বিভাগ: ভেতরের পাতা

ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ ও বর্তমান প্রেক্ষিত

ওলীউর রহমান

১৭ রমজান ঐতিহাসিক বদর দিবস। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে হিজরী দ্বিতীয় বর্ষে রমজান মাসের ১৭ তারিখে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। মুসলমানদের ঈমানী শক্তির কাছে কুফরী শক্তির শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে সেদিন বদর প্রান্তরে রচিত হয়েছিল ইসলাম ও মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় ইতিহাস। এ যুদ্ধের পর থেকে ইসলামের বিজয় ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র আরবে এবং পতনঘন্টা বেজে উঠেছিল বিশ্বের দাম্ভিক শক্তি সমূহের। পবিত্র কোরআনে এ যুদ্ধকে বলা হয়েছে “আল ফুরকান” অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী।
হিজরতের পর রাসূল সা. মদিনায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে মদিনার অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীগুলোর সাথে একটি শান্তি ও সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এদিকে কুরাইশগণ নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল মদিনায় নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমনকি মদিনায় আক্রমণ করারও তারা পরিকল্পনা করেছিল। এরই অংশ হিসেবে তারা কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে সিরিয়ায় পাঠিয়েছিল অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্য-রসদ নিয়ে আসার জন্য। রাসূল (সা.) যখন সংবাদ পেলেন যে, আবু সুফিয়ান সিরিয়া থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্য রসদের বিশাল সম্ভার নিয়ে মক্কায় ফিরছেন তখন তিনি বদর গিরিপথে আবু সুফিয়ানকে বাঁধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ মক্কায় এই অস্ত্র ভান্ডার পৌঁছলে কুরাইশগণ এই খাদ্য রসদ এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মদিনায় হামলা চালাবে। এ উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) দ্বিতীয় হিজরীর রমজান মাসে ৩১৩ জনের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর গিরিপথের দিকে রওয়ানা দিলেন। এ দিকে কুরাইশরা আবু সুফিয়ানকে সাহায্য করার জন্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করলো।
সাহাবায়ে কেরামের ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে ছিল ৭০টি উট, ২টি ঘোড়া, আটখানা তরবারী এবং নয়টা লোহার পোশাক। অন্য দিকে মক্কাবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল একহাজার। এর মধ্যে সাত শত উষ্ট্রারোহী, দু’শ অশ্বারোহী এবং তাদের বাহিনী ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্য রসদে সমৃদ্ধ। বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সিপাহসালার ছিলেন স্বয়ং রাসূল (সা.) এবং মক্কা বাহিনীর অধিনায়ক ছিল উৎবা বিন রবিআ। তাছাড়া মক্কা বাহিনীর সাথে ছিল মক্কার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। যেমন- উমাইয়া বিন খলফ, আবুজেহেল, উৎবা, শায়বা, আবুল বুখতারী, হিশাম, হাকিম বিন হাজম প্রমুখ।
রাসূল (সা.) যখন মক্কাবাহিনীর বিশাল রণপ্রস্তুতির কথা জানতে পারলেন তখন তাদের শক্তি ও প্রাচুর্যের কথা সাহাবায়ে কেরামকে জানিয়ে দিলেন এবং তাদের সাথে পরামর্শ করলেন। রাসূল (সা.) এর হয়ত আশংকা ছিল যে, সাহাবায়ে কেরামগণ এ অসম যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে কি না। কারণ সাহাবায়ে কেরাম একদিকে ছিলেন রিক্ত হস্ত, খাদ্য-রসদ ও অস্ত্র-শস্ত্র ছিল অপ্রতুল, শত্র“ বাহিনী ছিল নিজেদের থেকে তিনগুণের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে এ যুদ্ধ ছিল সাহাবায়েকেরামের নিজেদের গোত্রীয় লোকদের বিরুদ্ধে। একারণে রাসূল (সা.) সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। কিন্তু রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে বীরত্বও সাহসিকতা প্রত্যক্ষ করলেন তাতে তিনি আনন্দিত হয়ে গেলেন। আনসার নেতা সাআদ বিন মাআজ (রা.) নিজেকে দ্বীনের পথে উৎসর্গ করে এক দীর্ঘ জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন- ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! আমরা আপনার উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার সত্যতা স্বীকার করেছি এবং আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনার আনিত দ্বীন সম্পূর্ণ সত্য। হে আল্লাহর রাসূল সা.! আপনি মদীনা থেকে বের হয়েছেন এক ইচ্ছা নিয়ে, কিন্তু আল্লাহ এখন অন্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এখন আপনার যা মর্জি হয় করতে পারেন। আমরা সর্বাবস্থায় আপনার সাথে আছি। আপনি আমাদের কে যা ইচ্ছা তা নির্দেশ দেন, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আপনি আমাদেরকে মহাসমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও আমরা মহাসমুদ্রে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত। আমাদের মধ্য থেকে কেউ পিছনে থকবেনা।’ (যুরকানী ১ম খন্ড)
রাসূল (সা.) ছাহাবাদের এরূপ বক্তব্য শুনে নিতান্ত খুশী হলেন এবং স্বয়ং আল্লাহ পাকও সাহাবাদের এসব বক্তব্যের উপর সন্তুষ্ট হয়ে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের ফায়সালা করে দিলেন। উভয়দলের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় আসন্ন। রাসূল (সা.) আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করলেন, ‘হে পরওরদেগার! তোমার ওয়াদা পূর্ণ কর- এই কুরাইশ বাহিনী নিতান্ত অহংকার ও দাম্ভিকতার সাথে অগ্রসর হচ্ছে, ওরা আপনার বিরোধীতা করছে। হে আল্লাহ! তোমার ওয়াদা পূর্ণ কর, আমাদের বিজয় দান কর।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম)
রাব্বুল আলামীন তার প্রিয় হাবীবের দোয়া কবুল করলেন, আল্লাহও তাঁর রাসূলের প্রতি অকুন্ঠ আনুগত্যশীল, শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবীত মুসলিম বাহিনীর প্রতি আসমানী সাহায্যের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। বৃষ্টির মাধ্যমে রাব্বুল আলামীন বদরের বালুকাময় স্থানকে শক্ত করে দিলেন। অন্যদিকে মুসলমানগণ নিজ নিজ পাত্রে পানি সংরক্ষণ করে নিলেন, ফলে বিরাট সংকট থেকে মুক্তি পেল মুসলিম বাহিনী। ১৭ রমজান যুদ্ধ শুরু হলো। ‘হয়ত শহীদ নয়ত গাজী’ শাহাদাত প্রিয় মুসলিম বাহিনীর সামনে এই সমান সুমহান দুটি পথ। মুসলমানদের আন্তরিকতা ও ঈমানী শক্তির কারণে মহান রাব্বুল আলামীন বদর প্রান্তরে পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করলেন। যুদ্ধের প্রাথমিক বিজয় মুসলমানদের পদচুম্বন করল। কুরাইশের শক্তিশালী তিন নেতা উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ নিহত হলো মুসলিম বাহিনীর আমীর হামজা, আলী এবং উবায়দা (রা.) এর হাতে। দুই যুবক মাআজ এবং মুআওয়াজের হাতে নিহত হলো বিখ্যাত কুরাইশ নেতা আবু জেহেল। আরেক প্রভাবশালী নেতা উমাইয়া বিন খালফ  শোচনীয় ভাবে মৃত্যু বরণ করল তার এক সময়ের কৃতদাস হযরত বিলাল (রা.) এর হাতে। এভাবে একের পর এক কুরাইশ বাহিনীর অনেক নেতা মৃত্যুমুখে পতিত হলো এবং মুসলিম বাহিনীর বিজয় কেতন উড্ডীন হলো বদর প্রান্তরে। মুসলমানদের মধ্যে শহীদ হলেন ১৪ জন এবং কাফের বাহিনীর মৃত্যুবরণ করলো ৭০ জন এবং বন্দী হলো আরো ৭০ জন।
মুসলমানদের ৩১৩ জনের ক্ষুদ্র বাহিনীর হাতে সেদিন পরাজিত হয়েছিল মক্কার একহাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী। অথচ মুসলিম বাহিনীর জনবল, যুদ্ধ উপকরণ ছিল একেবারে সীমিত। সে সময়ের তুলনায় আজ মুসলমানদের শক্তি সামর্থ্য ও জনসংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু তার পরও সারা বিশ্বে মুসলনারা ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ সহ ইসলাম বিদ্বেষীদের হাতে মার খাচ্ছে। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মুসলমানগণই। ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মিরও আমাদের প্রতিবেশি মিয়ানমারের আরাকানের দিকে তাকালে মনে হয় যেন মুসলমানরাই একমাত্র সেই জাতি যাদের জীবন, সম্পদ, ঘরবাড়ি এবং তাদের মা বোনদের ইজ্জতের কোন মূল্য নেই। যেভাবে ইচ্ছা কাফের মুশরিকেরা মুসলমানদের মারতে পারে, তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের সম্পদ দখল করতে পারে, তাদের মা-বোনদের ইজ্জত আবরু যত ইচ্ছা লুন্ঠন করতে পারে। শুধু তাই নয় আজ পৃথিবীতে যারা সবচেয়ে বেশি মানবাধিকারের কথা বলে তাদের নেতৃত্বেই মুসলিম নিধন চলছে দেশে দেশে।
আজ মুসলমানরা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নিগৃহিত ও নিপীড়িত জাতি। নিকট অতীতে ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মির, মিয়ানমারে যত মুসলমান মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠিত হয়েছে তা একত্রিত করলে গোটা পৃথিবী কালো মেঘে ছেয়ে যাবে, যত মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে তাদের হাড় গুলো একত্রিত করলে একটি হিমালয় পর্বতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে, তাদের রক্ত গুলো একত্রিত করা হলে ফুরাত নদীর মত একটি নদী হয়ত বয়ে যাবে। আজ আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে মুসলমানদের বুক ফাটা আর্তনাদ। মনে হচ্ছে যেন মুসলমানদের যোগ্য কোন আভিভাবক নেই, কোন আশ্রয় নেই। অথচ এই মুসলমানরাই এক সময় গড়েছিল সভ্যতার সোনালী ইতিহাস-শাসন করেছিল অর্ধ পৃথিবী। ইতিহাসের এই বিজয়ী জাতির আজ এই দুর্দশা কেন? আজ সারা বিশ্বে মুসলমানদের এই চরম দুর্দশার একমাত্র কারণ হলো মুসলমানদের ঈমানী দুর্বলতা এবং কাপুরুষতা। মুসলিম বিশ্ব আজ বহুধাবিভক্ত। মুসলমানরা আজ তাগুতী শক্তির ক্রীড়নক। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক ও আরাকান জুড়ে কাফের মুশরিকেরা মুসলিম নিধনের মহড়া দেয়, ইসরাঈলী হায়নারা ফিলিস্তিনের মা-বোনদের বুকে উপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করে, পিতার সামনে মেয়ের ইজ্জত লুন্ঠন করে, মিয়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা মুসলমানদের কচুকাটা করে অথচ মুসলিম নেতারা এই সব জুলুমের প্রতিবাদ টুকুও করতে ভয় পায়। এ অবস্থায় আল্লাহর সাহায্য আসবে কি করে? বদর প্রান্তরে মুসলমানদের মাঝে যে ঈমানী শক্তি, ঐক্য ও মমত্ববোধ, একনিষ্ঠতা ছিল, সাহাবীগণ যেভাবে ছিলেন কুফুর শিরকের বিরুদ্ধে আপোসহীন এসবের কিছুই তো আজ মুসলিম বিশ্বে নেই। আছে শুধু দ্বন্দ্ব-কলহ, ক্ষমতার লোভ, বিলাসিতা ইত্যাদি। বিশ্বের কোন একটি দেশে ইসালামপন্থীদের মধ্যেও সুদৃঢ় ঐক্য নেই। আর একারণেই আজ মুসলিম বিশ্বের এই অবস্থা। আল্লাহর সাহায্যও মদদ থেকে আমরা বঞ্চিত। যদি আমরা বদরের বিজয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি এবং সাহাবায়ে কেরামের ঈমানী চেতনায় যদি উজ্জীবিত হতে পারি, তাহলে আজও পৃথিবীতে ইসলামের পতাকা উচ্চকিত থাকবে, আমাদের সম্মান মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, মুসলমানদের এই দুর্দশা দূর হবে। পৃথিবীর কোন তাগুতী শক্তি মুসলমানদের দমিয়ে রাখতে পারবে না।

