বিভাগ: ইসলামের আলো

মহান হজ্বের শ্রেষ্ঠত্বের ঐতিহাসিক প্রমাণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

মহান আল্লাহর বিশ্ব-সাম্রাজ্যে মুসলমান শ্রেষ্ঠ জাতি। মুসলমানের জীবন বিধান হলো ইসলাম। ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি। তা হলো- ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্ব। হজ্ব হলো বাস্তব জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যারা হজ্ব করে তারা স্বচক্ষে আল্লাহর নিদর্শনাবলীসমূহ অবলোকন করে ঈমানের পরিপক্কতা লাভ করে। আল্লাহর ঘর তোয়াফকারী হাজীদের আল্লাহর মেহমান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কাবাঘর, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহীম, মিনা, সাফা মারুয়া, মুজদালিফা, জামরাহ, আরাফাহসহ আল-কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সফর করে একজন মুসলমান তার বাস্তব জীবনে আল্লাহ এবং মোহাম্মদ (সাঃ) কে মেনে নিতে সর্বোচ্চ সুযোগ পায়। মহানবী (সাঃ) তাঁর শ্রেষ্ঠ ঈমানিয়াত দ্বারা সেই শ্রেষ্ঠ ইবাদত হজ্ব গুরুত্বের সাথে সম্পন্ন করেছেন। হজ্বের তাৎপর্য তুলে ধরে ব্যাপকভাবে অগণিত বাণী রেখে গিয়েছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে সেই মহামূল্যবান হাদীসসমূহ গুরুত্বের সাথে সংকলন করা হলো।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন: রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞাসা করা হল, “সর্বোত্তম কাজ কোনটা? তিনি বললেন: আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। আবার জিজ্ঞেস করা হল; এর পর কোনটা? তিনি বললেন: আল্লাহর পথে জিহাদ। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো: এরপর কোনটা? তিনি বললেন; নিষ্কলুষ হজ্ব। (বুখারী ও মুসলিম) ইবনে হাব্বান থেকে বর্ণিত: রাসূল (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ আমল হলো, এমন পরিপক্ক ঈমান, যার সাথে কোন সন্দেহের মিশ্রণ ঘটেনি। এমন সশস্ত্র জেহাদ যার ভেতরে কোন চুরি বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি এবং এমন হজ্ব, যাতে কোন গুনাহর কাজ হয়নি। হযরত আবু হোরায়রা (রা:) বলেছেন: একটা নিষ্কলুষ হজ্ব এক বছরের গুনাহের কাফফারা স্বরূপ অর্থাৎ মাফ হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। মাবরুর হজ্ব: কেউ কেউ বলেছেন, মাবরুর হজ্ব হচ্ছে এমন হজ্ব, যার ভেতরে কোন গুনাহ সংঘটিত হয় না। অন্য বর্ণনায় আছে, মাবরুর হজ্বের বৈশিষ্ট হলো, মানুষকে আহার করানো এবং ভাল কথা বলা। অন্যদের কথায়- আহার করানো এবং ছালামের বিস্তার ঘটানো।
আবু হোরায়রার (রা:) বর্ণিত অন্য হাদীস মতে রাসূল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি হজ¦ করল এবং রফাস (অর্থাৎ কোন ধরনের যৌন তৎপরতায় লিপ্ত হল না) করল না এবং গুণাহর কাজও করল না, সে এমন ভাবে পাপমুক্ত হয়ে গেল যেমন সদ্য প্রসূত সন্তান তার জন্মের দিনে পাপমুক্ত থাকে। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)। হযরত আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত আরেক হাদীসের মতে রাসূল (সাঃ) বলেছেন- এক উমরা থেকে আর এক উমরা পর্যন্ত যত গুণাহ করা হয়, উমরার কারণে সেগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। আর নিষ্কলুষ হজে¦র প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)
তিরমিযীতে বলা হয়েছে- হজ্বে মাবরুর হচ্ছে-অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করা হবে। ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় রয়েছে- “রফাস” মানে নরনারীর সম্পর্কজনিত কোন তৎপরতা। আযহারী বলেন- পুরুষ নারীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করে এমন যে কোন ব্যাপার। সহবাস, অশ্লীলতা, পুরুষ কর্তৃক নারীকে যৌন বিষয়ে কিছু বলা। বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী ইত্যাদি হাদীসে বর্ণিত আবু হোরায়রা (রা:) বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন- এক উমরা থেকে আর এক উমরা পর্যন্ত যত গুণা করা হয় সেগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। আর নিষ্কলুষ হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। ইসবাহানীর বর্ণনায় আরো আছে, হজ¦কারী যখনই সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলে, তখনই তাকে একটা সুসংবাদ দেয়া হয়।
মুসলিম ও ইবনে খুযায়মায় বর্ণিত, হযরত ইবনে শামমাছা (রা:) বলেন: একবার আমরা হযরত আমর ইবনুল আস (রা:) এর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি তখন মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কাঁদলেন। তারপর বললেন- যখন আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলাম গ্রহণের প্রেরণা জাগিয়ে তুললেন, তখন আমি রাসল (সাঃ) এর কাছে হাজির হলাম। তারপর বললাম, হে রাসূলুল্লাহ আপনার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার কাছে বয়াত করব (অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করব) তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আমি হাত গুটিয়ে নিলাম। রাসূল (সাঃ) বললেন- কি ব্যাপার, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম, যেন আমার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হয়। রাসূল (সাঃ) বললেন- ওহে আমর, তুমি কি জান না, ইসলাম গ্রহণ অতীতের সমস্ত গুণাহ নষ্ট করে দেয়। হিজরত অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়ে দেয় এবং হজ্ব অতীতের পাপ মোচন করে দেয়। তাবারানীতে বর্ণিত হাদীসে হযরত আলীর (রা:) ছেলে হাসান (রা:) বলেন- একব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে বললো, আমি দুর্বল ও ভীরু। রাসূল (সাঃ) বললেন- তাহলে এমন জেহাদে যোগদান কর, যাতে অস্ত্রশস্ত্র থাকে না। তা হচ্ছে হজ্ব। বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত আয়েশা (রা:) বলেন- আমি রাসূল (সাঃ) কে বললাম, আমরা মনে করি জেহাদ সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। তাহলে আমরা কি জেহাদ করবো না? রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমরা মহিলাদের জন্য শ্রেষ্ঠ আমল হচ্ছে কলুষমুক্ত হজ্ব।
ইবনে খুযায়মার রেওয়ায়েতের ভাষা হলো, হযরত আয়েশা বলেন, আমি জিজ্ঞেস  করলাম: মহিলাদের কি জেহাদ করতে হবে? রাসূল (সাঃ) বললেন- তাদের এমন জেহাদ  করতে হবে যাতে সশস্ত্র লড়াই নেই। তা হচ্ছে হজ্ব ও উমরা। নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হযরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বললেন- বৃদ্ধ, দুর্বল ও স্ত্রীলোকের জেহাদ হলো হজ্ব ও উমরা।
আহমাদ, তাবারানী ও বায়হাকীতে বর্ণিত হযরত আমর ইবনে আবাসা (রা:) বর্ণিত। এক ব্যক্তি বললো: হে আল্লাহর রাসূল, ইসলাম কি? রাসূল (সাঃ) বললেন- আল্লাহর কাছে তোমার মনের আত্মসমর্পণ করা এবং তোমার জিহবা ও হাতের কষ্ট থেকে মুসলমানদের নিরাপদ থাকা। ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের ইসলাম উত্তম? রাসূল (সাঃ) বললেন- ঈমান আনা। সে জিজ্ঞেস করলো: ঈমান কি? তিনি বললেন- আল্লাহ তায়ালা, তার ফেরেশতাগণ তার কিতাবসমূহ তার রাসূলগণ এবং মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে ঈমান আনা। সে জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের ঈমান উত্তম? তিনি বললেন: হিজরত করা। সে জিজ্ঞেস করলো: হিজরত কি? তিনি বললেন: অন্যায় ও অসত্যকে বর্জন করা। সে জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের হিজরত উত্তম? তিনি বললেন- জিহাদ। সে জিজ্ঞেস করলো: জিহাদ কি? তিনি বললেন- যখন তুমি কাফেরদের আক্রমণের শিকার হবে, তখন তাদের সাথে যুদ্ধ করবে এটাই জিহাদ। সে জিজ্ঞেস করলো: কি ধরনের জিহাদ উত্তম? তিনি বললেন: যে জিহাদে মুজাহিদের রক্ত ঝরে ও ঘোড়া মারা যায়। রাসূল (সাঃ) বললেন- এরপর দুটো কাজ এমন রয়েছে, যা সকল কাজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ: গুনাহমুক্ত হজ্ব ও গুনাহমুক্ত উমরা।
আহমাদ, তাবরানী, ইবনে খুযায়মা, বায়হাকী হাকেম এ বর্ণিত হযরত জাবের থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন- গুনাহমুক্ত হজে¦র বদলা জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। জিজ্ঞেস করা হল গুনাহমুক্ত হজ¦ কিভাবে আদায় করা যায়? তিনি বললেন- মানুষকে খাওয়ানো ও ভাল কথা বলার মাধ্যমে? অর্থাৎ হজ্বের সফরে থাকা বলে। তিরমিযী, ইবনে খুযায়মা ও ইবনে হাব্বানে বর্ণিত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: হজ্ব ও উমরার মাঝে দীর্ঘ বিরতি না দিয়ে একটার পর অপরটা আদায় কর, তাহলে দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে দেবে। যেমন কামারের চুল্লি লোহার মরিচা এবং স্বর্ণকারের চুল্লি স্বর্ণ ও রূপার খাদ দূর করে। গুনাহমুক্ত হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। তাবরানীতে বর্ণিত, হযরত আব্দুল্লাহ বিন জায়াদ (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসুল (সাঃ) বলেছেন- তোমরা হজ্ব কর, কেননা পানি যেমন ময়লা ধুয়ে দেয়, তেমনি হজ্ব গুণাহকে ধুয়ে পরিষ্কার করে।
বাযখারে বর্ণিত হযরত আবু মুছা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলছেন- হজ্ব সমাপনকারী তার পরিবার পরিজনের মধ্য থেকে চারশত জনের পক্ষে সুপারিশ করতে পারবে এবং সদ্য প্রসূত শিশুর মতো নিজের সমস্ত গুনাহ থেকে অব্যাহতি পাবে। ইবনে খুযায়মা থেকে বর্ণিত হযরাত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন- রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হযরত আদম (আঃ) ভারত থেকে পায়ে হেঁটে এক হাজার বার কাবা শরীফে এসেছেন। কখনও কোন সওয়ারীতে আরোহন করেননি।
বাযযারের বর্ণনায় আছে হযরত জাবের (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন যারা হজ¦ ও উমরা করে, তারা আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তিনি তাদেরকে আমন্ত্রণ করেন। তারা সেই আমন্ত্রণের সাড়া দেয়। আর তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তাদেরকে তা প্রদান করেন। বাযযার, তাবরানী ইবনে মাজার বর্ণনা মতে, হযরত ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহর পথে জেহাদকারী এবং হজ্ব ও উমরাকারী আল্লাহর প্রতিনিধি। তিনি তাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তারা তাতে সাড়া দিয়েছেন। তারা আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি তা তাদেরকে দেন। বাযযার তাবরানী, ইবনে খুযায়মা ও হাকেম থেকে বর্ণিত। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হজ্বকারীর গুনাহ মাফ করা হয় এবং সে যার যার গুনাহ মাফ চায় তাদেরকেও মাফ করা হয়। ইবনে হাববান, ইবনে খুযায়যা, তাবারানী, বাযযার ও হাকেম থেকে প্রাপ্ত হযরত ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন- এই ঘর (পবিত্র কাবা) দ্বারা তোমরা উপকৃত হও। কেননা এ ঘর দু’বার ধ্বংস করা হয়েছে এবং তৃতীয়বারে তাকে তুলে নেয়া হবে।
তাবারানীর বর্ণনা মতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) থেকে বর্ণিত, যখন আল্লাহ তায়ালা আদম (আ:) কে বেহেশত থেকে নামালেন, তখন তাকে বললেন- আমি তোমার সাথে সাথে এমন একটা ঘর নামাবো, যার চার পাশে তওয়াফ করা হবে যেমন আমার আরশের চারপাশে তওয়াফ করা হয় এবং তার কাছে নামায পড়া হবে, যেমন আমার আরশের কাছে নামায পড়া হয়। তারপর যখন বন্যার সময় এল, তখন এই ঘরকে ওপরে তুলে নেয়া হলো। নবীগন এই ঘরের কাছে গিয়ে হজ¦ করতেন, কিন্তু তার স্থানটা চিনতেন না। অত:পর এই জায়গায় আল্লাহ হযরত ইব্রাহীমকে বসবাস করালেন। তিনি পাঁচটা পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবা ঘর নির্মাণ করলেন। পাঁচটি পাহাড় হল- হেরা, ছাবীর, লেকমন, তুর ও খায়ের। সুতরাং তোমরা যত বেশি পারো এই ঘর দ্বারা উপকৃত হও।
ইসবাহানীর বর্ণনায়, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হজ্ব আদায়ে ত্বরিত উদ্যোগী হও। অর্থাৎ ফরজ হজ্ব দ্রুত আদায় কর। কেননা কখন কি বাধা বিঘœ এসে পড়বে কেউ জানো না। ইসবাহানীতে আরো বর্ণিত। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) বর্ণনা করেন। রাসূল (সাঃ) বলেছেন-আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ:) কে ওহীর মারফত বললেন- হে আদম, তোমার কোন অঘটন ঘটার আগে এই ঘরে হজ্ব আদায় করে নাও। আদম (সাঃ) বললেন- হে আমার প্রতিপালক, আমার কী অঘটন ঘটবে? আল্লাহ বললেন- সে তুমি জান না। মৃত্যু হতে পারে। আদম (আঃ) বললেন- মৃত্যু আবার কী? আমার বংশ ধরের মধ্যে কাকে আমি আমার দায়িত্ব হস্তান্তর করবো? আল্লাহ বললেন- আকাশ ও পৃথিবীর কাছে পেশ কর।
আদম (আঃ) প্রথমে আকাশের কাছে তাঁর দায়িত্ব পেশ করলেন। সে ঐ দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পৃথিবীর কাছে পেশ করলেন। সেও তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড় পর্বতের কাছে তা পেশ করলেন। সেও অস্বীকার করলো। অবশেষে এই দায়িত্ব গ্রহণ করলো তার সেই ছেলে, যে নিজের ভাইকে হত্যা করেছিল। এরপর হযরত আদম (আঃ) ভারতবর্ষ থেকে হজ্বের উদ্দেশ্যে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে তিনি যেখানেই পানাহার করার জন্য যাত্রা বিরতি করলেন, সেখানেই পরবর্তীকালে জনবসতি গড়ে উঠলো। এক সময় তিনি মক্কা শরীফে এলেন। এখানে ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানালো। তারা বললেন- হে আদম, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।
আপনার হজ্ব নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হোক। আমরা আপনার দুই হাজার বছর আগে এই ঘরে হজ্ব করেছি। রাসূল (সাঃ) বললেন- সেদিন কাবা ঘর লাল রং এর ইয়াকুত পাথর দিয়ে নির্মিত ছিল এবং ভেতরে ফাঁকা ছিল। যে তাওয়াফ করতো, যে ঘরের ভেতরে যারা আছে তাদেরকে দেখতে পেত। কাবা ঘরের তখন দুটো দরজা ছিল। আদম (আঃ) তার হজ্ব সমাধা করলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে ওহী যোগে জিজ্ঞেস করলেন- হে আদম, তোমার হজ্ব আদায় সম্পন্ন করেছ? আদম বললেন- হে আমার প্রভু, করেছি।

