বিভাগ: ইসলামের আলো

রমজানুল মোবারক : অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত একটি মাস

মিনহাজুল ইসলাম মোহাম্মদ মাছুম

মাহে রমজান আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে বান্দার জন্য অফুরন্ত কল্যাণ, নেয়ামত ও বরকতের উৎস। আল্লাহপাককে রাজী করিয়ে জান্নাত লাভের উপায় হিসাবে রমজানের আগমন। রোজাদারদের জন্য এ মাস খুশীর আনন্দে ভেসে যাবার মাস। হাদীস মতে, এ মাসে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। অভিশপ্ত বিতাড়িত শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। এ মাসের ফজীলত বলে শেষ করা যাবে না। সত্যি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে প্রতি বছর মুসলিম সমাজে রমজান আসে। কবির ভাষায়-“মাহে রমজান এলো বছর ঘুরে, মু’মিন মুসলমানের দ্বারে দ্বারে, রহমতেরই বাণী নিয়ে, মাগফিরাতের পয়গাম নিয়ে, এলো সবার মাঝে আবার ফিরে।” এ আল্লাহর এক অপার রহমত মু’মিন বান্দাদের জন্য।
মাহে রমজানের অনন্য বৈশিষ্ট্য :
১। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস : আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, রমজান মাসের প্রথম দশদিন আল্লাহর রহমত নাজিল হয়, দ্বিতীয় দশদিন মাগফেরাত এবং তৃতীয় দশদিন দোজখ থেকে মুক্তি দেয়া হয়। যে ব্যক্তি এতে আপন অধীনস্থ দাস-দাসী ও চাকর-বাকর হতে কাজের বোঝা হালকা করে দেয়, আল্লাহপাক তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং দোজখের আগুন থেকে নাজাত দেবেন। (বায়হাকী)
২। বরকতের মাস : সকল মাসের সর্দার রমজান। এ মাসে মু’মিনদের রিজিক বৃদ্ধি(বরকত) করা হয়। (মিশকাত) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আপন ইচ্ছায় কোনো নফল ইবাদত করবে, অন্যান্য মাসের ফরজ সালাতের সওয়াব হবে। আর যে ব্যক্তি একটি ফরজ আদায় করবে, অন্যান্য মাসের সত্তরটি সওয়াবের হকদার হবে। (মিশকাত)
৩। আল্ কোরআন নাজিলের মাস : আল্লাহপাক এরশাদ করেছেন, “রমজান সে-ই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে আল্ কোরআন, যা মানুষের জন্য দিশারী এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পায় সে যেন রোজা রাখে।” (সূরা বাকারা-১৮৫)
৪। দরিদ্র-অসহায়দের সহযোগিতার (দান-খয়রাত) মাস : রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন, এই মাস দরিদ্র-অসহায়দেরকে সহযোগিতার মাস, যার উসিলায় মু’মিনদের জীবিকা বাড়তে থাকে। অন্য হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান এলে তাঁর দান ও বদান্যতা আরো বেড়ে যেত, এমনকি তাঁর দানশীলতা প্রবল বেগে বহমান বাতাসের চেয়েও বেশী হয়ে যেত। সদকা (যাকাত), দান-খয়রাতের জন্য কোন মাস নির্দিষ্ট নেই, তবু মাহে রমজান এলে লোকজন সত্তর গুণ সওয়াব লাভের আশায় দান করে থাকেন। এ ব্যাপারে হাদীসে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
৫। তাকওয়া অর্জনের মাস : মহাগ্রন্থ আল্ কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদাররা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছিল, তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’’ (সূরা বাকারা-১৮৩) তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের জন্য আল্লাহপাক কোরআনে অনেক আয়াত নাজিল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তাকওয়া ব্যতীত মু’মিন, মুত্তাকী, পরহেজগার হওয়া যায় না। রাসূল (সা)কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন্ আমল মানুষকে বেশী জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর ভয় (অর্থাৎ তাকওয়া) ও স্বভাব। (তিরমিযী) অন্য হাদীসে আছে, সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, জবাবে তিনি বলেন, যে আল্লাহকে বেশী ভয় করে এবং আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখে। ইবনে উমর (রা) বলেন, “মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত তাকওয়ার স্তরে উন্নীত হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে অন্তরে সংশয় সৃষ্টিকারী কাজ পরিহার না করে।”
৬। সালাতুত তারাবীর (কিয়ামূল লাইল) মাস : তারাবী সালাত রমজান মাসেই পড়া হয়। তারাবীর সালাত (কিয়ামূল লাইল) নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। বিনা ওজরে তারাবীর সালাত ত্যাগ কঠিন গুনাহ। হাদীসে তারাবীর সালাতকে মাগফেরাত লাভের উপায় হিসাবে রাসূল (সা) বলেছেন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রাতগুলোতে ঈমানী প্রেরণা এবং আখেরাতের প্রতিদানের নিয়তে তারাবীহ সালাত পড়লো, তার কৃত সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”
৭। বদরের মাস : হিজরী ২য় বর্ষে (৬২৪ খৃ.) ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদর অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন ছিল ১৭ই রমজান। মাত্র ৩১৩ জন আল্লাহর পথের সৈনিক হাজারোধিক কাফের সৈন্যের বিরুদ্ধে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং বিজয়ী হন।
৮। দোয়া কবুলের মাস : এ মাসে রোজাদারের দোয়া বিশেষ ভাবে কবুল করা হয়। রাসূল (সা) বলেছেন, তিন শ্রেণীর লোকের দোয়া সঙ্গে সঙ্গে বা বিশেষভাবে কবুল করা হয়। এক. রোজাদারের দোয়া, দুই.মজলুম বা অত্যাচারিতের দোয়া এবং তিন. মুসাফিরের দোয়া। (বায়হাকী)
৯। রিপু দমনের মাস : রোজা কুপ্রবৃত্তি থেকে মানুষকে হেফাজত করে। মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে বলেন, “আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে এসে দাঁড়াবার ব্যাপারে ভীত ছিল এবং নফস্কে খারাপ কামনা থেকে বিরত ছিল, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।” (সূরা আন্ নাযিআ’ত ঃ ৪০-৪১) হাদীসে রাসূলে বলা হয়েছে, রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ। যতক্ষণ না একে ছিন্ন করা হয়। কুকর্ম থেকে বিরত না থাকে।
১০। আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস : রমজান মাস তাহাজ্জুদ পালনের উৎকৃষ্ট সময়। তাহাজ্জুদ সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম হয়। রমজানে শেষ দশকে এতেকাফ রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। সমাজ থেকে কাউকে না কাউকে রাখতেই হবে। না হলে সবাইকে গুনাহগার হতে হবে। এতেকাফের মাধ্যমেও আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা যায়। আল্লাহপাক নিজেই বলেছেন, “রোজা আমার জন্য অর্থাৎ বান্দা আমার নৈকট্য লাভের জন্যই রোজা রেখেছে। কাজেই আমি আল্লাহ নিজেই এর পুরষ্কার দেব।” (হাদীসে কুদসী)
১১। এতেকাফের মাস : হযরত আয়েশা (রা) বলেছেন, হুজুর পাক (সা) রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত এ নিয়ম তিনি পালন করেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ এতেকাফের এ সিলসিলা জারী রাখেন। (বুখারী) হযরত আবু হোরায়রা (রা) বলেছেন, রাসূল (সা) প্রতি রমজানে শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর বিশ দিন এতেকাফ করেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
১২। যাকাত ও দান-সদকা বেশী বেশী দেয়ার মাস : যাকাত ও দান-সদকা দেয়ার নির্দিষ্ট কোন মাস নেই। যে কোন দিনে, মাসে দেয়া যায়। যেহেতু রমজান মাসের ইবাদতে সত্তর গুণ সওয়াব বেশী লাভ করা যায়, এজন্য লোকেরা এ মাসকেই বেছে নেয় যাকাত ও দান-সদকা করার জন্য। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) হচ্ছেন সমগ্র মানবকুলের মধ্যে সর্বাধিক উদার ও দানশীল। রমজান মাস এলে মহানবী (সা)এর দানশীলতা বেড়ে যেত। রাসূল (সা) বলেছেন, “উপরের হাত নীচের হাতের চেয়ে উত্তম, আর যারা তোমার অধীনে আছে তাদের থেকেই দান শুরু কর। আর উত্তম দান হচ্ছে তা, যা প্রাচুর্য থেকে প্রদান করা হয়। আর যে ব্যক্তি যাচঞা থেকে পবিত্রতা চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন। আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী হতে চায়, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
১৩। মক্কা বিজয়ের মাস : ৬২৮ খৃ. হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে ইসলাম বিরোধীরা। শুধু তাই নয়, মুসলিমদের উপরও দমন-নির্যাতন শুরু করে। এমতাবস্থায় রাসূল (সা) ৮ম হিজরীতে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করেন। ২১শে রমজান আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কা বিজয় করে মহান আদর্শ ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন।
১৪। জিহাদের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস : ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ এবং মক্কা বিজয় এ রমজান মাসেই সুসম্পন্ন হয়। নিজের নফসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোও শ্রেষ্ঠ জিহাদ। কিন্তু খোদাদ্রোহী ও তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য রমজান মাসই উপযুক্ত মাস।
১৫। গুনাহ থেকে ক্ষমা ও মুক্তি লাভের মাস : রোজার বিনিময়ে রোজাদার গুনাহ থেকে মুক্তি পায়। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস ও নেকী লাভের আশায় রমজানের রোজা রাখে, এর বিনিময়ে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ (ছগীরাহ) মাফ করে দেয়া হয়। (মুয়াত্তা) অন্য হাদীসে আছে, রাসূল (সা)বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানকে পেয়েও নিজের গুনাহ থেকে মুক্তি পেল না, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক।
১৬। চরিত্র গঠনের মাস : মিথ্যা বলা মহাপাপ। এটি একটি ভয়ানক ব্যাধি। মিথ্যা কথা না বলা চরিত্রবানের সুলক্ষণ। রমজানের রোজা রাখার মাধ্যমে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করল না-সে ব্যক্তির পানীয় দ্রব্য পরিত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী) তিনি আরো বলেছেন, রোজা পাঁচটি জিনিস নষ্ট করে ঃ মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, কুটনামী, মিথ্যা শপথ ও কামভাব দৃষ্টিপাত। এসব দোষাবলী বর্জন চরিত্র গঠনে সহায়ক।
১৭। ধৈর্য-সহানুভূতির মাস : রোজার মাধ্যমে কে কত অপরের প্রতি ধৈর্যশীল ও গরীব দুঃখীর প্রতি সহানুভূতিশীল তা বুঝা যায়। সমাজের বিত্তবানেরা ক্ষুধা এবং অভাবের তাড়না কতটুক ুতা বুঝতে পেরে এ মাসে দান-সদকা-যাকাতের প্রতি যতœবান হয়ে দান করতে উদ্বুদ্ধ হয়। বিপদ-মুছিবতে ধৈর্য ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা রদ করতেও রোজার গুর”ত্ব অপরিসীম। রাসূল (সা) বলেছেন, কেউ যদি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তবে বলো “আমি রোজাদার।”
১৮। লাইলাতুল ক্বদরের মাস : আল্ কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি এই (গ্রন্থ) টিকে নাজিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে। তুমি কি জানো সেই মর্যাদাপূর্ণ রাত কি? এই মর্যাদাপূর্ণ রাতটি হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা আল্ কদর : ১-৩) ক্বদরের রাতটিও রমজান মাসের মধ্যে।
১৯। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাস : রোজা আমাদের আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম শিক্ষা দান করে। রমজানে কঠোর শৃংখলার ফলে মানুষ দিনের বেলায় যথেচ্ছ ভোগের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারে না। নিয়মানুবর্তিতা ও নিয়ন্ত্রণের ফলে সে পূর্ণ মু’মিন হওয়ার সুযোগ লাভ করে থাকে। ফলে আত্মা কলুষমুক্ত ও পরিশুদ্ধতার পথে এগিয়ে যায়। দেহ ও মনকে ষড়রিপুর হাত থেকে বাঁচিয়ে সংযমী হতে সহায়তা করে। রোজার সংযম পালনে মূলত আমাদের জিহ্বাকে সংযত করতে হবে। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন কথা বললে ভাল কথা বলে কিংবা চুপ করে থাকে। (বুখারী ও মুসলিম) হাদীস থেকে জানা যায়, জবান বা জিহ্বার ১৫টি দোষ আছে, যথা ঃ ১. মিথ্যা কথা বলা, ২। ঠাট্টা বিদ্রƒপ করা, ৩. অশ্লীল ও খারাপ কথা বলা, ৪. গালি দেয়া, ৫. নিন্দা করা, ৬. অপবাদ দেয়া, ৭. গীবত করা, ৮. চোগলখুরী করা, ৯. বিনা প্রয়োজনে গোপনীয়তা ফাঁস করা, ১০. মোনাফিকী করা, ১১. ঝগড়া-ঝাটি করা, ১২. বেহুদা ও অতিরিক্ত কথা বলা, ১৩. বাতিল ও হারাম জিনিস নিয়ে কথা বলা, ১৪. অভিশাপ দেয়া, ও ১৫. সামনা-সামনি কারো প্রশংসা করা।
২০। আত্মত্যাগ ও আত্মজাগৃতির মাস : প্রবাদ আছে-ভোগ নয়, ত্যাগই সুখ। রোজা আত্মত্যাগের কঠোর অনুশীলন ও অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে তোলার মাস। রোজা সকল প্রকার ইন্দ্রিয় ও জাগতিক সুখ-ভোগ থেকে বিরত রেখে সিয়াম সাধনায় নিয়োজিত করে। এটা উচ্চ শ্রেণীর সিয়ামের লক্ষণ। নবী, সিদ্দিক ও আল্লাহর নিয়ামত প্রাপ্তদের সিয়াম উচ্চশ্রেণীর সিয়াম।
ইমাম গাজ্জালী (র) বলেন, উচ্চ শ্রেণীর সিয়াম হল সে সিয়াম, যে সিয়ামে দৈহিক সংযমের সাথে অন্তরের সংযম কার্যকরভাবে অনুসৃত হয়। অন্তরে যখন আখেরাত ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয় না, কোন স্বার্থ মুখ্য না হয়ে পরার্থে জীবন উৎসর্গীকৃত তার সিয়ামই প্রকৃত ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল।
২১। পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সামাজিকতা বৃদ্ধির মাস : রোজা মুসলমানদেরকে ঐক্য, সাম্য ও প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সমবেদনা বাড়ায়। ধনী-গরীব সমভাবে একই সময়ে রোজা এবং এক কাতারে সালাত আদায়ের ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, মমত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। রাসূল (সা) বলেছেন, এ মাস সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাস। (মিশকাত)
২২। কোরআন তেলাওয়াত করে পুণ্য হাসিলের মাস : কোরআন নাজিলের এই মাসে কোরআন তেলাওয়াত ও শ্রবণ করা খুবই পুণ্যের কাজ। হাদীসে আছে, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কোরআন শিখে এবং অপরকে শিখায়। হাদীসে আরো এসেছে, হযরত জিবরাইল (আ) রমজানের প্রতি রাতে রাসূল (সা)কে কোরআন শিক্ষা দিতেন। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত ফাতেমা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাইল (আ) প্রতি বছর রমজান মাসে একবার রাসূল-এ-খোদা (সা)কে কোরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। কিন্তু রাসূল (সা)এর ওফাতের বছর দু’বার কোরআন পেশ করেন। তাই এ মাসে কোরআন তেলাওয়াতে মনোযোগী হতে হবে এবং তারাবীর সালাতে অংশ গ্রহণ করে কোরআন শুনে আমল করতে হবে।
২৩। দাওয়াতে দ্বীনের মাস : এ মাস দ্বীনের দাওয়াতের জন্য খুবই গুরূত্বপূর্ণ। কোরআন নাজিলের এই মাসে কোরআনের দাওয়াতকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। কোরআন বলছে, “তার কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকে, নেক আমল করে, এবং ঘোষণা করে আমি একজন মুসলমান।” (সূরা হা-মীম-সাজদাহ : ৩৩) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, “ডাক তোমার প্রভুর দিকে হিকমত ও উত্তম নসীহত সহকারে, আর (লোকদের সাথে) বির্তক কর উত্তম পদ্ধতিতে।” (সূরা আন্ নহল-১২৫) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, ‘‘তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জানলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’’ (বুখারী)
২৪। জুমাতুল বিদার মাস : রমজানের শেষ জুমাকে জুমাতুল বিদা বলা হয়। এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মাহাতœ্য অপরিসীম। দিন হিসাবে শুক্রবার বা জুমাবারের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। মহানবী (সা) এক জুমুআ’র দিনে খুতবা প্রদানকালে জুমাবারকে ঈদের দিন বলেও আখ্যায়িত করেন। আলেম-ওলামাদের মতে, বছরের দিবস সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিবস হচ্ছে আরাফাতের দিবস ও সপ্তাহের দিবস সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিবস জুমুআ’র দিবস। জুম্মা’র রাতও তেমনি। যেহেতু এ দিন রমজান মাসে তাই এর গুরুত্ব আরো অনেক অনেক বেশী হওয়া উচিত মুসলমানদের কাছে।
২৫ । আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস : এই মাস কোরআনের আইন বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস। আল্ কোরআনে এরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তারা কাফির। (সূরা মায়েদা-৪৪), আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারা জালিম। (সূরা মায়েদা-৪৫), আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না তারা ফাসিক। (সুরা মায়েদা-৪৭)। কোরআনের কথানুযায়ী বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী দেশের আইন-আদালত, বিচার-ফয়সালা, দেশ পরিচালনা না হলে মুসলমান দাবী করা সত্ত্বেও কাফির, জালিম ও ফাসিক। আল্লাহর হুকুম অমান্য করা কত বড় গর্হিত কাজ একবার ভাবুন তো!
কাজেই রমজানের এই সুযোগ সমূহকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদেরকে পুরো মাস ঈমান ও এহতেসাবের সাথে রোজা রাখতে হবে। আরো কিছু আমল বা কাজ করতে হবে যা আল্লাহর অত্যন্ত পছন্দনীয়। দু’টি আমল হচ্ছে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করা এবং বেশী বেশী করে তওবা-এস্তেগফার করা। আর মু’মিনের জন্য জরুরী এই যে, জান্নাতের আশা করা এবং দোজখ থেকে পানাহ চাওয়া।
এছাড়া কোরআন নাজিলের এই বরকতময় মাসে প্রত্যহ কোরআন পাঠের অভ্যাস করতে হবে। সেই মোতাবেক জীবন-গঠন করে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর কোরআনের আইনকে প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ শপথ নিতে হবে। রমজানের শেষ দিবসে শবে কদর লাভের জন্য বেজোড় রাতগুলোতে ইবাদতে মগ্ন থাকতে হবে। গরীব-অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত (দান-সদকা-যাকাত প্রদানের মাধ্যমে) প্রসারিত করতে হবে। কারণ রমজানকে পেয়েও আমরা যদি গুনাহ মাফ করতে না পারি এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কি হতে পারে? তাই মাহে রমজানের হেদায়েতকে কাজে লাগিয়ে নাজাতের পথ খুঁজে নিতে হবে।

