বিভাগ: ইসলামের আলো

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
জবর দখল করা ইসলামী আইন নিষিদ্ধ। এ নিষিদ্ধ কাজটি সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জোরপূর্বক মানুষের সম্পদ হরণ, জোর পূর্বক অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া, মানুষকে প্রহার করা, গালিগালাজ করা, বিনা উস্কানিতে কারো ওপর আক্রমণ চালানো এবং আর্থিক, দৈহিক ও মর্যাদার ক্ষতিসাধন এবং দুর্বলদের ওপর নৃশংসতা চালানো ইত্যাদিকে জবর দখল বলে। এটি ইসলামে একেবারেই নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘জালিমদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না। আল্লাহ তাদেরকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফোরিত হবে, তারা মাথা নিচু করে দৌঁড়াতে থাকবে, তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে ফিরবে না এবং তাদের হৃদয়সমূহ দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আযাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও। সেদিন জুলুমবাজরা বলবে : হে আমাদের প্রভূ! অল্প কিছুদিন আমাদেরকে সময় দিন তাহলে আমরা আপনার দাওয়াত কবুল করবো এবং রসূলদের অনুসরণ করবো। তোমরা কি ইত:পূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে তোমাদের পতন নেই। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করেছ এবং সেই সব জালেমের সাথে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি।’’ রসূল (স.) বলেন: ‘‘যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণও অন্যের জমি জবর দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার ঘাড়ে সাতটি পৃথিবী চাপিয়ে দেয়া হবে।’’
প্রচলিত আইনে, অন্যায়ভাবে অন্যের ভূমিতে প্রবেশ করা অথবা ভূমির দখলে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করাকে ভূমিতে অনধিকার প্রবেশ বা ভূমি ট্রেসপাস বলে। অন্যের অঙ্গনে যথার্থ কারণ ছাড়া প্রবেশ করলে ট্রেসপাস সংঘটিত হয়। এ উদ্দেশ্যে বিবাদীর সম্পূর্ণ প্রবেশ প্রয়োজন হয় না। প্রধান ফটকে সামান্যতম অঙ্গুলী প্রবেশই যথেষ্ট। এ ছাড়া জানালায় হাত ঢুকানো, দেওয়ালে হেলান দেয়া, অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলক্রমে প্রবেশ করা এ অপকর্মের অন্তর্ভূক্ত।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি বলপূর্বক কারো কাছ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করবে তার শাস্তির মেয়াদ তিন বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। আর এ বলপূর্বক কোন কিছু গ্রহণের মাধ্যমে যদি ভিকটিমের কোন ক্ষতি হয় তাহলে তার শাস্তির মেয়াদ পাঁচ বছরের কম নয়। আর বলপূর্বক বা জোর করে কাউকে মৃত্যুর ভয় দেখালে তার শাস্তি সাত বছরের কম নয়।
ক্ষতিপূরণের মামলায় বলা হয়েছে যে, জমি পুনরুদ্ধারের মামলা ছাড়াও দখলচ্যুত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের দাবি করতে পারে। বেদখল হতে উদ্ভুত যাবতীয় ক্ষতিসহ দখল উদ্ধার বাবদ যাবতীয় খরচ সে দাবি করতে পারে। আবশ্য বিবাদী ভূমির বা গৃহাঙ্গানের উন্নতিকল্পে খরচ করে থাকলে সেগুলোর জন্য সেট অফ (ঝবঃ ড়ভভ) দাবি করতে পারে কি-না সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত সেই। তবে প্রখ্যাত টর্ট আইন বিশারদ স্যামন্ডের মতামত উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন: যেহেতু বেদখলের ফলে উদ্ভুত ক্ষতিপূরণের জন্য দাবীর দাবি, এটা নীতিগতভাবে পরিষ্কার যে, বিবাদী উক্ত অঙ্গনের যে মূল্য বৃদ্ধি করেছে তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিবাদী যদি পুরাতন ঘর ভেঙ্গে নতুন গৃহ নির্মাণ করে থাকে, তবে এটা যথার্থ হবে না যে, বাদী নতুন গৃহের দখল এবং পুরাতন গৃহের মূল্য আদায় করতে পারবে।
স্বাভাবিক যৌনকার্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্যতম। এর সমাধান না হলে মানুষ তার জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অবৈধ পন্থায় যৌনকার্য সম্পাদন করা গর্হিত কাজ। কোনো নারী স্বেচ্ছায় নিজেকে দেহ ব্যবসায় নিয়োজিত করতে পারবে না। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্য কেউ তাকে দিয়ে দেহ ব্যবসায় পরিচালনা করতে চাইলে তাও নিষিদ্ধ। আল-কুরআনে এসেছে, ‘‘তোমরা যুবতীদের দেহ ব্যবসায় লিপ্ত হতে বাধ্য করো না।’’ কুরআনের আরো ঘোষণা, ‘‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। কেননা তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’’
মহানবী (স.) বলেন, ‘‘কোন ব্যক্তি মু’মিন থাকা অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে না।’’ ইসলাম ব্যভিচার ও দেহ ব্যবসায়কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পর্ণোগ্রাফি ছবি তৈরি অশ্লীলতা ও বিকারগ্রস্ত মানসিকতার পরিচায়ক। তরুণ-যুব-শিশু চরিত্র হনন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম যে কোন প্রকার অশ্লীলতার নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছে। আল-কুরআন বলেন, ‘‘তোমরা কোনো ধরণের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হয়ো না।’’ চারিত্রিক ও সামাজিক শৃংখলা বিনষ্টকারী উপকরণের ব্যবসা বা ক্রয়বিক্রয় মাধ্যমে অর্থ আয় করাকেও ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘নিশ্চয় যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা বিস্তার করাকে পছন্দ করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে পীড়াদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ যা জানেন তা তোমরা জান না।’’ অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তোমাদের দাসীরা পবিত্র ও সতী-সাধ্বী থাকতে চাইলে দুনিয়ার স্বার্থ লাভের জন্য তাদেরকে ব্যভিচার করতে বাধ্য করো না।
ইসলাম যেনা-ব্যভিচার সমর্থন করে না। এ সমস্ত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার জন্য আল্লাহ মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর যারা এমন অশ্লীল কাজে লিপ্ত হবে তাদের উভয়ের ব্যাপারে কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ‘‘ব্যভিচারিনী ও ব্যভিচারী যেনা করলে উভয়ের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান প্রয়োগে তোমাদের উভয়ের ব্যাপারে নম্রতা দেখানো যাবে না, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করে থাক। আর মু’মিনদের একটি দল উভয়ের শাস্তি প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করবে। যেনাকারী পুরুষ যেনাকারিনী মহিলা যেনাকারী বা মুশরিক পুরুষ ব্যতীত অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবে না। আর এরা মুমিনদের জন্য হারাম।’’
রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘আমার নিকট থেকে নিয়ে নাও, আল্লাহ্ ঐ সকল মহিলার জন্য পথ বের করে দিবেন। যুবক-যুবতী যেনা করলে তাদের শাস্তি একশত বেত্রাঘাত ও একবছর নির্বাসন। আর বিবাহিত মহিলা ও পুরুষ যেনা করলে তাদের শাস্তি একশত বেত্রাঘাত ও পাথর দ্বারা রজম।’’ এমনিভাবে আরো অনেক হাদীস রসূল স. থেকে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিত যে, এ সকল খারাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা এবং অপরকে বিরত থাকা।
প্রচলিত আইনে পতিতাবৃত্তিকে জঘন্য অপরাধ মনে করা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে: ‘‘যে ব্যক্তি ১৮ বছরের কম বয়স্কা কোন ব্যক্তি যে কোন বয়সে বেশ্যাবৃত্তি বা অন্য কোন লোকের সহিত অবৈধ যৌন সম্পর্ক অথবা কোন বে-আইনি ও অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এই উদ্দেশ্যে কিংবা অনুরূপ ব্যক্তি যে কোন উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এইরূপ সম্ভাবনা জানিয়া তাহাকে বিক্রয় করে, ভাড়া দেয় বা প্রকার ন্তরে হস্তান্তর করে সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে যাহার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে দন্ডিত হইবে তদুপরি অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবে।’’
যে ব্যক্তি ১৮ বছরের কম বয়স্কা কোন ব্যক্তি যে কোন বয়সে বেশ্যাবৃত্তি বা অন্য কোন লোকের সহিত অবৈধ যৌন সম্পর্ক অথবা কানো বে-আইনি ও অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এই উদ্দেশ্যে কিংবা অনুরূপ ব্যক্তি যে কোন উদ্দেশ্যে নিয়োজিত বা ব্যবহৃত হইবে এইরূপ সম্ভাবনা জানিয়া তাহাকে ক্রয় করে, ভাড়া দেয় বা প্রকারন্তরে হস্তান্তর করে সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে যাহার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হইতে পারে দন্ডিত হইবে তদুপরি অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবে।
‘পাচার’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ঞৎধভভরপশরহম, করফহধঢ়ঢ়রহম, ঝসঁমমষরহম. শব্দটির প্রচলিত অর্থ হচ্ছে, অন্যায় ও অবৈধ উপায়ে কোন জিনিস যথাযথ স্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। অবৈধ উপার্জনের অন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে মানবপাচার। নারী ও শিশু পাচারের মত জঘন্য অপরাধের প্রবণতা আগেও ছিল, “আল-কুরআনের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ইউসুফ আ. কে খ্রিস্টপূর্ব কয়েক বছর পূর্বে একদল ব্যবসায়ী কূপ থেকে তুলে মিসরে পাচার নিয়ে যয় এবং বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ্ বলেন: বর্তমানেও আছে। জাহিলী যুগে আরবেও শিশু পাচারের ঘটনা দেখা যায়। “উদাহরণস্বরূপ যায়িদ ইবনে হারিছার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি পাচার হয়ে দাস জীবন যাপন করেন। পরে রসূলুল্লাহ (স.) ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। অবশ্য শিল্প বিপ্লবের পর এর বিস্তার এত বেশি হয়েছে যে, তা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমান যুগে অর্থ উপার্জনের সহজ মাধ্যম হিসেবে একটি দেশী-বিদেশী দুষ্টচক্র লোক পাচার করার কাজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের শাস্তির বিধান রয়েছে ইসলামে। অপরাধগুলোকে শাস্তির স্তরভেদে তিন ভাগে ভাগ করা হয়: ১. হুদূদ “হুদুদ সংক্রান্ত অপরাধ: হুদুদ সংক্রান্ত অপরাধ বলতে ঐসব অপরাধকে বুঝায় যার জন্য আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন: ব্যভিচার, মদ্যপান, চৌর্যবৃত্তি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ করা, মিথ্যা অপবাদ, ধর্ম ত্যাগ ও বিদ্রোহ/ রাষ্ট্রদ্রোহিতা। সংক্রান্ত অপরাধ ২. কিসাস ও দিয়াত “কিসাস ও দিয়াহ সংক্রান্ত অপরাধ: কিসাস ও দিয়াত সংক্রান্ত অপরাধ বলতে ঐসব অপরাধকে বুঝায় যার জন্য হুবহু অপরাধ প্রতিশোধ গ্রহণ কিংবা নির্ধারিত জরিমানা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। মযলুম ব্যক্তি নিজে কিংবা তার উত্তরাধিগণ তা ক্ষমা করে দেবার অধিকার রাখে। যেমন: ইচ্ছাকৃত হত্যা, প্রায় ইচ্ছাকৃত হত্যা, ভুলে হত্যা, ইচ্ছাকৃত শারীরিকভাবে আহত করা, ভুলে শারীরিক ক্ষতি সাধন করা। তা’যীর “তা’যীর সংক্রান্ত অপরাধ হচ্ছে ঐসব অপরাধ যার ব্যাপারে শরী’আতে সুনির্দিষ্টভাবে কোন শাস্তির উল্লেখ করে নি, যা নির্ধাণ করার ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করা হয়েছে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে সরকার জনসাধারণকে সতর্ককরণ করা থেকে শুরু করে শাস্তির ভয়াবহতা অনুযায়ী সবশেষে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত যে কোন শাস্তি প্রদান করতে পারে। এ ধরণের অপরাধের সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। যেমন- সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, গালমন্দ করা ইত্যাদি। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে অপরাধ যাই হোক না কেন তা উল্লেখ তিন প্রকারের শাস্তি পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। পাচার কিসাস এর শাস্তি আরোপ করার মত অপরাধ নয়, আবার হুদূদ সংক্রান্ত যতটি অপরাধের উল্লেখ করা হয়েছে তারও আওতাভূক্ত নয়। এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি প্রতারণামূলক কাজ। প্রতারণার মাধ্যমে পাচারকারীরা মানুষকে ক্ষতিকর ও সমাজবিরোধী কাজের সাথে সম্পৃক্ত করছে। তাই এটি তা’যীর সংক্রান্ত অপরাধসমূহের একটি অপরাধ। (অসমাপ্ত)