মানব জীবনে কুরআন হাদীস

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

কোন ধর্ম যদি বিশেষ কোন গোত্র বা বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট করা না হয় অথবা সীমবদ্ধ না থাকে কোন ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে, বরং ধর্মের লক্ষ্য যদি হয় বিশ্ব জগতের সমগ্র জনগোষ্ঠী তা হলে দু’ভাবে সে ধর্ম গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয়ত জন্মগত সূত্রে। জন্মসূত্রে ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রশ্নটি গৌণ।
স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতনভাবে একটি ধর্মকে পরিহার করে এবং আরেকটি ধর্ম গ্রহণ করে। কোন ধর্ম গ্রহণ বা বর্জন করার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে তার পছন্দ-অপছন্দের উপর নির্ভর করে। এ প্রসঙ্গে নবী করীম (সা) বলেছেন যে, “তাকে মুখে ঘোষণা দিতে হবে এবং অন্তরে বিশ্বাস করতে হবে।” স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে প্রথমে গোসল করার মধ্য দিয়ে অবিশ্বাস এবং অজ্ঞতার কালিমা দূরীভূত হয়। অতঃপর সে দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ঘোষণা দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) তাঁর রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ।
হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে, কোন লোক ইসলাম গ্রহণ করলে প্রিয়নবী (সা) তাঁর পূর্ব নাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। যদি দেখা যেত যে, তাঁর নামের সঙ্গে অনৈসলামিক কোন ধ্যান-ধারণা জড়িয়ে আছে, অথবা তার না কা’বার পূজারী, সূর্যের পূজারী, ভ্রান্ত পথের অনুসারী অথবা এ জাতীয় কোন অর্থ বহন করে, তাহলে সে নামগুলো পাল্টিয়ে সুবিধাজনক একটি নতুন নাম ঠিক করে দিতেন। বর্তমান সময়ে নওমুসলিমগণ পূর্ব নামের সঙ্গে একটি আরবি নাম যোগ করে থাকেন।
নবী করীম (সা) এর মাতৃভাষা আরবি। তাঁর স্ত্রীগণ উন্মুল মু’মিনীন বা মুসলমানদের মাতা হিসাবে পরিচিত। তাঁরাও আরবি ভাষায় কথা বলতেন। সে হিসাবে প্রতিটি মুসলমানের একটি মাতৃভাষা আরবি। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, আরবি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জগতের মাতৃভাষা। সে কারণেই আরবি ভাষা লেখা, বিশেষকরে মূল আরবিতে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে পারাটা প্রত্যেক মুসলমানের একটি পবিত্র দায়িত্ব।
মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার মাধ্যমে একটি শিশু ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকে। ভূমিষ্ট হওয়ার পর পরই তার ডানকানে আযান এবং বাম কানে আকামত দেওয়া হয়। অর্থাৎ জন্মগ্রহণ করার পর প্রথমেই সে শুনতে পায় আল্লাহর একত্মবাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান এবং আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী ও নিজের কল্যাণের জন্য আহ্বানের কথা। আযানের সময় তাকে শোনান হয় যে, আল্লাহ মহান; আমি শপথ গ্রহণ পূর্বক সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ (মাবুদ) বা উপাস্য নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল। সালাতের জন্য এসো, কল্যাণের জন্য এসো, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ (মা’বুদ)নেই। আকামতের সময় তাকে আযানের সব কথাই শোনানো হয়। তাকে আরো শোনানো হয় যে, ওহে সালাতের সময়  সমুপস্থিত।
বাল্যজীবন ঃ শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর প্রথম চুল কেটে সমস্ত চুলের সমপরিমাণ ওজন রূপা বা টাকা গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। যাদের সঙ্গতি আছে তারা ছাগল বা ভেড়া যবাই করে এবং সেই গোশত দিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও গরীব-দুঃখীদের আপ্যায়ন করে থাকে। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে বলে আকীকা। এরপরেই আসে পুত্র সন্তানকে খাতনা (মুসলমানী) করানোর প্রসঙ্গ। খাতনা করানোর নির্দিষ্ট কোন সময় সীমা নির্ধারণ করা নেই। সাধারণত বাল্য বয়সেই খাতনা করানো হয়। অবশ্য কোন বয়স্ক লোক ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে খাতনা করানোর ব্যাপরে কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
সাধারণত চার বছর পর শিশু লেখাপড়া শুরু করে। এ সময়ে বিশেষ দু’আ-দরূদ ও ভাল খাবারের আয়োজন করা হয়।  শিশুকে সে অনুষ্ঠানেই প্রথম পাঠ দেওয়া হয়। শুভ সূচনা হিসাবে কুরআনুল করীমের সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। শিশু উস্তাদের সঙ্গে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে। বলে রাখা আবশ্যক যে, হেরা গুহায় নবী করীম (সা) সর্বপ্রথম  যখন ওহী লাভ করেন, তখন এ আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল।
সালাত ও সিয়াম ঃ লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকে নামায পড়ার নিয়ম কানুনগুলো শিখতে হয়। তাকে মুখস্থ করতে হয় প্রয়োজনীয় দু’আ-দরূদ ও কুরআনের সূরাসমূহ। সাত বছর বয়সে সে সালাত আদায় করতে শুরু করে। প্রয়োজনবোধে পিতা-মাতা এ জন্য তাকে শাস্তি দেন। বাল্য বয়স থেকে সালাতে অভ্যস্ত করে তোলার জন্য এটা জরুরী।
একটি শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উপর সালাত বা নামায পড়ার ন্যায় রোযা রাখা বা সিয়াম পালন করাটাও ফরয হয়ে পড়ে। অবশ্য মুসলিম পরিবারের শিশুরা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই সিয়াম পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। জীবনে প্রথম যেদিন সিয়াম পালন করে. সেদিন সে খুবই আনন্দিত ও উৎফুল্ল হয়ে থাকে। এমন কি এটা যেন তার পরিবারে একটা উৎসবের রূপ নেয়। সাধারণত বার বছর বয়সে ছেলেমেয়েরা সিয়াম পালন করতে শুরু করে এবং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে এ মাসব্যাপী সিয়াম পালনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।
হজ্ব ঃ সঙ্গতি সম্পন্ন লোকের জন্য জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। জিলহজ্বের দ্বিতীয় সপ্তাহে হজ্ব করা হয়। এ সময়ে হাজীগণ মক্কায় সমবেত হন এবং প্রায় সপ্তাহ ব্যাপী তাঁরা মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা এবং আবার মিনায় অবস্থান করেন। এ তিনটি স্থান মক্কার উপকন্ঠে অবস্থিত। জিলহজ্ব মাস ছাড়াও বছরের যে কোন সময় কা’বা ঘরে যাওয়া যায়। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে বলা উমরাহ।
যিনি হজ্ব করবেন তাকে অবশ্যই নিত্যদিনের পোশাক পরিত্যাগ করতে হবে। এ সময়ে তাকে বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরতে হয়, এটাকে বলে ইহরাম। ইহরামে দুই প্রস্থ কাপড় থাকে। কাপড়ে কোন রকম সেলাই চলে না। এক প্রস্থ কাপড় সে পরিধান করে, অন্য প্রস্থ দিয়ে কাঁধ ও শরীর ঢাকে। কিন্তু সর্বক্ষণের জন্য মাথা উন্মুক্ত রাখে। মহিলারা স্বাভাবিক পোশাক পরে। তবে তা হতে হয় শালীন ও মার্জিত। তাদের হাত এবং পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত সমস্ত শরীর আবৃত রাখতে হয়। মক্কার আরেক নাম হেরেম শরীফ। হেরেম শরীফে প্রবেশের পূর্বেই ইহরাম বাঁধতে হয়। হেরেম শরীফে প্রবেশের পূর্বে যেখান থেকে ইহরামের পোশাক পরিধান করতে হয় সে স্থানকে মীকাত বলে। আর মক্কাবাসীদের ইহরাম বাঁধতে হয় হেরেম শরীফ বা মক্কার অভ্যন্তর থেকে। হেরেম শরীফ থেকে সে চলে যায় মিনায়। ৯ই জিলহজ্ব যায় আরাফাতের ময়দানে। সারাটা দিন সেখানে কাটিয়ে দেয় ইবাদ-বন্দেগী ও দু’আ-দরূদ পাঠের মধ্য দিয়ে। রাত্রি যাপন করে মুযদালিফায় উন্মুক্ত প্রান্তরে। ১০, ১১ ও ১২ তারিখ এ তিন দিন অতিবাহিত করে মিনায়। মিনায়  অবস্থানকালে প্রতিদিন সে শয়তানের প্রতীকিকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে। সুযোগ বুঝে এক সময়ে (১০ কিম্বা ১১ তারিখ) তাকে মক্কায় যেতে হয়। তখন সে তওয়াফ ও সাঈ করে। নির্ধারিত নিয়মে পবিত্র কা’বা ঘর ৭ বার প্রদক্ষিণ করাকে তওয়াফ বলে। আর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে ৭ বার আসা যাওয়াটা হল সাঈ। কা’বা ঘর তওয়াফ এবং সাঈ করার নির্দিষ্ট কতকগুলো পদ্ধতি ও দু’আ রয়েছে। বস্তুতপক্ষে ইহরাম পরিধান করার পর থেকে ইহরাম ছাড়া পর্যন্ত একজনকে সারাক্ষণ আল্লাহর যিকর করতে হয়। এ সময়ের এ যিকরকে বলে তলবিয়া। তলবিয়ার দোয়া এরকম ঃ “লাব্বায়িক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক, লাব্বায়েক লা শারীকা লাকা লাব্বায়িক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক্।
উমরা করার জন্য আরাফাত, মিনা বা মুযদালিফায় যেতে হয় না। কিন্তু যথারীতি তওয়াফ ও সাঈ করতে হয় এবং ইহরামের কাপড় পরিধান করতে হয়। এমনকি মক্কায় বসবাসকারী মুসলমানগণকে উমরা করার জন্য মক্কার  বইরে গিয়ে ইহরাম করে হেরেম শরীফে প্রবেশ করেত হয়। তওয়াফ ও সাঈ করার পর মাথা মুন্ডন করে তারা স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসে।
যাকাত ঃ যাকাত এক ধরনের সাদাকা। সকল প্রকার সঞ্চয়, মওজুদ, সম্পদ, উৎপন্ন ফসলের উপর যাকাত প্রদান করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঃ কৃষিপণ্য, বাণিজ্য সামগ্রী, খনিজ সম্পদ, সরকারী চারণ-ভূমিতে পালিত মেষ-ছাগল, গরু, উট। আজকালকার দিনে মুসলমানগণ সঞ্চিত সম্পদের উপর প্রদত্ত যাকাত ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করে থাকেন। মুসলিম বা অমুসলিম সব রাষ্ট্রেই এ নিয়ম চালূ রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য কর বা খাজনার পরিমাণ স্থানীয় সরকার নির্ধরণ করেন এবং তা আদায়ও করা হয় সরকারী তত্ত্বাবধানে।
যাকাতের হিসাব এ রকম যে, কারো কাছে যদি  সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সমমুল্যের অর্থ এক বছরের বেশি সময় জমা থাকে তাহলে তাকে উক্ত সঞ্চয়ের উপর শতকরা ২.৫% হারে যাকাত প্রদান করতে হয়। যাকাতের অর্থ সরাসরি বিরতণ করা যেতে পারে অথবা কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তা ব্যয় করা বৈধ। যাকাতের অর্থ ব্যয় করার ৮টি খাত আল্লাহ তা’আরা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ব্যক্তি তার ইচ্ছানুযায়ী এক বা একাধিক খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করতে পরে।
বছরের দুটি প্রধান উৎসব দুই ঈদে আরেক ধরনের সাদকা প্রদান করতে হয়। রমযান শেষে ঈদুল ফিতরের সময় দিতে হয় ফিতরা। এর পরিমাণ হল পূর্ণ বয়স্ক একজন লোকের সারা দিনের খোরাকের সমান। এ অর্থ একজন নিঃস্ব দরিদ্র লোকের প্রাপ্য। আবার পবিত্র নগরী মক্কায় যখন হজ্ব পালন করা হয় তখন আসে ইদুল আযহা। এ সময় সঙ্গতি সম্পন্ন লোকেরা গরু, ছাগল অথবা মেষ কোরবানী করে থাকেন। কোরবানীর গোশতের একটি অংশ নিজেদের জন্য রেখে বাকি অংশ দুঃস্থ ও গরীবদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়।
অর্থনীতি প্রসঙ্গে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, একজন মুসলমানের পক্ষে কোন রকম সুদী কারবারে অংশ গ্রহণের অনুমতি নেই। সে বিষয়ে চিন্তার যথেষ্ট অবকাশ আছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জুয়া, লটারী অথবা ফটকাবাজী কোন কাজে হাত দিতে পারে না। স্মরণ রাখতে হবে যে, স্বেচ্ছায় কেউ কখনো সুদ দেয় না। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ঋণ দিয়ে তার উপর সুদ আদায়ের প্রবণতাকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। ব্যাংকে জমা রাখা টাকার উপর যে সুদ আসে সে ব্যাংকটি যদি সুদী কারবারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে এর লভ্যাংশও অবৈধ। কিন্তু এমন অনেক দেশ আছে যেখানে সুদী ব্যাংক ব্যতীত অন্য কোন ব্যাংক নেই। তখন তাকে বাধ্য হয়েই সুদী ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে কেউ যদি ব্যাংকে তার সঞ্চয়ের উপর যে সুদ আসে তা গ্রহণ না করে, তাহলে ব্যাংক ইচ্ছা করলে অদাবিকৃত সুদের অর্থকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দান করতে পারে। কখনো কখনো অনুদান প্রাপ্ত এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে। সে কারণেই ব্যাংকে জামা টাকা উপর যে সুদ আসে তা ছেড়ে না দিয়ে বরং তা গ্রহণ করা উচিত। অবশ্য এ অর্থ নিজের বা পরিবারের জন্য ব্যয় না করে কোন জনহিতকর কাজে ব্যয় করতে হবে। প্রখ্যাত মুফতী সারাখশী বলেছেন যে, “অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ থেকে অবশ্যই মুক্তি পেতে হবে এবং এ সম্পদকে কোন জনহিতকর কাজে ব্যয় করতে হবে”। কারো কারো মতে সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়-দেনার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সোসাইটির সঙ্গে বীমা করা বিধিসম্মত। কিন্ত পুঁজিবাদী মুনাফালোভী কোন কোম্পানীর সঙ্গে বীমা করাটা অবৈধ। (অসমাপ্ত)

হজ্ব আপনি কীভাবে পালন করবেন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

বছর ঘুরে আবারো আসছে মহান হজ্বের মাস। এবার যাঁরা হজ্বে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। এ সম্পর্কে পরিচালক হজ্ব ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল জানালেন, এবার যাঁরা হজ্বে যাচ্ছেন তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকা দেওয়া, স্বাস্থ্যসনদ সংগ্রহ, হজ্বের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র সংগ্রহ করা দরকার। হজের প্রশিক্ষণও নিতে হবে। হজ্ব প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য তথ্য ঢাকার আশকোনা হজ্ব কার্যালয় থেকে জানা যাবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বইপুস্তক বা পরিচিতদের কাছ থেকেও হজ্ব বিষয়ক তথ্য জানতে পারেন। আর হজ্বের প্রয়োজনীয় তথ্য িি.িযধলল.মড়া.নফ ঠিকানায় পাওয়া যাবে। হজ্বে যাচ্ছেন, আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করুন ‘হে আল্লাহ! আমার হজ্বকে সহজ করো, কবুল করো’ দেখবেন, আপনার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। হজ্বের দীর্ঘ সফরে ধৈর্য হারাবেন না। সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মানসিকতা রাখবেন, তাহলে অল্পতেই বিচলিত হবেন না। হজ্বে যাওয়ার আগে পাসপোর্ট, বিমানের টিকিট সংগ্রহ ও তারিখ নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে ভুলবেন না। নিয়ম মেনে ম্যানিনজাইটিস টিকা বা অন্যান্য ভ্যাকসিন দিয়ে নিন। হজ্বের নিয়ম জানার জন্য একাধিক বই পড়তে পারেন। ‘প্রথম আলো হজ্ব গাইড’ চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন। অথবা যাঁরা পড়তে পারেন না, তাঁরা অন্য হাজিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে পারেন। হজ্বের কোনো বিষয়ে বিভিন্নতা দেখলে ঝগড়া করবেন না। আপনি যে আলেমের ইলম ও তাকওয়ার ওপর আস্থা রাখেন, তার সমাধান অনুযায়ী আমল করবেন, তবে সে মতে আমল করার জন্য অন্য কাউকে বাধ্য করবেন না। পরিচিত অথবা এলাকার দলনেতার (গ্র“প লিডার) সঙ্গে আলাপ করতে পারেন। মানসিক প্রস্তুতি জরুরি হজ্ব করতে যাচ্ছেন যাত্রার শুরুতে নিজেকে এমনভাবে মানসিকভাবে তৈরি করে নিন, যেন দেহ-মনে কোনো কষ্ট না থাকে। ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে হজ হলো দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত এবং শ্রমসাধ্য ব্যাপার। মালপত্র হালকা রাখুন, কারণ নিজের মালপত্র নিজেকেই বহন করতে হবে। সঙ্গীদের সম্মান করুন, তাঁদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। দলের (গ্র“পের) দুর্বল বয়স্কদের প্রতি খেয়াল রাখবেন। সৌদি আরবে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ কাবা শরিফে জামাতে আদায় করার চেষ্টা করবেন। যাত্রার শুরুতে ভালো সফরসঙ্গী খুঁজে নেবেন, যাতে নামাজ পড়তে ও চলাফেরায় একে অন্যের সাহায্য নিতে পারেন। আপনি হজ্বের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাচ্ছেন; সেখানকার মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে, রাস্তাঘাট অচেনা। হজ্বযাত্রীদের সেবা করার জন্য সৌদি আরব ও বাংলাদেশ সরকার নানা রকম ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। হজ্বের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র সংগ্রহ করা দরকার। যেমন: ১. বিমানের টিকিট, ডলার কেনা, ২. পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, টাকা রাখার জন্য গলায় ঝোলানো ছোট ব্যাগ, ৩. পুরুষের জন্য ইহরামের কাপড় কমপক্ষে দুই সেট (প্রতি সেটে শরীরের নিচের অংশে পরার জন্য আড়াই হাত বহরের আড়াই গজ এক টুকরা কাপড় আর গায়ের চাদরের জন্য একই বহরের তিন গজ এক টুকরা কাপড়। ইহরামের কাপড় সাদা, সুতি হলে ভালো হয়) আর নারীদের জন্য সেলাইযুক্ত স্বাভাবিক পোশাকই ইহরামের কাপড় ৪. নরম ফিতাওয়ালা স্যান্ডেল, ৫. ইহরাম পরার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হলে কটিবন্ধনী (বেল্ট), ৬. গামছা, তোয়ালে, ৭. লুঙ্গি, গেঞ্জি, পায়জামা, পাঞ্জাবি (আপনি যে পোশাক পরবেন), ৮. সাবান, পেস্ট, ব্রাশ, মিসওয়াক, ৯. নখ কাটার যন্ত্র, সুই-সুতা, ১০. থালা, বাটি, গ্লাস, ১১. হজ্বের বই, কোরআন শরিফ, ধর্মীয় পুস্তক, ১২. কাগজ-কলম, ১৩. শীতের কাপড় (মদিনায় ঠান্ডা পড়ে), ১৪. প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, চশমা ব্যবহার করলে অতিরিক্ত একটি চশমা (ভিড় বা অন্য কোনো কারণে ভেঙে গেলে ব্যবহারের জন্য), ১৫. বাংলাদেশি টাকা (দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার জন্য), ১৬. নারীদের জন্য বোরকা, ১৭. যত দিন বিদেশে থাকবেন, সেই অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ ওষুধ নেবেন, ১৮. মোবাইল সেট (সৌদি আরবে ব্যবহার করা যায়, তেমন সিম কিনে নিতে হবে) ১৯. মালপত্র নেওয়ার জন্য ব্যাগ অথবা স্যুটকেস (তালা-চাবিসহ) নিতে হবে। ব্যাগের ওপর ইংরেজিতে নিজের নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর লিখতে হবে। এর বাইরে আরও কিছু প্রয়োজনীয় মনে হলে তা নিয়ম মেনে সঙ্গে নিতে হবে। ঢাকার আশকোনায় অবস্থিত হাজ ক্যাম্পে টিকা দেওয়া, হজ্বের প্রশিক্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রা কেনাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস পাওয়া যায়। ঢাকার হাজ ক্যাম্প বিমানে যাত্রার আগে হাজ ক্যাম্পে যত দিন অবস্থান করবেন, আপনার মালপত্র খেয়াল রাখবেন। কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন নেওয়া বাকি থাকলে অবশ্যই তা নিয়ে নিন। প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে নিন। ব্যাগেজ নিয়মকানুন বিমানে উড্ডয়নকালে হাত ব্যাগে ছুরি, কাঁচি, দড়ি নেওয়া যাবে না। বিমান কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা অনুযায়ী বিমানে কোনো হজ্বযাত্রী সর্বোচ্চ ৩০ কেজির বেশি মালামাল বহন করতে পারবেন না। নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত কোনো ওষুধ নিতে পারবেন না। চাল, ডাল, শুঁটকি, গুড় ইত্যাদিসহ পচনশীল খাদ্যদ্রব্য যেমন: রান্না করা খাবার, তরিতরকারি, ফলমূল, পান, সুপারি ইত্যাদি সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া যাবে না । জরুরি কাগজপত্র ১০ কপি পাসপোর্ট আকারের ছবি, স্ট্যাম্প আকারের ৬ কপি ছবি, পাসপোর্টের ২-৩ পাতার সত্যায়িত ফটোকপি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ, টিকা কার্ড। নারী হজ্বযাত্রীর ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত মাহরামের সঙ্গে সম্পর্কের সনদ, ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ। প্রত্যেক হজ্বযাত্রীর ৭ সংখ্যার একটি পরিচিতি নম্বর থাকে। এর প্রথম ৪ সংখ্যা এজেন্সির নম্বর আর শেষ ৩ সংখ্যা হজ্বযাত্রীর পরিচিতি নম্বর। এই নম্বরটি জানা থাকলে হজ্বযাত্রী ও তাঁর আত্মীয়স্বজন ওয়েবসাইটে ওই হাজির তথ্য পেতে পারেন সহজে। বাড়তি সতর্কতার জন্য নিজের নাম, পাসপোর্ট নম্বর, হজ্ব এজেন্সির নাম এবং সৌদি আরবে সংশ্লিষ্ট হজ্ব এজেন্সির প্রতিনিধির মোবাইল নম্বরসহ ঠিকানা ইংরেজিতে লিখে রাখুন। সৌদি আরবে অবস্থানকালে বাসস্থানের বাইরে গেলে হজ্বযাত্রীকে পরিচয়পত্র, মোয়াল্লেম কার্ড ও হোটেলের কার্ড অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে। ইহরাম আপনার গন্তব্য ঢাকা থেকে মক্কায়, নাকি মদিনায় তা জেনে নিন। যদি মদিনায় হয়, তাহলে এখন ইহরাম বাঁধা নয়; যখন মদিনা থেকে মক্কায় যাবেন, তখন ইহরাম বাঁধতে হবে। বেশির ভাগ হজ্বযাত্রী আগে মক্কায় যান। যদি মক্কা যেতে হয়, তাহলে ঢাকা থেকে বিমানে ওঠার আগে ইহরাম বাঁধা ভালো। কারণ, জেদ্দা পৌঁছানোর আগেই ‘মিকাত’ বা ইহরাম বাঁধার নির্দিষ্ট স্থান। বিমানে যদিও ইহরাম বাঁধার কথা বলা হয়, কিন্তু ওই সময় অনেকে ঘুমিয়ে থাকেন; আর বিমানে পোশাক পরিবর্তন করাটাও দৃষ্টিকটু। বিনা ইহরামে মিকাত পার হলে এ জন্য দম বা কাফফারা দিতে হবে। তদুপরি গুনাহ হবে। ইহরাম গ্রহণের পর সাংসারিক কাজকর্ম নিষেধ যেমন সহবাস করা যাবে না, পুরুষদের জন্য কোনো সেলাই করা জামা, পায়জামা ইত্যাদি পরা বৈধ নয়, কথা ও কাজে কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না, নখ, চুল, দাড়ি-গোঁফ ও শরীরের একটি পশমও কাটা বা ছেঁড়া যাবে না, কোনো ধরনের সুগন্ধি লাগানো যাবে না, কোনো ধরনের শিকার করা যাবে না, ক্ষতিকারক সকল প্রাণী মারা যাবে। ক্ষতি করে না এমন কোনো প্রাণী মারা যাবে না। ঢাকা বিমানবন্দর উড্ডয়নের সময় অনুযায়ী বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে লাগেজে যে মালপত্র দেবেন, তা ঠিকমতো বাঁধা হয়েছে কি না, দেখে নেবেন। বিমানের কাউন্টারে মালপত্র রেখে এর টোকেন দিলে তা যতœ করে রাখবেন। কারণ, জেদ্দা বিমানবন্দরে ওই টোকেন দেখালে সেই ব্যাগ আপনাকে ফেরত দেবে। ইমিগ্রেশন, চেকিংয়ের পর নিজ মালপত্র যতেœ রাখুন। বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র, বিমানের টিকিট, টিকা দেওয়ার কার্ড, অন্য কাগজপত্র, টাকা, বিমানে পড়ার জন্য ধর্মীয় বই ইত্যাদি গলায় ঝোলানোর ব্যাগে যতেœ রাখুন। সময়মতো বিমানে উঠে নির্ধারিত আসনে বসুন। জেদ্দা বিমানবন্দর বিমান থেকে নামার পর দেখবেন, একটি হলঘরে বসার ব্যবস্থা করা আছে। অবতরণ কার্ড, হেলথ কার্ড, পাসপোর্ট ইত্যাদি কাগজপত্র বের করুন। এই হলঘরের পাশেই ইমিগ্রেশন কাউন্টার। ইমিগ্রেশন পুলিশ ভিসা দেখে (ছবি ও আঙুলের ছাপ নিয়ে) পাসপোর্টের নির্দিষ্ট পাতায় সিল দেবেন। বিমানের বেল্টে মালামাল খুঁজে নিরাপত্তা-তল্লাশির জন্য মালামাল দিন। তারপর মোয়াল্লেমের কাউন্টার। সৌদি আরবে বিমানবন্দরে নামার পর থেকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে হাজিদের মক্কা-মদিনায় পৌঁছানো, মক্কা-মদিনায় আবাসন, মিনা, মুজদালিফা, আরাফাতে থাকা-খাওয়া, যাতায়াতসহ সবকিছুর ব্যবস্থা যাঁরা করেন, তাঁদের বলা হয় মোয়াল্লেম। সৌদি আরবের নাগরিকেরাই হতে পারেন মোয়াল্লেম। প্রত্যেক মোয়াল্লেমের নির্দিষ্ট নম্বর আছে। মোয়াল্লেমের কাউন্টার থেকে মিলিয়ে নেবেন তার অধীন কোন কোন হাজি সৌদি আরবে এসে পৌঁছেছেন। লাল-সবুজ পতাকা অনুসরণ করে ‘বাংলাদেশ প্লাজায়’ পৌঁছাবেন। হজ্ব টার্মিনাল শুধু হজ্বযাত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। শুধু হজ্বের সময় (জিলক্বদ, জিলহজ্ব ও মহররম মাসে) এটি চালু থাকে। বছরের বাকি সময় বন্ধ থাকে। বিমানবন্দর টার্মিনালের চারদিক খোলা। ঐতিহ্যবাহী তাঁবুর নকশায় করা ছাদ। এই হজ্ব টার্মিনালের স্থপতি কিন্তু বাংলাদেশি। নাম ফজলুর রহমান খান, যিনি এফ আর খান নামে পরিচিত। হজ্ব টার্মিনাল হজ্ব টার্মিনালের ‘বাংলাদেশ প্লাজায়’ গিয়ে অপেক্ষা করুন। অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে, ধৈর্য হারাবেন না। সেখানে অজু করা, নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। বসার জন্য চেয়ারও রয়েছে। প্রতি ৪৫ জনের জন্য একটি বাসের ব্যবস্থা। মোয়াল্লেমের গাড়ি আপনাকে জেদ্দা থেকে মক্কায় যে বাড়িতে থাকবেন, সেখানে নামিয়ে দেবে। মোয়াল্লেমের নম্বর (আরবিতে লেখা) কবজি বেল্ট দেওয়া হবে আপনাকে, তা হাতে পরে নেবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র (যাতে পিলগ্রিম নম্বর, নাম, ট্রাভেল এজেন্টের নাম ইত্যাদি থাকবে) গলায় ঝোলাবেন। জেদ্দা থেকে মক্কায় পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। চলার পথে তালবিয়া পড়–ন (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক)। মক্কায় পৌঁছানোর পর মক্কায় পৌঁছে আপনার থাকার জায়গায় মালপত্র রেখে ক্লান্ত থাকলে বিশ্রাম করুন। আর যদি নামাজের ওয়াক্ত হয়, নামাজ আদায় করুন। বিশ্রাম শেষে দলবদ্ধভাবে ওমরাহর নিয়ত করে থাকলে ওমরাহ পালন করুন। মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফ) অনেক প্রবেশপথ আছে। সব কটি দেখতে একই রকম। কিন্তু প্রতিটি প্রবেশপথে আরবি ও ইংরেজিতে ১, ২, ৩ নম্বর ও প্রবেশপথের নাম আছে, যেমন ‘বাদশা আবদুল আজিজ প্রবেশপথ’। আপনি আগে থেকে ঠিক করবেন, কোন প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকবেন বা বের হবেন। সফরসঙ্গীকেও স্থান চিনিয়ে দিন। তিনি যদি হারিয়ে যান, তাহলে নির্দিষ্ট নম্বরের গেটের সামনে থাকবেন। এতে ভেতরে ভিড়ে হারিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট স্থানে এসে সঙ্গীকে খুঁজে পাবেন। কাবা শরিফে জুতা-স্যান্ডেল রাখার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকবেন, নির্দিষ্ট স্থানে জুতা রাখার জায়গায় রাখুন। যেখানে-সেখানে জুতা রাখলে পরে খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রতিটি জুতা রাখার র‌্যাকেও নম্বর দেওয়া আছে। এই নম্বর মনে রাখুন। চাইলে জুতা বহন করার ব্যাগ সঙ্গে রাখতে পারেন। কাবা ঘরের চারটি কোণের আলাদা নাম আছে: হাজরে আসওয়াদ, রকনে ইরাকি, রকনে শামি ও রকনে ইয়ামেনি। হাজরে আসওয়াদ বরাবর কোণ থেকে শুরু হয়ে কাবাঘরের পরবর্তী কোণ রকনে ইরাকি (দুই কোণের মাঝামাঝি স্থান মিজাবে রহমত ও হাতিম)। তারপর যথাক্রমে রকনে শামি ও রকনে ইয়ামেনি। এটা ঘুরে আবার হাজরে আসওয়াদ বরাবর এলে তাওয়াফের এক চক্কর পূর্ণ হয়। এভাবে একে একে সাত চক্কর দিতে হয়। ওমরাহর নিয়মকানুন আগে জেনে নেবেন। এসব কাজ ধারাবাহিকভাবে করতে হবে, যেমন: সাতবার তওয়াফ করা, নামাজ আদায় করা, জমজমের পানি পান করা, সাঈ করা (সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানো যদিও মসৃণ পথ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত), মাথা ন্যাড়া অথবা চুল ছোট করা। ওয়াক্তের নামাজের সময় হলে, যতটুকু হয়েছে ওই সময় নামাজ পড়ে আবার বাকিটুকু শেষ করা। ওমরাহ হিল (কাবা শরিফের সীমানার বাইরে মিকাতের ভেতরের স্থান) থেকে অথবা মিকাত থেকে ইহরাম বেঁধে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়া বা ছোট করাকে ওমরাহ বলে। হজ তিন প্রকার তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ। হজ্বের মাসসমূহে (শাওয়াল, জিলক্বদ, জিলহজ্ব) ওমরাহর নিয়তে ইহরাম করে, ওমরাহ পালন করে, পরে হজ্বের নিয়ত করে হজ পালন করাকে হজ্বে তামাত্তু বলে। হজ্বের মাসসমূহে একই সঙ্গে হজ্ব ও ওমরাহ পালনের নিয়তে ইহরাম করে ওমরাহ ও হজ্ব করাকে হজ্বে কিরান বলে। আর শুধু হজ পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধে হজ্ব সম্পাদনকে হজ্বে ইফরাদ বলে। আরও কিছু পরামর্শ সৌদি আরবে অবস্থানকালে ট্রাফিক আইন মেনে চলুন। সিগন্যাল পড়লে রাস্তা পার হতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার সময় অবশ্যই ডানে-বায়ে দেখেশুনে সাবধানে পার হতে হবে। কখনো দৌড়ে রাস্তা পারাপার হবেন না। কাবা শরিফ ও মসজিদে নবিবর ভেতরে কিছুদূর পরপর পবিত্র কোরআন মজিদ রাখা আছে। আর পাশে জমজম পানি (স্বাভাবিক ও ঠান্ডা) খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো ধরনের অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনায় পড়লে বাংলাদেশ হজ্ব মিশনের মেডিকেল সদস্যের (চিকিৎসক) সঙ্গে যোগাযোগ করুন। হজ্বযাত্রীদের তথ্য, হারানো হজ্বযাত্রীদের খুঁজে পাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশ হজ্ব মিশনে অবস্থিত আইটি হেল্প ডেস্ক সাহায্য করে। মিনার ম্যাপ থাকলে হারানোর ভয় নেই। মিনার কিছু অবস্থান চিনে নিজের মতো করে আয়ত্তে আনলে এখানে চলাচল করা সহজ হয়। যেমন জামারা (শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপের স্থান), মসজিদে খায়েফ, মিনায় তিনটি ব্রিজ:কিং খালেদ ব্রিজ ১৫ নম্বর, বাদশাহ আবদুল্লাহ ব্রিজ ২৫ নম্বর, বাদশাহ ফয়সাল ব্রিজ ৩৫ নম্বর। হাঁটার পথ (টিনশেড নামে পরিচিত)।
এখানে সাতটি জোন রয়েছে। মিনার বড় রাস্তাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নাম ও নম্বর রয়েছে। রাস্তার নাম ও নম্বর জানা থাকলে মিনায় চলাচল সহজ হয়। পথ হারানোর সুযোগ কম থাকে। বড় রাস্তাগুলো হলো: কিং ফয়সাল রোড ৫০ নম্বর রাস্তা, আলজাওহারাত রোড ৫৬ নম্বর রাস্তা, সুক্কল আরব রোড ৬২ নম্বর রাস্তা, কিং ফাহাদ রোড ৬৮ নম্বর রাস্তা। মিনায় রেলস্টেশন ৩টি। মুজদালিফায় রেলস্টেশন ৩টি। এ ছাড়া রয়েছে সুড়ঙ্গপথ, টানেল, পায়ে চলার রাস্তা, হাসপাতাল, মসজিদ, পোস্ট অফিস, মিনার বাদশাহ বাড়ি, রয়েল গেস্টহাউস (রাজকীয় অতিথি ভবন) মোয়াচ্ছাসা কার্যালয়। ছাপানো অথবা ইন্টারনেটে মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাতের মানচিত্র পাওয়া যায়। সম্ভব হলে মানচিত্র দেখুন তাহলে ওখানকার রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি সম্পর্কে একটা ধারণা পাবেন। হাজিদের একটি অংশ নিজে মুস্তাহালাকায় (পশুর হাট ও জবাই করার স্থান) গিয়ে কোরবানি দেয়। অন্য অংশ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) মাধ্যমে কোরবানি দেয়। আইডিবির কুপন কিনে কোরবানি দেওয়া সৌদি সরকারের স্বীকৃত ব্যবস্থা । মনে রাখবেন, মসজিদে নববি ও মসজিদুল হারামের সীমানার মধ্যে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাঁচি কিংবা কাশি দেওয়ার সময় অবশ্যই মুখ ঢেকে নিতে হবে। শরীরের কোনো স্থান কেটে গেলে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ব্যবহার করুন। কোনো কোনো হজ্বযাত্রী হেঁটে হজ্বের আমলগুলো করে থাকেন। যেমন মক্কা থেকে মিনার দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। আরাফাত থেকে মুজদালিফার দূরত্ব প্রায় নয় কিলোমিটার। মুজদালিফা থেকে মিনার দূরত্ব প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। এসব স্থানবিশেষে হেঁটে যেতে এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। মাহরাম (যেসব পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ। যেমন স্বামী, বাবা, আপন ভাই, আপন চাচা-মামা, ছেলে ইত্যাদি) ছাড়া নারী হজ্বযাত্রী এককভাবে হজ্বে গমনের যোগ্য বিবেচিত হন না; নারী হজ্বযাত্রীকে মাহরামের সঙ্গে একত্রে টাকা জমা দিতে হয়। মক্কায় বাসার দূরত্ব নির্ধারিত হয় কাবা শরিফ থেকে। আর মদিনায় মসজিদে নবিব থেকে। বাসস্থান কত দূর, তার ওপর নির্ভর করে হজ্বের ব্যয়ের টাকা। অর্থাৎ কাবা শরিফ থেকে বাসার দূরত্ব কম হলে খরচ বেড়ে যাবে। যত বেশি দূরত্ব হবে, খরচও তত কম হবে। হজ্বের সময় হজ্বযাত্রীদের যেন কোনো রকম কষ্ট না হয়, আপনার ট্রাভেল এজেন্সি আপনাকে যথাযথ সুবিধাদি (দেশ থেকে আপনাকে থাকা, খাওয়াসহ অন্য যেসব সুবিধার কথা বলেছিল) না দিলে আপনি মক্কা ও মদিনার বাংলাদেশ হজ্ব মিশনকে জানাতে পারেন। এতেও আপনি সন্তুষ্ট না থাকলে সৌদির ওয়াজারাতুল হজ (হজ্ব মন্ত্রণালয়) বরাবর লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। মদিনা থেকে যদি মক্কায় আসেন, তাহলে ইহরামের কাপড় সঙ্গে নিতে হবে। মিনায় মোয়াল্লেম নম্বর বা তাঁবু নম্বর জানা না থাকলে যে কেউ হারিয়ে যেতে পারেন। মোয়াল্লেম অফিস থেকে তাঁবুর নম্বরসহ কার্ড দেওয়া হয়। তা যতেœ রাখতে হবে। বাইরে বের হওয়ার সময়ও কার্ডটি সঙ্গে রাখুন। সমস্যা এড়ানোর জন্য যে তাঁবুতে অবস্থান করবেন, সেই তাঁবু চিহ্নিত করে নিন। মিনায় জামারা থেকে আপনার তাঁবুর অবস্থান, তাঁবু থেকে মসজিদুল হারামে যাওয়া-আসার পথ সম্পর্কে ধারণা নিন। ভিড় এড়াতে কেউ কেউ হেঁটে সুড়ঙ্গ (টানেলের) পথ দিয়ে মসজিদুল হারামে পৌঁছান। হাঁটার পথ চিনতে স্থানীয় (কোনো বাংলাদেশিকে বললে দেখিয়ে দেবেন) বা গুগল ম্যাপের সহায়তা নিতে পারেন। অনেকে ট্যাবলেট বা আইফোন নিয়ে যান। রাস্তাঘাট, অবস্থান ইত্যাদি জানতে হজ ও পিলগ্রিম অ্যাপসের সহায়তা নিতে পারেন। আরাফাতের ময়দানে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে খাবার, জুস, ফল ইত্যাদি দিয়ে থাকে। ওই সব খাবার আনতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়তে হয়। তাই এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। মুজদালিফায় রাতে থাকার জন্য প্লাস্টিকের পাটি ব্যবহার করতে পারেন। মক্কাসহ বিভিন্ন জায়গায় পাটি কিনতে পাওয়া যায়। মিনায় চুল কাটার লোক পাওয়া যায়। নিজেরা নিজেদের চুল কাটবেন না, এতে মাথা কেটে যেতে পারে। মিনায় কোনো সমস্যা হলে বাংলাদেশ হজ্ব মিশনের তাঁবুতে যোগাযোগ করবেন। হজ্বযাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড়ে পথ হারানোর আশঙ্কা থাকে। তবে এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এ ব্যাপারে হজ্বযাত্রীদের সচেতন থাকতে হবে। অনেক বাংলাদেশি হজ্বযাত্রী হারিয়ে যাওয়ার কারণে হজ্বের আহকাম বা নিয়মকানুন ঠিকমতো পালন করতে পারেন না। মক্কা-মদিনায় প্রচুর বাংলাদেশি হোটেল আছে। মক্কার হোটেলগুলোর নাম ঢাকা, এশিয়া, চট্টগ্রাম, জমজম ইত্যাদি। এসব হোটেলে ভাত, মাছ, মাংস, সবজি, ডাল সব ধরনের বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। হোটেল থেকে পার্সেলে একজনের খাবার কিনলে বাড়িতে বসে অনায়াসে দুজন খেতে পারেন। মক্কা-মদিনায় প্রচুর ফলমূল ও ফলের রস পাওয়া যায়। এগুলো কিনে খেতে পারেন। মক্কা-মদিনায় অনেক বাংলাদেশি কাজ করেন, তাই ভাষাগত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কেনাকাটার সময় দরদাম করে কিনবেন। হজ্বের সময় প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়, পকেটে টাকা থাকলেও যানবাহন পাওয়া যায় না। (অসমাপ্ত)

