বিভাগ: বিশেষ সংখ্যা

শিক্ষকতায় পূর্ণতা অর্জনে বিএড ডিগ্রী অত্যাবশ্যক – লে. কর্ণেল (অব:) সাইফুল কবীর

সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের (অবসরপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ লে. কর্ণেল প্রফেসর সাইফুল কবলি চৌধুরী বলেছেন, শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। আর এ কারিগরবৃন্দ শিক্ষক প্রশিক্ষণে বি.এড ডিগ্রী অর্জনের মাধ্যমে তাঁদের পেশাদারিত্বে পূর্ণতা লাভ করতে সক্ষম। প্রফেসর চৌধুরী গত শুক্রবার বিস্তারিত

হিংসা বিদ্বেষ নয়, চাই পারস্পরিক বন্ধন “ঈদুল ফিতর”

4bk66e8035ad638wuv_800C450রা য় হা ন আ হ মে দ ত পা দা র

আ মাদের চারিপাশের লাখো লাখো মুসলমান ভাইয়েরা না খেয়ে থাকেন, এইটা কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি না। আর লক্ষ্য করলেও না জানার ভান করে এড়িয়ে যাই। আমাদের সমাজে গরীব থেকে ধনীদের সংখ্যা অনেক বেশী। বেশী না হলেও যা আছেন তারা যদি এই গরীব ভাইদের হক আদায় করে নিশ্চয়ই কোন ভাই না খেয়ে কষ্টকর জীবন যাপন করবেন না। আমাদের কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে যে, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই একের বিপদে অন্যকে এগিয়ে আসতে হবে এবং একজন ধনী ভাইয়ের উপর অন্য এক গরীব ভাইয়ের যে হক আছে তা আদায় করতে হবে।
সংক্ষেপে ঈদের জরুরী বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরছি: ঈদের আগের দিন সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে ঈদের সালাত আদায় করা পর্যন্ত তাকবীর তথা আল্লাহু আকবর বলতে থাকা। এ হচ্ছে বিশ্ববাসীর সামনে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আর যাতে তোমরা সংখ্যাপূর্ণ কর এবং তিনি যে তোমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহ মহান বলে ঘোষণা দাও এবং যাতে তোমরা শোকর কর তাকবীরের শব্দগুলো হল:
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার
লাইলাহাইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার,
ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
পুরুষরা মসজিদে, বাজারে ও ঘরে এ তাকবীর ধ্বনি জোরে দিতে থাকবে। আর মহিলারা তাকবীর বলবে আস্তে। যাকাতুল ফিতর প্রদান করা, রোজাদারের যে ভুল-বিভ্রান্তি ও পাপ হয়েছে তা মোচন করার জন্য এবং মিসকীনদের খাদ্য যোগানের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিতর দেয়ার বিধান দেয়া হয়েছে। যাকাতুল ফিতর ঈদের একদিন বা দুইদিন আগেও দেয়া যায়। তবে সালাতুল ঈদের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না, আগেই আদায় করতে হবে।
অনেকের ধারণা নামাজের নিয়ত আরবিতে করা জরুরি। এমনটি ঠিক নয়। যে কোনো ভাষাতেই নামাজের নিয়ত করা যায়। নিয়ত মনে মনে করাই যথেষ্ট। ঈদের দিন ইমামের পেছনে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে মনে এই নিয়ত করে নিবে-আমি অতিরিক্ত ছয় তাকবিরসহ এই ইমামের পেছনে ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি। এরপর উভয় হাত কান বরাবর উঠিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বেঁধে নিবে। হাত বাঁধার পর ছানা অর্থাৎ ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা’ শেষ পর্যন্ত পড়ে নেবে। এরপর আল্লাহু আকবার বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দেবে। দ্বিতীয়বারও একই নিয়মে তাকবির বলে হাত ছেড়ে দেতে হবে। ইমাম সাহেব তৃতীয়বার তাকবির বলে হাত বেঁধে আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য যে কোনো সূরা তিলা ওয়াত করবেন। এ সময় মুক্তাদিরা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবেন। এরপর ইমাম সাহেব নিয়মমত রুকু-সিজদা সেরে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন। মুক্তাদিরা ইমাম সাহেবের অনুসরণ করবেন।