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাষ্ট্রীয় আইনে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ এ প্রসঙ্গে প্রকাশ্য জুয়া আইন ১৯৬৭ ধারায় বলা হয়েছে- এ আইন প্রকাশ্য জুয়া আইন-১৮৬৭ নামে অভিহিত হইবে এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে ইহা প্রযোজ্য হইবে। জুয়া খেলা শব্দ দ্বারা জুয়া বা বাজী ধরা বুঝাইবে (কেবল ঘোড়া দৌড়ের উপর বাজী ধরা ছাড়া) যখন উক্ত জুয়া বাজী অনুষ্ঠিত হয়-
ক. অনুরূপ ঘোড়া দৌঁড়ের দিনে, খ. এমন স্থানে যা সরকারি অনুমোদন লইয়া স্টুয়ার্ডরা ঘোড়া দৌড়েঁর জন্য পৃথক করিয়া রাখিয়াছে এবং গ. কটি লাইসেন্স যুক্ত বুক মেকারসহ; অথবা  ১৯২২ সালের বঙ্গীয় প্রমোদ কর আইনের ১৪ ধারার সংজ্ঞানুসারে টোটোলাইজেটরের দ্বারা কিন্তু লটারী উহার অন্তর্ভূক্ত নহে; খেলার কাজে ব্যবহৃত যে কোন হাতিয়ার বা সামগ্রী ‘‘ক্রীড়া সামগ্রী’’ শব্দের অন্তর্গত, এবং ‘‘সাধারণ ক্রীড়া ভবন’’ অর্থ যে কোন ঘর, কক্ষ, তাঁবু বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থান বা প্রাঙ্গণ বা গাড়ি অথবা যে কোন স্থানে যেখানে মালিকের রক্ষকের বা ব্যবহারকারীর মুনাফা বা উপার্জনের জন্য যে কোন ক্রীড়াসামগ্রী বা অন্য কিছু ভাড়া বা অর্থের বিনিময়ে রাখা বা ব্যবহৃত হয়।
এই আইনের এখতিয়ারভুক্তি এলাকায় যে কোন ব্যক্তি যে কোন ঘর, তাঁবু, কক্ষ, প্রাঙ্গণ বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানের মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী ব্যবহারকারী হিসেবে অনুরূপ স্থানকে সাধারণ জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত করিতে দিলে; এবং উপরোক্ত ঘর, তাঁবু, কক্ষ, প্রাঙ্গণ, বা প্রাচীর বেষ্টিত স্থানের মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী বা ব্যবহারকারী হিসেবে যে কোন ব্যক্তির জ্ঞাতসারে বা স্বেচ্ছায় অন্য লোককে, উক্ত স্থানকে সাধারণ জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত করিতে দিলে; এবং যে কেহ উপরে বর্ণিত স্থানকে উক্ত উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কাজে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করিলে অথবা যে কোন ভাবে সাহায্য-সহায়তা করিলে; এবং অনুরূপ গৃহের, তাঁবুতে, কক্ষে, প্রাঙ্গণে বা প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে যে কেহ জুয়া খেলার উদ্দেশ্যে অর্থ প্রদান বা নিয়োজিত করিলে অভিযুক্ত হইয়া যে কোন ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট বিচারে সোপর্দ হইবে এবং অনূর্ধ্ব দুইশত টাকা পর্যন্ত জরিমানায় এবং পেনাল কোডের সংজ্ঞানুসারে অনূর্ধ্ব তিন মাস পর্যন্ত কারাদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবে।
চাদাবাঁজি করে সম্পদ উপার্জন করা ও এক ধরণের জুলুম এবং ইসলামী শরীয়তে এ জাতীয় উপার্জনকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বলা হয়েছে: “কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়কআযাব রয়েছে।” যারা জোর করে চাঁদা আদায় করে তারা নিজেরাও জুলুমবাজ এবং তারা জুলুমবাদের  সবচেয়ে বড় সাহায্যকারীও। চাঁদাবাজরা যে চাঁদা আদায় করে, তা যেমন তাদের প্রাপ্য নয়, তেমনি যে পথে তা ব্যয় করে তাও বৈধ নয়। জোরপূর্বক চাঁদা আদায়কারী আল্লাহর বান্দাদের ওপর জুলুম ও শোষণ চালায়। তাদের কষ্টার্জিত অর্থ কেড়ে নেয়। এ ধরনের লোকেরা কিয়ামতের দিন মজলুমদের প্রাপ্য দিতে পারবে না। যদি তাদের কবুলকৃত কোন সৎকর্ম থাকে, তবে তাই দিতে হবে। অন্যথায় মজলুমদের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। রসূল (স.) বলেছেন, ‘‘আমার উম্মাতের মধ্যে প্রকৃত দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন প্রচুর নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে আসবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়ে আসবে, প্রহার করে আসবে অথবা কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে আসবে। এরপর এই সকল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একে একে তার পুণ্যকর্ম দিয়ে দেয়া হবে। যখন পুণ্যকর্ম ফুরিয়ে যাবে, তখন মজলুমদের পাপ কাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এ জন্য রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘অবৈধ চাঁদা আদায়কারী জান্নাতে যাবে না।’’
এ থেকে বুঝা যায়, এটি কত বড় গুনাহের কাজ। জোরপূর্বক অর্থ আদায় করার কাজটি ডাকাতি ও রাহাজানির নামান্তর। জোরপূর্বক চাঁদা যে আদায় করে, সে তার সহযোগিতা করে, যে লেখে, যে সাক্ষী থাকে, তারা সবাই এ পাপের সমান অংশীদার। তারা সবাই আত্মসাৎকারী ও হারামখোর। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, জাবির (রা.) রসূল (স.) কে বললেন: ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আমার মাদক ব্যবসায় ছিল। সেই ব্যবসায় থেকে আমার বেশ কিছু সঞ্চিত নগদ অর্থ আছে। আমি যদি তা দিয়ে আল্লাহর কোন ইবাদত বা সাওয়াবের কাজ করি, তবে তাতে কি আমার উপকার হবে? রসূল (স.) বললেন: তুমি যদি সেই অর্থ হজ্জ্ব, জিহাদ, অথবা সাদকায় ব্যবহার করো, তবে তা আল্লাহর কাছে একটা মাছির ডানার সমানও মূল্য পাবে না। আল্লাহ পাক পবিত্র সম্পদ ছাড়া কোন কিছু গ্রহণ করেন না।’’
প্রচলিত ও ইসলামী আইনে চুরি একটি জঘণ্য অপরাধ। যার শাস্তিও ভয়াবহ। চুরির মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ ভোগ করা হারাম ও দন্ডনীয় অপরাধ। চুরি শব্দের অর্থ-অপহরণ, চৌর্য, পরের দ্রব্য না বলে গ্রহণ, গোপনে আত্মসাৎকরণ ও অন্যের অলক্ষ্যে চুরি করা, সম্পদ কুক্ষিগত করা ইত্যাদি। চুরির আরবী প্রতিশব্দ হলো আস-সারাকাহ। এর আভিধানিক অর্থ-অপরের সম্পদ গোপনে হস্তগত করা। গোপনীয়ভাবে অন্যের নিকট হতে সম্পদ বা অন্য কিছু নিয়ে নেয়া। কোন বালেগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি কর্তৃক অপরের দখলভূক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ সংরক্ষিত স্থান হতে গোপনে হস্তগত করাকে চুরি বলে। আব্দুল কাদির আওদা বলেন: ‘‘চুরি হচ্ছে গোপনে অন্যের সম্পদ নেয়া অর্থাৎ গোপন পন্থায় অথবা প্রাধান্য বিস্তার করে অন্যের সম্পদ হস্তগত করা।’’
লিসানুল আরব গ্রন্থে বলা হয়েছে- গোপনভাবে অপরের সম্পদ হরণ করাকে চুরি বলে। মোট কথা, কোন জ্ঞানবান বালেগ ব্যক্তি কর্তৃক অপরের মালিকানাধীন সংরক্ষিত নিসাব (এক দিনার বা দশ দিরহাম) পরিমাণ সম্পদের মূল্য, যার মাঝে চোরের কোন অধিকার কিংবা অধিকারের কোন অবকাশ নেই। গোপনে ও ধরা পড়ার ভয়ে সবার অলক্ষ্যে স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে হস্তগত করাকে চুরি বলে। সে ব্যক্তি মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক অথবা মুরতাদ হোক অথবা পুরুষ হোক কিংবা মহিলা হোক, স্বাধীন হোক কিংবা দাস হোক এতে কোন পার্থক্য হবে না। সবার বেলায় একই বিধান প্রযোজ্য।
জাস্টিনিয়ানের বিধিবদ্ধ আইন এ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী কাউকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি ব্যবহার বা দখল করা অথবা অন্যের সম্পত্তি অবৈধভাবে আত্মসাৎ করার নাম চুরি। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, অপহরণ করার উদ্দেশ্যে অন্যের অস্থাবর সম্পত্তি আত্মসাৎ বা ব্যবহার করলে তা চুরি বলে বিবেচিত হয়। আর চুরির দায়ে শুধু চোর নয়, চোরের সহায়তাকারী এবং পরামর্শদানকারীও অভিযুক্ত হতো। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এ মর্মে যে, তাারা আল্লাহর সহিত কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না তখন তাদের বায়আত গ্রহণ করিও।’’
আল-কুরআনের চুরির শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও এতো তাদের কৃতকর্মের ফল এবং প্রদত্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ প্রকাশ থাকে যে, প্রথমবার চুরির দায়ে ডান হাত, দ্বিতীয়বার চুরির দায়ে বাম পা কেটে দিতে হবে। এ ব্যাপারে সকল ইমাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তৃতীয়বার চুরি করলে তার শাস্তি কী হবে এ বিষয়ে অনেক মতভেদ পরিলক্ষিত হয় যা এ স্বল্প পরিসরে আলোচনার সুযোগ নেই। তাই উক্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য উল্লেখিত গ্রন্থগুলো দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৯ নং ধারা অনুযায়ী সাধারণ চুরির শাস্তি হলো তিন বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। “গাজী শামছুর, রহমান, দন্ডবিধির ভাষ্য, ধারা-৩৭৯।” আর বাসাবাড়ি থেকে চুরি করলে শাস্তি হলো সাত বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
রোমান আইনে আগে চুরিকে একটি দেওয়ানী ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটিকে ফৌজদারি ও দন্ডণীয় অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। কাজেই চুরির বিরুদ্ধে দ্বিবিধ প্রতিকার ছিল নিম্নরূপ: ১. চুরির ধরণ যাই হোক চোরাই মাল ফেরৎ দেয়া হচ্ছে চুরির প্রতিকারে প্রাথমিক ব্যবস্থা। ২. চুরির ক্ষেত্রে শান্তি জরিমানা। ক. হাতে নাতে ধরা পড়া চুরির ক্ষেত্রে চোরাই মালের মূল্যের চারগুণ এবং পরে ধরা পড়া চুরির ক্ষতিপূরণ চোরাই মালের মূল্যের দ্বিগুণ।
ডাকাতি বড় ধরণের অপরাধ। ডাকাতি চুরির চেয়ে অধিকতর ভয়াবহ। পরকালীন শাস্তি ছাড়াও এ অপরাধের জন্য ইসলাম পার্থিব দন্ডবিধি দিয়েছে। মানব জীবনে অর্থ-সম্পদ থাকা অপরিহার্য। ইসলাম এ ধন-সম্পদ অর্জন ও ব্যয় ভোগের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিধান পেশ করেছে। হলাল পথে উপার্জিত ধন-সম্পদকে হালাল ঘোষণা করেছে আর হারাম পথে অন্যায় ও জুলুমের মাধ্যমে আহরিত ধন-সম্পদকে হারাম করে দিয়েছে এবং পরকালে কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তিকে নিপতিত হওয়ার ভয় দেখিয়েছে। ডাকাত শব্দের অর্থ দস্যু, লুণ্ঠনকারী, বলপূর্বক অপহরণকারী, অসম সাহসী ও নির্ভীক এবং ডাকাতি শব্দের অর্থ হল: দস্যুবৃত্তি, দস্যু দ্বারা লুণ্ঠন, অসম সাহসিক ও বিস্ময়কর দুষ্কর্ম ইত্যাদি।
যে সব লোক সশস্ত্র হয়ে পথে-ঘাটে, ঘরে-বাড়িতে, নদীতে-মরুভূমিতে নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা চালায় এবং প্রকাশ্যভাবে জনগণের সম্মুখে জনগণের ধন-মাল হরণ করে নিয়ে যায়, তাদেরকেই বলা হয়েছে ডাকাত, লুণ্ঠনকারী বা মুহারিবুন। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে, ‘‘যদি চুরি করিবার উদ্দেশ্যে বা চুরি করিতে কিংবা চুরিতে লব্ধ সম্পত্তি বহন বা বহনের উদ্যোগকালে অপরাধকারী তদুদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায় বা আঘাত করে কিংবা আটক করে ভীতি প্রদর্শন করে তাহলে উক্ত চুরিকে দস্যুতা বলে।’’ আর সেই ক্ষেত্রে ৫ বা ততোধিক ব্যক্তি মিলিত হইয়া কোন দস্যুতা অনুষ্ঠান করে বা করিবার উদ্যোগ করে তাহা হইলে তাকে ডাকাতি বলে।
যারা ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ ছিনিয়ে নেয় এবং ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষের জীবন ও সম্ভ্রমহানী ঘটায় তাদের ক্ষেত্রে আল-কুরআনের সরাসরি শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আযাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহাশাস্তি।’’
ডাকাতি প্রতিরোধে মুমিনদের এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও ডাকাতির ঘটনা ঘটলে মুমিন নির্বিচার থাকতে পারে না। কেননা এটা ঈমানের পরিপন্থী আচরণ। এ প্রসঙ্গে নবী স. বলেছেন: ‘‘যখন কোনো লোক কোন মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয় আর লোকেরা তা চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে তখন সে আর মুমিন থাকে না।’’ অতএব ডাকাতি সুস্থ সমাজব্যবস্থার পক্ষে খবুই ক্ষতিকর ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। এ কারণে ইসলামী আইনে ডাকাতি জঘন্য অপরাধ। ইসলামী সমাজে ডাকাতির কোন সুযোগ থাকতে পারে না। ডাকাতির পথও কারণ সর্বতোভাবে বন্ধ করা একান্তই আবশ্যক।
ইসলাম বিধান মতে ডাকাতির শাস্তি অপরাধভেদে কমবেশী হতে পারে। শাস্তির বিধান প্রয়োগ করার ব্যাপারে ইসলামী সরকারের স্বাধীনতা রয়েছে। অর্থাৎ বিচারক ইচ্ছা করলে তাকে হত্যা করতে পারবে, শূলে চড়াতে পারবে এবং বহিষ্কার করতে পারবে। এই মতটি ইবনে আব্বাস, হাসান, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব ও মুজাহিদের। যে ডাকাত হত্যা ও সম্পদ হরণ এই দুই অপরাধই করে তাকে হত্যা করা হবে অতঃপর শূলে চড়ানো হবে। যে ডাকাত সম্পদ কেড়ে নেবে কিন্তু কাউকে হত্যা করবে না, তাকে শুধু হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটা হবে। যে ডাকাত শুধু রক্তপাত করবে এবং সম্পদ হরণ করবে না তাকে হত্যা করা হবে। আর যে ব্যক্তি হত্যাও করবে না, সম্পদও হরণ করবে না, কিন্তু অস্ত্র নিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করবে, তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটি শাফেঈ মাযহাবের মত। ইমাম শাফেঈ আরো বলেন, প্রত্যেককে তার অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তি দেয়া হবে। হত্যা ও শূল দুটোই যার প্রাপ্য, তাকে প্রথমে হত্যা করা হবে অথবা ৩ বার শুলে চড়িয়ে নামিয়ে রাখা হবে যাতে তার শাস্তি কে খুবই ঘৃণ্য ভাবে প্রকাশ করা যায়। আর যার কেবল হত্যার শাস্তি প্রাপ্য তাকে হত্যা করে লাশ আপনজনদের হাতে অর্পণ করতে হবে। আল-কুরআন এর ঘোষণা ‘‘অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে’’-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: যাকে ধরা সম্ভব হবে না তার সম্পর্কে সরকার ঘোষণা দিয়ে দেবেন যে, যে ব্যক্তি তাকে ধরতে পারবে, সে যেন তাকে হত্যা করে। আর যে ধরা পড়বে, তাকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দি করতে হবে। কেননা এতে করে অপরাধ বন্ধ হবে এবং এটাই তার বহিষ্কার। শুধু হত্যার ভয় দেখানো এবং সন্ত্রাস ছড়ানোই কবীরা গুনাহ। এর ওপর কেউ যদি জিনিসপত্র ছিনতাইও করে এবং খুন-জখমও করে, তবে সে তো এক সাথে অনেকগুলো কবীরা গুনাহ সংঘটিত করে। এছাড়া এ ধরণের অপরাধিরা সাধারণত মদখোরী, ব্যভিচার, সমকাম, নামায তরক ইত্যাদি কবীরা গুনাহেও লিপ্ত থাকে।
বাংলাদেশ দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে, যদি কোন লোক উপরে বর্ণিত ডাকাতির সংজ্ঞায় বর্ণিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকে তাহলে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৯২ ধারা মোতাবেক ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ডে অথবা অর্থদন্ডে অথবা উভয় দেন্ড দন্ডিত হইতে পারে। আর এ ডাকাতি যদি প্রকাশ্য রাজপথে সংঘটিত হয়ে থাকে তাহলে তার শাস্তির মেয়াদ ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ডে অথবা অর্থদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে।
মানব পাচার ও অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা ইসলাম ও প্রচলিত আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অপহরণ একটি জঘন্য অপরাধ। রসূল (স.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘‘তোমাদের এ শহরে আজকের দিন ও এ মাসের মতই তোমাদের পরস্পরের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সম্মানীয়। প্রত্যেক মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে চলতে দিতে হবে। এটা তার অধিকার। অপহরণের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চলার অধিকারকে হরণ করা হয়। তাছাড়া অপহরণকারী অপহৃত ব্যক্তিকে সাধারণত যেসব কাজে নিয়োজিত করে তাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনৈতিক ও অমানবিক। তাই এ অপরাধের সাথে জড়িত প্রায় সব দিক অবৈধ। আর অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা একটি প্রতারণা। ইসলামী আইনে সকল প্রকার প্রতারণা হারাম। প্রতারণা ও ধোঁকাবাজীকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে আল্লাহ্ বলেন: আর এভাবেই আমি প্রত্যেক জনপদে এর শীর্ষস্থানীয় অপরাধী লোকদেরকে এমনই করেছি যেন তারা নিজেদের ধোঁকা, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে।
অপহরণ শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি জঘন্য অপরাধ। তাই ইসলামে অপহরণের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। আর অপহরণের ক্ষেত্রে সাধারণত চুরি ও প্রতারণাই প্রধান কৌশল হিসেবে অনুসৃত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে কৌশলই অবলম্বন করা হোক না কেন, সার্বিকভাবে ইসলাম তা অবৈধ বলে সাব্যস্ত করেছে। কোন মানুষকে বিক্রি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এমন কি নিজের সন্তানকেও বিক্রি করার কারো অধিকার নেই। কেননা, মানুষ অতীব সম্মানীয়। আল্লাহ বলেন, ‘‘আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।
প্রচলিত আইনের দন্ডবিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে কোন স্থান হতে গমন করিবার জন্য জোরপূর্বলক বাধ্য করে বা কোন প্রতারণামূলক উপায়ে প্রলুব্ধ করে সেই ব্যক্তি উক্ত ব্যক্তিকে অপহরণ করেছে বলিয়া গণ্য হইবে। যদি কোন লোক উক্ত অপরাধে অপরাধী হয় তাহলে তার শাস্তির মেয়াদ সাত বছর কারাদন্ড এবং তদুপরি অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে। যে ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে দাস আমদানি, রপ্তানি, অপহরণ, ক্রয়-বিক্রয় করে বা দাসের কারবার করে সে ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা যে কোন বর্ণনার অনুর্ধ দশ বছর মেয়াদী কারাদন্ডে তদুপরি অর্থে দন্ডিত হবে।
এ সম্পর্কে ২০০০ সালে জাতীয় গেজেটের ৮ নং আইনের ৭ ধারায় নারী ও শিশু অপহরণের শাস্তি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি ধারা-৫ এ উল্লিখিত কোন অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে কোন নারী বা শিশুকে অপহরণ করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অন্যূন চৌদ্দ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবে এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবে। যদি কোন ব্যক্তি মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে কোন নারী বা শিশুকে আটক করেন, তা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।
ওজনে কম দিয়ে সম্পদ উপার্জন করা ইসলামে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং যারা এমন জঘন্যতম কাজে লিপ্ত থাকবে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ আল-কুরআনে ঘোষণা করেন: ‘‘যারা ওজনে ও মাপে কম দেয়, তাদের জন্য সর্বনাশ। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে আনার সময় ঠিকমত আনে, আর মেপে দেয়ার সময় কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে? যে দিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগৎ সমূহের প্রতিপালকের সম্মুখে। কখনও না, পাপাচারীদের আমলনামা তো সিজ্জীনে আছে। সিজ্জীন সম্পর্কে তুমি কী জান? তা চিহ্নিত আমলনামা। সেই দিন দুর্ভোগ হবে অস্বীকারকারীদের, যারা কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে, কেবল প্রত্যেক পাপিষ্ঠ সীমালংঘনকারী এটি অস্বীকার করে।’’
ইমাম সুদ্দী বলেন: রসূল (স.) যখন হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন তখন সেখানে অনেক লোক দেখতে পেলেন যারা নিজের জিনিস মেপে নেয়ার সময় বেশি নিত এবং অপরকে দেয়ার সময় ওজনে কম দিত; তখন আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করেন। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘পাঁচটি জিনিসের ফলে পাঁচটি জিনিস অনিবার্য। যে পাঁচটি বিষয় হলো: কোন জাতি প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তার ওপর তার শত্র“কে চাপিয়ে দেবেন। কোন জাতি আল্লাহর বিধান ছাড়া মনগড়া বিধান দ্বারা দেশ শাসন করলে তাদের মধ্যে দারিদ্র্য ছড়িয়ে পড়বে, কোন জাতিকে অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে তাদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, মাপে ও ওজনে কম দিলে ফসল কম হবে ও দুর্ভিক্ষ হবে, আর যাকাত দেয়া বন্ধ করলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে।’’ এখানে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় যে, মাপে কম দেয়া ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে তিল তিল করে অলক্ষ্যে চুরি করে এবং হারাম উপার্জন করে। (অসমাপ্ত)