রোজাদারের কোরআন পাঠ ও দোয়া অব্যর্থ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার, যা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সূরা ফাতির : ২৯-৩০)। আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন দুই প্রকার।
প্রথমত, শাব্দিক তেলাওয়াতÑ আল কোরআন পাঠ করা। এর ফজিলতের ব্যাপারে কোরআন ও সুন্নাহে অনেক দলিল-প্রমাণ রয়েছে। যেমন বোখারি ও মুসলিমে কোরআন পাঠ অন্যতম রয়েছে, নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যিনি কোরআন মজিদ শিক্ষা করেন এবং অন্যকে শিক্ষা দেন।’ অনুরূপভাবে বোখারি ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল কোরআনে দক্ষ ও পন্ডিত ব্যক্তিরা সম্মানিত পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোরআন আটকে আটকে তেলাওয়াত করে এবং তা তার জন্য কষ্টকর হয়, তার জন্য দুইটি প্রতিদান রয়েছে।’ সহিহ মুসলিমে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন তেলাওয়াত কর। কেননা কোরআন কিয়ামতের দিন তেলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি হরফ (অক্ষর) পাঠ করবে, তাকে একটি নেকি প্রদান করা হবে। আর প্রতিটি নেকি ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মিম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মিম একটি হরফ।’ (তিরমিজি : ২৯১০)। দ্বিতীয়ত, হুকমি তিলাওয়াত বা প্রায়োগিক পঠনÑ অর্থাৎ আল্লাহর কথাকে বিশ্বাস করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নিয়ে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বর্জন করে কিতাব তথা আল কোরআনের সব হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ কোরআনের বিধানকে তেলাওয়াত করা। আর তার অর্থ হচ্ছে, কোরআন প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করা, সব আদিষ্ট বিষয় পালন ও নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করার মাধ্যমে তার বিধানাবলি মেনে নেয়া। বস্তুত এ প্রকারই হচ্ছে কোরআন নাজিলের বৃহত্তম লক্ষ্য। যেমনÑ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমরা আপনার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা সোয়াদ : ২৯)।
এজন্য সালাফে সালেহিন (রহ.) কোরআন তিলাওয়াতের এ পদ্ধতির ওপর চলে কোরআন শিক্ষা করেছেন। এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং মজবুত আকিদা-বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এর যাবতীয় বিধানকে ইতিবাচক ধারায় বাস্তবায়িত করেছেন। আবু আবদুর রহমান আসসুলামি (রহ.) বলেন, ‘উসমান ইবন আফ্ফান, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ প্রমুখ যারা আমাদের কোরআন শিক্ষা দিতেন তারা বলেছেন, তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে ১০টি আয়াত শিখতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভালোভাবে না শিখতেন ও তাতে যেসব জ্ঞান ও আমল করার কথা রয়েছে তা বাস্তবায়ন না করতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হতেন না। তারা বলেন, আমরা এভাবেই কোরআন, জ্ঞান ও আমল সবই শিখেছি।’ (তাফসিরে তাবারি)।
আর এটাই হলো কোরআন তেলাওয়াতের ওই প্রকার, যার ওপর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ভর করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, তখন যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না। আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন? তিনি বলবেন, ‘এভাবেই তোমার কাছে আমার নিদর্শন এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো। আর এভাবেই আমি প্রতিফল দান করি তাকে, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার রবের নিদর্শনে ঈমান আনে না। আর আখিরাতের আজাব তো অবশ্যই কঠোরতর ও অধিকতর স্থায়ী।’ (সূরা ত্বহা : ১২৩-১২৭)।
রমজানের অফুরন্ত কল্যাণের অন্যতম দিক হলো এ মাসে রোজাদারের দোয়া কবুল করা হয়। রমজান শুধু ইবাদতের বিশেষ মৌসুম নয়, দোয়ারও অতুলনীয় রোজাদারের দোয়া উপলক্ষ। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারায় পর পর কয়েকটি আয়াতে রমজান ও রোজা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। এর অব্যবহিত পরই আল্লাহ তার নবীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, (তাদের বলো) আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, আমি তাদের প্রার্থনা কবুল করি, যখন তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৬)।
কোরআনের ব্যাখ্যাবিশারদদের মতে, রোজার আলোচনার ধারাবাহিকতায় দোয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপনের মাধ্যমে রোজাদারের দোয়া বিশেষ কবুলযোগ্য বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই রোজাদারের করণীয় আমলগুলোর মধ্যে দোয়াও অতিগুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) এক হাদিসে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেয়া হয় না : রোজাদারের দোয়া, যে যাবৎ সে ইফতার করে; ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং মজলুম ব্যক্তির দোয়া।’ (তিরমিজি)। আমরা হাদিসে কুদসি থেকে জেনেছি, রোজা কেবল আল্লাহর জন্য, তাই রোজার পুরস্কার আল্লাহ নিজেই দেবেন। রোজাদারের জন্য কিয়ামতে ও জান্নাতে অকল্পনীয় পুরস্কার ছাড়াও দুনিয়ায় উত্তম পুরস্কার হলো তার দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। বিশেষ করে রমজানের প্রত্যেক রাতে এবং ইফতারের পূর্বমুহূর্তে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘ইফতারের সময় আল্লাহ বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আর রমজানের প্রতি রাতেও। সিয়াম পালনকারী প্রত্যেক বান্দার দোয়া কবুল হয়।’ (মুসনাদ আহমদ)। আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই ইফতারের সময় সিয়াম পালনকারীর দোয়া কবুল হয়।’ (বায়হাকি)। রহমতের এ ভর মৌসুমে তাই বেশি বেশি দোয়া করা উচিতÑ বিশেষ করে শেষ রাতে, সাহরির শেষ সময়, ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে, রুকু-সেজদায়, ফরজ নামাজের পর, কোরআন তেলাওয়াতের পর, তারাবির নামাজে চার রাকাতের বিরতিতে দোয়ায় মনোনিবেশ করা উচিত। দোয়া করতে হবে কাতরভাবে ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে। আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাইতে হবে। একমাত্র আল্লাহই এমন দয়ালু সত্তা, যিনি না চাইলে বরং রাগ করেন। হাদিসের ভাষ্যমতে, তিনি প্রতি রাতে বান্দাকে দেয়ার জন্য ডাকতে থাকেন। কোরআনে তিনি বারবার তার কাছে চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বান্দাকে দ্বিধাহীনভাবে প্রার্থনার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা জুমার : ৫৪)।

মাহে রমজান : মাহাত্ম্য ও করণীয়

মাহমুদ মুজিব

মাহে রমজান অফুরন্ত রহমত, বরকত, কল্যাণ ও মঙ্গল পূর্ণ মাস। জাগতিক লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির অনুসরণ ইত্যাদি মানবিক দূর্বলতা থেকে দূরে থেকে আত্ম সংশোধনের মাধ্যমে খোদায়ী গুণাবলী অর্জনের অবারিত সুযোগ এনে দেয় পবিত্র মাহে রামাজান।
ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম একটি হলো রোজা। তাই কেউ অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে। এবং রোজা নিয়ে কটুক্তি করলে ঈমান চলে যাবে। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল বুদ্ধিমান সাবালক মুসলিম নর-নারীর উপর রোজা ফরজ। শরয়ী কোন ওজর ব্যতীত রোজা না রাখলে কবীরা গুনাহ হবে।
রোজার ইতিহাস বহু প্রাচীন। মুসলমানদের পূর্বেও অন্যান্য ধর্মে রোজার বিধান চালু ছিলো। যেমন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন- ‘ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়ে ছিলো। নিঃসন্দেহে তোমরা (এ রোজার মাধ্যমে) মুত্তাকী  (খোদাভীরু) হতে পারবে। (সুরা বাকারা- ১৮৩)
রোজার সংজ্ঞা :
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদতের নিয়তে সুবহে সাদিক (সেহরীর শেষ সময় ও ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময়) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, সহবাস ও রোজা ভঙ্গকারী যাবতীয় কাজ হতে বিরত থাকা।
রোজা, সেহরী ও ইফতারের কতিপয় মাসায়েল :
*রমজানের রোজার নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত ব্যতীত সারাদিন পানাহার ও যৌনতৃপ্তি থেকে বিরত থাকলেও রোযা হবে না।
* মুখে নিয়ত করা জরুরী নয়। অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে, তবে মুখে নিয়ত করা উত্তম। মুখে নিয়ত করলেও আরবীতে হওয়া জরুরী নয়- যে কোন ভাষায় নিয়ত করা যায়। আরবীতে করলে এভাবে করা- نَوَيْتُ بِصَوْمِ الْيَوْمِ অথবা   بِصَوْمِ غَدٍ نَوَيْت   বাংলায় : ‘আমি আজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম।’
সেহরী :
* সেহরী খাওয়া জরুরী নয় তবে সেহরী খাওয়া সুন্নত। অনেক ফজিলতের আমল। ক্ষুধা না লাগলে বা খেতে ইচ্ছে না করলেও সেহরীর ফজিলত লাভের নিয়তে যা-ই হোক কিছু পানাহার করে নেয়া উত্তম।
*নিদ্রার করণে সেহরী খেতে না পারলেও রোজা রাখতে হবে।* বিলম্বে সেহরী খাওয়া উত্তম।
ইফতার :
*সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মুস্তাহাব। বিলম্বে ইফতার করা মাকরূহ।* সূর্য অস্ত যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরই ইফতার করতে হবে। শুধু ঘড়ি বা আযানের উপর নির্ভর করা ভালো নয়। কারণ তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
*সবচে’ উত্তম হলো খেজুর দ্বারা ইফতার করা। তারপর কোন মিষ্টি জাতীয় জিনিষ দ্বারা ও তারপর পানি দ্বারা করা ভালো।
* ইফতার করার পূর্বে দু‘আ পড়া মুস্তাহাব। নিম্নোক্ত দু‘আটি পড়া যেতে পারে – اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ
* ইফতারের সময় দু‘আ কবুল হয়। তাই ইফতারের পূর্বে বা কিছু ইফতার করে বা ইফতার থেকে সম্পূর্ণ ফারেগ হয়ে দু‘আ করা মুস্তাহাব।
রোজার ফজিলত
সাধারণভাবে যে কোন রোজাই অত্যন্ত পুণ্য ও সওয়াবের কাজ। এ প্রসঙ্গে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘যে আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোযা রাখবে আল্লাহ তা‘আলা সেই দিনের পরিবর্তে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে দিবেন।’ (বুখারী ও মুসলিম)
* রোজা একান্তভাবে আমার-ই জন্যে। আর আমিই তার প্রতিদান দিবো।’ (বুখারী ও মুসলিম)
রমজানের রোজার বিশেষ ফজিলত :
সাধারণ রোজার পাশাপাশি রমজান মাসের রোজার বিশেষ কতিপয় বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে :-
* রোজাদারের (ক্ষুধার কারণে) মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের (এক প্রকার দারুণ সুগন্ধি) চেয়েও অধিক প্রিয়।
*ফিরিশতাগণ রোজাদারের জন্যে ইফতার করা পর্যন্ত ইস্তেগফার তথা গুনাহ্ মাফ চাইতে থাকে।
*রমজানের প্রতিদিন আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে সুসজ্জিত করে বলেন- ‘আমার (রোজাদার) বান্দারা অচিরেই তাদের পরিশ্রম ও কষ্ট-ক্লেশ দূরে সরিয়ে তোমার কাছে পৌঁছে যাবে।
* এই মাসে লাইলাতুল কদর রয়েছে। যে রাত হাজার রাতের চেয়েও উত্তম। যে এ রাত্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো তবে সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো।
*রমজানের শেষ রাতে রোজাদারদের ক্ষমা ঘোষণা করা হয়।
* এ মাসে একটি নফল ইবাদত (সওয়াবের ক্ষেত্রে) ফরজের সমতুল্য। আর একটি ফরজ সত্তরটি ফরজের সমতুল্য।
* যে পূর্ণ ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।
রমজানে বিশেষভাবে করণীয়:
কুরআন তিলাওয়াতে যতœ নেয়া: রমজান হলো কুরআনের মাস। এ মাসে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পূর্ণ কুরআন উপস্থাপন করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রমজান মাসে কুরআন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। অনেক সাহাবী রমজানের প্র্রতিদিন কুরআন খতম করতেন। বহু পূর্বসূরী রমজান মাসে প্রতি তিন দিনে কুরআন খতম করতেন। তাই কুরআন তেলাওয়াতে বিশেষভাবে যতœ নেয়া উচিত।
তারাবীহ সহ আল্লাহ তায়ালার ইবাদাতে রাত্রি জাগরণ: হযরত উমর (রাঃ) রমজানের মধ্যরাতের পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিয়ে ‘নামায’ ‘নামায’বলে উৎসাহ দিতেন। হযরত উসমান (রাঃ) রমজানের রাত্রে এমন দীর্ঘ নামায পড়তেন যে অনেক সময় এক রাকতে পুরো কুরআন পড়ে ফেলতেন।
দান-সদকা করা: রমজান মাসে তাক্বওয়া অর্জনের আরেকটি মাধ্যম হলো সদকা। নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে স্বত্ত্ব ত্যাগ করে গরীব-দূঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়াকে সদকা বলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সবচে’ বড় দানবীর। আর রমজান মাসে তিনি সর্বাধিক দান-সদকা করতেন। তিনি বলেন-সর্বোৎকৃষ্ট সদকা হলোরমজানের সদকা।
রোযাদারকে ইফতার করানো:হযরত সালমান (রাঃ)  থেকে বর্ণিত হয়েছে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-‘যে রমজান মাসে কোন রোযাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করবে তবে তার পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং রোযাদারের মূল প্রতিদানের কোন অংশ কমানো ব্যতিরেকে সে রোযাদারের সমান প্রতিদান পাবে।’ সাহাবাগণ বলে ওঠলেন- ইয়ারাসূলুল্লাহ! ইফতার করানোর মতো সামর্থ্য তো আমাদের সবার নেই!! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যারা একটুখানি দুধ বা একটি খেজুর বা এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে আল্লাাহ তা‘য়ালা তাদেরকেও এই সাওয়াব দিবেন।’ (ইবনে খুযাইমা ওবায়হাকী)
ই‘তিকাফ: রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টমন্ডিত আমল হলো শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ থাকা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ থাকতেন। তবে উনার ইন্তিকালের বছর তিনি বিশ দিন ই‘তিকাফ ছিলেন। সুতরাং ই‘তিকাফ যে কোন সময় হতে পারে । কিন্তু অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ হলো রমজানের শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ থাকা। যাতে লাইলাতুল ক্বদর লাভের সৌভাগ্য হয়।
লাইলাতুল ক্বদর: রমজান মাসের আরেক নেয়ামত হলো লাইলাতুল ক্বদর। রমজানের শেষ দশ দিনের যে কোন বেজোড় রাত লাইলাতুল ক্বদর হতে পারে। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে ২৭ তম রাত্রি (উল্লেখ্য আরবি মাস শুরু হয় মাগরিবের আযানের পর পর- তাই ২৭ তম রাত্রি বলা হয়েছে- ২৭শে রমজানের আগের রাত্রী ২৭তম রাত্রী)  লাইলাতুল ক্বদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচে’ বেশি। লাইলাতুল ক্বদরের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্বন্ধে আল্লাহ তা’আলা বলেন- ‘অবশ্যই আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল ক্বদরে অবতীর্ণ করেছি। আপনি (হে নবী) কি জানেন- লাইলাতুল ক্বদর কি? তা হচ্ছে এমন এক রাত যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’ (সুরা আল-ক্বদর)
সদকাতুল ফিতর:সদকাতুল ফিতর রমজান মাসে দিতে হয় এমন একটি অনুদান। যাতে মুসলিম সমাজের অভাবী ব্যক্তিরাও যেন স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করতে পারে। ঈদের নামাযের পূর্বেই এই সদকা আদায় করতে হয়। সাহাবায়ে কেরাম ঈদের বেশ কয়েক দিন পূর্বে অভাবীদের কাছে এ সদকা পৌছে দিতেন। যাতে তারা ঈদের জামা-কাপড় এবং বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী কেনাকাটা করে খুশি মনে ঈদ উদযাপন করতে পারে ।
রমজানে বর্জনীয়:
সর্বপ্রকার গুনাহ বা পাপকর্ম ছেড়ে দেয়া। অনর্থক কাজ-কর্ম ও গল্প-গুজবে সময় নষ্ট না করা। অন্যের গীবত-শেকায়াত তথা পরনিন্দা না করা। নাচ-গান, জুয়া ও সব ধরনের অশ্লীলতা-বেহায়াপনায় লিপ্ত না হওয়া। দিনের বেলা হোটেল-রেস্তোঁরা ইত্যাদি খোলা না রাখা।
রমজানে সংযম ও আত্মত্যাগের অনুশীলন এবং সেই সাথে ইসলামভিত্তিক ন্যায়-নিষ্ঠা, সত্য ও সততা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ প্রয়োজন। ন্যায়-নিষ্ঠা ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠার জন্যে ত্যাগ-তিতিক্ষা বরণ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত, শাশ্বত ও জীবন্ত। নৈতিকতা, শালীনতা ও একত্রে ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে সহ মর্মিতার সদভ্যাস গড়ে তুলে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক  কল্যাণ সাধনের পথ প্রশস্ত করার অনুশীলন করার রামাজান। বাঙালি মননে চিরায়ত ইসলামী  মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চরিত্র, ধর্ম ও আদর্শ রক্ষা এবং  সর্বগ্রাসী অপরাধ প্রবণতা রোধের অনুশীলনের চেতনা জোরদার  করার দারুণ সুযোগ আসে এ মাসে।
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সকাশে সকাতর আর্তি— তিনি যেন আমাদের সকলকে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার তৌফিক দান করেন এবং তাঁর অফুরান অনুকম্পা ও করুণার বারিধারায় আমাদের সিক্ত করেন।