দ্বিতীয় রাকাতে ইমাম সাহেব প্রথমে সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য সূরা পড়বেন। এরপর আগের মতো তিন তাকবির বলতে হবে। প্রতি তাকবিরের সময়ই উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। চতুর্থ তাকবির বলে হাত না উঠিয়েই রুকুতে চলে যেতে হবে। এরপর অন্যান্য নামাজের নিয়মেই নামাজ শেষ করে সালাম ফেরাতে হবে। ঈদের নামাজ শেষে ইমাম সাহেব খুতবা পাঠ করবেন। জুম্মার খুতবার মতো এই খুতবা শোনা মুসল্লিদের জন্য ওয়াজিব। খুতবার সময় কথাবার্তা বলা, চলাফেলা করা, নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারও ঈদের নামাজ ছুটে গেলে কিংবা যে কোনো কারণে নামাজ নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় একাকী তা আদায় বা কাজা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে চার বা তার অধিক লোকের ঈদের নামাজ ছুটে গেলে তাদের জন্য ঈদের নামাজ পড়ে নেয়া ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পর খুতবা শ্রবণ করা। ঈদের সালাত আদায়কারীকে ঈদের খুতবা বাধ্যতামূলক শুনতেই হবে এমন কথা নেই। হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ বিন সায়েব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের নামাজ শেষ করলেন তখন বললেন, আমরা এখন খুতবা দেব। যার ভাল লাগে সে যেন বসে আর যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে। (আবু দাউদ) তবে খুতবা শ্রবণ করা সাওয়াবের কাজ। কারণ দুই খুতবায় আল্লাহর গুণগান প্রশংসা, তাকবির পাঠ করা হয়। তা শ্রবণ করলে এবং পাঠ করলে অধিক কাওছার ওয়াব পাওয়া যায়।
ইসলামী অর্থনীতিকে যাকাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ধনীদের সম্পদে গরীবের হককে যাকাত বলে। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ধনী দরিদ্র্য বৈষম্য কমে। গরীব মানুষও যাকাতের অর্থ পেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে থাকে। অর্থনৈতিক দিক থেকে সমাজে সুষম বন্টনের ক্ষেত্রে যাকাত অবদান রেখে চলেছে। অর্থের অঙ্কে শতকারা আড়ায় ভাগ যাকাত দিলে ধনীদের সম্পদ কমে না বরং আল্লাহর কুদরতে সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আর ধনীদের হক যাকাত তাদের কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক ভীত সুদৃঢ় করে। সমাজে ধনী-দরিদ্র্য বৈষম্য কিছুটা হলেও কমে আসে। ইসলামের ৫টি স্তম্ভের অন্যতম হলো যাকাত। যাকাত অর্থ হচ্ছে শুদ্ধিকরণ এবং বৃদ্ধি।এর মাধ্যমে যাকাত আদায়কারীর আত্মা ও মন পবিত্র হয়। যাকাত আদায়ের ফলে সম্পদে বরকত আসে। সম্পদের শুদ্ধতা আসে। ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি পায়। সমাজে শন্তি, শৃঙ্খলা পায়।
সারা বিশ্বের মুসলমানের সর্বজনীন আনন্দ-উৎসব ঈদুল ফিতর। বছর জুড়ে নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-বেদনা সব ভুলে ঈদের দিন মানুষ সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হন। ঈদগাহে কোলাকুলি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে সবাইকে নতুন করে আবদ্ধ করে। ঈদ এমন এক নির্মল আনন্দের আয়োজন, যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরের মিল বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হন এবং আনন্দ সমভাগাভাগি করেন। মাহে রমজানের এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের অতীত জীবনের সব পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে পারার পবিত্র অনুভূতি ধারণ করেই পরিপূর্ণতা লাভ করে ঈদের খুশি। আর আনন্দ ও পুণ্যের অনুভূতিই জগতে এমন এক দুর্লভ জিনিস, যা ভাগাভাগি করলে ক্রমেই তা বৃদ্ধি পায়। রমজান মাসে সংযম ও আত্মশুদ্ধি অনুশীলনের পর ঈদুল ফিতর ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করে, গড়ে ওঠে সবার মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বন্ধন। যেখানে থাকে না কোনো বৈষম্য ঈদের দিন মসজিদে, ময়দানে ঈদের নামাজে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম হয়ে থাকে। সবাই সুশৃঙ্খল ভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে ধনী-নির্ধন পরিচিত-অপরিচিত সবাই সানন্দে কোলাকুলি করেন। রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের সব ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামাতে পার্থিব সুখ শান্তি, স্বস্তি আর পারলৌকিক মুক্তি কামনা করে আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