মহান হজ্বের গুরুত্ব ও ফযীলত

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের পঞ্চমটি হল হজ্বে বায়তুল্লাহ। ঈমান, নামাজ, যাকাত ও রোজার পরই হজ্বের অবস্থান। হজ্ব মূলত কাযড়ক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বিত একটি ইবাদত। তাই উভয় দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর হজ্ব পালন করা ফরয। অর্থাৎ হজ্ব আদায়ে সক্ষম এমন শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচাপাতি ও আসবাবপত্রের অতিরিক্ত হজ্বে যাওয়া-আসার ব্যয় এবং হজ্ব আদায়কালীন সাংসারিক ব্যয় নির্বাহে সক্ষম এমন সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর হজ্ব আদায় করা ফরয। হজ্ব প্রত্যেক মুসলমানের উপর সারা জীবনে একবারই ফরজ হয়। একবার ফরজ হজ্ব আদায়ের পর পরবর্তী হজ্বগুলো নফল হিসেবে গণ্য হবে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন- হে মানবসকল! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর হজ্ব ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ্ব করো। এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! প্রতি বছর কি হজ্ব করতে হবে? তিনি চুপ রইলেন এবং লোকটি এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করল। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তাহলে তা (প্রতি বছর হজ্ব করা) ফরজ হয়ে যেতো, কিন্তু তোমাদের পক্ষে তা করা সম্ভব হতো না।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৩৭ (৪১২); মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১০৬০৭; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৭০৪; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫০৮; সুনানে নাসায়ী ৫/১১০; শরহে মুশকিলুল আছার, হাদীস : ১৪৭২; সুনানে দারাকুতনী ২/২৮১
ইবনে আববাস (রা.) হতে বর্ণিত অনুরূপ হাদীসে আরো বলা হয়েছে, হজ্ব (ফরজ) হল একবার, এরপরে যে অতিরিক্ত আদায় করবে তা নফল হিসেবে গণ্য।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩০৪; সুনানে দারিমী, হাদীস : ১৭৮৮; সুনানে নাসায়ী ৫/১১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ১৭২১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৮৬; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ৩২০৯
হজ্ব যেহেতু একবারই ফরজ তাই যার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে সে যদি মৃত্যুর আগে যে কোনো বছর হজ্ব আদায় করে, তবে তার ফরয আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু হজ্ব বিধানের মৌলিক তাৎপর্য, তার যথার্থ দাবি ও আসল হুকুম হচ্ছে হজ্ব ফরয হওয়ার সাথে সাথে আদায় করা। বিনা ওজরে বিলম্ব না করা। কারণ বিনা ওজরে বিলম্ব করাও গুনাহ। আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল ফরয হজ্ব আদায়ের প্রতি এমনভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন যে, কেউ যদি এই হজ্বকে অস্বীকার করে বা এ বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলা প্রদর্শন করে তবে সে আল্লাহর জিম্মা থেকে মুক্ত ও হতভাগ্যরূপে বিবেচিত হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-(তরজমা) মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের উপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ্ব করা ফরয। আর কেউ যদি অস্বীকার করে তাহলে তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।-সূরা আলে ইমরান (৩) : ৯৭।  তাছাড়া যে কোনো ধরনের বিপদ-আপদ, অসুখ-বিসুখের সম্মুখীন হওয়া বা মৃত্যুর ডাক এসে যাওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। তাই হজ্ব ফরয হওয়ার পর বিলম্ব করলে পরে সামর্থ্য হারিয়ে ফেললে বা মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তাআলার নিকট অপরাধী হিসেবেই তাকে হাজির হতে হবে। এজন্যই হাদীস শরীফে হজ্ব ফরয হওয়ামাত্র আদায় করার তাগিদ ও হুকুম দেওয়া হয়েছে। ইবনে আববাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি হজ্ব করার ইচ্ছে করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয়। কারণ যে কোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থাও না থাকতে পারে অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৮৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৮৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ১৭৩২; সুনানে দারিমী, হাদীস : ১৭৮৪; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৮৭; তবারানী, হাদীস : ৭৩৮। অন্য বর্ণনায় ইরশাদ হয়েছে, ইবনে আববাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ফরয হজ্ব আদায়ে তোমরা বিলম্ব করো না। কারণ তোমাদের কারো জানা নেই তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৮৬৭; সুনানে কুবরা বায়হাকী ৪/৩৪০। উপরন্তু একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা যে সচ্ছল সামর্থ্যবান ব্যক্তি সত্ত্বর হজ্ব আদায় করে না তাকে হতভাগা ও বঞ্চিত আখ্যায়িত করেছেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দার শরীরকে সুস্থ রাখলাম, তার রিযিক ও আয়-উপার্জনে প্রশস্ততা দান করলাম। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি সে আমার গৃহের হজ্বের উদ্দেশ্যে আগমন না করে তবে সে হতভাগ্য, বঞ্চিত।-সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯৫; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস : ১০৩১; তবারানী, হাদীস : ৪৯০; সুনানে কুবরা বায়হাকী ৫/২৬২; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৫৯। শুধু তাই নয়, একসময় বায়তুল্লাহ উঠিয়ে নেয়া হলে মানুষ হজ্ব করতে পারবে না এই আশঙ্কার কারণেও আল্লাহর রাসূল উম্মতকে তাড়াহুড়া হজ্ব করার হুকুম করেছেন। ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- তোমরা হজ্ব ও উমরার মাধ্যমে এই (বায়তুল্লাহ) গৃহের উপকার গ্রহণ কর। কেননা তা ইতিপূর্বে দু’বার ধ্বংস হয়েছে। তৃতীয়বারের পর উঠিয়ে নেওয়া হবে।-সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫০৬; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৬৭১৮; মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১০৭২; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৬৫২। হজ্ব করার শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থ-বিত্ত থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ্ব করে না তার সম্পর্কে হাদীস শরীফে কঠোর হুমকি প্রদান করা হয়েছে। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন- যে ব্যক্তি হজ্ব করার সামর্থ্য রাখে, তবুও হজ্ব করে না সে ইহুদী হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি খৃস্টান হয়ে তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই।-তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৫৭৮। তিনি আরো বলেন, আমার ইচ্ছে হয় কিছু লোককে বিভিন্ন শহরাঞ্চল ও লোকালয়ে পাঠিয়ে দিই, তারা সেখানে দেখবে, কারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করছে না। তারা তাদের উপর কর আরোপ করবে। তারা মুসলমান নয়, তারা মুসলমান নয়।-প্রাগুক্ত
যারা হজ্ব-উমরা না করে সন্ন্যাসী হওয়ার চেষ্টা করে ইসলাম তা কখনো অনুমোদন করে না। ইবনে আববাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ইসলামে বৈরাগ্য নেই। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হজ্বের ক্ষেত্রে কোনো বৈরাগ্য নেই।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৩১১৩, ৩১১৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ১৭২৯; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৮৬; তবারানী, হাদীস : ১১৫৯৫; শরহু মুশকিলুল আছার, হাদীস : ১২৮২। ইকরামা রাহ.কে জিজ্ঞাসা করা হল, সারুরা কী? তিনি বলেন, যে ব্যক্তি হজ্ব-উমরাহ কিছুই করে না অথবা যে ব্যক্তি কুরবানী করে না।-শরহু মুশকিলুল আছার ২/২১৫-১৬। সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাহ. বলেন, জাহেলী যুগে যখন কোনো ব্যক্তি হজ্ব করত না তখন তারা বলত, সে সারুরা (বৈরাগী)। তখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসলামে বৈরাগ্য নেই।-প্রাগুক্ত
যারা হজ্বের সফরের সৌভাগ্য লাভ করেন তারা যেন আল্লাহর মেহমান। তাই প্রত্যেকের উচিত সর্বদা আল্লাহর আনুগত্য ও তার ইশক-মুহববতের অনুভূতি নিয়ে সেখানে অবস্থান করা। বায়তুল্লাহ ও আল্লাহর অন্যান্য শোর ও নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। দ্বন্দ-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ এবং অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে সর্বাত্মকভাবে দূরে থাকা। কুরআন-হাদীসে এ সম্পর্কে বিশেষ হুকুম নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- (তরজমা) হজ্বের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের উপর হজ্ব অবধারিত করে নেয় সে হজ্বের সময় কোনো অশ্লীল কথা বলবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়া করবে না। তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করবে আল্লাহ তা জানেন।-সূরা বাকারা (২) : ১৯৭। উক্ত আয়াতে তিনটি বিষয় থেকে বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এক. ইহরাম অবস্থায় অশ্লীল কথা বলা। এমনকি স্ত্রীর সাথে যৌন উত্তেজনামূলক কথা বলাও নিষিদ্ধ। দুই. কোনো ধরনের গুনাহয় লিপ্ত হওয়া। ইহরাম অবস্থার বিশেষ গুনাহ যেমন শরীরের কোনো স্থানের চুল, পশম বা নখ কাটা, আতর বা সুগন্ধি লাগানো, পশু শিকার করা, শরীরে উকুন মারা থেকে যেরূপ বিরত থাকবে তেমনি সাধারণ অবস্থার গুনাহ যেমন অন্যকে কষ্ট দেওয়া, কু-দৃষ্টি ও গীবত শেকায়েত থেকেও বিরত থাকবে। তিন. ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া। এ ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা ও ঝগড়া-বিবাদমুক্ত হজ্বকেই হাদীস শরীফে হজ্বে মাবরূর বা মকবুল হজ্ব বলা হয়েছে এবং এর বিশেষ বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা উল্লেখিত হয়েছে। এখানে কিছু ফযীলত বর্ণনা করা হল।
হজ্ব পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মুছে দেয় : আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি হজ্ব করে আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।-সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৮১১। অন্য বর্ণনায় রয়েছে আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব করল এবং অশ্লীল কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ্ব থেকে ফিরে আসবে যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছিল।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৫০; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৭৩৮১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৮১; সুনানে নাসায়ী ৫/১১৪; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯৪; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১৪। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে-আতা ইবনে ইয়াসার রাহ. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর হজ্ব করে, হজ্বের বিধানগুলো যথাযথভাবে আদায় করে, মুসলমানরা তার মুখ ও হাত থেকে নিরাপদ থাকে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৮৮১৭; তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৩৫৮। আমর ইবনুল আস রা. বর্ণনা করেন, (দীর্ঘ এক হাদীসে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হে আমর! তুমি কি জান না যে, ইসলাম (গ্রহণ) পূর্বেকার যাবতীয় পাপকে মুছে ফেলে। হিজরত তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয় এবং হজ্ব অতীতের পাপসমূহ মুছে দেয়।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১২১; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৭৭৭৭; শরহু মুশকিলিল আছার, হাদীস : ৫০৭
হজ্বে মাবরূরের প্রতিদান হল জান্নাত : আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- এক উমরা আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর হজ্বে মাবরূরের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৪৯; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৭৩৫৪; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯৫; সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৯৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৮৮; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১২৭৮২। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-তোমরা হজ্ব ও উমরা পরপর একত্রে পালন কর। কেননা এ দুটি (হজ্ব ও উমরাহ) দারিদ্র ও গুনাহসমূহ এমনভাবে দূর করে দেয় যেমন কামারের হাপর লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা দূর করে দেয়। আর হজ্বে মাবরূরের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।-সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৮১০; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৩৬৬৯; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১২৭৮০; সুনানে কুবরা, নাসায়ী, হাদীস : ৩৬১০; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১২; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯৩; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস : ৪৯৭৬; তবারানী, হাদীস : ১০৪৬০। জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- হজ্বে মাবরূরের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। জিজ্ঞাসা করা হল, হজ্বের সদাচার কী? তিনি বললেন, খানা খাওয়ানো এবং উত্তম কথা বলা (অর্থাৎ অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা পরিত্যাগ করা)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, খানা খাওয়ানো ও বেশি বেশি সালাম করা (সালামের বিস্তার ঘটানো)।-সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ৩০৭২; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস : ৪১১৯; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৪৪৮২; তবারানী আওসাত ১/১১৩; মুসনাদে আবু দাউদ, ত্বয়ালিসী, হাদীস : ১৭১৮; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৮১২; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৮৮১৭
সর্বোত্তম আমল হজ্বে মাবরূর : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞাসা করা হল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞাসা করা হল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, হজ্বে মাবরূর বা কবুল হজ্ব।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৮৩; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৭৫৯০; সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ১৬৫৮; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ১৫৩; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস : ২০২৯৬; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস : ৪২১১। মাযড়য (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, কোন আমল সর্বোত্তাম? তিনি বললেন, এক আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা। তারপর জিহাদ করা। অতপর কবুল হজ্ব অন্যান্য আমল হতে এত উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ যেরূপ সূর্যের উদয়াচল হতে অস্তাচলের ব্যবধান।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৯০১০; তবারানী ২০/৮০৯; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৬৩।  এ সম্পর্কিত অন্য একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আমর ইবনে আবাসা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-অতপর এমন দুটি আমল, যা অন্য সকল আমল হতে শ্রেষ্ঠ। তবে যে ব্যক্তি তার অনুরূপ আমল করে তা ব্যতীত : মকবুল হজ্ব অথবা মকবুল উমরা।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৭০৭; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস : ২০১০৭; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৬১
নারী, বৃদ্ধ, দুর্বল ব্যক্তি ও শিশুদের জিহাদ হল হজ্ব ও উমরাহ : উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করি। আমরা কি জিহাদ করব না? তিনি বললেন, না। বরং তোমাদের নারীদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হল হজ্বে মাবরূর।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫২০; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৪৪২২; সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ৩৬০৭; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৭০২; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস : ৪৭১৭; শরহু মুশকিলিল আছার, হাদীস : ৫৬০৯। অন্য বর্ণনায় রয়েছে-আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ করব না? তিনি বললেন, তোমাদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও উত্তম জিহাদ হল হজ্বে মাবরূর। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাললাম থেকে এ কথা শুনার পর হতে আমি হজ্ব ছাডড়নি।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৮৬১; মুসনাদে আহমদ,  হাদীস : ২৪৪৯৭; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৪/৩২৬। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাললাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- বৃদ্ধ, দুর্বল ও নারীর জিহাদ হল হজ্ব ও উমরা।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ৯৪৫৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৯৭০৯; সুনানে নাসায়ী ৫/১১৩; তবারানী আওসাত, হাদীস : ৮৭৪৬; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৪/৩৫০। হুসাইন বিন আলী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমি ভীরু ও দুর্বল (জিহাদে যাওয়ার শক্তি-সামর্থ্য নেই)। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি অস্ত্র ও শত্রুর সাথে লড়াইবিহীন জিহাদ-হজ্ব পালন করতে এস।-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৮৮০৯; তবারানী, হাদীস : ২৯১০; সুনানে সাঈদ ইবনে মনসূর, হাদীস : ২৩৪২; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৫৮
হজ্ব ও উমরাকারীর দুআ কবুল করা হয় : জাবির রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- হজ্ব ও উমরাকারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা দুআ করলে তাদের দুআ কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তা দেওয়া হয়।-মুসনদে বাযযার, হাদীস : ১১৫৩; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫২৮৮; তবারানী, হাদীস : ১৭২১। ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাললাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী (গাযী), হজ্ব ও উমরা আদায়কারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা দুআ করলে দুআ কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তা দেওয়া হয়।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৯৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৪৬১৩। আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-তিন প্রকারের লোক আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি : গাযী, হজ্ব ও উমরাকারী।-সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৯২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১১; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৫৩; সুনানে নাসায়ী ৫/১১৩; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৫/২৬২
হাজীদের গুনাহ মাফ হয় এবং তারা যাদের গুনাহ ক্ষমা চায় তাদেরকে মাফ করা হয় : আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আল্লাহ তাআলা হাজীদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং হাজী যাদের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা করেন, তাদেরকেও ক্ষমা করেন। -মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১১৫৫; তবারানী সগীর, হাদীস : ১০৮৯; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১৬; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৫৪
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হজ্ব ও উমরাকারীগণ যখন দুআ করে, তাদের দুআ কবুল করা হয়। তারা যখন কারো জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদেরকে ক্ষমা করা হয়। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৯২; সুনানে নাসায়ী, ৫/১১৩
হজ্ব ও উমরার জন্য খরচ করার ফযীলত : আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করার সময় তাকে তার উমরা সম্পর্কে বলেছেন, তুমি তোমার পরিশ্রম ও খরচ অনুপাতে নেকি পাবে।-মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৭৭৬; সুনানে দারাকুতনী, ২/২৮৬। আয়েশা (রা.) হতে অন্য বর্ণনায় আছে রয়েছে তুমি তোমার উমরার সওয়াব তোমার খরচ অনুপাতে পাবে।-মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ১৭৭৭; সুনানে দারাকুতনী, ২/২৮৬। বুরাইদা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- হজ্বের জন্য খরচ করা, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার মতই, যার সওয়াব সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ২৩০০০; শুয়াবুল ঈমান বাইহাকী, হাদীস : ৪১২৫; তবারানী আউসাত, হাদীস : ৫২৭০। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাললাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- হজ্ব হল আল্লাহর রাস্তা। তাতে (আল্লাহর রাস্তায়) এক দিরহাম খরচের সওয়াব সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।-তবারানী, আউসাত, হাদীস : ৫৬৯০। জাবির রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন- কোন হজ্বকারী ব্যক্তি নিঃস্ব হয় না। জাবের রা.কে ইমআর শব্দের উদ্দেশ্য কী জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, অভাব-অনটন। -মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১০৮০; তবারানী আউসাত, হাদীস : ৫২০৯। ইবনে ওমর রা. বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- হজ্বে গমনকারী ব্যক্তির উট চলার পথে যখনই পা উঠায় এবং পা রাখে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা ঐ হজ্ব কারীদের জন্য সওয়াব লিখে দেন। অথবা তার একটি করে গুনাহ মুছে দেন অথবা তার একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। (অসমাপ্ত)