রমজানুল মোবারক নেকী অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মওসুম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

প্রকৃত মু’মিন আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও সর্বাত্মকভাবে তাঁর আনুগত্যে নিজের জীবন অতিবাহিত করে। শেষ নিঃশ্বাস অবধি এ ধারা অব্যাহত রাখে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন : (হে নবী) ইয়াক্বীন (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত আল্লাহর বন্দেগীতে অব্যাহত থাকুন। এছাড়াও আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিশেষ বিশেষ কিছু সময় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে দান করেছেন, যাতে করে সে সময়গুলোতে একটু অতিরিক্ত নেক আমল করে আমাদের ছওয়াবের পরিমাণকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারি। নেকী অর্জনের এমনি ধরনের এক গুরুত্বপূর্ণ মওসুম হচ্ছে রমজানুল মোবারক।
জীবনে আরেকটি রমজান পাওয়া কতই না সৌভাগ্যের ব্যাপার। গত বছর অনেকে রমজানে আমাদের আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে রমজান রেখেছিলাম। আজ আমাদের মাঝে অনেকেই নেই। আগামী রমজান আমাদের পাওয়ার সৌভাগ্য হবে কি? এটা আল্লাহই ভালো জানেন। আর যদি আল্লাহপাকের একান্ত দয়ায় পেয়ে যাই, তাহলে তার জন্য আমরা কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি?
রাসূল (সা.) বলেন, কেউ এ মাসে যে কোনো ভাল কাজ করলে তার সওয়াব হবে অন্য মাসের ফরজের সমান। আর একটি ফরজ আঞ্জাম দিলে তার সওয়াব হবে অন্য মাসের ৭০টি ফরজের সওয়াব। এটি হচ্ছে সবরের মাস। আর সবরের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। এটি সমবেদনার মাস। এ মাসে রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। কেউ এ মাসে রোজাদারকে ইফতার করালে তা তার গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়া ও জাহান্নাম থেকে তার গর্দান মুক্ত হওয়ার কারণ হয়ে যাবে। এবং রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব হবে, তবে এতে রোজাদারের তার নিজের সওয়াবে কোনো কমতি হবেনা। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ!  আমাদের সবার যে রোজাদারকে ইফতার করানোর সক্ষমতা নেই। তিনি বললেন, এমন বিপুল সওয়াব সে ব্যক্তিকেও দান করা হবে, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে দুধ, খেজুর এমনকি শুধু পানি দিয়ে হলেও ইফতার আপ্যায়ন করাবে। যে ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত রোজাদারকে ইফতারের সময় পানি পান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাওযে (কাওছার) থেকে এমন পানীয় পান করাবেন, যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে আর কোনোদিন তৃষ্ণার্ত হবেনা। কেউ যদি এ মাসে তার ক্রীতদাস (এমনকি কর্মচারী/চাকর)-এর কাজ কমিয়ে দেয় আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেবেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবেন। এ মাসের প্রথম হচ্ছে রহমত। মধ্যখানে রয়েছে মাগফিরাত। আর শেষ দিকে রয়েছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি।
এ মাসটিতে তোমরা ৪টি কাজে বেশি বেশি অভ্যস্ত হতে সচেষ্ট হও। প্রথম দুটোর মাধ্যমে তোমাদের প্রভু সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর শেষ দুটো না করে তোমাদের কোনো উপায় নেই। যে দু’অভ্যাস দিয়ে তোমাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে তা হচ্ছে ১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহের সাক্ষ্য দেয়া আর ২. আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করতে থাকা। আর যে দুটো না করে তোমাদের কোনো উপায় নেই তা হচ্ছে ৩. আল্লাহর কাছে জান্নাতের আবেদন করতে থাকা এবং ৪. জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইতে থাকা। (সাহাবী সালমানের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন বায়হাকী ও ইবনে খোযাইমা)
ইমাম যুহরী (র.) বলেছেন, “রমজান আসা মানেই হলো বেশি বেশি তেলাওয়াতে কুরআন ও অন্যকে খাওয়ানোর প্রচেষ্টা।” অনেকেই মসজিদে বসে থাকতেন আর বলতেন, রোজাকে পাহারা দেই, বাইরে গিয়ে কারো গীবত চর্চায় ব্যস্ত হওয়া থেকে। রোজা আসলে আমরাও কিছুটা প্রস্তুতি নেই। তবে, আমাদের প্রস্তুতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের। আমাদের অনেকেই দেখা যায়, রোজার প্রারম্ভে খাদ্য সম্ভারের সমাহারে ঘর ভর্তি করে নেয়া। এমনকি দোকানপাট পর্যন্ত খালি হয়ে যায়। সারা দিনের অভুক্ত থাকার বদলা নেয়ার জন্য ইফতারে রাতের বেলায় এবং সেহরীতে দ্বিগুণ তিনগুণ উদরস্থ করার মানসিকতা। রমজান এসেছে খাওয়া কমাতে, অথচ আমাদের কেনাকাটা দেখলে মনে হয় রমজান যেন এসেছে খাবার বাড়িয়ে দিতে। আর এ সুযোগে আমাদের দেশে তো ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে গরিবের নাভিশ্বাস সৃষ্টি করে দেয়। রমজান আসে মু’মিনকে ঘুম কমিয়ে সদা তৎপর হতে সাহায্য করতে। অথচ অনেকেই দিনের অর্ধবেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে অলসভাবে কাটিয়ে দেন। মূল্যবান সময়গুলো যদি ঘুমেই কেটে যায়, তাহলে কি পাবো রমজানের নেয়ামত থেকে।
অন্তরে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রথমে আবারো চোখ বুলিয়ে নেই রোজা ও রমজানের ফযীলত ও গুরুত্ব সংক্রান্ত কিছু হাদীসের উপর। রাসূলে করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, আদম সন্তান প্রতিটি ভালো কাজের প্রতিদান দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তবে রোজা, সেটা তো আমার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তার প্রতিদান আমি নিজেই দিব। আমার (সন্তুষ্ট হাসিলের) উদ্দেশ্যে রোজাদার পানাহার থেকে বিরত থেকেছে… রোজাদারের মুখ থেকে নির্গত দুর্গন্ধ আল্লাহপাকের নিকট মিশকের সুগন্ধের চেয়েও প্রিয়-(বুখারী)। একমাসের সিয়াম সাধনার মতো এক নাগাড়ে এত দীর্ঘ ইবাদতের সুযোগ আমাদের জীবনে আর দ্বিতীয়টি নেই। দিনের বেলায় সিয়াম সাধনা। আর রাতের বেলায় কেয়ামুল্লাইল অর্থাৎ নামাজে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কুরআন তেলাওয়াতের সুযোগ নিয়ে রমজান আসে বার বার আমাদের কাছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন “রাসূল করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন রোজা এবং আল কুরআন উভয়ে বান্দার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। রোজা বলবে হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে নিবৃত্ত রেখেছি। আল কুরআন বলবে হে প্রভু, আমি তাকে রাতের বেলা ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। উভয়ে বলবে, হে প্রভু তার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ কবুল করুন। আল্লাহপাক তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করে নিবেন”-(আহমদ)। আবু সাইদ আল খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, “কেউ যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি রোজা সম্পন্ন করে, সে একটি দিনের কারণে আল্লাহ তার চেহারা থেকে জাহান্নামে’র আগুনকে সত্তর বছর দূরে নিয়ে যান”। -(আহমদ) সহুল বিন সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন, “রাসূল করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, জান্নাতে একটি বিশেষ ফটক রয়েছে, তার নাম হচ্ছে রাইয়ান। সেখানে থেকে ডাক দেয়া হবে। রোজাদারগণ কোথায়? সর্বশেষ রোজাদারের প্রবেশ সম্পন্ন হলে ফটকটি বন্ধ করে দেয়া হবে। -(বুখারী ও মুসলিম)।
আল্লাহর কাছ থেকে কতনা অবারিত সুসংবাদের সুবাস নিয়ে হাজির হয় রমজান প্রতিবার আমাদের কাছে। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রমজান মাসের আগমন হলে নবীজি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, “বরকতময় একটি মাস তোমাদের নিকট এসে গেছে, যে মাসে সিয়াম সাধনা তোমাদের উপর ফরজ করে দেয়া হয়েছে। এ মাসটিতে জান্নাতের প্রবেশদ্বারগুলো খুলে রাখা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলোকে বন্ধ করে রাখা হয়, শয়তানগুলোকে শিকল দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়। এ মাসে রয়েছে এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত”।-(আহমদ, নাসাঈ, বায়হাকি) অন্য হাদীসে এসেছে, রমজানের আগমন ঘটার সাথে সাথে একজন ফেরেশতা ডাকতে থাকে হে সুকর্ম সন্ধানী, সুসংবাদ গ্রহণ করো। আর হে দুষ্কৃতি সন্ধানী বিরত হও। রমজান শেষ হওয়া পর্যন্ত এ ডাক চলতে থাকে-(তিরমিযী, ইব্ন্ মাজাহ, ইবন্ খোযাইমাহ)।
রমজানের উদ্দেশ্য ও তাহা হাসিলের উপায়? সিয়াম সাধনার প্রক্রিয়া, প্রবৃত্তির চাহিদা ও রিপু দমনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যে আত্ম সংশোধনের সৃষ্টি হয় তা একজন মু’মিনকে মুত্তাকী পর্যায়ে উন্নীত করে। আর এই তাকওয়া অর্জন সিয়াম সাধনার প্রকৃত উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে রোজার নির্দেশ করে বলেছেন, “আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হবে”। বছরের পর বছর যদি আমরা রোজা রাখতেই থাকি কিন্তু আমাদের মধ্যে তাকওয়া অর্জন হয়না তাহলে রোজার মূল উদ্দেশ্য থেকে আমরা বঞ্চিতই থেকে যাব। আংশিক ছওয়াব পেলেও আমরা পুরো ছওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকবো। শুধু পানাহার আর সহবাস থেকে বিরত থাকলেই প্রকৃত রোজা হয়না। প্রকৃত রোজা হচ্ছে নিজের নফস্ ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় পরিচালিত করা। যাবতীয় গুনাহ বা অন্যায়ের কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যে মিথ্যা কথা, অন্যায় কাজ ও জাহেলী তৎপরতা থেকে নিজেকে বিরত রাখেনা, আল্লাহর কোনো দরকারই নেই সে শুধু খানাপিনা থেকে বিরত থাকবে। (বুখারী)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, কিছু রোজাদার এমন রয়েছে যে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া তাদের রোজার আর কিছুই নেই-(আহমদ)। এমনকি নিজে তো মিথ্যা, অন্যায় এবং এ জাতীয় গুনাহ থেকে বিরত থাকবেই, অন্য কেউও যদি তাকে অন্যায়ভাবে প্ররোচিত করে, সেখানেও তাকে আত্মসংযমের পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে। তিনি এরশাদ করেছেন আরেকটি হাদীসে, ‘তোমাদের কেউ যেদিন রোজা রাখে সেদিন যে কোনো মন্দ কথা উচ্চারণ না করে, গালমন্দ না করে, আর কেউ যদি তাকে অন্যায় কথা বলে বা গালমন্দ করে সে যেন বলে দেয় আমি রোজাদার-(বুখারী)। এ আত্মসংযমই হচ্ছে রোজার মূল শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম এভাবেই রোজার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন। হজরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, “তুমি যখন রোজা রাখবে, তখন যেন তোমার কর্ণ ও চক্ষু রোজা রাখে, তোমার কণ্ঠও যেন রোজা রাখে মিথ্যা এবং যাবতীয় গুনাহ থেকে। প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। রোজার দিনটিতে তুমি ভাবগম্ভীর ও প্রশান্ত থাকার চেষ্টা কর। রোজার দিনটি এবং রোজা ছাড়া দিনটি যেন তোমার একই রকম না হয়ে যায়”। মোদ্দাকথা, দেহ এবং আত্মা উভয়ে মিলে যে রোজা রাখে সেটাই হচ্ছে প্রকৃত রোজা। সে রোজার মাধ্যমেই আল্লাহর কাছ থেকে অর্জিত হবে অফুরন্ত মাগফিরাতের সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমজান মাসের রোজা রাখে তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমজান মাসে রাতে ইবাদতে মশগুল থাকে, তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।-(বুখারী/মুসলিম)
ঈমান ও ইহতিসাব দ্বারা বুঝানো হয়েছে- রোজাকে আল্লাহ যে ফরজ করেছেন তার সতেজ উপলব্ধি সহকারে তা পালন করা। আল্লাহর কাছ থেকে অফুরন্ত পুরস্কারের প্রবল আকাক্সক্ষা সহকারে পালন করা। রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছার কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকা। শুধু গৎ বাঁধা অভ্যেস হিসেবে নয়, বা সবাই যেহেতু রোজা রাখবে কাজেই আমারও না রেখে গতি নেই। অথবা পেট উপোষ রাখলে স্বাস্থ্যবিদদের দৃষ্টিতে অনেক ফায়দা আছে- এসব কিছুর কারণে নয়, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হুকুম পালনের পরাকাষ্ঠা নিয়ে। সিয়াম সাধনার এ নির্ভেজাল রূপটির নাম হচ্ছে ঈমান ও ইহতিসাব। ক্বিয়ামুল্লাইল অর্থাৎ তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদও অনুরূপভাবে ঈমান ও ইহতিসাবের সহিত আদায় করতে হবে। ঘন ঘন করে কতকগুলো রুকু সিজদা দিয়ে অনেকগুলো রাকয়াতের ফিরিস্তি তৈরি করা ক্বিয়ামুল্লাইলের সার্থকতা নয়। সার্থকতা হচ্ছে খুশু খুজুসহ ভাবগম্ভীর পরিবেশে দীর্ঘ ক্বিয়ামে লম্বা কিরাত ও সময় নিয়ে ধীর স্থিরভাবে রুকু সিজদা করে আল্লাহর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ গ্রহণ করা। খতম তারাবীহ হলেই হবেনা। কুরআনকে অবশ্যই তাজবীদ সহকারে হৃদয়ঙ্গম করে তিলাওয়াত করতে হবে। চাই খতম হোক আর না হোক। রকেটের গতিতে কুরআন খতম এবং খতম তারাবীহর এ নি®প্রাণ রেওয়াজ অনেকের কাছে একটা ঠুনকো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ক্বিয়ামুল্লাইলের প্রাণ এবং আল্লাহর কালামের তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য তাতে হারিয়ে গেছে। মজলুম তিলাওয়াতের শিকার এ কুরআন কিয়ামতের দিন সুপারিশ করা তো দূরে, বরং তিলাওয়াতকারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করে বসবে।
আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের প্রত্যাশায় রমজানের রোজা, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ এবং কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি আরেকটি নেক আমলকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আদায় করতে হবে। আর সেটি হচ্ছে দান খয়রাত। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আমলটিকে রমজানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “নবীজী (সা.)  ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল”। আর রমজান মাস এলে হযরত জিবরাঈল (আ.) যখন তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন, তাঁকে নিয়ে কুরআন পাঠের অনুশীলন করতেন, তখন তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) রমজানের প্রতিটি রাতেই নবীজী (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। কুরআন পাঠের অনুশীলন করতেন। জিবরাঈল (আ.)র সাথে সাক্ষাতের সময়গুলোতে তিনি মেঘবাহী বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। অন্য রেওয়াতে এসেছে, কেউ কিছু চাওয়ামাত্র তিনি তা দান করে দিতেন-(আহমদ), কারণ জান্নাতের  আকাক্সক্ষা থাকলে অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় অবারিতভাবে দান করতে হবে। আলী (রা.) বর্ণনা করেছেন, “জান্নাতে এমন কিছু প্রাসাদ রয়েছে যেগুলো এত সুন্দর করে তৈরি করা হয়েছে যে সেগুলোর বাইরে থেকে ভিতরের সবকিছু দেখা যাবে এবং ভিতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, কাদের জন্য সে সুযোগ হে আল্লাহর রাসূল (সা.)? তিনি বললেন, ঐসব লোকদের জন্য যারা মিষ্টভাষী, অন্যদেরকে আহার সরবরাহ করে, সর্বদা রোজা পালন করে আর রাতের অন্ধকারে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়”। (আহমদ/ইবনে হাব্বান/বায়হাকী)
রমজানে উপরোল্লিখিত নেক আমলগুলোর পাশাপাশি আরোও যে আমলটার সুযোগ বেশি করে নিতে হবে সেটা হচ্ছে তাওবা এবং ইস্তেগফার। রোজা ও অন্যান্য নেক আমলের কারণে এ মাসে বান্দার প্রতি আল্লাহর করুণা অনেক বেড়ে যায়। বান্দাও এ মাসে তুলনামূলকভাবে গুনাহ কম করে এবং বেশি করে নেক আমলের কারণে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলে অনেকখানি এগিয়ে যায়। আর এটাই মোক্ষম সময় আল্লাহর কাছে তাওবাহ করার, গুনাহসমূহ ছেড়ে দেয়ার খাঁটি অঙ্গীকার করে অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়ার।  রমজানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায় শেষের দশ দিনের আমলকে আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। দশ দিনের ঐ বিশেষ সুযোগের মধ্যেই নিহিত রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও সেরা লাইলাতুল ক্বদরের রাতটি। যা লুকিয়ে রয়েছে পাঁচটি বেজোড় রাতের যে কোনো একটি রাতে। তাই ঐ পাঁচটি রাতের আমল অবশ্যই অন্য রাতের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের শেষ দশটি দিন এলে রাসূলুল্লাহ (সা.) কোমরে কাপড় বেঁধে নামতেন, রাতে ইবাদতে মশগুল হয়ে যেতেন, পরিবারের অন্যান্যদেরকেও জাগিয়ে দিতেন। -(বুখারী/মুসলিম)
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, তিনি এ দশদিনে এত বেশি আমল করতেন যা তিনি অন্যান্য সময় করতেন না।-(মুসলিম) লাইলাতুল কাদরকে পাওয়ার জন্যই এ দশদিনে ইতিকাফ করতেন এবং এত আমল করতেন। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিছাবের সাথে লাইলাতুল কাদরে ইবাদত করবে তার অতীত গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী/মুসলিম) আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) আমি যদি লাইলাতুল কাদর পাই তাহলে কোনো দোয়া বেশি পড়বো? তিনি বললেন, বলো, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।-(তিরমিযী) অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি খুবই পছন্দ করেন, অতএব আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজানের এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এ প্রসঙ্গে মুসলিম পন্ডিতগণ বলেছেন: ‘‘প্রতারণার মাধ্যমে পাচারের শাস্তি বিধানে সরকার তার ধরণ ও ভয়াবহতার ভিত্তিতে মৃত্যুদন্ড, চাবুক মারা, জেলে আটকে রাখা, নির্বাসনে দেয়া, মাল ক্রোক করা, শোকজ নোটিশ, সতর্কীকরণ নোটিশ, সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ, বয়কট করা, ভর্ৎসনা করা ও উপদেশ দেয়া ইত্যাদির যে কোন শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে।’’ তবে যদি পাচারকারী কোন নারীকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অথবা অপহরণ করে পাচার করে, তবে তার উপর অপহরণের জন্য শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি (হাদ্দুল হিরাবা) প্রযোজ্য হবে। আর যদি কেউ শিশুকে চুরি করে পাচার করে তবে তাকে তা’যীর হিসেবে রাষ্ট্র যে কোন ধরণের শাস্তি দিতে পারে।
২০০০ সালের বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাশকৃত নারী ও শিশু অধিকার সম্পর্কিত ৮ আইনের ৫ নং ধারায় পাচারের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ক) যদি কোন ব্যক্তি কোন বেআইনি বা নীতিগর্হিত উদ্দেশ্যে কোন শিশুকে বিদেশ হইতে আনয়ন করেন বা বিদেশে প্রেরণ বা পাচার করেন অথবা ক্রয় বা বিক্রয় করেন বা উক্তরূপ কোন উদ্দেশ্যে কোন শিশুকে নিজ দখলে, জিম্মায় বা হেফাজতে রাখেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন। খ) যদি কোন ব্যক্তি নবজাতক শিশুকে হাসপাতালে, শিশু মাতৃসদন, নার্সিং হোম, ক্লিনিক ইত্যাদি বা সংশ্লিষ্ট শিশুর অভিভাবকের হেফাজত হইতে চুরি করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি উপ-ধারা (ক) এ উল্লেখিত দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন।
আমানতের খিয়ানত একটি জঘণ্য কাজ এবং এর দ্বারা উপার্জিত সম্পদও হারাম। আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমাদের কাউকে যদি কোন ব্যক্তি কোন কিছুর আমানতদার বানায় বা কোন বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে, তাহলে সে যেন উক্ত আমানত প্রাপককে পরিশোধ করে দেয় এবং সে যেন (এ ব্যাপারে) তার রব আল্লাহকে ভয় করে। তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, যে কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী। তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।’’ অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তোমাদের ওপর ন্যস্ত আমানতের খেয়ানত করো না। অথচ তোমরা জান।’’ অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন: ‘‘আর কোন নবীর জন্য কোন কিছু আত্মসাৎ করা মানানসই নয়, আর যে ব্যক্তি কোন কিছু আত্মসাৎ বা গোপন করবে, কিয়ামতের দিন সে উক্ত আত্মসাৎকৃত বস্তুসহ উপস্থিত হবে; অত:পর প্রত্যেককে তার পরিপূর্ণ বদলা দেয়া হবে এবং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না।’’
মুফাসসিরগণ বলেছেন: এ আয়াত সাহাবী আবু লুবাবা সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। বনু কুরাইয়া গোত্রের পল্লীতে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা বসবাস করছিল। রসূল (স.) বনু কুরাইয়াকে অবরোধ করে রেখেছিলেন। তিনি আবু লুবাবাকে কোন প্রয়োজনে বনু কুরাইযার কাছে পাঠিয়েছিলেন। বনু কুরাইযার লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: ‘‘হে আবু লুবাবা! আমাদের ব্যাপারে রসুলের রায় অনুসারে আমরা যদি নেমে আসি, তা হলে আমাদের কি হবে বলে তোমার মনে হয়? আবু লুবাবা নিজের গলার দিকে ইংগিত দিয়ে বুঝালেন, তোমাদেরকে যবাই করা হবে। কাজেই নেমে এসো না। তাঁর এ কাজটি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা ছিল। আবু লুবাবা নিজেও স্বীকার করেন যে, আমি কাজটি করার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলাম যে, আমি খিয়ানত করে ফেলেছি। এরপর আবু লুবাবা মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে নিজেকে ছয়দিন যাবৎ বেঁধে রাখেন এবং তাঁর তাওবা কবুল হবার ঘোষণা আসার পরই নিজেকে মুক্ত করেন।
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: ‘‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শাহাদাত বরণকালে আমানতের খিয়ানত ব্যতীত সকল গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়। আমানতে খেয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন হাজির করা হবে এবং বলা হবে, তোমার আমানত ফেরত দাও। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করে ফেরত দেব? দুনিয়ার তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন তার কাছে যে জিনিসটি আমানত রাখা হয়েছিল, তাকে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থলে হুবহু যে আকারে রাখা হয়েছিল সেই আকারে দেখানো হবে। অতপর বলা হবে, তুমি ওখানে নেমে যাও এবং ওটা বের করে নিয়ে এসো। অত:পর সে নেমে যাবে এবং জিনিসটি ঘাড়ে করে নিয়ে আসবে। জিনিসটি তার কাছে দুনিয়ার সকল পাহাড়ের চেয়ে ভারী মনে হবে। সে মনে করবে যে জিনিসটি নিয়ে আসলে সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু জাহান্নামের মুখের কাছে আসা মাত্র আবার আমানতের জিনিসসহ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে পড়ে যাবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে।
আমাদের সমাজে যাদু-টোনা করে বিভিন্ন জঘণ্যতম কাজের মাধ্যমে একশ্রেণীর লোকজন উপার্জনের পথ খুলে নিয়েছে। অথচ এ যাদু-টোনা কবীরা গুনাহের মধ্যে অন্যতম একটি গুনাহ। যাদু কবীরা গুনাহ হওয়ার কারণ এই যে, এ কাজ করতে হলে কাফির না হয়ে করা সম্ভব হয় না। আল্লাহ বলেন: ‘‘শয়তানরা কুফরিতে লিপ্ত হয়ে মানুষকে যাদু শিক্ষা দিতো।’’ মূলত অভিশপ্ত শয়তান মানুষকে যাদু শিক্ষা দেয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সাথে শিরক করা। হারূত ও মারূত নামক দু’জন ফিরিশতার ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘তারা উভয়ে কাউকে যাদু শিক্ষা দেয়ার আগে এ কথা বলে দিত যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ। কাজেই তোমরা কুফরিতে লিপ্ত হয়ো না। তারপর তাদের কাছ থেকে লোকেরা এমন যাদু শিখত, যা দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। অথচ তারা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না। তারা যে যাদু শিখতো তা তাদের শুধু ক্ষতি করতো, উপকার করতো না। আর তারা এ কথাও জানত যে, যে ব্যক্তি যাদু আয়ত্ত করবে, আখিরাতে সে কোন অংশ পাবে না।’’
ইসলামী বিধান মতে যাদুকরের শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। কারণ তা আল্লাহর সাথে কুফরি অথবা কুফরির পর্যায়ভূক্ত। রসূল (স.) যে হাদীসে ‘‘সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ’’ ত্যাগ করতে বলেছেন, তাতে যাদুও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। “আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘তোমরা সাতটি ভয়াবহ গুনাহ থেকে বিরত থাকো। (ক) আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা (খ) যাদু করা, (গ) শরীয়তের বিধিসম্মতভাবে ছাড়া কোন অবৈধ হত্যাকান্ড ঘটানো, (ঘ) ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, (ঙ) সুদ খাওয়া, (চ) যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো এবং (ছ) সরলমতি সতীসাধ্বী মু’মিন মহিলাদের ওপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ। পথভ্রষ্ট বহু মানুষের যাদুর আশ্রয় নিতে দেখা যায়। কারণ তারা একে শুধু একটা হারাম কাজ মনে করে। আসলে যাদুও যে কুফরী তা তারা জানে না। স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো, বেগানা পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে প্রেম-প্রণয় সৃষ্টির কাজে এমন সব মন্ত্র পড়ে যাদু করা হয়, যার বেশির ভাগ শিরক ও কুফরিতে পরিপূর্ণ। কাজেই আল্লাহকে ভয় করা উচিত এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় ক্ষতিকর এমন কাজের ধারে কাছে যাওয়া উচিত নয়। হাদীসে এসেছে: ‘যাদুকরের শাস্তি হত্যা করা’’
পরিশ্রম না করে পরনির্ভরশীল হয়ে জীবন পরিচালনা করা ইসলামসম্মত নয়। বরং তা ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ প্রতিটি মানুষের জন্য তার রিযিকের যথাযথ ব্যবস্থা করে রেখেছেন। মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমে হালাল উপায়ে উপার্জন করে নিজে খাবে এবং পরিবার-পরিজনকে খাওয়াবে। মানুষ স্বীয় কর্মক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উপার্জন না করে বসে বসে খাবে তা ইসলাম সমর্থন করে না। এ জন্যই ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তিকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ কর্মক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি ভিক্ষা করার অর্থ হলো তার মধ্যে অন্তর্নিহিত আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ও উপার্জন-প্রতিভাকে কাজে না লাগানোর ফল। তাই-ই নয় শুধু, সে মনুষ্যত্বের চরম অপমানও করে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘তোমাদের কেউ তার পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে এনে বিক্রি করা, কারো নিকট ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম চাই সে দিক বা না দিক।’’ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, রসূল (স.) বলেছেন : ‘‘লোকদের কাছে ভিক্ষা করলে অবশেষে কিয়ামতের দিন এমনভাবে উপস্থিত হবে যে তখন তার মুখমন্ডলে এক টুকরাও গোশত থাকবে না।’’ সাহল ইবনে হানযালিয়া বলেন, রসূল (স.) বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি ভিক্ষা চায় অথচ তার বেঁচে থাকার সম্বল তার আছে, নিশ্চয় সে অধিক আগুন সংগ্রহ করছে।’’ ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর মতে : ‘‘যার কাছে দুবেলার খাবার আছে, তার জন্য সাওয়াল করা জায়েয নয়।’’
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, ঢাকা শহরে ১৪৯৯৯ জন ভাসমান লোক রয়েছে। এর মধ্যে মহিলার সংখ্যা ১১৭১৭ জন এবং পুরুষের সংখ্যা ৩২৮৩ জন। ভাসমান লোক তারা-যারা খোলা আকাশের নিচে, রাস্তায়, মাজারে, বাস টারমিনালে, রেলওয়ে স্টেশনে, প্যসেঞ্জার সেডে, স্টেডিয়ামের বারান্দায়, সরকারী ও বেসরকারী অফিসে, ফুটপাত ও পার্কে রাত্রীযাপন করে।
রাষ্ট্রীয় আইনে ভিক্ষাবৃত্তিতে কাউকে উৎসাহিত বা নিয়োজিত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের দন্ডবিধির ভাষ্যানুযায়ী: ‘‘যিনি কোনো ব্যক্তিকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করেন বা তৎকর্তৃক ভিক্ষা করান অথবা যিনি কোনো শিশুর হেফাজত, দায়িত্ব বা তত্ত্বাবধানে থাকাকালে উক্ত শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করতে বা তৎকর্তৃক ভিক্ষা করাতে অপসহায়তা বা উৎসাহ দান করেন তিনি তজ্জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বছর পর্যন্ত মেয়াদের সম্রম কারাদ- অথবা অর্থদন্ড কিংবা উভয়বিধ দন্ডে দন্ডনীয় হবেন।’’
মডেলিং একটি পেশা। এটি যদি ইসলাম পরিপন্থী না হয় তাহলে তা জায়েয, অন্যথায় তা হারাম। কেননা বর্তমান মডেলিংয়ের মধ্যে যে সকল বেপর্দা ও অর্ধ-উলঙ্গ এবং বেহায়াপনা চিত্র দেখা যায় কোন ক্রমেই তা ইসলামে সমর্থিত নয়। আর এ উপার্জিত সম্পদও হালাল হতে পারে না। বিজ্ঞাপন সংস্কৃতির সহযোগী অনুষঙ্গ হিসেবে মডেলিং ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। আধুনিক অর্থনীতি বলে বিজ্ঞাপন ব্যতীত কোনো পণ্যের বাজারজাতকরণ সম্ভব নয়। আর বিজ্ঞাপনের সাথে মডেলিংয়ের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তারকা খ্যাতিকে পণ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে পণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং তা চাহিদা সৃষ্টির কৌশল সর্বজনবিদিত। তেমনি পণ্যের বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে অনেক ব্যক্তি প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হতে পারে। মডেলিং একটি স্বতন্ত্র পেশায় পরিণত হয়েছে। পণ্যের বাজার সম্প্রচারিত হচ্ছে সে ক্ষেত্রে মডেলিংয়েরও জনপ্রিয়তা বাড়ছে। প্রায় সারা বিশ্বে মডেলিংয়ের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আমাদের দেশেও সে রকমের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। বিদেশে ৬০% অর্থ বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় হয়। সেখানে মডেলদের পারিশ্রমিক উচ্চমূল্যের। ইসলাম অপ্রয়োজনীয়ভাবে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সমর্থন করে না, কারণ মডেলিংয়ের দ্বারা পণ্যের গুণগতমান বাড়ে না।
বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্যায়-অনাচার ও অবৈধ পন্থায় উপার্জনের ছড়াছড়ি। এর মধ্য থেকে আমাদের সঠিক ও বৈধ পন্থায় উপার্জন করে তা জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সকলেরই মনে রাখা উচিত যে, সৎভাবে যে কোনো কাজই হোক না কেন তা পবিত্র, যতই তা নগণ্য হোক না কেন। হালাল উপার্জন আল্লাহর পছন্দনীয়, বেকার লোককে কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া ঈমানী দায়িত্ব, কাজের বিনিময়ে মজুরি প্রদান ও গ্রহণ সম্পূর্ণ বৈধ। বেতন সম্মানজনক হতে হবে যাতে পরিবারসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ হতে পারে, চাকরির পূর্বেই বেতন মজুরি নির্ধারণ করে নিতে হবে, মালিকের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে কোন চুক্তি ও শর্ত শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ অন্যায়। কাজের সময় ও মেয়াদ নির্ধারিত থাকতে হবে, মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক হবে আত্মীয়তার মত, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা ঈমানদার লোকদের দায়িত্ব। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে বৈষম্যের অবসান, চাকরির শর্ত ও চুক্তি নির্ধারণ হবে উভয়ের সম্মতিতে এবং কেউই চুক্তি লঙ্ঘন করবে না, উত্তম শ্রমিকের পরিচয় হলো, শক্তিশালী ও বিশ্বস্ততা আর উত্তম মালিকের পরিচয় হলো, জালিম হবে না, সৎকর্মপরায়ণ হবে, সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ দিবে না, শ্রমিকের চুক্তি করার ও কথা বলার স্বাধীনতা আছে, ঈমানদারগণ সকল কাজ আল্লাহর বিধান মোতাবেক সম্পন্ন করবে। (সমাপ্ত)