ঈদ ধনী-গরীব সব মানুষের মহামিলনের বার্তা বহন করে। ঈদের দিন ধনী-গরীব বাদশা ফকির মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব আদায় এবং একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে সাম্যের জয় ধ্বনি করেন। রমজান মাসে সংযম ও আত্মশুদ্ধি অনুশীলনের পর ঈদুল ফিতর ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করে, গড়ে উঠে সবার মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বন্ধন ঈদের দিন মসজিদে, ময়দানে ঈদের নামাজে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম হয়ে থাকে। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে ধনী-নির্ধন পরিচিত-অপরিচিত সবাই সানন্দে কোলাকুলি করেন। রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের সব ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামাতে পার্থিব সুখ-শান্তি, স্বস্তি আর পারলৌকিক মুক্তি কামনা করে আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। সেই সঙ্গে বিশ্ব শান্তি এবং দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর উত্তরোত্তর শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও সংহতি কামনা করা হয়। প্রকৃত পক্ষে ঈদ ধনী-দরিদ্র, সুখী-অসুখী, আবাল বৃদ্ধ-বনিতা সব মানুষের জন্য কোনো না কোনোভাবে নিয়ে এই দিনটি নারী, পুরুষ, ধনী, গরীব, সবাই এক অনাবিল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়। সকলেই এক মাঠে নামাজ পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সবার দ্বার থাকে অবারিত। ধনীরা সাদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে নিঃস্ব ও বঞ্চিতকেও তাদের আনন্দের ধারায় শামিল করে নেয়। আমাদের দেশে এই দিনটিতে সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক ভূষিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। সমাজের দরিদ্র শ্রেণীও এদিন থাকে আনন্দাপ্লুাত। তাদের পেট সেদিন অভুক্ত থাকে না, তাদের পকেটও থাকে না অর্থশূন্য ইসলামের অর্থনৈতিক সাম্যের বিধান এ দিনই মূর্ত হয়ে উঠে। সবাই নতুন পোশাক পরিধান, একই মাঠে জমায়েত, একই ইমামের পেছনে তাকবির ধ্বনির সঙ্গে নামাজ আদায়, বুকে বুক মিশিয়ে কোলাকুলি-এক নয়নাভিরাম স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা করে। একই দৃশ্য সর্বত্র। দীর্ঘ রোজার পর ঈদুল ফিতর পরিশুদ্ধ আত্মাকে সিরাতুল মুস্তাকিমে অবিচল রাখতে প্রেরণা জোগায় এবং দীর্ঘ তাকওয়ার প্রশিক্ষণকে বাস্তব রূপ দিতে শুরু করে।
আমরা শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ততায় না থেকে চারপাশে চোখ মেলে তাকাতে হবে আমাদের। অভাবী, দুঃখ ক্লিষ্ট নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যে ঈদের আসল শিক্ষা তা আমা দের হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। মেকি অশ্লীল ভোগ সর্বস্ব আনন্দ উৎসবে মত্ত না হয়ে নিগৃহীতদের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে ঈদ পালন করা প্রয়োজন। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা অনুধাব নের মাধ্যমে ধনী-গরীব সবার মধ্যে স¤প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় ও মজবুত হোক। বিভেদ বিদ্বেষ ভুলে গড়াগড়ি-কোলাকুলিতে কাটুক এইদিন। কিছু মানুষের লোভ ও নিষ্ঠুরতায় প্রতি বছর ঈদে লাখ লাখ মানুষ অতি কষ্টে ঈদ উদযাপনে বাধ্য হন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের শহরাঞ্চল থেকে নাড়ির টানে গ্রামে ছুটে যাওয়া মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। লঞ্চ, ট্রেন বাসের টিকিট পেতে গ্রামমুখী মানুষকে কী যে দুর্ভোগে পড়তে হয় তা ভাষায় বর্ণনা করাও দুঃসাধ্য। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাডা আদায় করে কিছু কুচক্রী মহল যা ঈদের আনন্দ থেকে মানুষকে দূরে টেলে দেয়।এখানে সরকারের কি দোষ। মানুষ মানুষের দায়িত্ব না বুঝলে সরকারের কি করার আছে।
মহান আল্লাহ ধনিদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। গরীবদের খোঁজ খবর রাখার জন্য এবং তারা গরীবদের সুখ-সুবিধার যেন কমতি না হয় সে দিক নিশ্চিত করার জন্য ঈদের দিনের সকাল বা তার আগে গরীবদেরকে তার অর্থসম্প দের নির্দিষ্ট অংশ দান করবেন। এর নাম সদকায়ে ফিতর। এ সদকায়ে ফিতর গরীবদেরকে মালিক বানিয়ে দান করতে হবে। এ অর্থে গরীবরা আল্লাহর নির্ধারিত ঈদের খুশী উপভোগ করে। ঈদের আনন্দ শুধু খাওয়া-দাওয়া আর সদকায়ে ফিতরের মত এবাদত আদায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর এবাদতের সীমানা আরও ব্যাপক। তাই ঈদের দিন সকালে এলাকার সব মুসলমান মিলে নিকটস্থ ঈদগাহে মিলিত হয়ে জামাতের সাথে পবিত্র ঈদের নামাজ আদায় করবে। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, আমির ফকির, নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে শামিল হয়ে ঐক্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সকলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে মাথা নত করে।