সম্পদের অহংকার ধ্বংস ও তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
মদ এবং যে সকল নেশা জাতীয় দ্রব্য যা পান বা সেবন করা হারাম তার উৎপাদন ও ব্যবসা ইসলাম সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছে। এ জাতীয় দ্রব্য উৎপাদন ও তার ব্যবসালব্ধ আয় অবৈধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা বলেন: হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-দেবী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো অপবিত্র শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্র“তা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি বিরত হবে না?’’ মদ এবং নেশা জাতীয় দ্রব্য ছাড়াও এ আয়াতে আরো যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাহলো: মূর্তি তৈরি, মূর্তি বিক্রয় ও মূর্তি উপাসনালয়ের সেবালব্ধ আয়, ভাগ্য গণনা ও জোতিষির ব্যবসা। এ সম্পর্কে আলোচ্য নিবন্ধের যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হবে।
পৃথিবীতে দু’ধরনের উপার্জন পরিলক্ষিত হয়। একটি হলো বৈধ পন্থায় উপার্জন। আর অপরটি হলো অবৈধ পন্থায় উপার্জন। মানবজীবনে এ অবৈধ পন্থায় উপার্জনকে কুরআন ও হাদীসে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।’’ রসূল স. বলেছেন ‘‘এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধুসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘‘হে প্রভু! বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। সাদ রা, বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন আমার দুআ কবুল হয়। রসূল (স.) বললেন: হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দুআ কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের একগ্রাসও মুখে নেয়, তাহলে চল্লিশ দিন যাবৎ তার দুআ কবুল হবে না।’’
অপর এক হাদীসে উল্লেখ আছে : ‘‘যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোন কাপড় কিনলো এবং তার মধ্যে এক দিরহাম অসৎ উপায়ে অর্জিত, সে যতদিন ঐ কাপড় পরিহিত থাকবে ততদিন তার নামায কবুল হবে না।’’ ইমাম ইবনুল ওয়ারদ বলেন, তুমি যদি জিহাদের ময়দানে যোদ্ধা অথবা প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত থাক, তাতেও কোন লাভ হবে না, যতক্ষণ তুমি যা খাচ্ছ তা হালাল না হারাম, তা বিবেচনায় না রাখ।’’
এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আবু বকর (রা.) এর একজন গোলাম ছিল। সে আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসাবে কিছু অর্থ নেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন। অতপর সে প্রতিদিন তার মুক্তিপণের কিছু অংশ নিয়ে আসতো। আবু বকর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিত তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন, নচেৎ করতেন না। একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলো। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে ঐ খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ খাবার তুমি কীভাবে সংগ্রহ করেছো? সে বললো, আমি জাহেলিয়াত যুগে লোকের ভাগ্য গণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না। কেবল ধোঁকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্য গণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত। আবু বকর (রা.) বললেন ঃ কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছো। তারপর গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বমিতে খাদ্য বের হবে না। উপস্থিত লোকেরা তাকে বললো, পানি না খেলে খাওয়া জিনিস বের হবে না। তখন তিনি পানি চাইলেন। পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভুক্ত দ্রব্য পেট এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? আবু বকর (রা.) বললেন: খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যুবরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম। কেননা আমি রসূলুল্লাহ (স.) কে শুনেছি: ‘‘যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উত্তম।’’ এখন মানবজীবনে সম্পদ উপার্জনের কতিপয় অবৈধ পন্থা সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
অবৈধ পন্থায় অর্থোপার্জনের বহুল প্রচলিত একটি প্রধান মাধ্যম হলো সুদের আদান প্রদান, যা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতির শিরা উপশিরায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সুদ অর্থনীতির সবচেয়ে পুরাতন ও জটিল একটি বিষয়। মিসর, রোম, গ্রীস ও ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশে প্রাচীনকালে সুদ সম্পর্কে আইন রচনার প্রয়োজন হয়। বেদ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে সুদকে একটি সমস্যা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টেটলের মতো প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং হিন্দু ও ইয়াহুদী সংস্কারকগণ সুদী কারবারের নিন্দা করেছেন। আর এটি ইসলামের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। সুদ অর্থনৈতিক শোষণ ও জুলুমের অন্যতম হাতিয়ার। এটি মানুষের মানসিকতাকে সংকীর্ণ করে দেয়, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক গতিকে শ্লথ করে দেয়, অর্থবণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি করে। যদিও বিভিন্ন প্রাচ্যবিদ বিভিন্ন ধরণের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষিত সুদকে বৈধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুদের আরবী প্রতিশব্দ হলো ‘রিবা’। যার আভিধানিক অর্থ কয়েকটি হতে পারে। যেমন: বৃদ্ধি “আয-যামাখশারী, আসাসুল বালাগাত, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন : যে সুদ তোমরা দিয়েছ এই উদ্দেশ্যে যে, মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন : “আর আমি মারইয়াম তনয় ও তাঁর মাকে এক নিদর্শন বানিয়েছিলাম এবং তাদেরকে এক অবস্থানযোগ্য স্বচ্ছ পানি বিশিষ্ট টিলায় আশ্রয় দিয়েছিলাম।” শিশুর বেড়ে ওঠা সুদের পরিভাষিক অর্থে- ঋণ গ্রহণ বাবদ ঋণের পরিমাণের হিসাবে যে অতিরিক্ত হিসাব নির্ণয় করা হয় তাকে সুদ বলে। আর এ অতিরিক্ত অর্থ ভোগকারীকে সুদখোর বলে। ‘‘সুদ বা রিবা হচ্ছে সেই বাড়তি অর্থ যার বিনিময়ে ঋণদাতা ঋণ পরিশোধের সময়টা আরো কিছু দিনের জন্য বাড়িয়ে দেয়।’’ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র.) বলেন: ‘‘পারস্পরিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালের প্রবৃদ্ধিই সুদ বা রিবা।’’ আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালীন (র.) বলেন: ‘‘পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পণ্য বা অর্থই রিবা বা সুদ।’’
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিও আল্লাহ্ একই বিধান দিয়েছিলেন যেমনটি দিয়েছিলেন ইয়াহুদীদের প্রতি। এ প্রসঙ্গে ইঞ্জিল শরীফে বলা হয়েছে: ‘‘যাহারা তোমাদের মঙ্গল করে, তোমরা যদি তাহাদেরই মঙ্গল করিতে থাক, তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? খারাপ লোকেরাও তো তাহা করিয়া থাকে। যাহাদের নিকট হইতে তোমরা ফিরিয়া পাইবার আশা কর, যদি তাহাদেরই টাকা ধার দাও তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? ফিরিয়া পাইবে বলিয়াই তো খারাপ লোকেরা খারাপ লোকদের ধার দিয়া থাকে। কিন্তু তোমরা তোমাদের শত্র“দের মহব্বত করিও এবং তাহাদের মঙ্গল করিও। কিছুই ফিরিয়া পাইবার আশা না রাখিয়া ধার দিও। তাহা হইলে তোমাদের জন্য মহাপুরস্কার আছে।’’
গ্রিক সভ্যতার মত রোমান সভ্যতায়ও সুদকে প্রকৃতি বিরোধী উপার্জন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। জাহেলী যুগে ও আরব কুরাইশরা সুদকে সম্পদ অর্জনের অনিষ্টকর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করতো। দেখা যায় রসূল (স.) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে যখন কাবা সংস্কার করা হচ্ছিল তখন আবূ ওয়াহাব সকলকে এ কাজে সুদের অর্থ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিল। জাহিলী যুগে কাফির, ইয়াহুদী এবং মুশরিকরা সুদকে ব্যবসা মনে করতো, অথচ ব্যবসা ও সুদ এক জিনিস নয়, যা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ৭টি আয়াতের মাধ্যমে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের মন্দ পরিণতি, হাশরের ময়দানে তাদের লাঞ্জনা, ভ্রষ্টতা ও কঠোর শাস্তির বাণী শুনিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যারা সুদ খায়, তারা সে ব্যক্তির ন্যায় দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলে, নিশ্চয় ব্যবসা তো সুদেরই অনুরূপ, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, আর সুদকে করেছেন হারাম। অতএব যার নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে উপদেশ এসেছে, অনন্তর সে বিরত রয়েছে তবে যা অতীত হয়েছে তা তারই এবং তার কৃতকর্ম আল্লাহর প্রতি নির্ভর। আর যারা পুনরায় সুদ গ্রহণ করবে, তারা দোযখবাসী হবে। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে।
অন্য এক আয়াতে সুদ ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ভক্ষণ করো না, আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা সুফল প্রাপ্ত হও। আর ভয় কর ঐ আগুনের যা কাফিরদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে’’। সুদ খাওয়া আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার নামান্তর। পবিত্র কুরআনে মোট ৭টি আয়াত, আর ৪০টিরও অধিক হাদীস এবং ইজমা দ্বারা সুদ হারাম প্রমাণিত। সুদের অবৈধতা এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কিত হাদীস নিুে উল্লেখ করা হলো- আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বিরত থাক। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, যে আল্লাহর রসূল! সাতটি বিষয় কী কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে র্শিক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধ হতে পলায়ন করা এবং সতী-সাধবী মুমিন স্ত্রীগণের প্রতি অপবাদ আরোপ করা’’।
রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কোন সমাজে সুদের প্রচলন হলে সেখানে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, ব্যভিচারের প্রচলন হলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে এবং মাপে কম দেয়ার প্রথা চালু হলে আল্লাহ সেখানে বৃষ্টি বন্ধ করে দেবেন। এটা অবধারিত।’’ রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘সুদের ৭০টি গুনাহ। তন্মধ্যে সর্বনিু গুনাহটি হলো আপন মাকে বিয়ে করার গুনাহর সমান। আর সবচেয়ে জঘন্য সুদ হলো, সুদের পাওনা আদায় করতে গিয়ে কোন মুসলমানের সম্ভ্রম নষ্ট করা বা তার সম্পত্তি জবর দখল করা’’। রসূল (স.) আরো বলেছেন: ‘‘আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের সাক্ষী, সুদের লেখক সকলেরই ওপরই অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।’’
ইসলামে সুদ ও সুদী কারবার নিষিদ্ধ। যদি কেউ এ গর্হিত কাজ করে তবে তার অপরাধের মাত্রানুযায়ী মুসলিম শাসক সুদের অর্থ ফেরত নেয়া, আর্থিক জরিমানা, আটকাদেশ, বেত্রাঘাত, নির্বাসন, মৃত্যুদন্ড এমনকি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করতে পারেন। ইমাম আল-জাস্সাস (র.) বলেন: সুদের মাধ্যমে যেহেতু মানুষের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়, সেহেতু তার শাস্তি ছিনতাইকারীর শাস্তির মত হবে। সম্পদ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণ করা বা কাউকে ঘুষ দেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ আত্মসাৎ করো না, শাসকদের কাছে অর্থ নিয়ে যেও না, যাতে তোমরা মানুষের অর্থের একাংশ অন্যায় পন্থায় ভোগ করতে পার, অথচ তোমরা জান।’’ অর্থাৎ তোমরা শাসকদের উৎকোচ দিয়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যবস্থা করো না অথচ তোমরা তো জান যে, এ রকম করা বৈধ নয়।
রসূল (স.) বলেছেন: আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষখোর উভয়কে অভিসম্পাত দিয়েছেন’’। রসূল (স.) আরো বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করলো, অতঃপর যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, সে তাকে কোন হাদিয়া বা উপহার দিল, সে যদি এই হাদিয়া গ্রহণ করে, তবে তা হবে একটি বড় ধরণের সুদ খাওয়ার পর্যায়ভুক্ত’’। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: ‘‘তোমরা ভাই-এর প্রয়োজন পূরণ করে দিয়ে তার কাছ থেকে যদি উপহার গ্রহণ করো তবে তা হবে হারাম।’’ যে ব্যক্তি কোন কাজের জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হয়, সে যদি তার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত কোন কাজ করে দিয়ে যার জন্য কাজ করেছে তার কাছ থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সেটা সর্বসম্মতভাবে ঘুষ বিবেচিত হবে, তা উপহার, উপঢৌকন, হাদিয়া বা বখশিশ যে নামেই প্রদত্ত হোক না কেন। আর যদি দায়িত্বের অতিরিক্ত হয় এবং চাকুরীর সময়ের বাইরে করা হয় তবে সে জন্য পারিশ্রমিক নিলে তা ঘুষ হবে না।
জুয়াকে ইসলাম অবৈধ উপার্জন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ভাগ্যগণনা শয়তানের কাজ। সুতরাং এসব থেকে দূরে থাক। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। যে কোন ধরণের জুয়াই এ আয়াতের ঘোষণার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা দাবা, তাস, পাশা, গুটি অথবা অন্য কোন জিনিসের দ্বারা খেলা হোক। এটা আসলে অবৈধ পন্থায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন করার আওতাভূক্ত। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কেউ যদি এরূপ প্রস্তাব দেয় যে, এসো তোমার সাথে জুয়া খেলবো, তবে তার সদকা করা উচিত।’’ জুয়া সম্বন্ধে শুধু কথা বললেই যদি সাদকা বা কাফ্ফারা দিতে হয়, তবে কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। তাস ও দাবা ইত্যাদি খেলা যদি আর্থিক হারজিত থেকে মুক্ত হয় এবং নিছক চিত্ত বিনোদনমূলক হয়, তবে তাও বৈধ হওয়ার বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে হারাম, কারো মতে হালাল। কিন্তু আর্থিক হারজিত যুক্ত থাকলে তা যে হারাম, সে ব্যাপারে সকল মাযহাবের ইমামগণ একমত। পাশা জাতীয় জুয়া খেলা হারাম হওয়া সম্পর্কে ইমামগণ একমত হয়েছেন। কারণ রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি পাশা খেললো সে যেন নিজের হাতকে শূকরের গোশত ও রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে রঙিন করলো।’’ দাবা খেলা তো অধিকাংশ আলিমের মতে হারাম, তাতে কোন কিছু বন্ধক রাখা তথা আর্থিক হারজিতের বাধ্যবাধকতা থাক বা না থাক। তবে বন্ধক রাখা এবং হেরে যাওয়া খেলোয়াড়ের বন্ধক রাখা ও আর্থিক হারজিত যুক্ত না থাকলেও অধিকাংশ আলিমের মতে দাবা খেলা হারাম। কেবল ইমাম শাফেঈ একে হালাল মনে করেন শুধু এ শর্তে যে, তা ঘরোয়াভাবে খেলা হবে এবং নামায কাযা অথবা অন্য কোন ফরয ওয়াজিব বিনষ্ট হওয়ার কারণ হবে না। ইমাম নববী ইমাম শাফেঈর এই মতানুসারে ফতোয়া দিতেন। সেই সাথে তিনি পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের বিনিময়ে দাবা খেলাকে জুয়ার অন্তর্ভূক্ত বলে রায় দেন।
ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ব্যাখ্যা দেন যে, ‘আযলাম’ অর্থ দাবা খেলা। আলী (রা.) বলেন: ‘‘দাবা হলো অনারবদের জুয়া। আলী রা. একদিন দাবা খেলায় রত একদন লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: ‘‘তোমরা যা নিয়ে এরূপ ধ্যানে মগ্ন আছ তা কী? এগুলো স্পর্শ করার চেয়ে জ্বলন্ত আগুন স্পর্শ করাও ভালো। আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আলী (রা.) আলো বলেন: ‘‘দাবাড়–র ন্যায় মিথ্যাবাদী আর কেউ নেই। সে বলে আমি হত্যা করছি, অথচ সেহ হত্যা করেনি। সে বলে, ওটা মরেছে, অথচ কোন কিছুই মরেনি। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াহকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, দাবা খেলার ব্যাপারে আপনার কি আপত্তি আছে? তিনি বললেন: দাবা পুরোপুরি আপত্তিকর। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কারযী দাবা খেলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন: দাবা খেলার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, দাবাড়– কিয়ামাতের দিন বাতিলপন্থীদের সাথে একত্র হবে। “প্রাগুক্ত”। রসূল স. বলেন: ‘‘আল্লাহ প্রতিদিন তাঁর সৃষ্টির প্রতি ৩৬০ (তিনশো ষাট) বার রহমাতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। যে দাবা খেলে, সে এর একটি দৃষ্টিও পায় না।’’ (অসমাপ্ত)