সামাজিক ন্যায়-বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ (স.) এর শিক্ষা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ধ্বংস হচ্ছে জান-মাল ও ফসলাদি। একদিকে অত্যাচারী এভাবে অন্যের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ব-বিবেকও সবকিছু নীরবে সহ্য করছে। নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কেউ কোথাও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আর সে জন্যই সারা বিশ্ব আজ অশান্তির দাবানলে জ্বলছে। অথচ আল্লাহর রাসূল স. বলেন-তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ দেখবে, সে সেটা হাত দিয়ে তা প্রতিহত করবে। এতে যদি সে সক্ষম না হয় তবে সে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ করবে। পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও প্রেম-প্রীতির বেলায় মুসলিম জাতি একটি দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গ যদি আক্রান্ত হয় তবে তার জন্য সমস্ত শরীর জ্বর ও নিদ্রাহীনতায় ব্যথিত হয়ে পড়ে।
রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরামর্শের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনা করা। আল-কুরআনের নির্দেশনা “কোন কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের সাথে পরামর্শ করে নিন “তাদের কাজকর্ম পরামর্শের ভিত্তিতে হয়” কে তিনি পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করতেন। এভাবে পরামর্শের ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজের সিদ্ধান্ত নেয়া তাঁর কর্মের একটি মূলনীতি ছিল। তবে যে সব কাজ ওহী দ্বারা পরিচালিত হত তা তিনি ওহীর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালনা করতেন।
মুসলিম রাষ্ট্রে রাসূলুল্লাহ (স.) এর শাসনাধীনে অমুসলিমরা করলেও তাদের সাথে তিনি কখনো অন্যায় করেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে অমুসলিমরা পূর্ণ অধিকার ভোগ করতো। তিনি নিজে যেমন সাথে ন্যায়বিচার করতেন তেমনি অন্যদেরও তাদের সাথে ন্যায় আচরণের নির্দেশ দিতেন। বিচারের ক্ষেত্রে তিনি তাদের ধর্মীয় মতাদর্শ, ব্যক্তি মর্যাদা বা বংশ মর্যাদা কোনটার দিকে ভ্রƒক্ষেপ করতেন না। যদিও হকের অধিকারী অমুসলিম ব্যক্তিটি মুসলিমদের নির্যাতন করে থাকুক। তিনি আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের দিকে লক্ষ্য রাখতেন, আর যদি বিচার কর তবে তাদের মধ্যে সুবিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন। অমুসলিম বা যাদের সাথে কোন বিষয়ে চুক্তিবন্ধ, তাদের হক আদায়ের ব্যাপারে তিনি তাঁর সাহাবীদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে প্রায় ত্রিশটির বেশি হাদীস পাওয়া যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেন-সাবধান! যে ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির ওপর, জুলুম করবে বা তার হক কম দিবে অথবা তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দিবে কিংবা অন্যায়ভাবে তার সামান্যতম হক নিয়ে নিবে, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বিবাদ করবো। এছাড়া তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোন চুক্তিবদ্ধ হত্যা করবে আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিবেন। মক্কা বিজয়ের পর রাসূল ও তাঁর সাহাবীরা হুনাইনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ছাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাহ তখনো মুশরিক ছিলেন। তিনি ছিলেন মক্কার বড় অস্ত্র ব্যবসায়ী। তাঁর কাছে অনেক অস্ত্র ছিল। যুদ্ধের জন্য রাসূল-এর কিছু ঢালের প্রয়োজন হলো। তিনি ছাফওয়ানকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কাছে কোন অস্ত্র আছে? ছাফওয়ান বললেন, না বরং কর্জ নেব। অতঃপর ছাফওয়ান রাসূলুল্লাহ (স.) কে ৩০-৪০ টি ঢাল ধার দিলেন। রাসূল (স.) যুদ্ধ করলেন। মুশরিকরা পরাজিত হলো।
এরপর ছাফওয়ানের ঢালগুলো একত্রিত করা হলো। এর মধ্যে কয়েকটি ঢাল হারিয়ে গেল রাসূল (স.) তাঁকে বললেন, আমরা তোমার কয়েকটি ঢাল হারিয়ে ফেলেছি। আমরা কি তোমাকে জরিমানা দিবো? তিনি বললেন, না ইয়া রাসূলুল্লাহ। কেননা আজকে আমার অন্তরে এমন জিনিস আছে, যা সেদিন ছিল না। নিজের বিজয় করা এলাকার একজন মুশরিকের কাছ থেকে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জোর করে একটি অস্ত্রও নিলেন না। এমনকি তা থেকে কয়েকটি হারিয়ে গেলে নিজ থেকেই জরিমানা দিতে চাইলেন। অথচ আজকে আমরা দেখতে পাই, ক্ষমতার জোরে মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সবকিছু হারিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছে। আব্দুর রহমান ইবন আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (স.) এর সাথে ১৩০ জন লোক ছিলাম। (সবাই খুব ক্ষুধার্ত ছিল)। রাসূল (স.) বললেন, তোমাদের কারো নিকট কোন খাবার আছে? একজনের কাছে এক ‘ছা’ পরিমাণ খাবার ছিল। সেটা মেশানো হলো।
অতঃপর একজন মুশরিক একদল বকরী হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। রাসূল (স.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটি বিক্রির জন্য নাকি দানের মুশরিক বললম না বরং এটি বিক্রির জন্য। অতঃপর তিনি তার থেকে একটি বকরী ক্রয় করলেন। অতঃপর সেটি প্রস্তুত করা হলো। প্রচন্ড ক্ষুধাসহ ১৩০ জন সাহাবী নিয়ে তিনি একজন মুশরিককে একাকী পেয়েও তার সম্পদ জোর করে কেড়ে নিলেন না। এভাবে ইসলামের বিজয়ের দিনেও তিনি সংখ্যালঘুদের সাথে সামান্যতম অন্যায় আচরণ করেননি। তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে কোন কার্পণ্য ও অন্যায় হস্তক্ষেপ করেননি। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা নিম্নের ঘটনা থেকে জানতে পারি,
জাবির ইবনু ‘আবদিল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, তাঁর পিতা একজন ইহুদীর কাছ থেকে নেয়া ত্রিশ ওয়াসাক খেজুর ঋণ রেখে ইন্তিকাল করেন। ঋণ পরিশোধের দিন আসল। কিন্তু জাবির রা, তখন ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম ছিলেন না। এ জন্য তিনি ইহুদির কাছে সময় চাইলেন। কিন্তু সে সময় দিতে অস্বীকার করলো এবং তাকে নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে চাপ দিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করলেন। তিনি ইহুদীকে অনেক কথা বলে দেয়ার জন্য সুপারিশ করলেন। কিন্তু সে একবারেই অস্বীকার করল এবং বলল : ‘হে আবুল কাসেম’ আমি তাকে সময় দেবো না। রাসূলুল্লাহ (স.) তখন ইহুদীর মদীনায় বসবাসের অবস্থার দিকে তাকালেন না, তিনি মুসলিমদের সাথে ইহুদীদের শক্রতার বিষয়েও নজর দিলেন না। বরং তিনি দেখলেন যে, হক ইহুদীর এবং সেটাকে আদায় করা ওয়াজিব। তিনি ইহুদীর সাথে ন্যায়বিচার করলেন। তাকে তার ঋণ পরিশোধ করে দিলেন। এই সম্মানিত সাহাবীর সাথে রাসূলের (স.) যে ঘনিষ্ঠতা ছিল সে দিকে রাসূলুল্লাহ (স.) ভ্রƒক্ষেপ করলেন না। বরং তিনি শরীয়তের বিধানের দিকে খেয়াল রাখলেন। আল-কুরআনের এই আয়াতের বিধানের দিকে লক্ষ্য রাখলেন, ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো! তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয় স্বজনের বিপক্ষে গেলেও তোমরা আল্লাহর (পক্ষে) সাক্ষী হিসেবে ন্যায়ের উপর অটল থাকবে। (সাক্ষ্য যার বিরুদ্ধে যাবে) সে ধনী হোক কিংবা গরিব হোক আল্লাহ্ই উভয়ের ভাল রক্ষক। অতএব তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, পাচ্ছে (ন্যায় থেকে) বিচ্যুত হও। আর যদি তোমরা (সাক্ষ্য) ঘুরিয়ে দাও কিংবা এড়িয়ে যাও তাহলে  (জেনে রাখবে) তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা অবগত আছেন। এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স.) এর ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত। কিন্তু আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে আমরা ঠিক এর ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। দখলদার বাহিনী একের পর এক দেশ ধ্বংস করছে। তাদের জান-মাল নষ্ট করছে। যমিনে ফিতœা-ফাসাদ সৃষ্টি করছে। কোন ন্যায়-অন্যায় বিচার করছে না। একই দেশের মধ্যে ক্ষমতাশালীরা ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর একই ধরনের অত্যাচার করছে। অন্যায়ভাবে বিরোধীদের সম্পদ দখল করে নিচ্ছে। তাদের জান-মালের ক্ষতি সাধন করছে। সামাজিক ন্যায়বিচার বলতে তেমন কিছু যেন অবশিষ্ট নেই। ক্ষমতা থাকলে সবকিছু করা বৈধ মনে করা।
সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) শরীয়তের বিধান বাস্তবায়নের পাশাপাশি সকলকে পরকালীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেন এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ব্যাপারে সতর্ক করতেন। পরকালীন পুরস্কারের ঘোষণার সাথে সাথে কঠিন আযাবের ভয় দেখাতেন। যাতে মানুষের পরকালের কল্যাণের আশায় দুনিয়ার ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে। যেমন তিনি বলেছেন-তোমরা প্রত্যেক দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।
ইমাম দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে, ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল এবং তার দায়িত্বশীল ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে, স্ত্রী তার স্বামীর সংসারের দায়িত্বশীল এবং তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে, খাদেম তার মনিবের মালের দায়িত্বশীল এবং তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তোমরা প্রত্যেক দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। এছাড়া তিনি আরো বলেন, আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিলে সে যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, সে তার দায়িত্বের খেয়ানতকারী, তাহলে তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিবেন। পরকালীন চেতনা বেশি করে জাগ্রত করতে এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (স.) জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। বিশেষ করে সমাজের দুর্বল শ্রেণির ওপর ক্ষমতাবানদের জুলুমের ব্যাপারে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তাই সেটা গরিবদের ওপর ধনীদের জুলুম হোক, অথবা শাসিতের ওপর শাসকশ্রেণির জুলুম হোক। অত্যাচারিত ব্যক্তি যত বেশি দুর্বল হবে অত্যাচারীর অপরাধ ততই বড় হিসেবে গণ্য হবে।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন-হে আমার বান্দা! আমি জুলুম করাকে নিজের উপর হারাম করেছি এবং এটাকে তোমাদের মধ্যেও হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম করো না। রাসূলুল্লাহ (স.) একবার মু‘আয় (রা.) কে বললেন, তুমি মাজলুমের ফরিয়াদ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা থাকে না। তিনি জুলুমকারীর প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন- নিশ্চয় মহান আল্লাহ তাদের শাস্তি দিবেন যারা দুনিয়ার মানুষদের শাস্তি দিবে। তিনি আরো বলেন-তিন ব্যক্তির দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ন্যায়পরায়ণ নেতা, আর রোযাদার যখন ইফতার করে এবং মাজলুমের দু’আ।
আল্লাহ এটাকে মেঘের উপর উঠিয়ে নেন এবং এর জন্য আসমানের দরজা খুলে দেন। আর প্রভু ঘোষণা করেন, আমার উজ্জতের কসম! আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব, যদিও তা পরে হয়। এর পাশাপাশি তিনি ন্যায়বিচারকের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন-দুনিয়ার সুবিচারকারীরা তাদের সুবিচারের কারণে কিয়ামতের দিন মহান দয়াময়ের ডান পার্শ্বে নূরের মিম্বারে অবস্থান করবে।
উপযুক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স.) এ দাওয়াতী জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল, আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে এমন এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করা, যেখানে প্রত্যেক নিজ নিজ অধিকার ভোগ করবে সাথে সাথে অপরের অধিকার আদায়ে অগ্রগামী হবে। কোন রকম জুলুম-নির্যাতনের আশ্রয় নেবে না। আর এ কাজে তিনি মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তেমনি সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যও সংগ্রাম করেছেন। আর এটা সম্ভব করেছিলেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে।
তিনি শরীয়তের বিধান পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে কোন রকম পক্ষপাতিত্ব করেননি। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, সম্পদের সুষম বণ্টনব্যবস্থা, জীবন সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সকলের স্বাভাবিক স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তিনি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা আনয়ন করেন। সর্বোপরি তিনি সকলকে পরকালীন চেতনায় জাগ্রত করেন। আখিরাতের কঠিন আযাবের ব্যাপারে সতর্ক করেন এবং চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। বিশ্বে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকলকে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (স.) এর শিক্ষা সমাজের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করতে হবে। (সমাপ্ত)