ঈদ উৎসব পালনকালে সেই সব ভাই-বোনদের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, যারা কঠিন পীড়ায় অসুস্থ হয়ে বাড়ীতে কিংবা হাসপাতালে পড়ে আছে। ব্যথা, যন্ত্রণা ও মানসিক পীড়নে ঈদের আনন্দ তাদের মাটি হয়ে গিয়েছে। আমাদের উচিৎ প্রথমত: আল্লাহ যে সুস্থতা ও নিরাপত্তার অশেষ নিয়ামতের উপর আমাদেরকে রেখেছেন তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং দ্বিতীয়ত:এ সবল রোগাক্রান্তদের আরোগ্য লাভের জন্যে দোয়া করা এবং সম্ভব হলে তাদের শুশ্রষা করা।আমরা আমাদের সাধ্যানুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে এদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারি এবং আল্লাহ যেন তাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন সে দোয়াও করতে পারি। প্রতি ঈদেই সবাই সাধ্যানুযায়ী নতুন নতুন মডেলের সুন্দর সুন্দর পোষাক ক্রয় করে থাকে।
আমরা কি কখনো ভাবি সে-সব ভাই-বোনদের কথা দারিদ্র্যের কষাঘাতে যাদের জীবন জর্জরিত। নতুন পোষাক কেনা দূরে থাক, পুরানো কোন ভাল পোষাকই তাদের নেই। বরং প্রতিদিনের অন্নের প্রয়োজনীয় যোগানও তাদের নেই। আমরা যারা স্বচছল তারা কি সামান্যতম হাসিও এদের মুখে ফোটাতে পরি না? ঈদুল ফিতর এসব প্রশ্নের সুন্দর জবাব খুঁজে পেতে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। এবারের ঈদুল ফিতরকে তেমনই অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করার পাশাপাশি আমাদের উচিত হবে ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান মেনে চলা ও শিষ্টাচারিতা রক্ষা করা। আবার ঈদ উপলক্ষে দোয়া চেয়ে পিতার কাছে লেখা একটি চিঠি এমন:-ঈদের সালাম নিও-দোয়া করো আগামী বছর-কাটিয়ে উঠতে পারি যেন-এই তিক্ত বছরের সমস্ত ব্যর্থতা। অন্তত ঈদের দিন সাদাসিধে লুঙ্গি একখানি-একটি পাঞ্জাবী আর সাদা গোলটুপি তোমাকে পাঠাতে যেন পারি-আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা।

সিয়াম সাধনার সংযম ও শিক্ষা প্রতিফলিত হোক ঈদ বাজারগুলোতে

0233-720x390॥ আবু মালিহা ॥

বি শ^ মুসলিমের উৎসব মুখর দু’টি দিনের মধ্যে একটি হলো ঈদুল ফিতর। অর্থাৎ পবিত্র মাহে রমাদ্বানের পর শাওয়ালের প্রথম দিনটিই হলো ঈদুল ফিতর। খুশির বন্যা নিয়ে ধনী-গরীব সকলের মাঝে আসে মহা উৎসবের দিন। এ আনন্দ অনাবিল এবং মহান প্রভুর সান্নিধ্যের এক মহেন্দ্রক্ষণ। বেহেশতের হুর-পরীরাও যেন এ দিনে গোটা মুসলিম বিশে^র তরে জান্নাতী সুখ উপহারের ডালি থেকে অফুরন্ত রহমত ও শান্তি বিতরণ করে। প্রতিটি মুসলিমের অন্তর ভরে উঠে অনাবিল আনন্দের ফাল্গুধারার প্রশ্রবণ। বিশ^ মুসলিমের অন্তর ভরে উঠে ঐক্য ও সংহতির দৃঢ় উজ্জীবনের মহাকল্লোল। প্রেম ভালবাসার ঐকতান। এবং সকলেই সুখ শান্তির ঐকান্তিক কামনায় শুভেচ্ছা জানায় ঈদ মোবারক আস সালাম। এবং তারই প্রাণ পরশ জাগে সকল ক্ষেত্রে। তেমনিভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপনের পূর্বে ঈদ বাজারগুলোতে মুসলমান নর-নারী সহ সকল স্তরের মানুষের ঈদ আনন্দকে সার্থক করে তোলার জন্য নতুন কেনাকাটার একটি উৎসব আমেজ ঘিরে থাকে মার্কেটগুলোতে। ধনী, গরীব সকলেই যার যার সামর্থ অনুযায়ী ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকে রমজানের শেষ দিনগুলোতে। বলার অপেক্ষা রাখে না ঈদের অর্ধেক আনন্দই আসে কেনাকাটার মাধ্যমে। যার যার পছন্দ ও রুচিমাফিক খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে কাপড় চোপড় ক্রয় করার মাধ্যমে উৎসব আমেজকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। আর তারই ফলশ্র“তিতে সবাই অপেক্ষায় থাকে ঈদুল ফিতর উদযাপনে।
মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই মাহে রামাদ্বানের এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে পূত-পবিত্র আনন্দ ও খুশীর উৎসব নিয়ে আসে শাওয়ালের প্রথম চাঁদে। তাই ঈদ মানেই উৎসব, ঈদ মানেই বিনোদনের মহাআনন্দের ফালগুধারা। অপরদিকে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতির ঐতিহাসিক মহামিলনের মহেন্দ্রক্ষণ। নানা আয়োজন ও অন্তরের প্রেম-প্রীতি ভালবাসার অতিন্দ্রীয় চেতনায় এক পুত-পবিত্র শিহরণ জাগরিত হয় মুসলিম হৃদয়ের পরম্পরায়। আত্মিক ও ভাব জগতে সৃষ্টি হয় বেহেশতী সুখের ফালগুধারার অনিন্দ্য প্রশ্রবন। প্রতিটি হৃদয়ে আলোক উদ্ভাসিত হয় প্রেমপূর্ণ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের মহাজাগরনী ঐকতান। ছোট বড়, ধনী-গরীব ব্যবধান ভুলে জেগে উঠে মানবতার জয়গানের শাশ্বত সুর বীনায় শান্তি ও কল্যাণের