অশ্লীলতার বীভৎস রূপ এবং তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
স্থাপত্য, চিত্র বা অন্য কোনো বর্ণনা যদি কোনো প্রাচীন স্মৃতিসৌধতে থাকে (এনশেন্ট মনুমেন্ট এন্ড অর্কিওলজিক্যাল সাইটস এন্ডস রিমেইন্স অ্যাক্ট. ১৯৫৮ অনুসারে) বা কোনো মন্দিরে থাকে অথবা এগুলো ধর্মীয় কারণে রাখা হয়। সে ক্ষেত্রে সেগুলির এই ধারার আওতায় পড়বে না। “ ১৮৬০ সালের ভারতীয় পেনাল কোডের ২৯২ ধারা”।
পেনাল কোডর ২৯৩ ধারায় বলা হয়েছে যে. যদি পূর্বোল্লিখিত অশ্লীল বস্তুু ২০ বছরের কম বয়সী কার নিকট বিক্রি করা হয়, ভাড়া দেয়া হয়, প্রদর্শন করা হয়, বা বিতরণ করা হয়, তাহলে শাস্তির পরিমাণ বেড়ে প্রথম অপরাধের জন্য কারাবাস ৩ বছর পর্যন্ত ও জরিমানার পরিমাণ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হবে। দ্বিতীয় বা পরের অপরাধের জন্য ৭ বছর পর্যন্ত এবং জরিমানার পরিমাণ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হবে। উল্লেখ্য যে ১৯৬৯ সালের এক সংশোধনীতে শাস্তির পরিমাণ আরও বাড়ানো হয়েছে। “১৮৬০ সালের ভারতীয় পেনাল কোডের ২৯৩ ধারা”।
ইন্টারনেটে প্রচারিত অশ্লীলতা রোধ করার জন্য ইনফর্মেশন টেকনোলজি অ্যাক্টের ৬৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, ইলেকট্রনিক উপায়ে যদি কোনো বস্তু পাঠানো হয় যা ল্যাম্পট্যজনক বা যা কামপ্রবৃত্তিকে আকৃষ্ট করে, অথবা যার ফল, যদি সামগ্রিক ভাবে বিচার করা যায়, লোকের মনকে কলুষিত (ফবঢ়ৎধাব) ও নৈতিকভাবে অধঃপতি (পড়ৎৎঁঢ়ঃ)  করতে পারে সেটি হবে দন্ডনীয় অপরাধ। প্রথম অপরাধের জন্য ৫ বছর কারাবাস ও ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ; পর্রবতী অপরাধের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত কারাবাস ও ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। “প্রাগুক্ত”। নারীর অশোভন উপস্থাপন (নিরোধ) আইনে নারীর অশালীন উপস্থাপনার অর্থ বলা হয়েছে নারীর শরীরকে- তার আকার, দেহ বা দেহাংশকে এমনভাবে দেখানো যেটি আশালীন, নারীর প্রতি অপমানসূচক বা নারীকে ছোট করা হচ্ছে। অথবা যা মানুষের নীতিবোধকে দূষিত, অধঃপতিত বা আহত করবে। “প্রাগুক্ত”।
এই আইনে বলা হয়েছে কোনো বিজ্ঞাপনে নারীদের আশালীন ভাবে দেখানো চলবে না। এখানে বিজ্ঞাপন বলতে ধরা হয়েছে যে কোন বিজ্ঞপ্তি, সার্কুলার, মোড়ক, বা অন্য কোন কাগজ পত্র। এগুলো আলো শব্দ ধোঁয়া বা গ্যাসের মাধ্যমে কোনো দর্শনযোগ্য উপস্থাপনও এই আওতায় পড়বে। “ প্রাগুক্ত”। এছাড়া কোন বই, পুস্তিকা, কাগজ, ফিল্ম, স্লাইড, লেখা, আঁকা, চিত্র, ফটোগ্রাফ, বা কোন আকৃতি যাতে নারীকে অশালীনভাবে ইপস্থাপন করা হচ্ছে তার প্রকাশনা করা, বিক্রি করা, বিতরণ করা চলবে না। তবে এ ব্যাপারে কতগুলো ব্যতিক্রম আছে। যেমন, এগুলো যদি বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প-চর্চা বা শিক্ষা-চর্চায় সহায়তা করে- তাহলে এতে অন্যায় হবে না। পেনাল কোডের ২৯২ ধারার মত এখানেও বলা হয়েছে যে, ধর্মীয় কারণে- মন্দিরে, পুরনো, মনুমেন্টের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে না। “ প্রাগুক্ত”।
অনলাইনে অসত্য ও অশ্লীল কিছু প্রকাশের ১৪ বছরের কারাদন্ড ঃ বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি আইনের অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধিত তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি আইনের লঘুপাপে গুরুদন্ডের শামিল বলে প্রমাণিত। অনলাইন অসত্য ও অশ্লীল কিছু প্রকাশের কারণে যদি ১৪ বছেরের কারাদন্ড হয়, তবে খুনের শাস্তি নকত বছর হবে, প্রশ্নও ওঠেছে। এ সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইডি) আয়োজিত গোলটেবিলের বৈঠক বক্তারা এই মত দেন। আলোচনায় বক্তারা তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানান। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মিথ্যা ও অশ্লীল প্রকাশ করলে, যা দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যের মানহানি ঘটায়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, ব্যক্তির ভাবমমূর্তি ক্ষুণœ করে বা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেয় তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। কোন ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করলে তিনি সর্বোচ্চ ১৪ বছরের ও সর্বনিম্ন সাত বছরের কারদন্ডে এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। আগের আইন কারাদন্ডের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ বছর। গত ২০ আগস্ট অধ্যাদেশের মাধ্যমে এ আইন সংশোধন করে শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো  হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতি হামিদ হোসন বলেন, আইন করা হয় নাগরিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু এই আইনটি স্বাধীনতা হরণ করার জন্য। আইন বিশ্লেষক শাহদীন মালিক বলেন, আগামী বছর টিআইবি দুর্নীতির যে প্রতিবেদ প্রকাশ করবে, সেখানে যদি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়, তবে এই আইন বলে টিআইবির কর্মকর্তাদের অন্তত সাত বছর করে জেল হবে। এআইন থাকা মানে দেশকে অসভ্য বা মধ্যযুগে ঠেলে দেয়া। টিআইবির নির্বাহী পরিচালকে ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। কিন্তু এই আইনের মাধ্যমে জনগণকে ত্রাসের রাজত্বে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি নেই। সম্ভবত তারা বিষয়টি উপভোগ করছে। ক্ষমতায় গিয়ে তারা আইনটির অপপ্রয়োগ করবে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) পরিচালক সারা হোসেন বলেন, আইনের সংজ্ঞা সুস্পষ্ট হতে হবে। যাতে মানুষ বুঝতে পারে, সে যা লিখছে তা বেআইনি কি না। কিন্তু বর্তমানে আইনটি অস্পষ্ট। সরকার ইচ্ছামতো  এর অপপ্রয়োগ করতে পারবে। তাই এখন ইন্টারনেটে কিছু লেখার আগেই ভাবতে হবে। এ লেখার কারণে সাত বছরের, নাকি ১৪ বছরের জেল হবে। আইআইডির নির্বাহী প্রধান সাঈদ আহমদ বলেন, এই আইনের মাধ্যমে লঘুপাপে গুরুদন্ডের বিধান চালু করা হয়েছে। আইনটি তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগীয় সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, আইন অস্পষ্ট। এ অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে এর অপপ্রয়োগ হবে।
অশ্লীলতা মানবজীবনের জন্য এমন ভয়ঙ্কর ও মারাত্মক ভাইরাসের ন্যায়; যা প্রতিটি মানুষেকে ক্রমান্বয়ে তার দৈহিক, মানসিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রেয়, সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আঘাতে করে তাকে দুর্বল করে দেয়। আর তার সুন্দর ও সাবলীল এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে থাকে। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, যে সকল বিষয় মানুষের প্রতিটি স্তরে ক্ষতি করে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় আধুনিক প্রজন্মের সেদিকেই চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলছে। আর তা হবে না কেন? নতুন প্রজন্মের ধ্বংস করে দিল আধুনিক গণমাধ্যমসমূহ।নিম্নে এ অশ্লিতা প্রচার ও প্রসারের আধুনিক গণমাধ্যমসমূহ বৈরী পদক্ষেপ সম্পর্কে চিত্র তুলে ধরা হলো:
ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সুপারস্টার ও সুন্দরী প্রতিযোগিতা: বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে সুপারস্টার ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আর তাতে অংশ নেয় বিভিন্ন সুন্দরীগণ। আর সেখানে সুপারস্টার ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে প্রদশিত হয় তাদের উলঙ্গ দেহের বিভিন্ন অংগের ব্যবহার। যা সেখানে উপস্থিত ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরিচালিত চ্যানেলগুলো দর্শকের নৈতিক জীবনকে যৌন সুড়সুড়ির দিকে ধাবিত করে। তন্মধ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সুন্দরী মিস, মিস ওয়াল্ড ও বিভিন্ন পুরুস্কার দেওয়ার অনুষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য। তবে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, আমাদের বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হওয়া সত্বেও সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির এ কালো ছোবলে আক্রান্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। যা মুসলিম জাতির জন্য একটি অশুভ লক্ষণ। ইউটিউবে আপলোড করা বিভিন্ন নগ্ন ভিডিও : অশ্লীলতা প্রচার ও প্রসারের আধুনিক প্রযুক্তি সবচেয়ে এগিয়ে যাচ্চে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ভিডিও আপলোড ও ডাউনলোড করার উল্লেখযোগ্য একটি ওয়েব সাইট হলো ইউটিউব। যেখানে একজন ব্যক্তি যেকোন ভিডিও আপলোড করতে পারে। এ বিষয়টিকে আমরা সকলেই ইচ্ছে করলে ভালো ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু তা না করে বরং সেখানে এমন এমন ভিডিও আপলোড করা হয় যা ইতঃপূর্বের সকল নগ্নতাকে ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশেজ্ঞগণ মনে করেন। কেননা সেখানে সকল প্রকার নগ্ন ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যেমন : কোন ছেলে মেয়েদের অন্তরঙ্গ ভিডিও, গোপনে ধারণকৃত অশ্লীল দৃৃশ্য ইত্যাদি। ফেসবুক : আধুনিক যোগাযোগের ও গণমাধ্যমের একটি বহুল চর্চিত মাধ্যম হলো ফেসবুক। যার মাধম্যে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও বার্তা আদান প্রদান করা হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে এ গণমাধ্যমে এমন কিছু অশ্লীল ছবি দিয়ে আইডি খোলা এবং সেখানে এমন কিছু ছবি ও মন্তব্য পোষ্ট করা হয় যা ইসলামী শরীয়ত ও নৈতিকতা বিরোধী। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না হলে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ও আগত প্রজন্ম নৈতিকতা থেকে দূরে চলে যাবে এবং জাতি মেধাবুদ্ধি থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হবে। বিভিন্ন ব্লগ : যোগাযোগের মাধ্যমের একটি বৃহৎ মাধ্যম হলো ইন্টারনেট। এ ইন্টানেটের মাধ্যমে বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা ও বিভিন্ন নামে ব্লগ তৈরি করেন। আর সেখানে তারা নিজস্ব মতামত ও লেখা পোস্ট করে থাকেন। কিন্তু আধুনিক কালে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন নামে ব্লগ পরিচালিত করে থাকেন, সেখানে ইসলাম বিরোধী ও যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন নাস্তিক্যবাদী, জাঙ্গিবাদী এবং উস্কানিমূলক লেখা পোস্ট করে থাকেন। আর এ কারণে আজ আমাদের যুবসমাজের মধ্যে কোন প্রকার নৈতিকবোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আর এ গুলো পড়ে ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্তধারণা নিতে শুরু করেছে। আর তারই প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর। বিভিন্ন পত্রিকা . বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের দৈনিক, পাক্ষিক. দ্বি-পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকায় অশ্লীল ও নগ্ন ছবি পরিলক্ষিত হয়। এ সকল পত্রিকার মধ্যে আবার এমন পত্রিকা রয়েছে যেগুলোতে ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য ও ছবি প্রকাশ করা হয়। অত্যন্ত পরিতাপ ও দুঃখের সাথে বলতে হয় যে আমাদের দেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত হওয়া সত্বেও আমাদের বাংলাদেশে বিজাতীয়দের অনুসরণ করে একই বক্তব্য প্রচার করা হয়ে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকার এমনকিছু নির্দিষ্ট পাতা রয়েছে যেখানে অর্ধনগ্ন ও নগ্ন ছবি প্রকাশিত হয়। এসকল পত্রিকার পাতা গুলোতে অশ্লীল ছবি প্রকাশিত হওয়ার কারণে সর্বস্তরের জনগণের দিকে ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর এ জন্য সমাজেও অশ্লীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া আর কিছু পত্রিকা বাজারে পাওয়া যায় যা গোপনে বিক্রি করা হয় এবং তার মূল বিষয় হলো নগ্নতা ও যৌনতাকে উস্কিয়ে দেয়া।  নগ্ন বিলবোর্ড ও পোস্টার : অশ্লীলতার অপর একটি প্রচার মাধ্যম হলো নগ্ন বিলবোর্ড ও অশ্লীল পোস্টার। এ দৃশ্যটি বাংলাদেশে অনেক বছর আগে থেকেই প্রচলিত। যদিও পূর্বে থেকেই এটি প্রচলিত কিন্তু বর্তমানে যে অশ্লীল পোস্টার দেখা যায় তা হয়তো পূর্বের সকল কার্যক্রমকে ও হার মানিয়ে দেবে। কেননা অধুনা সিনেমার পেস্টার গুলোতে এমন কিছু নারীর ছবি প্রকাশ করা হয় যার দিক থেকে কোন নারীও হয়তো দৃষ্টিপাত করেতে পারে না। লজ্জায় তার মাথা নত হয়ে যায়। আর এ গুলো যখন যুব সমাজের মাঝে প্রকাশিত হয় তখন তারা এ সকল পোস্টার দেখে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে।
নারীদের বেপর্দাভাবে চলাচল : এবিষয়ে লিখলেই একটি গ্রন্থই লেখ যায়। যেহেত্ ুএটি একটি প্রবন্ধ, তাই এখানে মৌলিক কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো। নারী জাতির জন্য পর্দা মহান আল্ল্াহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে একটি আবাশ্যিক বিধান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আর মুমিন নারীদেরকে বল যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী পিতা শ্বশুর নিজেদের ছেলে. স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ. তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, ওদের কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন গোপন সৌর্ন্দয প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিন গণ তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তওবা কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। “আল-কুরআন, ২৪ :৩১”।
অন্যত্র এক আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন: “হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে, ও মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর ঝুলিয়ে দেয়, তাদেরকে চেনার ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে কাছকাছি পন্থা হবে। ফলে তাদেরদেরকে কষ্ট দেয়া হবে না। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল,পরম দয়াল্”ু  আল-কুরআন, ৩৩ : ৫৯”। ইসলাম নারীদেরকে ঘরে বসে থাকতে বলেনি। তবে যখন সে বের হবে তখন তাকে কিছু নির্দেশনা মেনে তারপর বের হওয়ার নির্দেশ ইসলাম তাকে দিয়েছে। যেমন কারু কার্য ও নকশা বিহীন হিজাব ব্যবহার করা, “ তার প্রমাণ পূর্বে বর্ণিত সূরা নুরের আয়াত- তারা স্বীয় রূপ-লাবণ্য ও সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। এ আয়াতের ভিতরে কারুকার্য খচিত পর্দাও অন্তর্ভুক্ত। কারণ আল্লাহ তা‘আলা যে সৌন্দর্য প্রকাশ করতে বারণ করেছে, সে সৌন্দর্যকে আরেকটি সৌন্দর্য দ্বারা আবৃত করাও নিষেধের আওতায় আসে। তদ্রƒপ সে সকল নকশাও নিষিদ্ধ, যা পর্দার বিভিন্ন জায়গায় অঙ্কিত থাকে বা নারীরা মাথায় আলাদাভাবে বা শরীরের কোন জায়গায় যুক্ত করে রাখে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহিলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।”  আল-কুরআন, ৩৩ :৩৩। অর্থ: নারীর এমন সৌন্দর্য ও রূপ-লাবণ্য প্রকাশ করা,যা পুরুষের যৌন উত্তেজনা ও সুড়সুড়ি সৃষ্টি করে। এরূপ অশ্লীলতা প্রদর্শন করা কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তিনজন মানুষ সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা কর না। ( অর্থাৎ তারা সবাই ধ্বংস হবে) যথা: ক.যে ব্যক্তি মুসলমানদের জামাত থেকে বের হয়ে গেল অথবা যে কুরআন অনুযায়ী দেশ পরিচালনাকারী শাসকের আনুগত্য ত্যাগ করল, আর সে এ অবস্থায় মারা গেল। খ. যে গোলাম বা দাসী নিজ মনিব থেকে পলায়ন করল এবং এ অবস্থায় সে মারা গেল। গ. যে নারী প্রয়োজন ছাড়া রূপচর্চা করে স্বামীর অবর্তমানে বাইরে বের হল।” -হাকিম , আল-মুস্তদরাক আলাস-সহীহইন, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩০৫৮”।
পর্দা সুগন্ধি বিহীন হওয়া, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রচুর হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সুগন্ধি ব্যবহার করে নারীদের বাইরে বের হওয়অ হারাম। সংক্ষিপ্ততার জন্য আমরা এখানে উদাহরণ স্বরূপ, রাসূলের একটি হাদীস উল্লেখ করছি, তিনি বলেন: “যে নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে বের হল, অতঃপর কোন জনসমাবেশ দিয়ে অতিক্রম করল তাদের ঘ্রাণ মোহিত বরার জন্য সে নারী ব্যভিচারিণী।”-ইমাম আহমদ, আল-মুসনাদ, প্রাগুক্ত, হাধীস নং-২৭০১”। শরীরে অঙ্গ প্রতঙ্গ ভেসে উঠে এমন পাতলা ও সংকীর্ণ হিজাব না হওয়া , পর্দা শরীরে রং প্রকাশ করে দেয় এমন পাতলা না হওয়া, নারীর পর্দা পুরুষের পোশাকের ন্যায় হওয়া, “সুখ্যাতির জন্য হিজাব পরিধান না করা বা মানুষ যার প্রতি আঙ্গুল নির্দেশ করে, পর্দা এমন কাপড়ের না হওয়া।সুনাম সুখ্যাতির কাপড়, অর্থাৎ যে কাপড় পরিধান করার দ্বারা মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধ লাভ উদ্দেশ্য হয়। যেমন উৎকৃষ্ট ও দামি কাপড়। যা সাধারণত দুনিয়ার সুখ-ভোগ ও চাকচিক্যে গর্বিত-অহংকারী ব্যক্তিরাই পরিধান করে। এ হুকুম নারী-পুরুষ সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যে কেউ এ ধরনের কাপড় অসৎ উদ্দেশ্যে পরিধান করবে, কঠোর হুমকির সম্মুখীন হবে, যদি তওবা না করে মারা যায়”। পর্দা বিজাতিদের সদৃশ্য না হওয়া ইত্যাদি। “ এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে,- ইব্ন উমার (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যে ব্যক্তি কোন সম্প্রাদায়ের সাথে মিল রাখল, সে ঐ  সম্প্রদায়ের লোক হিসাবে গণ্য।” ইমাম আহমদ, আল-মুসনাদ, প্রাগুক্ত, খ. ১১,পৃ.২৬০, হাধীস নং-৫২৩২”।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: “যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লহার স্মরণে এবং যে সত্য নাজিল হয়েছে, তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি? আর তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতঃপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল।” আল-কুরআন, ৫৭:১৬। ইবনে কাছীর অত্র আয়াতের তাফসীরে  বলেন : “এর জন্য আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে মৌলিক কিংবা আনুষঙ্গিক যে কোন বিষয়ে তাদের সাদৃশ্য পরিহার করতে বলেছেন। ইবনে তাইমিয়্যাও অনুরূপ বলেছেন। অর্থাৎ অত্র আয়াতে নিষেধাজ্ঞার পরিধি ব্যাপক ও সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কাফেরদের  অনুসরণ করা যাবে না।”-ইব্ন কাছীর, তাফষীরুল কুর’আনিল ‘আজীম, প্রাগুক্ত, খ.৪, পৃ.৪৮৪”। জাবির বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল (সা.) এর সাথে একবার ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করলাম। আজান-একামত ব্যতীত তিনি খুতবার পূর্বেই সালাত আরম্ভ করলেন। সালাত শেষে বেলাল (রা.) এর কাঁধে ভর দিয়ে দন্ডয়মান হলেন। সকলকে আল্লাহর তাকওয়ার আদেশ দিলেন, তার আনুগত্যের উৎসাহ প্রদান করলেন। মানুষের ওয়াজ-নসিহত করলেন। অতঃপর নারীদের নিকট গমন করে তাদের উদ্দেশ্যে নসিহত করে বললেন: তোমরা সদকা কর, তোমাদের অধিকাংশই হবে জাহান্নামের ইন্ধন। বিবর্ণ-ফ্যাকাশে মুখমন্ডল নিয়ে নারীদের মধ্যে হতে একজন দাঁড়িয়ে বলল: কেন, হে আল্লাহর রাসূল? রাসূল বললেন, কারণ তোমরা অধিক অভিযোগ কর, স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। জাবির বলেন: অতঃপর তারা তাদের অলংকারাদি সদকা করতে আরম্ভ করল। তাদের কানের দুল ও আংটি বেলালের বিছানো কাপড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। -ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, পরিচ্ছেদ : সালাতুল‘ঈদাইন, প্রাগুক্ত, খ.৫, পৃ.৪৫৩, হাদীস নং-২০৮৫”। কিন্তু আধুনিক নারীরা এ সকল নির্দেশনার কোনোটাই মানছেন না। আর যে কারণে আজ তারা ধর্ষিত নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছেন। আর সে কারণে দায়ী করা হয় পুরুষদেরকে। ট. মোবাইলের মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে : আধুনিক যুগে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে মোবাইল অন্যতম। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তথ্য ব্যবহৃত হচ্ছে অনৈতিক কর্মকান্ডে। যেমন ধর্ষণের ভিডিও চিত্র ধারণ করে ব্লুু-টুথের মাধ্যমে পরস্পর ফাইল আদান-প্রদান করা, বিভিন্ন অশ্লিল ভিডিও মেমোরি কার্ডে ধারণ করে তা দেখা। আর এর মাধ্যমে আমাদের সমাজ বিশেষ করে যুব সমাজ একেবারে ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে।
উপসংহার : উপযুক্ত বিষয়গুলোর কারণে আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে বড় ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে আর যে কারণে আজ জাতি ধ্বংস হতে বসেছে। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই জাতীয় সম্প্রচার নীতি প্রণয়ন করেছে এবং সেখানে বলা হয়েছে যে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবক্ষয় রোধে সম্প্রচার মাধ্যমের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, বিনোদনের জন্য সুস্থ ধারার নাটক, চলচ্চিত্র, গান ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। শিশু বা নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্যমূলক আচরণ বা হয়রানিমূলক কর্মকান্ডকে উদ্বুদ্ধ করে এমন অনুষ্ঠান প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে, শিশুদের নমস্তাত্ত্বিক, মানবিক এবং নৈতিক গঠনকে নেতিবাচকেভাবে প্রভাবিতে করে এমন ধরনের অশ্লীল, তথ্যগতভাবে ভুল  ভাষাগতভাবে অশোভন এবং সহিংসতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উল্লেখ্য যে, এ সকল নীতিমালা থাকলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরী। তবে এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি তাহলো : জাতীয় নীতিমালা  অনুসরণের পাশাপাশি অশ্লীলতা প্রচার ও প্রসার থেকে বিরত রাখার মধ্যেই রয়েছে প্রতিবিধান। চরিত্রের উত্তম গুণাবলী দিয়ে ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে চলে এ সকল অশ্লীলতা প্রচার ও প্রসার প্রতিরোধ করা বর্তমান সময়ের গণদাবী, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর বাণী ও রাসূলুল্লাহ (স.) এর হাদীসের প্রতিধ্বনি মাত্র। কারণ, যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না তাদের জন্যই শান্তি ও নিরাপত্তা এবং তারাই সুপথগামী। সুতরাং আমাদের সকলের উচিত, কুরআন, সুন্নাহ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণকামী হওয়া এবং সে সম্পর্কে যথেষ্ট আমল করে নিজেদের আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্য হিসাবে গড়ে তোলা। (সমাপ্ত)