রমজান মাসের গুরুত্ব-ফজিলত ও মাসআলা মাসায়েল

সৈয়দ মবনু

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ইফতারের নিয়ত বাংলায় উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলাকা তাওয়াক্কালতু ওয়াবেরাহ মাতিকা আফতারতু ইয়া আরহামার-রাহেমীন। বাংলায় অর্থ: হে আল্লাহ আমি তোমার উদ্দেশ্যে রোজা রেখেছি। তোমার করুণার উপর নির্ভর করছি। এখন তোমার করুণার সাথে ইফতার করছি। হে সর্বশ্রেষ্ট করুণাময়।
তারাবি তারাবির নামাজ সুন্নাতে মোয়াক্কাদা, এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। কত রাকাত তারাবি পড়তে হবে? তা নিয়ে কিছু মতানৈক্য আছে। এখানে কেউ বলছেন আট রাকাত, কেউ বলছেন বারো রাকাত, আর কেউ বলছেন বিশ রাকাত। বেশির ভাগের মতে বিশ রাকাত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মত বিশ রাকাতের পক্ষে। এখানে প্রত্যেকের পক্ষেই হাদিসের দলিল আছে। এ নিয়ে উম্মতের ভেতর ফেতনা সৃষ্টির কোন অবকাশ নেই। মুসলিম উম্মাহের এই সংকটময় মুহূর্তে এই রকমের বিষয় নিয়ে ফেতনা সৃষ্টি করা খুবই লজ্জাকর ব্যাপার।
এতেকাফ এতেকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ আটকিয়ে রাখা বা আবদ্ধ থাকা। তবে সব আটকিয়ে রাখা বা আবদ্ধ রাখাকে এতেকাফ বলা যাবে না। শরিয়তের পরিভাষায় এতেকাফ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ইবাদতের নিয়তে পুরুষেরা মসজিদে এবং নারীরা নিজের ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা।
এতেকাফের ফজিলত যে ব্যক্তি সহীহ নিয়তে এবং খাঁটি ঈমানের সাথে পুণ্যের উদ্দেশ্যে এতেকাফ করবে তার পূর্ববর্তি সমস্ত সগিরা গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (দায়লমী)। উল্লেখ্য যে কবিরাহ গোনাহ তাওবাহ ছাড়া মাফ হয় না।
এতকাফের প্রকারভেদ এতেকাফ চার প্রকার-
১. মোস্তাহাব: রমজানের শেষ দশদিন ব্যতীত যে কোন সময় এতেকাফ করা মোস্তাহাব।
২. নফল: উলামায়ে কেরামের মতে কেউ যদি ব্যস্ততার কারণে ১৯ রমজান থেকে এতেকাফে বসতে না পারে, তবে সে যে কোন সময় নফলের নিয়তে এতেকাফে বসতে পারবে, প্রয়োজন মতো বেরিয়ে গিয়ে কাজ শেষে আবার এসে বসতে পারবে এর জন্য কাজা ওয়াজিব হবে না। এই এতেকাফ অনেকটা মোস্তাহাবের মতো।
৩. সুন্নতে কেফায়াহ: এটা অনেকটা জানাযার নামাজের বিধানের মতো গোটা উম্মতের পক্ষ থেকে কয়েকজনে আদায় করলে আদায় হয়ে যায়। রমজানের শেষ দশদিন এমন মসজিদে এই এতকাফ করতে হয় যেখানে জামাতে নামাজ হয়।
৪. ওয়াজিব: মান্নতের এতেকাফ অর্থাৎ কেউ যদি এতেকাফ মান্নত করে। মান্নত এতেকাফের জন্য রোজা রাখতে হবে। মান্নত এতেকাফে কেউ যদি শুধু দিনের কথা বলে তবে শুধু দিনে করলেই চলবে। শর্তের ভেতর যদি রাতের কথাও থাকে তবে রাতেও করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি শুরু রাতে এতেকাফের মান্নত করে তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুন্নতে কেফায়াহ কিংবা ওয়াজিব এতেকাফ ভঙ্গ করলে কাজা ওয়াজিব হবে।
এতেকাফের বিধান সমূহ ১. যে মসজিদে জামাতে নামাজ হয় পুরুষেরা সেই মসজিদে এতেকাফ আদায় করবে। নারীরা এতেকাফ আদায় করবে ঘরে।
২. নিয়ত ছাড়া এতেকাফ আদায় হবে না।
৩. এতেকাফের সময় মহিলাদের হায়েজ, নেফাজ এবং ফরজ গোসলের প্রয়োজন থেকে পবিত্র হতে হবে। এতেকাফ চলাকালিন সময় গোসল ফরজ হলে সাথে সাথে গোসল করে নিতে হবে।
৪. এতেকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান মসজিদুল হারাম, পরে মসজিদে নববী, তারপর মসজিদুল আকসা, তারপর যে কোন জামে মসজিদ (জামে মসজিদ বলা হয় যেখনে জুম্মার নামাজ হয়), অতঃপর মহল্লার পাঞ্জেগানা মসজিদ।
৫. এতেকাফ অবস্থায় দুই কাজ হারাম-ক) এতেকাফের স্থান থেকে শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত বের হওয়া। শরয়ী প্রয়োজন হলো-পাঞ্জেগানা মসজিদে এতেকাফ করলে জুম্মার নামাজের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া। প্রস্রাব, পায়খানা, ফরজ গোসল, খাবার আনার কেউ না থাকলে নিজে গিয়ে খেয়ে আসা ইত্যাদিকে তাবয়ী প্রয়োজন বলে মাসায়েলের কিতাব সমূহে পৃথক করা হলেও এগুলো প্রকৃত অর্থে শরয়ী প্রয়োজনের অন্তর্ভূক্ত। এই ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলো প্রয়োজন শেষ হওয়ার সাথে সাথে মসজিদে ফিরে আসা। জরুরী প্রয়োজন ব্যতিত সামান্য সময়ের জন্য বের হলে এতেকাফ ভেঙে যাবে।
খ) এই কাজ করা যা এতেকাফ অবস্থায় নাজায়েজ। যেমন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় মসজিদে কিংবা মসজিদের বাইরে স্বামী স্ত্রীর যৌন মিলন হওয়া। যদি চুম্বন কিংবা আলিঙ্গনে বির্যপাত না হয় তবে এতেকাফ ভঙ্গ হবে না, কিন্তু গোনাহ হবে। কল্পনা, চিন্তা কিংবা স্বপ্নগত কারণে বির্যপাত হলে এতেকাফ নষ্ট হবে না, তবে সাথে সাথে গোসল করে নিতে হবে।
এতেকাফ অবস্থায় যে দু রকমের কাজ হারাম তা যদি কেউ করে ফেলে তবে তার এতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। মোস্তাহাব কাজের কাজা করতে হয় না। বাকিগুলোর কাজা করতে হবে।
৬. এতেকাফের সময় একেবারে নীরবে চুপ থেকে বসে থাকা উচিত নয়। কোরআন তেলাওয়াত, দ্বীনি শিক্ষা অর্জন কিংবা দ্বীনি শিক্ষা দান, তাসবিহ ইত্যাদিতে সময় দেওয়া উত্তম। চুপ করে থাকার নাম কোন ইবাদত নয়।
যাকাত যাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। এরকমের যে কোন ফরজ কাজকে কেউ অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে। আদায় না করলে তাকে ফাসেক বলা যাবে। যাকাতের কথা পবিত্র কোরআনে অধিকাংশ স্থানে নামাজের পাশাপাশি এসেছে। যেমন সুরা বাকারাতে বলা হয়েছে নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো। যাকাত পবিত্র কোরআন হাদিসের অকাট্য (ক্বেতয়ী) দলিলের মাধ্যমে ফরজ। যাকাত আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা বৃদ্ধি। মালের নির্ধারিত অংশ যাকাতের হকদারের কাছে পৌছে দিলে বাকি অংশ পবিত্র এবং বরকতময় হয়ে যায়। শরিয়তের পরিভাষায় যাকাত হলো মালে নেসাবের মালিক ব্যক্তি তার মালের কোরআন সুন্নাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ অন্যকে মালিক করে দেয়া। রমজানের মতো যাকাত পৃথক একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ হলেও আমরা তা রমজানে মাসআলা মাসায়েলের ভেতর এজন্য নিয়ে এসেছি যে, গোটা বিশ্বের মুসলিম সমাজ যাকাত সাধারণত রমজানেই আদায় করে থাকেন। রমজানে যাকাত আদায়ে দুটি ফজিলত রয়েছে-
১. যাকাতের মতো একটি ফরজ কাজ আদায় হলো,
২. রমজানের ফজিলত হিসাবে পুণ্যের ক্ষেত্রে একে সত্তর।
যাকাত যাদের ওপর ফরজ যাকাত ফরজ হয় প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন এই স্বাধীন মুসলমানের ওপর যার কাছে প্রয়োজনীয় খরচের পর সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা এই পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর মওজুদ আছে। এই সম্পদ থাকাকেই শরিয়তের পরিভাষায় যাকাতের নেসাব বলা হয়। যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে তাকে সাহেবে নেসাব বলে।