উম্মাতের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
তৃতীয়ত : বিধানের ফলে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া সম্পর্কে সচেতন হওয়া অর্থাৎ সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পরে যাতে এর সাথে শরঈ কোন দলীলের বৈপরিতা সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া।
চতুর্থত : নস অথবা শব্দতত্ত্বের মধ্যে বৈপরিত্যের ক্ষেত্রে এর মধ্যে সমন্বয়, ধারাবাহিকতার পদ্ধতি অবগত হওয়া।
উসূলবিদগণের শর্তানুযায়ী যদি এসবের মধ্যে বৈপরিত্য থাকে তবে সেক্ষেত্রে করণীয়। ১. উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করা ২. সমন্বয় সম্ভব না হলে একটিকে অগ্রাধিকার দেয়া ৩. অগ্রাধিকার সম্ভব না হলে ইখতিয়ার প্রদান।
আলিমগণ একমত যে, সুস্থ বিবেক সহীহ বর্ণনামূলক দলীলের বিরোধী নয়। তারপরেও যদি সহীহ বর্ণনার সাথে আকলের সংঘাত হয় সেক্ষেত্রে বর্ণনাকেই গ্রহণ করতে হবে ও আকল পরিত্যাগ করতে হবে। ফিকহী কায়িদার মাধ্যমে বিধান নির্ণয়: ফিকহী কায়িদা মুজতাহিদ, গবেষক ফকীহ, মুফতী, বিচারক ও শাসকের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শরঈ ইলম। ফিক্হী কায়িদার সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে ফকীহগণ দুটি মতামতে বিভক্ত হয়েছেন। প্রথম মত অনুযায়ী এটি এমন এক সামগ্রিক বিষয় যা তার অধীনস্থ বিধান বা অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়, সামগ্রিক নয় যা অধিকাংশ শাখার বিধান নির্ণয়ের জন্য প্রয়োগ করা হয়।
দ্বিতীয় মত অনুযায়ী এটি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধান বা অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়, সামগ্রিক নয় বা অধিকাংশ শাখার বিধান নির্ণয়ের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ফিকহ ও উসূল মূলত একটি গাছের দুটি শাখা স্বরূপ। একজন ফকীহকে যেমন-উসূলে পারদর্শী হতে হয়, একইভাবে একজন উসূলবিদকে ফিকহে পারদর্শী হতে হয়। তবুও উভয়টি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে উভয় কায়িদার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। ইমাম কারাফী সর্বপ্রথম এ দুই শ্রেণীর কায়িদার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেন। তিনি তাঁর আল-ফুরুক গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, মুহাম্মদ (সা.) এর শরীয়ত উসূল ও ফুরু এ দু’টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে। আর এ উসূল দু’ভাগে বিভক্ত-
প্রথম: উসূলে ফিকহ যার মধ্যে বিশেষত আরবী শব্দতত্ত্বের ভিত্তিতে উদ্ভাবিত বিধান সমূহের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: সামগ্রিক ফিকহী কায়িদা, যার মধ্যে শরীয়াতের বিধান প্রবর্তনের গুঢ়রহস্য বর্ণিত হয়েছে। যার কোন কিছুই উসূলে ফিকহে বর্ণিত হয়নি। অতএব বলা যায়, ফিকহী কায়িদা এমন এক বিধান যার অধীনে ফিকহের অসংখ্য গৌণ বিষয় একত্র হয়। আর উসূলের কায়িদা মূলত এমন নীতিমালাকে বলা হয় যা একজন ফকীহকে শরঈ দলীল থেকে বিধান নির্ণয়ের পন্থা বাতলে দেয়।
ফিকহী জাবিত বলা হয় এমন এক সামগ্রিক বিধানকে যা ফিকহের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার উপর প্রয়োগ করা হয়। “কাহতানী, ড. মুফসির, মানহাজু ইসতিখরাজ, প্রগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৮৬। উপরিউক্ত সংজ্ঞা থেকেই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয় যে, কায়িদা বা মূলনীতি এমন এক সামগ্রিক বিষয় যা বিভিন্ন অধ্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন মাসআলার ওপর প্রয়োগ করা হয়। পক্ষান্তরে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অধ্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
উদাহরণ (উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে বিধান নির্ধারিত হয়) কায়িদাটি ফিকহের বিভিন্ন অধ্যায় যেমন- তাহারাত, সালাত, যাকাত, সাওম, নিকাহ, তালাক ইত্যাদি বিষয়ের উপর প্রয়োগ করা যায়। এমনকি ইমাম শাফিঈ থেকে বর্ণিত হয়েছে, এটি সত্তরটি অধ্যায় প্রবিষ্ট হয়। কিন্তু জাবিত শুধু একটি অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। যেমন-‘মৃতব্যক্তি ব্যতীত যার উপর গোসল ফরজ তার ওপর অযুও ফরয’ এটি শুধু তাহারাতের অধ্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করে।
যে কায়িদাটি প্রয়োগ করা হবে সে কায়িদা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শর্ত বাস্তবে থাকা। কষ্ট বা ক্লেশ বাস্তবেই বর্তমান থাকা। কষ্ট বা ক্লেশ স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া। উক্ত কষ্ট প্রদান শরীয়াত প্রণেতার উদ্দেশ্য না হওয়া। কায়িদাটি প্রয়োগ করলে যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু ছুটে না যায়।
কায়িদা সংশ্লিষ্ট বিধান তার চেয়ে শক্তিশালী দলীল বা কায়িদা বিরোধী না হওয়া। কিন্তু এটি মাছের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে না। কেননা মৃত মাছ খাওয়ার বৈধতার ব্যাপারে মহানবী (সা.) এ থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যে বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের জন্য কায়িদা প্রয়োগ করা হবে বিষয়ে কুরআন সুন্নাহ, ইজমার কোন নস বর্ণিত না থাকা। অন্যান্য কায়েদার ক্ষেত্রে একই ধরণের সতর্কতা নিতে হবে।
যে ব্যক্তিকে ওঈট তে খরভব ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ দিয়ে রাখা হয়েছে তার ব্যাপারে শরঈ বিধান কী হবে? এ সম্পর্কে যে ফিকহী কায়িদা প্রয়োগ করা যায় তাহল, “কৃত্রিম জীবন অস্তিত্বহীনের মত।” একজন রোযাদার এক দেশ থেকে সাহরী করে বিমান যোগে অন্য দেশে গেলেন যেখানে তার ইফতারের সময়ের ব্যবধান কয়েক ঘন্টা। তিনি কখন ইফতার করবেন? মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এর সমাধানে “বাহ্যিক অনুধাবনের ভিত্তিতে বিধান নির্ধারিত হয় অজ্ঞাত বাস্তবতা গ্রাহ্য নয়। এ ফিকহী কায়িদাটি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
তাখরীজ ফিকহীর সংজ্ঞা তাখরীজ ফিকহীর সংজ্ঞা বর্ণনায় ইবনে ফারহুন মালিকী বলেন, “নসভিত্তিক কোন মাসআলার বিধান থেকে (সাদৃশ্যপূর্ণ) মাসআলার বিধান নির্গমণ। শায়খ আলভী আসসাক্কাফ বলেন, মাযহাবের ফকীহগণ কর্তৃক কোন বিষয়ে তাদের ইমামের বর্ণিত বিধানের অনুরূপ বিধান অন্য বিষয়ের জন্য নির্ধারণ করাকে তাখরীজ ফিকহী বলা হয়। আহমদ ইবনে তাইমিয়া বলেন, “কোন মাসআলার বিধানকে তার অনুরূপ মাসআলার জন্য বহন করা এবং এ বিষয়ে উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান করা।” এককথায়, মাযহাবের ইমামগণের মতামত ও নীতিমালার আলোকে শরঈ প্রয়োগিক বিধান বা বিধানের নীতিমালা নির্ণয় করাকে ফিকহী তাখরীজ বলে।
কুরআন সুন্নাহ’র নস বর্তমান থাকা অবস্থায় ইমামগণের আলোকে বিধান নির্ণয় না করা। বিধান নির্ণয়কারীকে মাযহাবের নীতিমালা ও তার শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা থাকতে হবে। বিধান নির্ণয়কারীকে ব্যাপকার্থে উসূলে ফিকহ ও বিশেষভাবে কিয়াস বিষয়ে জ্ঞানবান হতে হবে। বিধান নির্ণয়কারীকে মাযহাবী উসূলের সাথে ফুরুয়ের সংযোগ স্থাপন ও উৎস অবগত হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে, যাকে উসূলবিদগণ স্বভাবজাত ফকীহ নামে অভিহিত করেছেন। উদ্ভূত বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতা ও ফিকহী শাখা-প্রশাখার পার্থক্য সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে। ইমামগণের মতামত যা আলিমগণের নিকট গ্রহণযোগ্য উৎসে বর্ণিত হয়েছে তার ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়। ফকীহগণ তাদের তাখরীজের ভিত্তিতে এর বিধান নির্ণয়ের ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। একদল গবেষক জুয়ার সাথে তুলনা করে ও গারাবের সাদৃশ্যতার কারণে একে হারাম বলেছেন। অন্যদিকে একদল একে তাবারুর সাথে তুলনা করে বা আকীলা চুক্তির ভিত্তিতে বৈধ বলেছে।
এ আধুনিক বিষয়টির বিধান বর্ণনা করতে যেয়ে বর্তমান যুগের আলিমগণ তাদের তাখরীজের ভিন্নতার কারণে মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ গ্রন্থকে উৎপন্নদ্রব্য (চৎড়ফঁপঃ) বিবেচনা করে গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত রাখা বৈধ বলেছেন। আবার কেউ কেউ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান একটি নির্দিষ্ট গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে যায় বিধায় গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ বৈধ নয় বলেছেন।
মাকাসিদে শরীআহ’র শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্য-এর ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়ন মাকাসিদে শরীআহ প্রাচীন ও আধুনিক উভয় যুগের আলিমগণের নিকট অতি পরিচিত একটি পরিভাষা। কিন্তু পূর্ববর্তী আলিমগণ এর কোন সংজ্ঞা প্রদান করেননি। এমনকি ইমাম শাতেবীও না, যিনি এ বিষয় সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। এক কথায় বান্দার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ বাস্তবায়নের জন্য শরীয়াত প্রণেতা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ ও বিশেষ যে উদ্দেশ্য গ্রহণ করেছেন তাকে বলা হয় মাকাসিদে শরীআহ। এ পরিভাষাটি বুঝানোর জন্য অন্যান্য কিছু শব্দও ব্যবহৃত হয়। যেমন- মাসলাহা, হিকমাহ, ইল্লাত ইত্যাদি।
যেসব কল্যাণ সংরক্ষণের জন্য ইসলামী আইন প্রণীত হয়েছে সে দৃষ্টিতে মাকাসিদে তিন প্রকার: ক. অত্যাবশ্যকীয়, খ. প্রয়োজনীয় (পরিপূরক), গ. উন্নতিবাচক। মর্যাদাগত দিক থেকে দুই প্রকার: ক. মৌলিক খ. সম্পূরক ইসলামী বিধান অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে তিন প্রকার: ক. সাধারণ উদ্দেশ্য (সামগ্রিক) খ. বিশেষ উদ্দেশ্য (অধ্যায় ভিত্তিক) গ. গৌণ উদ্দেশ্য (নির্দিষ্ট বিষয়)। মাকাসিদে শরীআহ’র ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে করণীয়- প্রথমত: মাকাসিদে শরীআহ’র পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন।
ইমাম শাতিবী শরঈ বিধান উদ্ভাবক বা মুজতাহিদের জন্য দু’টি শর্ত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি দু’টি বৈশিষ্ট্য অর্জন করবেন তিনি ইজতিহাদের যোগ্য হবেন। একটি হল, পূর্ণভাবে মাকাসিদে শরীআহ অনুধাবন এবং অন্যটি হল, উক্ত অনুধাবনের ভিত্তিতে বিধান উদ্ভাবন।
দ্বিতীয়ত: ইস্তিকরা অর্থাৎ শরীয়াতের নস, বিধিবিধান, কারণ (ইল্লাত) ইত্যাদি সম্পর্কে অনুসন্ধান। আদেশ- নিষেধের কারণ। কল্যাণ- অকল্যাণের বিশ্লেষণ।
তৃতীয়ত: মাকাসিদে শরীআহ’র চারটি শর্ত: ক. কল্যাণের বিষয় অকাট্য হবে। এ কারণে পালকপুত্র প্রথা ইসলাম রহিত করেছে। খ. প্রকাশ্যমান হবে। যেমন- বিবাহের উদ্দেশ্য বংশ রক্ষা করা। গ. দু’টি বিষয়কে সংযুক্ত করা হলেও উদ্দেশ্য একটি হতে হবে। যেমন- মদ হারাম হওয়া ও এর সাথে সাথে শাস্তি নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য একটিই তা হল, বুদ্ধির সংরক্ষণ। ঘ. ব্যাপক, সামগ্রিক ও শাশ্বত হওয়া।
চতুর্থত: এ কথা অনস্বীকার্য যে, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার কল্যাণেই শরীয়াত প্রবর্তন করেছেন। এই কল্যাণের কাজই হল শরীয়াতের উদ্দেশ্য সংরক্ষণ করা। ইমাম রাযী বলেন, কল্যাণ-অকল্যাণ বিবেচনায় মানুষের কর্মকান্ড ছয় ধরণের হয়ে থাকে- ১. যাতে শুধু কল্যাণ রয়েছে। অকল্যাণ বলতে কিছু নেই। এ কাজটি শরীয়াত সম্মত হওয়া নিশ্চিত। ২. যাতে কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়ই রয়েছে। তবে কল্যাণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এটিও শরীয়াত সম্মত হওয়া উচিত। কেননা সামান্য অকল্যাণের জন্য অনেক কল্যাণ পরিত্যাগ করা দূষণীয়। ৩. যাতে কল্যাণ- অকল্যাণ সমান। এটি একটি নিরর্থক কাজ। যা শরীয়াত সম্মত না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ৪. যাতে কল্যাণ- অকল্যাণ কোনটিই নেই। এটিও একটি নিরর্থক কাজ। অতএব তাও শরীয়াত সম্মত হতে পারে না। ৫. এককভাবে অকল্যাণ নিহিত। নিশ্চিতভাবে এটি শরীয়াত সম্মত হবে না। ৬. যাতে কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়ই রয়েছে তবে অকল্যাণই অগ্রগণ্য। এটিও শরীয়ত সম্মত না হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা অকল্যাণ দূরীভূত করা আবশ্যক।
১ম, কল্যাণ অত্যাবশ্যক হওয়া। ২য়, কল্যাণ সামগ্রিক হওয়া, গৌণ না হওয়া। ৩য়, কল্যাণ অকাট্য হওয়া, ধারণাপ্রসূত না হওয়া। ইমাম শাতেবী মাসালিহে মুরাসালাহর ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত প্রদান করেছেন-
১. কল্যাণ চিন্তা ও শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা। শরীয়াতের কোন মূলনীতি বা কোন দলীলের সাথে এটা সাংঘর্ষিক হবে না। ২. সত্তাগতভাবে বিষয়টি জ্ঞান-বিবেকসম্মত হওয়া। কোন জ্ঞানী ব্যক্তির সামনে যখন সেটা উপস্থাপিত হবে তখন সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি যেন তাকে সমর্থন করে। ৩. তা গ্রহণের ক্ষেত্রে শর্ত হল, এর দ্বারা যেন নিশ্চিত কোন সংকটের অবসান হয় এবং যদি এটা গ্রহণ করা না হয় তবে মানুষের চরম সংকটের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
পঞ্চমত: মাকাসিদ সংক্রান্ত কায়িদার মূলনীতি ও প্রয়োগ আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের ও অন্যান্য উসূলে ফিকহের গ্রন্থসমূহে মাকাসিদ সংক্রান্ত বিভিন্ন ফিকহী কায়িদা উল্লেখ করা হয়েছে। মাকাসিদের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ে আগ্রহী গবেষককে যার প্রতি দৃষ্টি প্রদান করা একান্ত কর্তব্য।
ইসলাম একটি গতিশীল জীবনব্যবস্থা। মানুষের জীবনের নতুন নতুন বিষয়ে ইসলামী বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি তাই এ ব্যবস্থায় বিদ্যমান। মহানবী (সা.) এর সময়ে মহান আল্লাহর কুরআন অবতীর্ণের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিধান জানিয়ে দিতেন অথবা রাসূল (সা.) নিজ ইজতিহাদের মাধ্যমে তার সমাধান করতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। বর্তমান সময়ে রিসালাতের ধারা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপরোক্ত পদ্ধতিগুলোর অবর্তমানে কীভাবে সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয় করা যায়।
উপরোক্ত তথ্য-উপাত্তের মূল্যায়ন করে আমরা নিম্নোক্ত ফলাফল অর্জন করতে পারি- যুগ পরিক্রমায় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ইসলামের গতিশীলতা স্থবির হয় না। যেসব নতুন নতুন আবিষ্কার বা সমস্যার কোন ইসলামী সমাধান নেই তাকে আমরা সাম্প্রতিক বিষয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। ইসলামের গতিশীল প্রমাণ, মুসলমানদের সমস্যা দূরীকরণ, ইজতিহাদের ধারা চলমান রাখাসহ বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের গবেষণা করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একজন গবেষককে গবেষণার পূর্বে বিষয়টি অনুধাবন ও এ সংশ্লিষ্ট খুঁটিনাটি বিষয় এবং জীবনের সাথে এর ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে ভালভাবে অবগত হতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণার সময়ে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। শরীআহ অভিযোজন মানুষের নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা এর মাধ্যমে মানুষের জন্য অকল্যাণকর নয় এমন বিষয়কে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়। আধুনিক সমস্যার সমাধানের সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি শরঈ দলীল। এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দেয়া হলে অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করার প্রয়োজন হয় না। শরঈ দলীলের ভিত্তিতে আধুনিক বিষয়ের সমাধান না হলে দ্বিতীয়ত আমাদেরকে দৃষ্টি দিতে হবে ফিকহী কায়িদার উপর। ফিকহী কায়িদা মূলত শরঈ দলীল থেকে ফিকহবিদগণের গবেষনালব্ধ নীতিমালা, যা প্রত্যেক যুগের আলিমগণ প্রয়োগ করেছেন। শরঈ দলীল ও ফিকহী কায়িদার অবর্তমানে আধুনিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের জন্য আমাদেরকে মাযহাবের নীতিমালার আশ্রয় নিতে হবে। মাযহাবের ইমামগণের গবেষণালব্ধ বিধানের সাদৃশ্য বিধান সমজাতীয় বিষয়ের উপর প্রয়োগ করা যেতে পারে। সর্বশেষ আমরা মাকাসিদে শরীআহ’র মাধ্যমে বিধান নির্ণয়ের পন্থা অবলম্বন করতে পারি। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই মাকাসিদ সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে গবেষকের পূর্ণ দক্ষতা থাকতে হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট। (সমাপ্ত)