অশ্লীলতার বীভৎস রূপ এবং তার প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বুহতান আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থ-অপবাদ, দুর্নাম, মিথ্যা, রটনা, ইত্যাদি। ইসলামের চিরস্থায়ী বিধান হলো, কারও প্রসংসা করতে হলে তার অসাক্ষাতে আর সমালোচনা করতে হলে সাক্ষাতে করতে হয় এ বিধান লংঘন করে যখনই কারও অসাক্ষাতে নিন্দা, সমলোচনা বা কুৎসা রটনা হয়, তখন তা শরীয়ত বিরোধী কাজে পরিণত হয়। এ ধরনের কাজ তিন রকম হতে পারে এবং তিনটি কবীরা গুনাহ। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ বা দোষ আরোপ করা হয়, তা যদি মিথ্যা বা প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণহীন হয়, তবে তা নিছক অপবাদ। আরবীতে একে বুহতান বা কাযাফা বলা হয়। ইসলামী বিধানে চোখলখোর ও পেছনে নিন্দাকারী এবং গীবতকারী সম্পর্কে কঠিন আযাবের ঘোষণা ও সর্তক করে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী শরীয়তে গীবত হারাম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন। ওহে যারা ঈমাম এনেছ! তোমরা অনেক অনুমান বর্জন কর। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান পাপ। আর তোমরা কারও দোষ অনুসন্ধান কর না এবং একে অপরের গীবত কর না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে পারবে? তোমরা তো অবশ্যই ঘৃণা কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চই আল্লাহ বড় তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। “ আল-কুরআন, ৪৯ :১২”। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্র্ণনায় এসেছে : আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত. তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন : মি‘রাজের রাত্রিতে আমি একদল লোকের পাশ দিয়ে গমনের সময় দেখলাম তারা স্বীয় মুখমন্ডল ও বুকের মাংস পিতল বা তামার নখ দ্বারা ছিন্ন করছে। আমি জিব্রাঈলের কাছে জানতে চাইলাম এরা কারা? তিনি বললেন : ওরা মানুষের মাংস ভক্ষণ করতো ও তাদের সম্মান হরণ করতো। “ ইমাম আবূ দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায় : আদাব, পরিচ্ছেদ : গীবাহ, খ. ৫., পৃ.১৯৪ হাদীস নং- ৪৮৪৭”।
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে : আবু বারযা আসলামী ও বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত তারা বলেন: রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন হে মু‘মিন সম্প্রদায়! যারা মুখে ঈমামের অঙ্গীকার করেছো; কিন্তু এখনো তা অন্তরে প্রবেশ করেনি। তোমরা মুসলমানদের অগোচরে তাদের নিন্দা করোনা এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ অন্বেষণ করে আল্লাহ তা‘আলা তার দোষ অন্বেষণ করেন। আর আল্লাহ তা‘আলা যার দোষ অন্বেষণ করেন তাকে স্বীয় গৃহে লাঞ্ছিত করেন। “ ইমাম আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত, অধ্যায় : আদব, খ. ৫, পৃ. ১৯৪-১৯৫ হাদীস নং-৪৮৮০; আলবানী, সহীহুল জামে’, খ.২, পৃ. ১৩২২-১৩২৩, হাদীস নং- ৭৯৮৪”।
গীবত করা সর্বসম্মতভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ কাজ। অনুরূপভাবে গীবত শ্রবণ করাও হারাম নিষিদ্ধ কর্ম। কারণ মানুষের চোখ কান ও অন্তর সবকিছুতেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন : নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে। “আল-কুরআন, ১৭ :৩৬”। মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন চোখ, কান ও অন্তকরণকে প্রশ্ন করা হবে। কানকে প্রশ্ন করা কবে : তুমি সারা জীবন কি কি শুনেছ? চোখকে প্রশ্ন করা : হবে তুমি সারা জীবন কি কি দেখেছ? অন্তঃকরণকে প্রশ্ন করা হবে : তুমি সারা জীবন মনে কি কি কল্পনা করেছ এবং কি কি বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছ? যদি কান দ্বারা শরীয়ত বিরোধী কথাবার্তা শুনে থাকে; যেমন কারও গীবত এবং হারাম গানবাদ্য কিংবা চোখ দ্বারা শরীয়ত বিরোধী বস্তু দেখে থাকে; যেমন বেগান স্ত্রী লোক বা সুশ্রী বালকের প্রতি কু-দৃষ্টি করা বা অন্তরে কুর‘আন ও সুন্নাহ বিরোধী বিশ্বাসকে স্থান দিয়ে থাকে অথবা কারও সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া কোন অভিযোগ মনে কায়েম করে থাকে, তবে এ প্রশ্নের ফলে আযাব ভোগ করতে হবে। “ মুফতী মুৃহাম্মদ শফী, তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন, অনু: মুহিউদ্দঅন খান, মদীনা মুনাওয়ারা : খাদেমূল হারামাইন কোরআন মদ্রণ প্রকল্প, পৃ.৭৭”। এছাড়া আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মু‘মিনগণের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন : তারা (মু‘মিনরা) যখন অবাঞ্ছিত বাজে কথাবার্তা শ্রবন করে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। “ আল-কুরআন, ২৮ :৫৫”। এখানে আয়াতটি বর্ণনা মূলক হলেও তা দ্বারা মু‘মিনদের কে অনর্থক ও বাজে কথা শ্রবণ থেকে নিষেধ করার নির্দেশ্যতুল্য। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু‘মিনগণের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ইরশাদ করেন : এবং যারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা নির্লিপ্ত থাকে। “ আল-কুরআন, ২৩ : ৩”।
উল্লেখ্য যে, যে লোক কোন পুরুষ বা মেয়েলোককে যিনা বা পুংমৈথুনর মিথ্যা অপবাদ বা অভিযোগে অভিযুক্ত করবে, এ অভিযোগ রাষ্ট-প্রধান তথা প্রশাসন কর্তৃপক্ষের নিকট দায়ের হবে, তাকে আশি দোররার শাস্তি দেওয়া হবে। এভাবেই জনগণের মান মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইসলামে এ ব্যবস্থা না থাকলে সমাজে এই পাপের ব্যাপক প্রচলন হত এবং তার ফলে বহু মানুষকেই নানাভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হতো। তবে অভিযোগকারী যদি তার অভিযোগের সমর্থনে চারজন প্রত্যক্ষদশীর সাক্ষ্য পেশ করতে পারে, তাহলে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হবে। কুরআন মাজিদে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আর যেসব লোক সুরক্ষিত চরিত্রবান মেয়েলোকের উপর যিনার অভিযোগ আনে, পরে সেজন্য চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করে না, তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করো। তাদের সাক্ষ্য কখনই কবুল  করবে না। ওরা ফাসিক। তবে যারা এ অপবাদ থেকে তওবা করবে ও নিজেদের সংশোধন করে নেবে, আল্লাহ (তাদের জন্য) নিশ্চই ক্ষমাশীল, অতীব দয়াবান। “ আল-কুরআন, ২৪ : ৪-৫। প্রকাশ থাকে যে, অখিভযোগকারী যদি স্বাধীন ও শরীয়াত পালনে বাধ্য হওয়ার উপযোঘী হয় এবং অভিযোগটা হয় যিনা করার এবং তা মিথ্যা হয় বা প্রমাণিত না হয়-তাহলে উপরোক্ত শাস্তি তাদের উপর কার্যকর  করা একান্তই কর্তব্য। আর অভিযোগ যদি যিনা বা পুংমৈথুন ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে হয় ( আর তা প্রমাণিত হয়) তাহলে তার উপর তাযীর ধার্য হবে। যিনার মিথ্যা অভিযোগ ‘হদ্দ’ ধার্য হচ্ছে, অথচ, কাউকে কুফর বা মুনাফিকীর অভিযোগে মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত করা হলে তাতে হদ্দ ধার্য হয় না। এর মূলে কি তাৎপর্য নিহিত, এ নিয়ে লোকেরা পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকে।
এ পর্যায়ে আমাদের জবাব স্পষ্ট। বস্তুত কারোর বিরুদ্ধে যিনার মিথ্যা অভিযোগ তোলা অত্যন্ত মারাত্মক ধরণের অপরাধ, তাতে কোনই সন্দেহ নেই এর পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া সমাজে খুব ভয়াবহ হয়ে দেখা দেয়। তাতে সমাজে নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা, চরিত্রহীনতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তি জনগণের আস্থা থেকে চিরদিনের তরে বঞ্চিত হয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে সমাজে যে ব্যাপক প্রচারণা চলতে থাকে তাকে মিথ্যা প্রমাণ করা ও তার খারাপ প্রতিক্রিয়া রোধ করা বা তার কু-প্রভাব মুছে ফেলা তার পক্ষে কখনই সম্ভবপর হয় না। তাকে সারাটা জীবন মিথ্যা কলংকের বোঝা বহন করে অতিবাহিত করতে হয়। এ অবস্থা আরও মম্যান্তিক হয়ে দেখা দেয় , যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন মেয়েলোক হয়। এই কলংক শুধু তাকেই ক্ষত-বিক্ষত করে না, তার পিতৃপুরুষ ও তার গর্ভজাতদের মুখকে কালিমা লিপ্ত করে। আর অবিবাহিতা হলে তো তার পক্ষে বিবাহিত হওয়ার আশা প্রায় শেষ হয়ে যায়। কুফরীর মিথ্যা অভিযোগের তুলনায় যিনার মিথ্যা অভিযোগ অত্যন্ত ভয়াবহ, প্রথমটি দ্বিতীয়টি তুলনায় অনেক হালকা হয়ে থাকে। কেননা কারোর বিরুদ্ধে সেরূপ অভিযোগ উঠলেও তার বাস্তবে ইসলাম অনুসরণ ও শরীয়তের হুকুম আহকাম পালন তাকে জনগণের সম্মুখে মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে অনেক সাহায্য করে। তাতে লজ্জার খুব একটা কারণ ঘটে না। কিন্তু যিনার মিথ্যা অভিযোগ একটি ব্যক্তির-সেই সাথে আর বহু ব্যক্তির জীবনকে চিরতরে কলঙ্কিত করে রাখে। অবশ্য এই শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে যার প্রতি অপবাদ দেয়া হয়েছে তার মধ্যে পাঁচটি শর্ত আর অপবাদ দাতার মধ্যে তিনটি শর্ত পাওয়া যেতে হবে। যার প্রতি অপবাদ দেয়া হয়েছে তার মধ্যে যে পাঁচটি শর্ত বিদ্যামান থাকতে হবে তা নিম্নরূপ: (১) তাকে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে; (২) বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে; (৩) মুসলিম হতে হবে; (৪) স্বাধীন হতে হবে; (৫) সচ্চরিত্রর অধিকারী  হতে হবে।
অতএব, কোন শিশু,পাগল, অমুসলিম, পরাধীন এবং চরিত্রহীন ব্যক্তির প্রতি অপবাদ দেয়া হলে এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে না, তবে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে। আর অপবাদদাতার  মধ্যে যে তিনটি শর্ত বিদ্যামান থাকতে হবে তা হলো:- (১) অপবাদ দাতাকে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে; (২) বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে। (৩) স্বাধীন হতে হবে।  ড. ওকাজ ফাকরী আহমদ, ফালসসাসাফাতুল ‘উকূবাতু ফীশ শারী‘আতিল ইসলামীয়্যাহ ওয়াল ক্বানূন, রিয়াদ! মাকাতাবাতুল ‘ইলমিয়্যাহ, তা. বি., পৃ.৫০”।
অতএব, অপবাদদাতা যদি অপ্রাপ্ত বয়স্ক, পাগল হয়, তবে শরী’য়ী শাস্তি প্রযোজ্য হবে না এবং দাস-দাসী হলে অর্ধেক শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তাই কাফিরদেরকেও শাস্তি দেয়া হবে, এমনকি নারীকেও শাস্তি দেয়া হবে। অপবাদমূলক লেখনী সাধারণভাবে বলা হয় এমন একটি লেখনী যা একজন ব্যক্তির কুৎসা রটনা করা এবং তাকে ঘৃণ্য এবং ঘৃণার পাত্র বানায়। আর এটি তাকে মানুষের কাছে ও হাস্যকর ও ঠাট্টার পাত্র হিসাবে পরিগণিত করে। “ঞযব উবভধসধঃরড়হ অপঃ ১৯৫২. ংং ১্৬, এড়ষফংসঁঃয া চৎবংংফৎধস খঃফ (১৯৭৭) ছই ৮৩ ধঃ ৮৭, ঢ়বৎ ডরহব ঔ., এষবধাবং া উবধশরহ (১৯৮০)অপ ৪৭৭ ধঃ ৪৮৭, (১৯৭৯) ২ অষষ ঊজ ৪৯৭ ধঃ ৫০৩, ঢ়বৎ ঠরংপড়ঁহঃ উরষলযড়ৎহব”. তবে অপবাদমূলক লেখনীর এ সংজ্ঞাটি টর্ট আইনের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ সংজ্ঞা নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে লর্ড এ্যাটবিল এর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন এভাবে: “ অপবাদমূলক লেখণীর মাধ্যমে একজন ব্যক্তির সামাজিক অধিকারের ভিত্তিতে অনেক বাদীকে নীচু করে দেয়।” বহুল প্রচলিত এ সংজ্ঞাটি  “খধি ড়ভ ঈৎসরহধষ খরনবষ”  আইনের ধারা বলে গ্রহণ করা হয়েছে। “অফধসং (১৮৮৮) ২২ ছইউ ৬৬, ঈঈজ. খধি ঈড়স ডড়ৎশরহম চধঢ়বৎ ঘড় ৮৪ ঢ়ধৎধ ৩৮; ঞযব উবভধসধঃরড়হ অপঃ ১৯৫২. ংং ১্৬, এড়ষফংসঁঃয া চৎবংংফৎধস খঃফ (১৯৭৭) ছই ৮৩ ধঃ ৮৭, ঢ়বৎ ডরহব ঔ., এষবধাবং া উবধশরহ (১৯৮০)অপ ৪৭৭ ধঃ ৪৮৭, (১৯৭৯) ২ অষষ ঊজ ৪৯৭ ধঃ ৫০৩, ঢ়বৎ ঠরংপড়ঁহঃ উরষলযড়ৎহব”.
অপবাদমূলক লেখনীর প্রকাশনা আইন হলো লঘু অপরাধ। এ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে “উবভধসধঃড়ৎু খরনবষ” আইন-১৮৪৩ এর দ্বারা ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। ঔ.জ. ঝঢ়বহপবৎ রহ জবংযধঢ়রহম ঃযব ঈৎরসরহধষ খধ,ি ২৮৫, য়ঁড়ঃবফ নু খড়ৎফ ঊফসঁহফ উধারবং, (১৯৭৯) ২ অষষ ঊজ ধঃ ৫০৫; ঈঋ খধি ঈড়স ডড়ৎশরহম চধঢ়বৎ ঘড় ৮৪, চধৎধং ঘড়.৩৬ ্ ৩৭; ঋড়ষফংসরঃয া চৎবংংফৎধস খঃফ (১৯৭৭) ২ অষষ ঊজ ৫৫৭ ৯ডরবহ ঔ. ঈঋ উবংসরহফ া ঞযড়ৎহ (১৯৮২) ৩ অষষ ঊজ ২৮৬৮., (১৯৮৩) ১ ডখজ ১৬৩ (ঞধুষড়ৎ ঔ); ঝরৎ ঔড়যহ ঝসরঃয ্ ঐড়মধহ, ঈৎরসরহধষ খধ,ি এৎবধঃ ইৎরঃধরহ: ঞযব ইধঃয চৎবংং, চ. ৭৩৭ এ আইনে  যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, চিলা,প্যারাগুয়ে, ফ্রান্স, হংকং, হাঙ্গেরি, ইন্ডিয়া, আয়্যারল্যান্ড, ইটালি, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, সিংগাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, ইউনাইটেড স্ট্যাট অব আমেরিকায় বলবৎ রয়েছে”। মিথ্যা অপবাদমূলক প্রকাশনা হলো, অপরাধ আইন ১৮৪৩ এর ধারা অনুযায়ী একটি লঘু অপরাধ। যেটার শাস্তি দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড। যদি এটি প্রমাণিত হয় যে, অপরাধী এটি জানতেন যে অপবাদটি মিথ্যা অথবা এটা যদি সত্য হয়, তবে সাধারণ অপরাধ আইনে দোষী সাব্যস্ত হবে এবং তার শাস্তি এক বছর সশ্রম কারাদন্ডের বেশি হবে না। “ইড়ধষবৎ া জ (১৮৮৮) ২১ ছইউ ২৮৪. যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, চিলা,প্যারাগুয়ে,ফ্রান্স, হংকং, হাঙ্গেরি, ইন্ডিয়া, আয়্যারল্যান্ড, ইটালি, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, সিংগাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, ইউনাইটেড স্ট্যাট অব আমেরিকায় এ আইনটি জারী আছে ”। ছয়. সমকামিতা : বর্তমান বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টিকারী মরণ ব্যাধি এইডস, যার পরিণাম নিশ্চিত মৃত্যু। ১৯৮১ সালে দিকে বিজ্ঞানিরা এ রোগের খবর পেলেন। বিজ্ঞানীরা এ রোগের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে বলেন, এটি একটি বদমায়েশী রোগ, যা শুধু, মাত্র দুশ্চরিদেরকে আক্রমণ করে। ডা: রবার্ট রেডিফিল্ড বলেন, অওউঝ রং ধ ংবীঁষষু ঃৎধহংসরঃঃবফ ফরংবধংব. অর্থাৎ এইডস হচ্ছে যৌন অনাচার থেকে সৃষ্ট রোগ। রেডফিল্ড আরো বলেন. আমাদের সমাজের (মার্কিন সমাজের) অধিকাংশ নারী-পুরুষের নৈতিক চরিত্র বলতে কিছুই নেই। কম-বেশি আমরা সকলেই ইতর রতিঃপ্রবণ মানুষ হয়ে গেছি। এইডস হচ্ছে স্রষ্টার তরফ থেকে আমাদের উপর শাস্তি ও অন্যদের জন্য শিক্ষা ও বটে। আমেরিকার প্রখ্যাত গবেষক চিকিৎসক ডনডেস সারলাইস বলেন. বিভিন্ন ধরনের পতিতা আর পুরুষ সঙ্গীরা এইডস রোগ সৃষ্টি, লালন পালন করে এবং ছড়ায়। ডা: জেমস চীন বলেন : দু হাজার সালের আগেই শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ইতর রতিঃপ্রবণতা লাভ করবে। পেশাদার পতিতা ও সৌখিন পতিতাদের সংস্পর্শে যারা যায় এবং ড্রাগ গ্রহণ করে তারাই এইডস জীবানু সৃষ্টি করে এবং তা ছড়ায়। এক কথায় অবাধ যৌনাচার, পতিতাদের সংস্পর্শ, সমকামিতার কু-অভ্যাস ও ড্রাগ গ্রহণকেই এইডসের জন্য দায়ী করা হয়। সম্প্রতি এ ভয়ংকর ব্যাধি আল্লাহর দেয়া বিধি নিষেধ অমান্যকারীদের উপর দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: তাদের দুষ্কর্ম তাদেরকে বিপদে ফেলেছে, এদের মধ্যে যারা পাপী তাদেরকেও অতি সত্বর দুস্কর্ম বিপদে ফেলবে। তারা তা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। “ আল-কুরআন, ৩৯ : ৫১। এ রোগটির কারণে পূরো সমাজেই সব সময়ে ভীত সন্ত্রস্ত, অশান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে অবস্থান করছে। কি জানি কোন সময় এই এইডস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
এ মরণব্যাধির উৎপত্তি ঘটেছিল লূত (আ.) এর সম্প্রদায়ের কুকর্মের জন্য। আর সেটি হলো লূত (আ.) এর সম্প্রদায় ব্যভিচার করেছিল, মহিলা বাদ পুরুষে-পুরুষে।সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:- “ আমি লূতকে প্রেরণ করেছি, যখন সে স্বীয় সম্পদায়কে বলল: তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বের কেউ করেনি। তোমরা তো নারীদের ছেড়ে কামবশত পুরুষদের কাছে গমন কর। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ।- আল-কুরআন, ৪২ : ৪৭”। ১৯৮৫ সালের অন্যাকে পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে: ১৪,৭৩৯ জন এইডস রোগ আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ১০৬৫৩ জন রোগীাই পুরুষ সমকামী। আমেরিকার মত উচ্চ শিক্ষিত সভ্য এবং সর্বদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার হয়ে সমকামিতার মত নিকৃষ্ট ঘৃণিত মানবতা বিরোধী অশ্লীলতাকে যদি আইন করে বৈধ করে তাহলে কিভাবে সম্ভব অশ্লীলতাসহ মানব সভ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে  কামপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসার জালে আবদ্ধ হয়ে লজ্জা-শরম ও ভাল-মন্দের স্বভাবজাত পার্থক্য বিসর্জন দিয়ে পার্লামেন্টে বৈধ ঘোষণা করা হয় তখন স্বাভাবিখভাবেই তা সমাজে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। আর তখনই সেই সমাজে আল্লাহর গজবের উপযুক্ত হয়ে যায়। তারা এমন প্রকৃতির বিরুদ্ধে নির্লজ্জতায় লিপ্ত হয় যা হারাম ও গোনাহ তো বটেই, স্স্থু স্বভাবের কাছে ঘৃণ্য হওয়ার কারণে সাধারণ জন্তু জানোয়ারও এর নিকটবর্তী হয় না। মানুষের পাশাপাশি ও লজ্জাকর অশোভন আচরণ যে কত দ্রুত সমাজ সভ্যতাকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, আধুনিক শিক্ষিত পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে ভয়াবহ ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে তা সমস্ত বিশ্ববাসী আজ হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করতে পারছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:- “যারা নিকৃষ্ট বস্তু করেছে তার বদলাও সেই পরিমাণ নিকৃষ্ট এবং অপমান তাদের চেহারাকে আবৃত করে ফেলবে। তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে এমন কেউ নেই।” আল-কুরআন, ১০:২৭। আজ এই যস আতঙ্কে সমগ্র বিশ্ব প্রকম্পিত, সমস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, সারা বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞাপনীগণ এই ভয়াবহ মরণব্যাধি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েয়ে। এই মহামারী এইডস থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করার জন্য বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এবং করছে। কিন্তু সকল প্রচেষ্টা সমূলে ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা বলছে, এইডস রোগের কোন চিকিৎসা নেই। কুরআনে বর্ণিত রয়েছে:- “আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্যম্ভাবী দিবস আসার পূর্বে তোমরা তোমাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য কর। সেদিন তোমাদের কোন আশ্রয় স্থল থাকলে না এবং তা নিরোধকারী কেউ থাকবে না।”- আল-কুরআন, ৪২:৪৭”।
বিভিন্ন জটিল, দুরারোগ্য ও ধ্বংসাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় হলো পবিত্র কুরআনের মহান শিক্ষা গ্রহণ এবং যাবতীয় বিধিনিষেধ যথাযথ ভাবে পালন । আর রাসূলে কারীম স.- এর মহান আর্দশের বাস্তবায়ন। বিশ্বের এই মহা দুর্যোগের সময় ইসলামের এই ধ্র“ব সত্য ও হুঁশিয়ারী বাণী উপলব্ধি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) এইডস প্রতিরোধে ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে বাধ্য হয়েছে। তাই ডঐঙ এমর্মে ঘোষণা করেছে।
“এইডস প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় ধর্মীয় শিক্ষাদান এবং যথাযথ নির্মল আচরণ প্রবর্তনের চেয়ে আর কোন কিছুই অধিক সহায়ক হতে পারে না যার প্রতি সকল ওহীভিত্তিক ধর্মে সমর্থন প্রদান ও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। “ঘড়ঃযরহম পধহ নব সড়ৎব যবষঢ়ভঁষ রহ ঃযরং ঢ়ৎবাবহঃরাব বভভড়ৎঃ ঃযধহ ৎবষরমরড়ঁং ঃবধপযরহমং ধহফ ঃযব ধফড়ঢ়ঃরড়হ ড়ভ ঢ়ৎড়ঢ়বৎ ধহফ ফবপবহঃ নবযযধারড়ৎ ধং ধফাড়পধঃবফ ধহফ ঃযব ঁৎমবফ নু ধষষ ফরারহব ৎবষরমরড়হং, ঃযব ৎড়ষব ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ বঃযরপং রহ ঃযব ঢ়ৎবাবহঃরড়হ ধহফ পড়হঃৎড়ষ ড়ভ অওউঝ. দি রোল অফ রিলিজিয়ন এন্ড ইথিক্স ইন দ্যা প্রিভিনশন এন্ড কন্ট্রোল অফ এইডস, (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত), অনুচ্ছেদ-৯, পৃ.৩।
ডা. মুহাম্মাদ মনসুর আলী বলেন: বর্তমান কালের সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাধি এইচ. আই. ভি। এইডস এমনই এক সময়ে সমগ্র বিশ্ব চরম আতষ্ক এবং নিরতিশয় হতাশা সৃষ্টি করেছে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান উন্নতির অত্যুঙ্গ শিখরে অবস্থান করছে। এ মরণ ব্যাধি উৎপত্তি এবং বিস্তারের কারণ হিসাবে দেখা গেছে চরম অশ্লীলতা, যৌন বিকৃতি ও কুরুচিপূর্ণ সমকামী ও বহুগামিতার মত পশু সুলভ যৌন আচরণের উপস্থিতি। শতকরা প্রায় ৯৫% সমকামী এবং বহুগামী পুরুষও মহিলাদের মাধ্যমে এইডস সমগ্র বিশ্বে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দিন দিন এইডস নামক মরণব্যাধিতে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। – আল-উম্মাহ পত্রিকা, রবিউল আখির, ১৪০৬ হিজরী”।
বিশ্বব্যাপি এ ব্যাধি শুরু থেকে ব্যাপক আকারে দেখা দেয়া পর্যন্ত প্রায় ১৩ মিািলয়ন নারী-পুরুষ ও শিশু এইচ,আই,ভি তে আক্রান্ত হয়েছে যা এইডস রোগের কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন এবং এইডস রোগীর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন হত পারে। প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার লোক এইচ.আই. ভি তে আক্রান্ত হচ্ছে।
প্রচলিত আইনে অশ্লীলতার শাস্তি ঃ আমাদের দেশের অধিকাংশ আইনই ব্রিটিশ আইনের উত্তরাধিকারী। অশ্লীলতার আইন তার ব্যতিক্রম নয়। ১৭১৭ সালের আগে ইংল্যান্ডে অশ্লীলতার বিচার হতো ….. (অসমাপ্ত)

