ্গ। খাতনা করানোর নির্দিষ্ট কোন সময় সীমা নির্ধারণ করা নেই। সাধারণত বাল্য বয়সেই খাতনা করানো হয়। অবশ্য কোন বয়স্ক লোক ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে খাতনা করানোর ব্যাপরে কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
সাধারণত চার বছর পর শিশু লেখাপড়া শুরু করে। এ সময়ে বিশেষ দু’আ-দরূদ ও ভাল খাবারের আয়োজন করা হয়।  শিশুকে সে অনুষ্ঠানেই প্রথম পাঠ দেওয়া হয়। শুভ সূচনা হিসাবে কুরআনুল করীমের সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। শিশু উস্তাদের সঙ্গে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে। বলে রাখা আবশ্যক যে, হেরা গুহায় নবী করীম (সা) সর্বপ্রথম  যখন ওহী লাভ করেন, তখন এ আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল।
সালাত ও সিয়াম ঃ লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকে নামায পড়ার নিয়ম কানুনগুলো শিখতে হয়। তাকে মুখস্থ করতে হয় প্রয়োজনীয় দু’আ-দরূদ ও কুরআনের সূরাসমূহ। সাত বছর বয়সে সে সালাত আদায় করতে শুরু করে। প্রয়োজনবোধে পিতা-মাতা এ জন্য তাকে শাস্তি দেন। বাল্য বয়স থেকে সালাতে অভ্যস্ত করে তোলার জন্য এটা জরুরী।
একটি শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উপর সালাত বা নামায পড়ার ন্যায় রোযা রাখা বা সিয়াম পালন করাটাও ফরয হয়ে পড়ে। অবশ্য মুসলিম পরিবারের শিশুরা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই সিয়াম পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। জীবনে প্রথম যেদিন সিয়াম পালন করে. সেদিন সে খুবই আনন্দিত ও উৎফুল্ল হয়ে থাকে। এমন কি এটা যেন তার পরিবারে একটা উৎসবের রূপ নেয়। সাধারণত বার বছর বয়সে ছেলেমেয়েরা সিয়াম পালন করতে শুরু করে এবং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে এ মাসব্যাপী সিয়াম পালনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।
হজ্ব ঃ সঙ্গতি সম্পন্ন লোকের জন্য জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। জিলহজ্বের দ্বিতীয় সপ্তাহে হজ্ব করা হয়। এ সময়ে হাজীগণ মক্কায় সমবেত হন এবং প্রায় সপ্তাহ ব্যাপী তাঁরা মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা এবং আবার মিনায় অবস্থান করেন। এ তিনটি স্থান মক্কার উপকন্ঠে অবস্থিত। জিলহজ্ব মাস ছাড়াও বছরের যে কোন সময় কা’বা ঘরে যাওয়া যায়। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে বলা উমরাহ।
যিনি হজ্ব করবেন তাকে অবশ্যই নিত্যদিনের পোশাক পরিত্যাগ করতে হবে। এ সময়ে তাকে বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরতে হয়, এটাকে বলে ইহরাম। ইহরামে দুই প্রস্থ কাপড় থাকে। কাপড়ে কোন রকম সেলাই চলে না। এক প্রস্থ কাপড় সে পরিধান করে, অন্য প্রস্থ দিয়ে কাঁধ ও শরীর ঢাকে। কিন্তু সর্বক্ষণের জন্য মাথা উন্মুক্ত রাখে। মহিলারা স্বাভাবিক পোশাক পরে। তবে তা হতে হয় শালীন ও মার্জিত। তাদের হাত এবং পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত সমস্ত শরীর আবৃত রাখতে হয়। মক্কার আরেক নাম হেরেম শরীফ। হেরেম শরীফে প্রবেশের পূর্বেই ইহরাম বাঁধতে হয়। হেরেম শরীফে প্রবেশের পূর্বে যেখান থেকে ইহরামের পোশাক পরিধান করতে হয় সে স্থানকে মীকাত বলে। আর মক্কাবাসীদের ইহরাম বাঁধতে হয় হেরেম শরীফ বা মক্কার অভ্যন্তর থেকে। হেরেম শরীফ থেকে সে চলে যায় মিনায়। ৯ই জিলহজ্ব যায় আরাফাতের ময়দানে। সারাটা দিন সেখানে কাটিয়ে দেয় ইবাদ-বন্দেগী ও দু’আ-দরূদ পাঠের মধ্য দিয়ে। রাত্রি যাপন করে মুযদালিফায় উন্মুক্ত প্রান্তরে। ১০, ১১ ও ১২ তারিখ এ তিন দিন অতিবাহিত করে মিনায়। মিনায়  অবস্থানকালে প্রতিদিন সে শয়তানের প্রতীকিকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে। সুযোগ বুঝে এক সময়ে (১০ কিম্বা ১১ তারিখ) তাকে মক্কায় যেতে হয়। তখন সে তওয়াফ ও সাঈ করে। নির্ধারিত নিয়মে পবিত্র কা’বা ঘর ৭ বার প্রদক্ষিণ করাকে তওয়াফ বলে। আর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে ৭ বার আসা যাওয়াটা হল সাঈ। কা’বা ঘর তওয়াফ এবং সাঈ করার নির্দিষ্ট কতকগুলো পদ্ধতি ও দু’আ রয়েছে। বস্তুতপক্ষে ইহরাম পরিধান করার পর থেকে ইহরাম ছাড়া পর্যন্ত একজনকে সারাক্ষণ আল্লাহর যিকর করতে হয়। এ সময়ের এ যিকরকে বলে তলবিয়া। তলবিয়ার দোয়া এরকম ঃ “লাব্বায়িক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক, লাব্বায়েক লা শারীকা লাকা লাব্বায়িক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক্।