সাহেবে নেসাবের প্রকারভেদ ১. যদি কারো কাছে বছরের শুরুতে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে আর শেষের দিকে থাকে না তবে যাকাত ফরজ হবে না।
২. যদি কারো কাছে বছরের শুরুতে এবং শেষে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে আর মধ্যখানে থাকে না তবু যাকাত দিতে হবে।
৩. যদি কারো কাছে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং ব্যবসার মাল এমন হয় যে, পৃথক থাকলে কোনটাই মালে নেসাব নয়, আর এক করলে মালে নেসাব হয়ে যায় তবে যাকাত ফরজ হয়ে যাবে। এখানে হিসাবটা করতে হবে এক করে। (হেদায়াহ)
যাকাতের পরিমাণ মালের চল্লিশভাগের একভাগ যাকাত দেয়া ফরজ। যদি কেউ মালের হিসাব করে নগদ টাকা দিয়ে যাকাত আদায় করতে চায় তবে তা আদায় হয়ে যাবে। নগদ অর্থের হিসাবটা হবে চল্লিশ টাকায় এক টাকা। একশ টাকায় আড়াই টাকা। এক লাখে আড়াই হাজার টাকা। মাল যে দেশে বা যে অঞ্চলে থাকবে সেখানের হিবাবানুসারে যাকাত দিতে হবে। ইংল্যণ্ডে পাউন্ড, আমেরিকায় ডলার এবং সৌদিতে রিয়ালের হিসাবে যাকাত আদায় করতে হবে। হিসাব হবে চল্লিশে এক এবং একশতে আড়াই পাউন্ড/ ডলার/ রিয়াল ইত্যাদি।
যাকাত আদায়ের শর্ত যাকাত হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ধনীর মালে গরিবের অধিকার। এই অধিকার আদায়কালে আদায়কারি হক্বদারকে মালের পূর্ণাঙ্গ মালিকত্ব দিয়ে দিতে হবে। কাজের বিনিময় কিংবা অনুগ্রহ আর দয়া-মায়ায় দিলে হবে না। দিতে হবে যাকাতের নিয়তে। যিনি যাকাত দিবেন তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস থাকতে হবে আমি যা দিচ্ছি তা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত গরিবের হক। যাকে দেয়া হবে সে এই মাল স্বাধীনভাবে খরচের অধিকার পাবে। যদি আদায়কারি কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করেন তবে যাকাত আদায় হবে না। নির্বাচন কিংবা দানবীর প্রচারের উদ্দেশ্যে যদি কেউ যাকাত দেন তবে তা আদায় না হয়ে বরং পাপ হবে। যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে যদি সামান্যও আমিত্ব কাজ করে তবে তাতে পাপ অবশ্যই হবে।
যে সকল বস্তু থাকলে যাকাত ফরজ হয় ইসলামি শরিয়তে চার প্রকার বস্তুর ওপর যাকাত ফরজ করা হয়েছে ১) স্বর্ণ রৌপ্য, ২) ব্যবসার মাল, ৩) চতুষ্পদ জন্তু, ৪) কৃষি উৎপাদনের ওপর। এখানে উল্লেখ্য যে, কৃষি উৎপাদনের ওপর যে হিসাব তা যাকাত থেকে একটু ভিন্ন। তাই এটাকে যাকাত না বলে শরিয়তে তাকে ‘ উশর’ বলা হয়। উশরের হিসাব হলো উৎপাদনের দশ ভাগের এক ভাগ।
যাকাত না দিলে যাকাত দেয়ার মতো মাল থাকার পরও যাকাত না দিলে এই ব্যক্তি ফাসেক হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই রকমের ব্যক্তির প্রতি ইসলাম এবং মুসলমানের কোন দায়-দায়িত্ব নেই। ইসলামি রাষ্ট্র থাকলে তাদের কে শাস্তি দেয়ার বিধান রয়েছে এবং রাষ্ট্র ওদের কোন নিরাপত্তা দিতে বাধ্য নয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে ‘যদি তারা তাওবাহ করে আর নামাজ কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে তা’হলে তাদের রাস্তা বন্ধ করবে না, তাদেরকে কষ্ট দেবে না।(সুরা তাওবাহ)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে গরিবের হক যাকাত আদায় করে না তার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে তাকে কষ্ট দেয়া বৈধ আছে। এই আয়াত আমাদেরকে শোষক এবং পুঁজিবাদিদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিচ্ছে। হযরত ওমর বিন খাত্তাব (র.) যাকাত অনাদায়কারিদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে রয়েছে‘ যদি তারা তাওবা করে, নামাজ কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের ভাই। (সুরা তাওবাহ) অর্থাৎ যারা যাকাত দেয় না তাদের সাথে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রসঙ্গ: যাকাত আর জিজিয়া অনেকে জিজিয়াকে অমুসলিমদের ওপর জুলুম বলে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করে থাকেন। প্রকৃত অর্থে যাকাত আর জিজিয়ার বিধান চিন্তা করলে একই। আমরা জানি যে, যাকাত শুধু মুসলমানদের ওপর ফরজ। ইসলামি রাষ্ট্রে যাকাত আদায়কারির জান, মাল, ইজ্জতের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিবে রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে যাকাত আদায় করবে রাষ্ট্র। ইসলামি রাষ্ট্রে যাকাত আদায়কারির মালের ওপর অন্য কোন রাষ্ট্রীয় টেক্স আসবে না। এখন কথা হলো ইসলামি রাষ্ট্রে যারা অমুসলিম হবে তাদেরতো যাকাত-ফেতরা নেই, তা হলে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নেবে না? অবশ্যই নেবে। বিনিময়ে তারা জিজিয়া টেক্স দিবেন। এক্ষেত্রে বিধান হলোÑযদি রাষ্ট্র জিজিয়া টেক্স আদায়করি কোন নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তবে অবশ্যই তার জিজিয়ার টাকা ফেরত দিতে হবে। জিজিয়া টেক্স নিয়ে অজ্ঞতা বশত অনেকে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেন। এই বিষয়টি শরিয়তে এতই স্পষ্ট রয়েছে যে, বিভ্রান্তির কোন সুযোগ নেই। জিজিয়া টেক্সের ওপর নাম অমুসলিমদের নিরাপত্তা টেক্স। মুসলমানরা যাকাত দেয়, অমুসলিমরা জিজিয়া দেয় এই হলো ব্যবধান।
যাকাতের তাৎপর্য পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাকের ঘোষণা হলো ‘ যে নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুসরণ করে অতি নিকটবর্তি আল্লাহ তার ওপর দয়াবান হবেন।’ (সুরা তাওবাহ)। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে‘ হে নবি, আপনি তাদের মাল থেকে সদকা আদায় করুন যা দ্বারা তাদেরকে গোনাহ থেকে পবিত্র ও পরিষ্কার করা হয়।’ ( সুরা তাওবাহ)
ফেতরা ফিতরাকে বলা হয় রোজার যাকাত। যাকাত যেমন মালকে পবিত্র করে তেমনি ফেতরাও রোজাকে পবিত্র করে, অর্থাৎ রোজা রেখে যে ভুল-ত্র“টি হয় তা ফেতরার মাধ্যমে পূরণ হয়ে মকবুলিয়তের কারণ হয়ে যায়। ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে যাদের এমন মাল আছে যে ঘরের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত থাকে তার ওপর ফেতরা ওয়াজিব। ফেতরা দিতে হয় নিজের পক্ষ থেকে এবং পৌষ্যের পক্ষ থেকে। ফেতরার জন্য মালের এক বছর হওয়া জরুরী নয়। ঈদের দিন জামাতের পূর্বে ফেতরা আদায় করা উত্তম। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)এর মতে ফেতরার পরিমাণ হলো গমের অর্ধ ছা’য়া বা এক সের বারো ছটাক। অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের পূর্ণ এক ছা’য়া বা তিন সের নয় ছটাক। নাবালেগের ফেতরা তার অভিবাবকের পক্ষ থেকে দিতে হয়। যাকাত যাদের দেয়া যায় ফেতরাও তাদেরকে দেয়া যায়। বিশিষ্টি সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন ‘ মুসলমান ক্রিতদাস ও আজাদ, নারী পুরুষ, ছোট বড় সবার ওপর হযরত নবি করিম (স.) সদকায়ে ফেতর এক ছা’য়া খেজুর বা যব নির্ধারণ করেছেন। মানুষ ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’ (মুত্তাফেকুন আলাইহে)। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে তার ইবাদতের তাওফিক দান করুন-আমিন। (সমাপ্ত)