মহাবারতা। সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের তরে মানব প্রেমের সুর মন্দ্রিত পবিত্র সত্তার আত্ম্যিক প্রেরণায় উদ্বেলিত হয় জাগতিক কল্যাণের সকল আয়োজন। অবক্ষয় আর নৈতিক অধ:পতন থেকে জাতিকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনায় নিমগ্ন হয় ঈদগাহে বিশাল জমায়েতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর দরবারে করুণা ভিক্ষার মাধ্যমে। সেজদাবনত হয়ে সমস্ত অকল্যাণ আর ধ্বংস থেকে হেফাজত করে মহান প্রভুর প্রশংসার ডালি দিয়ে যেন মানবতা সমস্বরে কৃতজ্ঞতা জানায় দু’হস্ত ঊর্ধ্বাকাশ তুলে ধরে। আগামী দিনগুলোতে মহান প্রভুর বারতাকে দিগ¦ীজয়ী করে ধূলির ধরাকে যেন বেহেশতী পরিবেশের আবাসন গড়ে তোলা যায়, তারই ঐকান্তিক কামনায় মুসলিম বিশ্ব আকুতি জানায় মহান আল্লাহর দরবারে। মানবের দুঃখ-বেদনা তিরোহিত করে সুখ-শান্তি ও চিরকল্যাণের সামাজিক বিধান কোরআন হাদীসের আলোকে সমাজ বিনির্মাণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও মুসলিম মিল্লাতের প্রতিটি সদস্যই যেন মহান প্রভুর সন্তুষ্টির তরে তৎপর হয়ে ওঠে, সেই ঐকান্তিক কামনা আমৃত্যু যেন জারি থাকে প্রতিটি মুমিন ব্যক্তির অন্তরে। ঈদ আনন্দ আর ঈদ বিনোদনের তরে সেটিই হবে ঈদুল ফিতরের আসল শিক্ষা।sylet1-
সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, ফেতনা-ফ্যাসাদ সহ সকল অকল্যাণের মূলোৎপাটনে ঈদুল ফিতরের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সত্যিকার অর্থে দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সুখ-আয়োজনের সকল কল্যাণধর্মী কর্মকান্ড ও তৎপরতা যদি অব্যাহত ভাবে চালানো যায় এবং পাশাপাশি মানব মনের অসুরকে দমন করে পুত-পবিত্র মন মানসিকতা সৃষ্টি করা যায় এবং জাগতিক কল্যাণে আত্মনিবেদিত হওয়া যায় ও ভোগের পরিবর্তে ত্যাগের মহিমা জেগে ওঠে তবেই জাতি হেসে উঠবে মানবতার জয়গানে। সফল হবে ঈদ-উৎসব এবং ঈদ বাজারের সকল আয়োজন। তবে ঈদ বাজারে নীতি নৈতিকতাহীন উল্লমফন চরিত্রের কোন অপসংস্কৃতির পরিবেশ সৃষ্টি হয় এমন কর্মকান্ড বা লাগামহীন সুখ বিলাসে যেন মত্ত না হই সে বিষয়টির দিকে সকলেরই সচেতনভাবে নজর দেয়া দরকার। এরই পাশাপাশি আমাদের মুসলিম সমাজ থেকে যেন দূর হয়ে যায় সমস্ত অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কারের সকল পরিবেশ। কেননা, গোটা মুসলিম দুনিয়ায় আজ বিভিন্ন উৎসবের নামে যে সকল অপসংস্কৃতির বা নৈকিতাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করে দেশের যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে ধাবিত করছে, সেগুলোকে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা দিয়ে সমাজ পরিবর্তন বা নৈতিকতার উৎকর্ষ বিধানে সকল মুসলিম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা যে ধরনের বিদেশী সংস্কৃতি বা আকাশ সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে যুব সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে চলছে, এভাবে অব্যাহত থাকলে আমাদের ভবিষ্যত বংশধারা নৈতিকতার চরম দেউলিয়াত্বের শিকার হয়ে মুসলিম পারিবারিক বা সামাজিক ভিত্তি ধ্বংসের পথকেই তরান্বিত করবে। তাই সময় থাকতে কোরআনের আলোকে আমাদের সমস্ত কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি রচনা করে সামাজিক ঐক্য ও সংহতিকে পুনর্গঠনের জন্য এখনই দৃঢ়ভূমিকা রাখতে হবে। তাই আসুন সকল মুসলিম নরনারী আজ সচেতন ভাবে এক একটি পরিবারকে ইসলামী শিক্ষা ও নৈতিকতার পাঠদানের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সুখি সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনের জন্য মাহে রামাদ্বানের শিক্ষা থেকে দীক্ষা নেই এবং ঈদ বাজার সহ সকল ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন ঘটাই। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমীন
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, সভাপতি-সিলেট কেন্দ্রীয় লেখক ফোরাম।

প্রিয়নবী (সা.)’র ঈদ উদযাপন

hqdefaultআতিকুর রহমান নগরী

ঈ দ অর্থ আনন্দ, খুশি, উল্লাস। মুসলিম উম্মাহর দুটি খুশির দিন রয়েছে। ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আযহা। এ দু’টি দিবসই অত্যন্ত মর্যাদাশীল ও আনন্দময়। একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে কাঙ্খিত ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য খুশির সওগাত নিয়ে। দীর্ঘ এক মাসের সংযম সাধনার শেষে সেই আনন্দময় উৎসব ঈদুল ফিতর সমাগত। ঈদ পবিত্র, ঈদ খুশির, ঈদ আনন্দের, ঈদ ক্ষমার, ঈদ প্রার্থনার। সব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে বুকে জড়ানোর দিন; সাম্য, সৌহার্দ্য, ভালোবাসা, মিলনের দিন।