সামাজিক ন্যায়-বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ (স.) এর শিক্ষা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

বর্তমান পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যেককে তার হক বা প্রাপ্য অংশ পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেয়া। এ ক্ষেত্রে ধনী-গরীব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালো আরব-অনারব, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু, দল-মত নির্বিশেষে কেউ কোন রকম অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-নির্যাতনের শিকার হবে না। পৃথিবীতে নবী ও রাসূলগণের প্রধান কাজ ছিল আল্লাহর বিধানের আলোকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক রাসূলুল্লাহ (স.) সামাজিক ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আধুনিক বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (স.) এর সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে লক্ষ্য করতে হবে এবং এর থেকে শিক্ষা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এটি ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ ধারণার সামগ্রীক রূপ। আর ইসলামে এটিকে আরো ব্যাপক পরিসরে ব্যাখ্যা করা হয়। এর মধ্যে তাওহীদ, সৃষ্টিজগৎ এবং মানুষের সার্বিক জীবন সম্পৃক্ত। কারণ ইসলাম একটি অবিভাজ্য পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন। এর প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখা একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্রষ্টা, সৃষ্টিজগৎ, মানুষ, ব্যক্তি, সমষ্টি, রাষ্ট্র-সব কিছুই সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্তর্ভুক্ত। সকলের পারস্পরিক সম্পর্কে যখন ন্যায়বিচারের ঘাটতি হয় তখন সৃষ্টিজগৎ অশান্তি ও নৈরাজ্যে ভরে যায়। পৃথিবীতে সবচেয়ে শান্তিময় সমাজ ছিল নবী-রাসূলগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজ। আর তাঁদের প্রতিষ্ঠিত সমাজের প্রধান ভিত্তিই ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করা। এটা তাদের দায়িত্ব ছিল। আর এ দায়িত্ব নির্ধারণ করেছিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন’। আল্লাহ তা’য়ালা আল-কুরআনের বহু স্থানে নবী ও রাসূলগণকে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের ওপর কিতাব ও মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানবজাতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করে। আমি লোহাও নাযিল করেছি, যার মধ্যে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের অনেক কল্যাণ আছে, এ জন্য যে, আল্লাহ জানতে চান, কে না দেখেও তাকে ও তাঁর রাসূলদের সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী। ‘সামাজিক ন্যয়বিচার’ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সৎকাজ ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও অবাধ্যতা নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে সুপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। এছাড়া যারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না তাদেরকে আল-কুরআন কাফির যালিম ও ফাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করছে। তাদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্য করছে। সহজে তা মেনে না নিলে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি কখনো কখনো অন্যায়ভাবে তাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। মিথ্যা অজুহাতে গোটা দেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মুসলিমদের ও মুসলিম দেশগুলোর অবস্থা আরো ভয়ানক। সারা পৃথিবীতে আজ তারা নানা জুলুম-নির্যাতনের শিকার। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলায় তারা জর্জরিত। ইসলামবিদ্বেষী সম্প্রদায় মুসলিম ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর নানামুখী নির্যাতন চালাচ্ছে। কোথাও তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে, কোথাও আবার পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে। কোথাও আবার প্ররোচনা দিয়ে মুসলিমদের বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত করছে। এর মধ্যে কোন এক দলকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে অন্য দলের ওপর লেলিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য মুসলিম সম্প্রদায়ও এক্ষেত্রে কম দোষী নয়। তারা আজ ইসলামের শিক্ষা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। সঠিক ইসলাম থেকে তারা বিচ্যুত। তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি, হানাহানিতে লিপ্ত।
একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে গিয়ে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা হরা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে বহু জনপদ। বন্দী করা হয়েছে বহু মানুষকে। শুধু বন্দী করেই ক্ষান্ত দেয়া হয়নি। বন্দীদের উপর চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন। গুয়ানতানামো কারাগারের কথা আমরা জানি। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারাগার, যা বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত। এই কারাগারে বন্দীদের বিনাবিচারে আটক রাখা হয় এবং তথ্য আদায়ের লক্ষ্যে ওয়াটার বোর্ডিংসহ বিবিধ আইন বহির্ভূত উপায়ে নির্যাতন চালানো হয়। রাসূলুল্লাহ (স.) এর রিসালাতের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সকল স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে প্রত্যেককে তার পরিপূর্ণ হক দিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা’য়ালা (স.) কে অধিক গুরুত্বসহকারে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সমাজের এই অশান্তিময় অবস্থা রাসূলুল্লাহ (স.) কে সারাক্ষণ কষ্ট দিতো। তিনি সব সময় চিন্তা করতেন কিভাবে সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। এ কারণে আমরা দেখতে পাই নুবুওয়াতের আগেই যুবক মুহাম্মদ (স.) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুবকদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। এর নামকরণের ব্যাপারে বলা হয়েছে-কেননা তাঁরা এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তাঁদের কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তি কোন দুর্বল ব্যক্তির ওপর জুলুম করলে তা প্রতিহত করা হবে এবং কোন স্থানীয় লোক কোন বিদেশী অভ্যাগতের হক ছিনিয়ে নিলে তা ফিরিয়ে দেয় হবে। দাওয়াতী জীবনের প্রথম দিকে একবার রাসূলুল্লাহ (স.) বানূ হাশিম গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি বৈঠক আহ্বান করেন। সেখানে তিনি তাঁর দাওয়াতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে “আমি তোমাদের নিকট এমন দাওয়াত নিয়ে এসেছি, যে দাওয়াত দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে।” অর্থাৎ এর মাধ্যমে দুনিয়ার এমন এক সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে কোন অকল্যাণ ও অশান্তি থাকবে না। আর এ দাওয়াত কবুল করলে আখিরাতেও সফল হওয়া যাবে। এর কিছুদিন পর তিনি কুরাইশ প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা করার সময় বলেন, “আমি যে দাওয়াত পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করো, তাহলে তাতে তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ নিহিত আছে।
এখানে দুনিয়ার কল্যাণ বলতে দুনিয়ার সামগ্রিক কল্যাণকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবন সর্বাঙ্গীন সুন্দর হবে। সমাজব্যবস্থা নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হবে স্থায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। রাসূলুল্লাহর (স.) উদ্দেশ্য ছিল সমাজের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে সেখানে ন্যায়-নীতি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণে কুরাইশদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি আবার আহ্বান করেন এভাবে যে, একটি মাত্র কথা যদি তোমরা আমাদের দাও, তবে তা দ্বারা তোমরা সমগ্র আরব জাতির ওপর আধিপত্য লাভ করবে এবং যত অনারব আছে তারা তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে। মাক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (স.) ও তাঁর সাহাবীরা যখন প্রচন্ড বিবোধিতা ও নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছিলেন, তখন সাহাবীরা একবার রাসূলুল্লাহর (স.) কাছে তাঁদের নির্যাতনের কথা বলে এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দু’আ চাইলেন। তখন তিনি সাহাবীদের সুসংবাদ শুনিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ এ দীনকে একদিন অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন। (ফলে সর্বত্রই নিরাপদ ও শান্তিময় অবস্থা বিরাজ করবে)। এমনকি তখনকার দিনে একজন উষ্ট্রারোহী একাকী সান’আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত নিরাপদে সফর করবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয়ে সে ভীত থাকবে না, এমনকি তার মেসপালের ব্যাপারে নেকড়ে বাঘের আশঙ্কাও তার থাকবে না। কিন্তু তোমরা (ঐ সময়ের অপেক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছো। এখানে রাসূলুল্লাহ স. এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিলেন, যেটা সম্পূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিময়। যেখানে কোন চুরি-ডাকাতি, খুন-রাহাজানি ও লুণ্ঠন থাকবে না। কেউ অন্যের জান-মাল, ইজ্জত, সম্ভ্রম অন্যায়ভাবে স্পর্শ করার সাহস করবে না। বাস্তবিকই রাসূল (স.) এ রকম এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মাক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (স.) যেমন মনে-প্রাণে কামনা করতেন সকল অন্যায়-অবিচারহীন একটি শান্তিময় সমাজ বির্নিমাণের, তেমনি মদীনায় গিয়ে তাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল সমস্ত অন্যায়-অবিচার দূর করে সাম্যের ভিত্তিতে এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃত অর্থেই মদীনায় রাসূল (স.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ তার সমস্ত সামাজিক সম্পর্কসহ এমনভাবে সংশোধিত হয়েছিল, যার ফলে সমাজের সকল স্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। সেখানে কেউ অন্যায়ভাবে অন্যের হক নষ্ট করতো না। প্রত্যেকে নিজ নিজ অধিকার ভোগ করতো। কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হতো না। বিশেষ করে ওহুদ যুদ্ধের পর নাযিলকৃত সূরা আন-নিসা এবং আল-মা’ইদাতে বর্ণিত ইসলামের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধান রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স.) শক্র-মিত্র, সমর্থক বা বিরোধী, মুসলিম বা অমুসলিম সবার সাথে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন। নিজের নিকট আত্মীয় হলেও কোন রকম পক্ষপাতমূলক বিচার করতেন না। একবার মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের জনৈকা মহিলা চুরি করলো। উসামাহ (রা.) তার উপর আল্লাহর বিধান কার্যকর না করার সুপারিশ করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করছো? এরপর তিনি দাঁড়ালেন এবং লোকদের উদ্দেশ্য, “হে মানুষেরা তোমাদের পূর্ববর্তীরা এজন্য ধ্বংস হয়ে গেছে যে, যখন তাদের মধ্যে মর্যাদাশীল কেউ চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করতো শাস্তি প্রয়োগ করতো।
রাসূলুল্লাহ (স.) তার প্রতিষ্ঠিত সমাজে সকলের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। অপরের ধন সম্পদ জবর দখল, আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন করাকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। এটাকে অবৈধ বলে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যে অন্যায়ভাবে অপরের জমির এক বিঘত পরিমাণ অংশও জবর দখল করবে, তার গলায় সপ্ত যমীনের হার ঝুলিয়ে দেয়া হবে। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলমানের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মানের উপর অন্যায় উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ হারাম।
মানুষের ব্যক্তিগত স্বাভাবিক স্বাধীনতা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (স.) মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি খেয়াল রাখতেন। তবে এ স্বাধীনতা অবশ্যই লাগামহীন স্বাধীনতা নয়, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শুধু ভোগ বিলাস ও নিজ স্বার্থ সংরক্ষণে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। বরং এটি একটি সীমারেখা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
সমাজের প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্ব ও দায়িত্ববোধ ছাড়া শুধু ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করা সম্ভব না। এ জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) সবাইকে দায়িত্বশীল হবার তাকীদ দিয়েছেন। তিনি বলেন-তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি সামাজিক জীবনের পারস্পরিক দায়িত্বশীলতার নীতিমালাকে স্পষ্ট করেছেন।
ব্যক্তি ও তার সত্তা, ব্যক্তি ও সমাজ, ব্যক্তি ও পরিবার, এক জাতির সাথে অন্য জাতির প্রত্যেক জাতির ভবিষ্যৎ বংশধর সবার মাঝে তিনি এক মজবুত পাস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের দৃষ্টান্ত রেখেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-তোমরা নিজেদের হাতকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর সমাজে দেখিয়েছেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে সমাজের স্বার্থ ও কল্যাণের জন্য পাহারাদার হতে হবে। স্বাধীনতার অজুহাতে সমাজের কোথাও ক্ষতিকর কোন কিছু করার অধিকার কারো নেই। বরং সকলের দায়িত্ব পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নজর রাখা। এ সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (স.) একটি চমৎকার উপমা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন-আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা যারা মেনে চলে, আর যারা তা অতিক্রম করে তাদের উদাহরণ হলো- যেমন কিছু লোক একটি জাহাজে আরোহণ করলো। তাদের কিছু লোক জাহাজের উপর তলাতে থাকতে এবং কিছু নীচের তলাতে থাকার জন্য স্থান বেছে নিল। যারা নীচের তলায় অবস্থান করছে তাদের পানি পারন করার জন্য উপর তলার লোকদের নিকট যেতে হয়। সুতরাং নিচের তলার লোকেরা বলল-আমরা যদি পানির জন্য নিচে ছিদ্র করে নিতাম এবং উপরের তলার লোকদের কষ্ট না দিতাম তাহলে কতইনা ভালো হত। অতএব, লোকের যদি নিচের তলার লোকদের ইচ্ছা পূরণ করার সুযোগ দেয় তাহলে তারা সকলেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তাদের এ কাজ থেকে বিরত রাখে তাহলে তারা নিজেরা মুক্তি পাবে এবং সাথে সবাই ধ্বংস থেকে মুক্তি পাবে। আলোচ্য হাদীসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনার যে ধ্বংসাত্মক পরিণতি তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বরং এখান থেকে অনুধাবন করা যায়, ব্যক্তি ও সমাজ পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত। এখানে সবাইকে অপরের কল্যাণের বিষয় ভাবতে হবে। আর তা না হলে সমগ্র সমাজ অশান্তি ও বিশঙ্খলার মধ্যে নিপতিত হবে। কিন্তু আজকের বিশ্ব-ব্যবস্থা রাসূলের স. এ শিক্ষা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। নিজের, নিজের পরিবারের, নিজের জাতির বা নিজের দেশের সামান্য স্বার্থের জন্য অন্যের, অন্যের পরিবারের, অন্য জাতির বা অন্য দেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছে। এমনকি বাড়ির পর বাড়ি, শহরের পর শহর দেশের পর দেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। (অসমাপ্ত)