লেখা ও বিজ্ঞাপন আহবান..

poto-1

মাহে রমজানের মর্যাদা ও ফজিলত

মোবারক হোসাইন

রমজান মাস সিয়াম সাধনা ও তাকওয়ার মাস, কল্যাণ ও বরকতের মাস, রহমত ও মাগফিরাত এবং জাহান্নামের অগ্নি থেকে মুক্তি লাভের মাস। মহান আল্লাহ এ মাসটিকে বহু ফজিলত ও মর্যাদা দিয়ে অভিষিক্ত করেছেন। এ গুরুত্ববহ তাৎপর্যময় মাস সারা বিশ্বের মুসলমানদের সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। মুমিন বান্দার জীবনে বছরের মধ্যে রমজান মাসটিই এক দুর্লভ সুযোগ এনে দেয়। তাই এ পুণ্যময় মাসের গুরুত্ব এত বেশি। এ কারণেই বলা হয়, পবিত্র রমজান মাস হচ্ছে ইবাদত, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, জিকর, শোকর ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মৌসুম। একদা নবী করিম (সা) মাহে রমজানের প্রাক্কালে বলেন, “রমজান মাস আগতপ্রায়, এ মাস বড়ই বরকতের মাস, আল্লাহ তাআলা বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করেন এবং খাস রহমত বর্ষণ করেন, গুনাহ মাফ করেন ও দোয়া কবুল করেন।” রোজাদারের মর্যাদা উল্লেখ করে হাদিস শরিফে রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন, “রোজাদারের নিদ্রা ইবাদতের সমতুল্য, তার চুপ থাকা তসবিহ পাঠের সমতুল্য, সে সামান্য ইবাদতে অন্য সময় অপেক্ষা অধিকতর সওয়াবের অধিকারী হয়। ঈমান ও এহতেসাবের সঙ্গে যে ব্যক্তি রোজা রাখে তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” আর রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “মানুষ যত প্রকার নেক কাজ করে আমি তার সওয়াব ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি করে দিই। কিন্তু রোজা এই নিয়মের বাইরে। রোজার সওয়াব একই নিয়মে সীমাবদ্ধ বা সীমিত নয়। রোজার সওয়াবের পুরস্কার স্বয়ং আমি প্রদান করব। অথবা আমি নিজেই রোজার সওয়াবের পুরস্কার।” এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে উল্লেখ হয়েছে, যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো নফল কাজ করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজই আদায় করল। আর যে এ মাসে কোনো ফরজ আদায় করল সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায় করল। নবী করিম (সা) ঘোষণা করেছেন, “যারা রমজান মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রোজা পালন করেছে, তারা ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে, যেদিন তাদের মাতা তাদের নিষ্পাপরূপে প্রসব করেছিলেন।”
রামাদান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হল সিয়াম। আর সিয়াম হলো ফজরের উদয়লগ্ন থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়াতসহ পানাহার ও যৌন মিলন থেকে বিরত থাকা। রামাদান মাসের রোজাকে ফরজ করে যে আয়াত নাজিল হয় তাতে আল্লাহ রোজার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্দেশ করেছেন।
সিয়াম পালন তথা রোজা ফরয এবং এটি ইসলামের অন্যতম একটি রুকন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমদের ওপর রোজা ফরজ করে দেয়া হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৩)
“সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে রোজা পালন করে।’’ (সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৫)
রোজার গুরুত্ব আরো প্রকটিত হয় সে সব ফজিলতের দ্বারা, যদ্বারা একে বিশেষত্ব দান করা হয়েছে। সে সবের মধ্যে রয়েছে :
১.    রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: “রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী।” (সূরা বাকারা : ১৮৫) রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম সা.-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরাইল রাসূলুল্লাহ (সা)-কে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন এবং রাসূল সা.-ও তাকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দুই বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।
২.    এ মাসে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়, জাহান্নামের দ্বারসমূহ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “রমজান মাসে এলে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয় জাহান্নামের দ্বারসমূহ রুদ্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০০)
৩.    এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল ক্বদেরর ন্যায় বরকতময় রজনী : মহান আল্লাহ বলেন, “লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাত্রে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজে, তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিময় এ রজনী, ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’’ (সূরা আল ক্বদর : ৩-৫)
৪.    এ মাস দোয়া কবুলের মাস : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “(রমজানের) প্রতি দিন ও রাতে (জাহান্নাম থেকে) আল্লাহর কাছে বহু বান্দা মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। তাদের প্রত্যেক বান্দার দোয়া কবুল হয়ে থাকে (যা সে রমজান মাসে করে থাকে)।’’ (সহীহ সনদে ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত, হাদিস নং ৭৪৫০)
৫.    রোজার পুরস্কার আল্লাহ স্বয়ং নিজে প্রদান করবেন : একটি হাদিসে কুদসিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলেন, “বনি আদমের সকল আমল তার জন্য, অবশ্য রোজার কথা আলাদা, কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর পুরস্কার দেবো।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)
৬.    রোজা রাখা গোনাহের কাফফারা স্বরূপ এবং ক্ষমালাভের কারণ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রামাদান মাসে রোজা রাখবে, তার পূর্বের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৯১০)
৭.    রোজা জান্নাত লাভের পথ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে যাকে বলা হয় ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে রোজাদারগণ প্রবেশ করবে। অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে নাৃ.. রোজাদারগণ প্রবেশ করলে এ দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’’ (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ১৭৯৭)
৮.    সিয়াম রোজাদারের জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: “কিয়ামতের দিন রোজা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে রব! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির কামনা হতে বাধা দিয়েছি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন।’ কুরআন বলবে, ‘আমি তাকে রাতের বেলায় ঘুমাতে দেয়নি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। ফলে এ দুয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ ’’ (মুসনাদ, হাদিস নং ৬৬২৬)
৯.    রোজা জাহান্নামের অগ্নি থেকে মুক্তিলাভের ঢাল : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন : যে বান্দাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখে আল্লাহ তার মাঝে এবং জাহান্নামের মাঝে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৪)
১০.    এ মাসের রোজা রাখা একাধারে বছরের দশ মাস রোজা রাখার সমান : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “রমজানের রোজা দশ মাসের রোজার সমতুল্য, ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান, এ যেন সারা বছরের রোজা।”
১১.    রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিসকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ! রোজাদারের মুখের গন্ধ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মিসকের চেয়েও সুগন্ধিময়।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৪)
১২.    রোজা ইহ-পরকালে সুখ-শান্তি লাভের উপায় : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “রোজাদারের জন্য দুটো খুশির সময় রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময় এবং অন্যটি স্বীয় প্রভু আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার সময়।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)
রোজার আরো ফজিলতের মধ্যে রয়েছেÑ
এতে ইচ্ছা ও সঙ্কল্পে দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়, চারিত্রিক মাহাত্ম্য অর্জিত হয়, শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায় এবং সর্বোপরি তা মুসলিম উম্মাহ্ একতাবদ্ধ হওয়ার এক বাস্তব নিদর্শন।
এক. রোজাদারকে ইফতার করানো : সহীহ সনদে তিরমিযী ও আহমাদ বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করায়, সে উক্ত রোজাদারের সাওয়াবের কোনরূপ ঘাটিত না করেই তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।’’ (সুনান তিরমিযী, হাদিস নং ৮০৭)