হতাশা নয়, মহাক্ষমাশীল আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখুন

মাওলানা জাফর আহমাদ

আল গাফফার- অতিশয় ক্ষমাশীল, ক্ষমাকারী। আল গাফুর- মহাক্ষমাশীল। শব্দ দু’টির মূল একই। গাফফার শব্দটি আরবি ভাষায় আধিক্য বোধক শব্দ।
আরবি সাহিত্যে এমন শব্দের বহুল ব্যবহার রয়েছে। যেমন আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘অতপর আমি (নুহ) তাদেরকে উচ্চকণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছি। তারপর প্রকাশ্যে তাদের কাছে তাবলিগ করেছি এবং গোপনে চুপে চুপে বুঝিয়েছি। আমি বলেছি তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি গাফফার বা অতিশয় ক্ষমাশীল।’ –সূরা নুহ: ৯-১০
আল্লাহতায়ালা যে ক্ষমাশীল ও করুণাময় এমন কথা কোরআনে কারিমের অনেক আয়াতে নানাভাবে নানা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ওইসব স্থানে বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা অতিশয় ক্ষমাশীল ও মহা ক্ষমাকারী। বান্দা বার বার ভুল করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, আল্লাহতায়ালা মাফ করে দেন। কারণ আল্লাহতায়ালা বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী লোকদের বলে দাও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়।’ –সূরা আলে ইমরান: ৩১
অর্থাৎ যদি তারা আল্লাহর রাসূলের কর্মনীতিকে ভালোবেসে তা গ্রহণ করে তবে তাদের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। কারণ আল্লাহতায়ালা বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়। আল্লাহ এমনই করুণাময় গাফফার যে, চরম অপরাধের পর ফিরে এলে তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।
যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ঈমানের নিয়ামত একবার লাভ করার পর পুনরায় যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে, তাদের আল্লাহ হেদায়েত দান করবেন- এটা কেমন করে সম্ভব হতে পারে? অথচ তারা নিজেরা সাক্ষ্য দিয়েছে যে, রাসূল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তার কাছে উজ্জ্বল নিদর্শন এসেছে। আল্লাহ জালেমদের হেদায়েত দান করেন না। তাদের ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সব মানুষের অভিশাপ, এটিই হচ্ছে তাদের জুলুমের সঠিক প্রতিদান। এই অবস্থায় তারা চিরদিন থাকবে। তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না এবং তাদের কোনো বিরামও দেওয়া হবে না। তবে যারা তওবা করে নিজেদের কর্মনীতির সংশোধন করে নেয় তারা এর হাত থেকে রেহাই পাবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়। কিন্তু যারা ঈমান আনার পর আবার কুফরি অবলম্বন করে তার নিজেদের কুফরির মধ্যে এগিয়ে যেতে থাকে, তাদের তওবা কবুল হবে না। এ ধরনের লোকেরা পথভ্রষ্ট।’ -সূরা আলে ইমরান: ৮৬-৯০
কোরআনে কারিমের অন্যত্র আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘হা-মীম এ কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত যিনি মহাপরাক্রমশালী, সবকিছু সম্পর্কে অতিশয় জ্ঞাত, গোনাহ মাফকারী, তওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা এবং অত্যন্ত দয়ালু। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সবাইকে তার দিকে ফিরে যেতে হবে।’ -সূরা মুমিন: ১-২
এখানে লক্ষণীয় যে, আয়াতে ক্রমানুসারে আল্লাহতায়ালার কতগুলো গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দু’টি গুণের পর ‘আল্লাহ গোনাহ মাফকারী ও তওবা কবুলকারী’ গুণটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে- যারা এখন পর্যন্ত বিদ্রোহ করে চলেছে তারা যেন নিরাশ না হয় বরং একথা ভেবে নিজেদের আচরণ পুনর্বিবেচনা করে যে, এখনও যদি তারা এ আচরণ থেকে বিরত হয় তাহলে আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে। আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে। তারা নামাজ কায়েম করে এবং যা কিছু আমি তাদের দিয়েছি তা থেকে খরচ করে। এ ধরনের লোকেরাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বিরাট মর্যাদা, ক্ষমা ও উত্তম রিজিক।’ -সূরা আনফাল: ২-৪
আল্লাহতায়ালা অতিশয় ক্ষমাশীল, মহাক্ষমাশীল। বান্দা জেনে অথবা না জেনে যত বড় অপরাধই করুক না কেন আল্লাহ গাফুরুর রাহিমের কাছে ফিরে এলে তিনি ক্ষমা করে দেন। তিনি বান্দাদের ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে দেখেন। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই হতাশায় নিমজ্জিত নয়, সর্বাবস্থায় ভরসা রাখতে হবে আল্লাহ গাফুরুর রাহিমের ওপর। তিনিই আমাদের শেষ আশ্রয়, তার দরবারই আমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা।

ইসলামের চোখে নারীর অর্থ উপার্জন

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

অর্থ ছাড়া মানবজীবন চলতে পারে না। মানবজীবনে অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা, মানুষের মৌলিক অধিকার। এগুলোর যোগান দিতে মানুষকে অর্থ উপার্জনের পন্থা বেছে নিতে হয়। অর্থ উপার্জন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ স্বাভাবিক ভাবে দু-ধরণের পেশা অবলম্বন করে থাকেন। চাকরি বা ব্যবসায় । তবে সেই চাকরি ও ব্যবসাও হতে হবে বৈধ। আর এদুটোই হচ্ছে অর্থ উপার্জনের বৈধ পন্থা। অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছাড়া কারো পক্ষেই এসব মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয় । অর্থনীতি মানবজীবনের জীবিকানির্বাহের অন্যতম চালিকা শক্তি। তাই আল্লাহ তা‘আলা ফরয ইবাদত সমাপনান্তে জীবিকা নির্বাহে উপার্জন করার লক্ষ্যে যমিনে বিচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, অর্থাৎ ‘‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সুরা: জুমুআ ১০)
ইসলাম সর্বদা নারীদের শালীন পরিবেশে শিক্ষা, কাজ ও চলাফেরার কথা বলে। শরিয়ত নির্ধারিত গণ্ডির মধ্যে থেকে নারীরা অবশ্যই শিক্ষা অর্জনসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ইসলাম কোথাও নারীকে বন্দি করে রাখার কথা বলেনি। ইসলাম নারী শিক্ষার প্রতি যেমন গুরুত্বারোপ করেছে তেমনি নারী-পুরুষের ভোটাধিকারেও কোনো ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি করেনি। এমনকি ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকারও প্রদান করেছে। কোরআনে কারিমের সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি ব্যবসাকে হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি।’ এই আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়া এবং সুদ হারাম হওয়া নারী-পুরুষের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যেসব ব্যবসা করতে পারবে। নারীও সে ধরনের ব্যবসা করতে পারবে। সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত হোক। সে তার অর্জিত সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। সে কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই তার সম্পত্তির ব্যাপারে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, যা একজন পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। কোরআন ও হাদিসের কোনো স্থানে নারীর কাজকর্মের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ আরোপিত হয়নি। শুধু দু’টি বিষয়ের প্রতি সঙ্গত কারণে নির্দেশ দিয়েছে। শর্ত দু’টি হলো প্রথমত, ব্যবসা হতে হবে হালাল পদ্ধতিতে ও শরিয়ত নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে। দ্বিতীয়ত, পর্দা রক্ষা করতে হবে। তাছাড়া ইসলাম নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী কোনো পেশায় নিয়োজিত হতেও নিষেধ করেছে। বর্তমান যুগ অর্থনৈতিক যুগ, অর্থের প্রয়োজন আজ যেন পূর্বাপেক্ষা অনেক গুণ বেশি বেড়ে গেছে। অর্থ ছাড়া এ যুগের জীবন ধারণ তো দূরের কথা শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণও যেন সম্ভব নয় এমনি এক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে জীবন ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে। তাই পরিবারের একজন লোকের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা, এক ব্যক্তির উপার্জনে গোটা পরিবারের সব রকমের প্রয়োজন পূরণ করা আজ যেন সুদূরপরাহত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের লোকদের মনোভাব এমনি। তারা মনে করে, জীবন বড় কঠিন, সংকটময়, সমস্যা সংকুল। তাই একজন পুরুষের উপার্জনের উপর নির্ভর না করে ঘরের মেয়েদের-স্ত্রীদের উচিত অর্থোপার্জনের জন্য বাইরে বেরিয়ে পড়া। এতে করে একদিকে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে স্বামীর সাথে সহযোগিতা করা হবে, জীবন যাত্রার মান উন্নত হবে। অন্যথায় বেচারা স্বামীর একার পক্ষে সংসার সুষ্ঠভাবে চালিয়ে নেয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না। আর অন্যদিকে নারীরাও কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের কর্মক্ষমতার বিকাশ সাধনের সুযোগ পাবে। এ হচ্ছে আধুনিক সমাজের মনস্তত্ত্ব। এর আবেদন যে খুবই তীব্র আকর্ষণীয় ও অপ্রত্যাখ্যানীয়, তাতে সন্দেহ নেই। এরই ফলে আজ দেখা যাচ্ছে, দলে দলে মেয়েরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। অফিসে, ব্যবসাকেন্দ্রে, হাসপাতালে, উড়োজাহাজে, রেড়িও, টিভি স্টেশনে- সর্বত্রই আজ নারীদের প্রচন্ড ভীড়। এ সম্পর্কে দুটো প্রশ্ন অত্যন্ত মৌলিক, একটি পারিবারিক-সামাজিক ও নৈতিক আর দ্বিতীয়টি নিতান্তই অর্থনৈতিক। নারী সমাজ আজ যে ঘর ছেড়ে অর্থোপার্জন কেন্দ্রসমূহে ভীড় জমাচ্ছে, তার বাস্তব ফলটা যে কী হচ্ছে তা আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। পরিবারের মেয়েরা নিজেদের শিশু সন্তানকে ঘরে রেখে দিয়ে কিংবা চাকর-চাকরানীর হাতে সঁপে দিয়ে অফিসে, বিপণীতে উপস্থিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে দিন রাতের প্রায় সময়ই শিশু সন্তানরা মায়ের স্নেহ বঞ্চিত থাকতে বাধ্য হচ্ছে। আর তারা প্রকৃতপক্ষে লালিত পালিত হচ্ছে, চাকর চাকরানীর হতে। ধাত্রী আর চাকর চাকরানীরা যে সন্তানের মা নয়, মায়ের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করাও তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়- এ কথা যুক্তি দিয়ে বোঝাবার প্রয়োজন পড়ে না অথচ ছোট ছোট মানব শিশুদের পক্ষে মানুষ হিসেবে লালিত-পালিত হওয়ার সবচাইতে বেশি প্রয়োজনীয় হচ্ছে মায়ের স্নেহ-দরদ ও বাৎসল্যপূর্ণ ক্রোড়। অপরদিকে স্বামী ও উপার্জনের জন্য বের হয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছে স্ত্রীও। স্বামী এক অফিসে, স্ত্রী অপর অফিসে, স্বামী এক কারখানা, স্ত্রী অপর কারখানায়। স্বামী এক দোকানে, স্ত্রী অপর এক দোকানে। স্বামী এক জায়গায় ভিন মেয়েদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে কাজ করছে, আর স্ত্রী অপর এক স্থানে ভিন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে রুজী- রোজগারে ব্যস্ত হয়ে আছে। জীবনে একটি বৃহত্তম ক্ষেত্রে স্বামী আর স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের বন্ধনে ফাটল ধরা ছেদ আসা যে অতি স্বাভাবিক তা বলে বোঝাবার অপেক্ষা রাখে না। এতে করে না স্বামীত্ব রক্ষা পায়, না থাকে স্ত্রীর বিশ্বস্ততা। উভয়ই অর্থনৈতিক প্রয়োজনের দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মনির্ভরশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজস্ব পদও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আত্মচিন্তায় মশগুল। প্রত্যেকেরই মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভাবধারায় চালিত ও প্রতিফলিত হতে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। অত:পর বাকী থাকে শুধু যৌন মিলনের প্রয়োজন পূরণ করার কাজটুকু। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভের পর এ সাধারণ কাজে পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া কতটুকু সম্ভব- বিশেষত বাইরে যখন সুযোগ সুবিধার কোন অভাব নেই। বস্তুত এরূপ অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আকর্ষণ ক্ষীণ হয়ে আসতে বাধ্য। অত:পর এমন অবস্থা দেখা দেবে, যখন পরিচয়ের ক্ষেত্রে তারা পরস্পর স্বামী- স্ত্রী হলেও কার্যত তারা এক ঘরে রাত্রি যাপনকারী দুই নারী পুরুষ মাত্র। আর শেষ পর্যন্ত চুড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তাদের ক্ষেত্রে বিচিত্র কিছু নয়। পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা, সম্প্রীতি, নির্লিপ্ততা, গভীর প্রেম- ভালোবাসা শূন্য হয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে অর্থোপার্জনের যন্ত্র বিশেষে পরিণত হয়ে পড়ে। এ ধরণের জীবন যাপনের এ এক অতি স্বাভাবিক পরণতি ছাড়া আর কিছু নয়।
স্ত্রীর ঘাড়ে অর্থ উপার্জনের বোঝা চালানো: ইসলাম নারীর উপর অর্থনৈতিক কোন দায়-দায়িত্ব চাপায়নি। পরিবারের আর্থিক দায়-দায়িত্ব বহন করা পুরুষের উপর  অর্পিত হয়েছে। সেহেতু নারীকে তার জীবিকার জন্য চাকরি করার প্রয়োজন নেই। তবে পুরুষের উপার্জন যদি সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট না হয় এবং প্রকৃত অভাবের সময়, সংকট কালে উভয়েই চাকরি করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে এমন অবস্থায়ও নারীর স্বাধীনতা রয়েছে। ইচ্ছা করলে সে বাইরে চাকরি করতে পারে, ইচ্ছা করলে নাও করতে পারে। কেউ জোর করে তার ঘাড়ে চাকরির বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে না। চাকরি না করে পুরুষের উপার্জন ভোগ করা তার অধিকার। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তার ঘাড়ে উপার্জনের বোঝা চাপিয়ে দেয়া অন্যায়, জুলুম। নারীর চাকরি করার অধিকার অবশ্যই আছে। ইসলাম নারীকে বাইরে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। কারণ, ইসলাম  বাস্তব ও প্রাকৃতিক ধর্ম । এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত, এর আয়তন অতি ব্যাপক। তা মানবীয় প্রয়োজনেও জীবনের সর্বাবস্থায় সাড়া দেয়। অনেক মহিলাকে বাইরে কাজ করতে হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতি তাদেরকে বাইরে কাজ করতে বাধ্য করে।যেমন করে বাপ মারা গেলে মাকে চাকরি করতে হয়, চাকরি করে এতিম ছেলে -মেয়েদের মুখে দু, মুঠো ভাত তুলে দিতে হয়। কোন গরীব যুবতীর বিয়ে শাদী না হলে তাকে চাকরি করে জীবন বাঁচাতে হয়। কিন্তু যাদের সংসার সচ্ছল ,স্বামী বা ভাই চাকরি করে, তাদের সংসারেই প্রচুর কাজ রয়ে গেছে। তাদের বাইরে কাজ করার সময় ও সুযোগ কোথায়? যাদের পুরুষরা সারাদিন বাইরে কাজ করে জীবিকা উপার্জন করে, তাদের জন্য বাড়িতে একটা শান্তি পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ ,একটা আরামদায়ক প্রতিবেশ সরবরাহ করা নারীর দায়িত্ব।ইসলামের অসাধারণ সৌন্দর্যগুলোর মধ্যে একটা সৌন্দর্য এই যে, পুরুষকে উপার্জন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নারীর ভরণ-পোষণের কাজে নিয়োজিত রেখে নারী জাতিকে এ সকল দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। আর নারীর উপর পুরুষের জন্য শান্তিপূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করা, গর্ভে সন্তান ধারণ করা, সন্তান জন্ম দেয়া, তাদের লালন -পালন করা, শিক্ষা- দিক্ষা দিয়ে আদর্শ নাগরিক রূপে গড়ে তোলা ইত্যাদির এক লম্বা ধারাবাহিক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারীর প্রধান কাজ ও প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে স্ত্রী ধর্ম ও মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করা। এ গুরু দায়িত্বের উপর যদি তার উপর নিজের ভরণ -পোষণের জন্য এবং ছেলে-মেয়েদের উপার্জনের প্রচন্ড কষ্ট-ক্লেশের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়, তবে সেটা হবে নারীর প্রতি অন্যায় -অবিচার।  তাই নবী (সা.) বলেছেন, স্বামীর খেদমত করা, সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা, মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করা: যেমন, সন্তান গর্ভে ধারণ করা, তাদের সুশিক্ষা দান করা, তাদের চরিত্র গঠন করা ও ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতি সাধন করা ইত্যাদি জন্য  নারী জাতিকে উৎসাহিত করেছেন। তাছাড়া ঘর গুছানো, ঘর সাজানো , রান্না- বান্না করা, কাপড় সেলাই করা ইত্যাদি গৃহস্থালী কাজের এত ব্যাপক দায়িত্ব প্রকৃতগতভাবেই নারী জাতির উপর ন্যস্ত করে দেয়া হয়েছে। যা হোক,ইসলামে নারী জাতির মূল্য, সমাজে তাদের গুরুত্ব ও মানুষ হিসেবে তাদের কৃতকার্যতার পরিমাণ নির্ণয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে। আর তা হলো, খোদাভীতি ও তার আনুগত্য স্বীকার করা, স্বামীর প্রতি তার কর্তব্য পালন করা, সন্তান গর্ভে ধারণ করা, তাদের লালন- পালন ও শিক্ষা -দীক্ষা দেয়ার যে সকল দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়েছে, সে সকল পূর্ণ করার উপর।