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
জবর দখল করা ইসলামী আইন নিষিদ্ধ। এ নিষিদ্ধ কাজটি সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জোরপূর্বক মানুষের সম্পদ হরণ, জোর পূর্বক অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া, মানুষকে প্রহার করা, গালিগালাজ করা, বিনা উস্কানিতে কারো ওপর আক্রমণ চালানো এবং আর্থিক, দৈহিক ও মর্যাদার ক্ষতিসাধন এবং দুর্বলদের ওপর নৃশংসতা চালানো ইত্যাদিকে জবর দখল বলে। এটি ইসলামে একেবারেই নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘জালিমদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না। আল্লাহ তাদেরকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফোরিত হবে, তারা মাথা নিচু করে দৌঁড়াতে থাকবে, তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে ফিরবে না এবং তাদের হৃদয়সমূহ দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আযাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও। সেদিন জুলুমবাজরা বলবে : হে আমাদের প্রভূ! অল্প কিছুদিন আমাদেরকে সময় দিন তাহলে আমরা আপনার দাওয়াত কবুল করবো এবং রসূলদের অনুসরণ করবো। তোমরা কি ইত:পূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে তোমাদের পতন নেই। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করেছ এবং সেই সব জালেমের সাথে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি।’’ রসূল (স.) বলেন: ‘‘যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণও অন্যের জমি জবর দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার ঘাড়ে সাতটি পৃথিবী চাপিয়ে দেয়া হবে।’’
প্রচলিত আইনে, অন্যায়ভাবে অন্যের ভূমিতে প্রবেশ করা অথবা ভূমির দখলে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করাকে ভূমিতে অনধিকার প্রবেশ বা ভূমি ট্রেসপাস বলে। অন্যের অঙ্গনে যথার্থ কারণ ছাড়া প্রবেশ করলে ট্রেসপাস সংঘটিত হয়। এ উদ্দেশ্যে বিবাদীর সম্পূর্ণ প্রবেশ প্রয়োজন হয় না। প্রধান ফটকে সামান্যতম অঙ্গুলী প্রবেশই যথেষ্ট। এ ছাড়া জানালায় হাত ঢুকানো, দেওয়ালে হেলান দেয়া, অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলক্রমে প্রবেশ করা এ অপকর্মের অন্তর্ভূক্ত।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি বলপূর্বক কারো কাছ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করবে তার শাস্তির মেয়াদ তিন বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। আর এ বলপূর্বক কোন কিছু গ্রহণের মাধ্যমে যদি ভিকটিমের কোন ক্ষতি হয় তাহলে তার শাস্তির মেয়াদ পাঁচ বছরের কম নয়। আর বলপূর্বক বা জোর করে কাউকে মৃত্যুর ভয় দেখালে তার শাস্তি সাত বছরের কম নয়।
ক্ষতিপূরণের মামলায় বলা হয়েছে যে, জমি পুনরুদ্ধারের মামলা ছাড়াও দখলচ্যুত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের দাবি করতে পারে। বেদখল হতে উদ্ভুত যাবতীয় ক্ষতিসহ দখল উদ্ধার বাবদ যাবতীয় খরচ সে দাবি করতে পারে। আবশ্য বিবাদী ভূমির বা গৃহাঙ্গানের উন্নতিকল্পে খরচ করে থাকলে সেগুলোর জন্য সেট অফ (ঝবঃ ড়ভভ) দাবি করতে পারে কি-না সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত সেই। তবে প্রখ্যাত টর্ট আইন বিশারদ স্যামন্ডের মতামত উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন: যেহেতু বেদখলের ফলে উদ্ভুত ক্ষতিপূরণের জন্য দাবীর দাবি, এটা নীতিগতভাবে পরিষ্কার যে, বিবাদী উক্ত অঙ্গনের যে মূল্য বৃদ্ধি করেছে তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিবাদী যদি পুরাতন ঘর ভেঙ্গে নতুন গৃহ নির্মাণ করে থাকে, তবে এটা যথার্থ হবে না যে, বাদী নতুন গৃহের দখল এবং পুরাতন গৃহের মূল্য আদায় করতে পারবে।
স্বাভাবিক যৌনকার্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্যতম। এর সমাধান না হলে মানুষ তার জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অবৈধ পন্থায় যৌনকার্য সম্পাদন করা গর্হিত কাজ। কোনো নারী স্বেচ্ছায় নিজেকে দেহ ব্যবসায় নিয়োজিত করতে পারবে না। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্য কেউ তাকে দিয়ে দেহ ব্যবসায় পরিচালনা করতে চাইলে তাও নিষিদ্ধ। আল-কুরআনে এসেছে, ‘‘তোমরা যুবতীদের দেহ ব্যবসায় লিপ্ত হতে বাধ্য করো না।’’ কুরআনের আরো ঘোষণা, ‘‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। কেননা তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’’
মহানবী (স.) বলেন, ‘‘কোন ব্যক্তি মু’মিন থাকা অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে না।’’ ইসলাম ব্যভিচার ও দেহ ব্যবসায়কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পর্ণোগ্রাফি ছবি তৈরি অশ্লীলতা ও বিকারগ্রস্ত মানসিকতার পরিচায়ক। তরুণ-যুব-শিশু চরিত্র হনন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম যে কোন প্রকার অশ্লীলতার নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছে। আল-কুরআন বলেন, ‘‘তোমরা কোনো ধরণের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হয়ো না।’’ চারিত্রিক ও সামাজিক শৃংখলা বিনষ্টকারী উপকরণের ব্যবসা বা ক্রয়বিক্রয় মাধ্যমে অর্থ আয় করাকেও ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘নিশ্চয় যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা বিস্তার করাকে পছন্দ করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে পীড়াদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ যা জানেন তা তোমরা জান না।’’ অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তোমাদের দাসীরা পবিত্র ও সতী-সাধ্বী থাকতে চাইলে দুনিয়ার স্বার্থ লাভের জন্য তাদেরকে ব্যভিচার করতে বাধ্য করো না।
ইসলাম যেনা-ব্যভিচার সমর্থন করে না। এ সমস্ত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার জন্য আল্লাহ মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর যারা এমন অশ্লীল কাজে লিপ্ত হবে তাদের উভয়ের ব্যাপারে কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ‘‘ব্যভিচারিনী ও ব্যভিচারী যেনা করলে উভয়ের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান প্রয়োগে তোমাদের উভয়ের ব্যাপারে নম্রতা দেখানো যাবে না, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করে থাক। আর মু’মিনদের একটি দল উভয়ের শাস্তি প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করবে। যেনাকারী পুরুষ যেনাকারিনী মহিলা যেনাকারী বা মুশরিক পুরুষ ব্যতীত অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবে না। আর এরা মুমিনদের জন্য হারাম।’’
রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘আমার নিকট থেকে নিয়ে নাও, আল্লাহ্ ঐ সকল মহিলার জন্য পথ বের করে দিবেন। যুবক-যুবতী যেনা করলে তাদের শাস্তি একশত বেত্রাঘাত ও একবছর নির্বাসন। আর বিবাহিত মহিলা ও পুরুষ যেনা করলে তাদের শাস্তি একশত বেত্রাঘাত ও পাথর দ্বারা রজম।’’ এমনিভাবে আরো অনেক হাদীস রসূল স. থেকে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিত যে, এ সকল খারাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা এবং অপরকে বিরত থাকা।
প্রচলিত আইনে পতিতাবৃত্তিকে জঘন্য অপরাধ মনে করা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে: ‘‘যে ব্যক্তি ১৮ বছরের কম বয়স্কা কোন ব্যক্তি যে কোন বয়সে বেশ্যাবৃত্তি বা অন্য কোন লোকের সহিত অবৈধ যৌন সম্পর্ক অথবা কোন বে-আইনি ও অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এই উদ্দেশ্যে কিংবা অনুরূপ ব্যক্তি যে কোন উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এইরূপ সম্ভাবনা জানিয়া তাহাকে বিক্রয় করে, ভাড়া দেয় বা প্রকার ন্তরে হস্তান্তর করে সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে যাহার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে দন্ডিত হইবে তদুপরি অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবে।’’
যে ব্যক্তি ১৮ বছরের কম বয়স্কা কোন ব্যক্তি যে কোন বয়সে বেশ্যাবৃত্তি বা অন্য কোন লোকের সহিত অবৈধ যৌন সম্পর্ক অথবা কানো বে-আইনি ও অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এই উদ্দেশ্যে কিংবা অনুরূপ ব্যক্তি যে কোন উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এইরূপ সম্ভাবনা জানিয়া তাহাকে ক্রয় করে, ভাড়া দেয় বা প্রকারন্তরে হস্তান্তর করে সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে যাহার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হইতে পারে দন্ডিত হইবে তদুপরি অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবে।
‘পাচার’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ঞৎধভভরপশরহম, করফহধঢ়ঢ়রহম, ঝসঁমমষরহম. শব্দটির প্রচলিত অর্থ হচ্ছে, অন্যায় ও অবৈধ উপায়ে কোন জিনিস যথাযথ স্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। অবৈধ উপার্জনের অন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে মানবপাচার। নারী ও শিশু পাচারের মত জঘন্য অপরাধের প্রবণতা আগেও ছিল, “আল-কুরআনের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ইউসুফ আ. কে খ্রিস্টপূর্ব কয়েক বছর পূর্বে একদল ব্যবসায়ী কূপ থেকে তুলে মিসরে পাচার নিয়ে যয় এবং বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ্ বলেন: বর্তমানেও আছে। জাহিলী যুগে আরবেও শিশু পাচারের ঘটনা দেখা যায়। “উদাহরণস্বরূপ যায়িদ ইবনে হারিছার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি পাচার হয়ে দাস জীবন যাপন করেন। পরে রসূলুল্লাহ (স.) ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। অবশ্য শিল্প বিপ্লবের পর এর বিস্তার এত বেশি হয়েছে যে, তা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমান যুগে অর্থ উপার্জনের সহজ মাধ্যম হিসেবে একটি দেশী-বিদেশী দুষ্টচক্র লোক পাচার করার কাজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের শাস্তির বিধান রয়েছে ইসলামে। অপরাধগুলোকে শাস্তির স্তরভেদে তিন ভাগে ভাগ করা হয়: ১. হুদূদ “হুদুদ সংক্রান্ত অপরাধ: হুদুদ সংক্রান্ত অপরাধ বলতে ঐসব অপরাধকে বুঝায় যার জন্য আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন: ব্যভিচার, মদ্যপান, চৌর্যবৃত্তি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ করা, মিথ্যা অপবাদ, ধর্ম ত্যাগ ও বিদ্রোহ/ রাষ্ট্রদ্রোহিতা। সংক্রান্ত অপরাধ ২. কিসাস ও দিয়াত “কিসাস ও দিয়াহ সংক্রান্ত অপরাধ: কিসাস ও দিয়াত সংক্রান্ত অপরাধ বলতে ঐসব অপরাধকে বুঝায় যার জন্য হুবহু অপরাধ প্রতিশোধ গ্রহণ কিংবা নির্ধারিত জরিমানা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। মযলুম ব্যক্তি নিজে কিংবা তার উত্তরাধিগণ তা ক্ষমা করে দেবার অধিকার রাখে। যেমন: ইচ্ছাকৃত হত্যা, প্রায় ইচ্ছাকৃত হত্যা, ভুলে হত্যা, ইচ্ছাকৃত শারীরিকভাবে আহত করা, ভুলে শারীরিক ক্ষতি সাধন করা। তা’যীর “তা’যীর সংক্রান্ত অপরাধ হচ্ছে ঐসব অপরাধ যার ব্যাপারে শরী’আতে সুনির্দিষ্টভাবে কোন শাস্তির উল্লেখ করে নি, যা নির্ধাণ করার ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করা হয়েছে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে সরকার জনসাধারণকে সতর্ককরণ করা থেকে শুরু করে শাস্তির ভয়াবহতা অনুযায়ী সবশেষে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত যে কোন শাস্তি প্রদান করতে পারে। এ ধরণের অপরাধের সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। যেমন- সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, গালমন্দ করা ইত্যাদি। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে অপরাধ যাই হোক না কেন তা উল্লেখ তিন প্রকারের শাস্তি পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। পাচার কিসাস এর শাস্তি আরোপ করার মত অপরাধ নয়, আবার হুদূদ সংক্রান্ত যতটি অপরাধের উল্লেখ করা হয়েছে তারও আওতাভূক্ত নয়। এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি প্রতারণামূলক কাজ। প্রতারণার মাধ্যমে পাচারকারীরা মানুষকে ক্ষতিকর ও সমাজবিরোধী কাজের সাথে সম্পৃক্ত করছে। তাই এটি তা’যীর সংক্রান্ত অপরাধসমূহের একটি অপরাধ। (অসমাপ্ত)