দুই. এ মাস সবর বা সহিষ্ণুতার মাস : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত এ হাদীসে রামাদান মাসকে সবরের মাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : “সবরের মাসে রোজা রাখা ও প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোজা রাখা অন্তরের অস্থিরতা দূর করে থাকে।” (আল বানী বলেন হাসান-সহীহ হাদিস নং ১৭০৩৩)
তিন. কুরআন তেলাওয়াত করা এবং এর মর্ম উপলব্ধি করা
রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাইলের সাথে কুরআন পাঠ করতেন। তার সিরাত অনুসরণ করে প্রত্যেক মু’মিনের উচিত এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা, বোঝা এবং আমল করা। ইবনু আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “জিবরাইল রামাদানের প্রতি রাতে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাকে নিয়ে কুরআন পাঠ করতেন।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩০৪৮)
চার. আল্লাহর রাস্তায় বেশি বেশি দান ও সদকা করা
আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা ও ব্যয় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। সব সময় যাতে সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গ এ ইবাদাত পালন করে সে ব্যাপারে ইসলাম ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেছে। আর রমজান মাসে এ ইবাদাতের তাৎপর্য ও গুরুত্ব আরো বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। কেননা ইমাম বুখারী ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মানুষের চেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। আর রমজান মাসে যখন জিবরাইল তার সাথে সাক্ষাতে মিলিত হতেন তখন তিনি আরো দানশীল হয়ে উঠতেনৃ। জিবরাইলের সাক্ষাতে তিনি বেগবান বায়ুর চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩০৪৮)
পাঁচ. বেশি বেশি দোয়া, জিকর এবং ইস্তেগফার করা
রমজানের দিনগুলোতে পুরো সময়টাই ফজিলতময়। তাই সকলের উচিত এ বরকতময় সময়ের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা- দোয়া, যিকর ও ইসস্তেগফারের মাধ্যমে। কেননা রমজান মাস দোআ কবুল হওয়ার খুবই উপযোগী সময়, যেমন প্রবন্ধের শুরুতে একটি হাদিসের বর্ণনায় বলা হয়েছে।
ছয়. সকল প্রকার ইবাদতে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা :
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাদান মাসে অন্য মাসের চেয়েও বেশি বেশি ইবাদাত করতেন। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রহ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ছিল রমজান মাসে সকল ধরনের ইবাদাত বেশি বেশি করা। তিনি ছিলেন সবচেয়ে দানশীল এবং রামাদানে আরো বেশি দানশীল হয়ে যেতেন,  কেননা এ সময়ে তিনি সদকা, ইহসান ও কুরআন তেলাওয়াত, নামাজ, যিকর ও ইতেকাফ ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদত অধিক পরিমাণে করতেন। তিনি রামাদানে এমন বিশেষ ইবাদাতসমূহ পালন করতেন যা অন্য মাসগুলোতে করতেন না। (যাদুল মাআ‘দ ১/৩২১)
সাত. কিয়ামু রমজান বা রমজানের তারাবিহের ফজিলত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে রমজানের তারাবিহ আদায় করল তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য এক হাদিসে এভাবে ইরশাদ করেছেন, “যখন কোন ব্যক্তি ইমামের সাথে ইমাম তার নামাজ শেষ করা পর্যন্ত নামাজ আদায় করবে তার জন্য তা সারা রাত জেগে ইবাদত করা হিসেবে গণ্য হবে।”
আট. লাইলাতুল ক্বাদরের বিশেষ ফজিলত
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আমরা লাইলাতুল কাদরে তা (কুরআন) নাজিল করেছি, আপনি কি জানেন লাইলাতুল কাদর কী? লাইলাতুল ক্বাদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, এতে ফিরেশতাকুল ও জিবরাইল তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সকল বিষয় নিয়ে অবতীর্ণ হয়, ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত ইহা শান্তিময়।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে লাইলাতুল কাদর জেগে ইবাদত করল তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।”
শরীয়ত যা বর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছে
শরীয়তের পক্ষ থেকে মূলত ছোট-বড় সকল গোনাহ ও পাপ সর্বদা বর্জন করার নির্দেশ এসেছে। আর রমজান মাস  ফজিলতের মাস এবং আল্লাহর ইবাদাতের প্রশিক্ষণ লাভের মাস হওয়ায় এ মাসে সর্বপ্রকার গোনাহের কাজ পরিত্যাগ করা অধিক বাঞ্ছনীয়। তদুপরি রামাদান মাসে সৎকাজের সওয়াব ও নেকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, তাই রমজানের সম্মান ও ফজিলতের কারণে এ মাসে সংঘটিত যে কোন পাপের শাস্তি অন্য সময়ের তুলনায় ভয়াবহ হবে এটাই স্বাভাবিক। এ জন্যই রোজাদারদের উচিত তাকওয়াবিরোধী সকল প্রকার মিথ্যা কথা ও কাজ পরিপূর্ণভাবে বর্জন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি (রোজা রেখে) মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ করা বর্জন করে না তবে তার শুধু খাদ্য ও পানীয় বর্জন করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৪)
অন্য আরেকটি হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের কেউ রোজার দিনে অশ্লীল কথা যেন না বলে এবং শোরগোল ও চেঁচামেচি না করে। কেউ তাকে গালমন্দ করলে বা তার সাথে ঝগড়া করলে শুধু বলবে, আমি রোজাদার।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)
যে ব্যক্তি কল্যাণকামী মাস মাহে রমজান পেয়ে নিজের গুনাহ মাফ করতে পারলো না, সে হল সবচেয়ে হতভাগ্য ব্যক্তি। এ প্রসঙ্গে হাদিস : হযরত কাব কর্তৃক হাদিসটি বর্ণিত। একদা রাসূল (সা) মসজিদে ইরশাদ করলেন : “তোমরা মিম্বরের নিকটবর্তী হও। আমরা নিকটে গেলাম। হুজুর (সা) মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে বললেন, ‘আমীন’। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সিঁড়িতে পা রেখেও দুইবার আমীন বললেন। খুতবা শেষে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে হযরত বললেন, এই মাত্র হযরত জিবরাঈল (আ) তাশরিফ এনেছিলেন। প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তির ওপর লানত যে রমজান মাস পেয়েও নিজের পাপ মাফ করিয়ে নিতে পারেনি। আমি বললাম, ‘আমীন’ অর্থাৎ তাই হোক। দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখতেই জিবরাঈল বললেন, লা’নত ঐ ব্যক্তির ওপর যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও দরূদ পড়েনি। আমি বললাম, ‘আমীন’। অতপর তৃতীয় সিঁড়িতে আমি পা রাখতেই জিবরাঈল বললেন, লা’নত ঐ ব্যক্তির ওপর যার সামনে মাতা-পিতা উভয়ই অথবা দু’জনের একজন বার্ধক্যে পৌঁছেছে কিন্তু সে তাদের সেবাকর্মে নিজেকে জান্নাতের যোগ্য করতে পারলো না। উত্তরে আমি বললাম, ‘আমীন’।
শেষকথা
ত্বাকওয়া অর্জনের এ মুবারক মাসে মুমিনদের উপর অর্পিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সৃষ্টি হয়েছে পূণ্য  অর্জনের বিশাল সুযোগ এবং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহান চরিত্র অর্জনের সুন্দর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। এ অর্পিত দায়িত্ব পালন এবং সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আজ সারা বিশ্বের মুসলিমদের উচিত চারিত্রিক অধঃপতন থেকে নিজেদের রক্ষা করা, নেতিয়ে পড়া চেতনাকে জাগ্রত করা এবং সকল প্রকার অনাহুত শক্তির বলয় থেকে মুক্ত হয়ে হক প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞাকে সুদৃঢ় করা, যাতে তারা রিসালাতের পবিত্র দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে এবং কুরআন নাযিলের এ মাসে কুরআনের মর্ম অনুধাবন করতে পারে, তা থেকে হিদায়াত লাভ করতে পারে এবং জীবেনের সর্বক্ষেত্রে একেই অনুসরণের একমাত্র মত ও পথ রূপে গ্রহণ করতে পারে। মাহে রমজানে রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করেন। রিপুর তাড়না থেকে তাকে মুক্ত করে তার ভেতর তাকওয়া-খোদাভীতি ও আল্লাহপ্রেম জাগ্রত করতে চান। সেই সত্য-সুন্দরের পথ তাকে সাফল্য ও মুক্তির দ্বারপ্রান্তেনিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে রমজান মাসের রোজা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, সেহির, ইফতার, তারাবি নামাজ, সাদাকাতুল ফিতর, জাকাত, দান-খয়রাত প্রভৃতি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতরাজি, যা রোজাদারদের কুপ্রবৃত্তি দমন ও তাকওয়া বা খোদাভীতিপূর্ণ ইবাদতের মানসিকতা সৃষ্টিতে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা জোগায়। পবিত্র মাহে রমযানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সর্বজনীন-কল্যাণের শাশ্বত চেতনায় সকল অকল্যাণ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানবতাকে বিজয়ী করার পথে আমাদের এগিয়ে দিক। আল্লাহ আমাদের সকল আমল কবুল করুন এবং আমাদের সবাইকে আরো উত্তম আমল করার তাওফীক দান করুন।