উম্মাতের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
পবিত্র কুরআন সাধারণত সাম্প্রতিক অবস্থার বিশ্লেষণ, মুসলমানদের করণীয় বা তৎসংশ্লিষ্ট বিধান নিয়ে অবতীর্ণ হতো, যাকে উক্ত অংশ অবতরণের কারণ বা ‘শানে নুযুল’ বলা হয়। অতএব কুরআন অবতরণের সময়কালে উদ্ভূত যে কোন পরিস্থিতির বিধান সরাসরি কুরআন থেকে পাওয়া যেত। যাকে রাসূল (সা.) এর বাণীমূলক, কর্মসূচক ও মৌনসম্মতিমূলক সুন্নাহ বলা হয়। সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদানের ক্ষেত্রে ওহী গায়র মাতলুর যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করা হত তার মধ্যে রয়েছে-
রাসূল (সা.) কুরআনের ব্যাখ্যা করতেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন: ‘আপনার প্রতি আমি স্মরণিকা অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐসব বিষয় ব্যাখ্যা করেন, যেগুলো তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। এ কারণে মহানবী (সা.) কুরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করতেন, এর বিধান বাস্তবায়ন করতেন, এর আলোকে বিভিন্ন বিধান প্রয়োগ করতেন। এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে কোন কোন বিধান রহিত করতেন। উদ্ভূত বিষয়ের বিধান তিনি নিজেই প্রদান করতেন। বিশেষত যেসব বিষয়ের কোন বিধান কুরআনে আসেনি। রাসূল (সা.) এর ঘোষিত বিধানের মধ্যে রয়েছে দাদীর উত্তারধিকার, যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা, বিতরের সালাত ইত্যাদি।
উদ্ভূত বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের জন্য মহানবী (সা.) সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করতেন। যেমন- বদরের যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে তিনি এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদানে সাহাবীগণের পদ্ধতি মহানবী (সা.) এর ইন্তেকালের পর সাহাবীগণ সাম্প্রতিক বিষয়ের সিদ্ধান্তদানের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ’র পাশাপাশি আরো কিছু নতুন পদ্ধতি যুক্ত করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিটি মহানবী (সা.) এর ইন্তেকালের পরপরই প্রয়োগ শুরু হয়। যার মাধ্যমে আবু বকর (রা.) কে খলিফা নির্বাচন করা হয়। এ পদ্ধতির আলোকে সাহাবীগণ যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিধান নির্ণয় করেছিলেন তার মধ্যে রয়েছে- ১. আবু বকর (রা.) কে খলীফা নির্বাচন। ২. কুরআন সংকলনের অপরিহার্যতা। ৩. যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ৪. মদ্যপের শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাত নির্ধারণ।
সাহাবীগণের যুগে এ পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। এমনকি সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি ছিল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের বিধানের আলোকে নতুন বিষয়ের বিধান উদ্ভাবন করা। বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবীগণের কৃত কিয়াসের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে যেয়ে অনেক উলূসবিদ তাদের গ্রন্থে এ সংক্রান্ত পৃথক অধ্যায়ের অবতারণা করেছেন। সাহাবীগণের অভিমত: সাহাবীগণ বিশেষত উমর (রা.) অন্য সাহাবীগণের বাণীর ভিত্তিতে অনেক নতুন বিষয়ের সমাধান দিতেন। বর্ণিত আছে, তাঁর সামনে নতুন কোন বিষয় উপস্থাপিত হলে তিনি আগে দেখতেন এর বিধান কুরআন ও সুন্নাহর রয়েছে কিনা। যদি না থাকত তবে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, আবু বকর কি এ জাতীয় কোন বিষয় ফয়সালা করেছিলেন? যদি আবু বকর রা. কৃত এমন কোন ফয়সালা থাকত তবে তিনি তার অনুসরণ করতেন। এছাড়াও অনেক সাহাবীর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ বর্ণনা রয়েছে যে, তাঁরা বড় বড় সাহাবীর মতামত অনুকরণ করে ফয়সালা করতেন। এ যুগে কিয়াসের মাধ্যমে নতুন বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দু’টি নতুন বিষয়কে বিবেচনায় আনা হয়েছিল। আর তা হল, মাসালিহ মুরাসালাহ “মাসালিহ মুরাসালা’’ বলা হয়, শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যের অনুরূপ কার্য স¤পাদন যা গৃহীত বা বাতিলকৃত হওয়ার ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট বিধান পাওয়া যায় না। সাদ্দুজ জারাঈ “যেসব উপায়-উপকরণ ক্ষতিকর ও শান্তিবিঘœকারী নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনে প্রলুদ্ধ করে সেসব কর্মের পথ রূদ্ধ করার নাম সাদ্দুজ জারাঈ।
সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দানের ক্ষেত্রে তাবিঈগণের যুগে নতুন কোন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়নি। বরং তারা সাহাবীগণের পদ্ধতিই অনুসরণ করতেন। তবে এ যুগে ইজতিহাদ ও কিয়াসের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যুক্তি দর্শন ভিত্তিক এ পদ্ধতির গোড়াপত্তন মূলত ইবরাহীম নাখয়ীর হাতে হয়, যিনি আলকামা নাখয়ীর ছাত্র ছিলেন। আর আলকামা নাখয়ী সরাসরি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে ফিকহ শিক্ষা করেন। সাহাবীগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. অধিক হারে রায় ও কিয়াস প্রয়োগের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ সময়কালে যুক্তি ও দর্শন নির্ভর এ পদ্ধতি উদ্ভাবের কারণ এ সময়ে ইসলামী সম্রাজ্য সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণের ফলে অধিক হারে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হয় যার কোন সমাধান সরাসরি কুরআন, সুন্নাহ বা পূর্বের আইনী উৎসে বিদ্যমান ছিলনা। এ সময়ে ইরাক ছিল সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। এ কারণেই ইসলামী বিধান নির্ণয়ের এ পদ্ধতিটিও এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল।
তাবিঈগণের পরবর্তী যুগ অর্থাৎ তাবে-তাবিঈগণের যুগে এ বিষয়ক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সোনালী অধ্যায় রচিত হয়। এই যুগেই প্রধান চার মাযহাবের প্রকাশ ও তাদের ফিকহ সংকলন সম্পন্ন হয়। ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল বর্তমান সময়ে এসে তাকে আমরা নিম্নোক্ত চারটি পদ্ধতি সীমাবদ্ধ করতে পারি:
শরঈ দলীল অর্থাৎ ইসলামী আইনের উৎস কয়টি সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম তুফী তার রিসালাহ ফী রিআতুল মাসলাহা’ গ্রন্থে ইসলামী আইনের ১৯টি উৎসের বর্ণনা দিয়েছেন। উক্ত গ্রন্থের ভাষ্যকার ড. আহমদ আব্দুর রহীম সায়েঈ এছাড়া আরও ২৬টিসহ মোট ৪৫টি উৎ সের উল্লেখ করেছেন। ফকীহগণ শরীয়াতের দলীলসমূহ দু’ভাগে ভাগ করেছেন-
প্রথম ভাগ: যেসব উৎসের ব্যাপারে আলিমগণ একমত হয়েছেন। এর মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহ, ব্যাপারে সকলেই একমত। জমহুর ফকীহগণ ইজমা ও কিয়াস শরীয়াতের উৎস হওয়ার ব্যাপারে একমত। মুতাযিলা মতাদর্শী নাজ্জাম ও খারিজীগণ ইজমা এবং জাফিরিয়্যাহ ও জাহিরিয়্যাহ সম্প্রদায় কিয়াসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
দ্বিতীয় ভাগ: যেসব দলীলের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, ইমাম কারাফী তার সংখ্যা বলেছেন ১৫। ড. আবদুর রহীম সায়েঈ এর বর্ণনা অনুযায়ী ৪১। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা ও ফকীহগণের মতামতের ভিত্তিতে এর সংখ্যা দাড়ায় ৮।
ইস্তিহসান, ইস্তিসহাব, মাসালিহ, উরফ, াদ্দুজ জারাঈ, সাহাবীগণের ফাতওয়া, মদীনাবাসীর কর্মকান্ড ও পূর্ববর্তী শরীয়াত। রঈ দলীলের ভিত্তিতে বিধান নির্ণয়ের নীতিমালা শরঈ দলীলের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ নীতিমালা রয়েছে, যা অনুসরণ করা জরুরী।
প্রথম: নস অনুধাবনের ক্ষেত্রে শব্দের দালালাত বা শব্দার্থতত্ত্বকে গুরুত্ব দেয়া নসে বর্ণিত শব্দের প্রকৃত অর্থ জ্ঞাত হওয়া ব্যতীত গবেষক কোনক্রমেই তা থেকে বিধান উদ্ভাবন করতে পারবেন না। এ কারণে ইমাম গাযালী শব্দার্থ তত্ত্বকে উসূলে ফিকহের মূলস্তম্ভ গণ্য করেছেন। একই কারণে আধুনিক অনেক উসূলবিদ দালালাত তথা শব্দার্থতত্ত্ব অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন “দলীল থেকে বিধান উদ্ভাবনের পদ্ধতি বা নীতি’’।
দ্বিতীয়ত: নসকে খারাপ উদ্দেশ্যে ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তার প্রকাশ্য রূপ থেকে বের না করা বাতিনী সম্প্রদায় যেমনটি করে থাকে। আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম বলেন, মুফতি মুজতাহিদ বা গবেষক কুরআনের আয়াতের অথবা রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ’র ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তার উচিত নয় যে, নিজের কুপ্রবৃত্তির চাহিদার্থে বিকৃত এমন কারে তবে তার ফাতওয়া বা ইসলামী বিধানের ভাষ্য দেয়ার অধিকার রহিত হবে এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে। (অসমাপ্ত)

শানে রিসালাতের তাৎপর্য

মো. শামসুল ইসলাম সাদিক
 
সর্বযুগের, সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম প্রিয়ারা নবীকে (সা.) সমগ্র নবী রাসূলের মুজেযাসহ অসংখ্যগুণ বৈশিষ্ট্য ও মুজেযা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা এই ধরাধামে প্রেরণ করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ হযরত নুহ (আ.) এর শুকরিয়া, হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নাত, হযরত মুসা (আ.) এর এখলাছ, হযরত ইসমাঈল (আ.) এর সত্যবাদিতা, হযরত ইয়াকুব ও আইয়ূব (আ.) এর ছবর, হযরত ঈসা (আ.) এর ন¤্রতাসহ সকল প্রকার গুণবৈশিষ্ট্য একত্রিতভাবে রাসূলে পাক (সা.) কে প্রদান করা হয়েছিল।
রাসূলে পাক (সা.) এর শান এতো উচ্চ মাকামে ছিল যা পৃথিবী ও আসমান জমিন এর তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাঁর শানে রিসালাত বর্ণনা এমনকি তদপেক্ষা অধিক মহান মুজেযা ও শ্রেষ্ঠতম ফজিলত আল্লাহপাক দান করে ছিলেন যা বর্ণনাতীত।
৬ষ্ঠ হিজরি সনে ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। সেই সন্ধিনামায় তারা আপত্তি করলো সন্ধিনামায় রাসূল (সা.) এর নামের সাথে ‘রাসূল’ শব্দ যোগ করা যাবে না। তা সন্ধিনামা হতে মুছে ফেলতে হবে, অন্যথায় তারা এই চুক্তিতে অংশ গ্রহণ করবে না। এমতাবস্থায় রাসূলে পাক (সা.) শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি হযরত আলী (রা.) কে নির্দেশ দিলেন, হে আলী তুমি চুক্তিনামা হতে ‘রাসূল’ শব্দটা মুছে দাও। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল (সা.) এর শান-মান ও রিসালাতকে উচ্চ মাকামে উত্তীর্ণ করেছেন, স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয়ারা রাসূল (সা.)’র যে যশগান গেয়েছেন, সেই রিসালাতের শান ও মান মর্যাদার উপর কতিপয় কাফির মুশরিকের আপত্তির মুখে রিসালাতের ‘রাসূল’ শব্দটা হযরত আলী (রা.) পক্ষে মূছে ফেলা সম্ভব ছিল না। একদিকে নবী (সা.) এর নির্দেশ, অপর দিকে নিজ ঈমানী অপারগতা। রাসূল (সা.) এর নির্দেশ মাননীয় ও কাফিরদের আপত্তির মুখে তিনি তা পালন করেন শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের জন্য। প্রিয়ারা নবী রাসূলে পাক (সা.) তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য্য ও মহানুভবতার খাতিরে রাসূল শব্দ মুছে ফেলতে রাজি হলেও, কোনো আশিকে রাসূলের পক্ষে রাসূলে পাক (সা.) এর শান মান ও রিসালাতের ন্যূনতম মর্যাদাহানি অথবা অবমাননায় আপস করা কখনো সম্ভব হতে পারে না।
রিসালতের দাওয়াতকে সর্বজনীন ও সূদুর প্রসারী করার লক্ষ্যে স্বয়ং রাসূলে পাক (সা.) যে হিকমতের সূক্ষ্ম ও সুচিন্তিত ধারায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা বাহ্যিক ছাড় দিলেও দিতে পারেন, যা আল্লাহ তায়ালার একান্ত মহা কৌশল হয়ে থাকে। তাই বলে কোনো মুমিনের পক্ষে বিবেক, যুক্তির দৃষ্টি কোন থেকে রিসালাতের অবমাননায় সায় দিতে পারে না।
হযরত আলী (রা.) আরজ জানালেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমায় ক্ষমা করুন, আমার পক্ষে এরূপ কাজ কোনোদিন সম্ভব নয়। আপনার পবিত্র শান ও মানের উপর কখন কলম উঠাতে পারি না। রাসূলে পাক (সা.) হলেন বিশ্ববাসীর জন্য রহমত এবং আমাদের আদর্শ হিসাবে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন তাই তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমস্ত সাহাবা-ই-কেরামের একান্ত ইচ্ছার বিরুদ্ধে গুটিকয়েক কাফিরের আব্দারে সায় দিয়ে রাসূলে পাক (সা.) চুক্তিনামা থেকে ‘রাসূল’ শব্দ নিজ হস্তে মুছে দিলেন।
রাসূল (সা.) এর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সাহাবা-ই-কেরামের পক্ষে রিসালাতের সুমহান মর্যাদাকে কোন কৌশলে ও ন্যূনতম ক্ষুণœ করা সম্ভব হয়নি। যার অনেক অনেক প্রমাণ বিদ্যমান। সাহাবা-ই-কেরামের পর থেকে অদ্যাবধি তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, সলফে সালেহীন, গাউস কুতুব, পীর, ওলি এবং কোন হক্কানী উলামাই কেরাম রিসালাতের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও। এছাড়াও অতীতকাল থেকেই ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও নাসারাদের সম্প্রদায় এবং তাদের অনুসারীরা রাসূলে পাক (সা.) এর পবিত্র রিসালাতের সুউচ্চ মাকাম দেখে তাদের মর্ম পীড়িত হয়েছে। আজও সেই সকল ইয়াহুদীদের দোসররা রাসূলে পাক (সা.) এর পবিত্র রিসালাতের মর্যাদাকে অতি সন্তর্পণে তাদের এই ঘৃণ্য মিশন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে সার্বক্ষণিকভাবে রাসূলে পাক (সা.) এর মর্যাদায় কলঙ্ক লেপনে অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও তারা ভদ্র লেবাসে চেঁচিয়ে ওঠে বলে, রাসূল দোষ গুণের যৌথ মিশ্রণের মানুষ, রাসূল (সা.) এর শাফাআতের আশা রাখা বৃথা, রাসূলে পাক (সা.) এর গুণাকীর্তন করলে আল্লাহ তায়ালার সাথে শিরক্ শামীল হবে ইত্যাদি বলে বেড়ায় তারা। তাই শানে রিসালাতের অবমাননার এর সকল কটুক্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে আসছেন আমাদের আশিকে রাসূল উলামা-ই-কেরাম। যার বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়েছিল। বাতিলদের দাঁতভাঙ্গা জবাবের ডাক দিয়েছিলেন শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)। তাঁর আহবানে বিগত ১৯ ও ২০ মার্চে ২০০৪ সালে ঐতিহাসিক সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শানে রিসারত সম্মেলন। শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর সভাপতিত্বে বিশ্ববরেণ্য আলেম-উলামা তথা দেশের মন্ত্রী, এমপি, সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান হাজির হন এ মহাসম্মেলনে। এ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য ড. তাহের আল কাদরী, কুয়েতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আল্লামা ইউছুফ হাশেম রেফাই ও মিশরের আবু লায়লা, ভারতের আল্লামা মুজাহিরুল্লাহ খান সহ দেশ বিদেশের অসংখ্য আলেম-উলামা, ছাত্র-শিক্ষক। সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ জিন্দাবাদ শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের প্রাণকেন্দ্রে।
অপর দিকে আবু জাহেলের, আবু লাহাবের উত্তর সূরীরা প্রকাশ্যে তাদের ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে রাসূল প্রেমিকদের হৃদয়ে ঝড় তুলতে চায়। তারা নিপুণভাবে রাসূলে পাকের (সা.) মর্যাদা ক্ষুণœ করতে চায়। তারা ধৃষ্টতা দেখিয়ে বিশ্বের মানুষের বিবেককে আহত করেছিল। ডেনমার্কের ঔুষষধহফং চড়ংঃবহ পত্রিকায় রাসূল (সা.) এর ১২টি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে। আর ঐসব ব্যঙ্গচিত্রে রাসূল (সা.) কে একজন সন্ত্রাসী, জঙ্গি হিসাবে দেখানো হয় (নাউযুবিল্লাহ)। যিনি শান্তির বার্তাবাহক আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করে গেছেন, যার পবিত্র আদর্শই দিতে পারে ইহকালের ও পরকালের শান্তির নিশ্চয়তা, তা সকল অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন অমুসলিম বিবেকধারীরাও, এমন মহামানবকে চিহ্নিত করা হয় একজন সন্ত্রাসী, জবর দখলকারী হিসেবে। কিন্তু যার অনুপম চরিত্রকে আল্লাহপাক নিষ্কলুষ রেখেছেন, যাঁর শান ও মান মাকামে আ’লায়, এসব ব্যক্তিদের আওয়াজ কি তাঁর রিসালাতের অবমাননা হবে? তাঁর মর্যাদা সমুন্নত ও শ্রেষ্ঠ। তাঁর মর্যাদার অনুপরিমাণ কমতির কোনো সুযোগ নেই।
তাহলে শানে রিসালাতের দুশমনদের দৌঁড়ঝাঁপ এতো কেন? কারণ তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি। আল্লাহ তায়ালা তাদের এ ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দেন, যাতে তারা তাদের অপকর্ম আরও বেশি অগ্রসর হতে পারে। এজন্য দেখা যায় ডেনিশ পত্রিকায় রাসূলে পাক (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর ডেনমার্কের স্থানীয় মুসলমান এবং বিদেশী মিশনের মুসলিম কূটনীতিকদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে পত্রিকার কর্তৃপক্ষ ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু তার তিন মাস পর মুসলমানদের হৃদয়ে আঘাত দেয়ার জন্য কার্টুন পুন:প্রকাশ করে ইটালি, ফ্রান্স, জার্মানী, হল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের কতিপয় মুসলিম বিদ্বেষী পত্রিকা। তারা একের পর এক ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে। এটা ছিল ইসলাম বিদ্বেষীদের গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধূয়া তুলে যারা কার্যত রাসূলে পাক (সা.) এর মর্যাদাহানি ঘটাতে চায়। রাসূলে পাক (সা.) এর মর্যাদাহানি ঘটাতে গিয়ে তারা কী দেখলো? ইন্দোনেশিয়া থেকে আরম্ভ করে পাকিস্তান, ইরাক, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বব্যাপী উম্মতে মুহাম্মদীর শানে রিসালাতের উত্তাল মিছিল, দেশে দেশে ইউরোপ বিদ্বেষী শ্লোগান, ইউরোপীয় পণ্য বর্জনসহ তাদের বিরুদ্ধে হুংকার, মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও শানে রিসালাতের সমুন্নত রাখার এক বিপ্লবী জবাব। পৃথিবীর একপ্রান্ত হতে অন্য প্রান্তের কোটি কোটি মুসলিমদের বজ্র হুংকারে প্রকম্পিত করেছিল বিশ্বের প্রতিটি রাজপথ, চার দিকে শুধু প্রতিধ্বনি ‘নারায়ে রিসালাত ইয়া রাসূলাল্লাহ’! তখন মুসলমানদের হুংকারে বাধ্য হয়ে কাফির মুশরিককেরা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। যারা বিশ্বনবী রাসূলে পাকের (সা.) শানে অবমাননার অপচেষ্টায় যারা সর্বদা লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে বড় বড় মিছিল দিলেই শুধু চলবে না। বরং বাতিলের সমুচিত জবাব দিতে হলে আমাদের হুব্বে রাসূল ও সুন্নাতের যথাযথ অনুশীলন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত হবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শানে রিসালাতের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আন্দোলনে শরীক হওয়া। রাসূলে পাক (সা.) এর শান, মান ও আদর্শ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য শুকরিয়া জানাতে হয় বাংলাদেশ আনজুমানে আল-ইসলাহ ও বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়াকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আবারও দেখা যাচ্ছে সেই আবু জেহেল ও আবু লাহাবের উত্তরসূরীরা রাসূলে পাকের (সা.) মর্যাদা ক্ষুন্ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
রাসূল (সা.) এর মর্যাদা তথা তাঁর শানে রিসালাতকে লুণ্ঠিত করার জন্য। তাই তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব প্রদানের লক্ষ্যে জামানার শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর সুযোগ্য সন্তান আল্লামা হুছামুদ্দিন চৌধুরী ছাহেবের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আগামী ২ ও ৩ মার্চ ২০১৭ তারিখে ঐতিহাসিক সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে রাসূলে পাক (সা.) এর শান-মানকে প্রতিষ্ঠার জন্য সারা বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রতি আহবান জানান। এবং তাঁর আহবানে বিশ্বনবী রাসূলে পাকের (সা.) শানে রিসালাতকে কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা ও সমুন্নত রাখার জন্য প্রত্যেক রাসূল প্রেমিক সমাগম হবে, পাশাপাশি শানে রিসালাত অস্বীকারকারীদের আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের মাটি থেকে আবারও হুঁশিয়ারি দেয়ার লক্ষ্যে এই মহতি শানে রিসালাতের অনবদ্য আয়োজন। আল্লাহপাক আমাদেরকে শানে রিসালতের মর্যাদা রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কবুল করুন। আমীন ॥