পবিত্র হজ্ব মহান ইবাদত

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আল্লাহর ঘরের হজ পালনকারী ব্যক্তিকে সবসময় ঘিরে রাখবে দোয়া, কান্নাকাটি, একান্তে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করার সার্বক্ষণিক পরিবেশ। নিজের বাড়ি থেকে বের হয়ে হজ্বের সব বিধান পালন করা পর্যন্ত তার প্রতিটি পদক্ষেপে ও প্রতিটি চক্করে এগুলোই বারবার আসবে। আর এসব কিছুর জন্যই আবশ্যক হলো রিজিক ও উপার্জন হালাল ও উৎকৃষ্ট হওয়া, অর্থকে পবিত্র করতে হবে, খরচাদি হবে পবিত্র।
আবহমানকাল থেকে মানুষের মনমানসিকতা হলো আপন জীবনে সে কোনো বড় ধরনের বা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আকাক্সক্ষী হয়। জীবনে পরিবর্তন আনতে সর্বদা সে কোনো টার্নিং পয়েন্ট বা পার্থক্য-রেখার অন্বেষায় লিপ্ত থাকে। যেখানে নিজের অতীত জীবন ও ভবিষ্যতের দুইটি স্বাতন্ত্র্য অবস্থান তৈরি হয়ে ওঠে। এজন্য মানুষ বিচিত্র ও বহুবিধ পরিবর্তনের লক্ষ্যে শীত, বর্ষা কিংবা গ্রীষ্ম ও অন্যান্য কালের অপেক্ষার প্রহর গনে। চলমান নিত্যনৈমিত্তিক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা সে কথার সাক্ষ্য প্রমাণ করে।
অনেক মানুষ আছেন, যারা বিয়ের পর কিংবা ছেলে-সন্তানের মা-বাবা হওয়ার পরে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপনের পর অথবা কোনো চাকরি-কর্মে অংশগ্রহণের পর অথবা বড় কোনো সফলতা অর্জন বা কারও কাছে মুরিদ হওয়ার পর ক্রমে পরিবর্তন হতে থাকেন। নতুবা নিজের মাঝে পরিবর্তনের যোগ্যতা সৃষ্টি করতে পারেন। কারণ জীবনে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বহু ঘটনাপ্রবাহ ও বিভিন্ন কর্মকান্ড অতীত জীবন এবং ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণী রেখা এঁকে দেয়। যেখান থেকে যে কোনো দিকে জীবনের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।
বাস্তবে বায়তুল্লাহর হজও অনুরূপভাবে মানুষের ফেলে আসা জীবন ও ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য বা মূল্যায়ন রেখার ভূমিকা রাখে এবং সংশোধন সংস্কার ও পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের জীবনের আমূল পরিবর্তনের একটি অবস্থানে নিয়ে আসে। হজের পর থেকে মানুষ নিজের সৎ-শুদ্ধ কিংবা পাপ-পঙ্কিলতাপূর্ণ অতীতের সমাপ্তি টেনে নতুন করে নিজের জীবনকে ঢেলে সাজায়। সে সুবাদে তার প্রতিটি কর্মকান্ডে লাগে নবজীবনের ছোঁয়া।
মক্কা-মদিনা ও আশপাশের যেসব পবিত্র-পুণ্য ভূমিতে পূত-পবিত্র আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দারা অবস্থান করেছেন, সেখানে উপস্থিতি, কাবা প্রাঙ্গণে বায়তুল্লাহর মুখোমুখি অবস্থান ও কায়মনোবাক্যে আল্লাহর সকাশে নিজের ভুলত্র“টি মার্জনা কামনা এবং পূর্বকৃত সব গোনাহের ওপর তওবা করা ও অনুতপ্ত হওয়া, নিজের অক্ষমতার কারণে লজ্জানুভব করা, আগামী দিনগুলোতে পুরোপুরি আনুগত্য ও বন্দেগির প্রতিশ্র“তি-স্বীকৃতি এমন প্রভাব বিস্তারকারী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যে, সব অন্যায়-অনাচার ও পাপ-অপরাধ থেকে সৎকর্ম, সদাচরণ ও উত্তম কার্যকলাপের প্রতি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জীবনের প্রাচীনদ্বার বদ্ধ করে সফলতা ও অগ্রতার নবদ্বার উন্মুক্ত করে। বরং বলা উচিত সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানের মতো নবজীবন লাভ করে। এজন্য রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ্ব করবে এবং তাতে অশ্লীল কোনো কর্মকান্ড ও পাপকার্যে লিপ্ত না হয়, তাহলে সে সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানের মতো প্রত্যাবর্তন করে।’ অর্থাৎ এক নবজীবন ও নতুন অভিযাত্রা সূচনা করে। যেটি দ্বীন-ধর্ম ও দুনিয়া উভয়ের সার্বিক কল্যাণ, সফলতা ও অগ্রগতিতে পুষ্ট হয়।
বিবিধ অনন্যতায় উদ্ভাসিত এক ইবাদতের নাম হজ। একই সঙ্গে এটি কায়িক ও আর্থিক ইবাদত। হজ শুধু সামর্থ্যবানদের ওপরই ফরজ; নামাজ-রোজার মতো ধনী-গরিব সবার জন্য জরুরি নয় এবং জীবনে একবার সম্পন্ন করা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি (ঈমানদার) কাবাঘরে পৌঁছতে সক্ষম হয় তার ওপর আল্লাহর প্রাপ্য হচ্ছে, সে যেন হজ্ব করে।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৬)।
হজ্ব বিপুল সওয়াব, রহমত, বরকত আর মর্যাদায় পরিপূর্ণ। যার জীবনে একবারও হজ্ব পালন নসিব হয় সে অতি সৌভাগ্যবান। মোমিনের জীবনে হজ্বের চেয়ে মহান আর কোনো ইবাদত নেই। হজ্বের মাধ্যমে মোমিনদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাদের এ আগমন হবেÑ যেন তারা তাদের কল্যাণের স্থানে পৌঁছে।’ (সূরা হজ : ২৮)।
একজন হজ্ব পালনকারী গোনাহমুক্ত নতুন জীবন প্রাপ্ত হয়। তার জীবন পবিত্র হয়ে ওঠে। অতীতের সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ্ব থেকে ফিরে আসেন। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ্ব করল, যৌন সম্পর্কযুক্ত কাজ ও কথা থেকে সংযত থাকল এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকল, সে তার মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতো পবিত্র হয়ে ফিরে এলো।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আর একটি গোনাহমুক্ত কবুল হজ্বের প্রতিদান সরাসরি জান্নাত। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘গোনাহমুক্ত গ্রহণযোগ্য হজের একমাত্র বিনিময় আল্লাহর জান্নাত।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
হজ্ব পালনকারী যখন এহরাম পরে এ মহান ইবাদতে মশগুল হয় তখন তার সম্মানার্থে চারপাশের সৃষ্টিজগৎও অংশগ্রহণ করে। সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলমান এহরাম পরে তালবিয়া পড়তে থাকে, তখন তার ডান ও বামের পাথর, বৃক্ষ, মাটিকণা এমনকি জমিনের উপর প্রান্ত থেকে নিচের সর্বশেষ প্রান্ত পর্যন্ত তালবিয়া পড়তে থাকে।’ (তিরমিজি)। আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যখন হজ পালনকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করো, তখন তাকে সালাম দাও এবং মোসাফা করে তার ঘরে প্রবেশ করার আগে তোমার গোনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে বলো। কেননা হজ্ব পালনকারী গোনাহমুক্ত হয়ে এসেছে।’ (আহমাদ)।
হজ্ব ও ওমরা পালনকারীরা মহান আল্লাহর মেহমান। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধে বিজয়ী, হজ্বকারী ও ওমরাকারী আল্লাহর মেহমান বা প্রতিনিধি। আল্লাহ তাদের আহ্বান করেছেন, তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আর তারা তাঁর কাছে চেয়েছেন এবং তিনি তাদের দিয়েছেন।’ (ইবনে মাজাহ)। হজ্বের উদ্দেশে বের হলে প্রতি কদমে নেকি লেখা হয়, গোনাহ মাফ করা হয় এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হয়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যখন বায়তুল্লাহর উদ্দেশে নিজের ঘর থেকে বের হবে, তোমার বাহনের প্রত্যেকবার মাটিতে পা রাখা এবং পা তোলার বিনিময়ে তোমার জন্য একটি করে নেকি লেখা হবে এবং তোমার গোনাহ মাফ করা হবে।’ (তাবরানি)। শুধু তাই নয়, হজের নিয়তে বেরিয়ে মারা গেলেও হজ্বের সওয়াব হতে থাকে। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ্বের উদ্দেশে বের হলো, এরপর সে মারা গেল, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত হজ্বের নেকি লেখা হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ওমরার উদ্দেশে বের হয়ে মারা যাবে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত ওমরার নেকি লেখা হতে থাকবে।’ (তারগিব ওয়াত-তারহিব)।
হজ্বের অনুপম পালনীয় বিধান দেখে শয়তান হতাশায় পড়ে যায়। উম্মুল মোমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরাফাত দিনের চেয়ে বেশিসংখ্যক বান্দাকে অন্য কোনো দিনই আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না।’ (মুসলিম)। হযরত তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরাফাতের দিন (হজ্বের দিন) শয়তানকে সর্বাধিক হীন, পেরেশান, ইতর ও ক্রোধান্বিত দেখা যায়। কারণ এ দিন আল্লাহর সীমাহীন রহমত বর্ষণ ও বান্দার বড় বড় গোনাহ মাফের বিষয়টি শয়তান দেখে থাকে।’ হজ্বে শুধু পরকালীন নয়, ইহকালীন কল্যাণও হাসিল হয়। হজ্ব ও ওমরা পাপ মোচনের পাশাপাশি হজ্বকারী এবং ওমরাকারীর অভাব-অনটনও দূর করে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হজ্ব ও ওমরা পরপর করতে থাকো, কেননা তা অভাব ও গোনাহ দূর করে দেয়, যেমন রেত লোহা, সোনা ও রুপার মরিচাকে দূর করে দেয়।’ (তিরমিজি)।
এভাবে অসংখ্য হাদিসে হজ্বের ফজিলত বর্ণিত আছে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ পালন না করা বা বিলম্ব করা মোটেও উচিত নয়। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং আমাদের আকাবির বুজুর্গানে দ্বীন অনেক কর্মব্যস্ততার মধ্যেও অনেকবার হজ্ব পালন করেছেন। ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) সুদূর কুফা থেকে এসে বহুবার হজ্ব পালন করেছেন। এমন কল্যাণ পেতে বিলম্ব না করে সামর্থ্যবানদের এখনই হজ্বের প্রস্তুতি নেয়া জরুরি।
পবিত্র হজ্ব আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ বিধান। হজ্ব ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সমর্থ পুরুষ ও নারীর ওপর জীবনে একবার হজ্ব ফরজ। হজ্বের ফরমান জারি করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের মধ্য থেকে যারা এই ঘরে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তারা যেন এ ঘরের হজ্ব সম্পন্ন করে। এটি তাদের ওপর আল্লাহর হক। আর যে ব্যক্তি এ নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ বিশ্ববাসীর প্রতি মুখাপেক্ষী নন।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)। শান্তি ও সন্তুষ্টির ধর্ম ইসলাম বিশে^র প্রতিটি মানুষের জন্য হজ্বের মাসগুলো নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হজ্বের মাসসমূহ সুবিদিত-সুপরিচিত। এ সময় যে হজ্ব করার ইচ্ছা করবে সে যেন যৌন সম্ভোগ, অশ্লীল কার্যকলাপ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকে।’ (সূরা বাকারা : ২:১৯৭)। শাওয়াল, জিলক্বদ, জিলহজ্ব ও মহররম এ মাসগুলো যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার মাস। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী বিশ^বাসী যদি এ তিন মাস রক্তপাত ও হানাহানি থেকে বিরত থাকার প্রশিক্ষণ নেয়, তবে বছরের বাকি মাসগুলোও যুদ্ধ ও রক্তপাতমুক্ত থাকা সহজ হবে। শান্তির পায়রা খুঁজে পাবে আপন নীড়। স্বর্গীয় প্রশান্তি উপলব্ধি করবে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে প্রত্যেক আদম সন্তান।
হজ্ব এমন একটি ইবাদত যা মোমিনদের দেহ ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। সুষ্ঠুভাবে হজ্ব সম্পাদনের পর একজন মোমিন রাসুল (সা.) এর ঘোষণা অনুযায়ী নিজেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ ভাবতে থাকে। এ ভাবনা তার হৃদয়ের প্রশান্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ্ব করবে এবং তাতে কোনো অশ্লীলতা ও পাপাচার করবে না, আল্লাহ তায়ালা তাকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ করে বাড়ি পৌঁছাবেন।’ (বোখারি : ১৫২১; মুসলিম : ১৩৫০)। তিনি আরও বলেছেন, ‘এক ওমরা থেকে অপর ওমরার মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহগুলোর কাফফারা। আর কবুল হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া কিছুই নয়।’ (বোখারি : ১৭৭৩;  মুসলিম : ১৩৪৯)।
হজ্ব গোনাহ মাফের সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্যও দূর করে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরপর একসঙ্গে হজ্ব ও ওমরা করো। কেননা এ হজ্ব ও ওমরা দারিদ্র্য এবং গোনাহ দূর করে দেয়। যেমন হাপরের আগুন লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা দূর করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৫৬৯৮; তিরমিজি : ২৮৮৭)। রাসূল (সা.) এর এ বাণীকে স্বীকার করে নিয়েছেন আজকের বড় অর্থনীতিবিদরাও। অল্প ক’দিন আগে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা এক রিপোর্টে হজ্বকে রিসেশন প্রুফ বা অর্থনীতির মন্দারোধক বলে উল্লেখ করেছেন। ইউএনডব্লিউটিও’র মহাব্যবস্থাপক তালিব রিফাই গালফ নিউজকে বলেছেন, বৈশ্বিক মন্দা বিশেষ করে ইউরোপের চলমান অর্থনৈতিক সংকট হজের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
হজ্বের মাধ্যমে একজন মুসলমান শান্তি ও সমৃদ্ধির শিক্ষা লাভ করে। হজ্ব পালনের সময় সে কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করে না, কারও প্রতি ঘৃণা ও রাগ-বিদ্বেষ প্রকাশ করে না। ‘ক্ষমা’ তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। দেশে ফিরে এর চর্চা অব্যাহত রাখলে তার পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী, সমাজ ও রাষ্ট্র তার দ্বারা উপকৃত হবে। আর  বিশ^ দরবারে তিনি অনুকরণ, অনুসরণ ও অনুপ্রেরণার মডেলে পরিণত হবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহর উদ্দেশে হজ ও ওমরাহ পালন করো।’ ( সূরা বাকারা : ২:১৯৬)। কারণ একজন হাজী তার গন্ডিতে মডেল হয়ে থাকেন। তাই সে যদি নিখুঁতভাবে হজের প্রশিক্ষণ নিয়ে তার ক্ষেত্রে ফিরতে না পারে তা ব্যক্তি-সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
হজ্ব শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, অমুসলিমদের জন্যও শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষ শোন! তোমাদের প্রভু এক, পিতা এক। সাবধান! অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, কালোর ওপর সাদার, সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য নেই তাকওয়া ব্যতীত। (মুসনাদে আহমাদ : ৫/৪১১; আবু দাউদ : ৪/১৩২)। আমাদের মধ্য থেকে যারা হজ্বে যাচ্ছে এবং যাবে তাদেরসহ আমরা যারা হজ্বে যেতে পারছি না আমাদেরও শান্তিময় সমাজ-দেশ ও বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মহাসমাবেশ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন বর্ণের, ভাষা এবং আকার-আকৃতির মানুষ একই ধরনের পোশাকে সজ্জিত হয়ে একই কেন্দ্রবিন্দুতে সমবেত হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রগ্রেসিভ পলিসি ইনস্টিটিউটের ‘ট্রেড ফ্যাক্ট অব দ্য উইক’ প্রকাশনায় ২০০৯ সালেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক অনুষ্ঠানের স্বীকৃতি দেয়া হয় হজ্বকে। যদিও হজ্বের উদ্দেশ্যটা বাণিজ্যিক নয়। আল্লাহ প্রেমের চূড়ান্ত উন্মাদনার এই পবিত্র সফরে কোনো পার্থিব চাওয়া-পাওয়া না থাকলেও জাহেলি যুগ থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহাসমাবেশ হিসেবে হজ্বের অবস্থান শীর্ষস্থানে। পৃথিবীর ৩০ লক্ষাধিক হাজীর আধ্যাত্মিক এ সফর প্রাচীনকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান যোগসূত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ব্রিটেনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, হজ্ব ও ওমরা উপলক্ষে জেদ্দার বাদশাহ আবদুল আজিজ বিমানবন্দরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ৩০ লাখেরও বেশি যাত্রী ওঠানামা করে। আরব নিউজের ১ খবরে বলা হয়, হজ ও ওমরা থেকে সৌদি আরবের বার্ষিক আয় এক হাজার ৭০০ কোটি ডলার প্রায়। মক্কা, মদিনা, জেদ্দা এবং তায়েফের অর্থনীতির সিংহভাগই পরিচালিত হয় হজ ও ওমরাকেন্দ্রিক। ‘বিজনেস মনিটর ইন্টারন্যাশনালের’ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, হজ্বের সময় টুপি, তসবি, স্কার্ফ, জায়নামাজ এবং হিজাবের মতো উপহার সামগ্রী বেচাকেনার পরিমাণ অন্তত ১১০ কোটি ডলার। (দৈনিক প্রথম আলো : ১৪-১০-২০১৩)। প্রশ্ন হলো, হজ্বে সৌদি আরবের অর্থনীতি চাঙ্গা হলেও আমাদের দেশের অর্থনীতিতে তো লস ছাড়া কিছুই নয়। হজ্ব করা মানেই হাজার হাজার কোটি টাকা সৌদি আরবকে দিয়ে দেশটিকে বড়লোক বানিয়ে দিয়ে আসা। আসলেই কি তাই?
ধর্মীয় উৎসবে আবর্তিত বাংলাদেশের অর্থনীতি। রমজানে যেমন যাকাতের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতবদল হয়; তেমনি ঈদের কেনাকাটা, ঈদে বাড়ি যেতে পরিবহন খাতে আয় হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। ঈদের কেনাকাটাসহ সব মিলিয়ে ঈদুল ফিতরে লেনদেন হয় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অন্যদিকে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির আরেকটি বিশাল জায়গা দখল করে আছে ঈদুল আজহা। কোরবানি ঈদে শুধু গরু-ছাগল কেনাবেচা হয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার। ঈদ আর কোরবানির মতো আমাদের অর্থনীতির গতিশীলতায় হজেরও বিরাট ভূমিকা আছে। (অসমাপ্ত)