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাষ্ট্রীয় আইনে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ এ প্রসঙ্গে প্রকাশ্য জুয়া আইন ১৯৬৭ ধারায় বলা হয়েছে- এ আইন প্রকাশ্য জুয়া আইন-১৮৬৭ নামে অভিহিত হইবে এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে ইহা প্রযোজ্য হইবে। জুয়া খেলা শব্দ দ্বারা জুয়া বা বাজী ধরা বুঝাইবে (কেবল ঘোড়া দৌড়ের উপর বাজী ধরা ছাড়া) যখন উক্ত জুয়া বাজী অনুষ্ঠিত হয়-
ক. অনুরূপ ঘোড়া দৌঁড়ের দিনে, খ. এমন স্থানে যা সরকারি অনুমোদন লইয়া স্টুয়ার্ডরা ঘোড়া দৌড়েঁর জন্য পৃথক করিয়া রাখিয়াছে এবং গ. কটি লাইসেন্স যুক্ত বুক মেকারসহ; অথবা  ১৯২২ সালের বঙ্গীয় প্রমোদ কর আইনের ১৪ ধারার সংজ্ঞানুসারে টোটোলাইজেটরের দ্বারা কিন্তু লটারী উহার অন্তর্ভূক্ত নহে; খেলার কাজে ব্যবহৃত যে কোন হাতিয়ার বা সামগ্রী ‘‘ক্রীড়া সামগ্রী’’ শব্দের অন্তর্গত, এবং ‘‘সাধারণ ক্রীড়া ভবন’’ অর্থ যে কোন ঘর, কক্ষ, তাঁবু বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থান বা প্রাঙ্গণ বা গাড়ি অথবা যে কোন স্থানে যেখানে মালিকের রক্ষকের বা ব্যবহারকারীর মুনাফা বা উপার্জনের জন্য যে কোন ক্রীড়াসামগ্রী বা অন্য কিছু ভাড়া বা অর্থের বিনিময়ে রাখা বা ব্যবহৃত হয়।
এই আইনের এখতিয়ারভুক্তি এলাকায় যে কোন ব্যক্তি যে কোন ঘর, তাঁবু, কক্ষ, প্রাঙ্গণ বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানের মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী ব্যবহারকারী হিসেবে অনুরূপ স্থানকে সাধারণ জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত করিতে দিলে; এবং উপরোক্ত ঘর, তাঁবু, কক্ষ, প্রাঙ্গণ, বা প্রাচীর বেষ্টিত স্থানের মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী বা ব্যবহারকারী হিসেবে যে কোন ব্যক্তির জ্ঞাতসারে বা স্বেচ্ছায় অন্য লোককে, উক্ত স্থানকে সাধারণ জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত করিতে দিলে; এবং যে কেহ উপরে বর্ণিত স্থানকে উক্ত উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কাজে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করিলে অথবা যে কোন ভাবে সাহায্য-সহায়তা করিলে; এবং অনুরূপ গৃহের, তাঁবুতে, কক্ষে, প্রাঙ্গণে বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে যে কেহ জুয়া খেলার উদ্দেশ্যে অর্থ প্রদান বা নিয়োজিত করিলে অভিযুক্ত হইয়া যে কোন ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট বিচারে সোপর্দ হইবে এবং অনূর্ধ্ব দুইশত টাকা পর্যন্ত জরিমানায় এবং পেনাল কোডের সংজ্ঞানুসারে অনূর্ধ্ব তিন মাস পর্যন্ত কারাদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবে।
চাদাবাঁজি করে সম্পদ উপার্জন করা ও এক ধরণের জুলুম এবং ইসলামী শরীয়তে এ জাতীয় উপার্জনকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বলা হয়েছে: “কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়কআযাব রয়েছে।” যারা জোর করে চাঁদা আদায় করে তারা নিজেরাও জুলুমবাজ এবং তারা জুলুমবাদের  সবচেয়ে বড় সাহায্যকারীও। চাঁদাবাজরা যে চাঁদা আদায় করে, তা যেমন তাদের প্রাপ্য নয়, তেমনি যে পথে তা ব্যয় করে তাও বৈধ নয়। জোরপূর্বক চাঁদা আদায়কারী আল্লাহর বান্দাদের ওপর জুলুম ও শোষণ চালায়। তাদের কষ্টার্জিত অর্থ কেড়ে নেয়। এ ধরনের লোকেরা কিয়ামতের দিন মজলুমদের প্রাপ্য দিতে পারবে না। যদি তাদের কবুলকৃত কোন সৎকর্ম থাকে, তবে তাই দিতে হবে। অন্যথায় মজলুমদের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। রসূল (স.) বলেছেন, ‘‘আমার উম্মাতের মধ্যে প্রকৃত দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন প্রচুর নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে আসবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়ে আসবে, প্রহার করে আসবে অথবা কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে আসবে। এরপর এই সকল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একে একে তার পুণ্যকর্ম দিয়ে দেয়া হবে। যখন পুণ্যকর্ম ফুরিয়ে যাবে, তখন মজলুমদের পাপ কাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এ জন্য রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘অবৈধ চাঁদা আদায়কারী জান্নাতে যাবে না।’’
এ থেকে বুঝা যায়, এটি কত বড় গুনাহের কাজ। জোরপূর্বক অর্থ আদায় করার কাজটি ডাকাতি ও রাহাজানির নামান্তর। জোরপূর্বক চাঁদা যে আদায় করে, সে তার সহযোগিতা করে, যে লেখে, যে সাক্ষী থাকে, তারা সবাই এ পাপের সমান অংশীদার। তারা সবাই আত্মসাৎকারী ও হারামখোর। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, জাবির (রা.) রসূল (স.) কে বললেন: ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আমার মাদক ব্যবসায় ছিল। সেই ব্যবসায় থেকে আমার বেশ কিছু সঞ্চিত নগদ অর্থ আছে। আমি যদি তা দিয়ে আল্লাহর কোন ইবাদত বা সাওয়াবের কাজ করি, তবে তাতে কি আমার উপকার হবে? রসূল (স.) বললেন: তুমি যদি সেই অর্থ হজ্জ্ব, জিহাদ, অথবা সাদকায় ব্যবহার করো, তবে তা আল্লাহর কাছে একটা মাছির ডানার সমানও মূল্য পাবে না। আল্লাহ পাক পবিত্র সম্পদ ছাড়া কোন কিছু গ্রহণ করেন না।’’
প্রচলিত ও ইসলামী আইনে চুরি একটি জঘণ্য অপরাধ। যার শাস্তিও ভয়াবহ। চুরির মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ ভোগ করা হারাম ও দন্ডনীয় অপরাধ। চুরি শব্দের অর্থ-অপহরণ, চৌর্য, পরের দ্রব্য না বলে গ্রহণ, গোপনে আত্মসাৎকরণ ও অন্যের অলক্ষ্যে চুরি করা, সম্পদ কুক্ষিগত করা ইত্যাদি। চুরির আরবী প্রতিশব্দ হলো আস-সারাকাহ। এর আভিধানিক অর্থ-অপরের সম্পদ গোপনে হস্তগত করা। গোপনীয়ভাবে অন্যের নিকট হতে সম্পদ বা অন্য কিছু নিয়ে নেয়া। কোন বালেগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি কর্তৃক অপরের দখলভূক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ সংরক্ষিত স্থান হতে গোপনে হস্তগত করাকে চুরি বলে। আব্দুল কাদির আওদা বলেন: ‘‘চুরি হচ্ছে গোপনে অন্যের সম্পদ নেয়া অর্থাৎ গোপন পন্থায় অথবা প্রাধান্য বিস্তার করে অন্যের সম্পদ হস্তগত করা।’’
লিসানুল আরব গ্রন্থে বলা হয়েছে- গোপনভাবে অপরের সম্পদ হরণ করাকে চুরি বলে। মোট কথা, কোন জ্ঞানবান বালেগ ব্যক্তি কর্তৃক অপরের মালিকানাধীন সংরক্ষিত নিসাব (এক দিনার বা দশ দিরহাম) পরিমাণ সম্পদের মূল্য, যার মাঝে চোরের কোন অধিকার কিংবা অধিকারের কোন অবকাশ নেই। গোপনে ও ধরা পড়ার ভয়ে সবার অলক্ষ্যে স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে হস্তগত করাকে চুরি বলে। সে ব্যক্তি মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক অথবা মুরতাদ হোক অথবা পুরুষ হোক কিংবা মহিলা হোক, স্বাধীন হোক কিংবা দাস হোক এতে কোন পার্থক্য হবে না। সবার বেলায় একই বিধান প্রযোজ্য।
জাস্টিনিয়ানের বিধিবদ্ধ আইন এ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী কাউকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি ব্যবহার বা দখল করা অথবা অন্যের সম্পত্তি অবৈধভাবে আত্মসাৎ করার নাম চুরি। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, অপহরণ করার উদ্দেশ্যে অন্যের অস্থাবর সম্পত্তি আত্মসাৎ বা ব্যবহার করলে তা চুরি বলে বিবেচিত হয়। আর চুরির দায়ে শুধু চোর নয়, চোরের সহায়তাকারী এবং পরামর্শদানকারীও অভিযুক্ত হতো। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এ মর্মে যে, তাারা আল্লাহর সহিত কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না তখন তাদের বায়আত গ্রহণ করিও।’’
আল-কুরআনের চুরির শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও এতো তাদের কৃতকর্মের ফল এবং প্রদত্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ প্রকাশ থাকে যে, প্রথমবার চুরির দায়ে ডান হাত, দ্বিতীয়বার চুরির দায়ে বাম পা কেটে দিতে হবে। এ ব্যাপারে সকল ইমাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তৃতীয়বার চুরি করলে তার শাস্তি কী হবে এ বিষয়ে অনেক মতভেদ পরিলক্ষিত হয় যা এ স্বল্প পরিসরে আলোচনার সুযোগ নেই। তাই উক্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য উল্লেখিত গ্রন্থগুলো দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৯ নং ধারা অনুযায়ী সাধারণ চুরির শাস্তি হলো তিন বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। “গাজী শামছুর, রহমান, দন্ডবিধির ভাষ্য, ধারা-৩৭৯।” আর বাসাবাড়ি থেকে চুরি করলে শাস্তি হলো সাত বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
রোমান আইনে আগে চুরিকে একটি দেওয়ানী ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটিকে ফৌজদারি ও দন্ডণীয় অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। কাজেই চুরির বিরুদ্ধে দ্বিবিধ প্রতিকার ছিল নিম্নরূপ: ১. চুরির ধরণ যাই হোক চোরাই মাল ফেরৎ দেয়া হচ্ছে চুরির প্রতিকারে প্রাথমিক ব্যবস্থা। ২. চুরির ক্ষেত্রে শান্তি জরিমানা। ক. হাতে নাতে ধরা পড়া চুরির ক্ষেত্রে চোরাই মালের মূল্যের চারগুণ এবং পরে ধরা পড়া চুরির ক্ষতিপূরণ চোরাই মালের মূল্যের দ্বিগুণ।
ডাকাতি বড় ধরণের অপরাধ। ডাকাতি চুরির চেয়ে অধিকতর ভয়াবহ। পরকালীন শাস্তি ছাড়াও এ অপরাধের জন্য ইসলাম পার্থিব দন্ডবিধি দিয়েছে। মানব জীবনে অর্থ-সম্পদ থাকা অপরিহার্য। ইসলাম এ ধন-সম্পদ অর্জন ও ব্যয় ভোগের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিধান পেশ করেছে। হলাল পথে উপার্জিত ধন-সম্পদকে হালাল ঘোষণা করেছে আর হারাম পথে অন্যায় ও জুলুমের মাধ্যমে আহরিত ধন-সম্পদকে হারাম করে দিয়েছে এবং পরকালে কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তিকে নিপতিত হওয়ার ভয় দেখিয়েছে। ডাকাত শব্দের অর্থ দস্যু, লুণ্ঠনকারী, বলপূর্বক অপহরণকারী, অসম সাহসী ও নির্ভীক এবং ডাকাতি শব্দের অর্থ হল: দস্যুবৃত্তি, দস্যু দ্বারা লুণ্ঠন, অসম সাহসিক ও বিস্ময়কর দুষ্কর্ম ইত্যাদি।
যে সব লোক সশস্ত্র হয়ে পথে-ঘাটে, ঘরে-বাড়িতে, নদীতে-মরুভূমিতে নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা চালায় এবং প্রকাশ্যভাবে জনগণের সম্মুখে জনগণের ধন-মাল হরণ করে নিয়ে যায়, তাদেরকেই বলা হয়েছে ডাকাত, লুণ্ঠনকারী বা মুহারিবুন। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে, ‘‘যদি চুরি করিবার উদ্দেশ্যে বা চুরি করিতে কিংবা চুরিতে লব্ধ সম্পত্তি বহন বা বহনের উদ্যোগকালে অপরাধকারী তদুদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায় বা আঘাত করে কিংবা আটক করে ভীতি প্রদর্শন করে তাহলে উক্ত চুরিকে দস্যুতা বলে।’’ আর সেই ক্ষেত্রে ৫ বা ততোধিক ব্যক্তি মিলিত হইয়া কোন দস্যুতা অনুষ্ঠান করে বা করিবার উদ্যোগ করে তাহা হইলে তাকে ডাকাতি বলে।
যারা ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ ছিনিয়ে নেয় এবং ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষের জীবন ও সম্ভ্রমহানী ঘটায় তাদের ক্ষেত্রে আল-কুরআনের সরাসরি শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আযাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহাশাস্তি।’’
ডাকাতি প্রতিরোধে মুমিনদের এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও ডাকাতির ঘটনা ঘটলে মুমিন নির্বিচার থাকতে পারে না। কেননা এটা ঈমানের পরিপন্থী আচরণ। এ প্রসঙ্গে নবী স. বলেছেন: ‘‘যখন কোনো লোক কোন মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয় আর লোকেরা তা চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে তখন সে আর মুমিন থাকে না।’’ অতএব ডাকাতি সুস্থ সমাজব্যবস্থার পক্ষে খবুই ক্ষতিকর ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। এ কারণে ইসলামী আইনে ডাকাতি জঘন্য অপরাধ। ইসলামী সমাজে ডাকাতির কোন সুযোগ থাকতে পারে না। ডাকাতির পথও কারণ সর্বতোভাবে বন্ধ করা একান্তই আবশ্যক।
ইসলাম বিধান মতে ডাকাতির শাস্তি অপরাধভেদে কমবেশী হতে পারে। শাস্তির বিধান প্রয়োগ করার ব্যাপারে ইসলামী সরকারের স্বাধীনতা রয়েছে। অর্থাৎ বিচারক ইচ্ছা করলে তাকে হত্যা করতে পারবে, শূলে চড়াতে পারবে এবং বহিষ্কার করতে পারবে। এই মতটি ইবনে আব্বাস, হাসান, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব ও মুজাহিদের। যে ডাকাত হত্যা ও সম্পদ হরণ এই দুই অপরাধই করে তাকে হত্যা করা হবে অতঃপর শূলে চড়ানো হবে। যে ডাকাত সম্পদ কেড়ে নেবে কিন্তু কাউকে হত্যা করবে না, তাকে শুধু হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে। যে ডাকাত শুধু রক্তপাত করবে এবং সম্পদ হরণ করবে না তাকে হত্যা করা হবে। আর যে ব্যক্তি হত্যাও করবে না, সম্পদও হরণ করবে না, কিন্তু অস্ত্র নিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করবে, তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটি শাফেঈ মাযহাবের মত। ইমাম শাফেঈ আরো বলেন, প্রত্যেককে তার অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তি দেয়া হবে। হত্যা ও শূল দুটোই যার প্রাপ্য, তাকে প্রথমে হত্যা করা হবে অথবা ৩ বার শুলে চড়িয়ে নামিয়ে রাখা হবে যাতে তার শাস্তি কে খুবই ঘৃণ্য ভাবে প্রকাশ করা যায়। আর যার কেবল হত্যার শাস্তি প্রাপ্য তাকে হত্যা করে লাশ আপনজনদের হাতে অর্পণ করতে হবে। আল-কুরআন এর ঘোষণা ‘‘অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে’’-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: যাকে ধরা সম্ভব হবে না তার সম্পর্কে সরকার ঘোষণা দিয়ে দেবেন যে, যে ব্যক্তি তাকে ধরতে পারবে, সে যেন তাকে হত্যা করে। আর যে ধরা পড়বে, তাকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দি করতে হবে। কেননা এতে করে অপরাধ বন্ধ হবে এবং এটাই তার বহিষ্কার। শুধু হত্যার ভয় দেখানো এবং সন্ত্রাস ছড়ানোই কবীরা গুনাহ। এর ওপর কেউ যদি জিনিসপত্র ছিনতাইও করে এবং খুন-জখমও করে, তবে সে তো এক সাথে অনেকগুলো কবীরা গুনাহ সংঘটিত করে। এছাড়া এ ধরণের অপরাধিরা সাধারণত মদখোরী, ব্যভিচার, সমকাম, নামায তরক ইত্যাদি কবীরা গুনাহেও লিপ্ত থাকে।
বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে, যদি কোন লোক উপরে বর্ণিত ডাকাতির সংজ্ঞায় বর্ণিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকে তাহলে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৯২ ধারা মোতাবেক ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ডে অথবা অর্থদন্ডে অথবা উভয় দেন্ড দন্ডিত হইতে পারে। আর এ ডাকাতি যদি প্রকাশ্য রাজপথে সংঘটিত হয়ে থাকে তাহলে তার শাস্তির মেয়াদ ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ডে অথবা অর্থদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে।
মানব পাচার ও অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা ইসলাম ও প্রচলিত আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অপহরণ একটি জঘন্য অপরাধ। রসূল (স.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘‘তোমাদের এ শহরে আজকের দিন ও এ মাসের মতই তোমাদের পরস্পরের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সম্মানীয়। প্রত্যেক মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে চলতে দিতে হবে। এটা তার অধিকার। অপহরণের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চলার অধিকারকে হরণ করা হয়। তাছাড়া অপহরণকারী অপহৃত ব্যক্তিকে সাধারণত যেসব কাজে নিয়োজিত করে তাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনৈতিক ও অমানবিক। তাই এ অপরাধের সাথে জড়িত প্রায় সব দিক অবৈধ। আর অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা একটি প্রতারণা। ইসলামী আইনে সকল প্রকার প্রতারণা হারাম। প্রতারণা ও ধোঁকাবাজীকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে আল্লাহ্ বলেন: আর এভাবেই আমি প্রত্যেক জনপদে এর শীর্ষস্থানীয় অপরাধী লোকদেরকে এমনই করেছি যেন তারা নিজেদের ধোঁকা, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে।
অপহরণ শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি জঘন্য অপরাধ। তাই ইসলামে অপহরণের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। আর অপহরণের ক্ষেত্রে সাধারণত চুরি ও প্রতারণাই প্রধান কৌশল হিসেবে অনুসৃত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে কৌশলই অবলম্বন করা হোক না কেন, সার্বিকভাবে ইসলাম তা অবৈধ বলে সাব্যস্ত করেছে। কোন মানুষকে বিক্রি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এমন কি নিজের সন্তানকেও বিক্রি করার কারো অধিকার নেই। কেননা, মানুষ অতীব সম্মানীয়। আল্লাহ বলেন, ‘‘আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।
প্রচলিত আইনের দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে কোন স্থান হতে গমন করিবার জন্য জোরপূর্বলক বাধ্য করে বা কোন প্রতারণামূলক উপায়ে প্রলুব্ধ করে সেই ব্যক্তি উক্ত ব্যক্তিকে অপহরণ করেছে বলিয়া গণ্য হইবে। যদি কোন লোক উক্ত অপরাধে অপরাধী হয় তাহলে তার শাস্তির মেয়াদ সাত বছর কারাদন্ড এবং তদুপরি অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে। যে ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে দাস আমদানি, রপ্তানি, অপহরণ, ক্রয়-বিক্রয় করে বা দাসের কারবার করে সে ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা যে কোন বর্ণনার অনুর্ধ দশ বছর মেয়াদী কারাদন্ডে তদুপরি অর্থে দন্ডিত হবে।
এ সম্পর্কে ২০০০ সালে জাতীয় গেজেটের ৮ নং আইনের ৭ ধারায় নারী ও শিশু অপহরণের শাস্তি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি ধারা-৫ এ উল্লিখিত কোন অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে কোন নারী বা শিশুকে অপহরণ করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অন্যূন চৌদ্দ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবে এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবে। যদি কোন ব্যক্তি মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে কোন নারী বা শিশুকে আটক করেন, তা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।
ওজনে কম দিয়ে সম্পদ উপার্জন করা ইসলামে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং যারা এমন জঘন্যতম কাজে লিপ্ত থাকবে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ আল-কুরআনে ঘোষণা করেন: ‘‘যারা ওজনে ও মাপে কম দেয়, তাদের জন্য সর্বনাশ। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে আনার সময় ঠিকমত আনে, আর মেপে দেয়ার সময় কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে? যে দিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগৎ সমূহের প্রতিপালকের সম্মুখে। কখনও না, পাপাচারীদের আমলনামা তো সিজ্জীনে আছে। সিজ্জীন সম্পর্কে তুমি কী জান? তা চিহ্নিত আমলনামা। সেই দিন দুর্ভোগ হবে অস্বীকারকারীদের, যারা কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে, কেবল প্রত্যেক পাপিষ্ঠ সীমালংঘনকারী এটি অস্বীকার করে।’’
ইমাম সুদ্দী বলেন: রসূল (স.) যখন হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন তখন সেখানে অনেক লোক দেখতে পেলেন যারা নিজের জিনিস মেপে নেয়ার সময় বেশি নিত এবং অপরকে দেয়ার সময় ওজনে কম দিত; তখন আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করেন। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘পাঁচটি জিনিসের ফলে পাঁচটি জিনিস অনিবার্য। যে পাঁচটি বিষয় হলো: কোন জাতি প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তার ওপর তার শত্র“কে চাপিয়ে দেবেন। কোন জাতি আল্লাহর বিধান ছাড়া মনগড়া বিধান দ্বারা দেশ শাসন করলে তাদের মধ্যে দারিদ্র্য ছড়িয়ে পড়বে, কোন জাতিকে অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে তাদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, মাপে ও ওজনে কম দিলে ফসল কম হবে ও দুর্ভিক্ষ হবে, আর যাকাত দেয়া বন্ধ করলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে।’’ এখানে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় যে, মাপে কম দেয়া ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে তিল তিল করে অলক্ষ্যে চুরি করে এবং হারাম উপার্জন করে। (অসমাপ্ত)