ঈদের প্রকৃত অর্থ কি? শুধু দামী পোশাক, রঙ্গিন জামা, হরেক রকম সুস্বাদু  খাবার আর নানা ধরণের আনন্দ-উৎসবের নাম ঈদ নয়। আর ধনী গরীবের এক কাতারে নামাজই শুধু নয় তাদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনাও ঈদের উদ্দেশ্য। ঈদের উদ্দেশ্য কি তা আল্লাহ তা’আলা নিন্মোক্ত আয়াতের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন ‘‘আর যেন তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা আল্লাহর মমত্ব-বড়ত্ব প্রকাশ কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা বাকারাঃ ১৮৫)  এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে, ঈদের উদ্দেশ্য হল দুটি: ১. আল্লাহর বড়ত্ব মমত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা। ২. আল্লাহ যে নেয়ামত দান করেছেন তার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা।
ঈদের প্রচলন: মুলত ঈদ ইসলামপূর্ব যূগেও বিভিন্ন জাতি বিভিন্নভাবে পালন করতো যা আমরা কুরআন-হাদিস ও ইতিহাস থেকে জানতে পারি। তবে সেগুলো সবই ছিল শুধু মাত্র আনন্দ-ফূর্তি আর খেলাধূলা। যেমনটি আবু দাউদ শরীফের বর্ণনায় এসেছে- মদীনায় যাওয়ার পর নবীজী (সা.) দেখলেন, সেখানকার লোকজন দুটি দিনকে উদযাপন করে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে। নবীজি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দুদিনের কী তাৎপর্য আছে? তারা বললো, আমরা জাহেলী যুগে এ দু দিনে খেলাধূলা করতাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটি দিন দিয়েছেন। যা হল ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। শুধু খেলাধূলা, আমোদ-ফূর্তির জন্য যে দু’টো দিন ছিল আল্লাহ তায়ালা তা পরিবর্তন করে এমন দু’টো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া, তাঁর জিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে পরিমিত আমোদ-ফূর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে। হযরত ইবনে জারীর (রা.)’র বর্ণনা মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম ঈদ পালন করেছেন। ঈদ আমাদের জন্য আল্লাহ রাব্বুলআ’লামিন প্রদত্ত বিরাট নিয়ামতের দিন। ইসলামী দিক নির্দেশনা অনুযায়ী যদি আমরা ঈদ উদযাপন করি তবে একদিকে যেমন ঈদের অনাবিল আনন্দে ভরে উঠবে আমাদের পার্থিব জীবন অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে আমাদের পরকালীন যিন্দেগী। কিন্তু ঈদ উৎসবটির সত্যিকার তাৎপর্য যদি বুঝতে হয়, তাহলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হলো নবীজী (সা.) এবং সাহাবাদের জীবনকে দেখা। তারা কীভাবে ঈদ উদযাপন করেছেন। অন্যদেরকে করার তাগিদ দিয়েছেন। আসুন, আমরা দেখি নবীজী এবং সাহাবাদের জীবনে ঈদ কেমন ছিল।
প্রিয় নবী (সা.)’র ঈদ উদযাপন : ঈদের দিন সকাল বেলায় চারপাশে ঈদ আনন্দের আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছে, লোকজন আনন্দ ভাগাভাগি করছে, ছোট্ট সোনামণিরা নতুন জামা গায়ে দিয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। এসব কিছুই প্রিয় নবী (সা.) স্বচক্ষে অবলোকন করছিলেন। প্রত্যেকে ঈদ আনন্দে নিজ নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করছিল। তারা সকলেই চাইত তাদের নিজ নিজ অনুষ্ঠান সম্পর্কে যাতে বিশ্বনবী (সা.) অবগত হন। প্রিয় নবী (সা.)’র ভালোবাসা ও সম্মানের খাতিরেই তারা এসব করেছিল।
এদিকে আখেরী নবী মুহাম্মদ (সা.)’র ঘরের অবস্থা সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, আখেরী নবী মুহাম্মদ (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দুটি ছোট মেয়ে গান গাচ্ছিল। তাদের দেখে নবী (সা.) অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে আবু বকর (রা.) আমার ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজীর কাছে শয়তানের বাঁশি? নবী (সা.) তার কথা শুনে বললেন, মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও। অতঃপর প্রিয় নবী (সা.) অন্য মনস্ক হলে আমি মেয়ে দুটিকে ইশারা করলে তারা বের হয়ে গেল। অন্যদিকে হুজরার খুবই নিকটে আরেকটি অনুষ্ঠান হচ্ছিল, যার বর্ণনাও আয়েশা (রা.) এভাবে দিয়েছেন, ঈদের দিন আবি সিনিয়ার কিছু লোকজন লাঠি-সোটা নিয়ে খেলাধূলা করছিল। নবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)কে ডেকে বললেন, আয়েশা তুমি কী দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি আমাকে তাঁর পিছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন, আমার গাল তাঁর গালের উপর রাখলাম। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, হে বনী আরফেদা, তোমরা শক্ত করে ধর। এরপর আমি যখন ক্লান্ত হয়ে গেলাম তখন তিনি বললেন, তোমার দেখা হয়েছে তো? আমি বললাম জ্বি হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে এবার যাও। (বুখারী, মুসলিম)