রমজানুল মোবারক : অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত একটি মাস

মিনহাজুল ইসলাম মোহাম্মদ মাছুম

মাহে রমজান আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে বান্দার জন্য অফুরন্ত কল্যাণ, নেয়ামত ও বরকতের উৎস। আল্লাহপাককে রাজী করিয়ে জান্নাত লাভের উপায় হিসাবে রমজানের আগমন। রোজাদারদের জন্য এ মাস খুশীর আনন্দে ভেসে যাবার মাস। হাদীস মতে, এ মাসে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। অভিশপ্ত বিতাড়িত শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। এ মাসের ফজীলত বলে শেষ করা যাবে না। সত্যি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে প্রতি বছর মুসলিম সমাজে রমজান আসে। কবির ভাষায়-“মাহে রমজান এলো বছর ঘুরে, মু’মিন মুসলমানের দ্বারে দ্বারে, রহমতেরই বাণী নিয়ে, মাগফিরাতের পয়গাম নিয়ে, এলো সবার মাঝে আবার ফিরে।” এ আল্লাহর এক অপার রহমত মু’মিন বান্দাদের জন্য।
মাহে রমজানের অনন্য বৈশিষ্ট্য :
১। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস : আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, রমজান মাসের প্রথম দশদিন আল্লাহর রহমত নাজিল হয়, দ্বিতীয় দশদিন মাগফেরাত এবং তৃতীয় দশদিন দোজখ থেকে মুক্তি দেয়া হয়। যে ব্যক্তি এতে আপন অধীনস্থ দাস-দাসী ও চাকর-বাকর হতে কাজের বোঝা হালকা করে দেয়, আল্লাহপাক তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং দোজখের আগুন থেকে নাজাত দেবেন। (বায়হাকী)
২। বরকতের মাস : সকল মাসের সর্দার রমজান। এ মাসে মু’মিনদের রিজিক বৃদ্ধি(বরকত) করা হয়। (মিশকাত) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আপন ইচ্ছায় কোনো নফল ইবাদত করবে, অন্যান্য মাসের ফরজ সালাতের সওয়াব হবে। আর যে ব্যক্তি একটি ফরজ আদায় করবে, অন্যান্য মাসের সত্তরটি সওয়াবের হকদার হবে। (মিশকাত)
৩। আল্ কোরআন নাজিলের মাস : আল্লাহপাক এরশাদ করেছেন, “রমজান সে-ই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে আল্ কোরআন, যা মানুষের জন্য দিশারী এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পায় সে যেন রোজা রাখে।” (সূরা বাকারা-১৮৫)
৪। দরিদ্র-অসহায়দের সহযোগিতার (দান-খয়রাত) মাস : রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন, এই মাস দরিদ্র-অসহায়দেরকে সহযোগিতার মাস, যার উসিলায় মু’মিনদের জীবিকা বাড়তে থাকে। অন্য হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান এলে তাঁর দান ও বদান্যতা আরো বেড়ে যেত, এমনকি তাঁর দানশীলতা প্রবল বেগে বহমান বাতাসের চেয়েও বেশী হয়ে যেত। সদকা (যাকাত), দান-খয়রাতের জন্য কোন মাস নির্দিষ্ট নেই, তবু মাহে রমজান এলে লোকজন সত্তর গুণ সওয়াব লাভের আশায় দান করে থাকেন। এ ব্যাপারে হাদীসে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
৫। তাকওয়া অর্জনের মাস : মহাগ্রন্থ আল্ কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদাররা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছিল, তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’’ (সূরা বাকারা-১৮৩) তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের জন্য আল্লাহপাক কোরআনে অনেক আয়াত নাজিল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তাকওয়া ব্যতীত মু’মিন, মুত্তাকী, পরহেজগার হওয়া যায় না। রাসূল (সা)কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন্ আমল মানুষকে বেশী জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর ভয় (অর্থাৎ তাকওয়া) ও স্বভাব। (তিরমিযী) অন্য হাদীসে আছে, সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, জবাবে তিনি বলেন, যে আল্লাহকে বেশী ভয় করে এবং আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখে। ইবনে উমর (রা) বলেন, “মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত তাকওয়ার স্তরে উন্নীত হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে অন্তরে সংশয় সৃষ্টিকারী কাজ পরিহার না করে।”
৬। সালাতুত তারাবীর (কিয়ামূল লাইল) মাস : তারাবী সালাত রমজান মাসেই পড়া হয়। তারাবীর সালাত (কিয়ামূল লাইল) নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। বিনা ওজরে তারাবীর সালাত ত্যাগ কঠিন গুনাহ। হাদীসে তারাবীর সালাতকে মাগফেরাত লাভের উপায় হিসাবে রাসূল (সা) বলেছেন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রাতগুলোতে ঈমানী প্রেরণা এবং আখেরাতের প্রতিদানের নিয়তে তারাবীহ সালাত পড়লো, তার কৃত সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”
৭। বদরের মাস : হিজরী ২য় বর্ষে (৬২৪ খৃ.) ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদর অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন ছিল ১৭ই রমজান। মাত্র ৩১৩ জন আল্লাহর পথের সৈনিক হাজারোধিক কাফের সৈন্যের বিরুদ্ধে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং বিজয়ী হন।
৮। দোয়া কবুলের মাস : এ মাসে রোজাদারের দোয়া বিশেষ ভাবে কবুল করা হয়। রাসূল (সা) বলেছেন, তিন শ্রেণীর লোকের দোয়া সঙ্গে সঙ্গে বা বিশেষভাবে কবুল করা হয়। এক. রোজাদারের দোয়া, দুই.মজলুম বা অত্যাচারিতের দোয়া এবং তিন. মুসাফিরের দোয়া। (বায়হাকী)
৯। রিপু দমনের মাস : রোজা কুপ্রবৃত্তি থেকে মানুষকে হেফাজত করে। মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে বলেন, “আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে এসে দাঁড়াবার ব্যাপারে ভীত ছিল এবং নফস্কে খারাপ কামনা থেকে বিরত ছিল, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।” (সূরা আন্ নাযিআ’ত ঃ ৪০-৪১) হাদীসে রাসূলে বলা হয়েছে, রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ। যতক্ষণ না একে ছিন্ন করা হয়। কুকর্ম থেকে বিরত না থাকে।
১০। আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস : রমজান মাস তাহাজ্জুদ পালনের উৎকৃষ্ট সময়। তাহাজ্জুদ সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম হয়। রমজানে শেষ দশকে এতেকাফ রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। সমাজ থেকে কাউকে না কাউকে রাখতেই হবে। না হলে সবাইকে গুনাহগার হতে হবে। এতেকাফের মাধ্যমেও আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা যায়। আল্লাহপাক নিজেই বলেছেন, “রোজা আমার জন্য অর্থাৎ বান্দা আমার নৈকট্য লাভের জন্যই রোজা রেখেছে। কাজেই আমি আল্লাহ নিজেই এর পুরষ্কার দেব।” (হাদীসে কুদসী)
১১। এতেকাফের মাস : হযরত আয়েশা (রা) বলেছেন, হুজুর পাক (সা) রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত এ নিয়ম তিনি পালন করেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ এতেকাফের এ সিলসিলা জারী রাখেন। (বুখারী) হযরত আবু হোরায়রা (রা) বলেছেন, রাসূল (সা) প্রতি রমজানে শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর বিশ দিন এতেকাফ করেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
১২। যাকাত ও দান-সদকা বেশী বেশী দেয়ার মাস : যাকাত ও দান-সদকা দেয়ার নির্দিষ্ট কোন মাস নেই। যে কোন দিনে, মাসে দেয়া যায়। যেহেতু রমজান মাসের ইবাদতে সত্তর গুণ সওয়াব বেশী লাভ করা যায়, এজন্য লোকেরা এ মাসকেই বেছে নেয় যাকাত ও দান-সদকা করার জন্য। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) হচ্ছেন সমগ্র মানবকুলের মধ্যে সর্বাধিক উদার ও দানশীল। রমজান মাস এলে মহানবী (সা)এর দানশীলতা বেড়ে যেত। রাসূল (সা) বলেছেন, “উপরের হাত নীচের হাতের চেয়ে উত্তম, আর যারা তোমার অধীনে আছে তাদের থেকেই দান শুরু কর। আর উত্তম দান হচ্ছে তা, যা প্রাচুর্য থেকে প্রদান করা হয়। আর যে ব্যক্তি যাচঞা থেকে পবিত্রতা চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন। আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী হতে চায়, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
১৩। মক্কা বিজয়ের মাস : ৬২৮ খৃ. হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে ইসলাম বিরোধীরা। শুধু তাই নয়, মুসলিমদের উপরও দমন-নির্যাতন শুরু করে। এমতাবস্থায় রাসূল (সা) ৮ম হিজরীতে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করেন। ২১শে রমজান আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কা বিজয় করে মহান আদর্শ ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন।
১৪। জিহাদের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস : ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ এবং মক্কা বিজয় এ রমজান মাসেই সুসম্পন্ন হয়। নিজের নফসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোও শ্রেষ্ঠ জিহাদ। কিন্তু খোদাদ্রোহী ও তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য রমজান মাসই উপযুক্ত মাস।
১৫। গুনাহ থেকে ক্ষমা ও মুক্তি লাভের মাস : রোজার বিনিময়ে রোজাদার গুনাহ থেকে মুক্তি পায়। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস ও নেকী লাভের আশায় রমজানের রোজা রাখে, এর বিনিময়ে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ (ছগীরাহ) মাফ করে দেয়া হয়। (মুয়াত্তা) অন্য হাদীসে আছে, রাসূল (সা)বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানকে পেয়েও নিজের গুনাহ থেকে মুক্তি পেল না, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক।
১৬। চরিত্র গঠনের মাস : মিথ্যা বলা মহাপাপ। এটি একটি ভয়ানক ব্যাধি। মিথ্যা কথা না বলা চরিত্রবানের সুলক্ষণ। রমজানের রোজা রাখার মাধ্যমে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করল না-সে ব্যক্তির পানীয় দ্রব্য পরিত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী) তিনি আরো বলেছেন, রোজা পাঁচটি জিনিস নষ্ট করে ঃ মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, কুটনামী, মিথ্যা শপথ ও কামভাব দৃষ্টিপাত। এসব দোষাবলী বর্জন চরিত্র গঠনে সহায়ক।
১৭। ধৈর্য-সহানুভূতির মাস : রোজার মাধ্যমে কে কত অপরের প্রতি ধৈর্যশীল ও গরীব দুঃখীর প্রতি সহানুভূতিশীল তা বুঝা যায়। সমাজের বিত্তবানেরা ক্ষুধা এবং অভাবের তাড়না কতটুক ুতা বুঝতে পেরে এ মাসে দান-সদকা-যাকাতের প্রতি যতœবান হয়ে দান করতে উদ্বুদ্ধ হয়। বিপদ-মুছিবতে ধৈর্য ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা রদ করতেও রোজার গুর”ত্ব অপরিসীম। রাসূল (সা) বলেছেন, কেউ যদি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তবে বলো “আমি রোজাদার।”
১৮। লাইলাতুল ক্বদরের মাস : আল্ কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি এই (গ্রন্থ) টিকে নাজিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে। তুমি কি জানো সেই মর্যাদাপূর্ণ রাত কি? এই মর্যাদাপূর্ণ রাতটি হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা আল্ কদর : ১-৩) ক্বদরের রাতটিও রমজান মাসের মধ্যে।
১৯। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাস : রোজা আমাদের আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম শিক্ষা দান করে। রমজানে কঠোর শৃংখলার ফলে মানুষ দিনের বেলায় যথেচ্ছ ভোগের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারে না। নিয়মানুবর্তিতা ও নিয়ন্ত্রণের ফলে সে পূর্ণ মু’মিন হওয়ার সুযোগ লাভ করে থাকে। ফলে আত্মা কলুষমুক্ত ও পরিশুদ্ধতার পথে এগিয়ে যায়। দেহ ও মনকে ষড়রিপুর হাত থেকে বাঁচিয়ে সংযমী হতে সহায়তা করে। রোজার সংযম পালনে মূলত আমাদের জিহ্বাকে সংযত করতে হবে। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন কথা বললে ভাল কথা বলে কিংবা চুপ করে থাকে। (বুখারী ও মুসলিম) হাদীস থেকে জানা যায়, জবান বা জিহ্বার ১৫টি দোষ আছে, যথা ঃ ১. মিথ্যা কথা বলা, ২। ঠাট্টা বিদ্রƒপ করা, ৩. অশ্লীল ও খারাপ কথা বলা, ৪. গালি দেয়া, ৫. নিন্দা করা, ৬. অপবাদ দেয়া, ৭. গীবত করা, ৮. চোগলখুরী করা, ৯. বিনা প্রয়োজনে গোপনীয়তা ফাঁস করা, ১০. মোনাফিকী করা, ১১. ঝগড়া-ঝাটি করা, ১২. বেহুদা ও অতিরিক্ত কথা বলা, ১৩. বাতিল ও হারাম জিনিস নিয়ে কথা বলা, ১৪. অভিশাপ দেয়া, ও ১৫. সামনা-সামনি কারো প্রশংসা করা।
২০। আত্মত্যাগ ও আত্মজাগৃতির মাস : প্রবাদ আছে-ভোগ নয়, ত্যাগই সুখ। রোজা আত্মত্যাগের কঠোর অনুশীলন ও অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে তোলার মাস। রোজা সকল প্রকার ইন্দ্রিয় ও জাগতিক সুখ-ভোগ থেকে বিরত রেখে সিয়াম সাধনায় নিয়োজিত করে। এটা উচ্চ শ্রেণীর সিয়ামের লক্ষণ। নবী, সিদ্দিক ও আল্লাহর নিয়ামত প্রাপ্তদের সিয়াম উচ্চশ্রেণীর সিয়াম।
ইমাম গাজ্জালী (র) বলেন, উচ্চ শ্রেণীর সিয়াম হল সে সিয়াম, যে সিয়ামে দৈহিক সংযমের সাথে অন্তরের সংযম কার্যকরভাবে অনুসৃত হয়। অন্তরে যখন আখেরাত ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয় না, কোন স্বার্থ মুখ্য না হয়ে পরার্থে জীবন উৎসর্গীকৃত তার সিয়ামই প্রকৃত ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল।
২১। পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সামাজিকতা বৃদ্ধির মাস : রোজা মুসলমানদেরকে ঐক্য, সাম্য ও প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সমবেদনা বাড়ায়। ধনী-গরীব সমভাবে একই সময়ে রোজা এবং এক কাতারে সালাত আদায়ের ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, মমত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। রাসূল (সা) বলেছেন, এ মাস সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাস। (মিশকাত)
২২। কোরআন তেলাওয়াত করে পুণ্য হাসিলের মাস : কোরআন নাজিলের এই মাসে কোরআন তেলাওয়াত ও শ্রবণ করা খুবই পুণ্যের কাজ। হাদীসে আছে, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কোরআন শিখে এবং অপরকে শিখায়। হাদীসে আরো এসেছে, হযরত জিবরাইল (আ) রমজানের প্রতি রাতে রাসূল (সা)কে কোরআন শিক্ষা দিতেন। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত ফাতেমা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাইল (আ) প্রতি বছর রমজান মাসে একবার রাসূল-এ-খোদা (সা)কে কোরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। কিন্তু রাসূল (সা)এর ওফাতের বছর দু’বার কোরআন পেশ করেন। তাই এ মাসে কোরআন তেলাওয়াতে মনোযোগী হতে হবে এবং তারাবীর সালাতে অংশ গ্রহণ করে কোরআন শুনে আমল করতে হবে।
২৩। দাওয়াতে দ্বীনের মাস : এ মাস দ্বীনের দাওয়াতের জন্য খুবই গুরূত্বপূর্ণ। কোরআন নাজিলের এই মাসে কোরআনের দাওয়াতকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। কোরআন বলছে, “তার কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকে, নেক আমল করে, এবং ঘোষণা করে আমি একজন মুসলমান।” (সূরা হা-মীম-সাজদাহ : ৩৩) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, “ডাক তোমার প্রভুর দিকে হিকমত ও উত্তম নসীহত সহকারে, আর (লোকদের সাথে) বির্তক কর উত্তম পদ্ধতিতে।” (সূরা আন্ নহল-১২৫) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, ‘‘তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জানলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’’ (বুখারী)
২৪। জুমাতুল বিদার মাস : রমজানের শেষ জুমাকে জুমাতুল বিদা বলা হয়। এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মাহাতœ্য অপরিসীম। দিন হিসাবে শুক্রবার বা জুমাবারের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। মহানবী (সা) এক জুমুআ’র দিনে খুতবা প্রদানকালে জুমাবারকে ঈদের দিন বলেও আখ্যায়িত করেন। আলেম-ওলামাদের মতে, বছরের দিবস সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিবস হচ্ছে আরাফাতের দিবস ও সপ্তাহের দিবস সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিবস জুমুআ’র দিবস। জুম্মা’র রাতও তেমনি। যেহেতু এ দিন রমজান মাসে তাই এর গুরুত্ব আরো অনেক অনেক বেশী হওয়া উচিত মুসলমানদের কাছে।
২৫ । আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস : এই মাস কোরআনের আইন বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস। আল্ কোরআনে এরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তারা কাফির। (সূরা মায়েদা-৪৪), আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারা জালিম। (সূরা মায়েদা-৪৫), আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না তারা ফাসিক। (সুরা মায়েদা-৪৭)। কোরআনের কথানুযায়ী বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী দেশের আইন-আদালত, বিচার-ফয়সালা, দেশ পরিচালনা না হলে মুসলমান দাবী করা সত্ত্বেও কাফির, জালিম ও ফাসিক। আল্লাহর হুকুম অমান্য করা কত বড় গর্হিত কাজ একবার ভাবুন তো!
কাজেই রমজানের এই সুযোগ সমূহকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদেরকে পুরো মাস ঈমান ও এহতেসাবের সাথে রোজা রাখতে হবে। আরো কিছু আমল বা কাজ করতে হবে যা আল্লাহর অত্যন্ত পছন্দনীয়। দু’টি আমল হচ্ছে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করা এবং বেশী বেশী করে তওবা-এস্তেগফার করা। আর মু’মিনের জন্য জরুরী এই যে, জান্নাতের আশা করা এবং দোজখ থেকে পানাহ চাওয়া।
এছাড়া কোরআন নাজিলের এই বরকতময় মাসে প্রত্যহ কোরআন পাঠের অভ্যাস করতে হবে। সেই মোতাবেক জীবন-গঠন করে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর কোরআনের আইনকে প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ শপথ নিতে হবে। রমজানের শেষ দিবসে শবে কদর লাভের জন্য বেজোড় রাতগুলোতে ইবাদতে মগ্ন থাকতে হবে। গরীব-অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত (দান-সদকা-যাকাত প্রদানের মাধ্যমে) প্রসারিত করতে হবে। কারণ রমজানকে পেয়েও আমরা যদি গুনাহ মাফ করতে না পারি এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কি হতে পারে? তাই মাহে রমজানের হেদায়েতকে কাজে লাগিয়ে নাজাতের পথ খুঁজে নিতে হবে।