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
মদ এবং যে সকল নেশা জাতীয় দ্রব্য যা পান বা সেবন করা হারাম তার উৎপাদন ও ব্যবসা ইসলাম সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছে। এ জাতীয় দ্রব্য উৎপাদন ও তার ব্যবসালব্ধ আয় অবৈধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা বলেন: হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-দেবী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো অপবিত্র শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্র“তা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি বিরত হবে না?’’ মদ এবং নেশা জাতীয় দ্রব্য ছাড়াও এ আয়াতে আরো যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাহলো: মূর্তি তৈরি, মূর্তি বিক্রয় ও মূর্তি উপাসনালয়ের সেবালব্ধ আয়, ভাগ্য গণনা ও জোতিষির ব্যবসা। এ সম্পর্কে আলোচ্য নিবন্ধের যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হবে।
পৃথিবীতে দু’ধরনের উপার্জন পরিলক্ষিত হয়। একটি হলো বৈধ পন্থায় উপার্জন। আর অপরটি হলো অবৈধ পন্থায় উপার্জন। মানবজীবনে এ অবৈধ পন্থায় উপার্জনকে কুরআন ও হাদীসে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।’’ রসূল স. বলেছেন ‘‘এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধুসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘‘হে প্রভু! বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। সাদ রা, বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন আমার দুআ কবুল হয়। রসূল (স.) বললেন: হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দুআ কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের একগ্রাসও মুখে নেয়, তাহলে চল্লিশ দিন যাবৎ তার দুআ কবুল হবে না।’’
অপর এক হাদীসে উল্লেখ আছে : ‘‘যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোন কাপড় কিনলো এবং তার মধ্যে এক দিরহাম অসৎ উপায়ে অর্জিত, সে যতদিন ঐ কাপড় পরিহিত থাকবে ততদিন তার নামায কবুল হবে না।’’ ইমাম ইবনুল ওয়ারদ বলেন, তুমি যদি জিহাদের ময়দানে যোদ্ধা অথবা প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত থাক, তাতেও কোন লাভ হবে না, যতক্ষণ তুমি যা খাচ্ছ তা হালাল না হারাম, তা বিবেচনায় না রাখ।’’
এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আবু বকর (রা.) এর একজন গোলাম ছিল। সে আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসাবে কিছু অর্থ নেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন। অতপর সে প্রতিদিন তার মুক্তিপণের কিছু অংশ নিয়ে আসতো। আবু বকর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিত তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন, নচেৎ করতেন না। একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলো। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে ঐ খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ খাবার তুমি কীভাবে সংগ্রহ করেছো? সে বললো, আমি জাহেলিয়াত যুগে লোকের ভাগ্য গণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না। কেবল ধোঁকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্য গণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত। আবু বকর (রা.) বললেন ঃ কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছো। তারপর গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বমিতে খাদ্য বের হবে না। উপস্থিত লোকেরা তাকে বললো, পানি না খেলে খাওয়া জিনিস বের হবে না। তখন তিনি পানি চাইলেন। পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভুক্ত দ্রব্য পেট এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? আবু বকর (রা.) বললেন: খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যুবরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম। কেননা আমি রসূলুল্লাহ (স.) কে শুনেছি: ‘‘যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উত্তম।’’ এখন মানবজীবনে সম্পদ উপার্জনের কতিপয় অবৈধ পন্থা সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
অবৈধ পন্থায় অর্থোপার্জনের বহুল প্রচলিত একটি প্রধান মাধ্যম হলো সুদের আদান প্রদান, যা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতির শিরা উপশিরায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সুদ অর্থনীতির সবচেয়ে পুরাতন ও জটিল একটি বিষয়। মিসর, রোম, গ্রীস ও ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশে প্রাচীনকালে সুদ সম্পর্কে আইন রচনার প্রয়োজন হয়। বেদ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে সুদকে একটি সমস্যা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টেটলের মতো প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং হিন্দু ও ইয়াহুদী সংস্কারকগণ সুদী কারবারের নিন্দা করেছেন। আর এটি ইসলামের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। সুদ অর্থনৈতিক শোষণ ও জুলুমের অন্যতম হাতিয়ার। এটি মানুষের মানসিকতাকে সংকীর্ণ করে দেয়, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক গতিকে শ্লথ করে দেয়, অর্থবণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি করে। যদিও বিভিন্ন প্রাচ্যবিদ বিভিন্ন ধরণের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষিত সুদকে বৈধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুদের আরবী প্রতিশব্দ হলো ‘রিবা’। যার আভিধানিক অর্থ কয়েকটি হতে পারে। যেমন: বৃদ্ধি “আয-যামাখশারী, আসাসুল বালাগাত, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন : যে সুদ তোমরা দিয়েছ এই উদ্দেশ্যে যে, মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন : “আর আমি মারইয়াম তনয় ও তাঁর মাকে এক নিদর্শন বানিয়েছিলাম এবং তাদেরকে এক অবস্থানযোগ্য স্বচ্ছ পানি বিশিষ্ট টিলায় আশ্রয় দিয়েছিলাম।” শিশুর বেড়ে ওঠা সুদের পরিভাষিক অর্থে- ঋণ গ্রহণ বাবদ ঋণের পরিমাণের হিসাবে যে অতিরিক্ত হিসাব নির্ণয় করা হয় তাকে সুদ বলে। আর এ অতিরিক্ত অর্থ ভোগকারীকে সুদখোর বলে। ‘‘সুদ বা রিবা হচ্ছে সেই বাড়তি অর্থ যার বিনিময়ে ঋণদাতা ঋণ পরিশোধের সময়টা আরো কিছু দিনের জন্য বাড়িয়ে দেয়।’’ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র.) বলেন: ‘‘পারস্পরিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালের প্রবৃদ্ধিই সুদ বা রিবা।’’ আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালীন (র.) বলেন: ‘‘পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পণ্য বা অর্থই রিবা বা সুদ।’’
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিও আল্লাহ্ একই বিধান দিয়েছিলেন যেমনটি দিয়েছিলেন ইয়াহুদীদের প্রতি। এ প্রসঙ্গে ইঞ্জিল শরীফে বলা হয়েছে: ‘‘যাহারা তোমাদের মঙ্গল করে, তোমরা যদি তাহাদেরই মঙ্গল করিতে থাক, তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? খারাপ লোকেরাও তো তাহা করিয়া থাকে। যাহাদের নিকট হইতে তোমরা ফিরিয়া পাইবার আশা কর, যদি তাহাদেরই টাকা ধার দাও তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? ফিরিয়া পাইবে বলিয়াই তো খারাপ লোকেরা খারাপ লোকদের ধার দিয়া থাকে। কিন্তু তোমরা তোমাদের শত্র“দের মহব্বত করিও এবং তাহাদের মঙ্গল করিও। কিছুই ফিরিয়া পাইবার আশা না রাখিয়া ধার দিও। তাহা হইলে তোমাদের জন্য মহাপুরস্কার আছে।’’
গ্রিক সভ্যতার মত রোমান সভ্যতায়ও সুদকে প্রকৃতি বিরোধী উপার্জন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। জাহেলী যুগে ও আরব কুরাইশরা সুদকে সম্পদ অর্জনের অনিষ্টকর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করতো। দেখা যায় রসূল (স.) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে যখন কাবা সংস্কার করা হচ্ছিল তখন আবূ ওয়াহাব সকলকে এ কাজে সুদের অর্থ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিল। জাহিলী যুগে কাফির, ইয়াহুদী এবং মুশরিকরা সুদকে ব্যবসা মনে করতো, অথচ ব্যবসা ও সুদ এক জিনিস নয়, যা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ৭টি আয়াতের মাধ্যমে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের মন্দ পরিণতি, হাশরের ময়দানে তাদের লাঞ্জনা, ভ্রষ্টতা ও কঠোর শাস্তির বাণী শুনিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যারা সুদ খায়, তারা সে ব্যক্তির ন্যায় দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলে, নিশ্চয় ব্যবসা তো সুদেরই অনুরূপ, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, আর সুদকে করেছেন হারাম। অতএব যার নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে উপদেশ এসেছে, অনন্তর সে বিরত রয়েছে তবে যা অতীত হয়েছে তা তারই এবং তার কৃতকর্ম আল্লাহর প্রতি নির্ভর। আর যারা পুনরায় সুদ গ্রহণ করবে, তারা দোযখবাসী হবে। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে।
অন্য এক আয়াতে সুদ ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ভক্ষণ করো না, আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা সুফল প্রাপ্ত হও। আর ভয় কর ঐ আগুনের যা কাফিরদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে’’। সুদ খাওয়া আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার নামান্তর। পবিত্র কুরআনে মোট ৭টি আয়াত, আর ৪০টিরও অধিক হাদীস এবং ইজমা দ্বারা সুদ হারাম প্রমাণিত। সুদের অবৈধতা এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কিত হাদীস নিুে উল্লেখ করা হলো- আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বিরত থাক। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, যে আল্লাহর রসূল! সাতটি বিষয় কী কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে র্শিক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধ হতে পলায়ন করা এবং সতী-সাধবী মুমিন স্ত্রীগণের প্রতি অপবাদ আরোপ করা’’।
রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কোন সমাজে সুদের প্রচলন হলে সেখানে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, ব্যভিচারের প্রচলন হলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে এবং মাপে কম দেয়ার প্রথা চালু হলে আল্লাহ সেখানে বৃষ্টি বন্ধ করে দেবেন। এটা অবধারিত।’’ রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘সুদের ৭০টি গুনাহ। তন্মধ্যে সর্বনিু গুনাহটি হলো আপন মাকে বিয়ে করার গুনাহর সমান। আর সবচেয়ে জঘন্য সুদ হলো, সুদের পাওনা আদায় করতে গিয়ে কোন মুসলমানের সম্ভ্রম নষ্ট করা বা তার সম্পত্তি জবর দখল করা’’। রসূল (স.) আরো বলেছেন: ‘‘আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের সাক্ষী, সুদের লেখক সকলেরই ওপরই অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।’’
ইসলামে সুদ ও সুদী কারবার নিষিদ্ধ। যদি কেউ এ গর্হিত কাজ করে তবে তার অপরাধের মাত্রানুযায়ী মুসলিম শাসক সুদের অর্থ ফেরত নেয়া, আর্থিক জরিমানা, আটকাদেশ, বেত্রাঘাত, নির্বাসন, মৃত্যুদন্ড এমনকি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করতে পারেন। ইমাম আল-জাস্সাস (র.) বলেন: সুদের মাধ্যমে যেহেতু মানুষের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়, সেহেতু তার শাস্তি ছিনতাইকারীর শাস্তির মত হবে। সম্পদ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণ করা বা কাউকে ঘুষ দেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ আত্মসাৎ করো না, শাসকদের কাছে অর্থ নিয়ে যেও না, যাতে তোমরা মানুষের অর্থের একাংশ অন্যায় পন্থায় ভোগ করতে পার, অথচ তোমরা জান।’’ অর্থাৎ তোমরা শাসকদের উৎকোচ দিয়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যবস্থা করো না অথচ তোমরা তো জান যে, এ রকম করা বৈধ নয়।
রসূল (স.) বলেছেন: আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষখোর উভয়কে অভিসম্পাত দিয়েছেন’’। রসূল (স.) আরো বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করলো, অতঃপর যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, সে তাকে কোন হাদিয়া বা উপহার দিল, সে যদি এই হাদিয়া গ্রহণ করে, তবে তা হবে একটি বড় ধরণের সুদ খাওয়ার পর্যায়ভুক্ত’’। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: ‘‘তোমরা ভাই-এর প্রয়োজন পূরণ করে দিয়ে তার কাছ থেকে যদি উপহার গ্রহণ করো তবে তা হবে হারাম।’’ যে ব্যক্তি কোন কাজের জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হয়, সে যদি তার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত কোন কাজ করে দিয়ে যার জন্য কাজ করেছে তার কাছ থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সেটা সর্বসম্মতভাবে ঘুষ বিবেচিত হবে, তা উপহার, উপঢৌকন, হাদিয়া বা বখশিশ যে নামেই প্রদত্ত হোক না কেন। আর যদি দায়িত্বের অতিরিক্ত হয় এবং চাকুরীর সময়ের বাইরে করা হয় তবে সে জন্য পারিশ্রমিক নিলে তা ঘুষ হবে না।
জুয়াকে ইসলাম অবৈধ উপার্জন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ভাগ্যগণনা শয়তানের কাজ। সুতরাং এসব থেকে দূরে থাক। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। যে কোন ধরণের জুয়াই এ আয়াতের ঘোষণার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা দাবা, তাস, পাশা, গুটি অথবা অন্য কোন জিনিসের দ্বারা খেলা হোক। এটা আসলে অবৈধ পন্থায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন করার আওতাভূক্ত। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কেউ যদি এরূপ প্রস্তাব দেয় যে, এসো তোমার সাথে জুয়া খেলবো, তবে তার সদকা করা উচিত।’’ জুয়া সম্বন্ধে শুধু কথা বললেই যদি সাদকা বা কাফ্ফারা দিতে হয়, তবে কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। তাস ও দাবা ইত্যাদি খেলা যদি আর্থিক হারজিত থেকে মুক্ত হয় এবং নিছক চিত্ত বিনোদনমূলক হয়, তবে তাও বৈধ হওয়ার বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে হারাম, কারো মতে হালাল। কিন্তু আর্থিক হারজিত যুক্ত থাকলে তা যে হারাম, সে ব্যাপারে সকল মাযহাবের ইমামগণ একমত। পাশা জাতীয় জুয়া খেলা হারাম হওয়া সম্পর্কে ইমামগণ একমত হয়েছেন। কারণ রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি পাশা খেললো সে যেন নিজের হাতকে শূকরের গোশত ও রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে রঙিন করলো।’’ দাবা খেলা তো অধিকাংশ আলিমের মতে হারাম, তাতে কোন কিছু বন্ধক রাখা তথা আর্থিক হারজিতের বাধ্যবাধকতা থাক বা না থাক। তবে বন্ধক রাখা এবং হেরে যাওয়া খেলোয়াড়ের বন্ধক রাখা ও আর্থিক হারজিত যুক্ত না থাকলেও অধিকাংশ আলিমের মতে দাবা খেলা হারাম। কেবল ইমাম শাফেঈ একে হালাল মনে করেন শুধু এ শর্তে যে, তা ঘরোয়াভাবে খেলা হবে এবং নামায কাযা অথবা অন্য কোন ফরয ওয়াজিব বিনষ্ট হওয়ার কারণ হবে না। ইমাম নববী ইমাম শাফেঈর এই মতানুসারে ফতোয়া দিতেন। সেই সাথে তিনি পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের বিনিময়ে দাবা খেলাকে জুয়ার অন্তর্ভূক্ত বলে রায় দেন।
ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ব্যাখ্যা দেন যে, ‘আযলাম’ অর্থ দাবা খেলা। আলী (রা.) বলেন: ‘‘দাবা হলো অনারবদের জুয়া। আলী রা. একদিন দাবা খেলায় রত একদন লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: ‘‘তোমরা যা নিয়ে এরূপ ধ্যানে মগ্ন আছ তা কী? এগুলো স্পর্শ করার চেয়ে জ্বলন্ত আগুন স্পর্শ করাও ভালো। আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আলী (রা.) আলো বলেন: ‘‘দাবাড়–র ন্যায় মিথ্যাবাদী আর কেউ নেই। সে বলে আমি হত্যা করছি, অথচ সেহ হত্যা করেনি। সে বলে, ওটা মরেছে, অথচ কোন কিছুই মরেনি। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াহকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, দাবা খেলার ব্যাপারে আপনার কি আপত্তি আছে? তিনি বললেন: দাবা পুরোপুরি আপত্তিকর। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কারযী দাবা খেলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন: দাবা খেলার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, দাবাড়– কিয়ামাতের দিন বাতিলপন্থীদের সাথে একত্র হবে। “প্রাগুক্ত”। রসূল স. বলেন: ‘‘আল্লাহ প্রতিদিন তাঁর সৃষ্টির প্রতি ৩৬০ (তিনশো ষাট) বার রহমাতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। যে দাবা খেলে, সে এর একটি দৃষ্টিও পায় না।’’ (অসমাপ্ত)