নবীজীর কামরার সন্নিকটে আরেকটি স্পটে ঈদ উপলক্ষে আরেকটি অনুষ্ঠান শুরু হল। কিছু বালক নবী (সা.)’র শানে উচ্চাঙ্গের ও মানসম্পন্ন কবিতা আবৃতি করতে লাগল। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসা ছিলেন, ইত্যবসরে আমরা বাচ্চাদের চেচামেচি শুনতে পেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দেখলেন হাবশিরা খেলাধূলা করতেছে আর ছোট ছোট শিশুরা তাদের চারদিকে হৈ চৈ করছে। তিনি বললেন, আয়েশা এদিকে এসে দেখে যাও। অতঃপর আমি এসে আমার থুতনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গর্দানের উপর রেখে তার পিছনে থেকে তাকাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, তুমি পরিতৃপ্ত হওনি? তুমি কী এখনও পরিতৃপ্ত হওনি? আমি তখন তার নিকট আমার অবস্থান পরীক্ষা করার জন্য বলেছিলাম না এখনও হয়নি। হঠাৎ ওমর (রা.)’র আসলেন। সাথে সাথে লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে রাসূল (সা.) মন্তব্য করলেন, আমি দেখলাম জিন ও মানুষ শয়তানগুলো ওমরকে দেখে পালিয়ে গেল। (তিরমিজি) তারা যে কবিতাগুলো আবৃতি করছিল তার অর্থ বুঝা যাচ্ছিলনা, কেননা তাছিল তাদের আঞ্চলিক ভাষায়। তাই নবী করীম (সা.) তাদেরকে অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। মুসনাদ ও সহীহ ইবনে হিব্বানে আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হাবশিরা নবী (সা.) এর নিকট এমন কিছু পাঠ করছিল যা তিনি বুঝতে পারেন নি। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কী বলছে? সাহাবীগণ বললেন, ওরা বলছে : মুহাম্মদ (সা.) সৎ ও নেককার বান্দা।
উপরোল্লেখিত আলোচনা থেকে আলেমগণ নিম্নবর্ণিত বিষয়াবলি উদঘাটন করেছেন:
১. পরিবারের সদস্যদের দেহ ও মন যেভাবে উৎফুল্ল হয় ঈদ মৌসুমে উদারতার সাথে তার আয়োজন করা শরীয়তসম্মত। সম্মানিত ব্যক্তি তার বয়স ও ষ্ট্যাটাসের দরুণ যদিও সে নিজে আনন্দ উৎসবে জড়িত হতে পারে না বটে। তার জন্য যা মানানসই সে তাতে যোগ দেবে। কিন্তু পরিবারের যেসব সদস্যের বয়স কম তারা স্বভাবগতভাবেই ঐসব খেল-তামাশার দিকে ধাবিত হয়। তাদের জন্য শরীয়তের সীমার ভিতর থেকে খেলাধুলা ও আনন্দ-ফূর্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
২. ঈদ উৎসবে আনন্দ প্রকাশ করা দ্বীনের একটি প্রতীক। এ কারণেই নবী (সা.) দুটি বালিকাকে গান গাইতে দেখে বারণ করেননি। শুধু তা-ই নয়, যখন আবু বকর (রা.) তাদের বাঁধা দিতে চাইলেন তখন তিনি আবু বকরকে নিষেধ করলেন।
অপর একটি রেওয়ায়েতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে আবু বকর প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, ইহুদিরা যাতে বুঝতে পারে, আমাদের ধর্মেও আনন্দ-উৎসবের সুযোগ আছে। আর নিশ্চয় আমি উদার ও ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।
৩. স্ত্রীর প্রতি সদয় আচরণ এবং তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কেননা নারী জাতিকে নরম হৃদয় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তার প্রকৃতিগত স্বভাবের প্রতি কেউ সাড়া দিলে সে সহজেই তার দিকে ঝুকে পড়ে। নবী সা. স্ত্রীদের ভালোবেসে কাছে টানার উত্তম দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তার ঘর ছিল মুহাব্বত, ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও পরস্পর শ্রদ্ধাবোধের উজ্জল নমুনা। হযরত আয়েশা (রা.)’র বর্ণনা, (আমার চোয়াল নবীর চোয়ালের সাথে মিশে গেল) দ্বারা স্ত্রীর প্রতি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটুকু আন্তরিকতা ছিল তা প্রকাশ পাচ্ছে, যা ঈদ উপলক্ষে বাস্তবায়িত হয়েছে।