রোজাদারের কোরআন পাঠ ও দোয়া অব্যর্থ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার, যা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সূরা ফাতির : ২৯-৩০)। আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন দুই প্রকার।
প্রথমত, শাব্দিক তেলাওয়াতÑ আল কোরআন পাঠ করা। এর ফজিলতের ব্যাপারে কোরআন ও সুন্নাহে অনেক দলিল-প্রমাণ রয়েছে। যেমন বোখারি ও মুসলিমে কোরআন পাঠ অন্যতম রয়েছে, নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যিনি কোরআন মজিদ শিক্ষা করেন এবং অন্যকে শিক্ষা দেন।’ অনুরূপভাবে বোখারি ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল কোরআনে দক্ষ ও পন্ডিত ব্যক্তিরা সম্মানিত পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোরআন আটকে আটকে তেলাওয়াত করে এবং তা তার জন্য কষ্টকর হয়, তার জন্য দুইটি প্রতিদান রয়েছে।’ সহিহ মুসলিমে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন তেলাওয়াত কর। কেননা কোরআন কিয়ামতের দিন তেলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি হরফ (অক্ষর) পাঠ করবে, তাকে একটি নেকি প্রদান করা হবে। আর প্রতিটি নেকি ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মিম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মিম একটি হরফ।’ (তিরমিজি : ২৯১০)। দ্বিতীয়ত, হুকমি তিলাওয়াত বা প্রায়োগিক পঠনÑ অর্থাৎ আল্লাহর কথাকে বিশ্বাস করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নিয়ে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বর্জন করে কিতাব তথা আল কোরআনের সব হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ কোরআনের বিধানকে তেলাওয়াত করা। আর তার অর্থ হচ্ছে, কোরআন প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করা, সব আদিষ্ট বিষয় পালন ও নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করার মাধ্যমে তার বিধানাবলি মেনে নেয়া। বস্তুত এ প্রকারই হচ্ছে কোরআন নাজিলের বৃহত্তম লক্ষ্য। যেমনÑ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমরা আপনার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা সোয়াদ : ২৯)।
এজন্য সালাফে সালেহিন (রহ.) কোরআন তিলাওয়াতের এ পদ্ধতির ওপর চলে কোরআন শিক্ষা করেছেন। এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং মজবুত আকিদা-বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এর যাবতীয় বিধানকে ইতিবাচক ধারায় বাস্তবায়িত করেছেন। আবু আবদুর রহমান আসসুলামি (রহ.) বলেন, ‘উসমান ইবন আফ্ফান, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ প্রমুখ যারা আমাদের কোরআন শিক্ষা দিতেন তারা বলেছেন, তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে ১০টি আয়াত শিখতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভালোভাবে না শিখতেন ও তাতে যেসব জ্ঞান ও আমল করার কথা রয়েছে তা বাস্তবায়ন না করতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হতেন না। তারা বলেন, আমরা এভাবেই কোরআন, জ্ঞান ও আমল সবই শিখেছি।’ (তাফসিরে তাবারি)।
আর এটাই হলো কোরআন তেলাওয়াতের ওই প্রকার, যার ওপর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ভর করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, তখন যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না। আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন? তিনি বলবেন, ‘এভাবেই তোমার কাছে আমার নিদর্শন এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো। আর এভাবেই আমি প্রতিফল দান করি তাকে, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার রবের নিদর্শনে ঈমান আনে না। আর আখিরাতের আজাব তো অবশ্যই কঠোরতর ও অধিকতর স্থায়ী।’ (সূরা ত্বহা : ১২৩-১২৭)।
রমজানের অফুরন্ত কল্যাণের অন্যতম দিক হলো এ মাসে রোজাদারের দোয়া কবুল করা হয়। রমজান শুধু ইবাদতের বিশেষ মৌসুম নয়, দোয়ারও অতুলনীয় রোজাদারের দোয়া উপলক্ষ। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারায় পর পর কয়েকটি আয়াতে রমজান ও রোজা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। এর অব্যবহিত পরই আল্লাহ তার নবীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, (তাদের বলো) আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, আমি তাদের প্রার্থনা কবুল করি, যখন তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৬)।
কোরআনের ব্যাখ্যাবিশারদদের মতে, রোজার আলোচনার ধারাবাহিকতায় দোয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপনের মাধ্যমে রোজাদারের দোয়া বিশেষ কবুলযোগ্য বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই রোজাদারের করণীয় আমলগুলোর মধ্যে দোয়াও অতিগুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) এক হাদিসে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেয়া হয় না : রোজাদারের দোয়া, যে যাবৎ সে ইফতার করে; ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং মজলুম ব্যক্তির দোয়া।’ (তিরমিজি)। আমরা হাদিসে কুদসি থেকে জেনেছি, রোজা কেবল আল্লাহর জন্য, তাই রোজার পুরস্কার আল্লাহ নিজেই দেবেন। রোজাদারের জন্য কিয়ামতে ও জান্নাতে অকল্পনীয় পুরস্কার ছাড়াও দুনিয়ায় উত্তম পুরস্কার হলো তার দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। বিশেষ করে রমজানের প্রত্যেক রাতে এবং ইফতারের পূর্বমুহূর্তে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘ইফতারের সময় আল্লাহ বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আর রমজানের প্রতি রাতেও। সিয়াম পালনকারী প্রত্যেক বান্দার দোয়া কবুল হয়।’ (মুসনাদ আহমদ)। আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই ইফতারের সময় সিয়াম পালনকারীর দোয়া কবুল হয়।’ (বায়হাকি)। রহমতের এ ভর মৌসুমে তাই বেশি বেশি দোয়া করা উচিতÑ বিশেষ করে শেষ রাতে, সাহরির শেষ সময়, ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে, রুকু-সেজদায়, ফরজ নামাজের পর, কোরআন তেলাওয়াতের পর, তারাবির নামাজে চার রাকাতের বিরতিতে দোয়ায় মনোনিবেশ করা উচিত। দোয়া করতে হবে কাতরভাবে ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে। আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাইতে হবে। একমাত্র আল্লাহই এমন দয়ালু সত্তা, যিনি না চাইলে বরং রাগ করেন। হাদিসের ভাষ্যমতে, তিনি প্রতি রাতে বান্দাকে দেয়ার জন্য ডাকতে থাকেন। কোরআনে তিনি বারবার তার কাছে চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বান্দাকে দ্বিধাহীনভাবে প্রার্থনার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা জুমার : ৫৪)।

মাহে রমজান : মাহাত্ম্য ও করণীয়

মাহমুদ মুজিব

মাহে রমজান অফুরন্ত রহমত, বরকত, কল্যাণ ও মঙ্গল পূর্ণ মাস। জাগতিক লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির অনুসরণ ইত্যাদি মানবিক দূর্বলতা থেকে দূরে থেকে আত্ম সংশোধনের মাধ্যমে খোদায়ী গুণাবলী অর্জনের অবারিত সুযোগ এনে দেয় পবিত্র মাহে রামাজান।
ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম একটি হলো রোজা। তাই কেউ অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে। এবং রোজা নিয়ে কটুক্তি করলে ঈমান চলে যাবে। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল বুদ্ধিমান সাবালক মুসলিম নর-নারীর উপর রোজা ফরজ। শরয়ী কোন ওজর ব্যতীত রোজা না রাখলে কবীরা গুনাহ হবে।
রোজার ইতিহাস বহু প্রাচীন। মুসলমানদের পূর্বেও অন্যান্য ধর্মে রোজার বিধান চালু ছিলো। যেমন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন- ‘ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়ে ছিলো। নিঃসন্দেহে তোমরা (এ রোজার মাধ্যমে) মুত্তাকী  (খোদাভীরু) হতে পারবে। (সুরা বাকারা- ১৮৩)
রোজার সংজ্ঞা :
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদতের নিয়তে সুবহে সাদিক (সেহরীর শেষ সময় ও ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময়) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, সহবাস ও রোজা ভঙ্গকারী যাবতীয় কাজ হতে বিরত থাকা।
রোজা, সেহরী ও ইফতারের কতিপয় মাসায়েল :
*রমজানের রোজার নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত ব্যতীত সারাদিন পানাহার ও যৌনতৃপ্তি থেকে বিরত থাকলেও রোযা হবে না।
* মুখে নিয়ত করা জরুরী নয়। অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে, তবে মুখে নিয়ত করা উত্তম। মুখে নিয়ত করলেও আরবীতে হওয়া জরুরী নয়- যে কোন ভাষায় নিয়ত করা যায়। আরবীতে করলে এভাবে করা- نَوَيْتُ بِصَوْمِ الْيَوْمِ অথবা   بِصَوْمِ غَدٍ نَوَيْت   বাংলায় : ‘আমি আজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম।’
সেহরী :
* সেহরী খাওয়া জরুরী নয় তবে সেহরী খাওয়া সুন্নত। অনেক ফজিলতের আমল। ক্ষুধা না লাগলে বা খেতে ইচ্ছে না করলেও সেহরীর ফজিলত লাভের নিয়তে যা-ই হোক কিছু পানাহার করে নেয়া উত্তম।
*নিদ্রার করণে সেহরী খেতে না পারলেও রোজা রাখতে হবে।* বিলম্বে সেহরী খাওয়া উত্তম।
ইফতার :
*সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মুস্তাহাব। বিলম্বে ইফতার করা মাকরূহ।* সূর্য অস্ত যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরই ইফতার করতে হবে। শুধু ঘড়ি বা আযানের উপর নির্ভর করা ভালো নয়। কারণ তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
*সবচে’ উত্তম হলো খেজুর দ্বারা ইফতার করা। তারপর কোন মিষ্টি জাতীয় জিনিষ দ্বারা ও তারপর পানি দ্বারা করা ভালো।
* ইফতার করার পূর্বে দু‘আ পড়া মুস্তাহাব। নিম্নোক্ত দু‘আটি পড়া যেতে পারে – اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ
* ইফতারের সময় দু‘আ কবুল হয়। তাই ইফতারের পূর্বে বা কিছু ইফতার করে বা ইফতার থেকে সম্পূর্ণ ফারেগ হয়ে দু‘আ করা মুস্তাহাব।
রোজার ফজিলত
সাধারণভাবে যে কোন রোজাই অত্যন্ত পুণ্য ও সওয়াবের কাজ। এ প্রসঙ্গে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘যে আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোযা রাখবে আল্লাহ তা‘আলা সেই দিনের পরিবর্তে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে দিবেন।’ (বুখারী ও মুসলিম)
* রোজা একান্তভাবে আমার-ই জন্যে। আর আমিই তার প্রতিদান দিবো।’ (বুখারী ও মুসলিম)
রমজানের রোজার বিশেষ ফজিলত :
সাধারণ রোজার পাশাপাশি রমজান মাসের রোজার বিশেষ কতিপয় বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে :-
* রোজাদারের (ক্ষুধার কারণে) মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের (এক প্রকার দারুণ সুগন্ধি) চেয়েও অধিক প্রিয়।
*ফিরিশতাগণ রোজাদারের জন্যে ইফতার করা পর্যন্ত ইস্তেগফার তথা গুনাহ্ মাফ চাইতে থাকে।
*রমজানের প্রতিদিন আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে সুসজ্জিত করে বলেন- ‘আমার (রোজাদার) বান্দারা অচিরেই তাদের পরিশ্রম ও কষ্ট-ক্লেশ দূরে সরিয়ে তোমার কাছে পৌঁছে যাবে।
* এই মাসে লাইলাতুল কদর রয়েছে। যে রাত হাজার রাতের চেয়েও উত্তম। যে এ রাত্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো তবে সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো।
*রমজানের শেষ রাতে রোজাদারদের ক্ষমা ঘোষণা করা হয়।
* এ মাসে একটি নফল ইবাদত (সওয়াবের ক্ষেত্রে) ফরজের সমতুল্য। আর একটি ফরজ সত্তরটি ফরজের সমতুল্য।
* যে পূর্ণ ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।
রমজানে বিশেষভাবে করণীয়:
কুরআন তিলাওয়াতে যতœ নেয়া: রমজান হলো কুরআনের মাস। এ মাসে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পূর্ণ কুরআন উপস্থাপন করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রমজান মাসে কুরআন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। অনেক সাহাবী রমজানের প্র্রতিদিন কুরআন খতম করতেন। বহু পূর্বসূরী রমজান মাসে প্রতি তিন দিনে কুরআন খতম করতেন। তাই কুরআন তেলাওয়াতে বিশেষভাবে যতœ নেয়া উচিত।
তারাবীহ সহ আল্লাহ তায়ালার ইবাদাতে রাত্রি জাগরণ: হযরত উমর (রাঃ) রমজানের মধ্যরাতের পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিয়ে ‘নামায’ ‘নামায’বলে উৎসাহ দিতেন। হযরত উসমান (রাঃ) রমজানের রাত্রে এমন দীর্ঘ নামায পড়তেন যে অনেক সময় এক রাকতে পুরো কুরআন পড়ে ফেলতেন।
দান-সদকা করা: রমজান মাসে তাক্বওয়া অর্জনের আরেকটি মাধ্যম হলো সদকা। নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে স্বত্ত্ব ত্যাগ করে গরীব-দূঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়াকে সদকা বলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সবচে’ বড় দানবীর। আর রমজান মাসে তিনি সর্বাধিক দান-সদকা করতেন। তিনি বলেন-সর্বোৎকৃষ্ট সদকা হলোরমজানের সদকা।
রোযাদারকে ইফতার করানো:হযরত সালমান (রাঃ)  থেকে বর্ণিত হয়েছে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-‘যে রমজান মাসে কোন রোযাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করবে তবে তার পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং রোযাদারের মূল প্রতিদানের কোন অংশ কমানো ব্যতিরেকে সে রোযাদারের সমান প্রতিদান পাবে।’ সাহাবাগণ বলে ওঠলেন- ইয়ারাসূলুল্লাহ! ইফতার করানোর মতো সামর্থ্য তো আমাদের সবার নেই!! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যারা একটুখানি দুধ বা একটি খেজুর বা এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে আল্লাাহ তা‘য়ালা তাদেরকেও এই সাওয়াব দিবেন।’ (ইবনে খুযাইমা ওবায়হাকী)
ই‘তিকাফ: রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টমন্ডিত আমল হলো শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ থাকা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ থাকতেন। তবে উনার ইন্তিকালের বছর তিনি বিশ দিন ই‘তিকাফ ছিলেন। সুতরাং ই‘তিকাফ যে কোন সময় হতে পারে । কিন্তু অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ হলো রমজানের শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ থাকা। যাতে লাইলাতুল ক্বদর লাভের সৌভাগ্য হয়।
লাইলাতুল ক্বদর: রমজান মাসের আরেক নেয়ামত হলো লাইলাতুল ক্বদর। রমজানের শেষ দশ দিনের যে কোন বেজোড় রাত লাইলাতুল ক্বদর হতে পারে। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে ২৭ তম রাত্রি (উল্লেখ্য আরবি মাস শুরু হয় মাগরিবের আযানের পর পর- তাই ২৭ তম রাত্রি বলা হয়েছে- ২৭শে রমজানের আগের রাত্রী ২৭তম রাত্রী)  লাইলাতুল ক্বদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচে’ বেশি। লাইলাতুল ক্বদরের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্বন্ধে আল্লাহ তা’আলা বলেন- ‘অবশ্যই আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল ক্বদরে অবতীর্ণ করেছি। আপনি (হে নবী) কি জানেন- লাইলাতুল ক্বদর কি? তা হচ্ছে এমন এক রাত যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’ (সুরা আল-ক্বদর)
সদকাতুল ফিতর:সদকাতুল ফিতর রমজান মাসে দিতে হয় এমন একটি অনুদান। যাতে মুসলিম সমাজের অভাবী ব্যক্তিরাও যেন স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করতে পারে। ঈদের নামাযের পূর্বেই এই সদকা আদায় করতে হয়। সাহাবায়ে কেরাম ঈদের বেশ কয়েক দিন পূর্বে অভাবীদের কাছে এ সদকা পৌছে দিতেন। যাতে তারা ঈদের জামা-কাপড় এবং বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী কেনাকাটা করে খুশি মনে ঈদ উদযাপন করতে পারে ।
রমজানে বর্জনীয়:
সর্বপ্রকার গুনাহ বা পাপকর্ম ছেড়ে দেয়া। অনর্থক কাজ-কর্ম ও গল্প-গুজবে সময় নষ্ট না করা। অন্যের গীবত-শেকায়াত তথা পরনিন্দা না করা। নাচ-গান, জুয়া ও সব ধরনের অশ্লীলতা-বেহায়াপনায় লিপ্ত না হওয়া। দিনের বেলা হোটেল-রেস্তোঁরা ইত্যাদি খোলা না রাখা।
রমজানে সংযম ও আত্মত্যাগের অনুশীলন এবং সেই সাথে ইসলামভিত্তিক ন্যায়-নিষ্ঠা, সত্য ও সততা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ প্রয়োজন। ন্যায়-নিষ্ঠা ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠার জন্যে ত্যাগ-তিতিক্ষা বরণ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত, শাশ্বত ও জীবন্ত। নৈতিকতা, শালীনতা ও একত্রে ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে সহ মর্মিতার সদভ্যাস গড়ে তুলে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক  কল্যাণ সাধনের পথ প্রশস্ত করার অনুশীলন করার রামাজান। বাঙালি মননে চিরায়ত ইসলামী  মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চরিত্র, ধর্ম ও আদর্শ রক্ষা এবং  সর্বগ্রাসী অপরাধ প্রবণতা রোধের অনুশীলনের চেতনা জোরদার  করার দারুণ সুযোগ আসে এ মাসে।
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সকাশে সকাতর আর্তি— তিনি যেন আমাদের সকলকে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার তৌফিক দান করেন এবং তাঁর অফুরান অনুকম্পা ও করুণার বারিধারায় আমাদের সিক্ত করেন।