উমরা করার জন্য আরাফাত, মিনা বা মুযদালিফায় যেতে হয় না। কিন্তু যথারীতি তওয়াফ ও সাঈ করতে হয় এবং ইহরামের কাপড় পরিধান করতে হয়। এমনকি মক্কায় বসবাসকারী মুসলমানগণকে উমরা করার জন্য মক্কার  বইরে গিয়ে ইহরাম করে হেরেম শরীফে প্রবেশ করেত হয়। তওয়াফ ও সাঈ করার পর মাথা মুন্ডন করে তারা স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসে।
যাকাত ঃ যাকাত এক ধরনের সাদাকা। সকল প্রকার সঞ্চয়, মওজুদ, সম্পদ, উৎপন্ন ফসলের উপর যাকাত প্রদান করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঃ কৃষিপণ্য, বাণিজ্য সামগ্রী, খনিজ সম্পদ, সরকারী চারণ-ভূমিতে পালিত মেষ-ছাগল, গরু, উট। আজকালকার দিনে মুসলমানগণ সঞ্চিত সম্পদের উপর প্রদত্ত যাকাত ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করে থাকেন। মুসলিম বা অমুসলিম সব রাষ্ট্রেই এ নিয়ম চালূ রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য কর বা খাজনার পরিমাণ স্থানীয় সরকার নির্ধরণ করেন এবং তা আদায়ও করা হয় সরকারী তত্ত্বাবধানে।
যাকাতের হিসাব এ রকম যে, কারো কাছে যদি  সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সমমুল্যের অর্থ এক বছরের বেশি সময় জমা থাকে তাহলে তাকে উক্ত সঞ্চয়ের উপর শতকরা ২.৫% হারে যাকাত প্রদান করতে হয়। যাকাতের অর্থ সরাসরি বিরতণ করা যেতে পারে অথবা কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তা ব্যয় করা বৈধ। যাকাতের অর্থ ব্যয় করার ৮টি খাত আল্লাহ তা’আরা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ব্যক্তি তার ইচ্ছানুযায়ী এক বা একাধিক খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করতে পরে।
বছরের দুটি প্রধান উৎসব দুই ঈদে আরেক ধরনের সাদকা প্রদান করতে হয়। রমযান শেষে ঈদুল ফিতরের সময় দিতে হয় ফিতরা। এর পরিমাণ হল পূর্ণ বয়স্ক একজন লোকের সারা দিনের খোরাকের সমান। এ অর্থ একজন নিঃস্ব দরিদ্র লোকের প্রাপ্য। আবার পবিত্র নগরী মক্কায় যখন হজ্ব পালন করা হয় তখন আসে ইদুল আযহা। এ সময় সঙ্গতি সম্পন্ন লোকেরা গরু, ছাগল অথবা মেষ কোরবানী করে থাকেন। কোরবানীর গোশতের একটি অংশ নিজেদের জন্য রেখে বাকি অংশ দুঃস্থ ও গরীবদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়।
অর্থনীতি প্রসঙ্গে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, একজন মুসলমানের পক্ষে কোন রকম সুদী কারবারে অংশ গ্রহণের অনুমতি নেই। সে বিষয়ে চিন্তার যথেষ্ট অবকাশ আছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জুয়া, লটারী অথবা ফটকাবাজী কোন কাজে হাত দিতে পারে না। স্মরণ রাখতে হবে যে, স্বেচ্ছায় কেউ কখনো সুদ দেয় না। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ঋণ দিয়ে তার উপর সুদ আদায়ের প্রবণতাকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। ব্যাংকে জমা রাখা টাকার উপর যে সুদ আসে সে ব্যাংকটি যদি সুদী কারবারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে এর লভ্যাংশও অবৈধ। কিন্তু এমন অনেক দেশ আছে যেখানে সুদী ব্যাংক ব্যতীত অন্য কোন ব্যাংক নেই। তখন তাকে বাধ্য হয়েই সুদী ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে কেউ যদি ব্যাংকে তার সঞ্চয়ের উপর যে সুদ আসে তা গ্রহণ না করে, তাহলে ব্যাংক ইচ্ছা করলে অদাবিকৃত সুদের অর্থকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দান করতে পারে। কখনো কখনো অনুদান প্রাপ্ত এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে। সে কারণেই ব্যাংকে জামা টাকা উপর যে সুদ আসে তা ছেড়ে না দিয়ে বরং তা গ্রহণ করা উচিত। অবশ্য এ অর্থ নিজের বা পরিবারের জন্য ব্যয় না করে কোন জনহিতকর কাজে ব্যয় করতে হবে। প্রখ্যাত মুফতী সারাখশী বলেছেন যে, “অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ থেকে অবশ্যই মুক্তি পেতে হবে এবং এ সম্পদকে কোন জনহিতকর কাজে ব্যয় করতে হবে”। কারো কারো মতে সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়-দেনার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সোসাইটির সঙ্গে বীমা করা বিধিসম্মত। কিন্ত পুঁজিবাদী মুনাফালোভী কোন কোম্পানীর সঙ্গে বীমা করাটা অবৈধ। (অসমাপ্ত)