উম্মাতের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনে ক্ষেত্রে করণীয়সমূহ থেকে এখানে আমরা চারটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় নিয়ে আলোচনা করব। সেগুলো হলো- ১. বিধান নির্ণয়ের পূর্বে করণীয় ২. বিধান উদ্ভাবনের সময় করণীয় ৩. শরীআহ অভিযোজন (ঝযধৎরয অফধঢ়ঃধঃরড়হ) ৪. সম্মিলিত গবেষণা (এৎড়ঁঢ় ওলঃরযধফ)
বিধান নির্ণয়ের পূর্বে করণীয় : সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পূর্বে সংশ্লিষ্ট গবেষকের যেসব করণীয় রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ঘটনার বাস্তবতা নিশ্চিত হওয়া: অবাস্তব বিষয় সম্পর্কে ইসলামের বিধান তলব ও প্রদান করা সালফে সালিহীন অপছন্দ করতেন। ইবনে উমর রা. এর নিকট এক ব্যক্তি এসে কোন এক বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যে বিষয়ের কোন বাস্তবতা নেই সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। কেননা আমি উমর ইবনুল খাত্তাব কর্তৃক ঐ ব্যক্তিকে অভিশাপ দিতে শুনেছি যে ব্যক্তি অবাস্তব বিষয়ে প্রশ্ন করে।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) -এর সাহাবীগণের চেয়ে উত্তম মানবগোষ্ঠী আমি দেখিনি। তাঁরা তাঁর কাছে তেরটি প্রশ্ন ছাড়া কোন কিছু জিজ্ঞেস করেননি। আর এর সবগুলোই কুরআনে বিধৃত হয়েছে। তাঁদের উপকারে আসত এমন বিষয় ছাড়া তাঁরা অন্য কিছু জিজ্ঞেস করতেন না। বিষয়টি বিশ্লেষণযোগ্য হওয়া: গবেষককে দৃষ্টি দিতে হবে উদ্ভূত পরিস্থিতি আদৌ বিশ্লেষণের যোগ্য কি না? কেননা এমন অনেক বিষয় আছে যাতে মানুষের দ্বীন- দুনিয়ার কোন কল্যাণ নেই। অযথা এর পিছনে সময় ও মেধা খরচ করা উচিত নয়। যদি কেউ কোন আলিম বা মুফতীকে বিপদে ফেলানোর জন্য বা তাকে অসম্মান করার জন্য অথবা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইসলামের বিধান জানতে চায় তবে তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কেননা মহানবী (সা.) কুটিল প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একইভাবে যেসব বিষয়ে শরীয়তের নস রয়েছে সেসব বিষয়ে ইজতিহাদ না করা। কেননা ফিকহী মূলনীতি হল, “নস থাকলে সেখানে ইজতিহাদের অনুমতি নেই।
যে বিষয়ে কোন অকাট্য দলীল বা ইজমা থাকবে না। যদি উক্ত বিষয়ে অকাট্য দলীল থাকে তবে সে দলীল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তথা তাবিলের পর্যায়ভুক্ত হতে হবে। এমন মতবিরোধপূর্ণ বিষয় যার ক্ষেত্রে শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে যেয়ে একপক্ষ তাকে বৈধ বলেছেন অন্যপক্ষ তাকে অবৈধ বলেছেন। বিষয়টি আকীদা বা তাওহীদের মূলনীতি কিংবা কুরআন- সুন্নাহ’র মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভূক্ত হবে না। বিষয়টি এমন সাম্প্রতিক সমস্যা যা ইতোমধ্যে সমাজে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বা এমন আবশ্যম্ভাবী যার শরঈ বিধান আবশ্যক।
সাম্প্রতিকতার ফিকহ তথা আধুনিক বিষয়ের ইসলামী সমাধান অতি সূক্ষ্ম একটি বিষয়। এ এমন এক জিজ্ঞাসা যে সম্পর্কে সরাসরি কোন বিধান বর্ণিত নেই। এ জন্য এ বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পূর্বে এর খুঁটিনাটি সব কিছু ভালভাবে অনুধাবন অপরিহার্য। খলিফা উমর রা. কর্র্তৃক আবু মুসা আশয়ারী (রা.) কে লেখা পত্রে তিনি বলেন- “নিশ্চয় বিচার-ফয়সালা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যা প্রত্যেক যুগে চলে আসছে। তোমার কাছে কোন কোন মামলা আসলে তা ভালভাবে অনুধাবন করবে (অতঃপর তা কার্যকর করবে)। কেননা মৌখিক ফয়সালার কোন অর্থ হয় না, যতক্ষণ না তা কার্যকর হয়। যেসব মামলার ফয়সালা কুরআন ও হাদীসে না পাওয়া যাবে সেগুলোকে খুব গভীরভাবে অনুধাবন করবে।
আধুনিক বিষয়টি সম্পর্কে প্রাজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর নির্দেশও রয়েছে: “জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান”। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্র“টির কারণে বর্তমান সময়ে একজন আলিমের পক্ষে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ব্যবসায় সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যথার্থভাবে জানার সুযোগ নেই। এজন্যই উদ্ভূত যাবতীয় বিষয় সংশ্লিষ্ট প্রাজ্ঞজনের কাছ থেকে ভালভাবে অবগত হওয়া কর্তব্য। যেমন- কেউ যদি টেস্ট টিউব বেবী, জরায়ূ ভাড়াদান, মরণোত্তর অঙ্গদান, শেয়ার মার্কেট, ব্যাংক কার্ড ইত্যাদি বিষয়ের বিধান নির্ণয় করতে চান তবে নিশ্চয় তাকে এসবের প্রক্রিয়া ও আনুষঙ্গিক সব বিষয় সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি থেকে জানতে হবে।
বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ যেন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন তার জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করা অবশ্য কর্তব্য। আমরা কোনভাবেই এ আত্মিক দিককে অবহেলা করতে পারি না। মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের ঘটনা বর্ণনা করে এ সংক্রান্ত আদব আমাদেরকে শিখিয়েছেন। নিজের অক্ষতার ক্ষেত্রে তিনি আমাদেরকে বলতে বলেছেন: “আপনার পবিত্রতা, আপনি আমাদেরকে যা শিখিয়েছেন তার চেয়ে বেশি কোন জ্ঞান আমাদের নেই। মহান আল্লাহ আরও বলেন, “বল, হে আমার প্রতিালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর।” বিধান উদ্ভাবনের সময়ে করণীয়: সমসাময়িক সমস্যার সমাধান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গবেষকের যেসব করণীয় তা হল- ক. দলীল, প্রস্তাব ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা: ইমাম ইবনে কাইয়্যিম বলেন, মুফতি বা মুজতাহিদের উচিত বিধানের দলীল ও সূত্র বর্ণনা করা এবং ফাতওয়া জিজ্ঞেসকারীকে দলীলবিহীন উত্তর না দেয়া।
যেহেতু সাম্প্রতিক আবিষ্কারের অধিকাংশই অমুসলিম কর্তৃক উদ্ভাবিত সেহেতু মুসলিম গবেষকের উচিত এসব বিষয়ের যে যে দিক শরীআহ’র সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলো পরিত্যাগ করে এর বিকল্প পদ্ধতি বের করা। ইমাম ইবনে কাইয়্যিম বলেন, মুফতি বা মুজতাহিদের জন্য আবশ্যক যদি তিনি ফাতওয়া তলবকারী তা সমাধান প্রত্যাশীদেরকে কোন কাজ থেকে নিষেধ করেন অথচ বিষয়টি তার জন্য অতি জরুরী তবে তিনি তাকে বা তাদেরকে উক্ত কাজের বিকল্প পথ বলে দিবেন। যাতে উক্ত ব্যক্তির জন্য হারামের দরজা বন্ধ হয়ে যায় ও শরীআহ অনুমোদিত পদ্ধতির দরজা উন্মুক্ত থাকে।
সাম্প্রতিক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিধান বর্ণনার পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ উক্ত বিষয়ের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন দিক আলোচনা করতে হবে, যাতে উক্ত বিষয়ের বিধান মানুষ সহজে বুঝতে পারে। যেমন মহান আল্লাহ যাকারিয়া (আ.) এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, বার্ধক্যের এমন পর্যায় তাঁর সন্তান হয়েছিল যে পর্যায়ে সাধারণত সন্তান হয় না। মহান আল্লাহ এ ঘটনাটি ঈসা (আ.) এর পিতা ছাড়া জন্ম হওয়ার ঘটনা বর্ণার পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ উল্লেখ করেছেন। যাতে অতিশয় বৃদ্ধ দম্পতি থেকে সন্তান জন্ম নেয়ার ঘটনা বিশ্বাস করানোর মাধ্যমে পিতা ছাড়া সন্তান জন্ম হওয়ার ঘটনা বিশ্বাস করা সহজ হয়। প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাথে সাথে সম্পূরক বিভিন্ন তথ্য প্রদান করাও মুজতাহিদের কর্তব্য। ইমাম বুখারী র. তার সহীহ বুখারীতে “মান আজাবাস সাঈল বিআকসারি মিমমা সাআলাহু আনহু” শীর্ষক একটি অধ্যায় অন্তর্ভূক্ত করে দেখিয়েছেন। মহানবী (সা.) অনেক প্রশ্নের জবাবের সাথে সাথে অতিরিক্ত তথ্য প্রদান করেছেন।
মাকাসিদে শরীআহ’র প্রতি দৃষ্টি রাখা : মাকাসিদে শরীআহ বলা হয়, বান্দার কল্যাণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যেসব নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে ইসলামী আইন প্রণীত হয়েছে যেসব উদ্দেশ্যকে। সাম্প্রতিক বিষয় পর্যাবেক্ষণকারী গবেষকের জন্য মাকাসিদে শরীআহ’র গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক এখানে উল্লেখ করা হল।  ১. কল্যাণ নিশ্চিত করা। ২. কষ্ট দূরীভূত করার নীতি বাস্তবায়ন করা। ৩. ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা।
এর দ্বারা উদ্দেশ্য গবেষক সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের সময় এ সংক্রান্ত কোন গবেষণাপ্রসূত বিধান আছে কি না এবং সে বিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না তা দেখবেন। লক্ষ্য করবেন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে উক্ত বিধান পরিবর্তনযোগ্য কি না? কেননা শরীয়াতের ইজতিহাদপ্রসূত অনেক বিধান স্থান-কাল-সমাজ পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এ কারণে একই মাযহাবের মুতাক্কাদিমীন ও মুতাআখখিরীনের মধ্যে ফাতওয়ার ভিন্নতা দেখা যায়। এরই প্রেক্ষিতে ইসলামী আইনের মূলনীতি শাস্ত্রের সূত্র রয়েছে: “যুগের পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন স্বীকৃতি”। আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম তাঁর ইলামুল মুয়াক্বিয়ীনের মধ্যে শীর্ষক একটি অধ্যায় অন্তর্ভূক্ত করেছেন’’।
ফকীহগণ ইসলামী আইন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রথা ও প্রচলনকে গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করেছেন, যার দৃষ্টান্ত অসংখ্য যেমন-রজ:স্রাব ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়কাল, গর্ভধারণের মেয়াদ, যেসব অপবিত্রতাকে ক্ষমা করা হয়েছে, শপথ, অঙ্গীকার, অসীয়ত ইত্যাদি। ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রথার গুরুত্ব প্রমাণিত হয় ফিকহী মূলনীতি ‘রীতি ও বিবেচ্য বিধান’ থেকে যা মূলত ইবনে মাসউদ (রা.) এর উক্তি-“মুসলমানগণ যা ভাল মনে করেন আল্লাহর কাছেও তা ভাল। আর তারা যা খারাপ মনে করেন তা আল্লাহর কাছেও খারাপ”। এর আলোকে প্রণীত। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞগণ ৪টি বিশেষ শর্ত প্রদান করেছেন। ১. সামাজিক প্রথাটি ব্যাপক সমাদৃত থাকা। ২. প্রথাটি প্রচলনের শুরু থেকে অদ্যাবধি অবিকৃত অবস্থায় থাকা। ৩. উক্ত প্রথার বিপরীতে ভিন্ন কোন প্রথা চালু না থাকা। ৪. প্রথাটি শরীয়াতের স্পষ্ট বিধান বিরোধী না হওয়া।
শরীআহ অভিযোজন বর্তমান সময়ে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি ফিকহী পরিভাষা। প্রাচীন ফিকহের কিতাবে এ পরিভাষার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না, তবে কাছাকাছি কিছু পরিভাষা আছে, আধুনিক সময়ে আলিমগণ বিভিন্নভাবে এই পরিভাষাটি সংজ্ঞায়িত করেছেন। ড. ইউসুফ আল-কারযাভী বলেন, শরীআহ অভিযোজন অর্থ উদ্ভূত পরিস্থিতির উপর শরঈ নস প্রয়োগ। কোন মাসআলার শরীআহ অভিযোজন অর্থ উক্ত মাসআলাটিকে (শরীআহ বিরোধী বিধান থেকে) মুক্তকরণ ও তাকে নির্দিষ্ট গণ্য দলীলের সাথে সম্পৃক্তকরণ। এক কথায়, সাম্প্রতিক কোন বিষয়কে শরীআহ’র রঙে রঙিন করাকে বলা হয় শরীআহ অভিযোজন। অর্থাৎ,  যেসব বিষয়ে শরীআহ’র সাথে সাংঘর্ষিক কিছু নেই তাকে শরীআহ’র বিধানের সাথে খাপ খাওয়ানো বা শরীয়াতের বিধানের সাথে তার যোগসূত্র স্থাপন।
আধুনিক সময়ের ফকীহগণের নিকট দু’টি কারণে শরীআহ অভিযোজন শব্দটি বিশেষ গুরুত্ববহ। প্রথমত, সাম্প্রতিক বিষয়গুলো সমকালীন সর্বশেষ অবস্থাসমৃদ্ধ। পূর্ববর্তী ফিকহের কিতাবে যে সম্পর্কে কোন আলোচনা বিদ্যমান নেই। আবার বিষয়গুলো জটিল, দুর্বোধ্য অথচ জীবনঘনিষ্ঠ। এ কারণে এর বিধান নির্ণয় কষ্টসাধ্য। কেননা এক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা প্রয়োজন। অতএব শরীআহ অভিযোজন উক্ত পরিক্রমার একটি পদক্ষেপ ও পর্যায়।
দ্বিতীয়ত, বিগত কয়েক যুগে সভ্যতার উন্নতি ও সমাজব্যবস্থার যে পরিবর্তন হয়েছে ইতিহাসে এর কোন দৃষ্টান্ত নেই। এসব উন্নতি ও পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে সম্পর্কিত বিধান গবেষণা করার মত ‘মুজতাহিদ মুতলাক’ (স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চিন্তার অধিকারী শরীআহ উদ্ভাবক) এর অভাব এবং মাযহাবী মুজতাহিদের সংখ্যাধিক্যের কারণে শরীআহ অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা সাম্প্রতিক বিষয়ে বৈশিষ্ট্য, এর গুণাগুণ বিবেচনা ও তাকে রূপায়নের ক্ষেত্রে এর স্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
শরীআহ অভিযোজন শরীআহ’র মূলনীতির ভিত্তিতে শুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে হতে হবে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিকটতম মূলনীতির মাধ্যমে অভিযোজনক করা যাতে ঐ মূলনীতির বিধানকে উক্ত বিষয়ের বিধান হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এতে কোন জটিলতা নেই। বরং জটিলতা তখনই দেখা দেবে যদি অসামঞ্জস্য মূলনীতির মাধ্যমে অভিযোজন করা হয়। পরিস্থিতিকে শুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ রূপায়নের জন্য সাধনা করা। বিষয়টি গবেষক, বিচারক ও আইন বিশ্লেষকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কিছু বিধান উক্ত বিষয়ের রূপায়ণেরই একটি অংশ। অতএব যে ব্যক্তি সাম্প্রতিক বিষয় রূপায়ণ করবে তার উচিত এর পূর্ণ ও শুদ্ধ রূপায়ণ করা এবং ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবস্থা, শাখা-প্রশাখা, মূলনীতি ইত্যাদি অবগত হওয়া। মুজতাহিদকে মাসআলা উপস্থাপন ও মূলনীতির সাথে একীভূতকরণের ফিকহী যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
ইসলামী আইন গবেষণার ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইজতিহাদ একটি নতুন মাত্রা। ইসলামের প্রাথমিক যুগসমূহে মুসলিম পন্ডিতগণের অক্লান্ত পরিশ্রম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাদের পারদর্শিতার ফলে ব্যক্তিগত বা একক গবেষণার মাধ্যমে সফলতার সাথে তৎকালীন বিভিন্ন বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয় সম্ভব হলেও বর্তমান সময়ে তা কষ্টসাধ্য। কুরআন-সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ’র দুর্বল অবস্থানের কারণে শেষের শতাব্দীগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার সেই সোনালী সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। যার প্রেক্ষিতে সঠিক ইজতিহাদ করার মত প্রজ্ঞাবান আলিম এর ব্যাপক অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে বর্তমানে একক গবেষণার সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের যোগ্যতাসম্পন্ন গবেষকের অভাব মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে বর্তমান সময়ে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চিন্তা-চেতনার জগতে বিরাট বিপ্লব সাধিত হওয়ায় জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন দিক নিয়ে ইজতিহাদ করার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহ সম্মিলিত ইজতিহাদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
সম্মিলিত ইজতিহাদ একটি আধুনিক ফিকী পরিভাষা। পূর্ববর্তী উসূলের কিতাবসমূহে এ বিষয়ক স্বতন্ত্র কোন অধ্যায় পাওয়া যায় না। সম্মিলিত ইজতিহাদের পরিচয়ের জন্য ইজতিহাদের সংজ্ঞা আবশ্যক। বিভিন্ন গ্রন্থে ইজতিহাদের অসংখ্য সংজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা ইমাম ফাতুহী (র.) এর সংজ্ঞাটিকে অধিকতর প্রণিধানযোগ্য সাব্যস্ত করতে পারি। তিনি বলেন ‘কোন বিষয়ের শরঈ বিধান অর্জনের জন্য ফকীহ কর্তৃক তার শক্তি ব্যয় করা।’ বর্তমান সময়ের কেউ কেউ সামষ্টিক ইজতিহাদের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমন- * ড. আব্দুল মাজীদ শারফী বলেন, বিধান উদঘাটনের পদ্ধতির আলোকে কোন বিষয়ের শরঈ বিধান সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহ কর্তৃক চেষ্টা সাধনা এবং পরামর্শের পর উক্ত বিধানের উপর তাদের সকলের বা অধিকাংশের ঐক্যমত। * ড. আল-আবদু খলীল বলেন, কোন বিষয়ের শরঈ বিধানের উপর কোন যুগের উম্মতে মুহাম্মাদীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুজতাহিদের ঐক্যমত। প্রকৃতপক্ষে সম্মিলিত ইজতিহাদ হচ্ছে- কোন বিষয়ের শরঈ বিধান নির্ণয়ের জন্য একদল আলিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং পারস্পরিক পরামর্শ ও পর্যালোচনান্তে উক্ত বিষয়ের উপর ঐক্যমত্য স্থাপন করাকে সম্মিলিত ইজতিহাদ বলা হয়। যেমন ইসলামিক ফিকহ একাডেমী জিদ্দায় করা হয়ে থাকে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, কোন বিষয়ে একক কোন ব্যক্তির চিন্তা- চেতনা ও মতামতের চেয়ে উক্ত বিষয়ে একদল মানুষের চিন্তা-চেতনা ও গবেষণার সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সহায়ক। তা ছাড়া পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সঠিক বিষয়টিই বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক। এ কারণেই শূরা (পরামর্শ) থেকে নির্গত ফলাফল অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “সকল কাজে তাদের সাথে পরামর্শ করে, অত:পর যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর তখন আল্লাহর উপর ভরসা কর।”
একক গবেষণার তুলনায় সম্মিলিত গবেষণা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা সমকালীন বড় বড় আলিম, গবেষক, বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে সামগ্রিক দিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্মিলিত ইজতিহাদ সম্পন্ন হয়। সম্মিলিত ইজতিহাদ ইজতিহাদকে চলমান রাখে এবং তা বন্ধ হওয়া রোধ করে। ইজতিহাদ ইসলামী আইনের একটি মৌলিক বিষয় ও ইসলামের গতিশীলতা প্রমাণের প্রধান অবলম্বন। সম্মিলিত ইজতিহাদ মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্যের পথ সুগম করে। কারণ মুসলিম উম্মাহ’র আলিমগণ একত্রিত হয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা সমাধানে ব্রতী হয়। আর জনসাধারণ তাদের নির্ণীত বিধানের সাথে একমত হয়ে অনুসরণ করেন। যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্য ফুটে ওঠে।
সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইজতিহাদের গুরুত্ব বর্ণনা করে ড. ইউসুফ আল-কারযাভী বলেন, আধুনিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ইজতিহাদকে সামষ্টিক ইজতিহাদের উন্নীত করতে হবে। যে পদ্ধতিতে আলিমগণ উক্ত উত্থাপিত বিষয়ে বিশেষত সাধারণ জনগণ যার অনুসরণ করবে সে বিষয়ে পরামর্শ ও পর্যালোচনা করবেন। নিশ্চয় একক মতামতের চেয়ে একদল মানুষের চিন্তা-গবেষণা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানোর উপযোগী।
ড. মুফসির কাহতানী তার গ্রন্থে শেখ মোস্তফা আল-যারকাহ এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, অতীতে ব্যক্তিগত ইজতিহাদের প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে তা বরং ক্ষতিকর, যা হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে ভয়ঙ্কর রূপে প্রকাশিত হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মাযহাবের ফকীহগণ ইজতিহাদের দরজা রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সমসাময়িক সমস্যা সমাধানের একমাত্র অবলম্বন ইজতিহাদ এক্ষেত্রে আমাদেরকে ইজতিহাদের নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। আর তাহল ব্যক্তিগত ইজতিহাদের পরিবর্তে সম্মিলিত ইজতিহাদ এবং এর মাধ্যমে আমরা ইজতিহাদের প্রথম পথ চলা অর্থাৎ আবু বকর ও উমর (রা.) এর যুগে ফিরে যাব।
সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি অবগত হতে হলে আমাদেরকে ইতিহাসের ক্রমধারায় এ সংক্রান্ত পদ্ধতিগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। ইসলামী আইনের প্রাথমিক যুগগুলোতে কীভাবে সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হত নিম্নে সংক্ষেপে তা বিধৃত হল- সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদানে মহানবী সা. এর পদ্ধতি মহানবী সা. এর সময়ে সাম্প্রতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তদান মূলত দু’টি বিষয়নির্ভর ছিল। (অসমাপ্ত)