আমাদের জীবনে মাহে রমজান

সাকী মাহবুব

সময়ের আবর্তে বছর ঘুরে আজ মুসলিম বিশ্বের দ্বারপ্রান্তে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত  নিয়ে  মাহে  রমজানের শুভাগমন। মাহে  রমজান আমাদের মাঝে এসেছে তাকওয়া আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণআত্মসর্মপেণর পুষ্পশুভ্র ও ইস্পাতদৃঢ় চেতনা নিয়ে। নানা কারণে ও তাৎপর্যে এ মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়। রমজান রোজার মাস, পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস, লাইলাতুল কদরের মাস, বদর যুদ্ধের মাস, তারাবিহ, কুরআন তিলাওয়াত, ইতেকাফ, দান-খয়রাতসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির মাস। ত্যাগ-তিতিক্ষা সংযম, সমবেদনা ও সহমর্মিতার বার্তাবহ এ মাস রমজান। রহমত (অনুগ্রহ) মাগফিরাত (ক্ষমা) ও নাজাতের (জাহান্নাম থেকে মুক্তির) এ মাস রমজান।
রমজানের নামকরণ
‘রমজান’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে জ্বালিয়ে দেয়া, পুড়িয়ে দেয়া, বিনাশ সাধন করা, দহন করা বা পোড়ানো। যেহেতু রমজানের রোজা গুনাহসমূহ ও আত্মার সর্বপ্রকার কলুষতা ও অপবিত্রতাকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয় তাই এ মাসের নাম রমজান।
রোজার  আভিধানিক সংজ্ঞা
রোজা ফারসি শব্দ। আরবিতে এর  প্রতিশব্দ ‘সাওম’। যার বহুবচন হচ্ছে সিয়াম। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, কঠোর সাধনা করা, জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে দেওয়া, অবিরাম চেষ্টা করা ইত্যাদি।
রোজার পারিভাষিক সংজ্ঞা
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তিসহ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার নামই রোজা।
রোজার উদ্দেশ্য
শরিয়তের প্রত্যেকটা আমলের একটা সহিহ উদ্দেশ্য থাকে। প্রত্যেক সহিহ আমলের সেই উদ্দেশ্য যদি হাসিল করা যায়, তাহলে সেই আমলের পুরোপুরি ফায়দা পাওয়া যায়। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের উপর যে রোজার বিধান দেয়া হয়েছে। এই রোজার উদ্দেশ্য কি তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই ঘোষণা করেছেন।
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বন করতে পার। (সূরা : বাকারা : ১৮৩) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন তাকওয়া অর্জনের জন্য। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখেছেন- রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদার মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। ইমাম গাজ্জালী (রহ) ইয়াহইয়াউল উলুমদ্দিন গ্রন্থে লিখেছেন, আখলাকে ইলাহি তথা ঐশ্বরিক গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে  তোলাই রোজার উদ্দেশ্য। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। শারীরিক ও আত্মিক শক্তির উন্নতি সাধন করে।
যুগে যুগে রোজা
পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকেই রমজানের ধারাবাহিকতা চলে এসেছে। হযরত আদম (আ) চন্দ্রমাসে ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখে রোজা রাখতেন। হযরত নূহ (আ) ১লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন। এমনিভাবে হযরত ইবরাহিম (আ), হযরত মূসা (আ), দাউদ (আ), ঈসা (আ) প্রত্যেকে তাঁর নিজ নিজ সময়ে রোজা রেখেছেন। এককথায় পূর্ববর্তী বলতে হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল যুগের মানুষকেই বুঝানো হয়েছে। আর এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেছেন “ইতঃপূর্বে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেমন রোজা ফরজ করা হয়েছিল”। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এ উম্মত যেন রমজানের কষ্টের কথা শুনে ঘাবড়ে না যায়। কেননা একাকিত্বের অনুভূতি মানুষকে ঘাবড়ে দেয়। পক্ষান্তরে সে যখন জানতে পারে যে, তার উপর আরোপিত বিধান কষ্টসাধ্য হলেও সেটা অভিনব কিছুই নয় বরং পূর্বেও এ বিধান পালন করেছে। তখন স্বভাবতই সে মানসিক স্বস্তি ও শক্তি সঞ্চয় করে। তার হিম্মত মনোবল ও উদ্যম বেড়ে যায়। আসমানি যত ধর্ম ছিল যথা ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম, ইবরাহিম (আ)-এর ধর্ম সব ধর্মে সিয়াম সাধনা ছিল ফরজ। কম্পারেটিভ রিলিজিয়ন তথা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে যাদের জ্ঞান আছে তারা জানেন, প্রাচীন সব ধর্মে রোজা পালন, পানাহার ত্যাগ ইত্যাদির প্রচলন ছিল। যথা হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, ব্যবিলনীয় ধর্ম, মিশরীয় ধর্ম এবং মেক্সিকো আদিবাসীর ধর্মসহ সকল ধর্মে দেখা যায় পানাহার ত্যাগ করা ও যৌন সম্ভোগ ত্যাগ করার নির্দেশ পালন করা হতো। এক কথায় বলা যায় যে, ঐশী ধর্ম এবং অন্যান্য সকল ধর্মে রোজার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।
রোজার ফজিলত
রমজানের রোজার ফজিলত অনেক। ইসলামে যে সকল ইবাদতের সওয়াব ও পুরস্কার সর্বাধিক তার মধ্যে রমজানের রোজা অন্যতম। অন্য কোন ইবাদতের ফজিলত এত বেশি আলোচিত হয়নি। এখানে আমরা রমজানের রোজার ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করব।
১.    হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের রোজা রাখবে, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম)
২.    রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)
৩.    রমজান মাস এলে রহমতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)
৪.    রমজান সবরের মাস, আর সবরের পুরস্কার হলো জান্নাত। (বায়হাকি)
৫.    রমজানের মোমিনের জীবিকা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। (বায়হাকি)
৬.    যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো  রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ঐ রোজাদারের পুরস্কারের কমতি হবে না। (বায়হাকি)
৭.    রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুঘ্রাণের চেয়েও উত্তম। (বুখারি ও মুসলিম)
৮.    যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে আহার করাবেন; আল্লাহ তাকে হাউজে কাওসার থেকে পান করাবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত সে আর তৃষ্ণার্ত হবে না। (বায়হাকি)
৯.    জান্নাতে আটটি দরজা আছে। এর মধ্যে একটির নাম রাইয়ান।  রোজাদারদের ছাড়া আর কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি ও মুসলিম)
১০.    রোজাদারদের জন্য দু’টি আনন্দের সময় একটি হলো ইফতারের সময় আর অপরটি তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারি ও মুসলিম)
১১.    রাসূলে করিম (সা) বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজ দশ থেকে সাতশত গুণ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু আল্লাহ বলেন, রোজাকে এর মধ্যে গণ্য করা হবে না। কারণ রোজা খাস করে কেবল আমারই জন্য রাখা হয় আর আমিই এর প্রতিফল দেবো। (বুখারি ও মুসলিম)
তাকওয়া সৃষ্টিতে রোজা
রোজা আদায়ের মাধ্যমে মানব হৃদয়ে আল্লাহ প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসায় বান্দা এসব থেকে বিরত থেকে রোজা পালন করে। আল্লাহকে ভয় করার নামই তাকওয়া বা খোদাভীতি। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বকে অপরাধমুক্ত করতে হলে এই তাকওয়ার কোনও বিকল্প নেই। লোক চক্ষুর অন্তরালে, পুলিশি প্রহরা যেখানে নিষ্ক্রিয়, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী যেখানে যেখানে অপারগ, স্যাটেলাইটের তীক্ষè দৃষ্টি যেখানে অসহায়, সেখানেও আল্লাহর ভয় একজন ব্যক্তিকে অপরাধমুক্ত রাখতে পারে। তাকওয়া মূলত নিজের জন্য নিজেই প্রহরী। আল্লাহ তায়ালা বলেন- তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।
রোজা ঢালস্বরূপ
রোজা মানুষকে ষড়রিপুর আক্রমণ থেকে ঢালস্বরূপ বাঁচিয়ে রাখে। কাম, ক্রোধ, লোভ লালসা ইত্যাদি রিপুর তাড়নায় মানুষ বিপথগামী হয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়; রোজা মানুষের এ সকল কুপ্রবৃত্তি দমন করে। এ কারণেই মহানবী (সা) বলেছেন, আস্সাওমু জুন্নাতুন অর্থাৎ রোজা ঢালস্বরূপ।