উম্মাতের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

বি জ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে প্রতিনিয়ত মানুষ মুখোমুখি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যার। জীবনযাত্রায় যুক্ত হচ্ছে এমন অনেক বিষয় কুরআন, সুন্নাহ’র সরাসরি যে সম্পর্কে কোন বিধান বর্ণিত হয়নি, হয়নি কোন সর্বসম্মত ইজতিহাদ। ইসলামের গতিশীলতা ও উপযোগিতার প্রশ্নে এসব সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান উপস্থাপন অপরিহার্য। যাদের জন্য এ অপরিহার্যতা, যারা ফরযে কিফায়ার এ দায়িত্ব পালন করবেন তাদের জন্য রয়েছে অনেক করণীয়- যার কিছু এ সংক্রান্ত গবেষণা শুরুর পূর্বে এবং কিছু রয়েছে গবেষণা কর্ম শুরু করার সময়। শরীআহ অভিযোজন ও সম্মিলিত ইজতিহাদের মত বিষয়ও করণীয় কার্যাবলির অন্তর্ভূক্ত। সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) সাহাবী ও তাবেঈগণ বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করতেন। তাদের অনুসৃত সে পদ্ধতির আলোকে সমকালীন সমস্যার সমাধানের পথনির্দেশ নিয়ে আলোচনা করাই এ প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য।
যুগের আবর্তন ও মানুষের জীবনাচারের পরিবর্তন মহান আল্লাহর অন্যতম অনুপম নিদর্শন। এ কারণে প্রত্যেক যুগের মানুষের জীবনযাত্রা, এর পদ্ধতি, ধরণ ও উপকরণের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষের বস্তুতান্ত্রিক জীবনের উৎকর্ষতার ফলে প্রতি নিয়ত আলাদা বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়। আজ যে বিষয়টি নতুন, আগামী কাল তা পুরাতন। বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্পনাতীত অগ্রগতি বর্তমান যুগকে অন্য সব যুগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। এসব আবিষ্কার মানুষের নানামুখি কর্মকান্ড সম্পাদন ও বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণকে সহজিকরণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে। ফলে তারা তাদের জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এমনকি এসন নতুন নতুন বিষয়কে উপেক্ষার কল্পনাও বর্তমান সময়ে অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছে।
মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক ছুঁয়ে যাওয়া এসব নতুন বিষয়ের শরঈ বিধান জানা একান্ত প্রয়োজন। বিশেষত এ কারণে যে, পূর্ববর্তী ফিকহের কিতাবে এসব বিষয়ের শরঈ বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণিত নেই। ফলে বৈধতা ও অবৈধতার প্রশ্নে মুসলিমগণ এসব বিষয়ের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। ইসলাম সর্বকালের সর্বযুগের মানুষের জন্য উপযোগী একমাত্র জীবনব্যবস্থা। কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যেসব বিষয়ের মুখোমুখি হবে তার বিধান এ ব্যবস্থায় বর্তমান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ এমন অনেক বিষয়ের সম্মুখিন হয় যার কোন বিধান সরাসরি এতে পাওয়া যাচ্ছে না। নবুওয়ত ও রিসালাতের ধারা সমাপ্ত হওয়ায় ওহীর মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে ওহীভিত্তিক এমন পদ্ধতি অবশিষ্ট রয়েছে যার মাধ্যমে প্রত্যেক যুগের যে কোন নতুন বিষয়ের সমাধান সম্ভব।
পৃথিবীর প্রতিটি কাজেরই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি থাকে। একইভাবে ওহীভিত্তিক উক্ত পদ্ধতির আলোকে সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনেরও নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। যার উপর ভিত্তি করে আইন গবেষককে কাক্সিক্ষত বিধান নির্ণয়ের পথ চলতে হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে সেই নীতিমালাকে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে আনুষঙ্গিক হিসেবে সাম্প্রতিক বিষয়ের আরবী পরিভাষা, এর গুরুত্ব, এক্ষেত্রে আইন গবেষকের জন্য করণীয় ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। সাথে সাথে মহানবী (সা.) সাহাবী ও তাবিঈগণ কীভাবে সাম্প্রতিক সমস্যার আইনী সমাধান করতেন তা বর্ণনাকরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিষয় বলতে এমন বিষয়কে বুঝায় যার ইসলামী বিধান নির্ণয়ের দাবি রাখে। অর্থাৎ এমন বিষয় যার শরঈ বিধান বর্ণনার জন্য ফাতওয়া ও ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়। তাই উক্ত বিষয়টি একেবারেই বিরল হোক বা পুরাতন বিষয় নতুন আঙ্গিকে আসুক অথবা নতুন হোক। সাম্প্রতিক বিষয়ের সংজ্ঞায় আমরা কয়েকজন মনীষীর অভিমত উল্লেখ করতে পারি- প্রফেসর আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, এটি এমন অবস্থা ও বিষয় ইসলামী ফিকহের আলোকে যার বিধান বিশ্লেষণের দাবি রাখে। শায়খ সালমান আওদাহ বলেন, এমন নতুন বিষয় যার অধিকাংশ দিক আধুনিক যুগের অনুগামী যার শরঈ বিধান জটিলতা ও দুর্বোধ্যতায় আচ্ছাদিত। আল-বারযালী ‘জামিউ মাসাঈলিল আহকাম’ গ্রন্থ পর্যালোচনা করতে যেয়ে বলা হয়েছে, “এটি আকীদা ও চরিত্র সংক্রান্ত এমন সমস্যা যা একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলত তিনি ইসলামী নীতিমালার আলোকে এর উপযুক্ত সমাধান ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রচেষ্টা করছেন। ড. হাসান ফিলানী বলেন, “কোন ব্যক্তির উপর এমন কোন অবস্থা আপতিত হওয়া যাতে ঐ ব্যক্তি এ বিষয়ের শরঈ বিধান জানার জন্য যে ব্যক্তি তা অবগত করাতে পারেন তার শরণাপন্ন হন। তাই উক্ত বিষয় ইবাদত বা লেনদেন বা আচরণ বা চারিত্রিক যে বিষয়েই সংশ্লিষ্ট হোক না কেন। অতএব সাম্প্রতিক বিষয় বলতে এমন নতুন বিষয়কে বুঝায় যার বিধানের ব্যাপারে শরীআতে সরাসরি কোন নস বর্ণিত হয়নি এবং সর্বসম্মত কোন ইজতিহাদ হয়নি।
সাম্প্রতিক বিষয় ও এ সংক্রান্ত ইসলামী বিধান বুঝাতে আরবী কিছু পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। এ সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ পরিভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে- হাওয়াদিস শব্দটি ‘হাদীসাহ’ এর বহুবচন। নতুন কিছু ঘটাকে ‘হাদাসা’ বলে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিসাহ অর্থ-নতুন বিষয়। এ জন্য বছরের শুরুতে নতুন বৃষ্টিকে হাদিসাহ বলে।
আন-নাওয়াযিল: এ শব্দটিও বহুবচন, একবচন ‘নাযিলাহ’। এর অর্থ বর্ণনায় আল-জাওহারী বলেন, সময়ের কোন কষ্টকর বিষয় বা জনসাধারণের উপর পতিত হয়। এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুন নাওয়াযিল’। আল-অকায়িঈ শব্দটি ‘অকিয়াহ’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ ঘটনা। লিসানুল আরব গ্রন্থকারের মতে, দুর্যোগ ও সময়ের দুর্বিপাক বুঝানোর জন্যও আকিয়াহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ শব্দের সাথে সম্পৃক্ত করে এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুল অকিই’। মুসতাজিদ্দাহ : শব্দটি ‘জুদুদ’ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ-নতুন। আর মুসতাজিদ্দাহ অর্থ- সাম্প্রতিক, সর্বশেষ অবস্থা, নতুন নতুন অবস্থা। আর এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুল-মুসতাজিদ্দাহ’।
কাদায় মুআসিরাহ: কাদায়া শব্দটি ‘কাদিয়াহ’ শব্দের বহুবচন। যার অর্থ অমীমাংসিত বিষয়। যে অমীমাংসিত বিষয় ফয়সালার জন্য কাযী বা বিচারকের সম্মুখে পেশ করা হয় তাকে কাদিয়াহ বা মামলা বলা হয়। আর মুআসিরাহ শব্দটি ‘আসর’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ সমসাময়িক, সমকালীন। অতএব কাদায়া মুআসিরাহ অর্থ সমকালীন অমীমাংসিত বিষয়। ফিকহের সাথে সম্পৃক্ত করে একে বলা হয় ‘কাদায়া মুআসিরাহ ‘ফিকহিয়্যাহ’। যেসব সাম্প্রতিক বিষয়ের শরঈ বিধান নির্মিত হয়নি সেসব বিষয়কে বুঝাতে বর্তমানে এই পরিভাষাটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক বিষয়কসমূহের ইসলামী বিধান নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে এর মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আলোচিত হল- ইসলামের গতিশীলতা ও পূর্ণতা প্রমাণ করা: ইসলামী একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এ পূর্ণতার ঘোষণা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিআমত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে নির্ধারিত করলাম।” একই সাথে এ ব্যবস্থা শাশ্বত ও গতিশীল। কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত প্রতিটি মানুষ স্থান, কাল, পাত্র ও পরিস্থিতি ভেদে যে অবস্থার মুখোমুখী হোক না কেন সে ক্ষেত্রে ইসলামের একটি নির্দেশনা থাকতে হবেই। নতুবা এটি হয়তো অপূর্ণাঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত হবে অথবা যুগের উৎকর্ষতার বিপরীতের এটি অনুপযোগী হিসেবে প্রমাণিত হবে। অতএব নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে সাম্প্রতিক বিষয়সমূহের বিধান নির্ণয়ের মাধ্যমে একদিকে ইসলামের গতিশীলতা ও পূর্ণতা প্রমাণ করা ও অন্যদিকে ইসলাম বিরোধী শক্তি যারা আধুনিক যুগে ইসলামের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাদের প্রতিউত্তর দান করা সম্ভব হয়।
মুসলিম উম্মাহ’র কষ্ট লাঘব করা : এমন অনেক নতুন বিষয় সৃষ্টি হয় যার বিধান নির্ণিত না থাকার কারণে মুসলিম উম্মাহ কষ্টের সম্মুখীন হন। আবার দেখা যায় অমুসলিমরা নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে অতিক্রম করে, যা তাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এ কষ্ট দূর করার জন্য ঐসব বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয় করার কোন বিকল্প নেই। যদি উক্ত বিষয় বৈধ হয় তাহলে মুসলমানগণ তা গ্রহণ করতে পারবেন। আর অবৈধ হলে এর বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার করার প্রতি সচেষ্ট হবেন এবং উক্ত অবৈধ পদ্ধতি বর্জন করবেন।
ইজতিহাদের ধারা চলমান রাখা: ইজতিহাদ তথা ইসলামী বিধান উদ্ভাবনের গবেষণা একদল মানুষের জন্য অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, “তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে”। ইজতিহাদের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে নতুন নতুন বিষয় গবেষণা করে এর বিধান উদ্ভাবন করা। যাকে আমরা ‘ইস্তিখরাজ, ‘ইস্তিম্বাত’ ইত্যাদি নামে চিনি। অতএব এ বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে ইজতিহাদের ধারা চলমান রাখা জরুরী। (অসমাপ্ত)