রোজা উন্নত চরিত্র গঠনের কারিগর
রোজা উন্নত চরিত্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়। ফলে সে ভালো চরিত্রবান আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠে।
আল্লাহপ্রেমের নিদর্শন
রোজা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার প্রেম ও ভালোবাসারই নিদর্শন। এটা কোন লোক দেখানো ইবাদত নয়। র‌্যাবের ভয়ে মানুষ রোজা করে না, একমাত্র মহান রবের ভয়ে রোজা রাখে। রোজার মাসে খাওয়া ও পান করার যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও মানুষ আল্লাহর ভয়ে তা থেকে বিরত থাকে। তাই আল্লাহ রাববুল আলামিন বলেন, রোজা আমার জন্য আর আমি এর প্রতিদান দেবো।
রোজা  ধৈর্য ও সংযমের কারিশমা
বাস্তব জীবনে ধৈর্যের প্রয়োজন অনেক বেশি। তাই আল্লাহ রমজানকে ধৈর্যের একটি বিজ্ঞানসম্মত কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মাঝে মাঝে ধৈর্য কমে যায়। তখন পানাহার ও যৌন চাহিদা থেকে দীর্ঘ এক মাস বিরত রাখার মাধ্যমে তাকে মজবুত করা হয়। দাওয়াতে দ্বীন ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কষ্ট সহ্য করার জন্য ধৈর্যের ভীষণ প্রয়োজন। শত্রুরা কিংবা অজ্ঞ লোকেরা গালিগালাজ ও হাসি ঠাট্টা করবে। ধৈর্যের সাথে এর মোকাবেলা করে হেকমতের সাথে দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য মোমিনের সাফল্যের চাবিকাঠি। রাসূল (সা) বলেছেন, রমজান হচ্ছে ধৈর্য ও সংযমের মাস। রাসূল (সা) অন্য হাদিসে বলেছেন, রোজা ধৈর্যের অর্ধেক। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ধৈর্য ধারণকারীদের সাথে আছেন। ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক জীবনকে সুখী ও উত্তেজনামূলক রাখার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। আর রমজান এ ধৈর্যের সওগাত নিয়েই বছরে একবার আমাদের দুয়ারে হাজিরা দেয়।
রোজা বিশ্ব মানবতার মুক্তির মাধ্যম
কিয়ামতের কঠিন মুহূর্তে রোজা বান্দার মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। এ মর্মে রোজাসমূহ সুপারিশ করে বলবে, হে প্রভু! আমি এ ব্যক্তিকে দিনে পানাহার ও অন্যান্য কামনা বাসনা হতে ফিরিয়ে রেখেছি। আপনি আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুপারিশ গ্রহণ করবেন। (বায়হাকি)
আরশের ছায়াতলে স্থান ও জান্নাত লাভ
কঠিন ভয়াবহ হাশরের ময়দানে যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না সেদিন সবাই স্বীয় কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ দেয়ার জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছোটাছুটি করবে- সেই বিভীষিকাময় দিনে রোজাদারগণ আল্লাহর আরশের ছায়াতলে স্থান লাভ করবে এবং পরিশেষে জান্নাত লাভ করবে।
রোজা আদর্শ সমাজ গঠনের মাইলফলক
রোজা এমন এক ইবাদত, যা পালন করার মাধ্যমে আদর্শ সমাজ গঠন করা যায়। মানুষ যখন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা, বিদ্বেষ, মিথ্যা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, গিবত, ঝগড়া-ফাসাদ, পরচর্চা, চোগলখুরি, অশ্লীলতার চর্চা, ব্যভিচার ইত্যাদি অসৎ স্বভাব থেকে মুক্ত থাকে তখন সমাজে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধি বিরাজমান থাকে। গঠিত হয় আদর্শ সমাজ।
রোজা বিনোদনের এক অন্যতম মাধ্যম
সারাদিন রোজা রেখে সন্ধ্যার সময় ইফতার করার পর রোজাদার যে মানসিক ও প্রশান্তি ও স্বর্গীয় অনুভূতি লাভ করে তা সত্যিকার অর্থে অতুলনীয়। আসলেই রোজা দেহ ও মনের এক আশ্চর্যজনক পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ব দৃঢ়করণ
পৃথিবীর সকল দেশের মুসলমানগণ রমজান মাসে সাওম পালন করে। এ সময় মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানগণ পরস্পরের নিকট শুভেচ্ছাবাণী প্রেরণ করেন। প্রখ্যাত আলিমগণ সফর বিনিময় করেন। এতে মুসলমানদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায় ও দৃঢ় হয়।
প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা: জিসি গুপ্ত বলেছেন, পবিত্র ইসলামে রোজা পালনের যে আদেশ করেছেন তা মানবের আত্মিক দৈহিক মঙ্গলের জন্য সত্যিই আকর। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
ডা: আর ক্যাসফোর্ডের মতে, রোজা হলো পরিপাকশক্তির শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।
অধ্যক্ষ ডা: ডি. এফ ফোর্ট বলেছেন, রোজা পালন আত্মশুদ্ধি ও সংযমের অন্যতম উপায়। যার মাধ্যমে ¯্রষ্টার পরিচয় ও অনুগ্রহ লাভ করা যায়। স্বাস্থ্য রক্ষা করা সহজ হয়। হিংসা-বিদ্বেষ ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বাঁচা যায়।
ডা: এ্যালেক্স বলেন, রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি এক বিশেষ বিশেষ অনুভূতি ও উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তি শক্তি পরিবর্ধিত হয়।
মনস্তত্ত্ববিশারদ সিগমন্ড নারায়েড বলেন, রোজার মাধ্যমে মস্তিষ্ক এবং মনের যাবতীয় রোগ ভালো হয়ে যায়। মানসিক অবসাদ হতেও মুক্তি লাভ করে।
রোগ জন্ম দেয়। সিয়াম অতিভোজন থেকে মানুষকে বিরত রাখে এবং শরীরে বিষাক্ত উপাদান পঞ্জীভূত হতে দেয় না।
রাসূল (সা) এর রমজান
রামজান মাসের পূর্ব থেকেই রাসূল (সা) এই মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুতি নিতেন। রমজানের পূর্বে শাবান মাসেই রাসূল (সা)-এর ইবাদত বেড়ে যেত। শাবান মাসের প্রায় পুরোটাই তিনি রোজা রাখতেন। তবে রমজানের এক বা দু’দিন আগে রোজা রাখতেন না।
এ মাসে রাসূল (সা)-এর দানশীলতা বাতাসের গতির চেয়েও বেড়ে যেত।
এ মাসে হযরত জিবরাইল (আ) এর কাছে তিনি কোরআন শিখতেন।
রাসূল (সা) শেষ দশ রাতে বেশি বেশি জাগতেন। পরিবার পরিজনকে জাগাতেন এবং ইবাদতের জন্য পরিধেয় বস্ত্রকে শক্তভাবে বেঁধে নিতেন।
রাসূল (সা) ইফতারও তাড়াতাড়ি করতেন এবং মাগরিবের নামাজও তাড়াতাড়ি পড়তেন।
লাইলাতুল ক্বদর এলে তিনি বেশি বেশি পড়তেন এই দোয়াটি-
“আল্লাহুমা ইন্নাকা তুহিববুল আফওয়া ফা ফু আন্নি” অর্থ হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ কর। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দাও।
নবী করিম (সা) রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফে বসতেন।
এ মাসে তিনি রমজানের রোজার সাথে সাথে প্রতি রাতে তারাবির নামাজ আদায় করতেন। রাসূল (সা) বলেন- সে ব্যক্তির উপর লা’নত যে রমজানের রোজা পেল অথচ নিজের গুনাহ মাফ করে নিতে পারল না।
উপসংহার
রমজানের রোজা মূলত একটি প্রশিক্ষণ কোর্স। এ কোর্সের প্রশিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সেই প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রশিক্ষণার্থী। প্রশিক্ষণ কোর্সের সিলেবাস হলো রোজার নিয়ম-কানুন, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফলসমূহ। আর তার ফলাফল তথা নম্বরপত্র হিসেবে বলা যায় তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। তাকওয়া অর্জনই মূলত সিয়ামের মূল টার্গেট। সিয়াম পালন করে যে ব্যক্তি তাকওয়া অর্জন করতে পারেনি সে ব্যক্তি হলো ঐ কৃষকের ন্যায়, যে চাষাবাদ করলো পুরো মৌসুম ধরে কিন্তু ফসল ঘরে উঠাতে পারল না। তার পরিশ্রম-ঘাম সবই বৃথা গেল। এবার সে না খেয়ে অনাহারে তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে।
অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সিয়াম নামক এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করতে পারবে না- সে হাশরের ময়দানে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত ও অপমানিত হয়ে জাহান্নামের নিক্ষিপ্ত হবে। আমরা হাদিস শরিফ থেকেই জানতে পারি “যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল কিন্তু গুনাহ মাফ চেয়ে নিতে পারল না; সে অবশ্যই ধ্বংসে নিপতিত হবে।” আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে সেই সব প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে শামিল হওয়ার তাওফিক দান করুন, যারা সিয়ামের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মিক ও সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে তাকওয়া অর্জনের ফলে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আমিন।

মাহে রমজান উপলক্ষে নবীগঞ্জে গরীব অসহায় দুস্থদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

হবিগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা :
আসন্ন মাহে রহমান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নবীগঞ্জের জালালপুরে বিতরণ করা হয়েছে। নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের জালালপুর যুব সমাজ কর্তৃক গত শুক্রবার দুপুর ১২টার সময় ফুল অব লাইট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মফজ্জুল হকের উদ্যোগে গরীব অসহায় বিস্তারিত

পবিত্র মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় ভার্থখলা স্বর্ণালী সংঘের র‌্যালী

পবিত্র মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে ও রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় গত শনিবার ভার্থখলা স্বর্ণালী সংঘের উদ্যোগে নগরীর দক্ষিণ সুরমায় একটি র‌্যালী বের করা হয়। র‌্যালীটি দক্ষিণ সুরমার বিভিন্ন সড়ক প্রক্ষণ করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, এডভোকেট ফজলুল হক, বিস্তারিত

পাঠাগার নব প্রজন্মের আলোর দিশারী —- মেয়র আয়ুব বখত জগলুল

সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব আয়ুব বখত জগলুল বলেছেন, সাহিত্য চর্চা মানুষকে খারাপ পথ থেকে sunamgonj mayor picফিরিয়ে এনে ভাল পথ দেখায়। পাঠ্যাভাস মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়। আর ইসলামী সাহিত্য মানুষকে রাসূল (সাঃ) এর আদর্শে জীবন পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করে বিস্তারিত

সোনালী ব্যাংক অফিসার্স এসোসিয়েশনের সভা

সোনালী ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন সিলেটের সাধারণ সভা গত ২৩ মে মঙ্গলবার রাতে সিলেট Sonali Bank Pic 27.05.17জেলা পরিষদ মিলনায়তে অনুষ্ঠিত হয়। বিস্তারিত

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে কাজিটুলায় দুস্থদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দুস্থদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার রাত ৮টায় কাজিটুলায় DSC_0308 copyএলাকায় সমাজসেবী মোঃ মানিক খানের নিজ তহবিল থেকে এ খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সিলেট ১৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বিস্তারিত