৪. নবী করীম (সা.)’র সুউচ্চ মর্যাদা, তার ব্যক্তিত্ব ও সুমহান দায়িত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও তিনি হযরত আয়েশা (রা.)’র মনে তৃপ্তিদানের জন্য দাড়িয়ে থাকার মাঝে পিতা-মাতা, ভাই-বন্ধু ও স্বামীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। স্বামীগণ স্ত্রীদের আর পিতা-মাতা সন্তানদের মনোবাসনা পূরণ করার ব্যাপারে যদি এগিয়ে না আসে তাহলে স্ত্রী ও সন্তানদের মনে এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়ে। যা তাকে মানসিক ও সামাজিক ভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে।
৫. খেলাধূলায় ব্যস্ত হওয়ার সময় অবশ্যই শরীয়তের সীমারেখার ভিতর থাকতে হবে। কোন গুনাহে লিপ্ত হয়ে অথবা আল্লাহর বিধান নষ্ট করে কখনও খেলাধূলা করা যাবে না। আয়েশা (রা.)’র বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, আমি হাবশিদের খেলা দেখার সময় নবী (সা.) আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, যে মেয়ে দুটো গাচ্ছিল তারা ছিল নাবালেগা। তাই প্রাপ্তবয়স্কা  মেয়েদের গাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া গান গাওয়া তাদের পেশা ছিল না। তারা শুধু কবিতা আবৃতির মাধ্যমে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছিল যা শরীয়ত বহির্ভূত ছিল না।
ইসলামে ঈদ: ইসলামে ঈদ কোন ব্যক্তি কেন্দ্রীক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। তাই কিছু মানুষের আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে এর হক আদায় হবে না। বরং ঈদ হলো সমগ্র মুসলিম জাতির আনন্দ। শরীয়ত বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে। সবচেয়ে কাছের মানুষ পিতা-মাতা থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সকলে মিলে আনন্দ উপভোগ করবে। এটাই শরীয়তের দাবি। ঈদুল ফিতরের দিন সকাল বেলা সকল মুসলমানের জন্য খাবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর ঈদুল আজহার দিন কুরবানির ব্যবস্থা করেও তিনি ব্যাপারটি ফুটিয়ে তুলেছেন। পৃথিবীতে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন রীতি আদর্শ ফকির মিসকিনদের জন্য এমন ব্যাপকভাবে খাবার দাবারের আয়োজন করতে সক্ষম হয়নি।
তাই তো মুসলমানদের মধ্য থেকে মহান দানশীল ব্যক্তিবর্গ মানুষের প্রয়োজন মিটানোর ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিতেন। ঈদ হলো আনন্দ, দয়া, ভালোবাসা ও মিল মুহাব্বতের আদান প্রদানের নাম। ইতিহাস স্বাক্ষ্য বহন করে, ঐ সকল মহামানবগণের আনন্দ পরিপূর্ণ হত না যতক্ষণ না তারা তাদের চারি পাশের ফকির ও অভাবী মানুষের প্রয়োজন মেটাতে না পারতেন। তাই তারা গরীব-দুঃখীকে খাবার খাওয়াতেন, তাদের মাঝে ঈদের জামা ও ঈদ সামগ্রি বিতরণ করতেন এবং তাদের পাশে এসে দাড়াতেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়া ও তাদের ইসলামের হাকীকত সম্পর্কে অবগত করানোর জন্য ঈদ একটি বড় ধরণের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কালামে এর প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ঐ সকল লোকের সাথে ভাল ব্যবহার করতে ও তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে নিষেধ করেন না যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেয়নি। (সূরা মুমতাহিনাহ ৮)
ইসলামে ঈদ একটি সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ প্রতীক। যা দেহ ও মনের প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়। মাহে রমজান ও হজের মাসসমূহের  ইবাদত বন্দেগির বাহক হিসাবে ঈদের আগমন ঘটে। ঐ সকল মাসের সব কয়টি ইবাদতই রূহের খোরাক যোগায়। এরশাদ হচ্ছে, তুমি বল : আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত, এ নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। (সূরা ইউনুস : ৫৮)
আর শরীরের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে খেলাধূলা ও আনন্দ ফুর্তি ইসলামে বৈধ করা হয়েছে। আর এ কারণেই ঈদের দিনগুলোতে সিয়াম সাধনা হারাম করা হয়েছে। কেননা রোজা রেখে খানা-পিনা ছেড়ে দিয়ে ঈদ উদযাপন করা আদৌ সম্ভব নয়। হযরত আনাস (রা.)’র বর্ণনা এদিকেই ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন ইহুদিরা দুটি দিন খেলা-ধুলা ও আনন্দ ফুর্তি করে। তখন তিনি বললেন : আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন, তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন। (আবু দাউদ, নাসায়ী) আর এভাবেই মুসলিম উম্মাহ পরিপূর্ণ নেয়ামত কামেল শরীয়ত নিয়ে সয়ংসম্পন্ন হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে –
তোমার নিকট যে হক এসেছে তা বাদ দিয়ে তুমি তাদের অনুসরণ করো না, কেননা আমি তোমাদের সকলকে শরীয়ত ও বিধান দান করেছি। (সূরা মায়েদা : ৪৮)
অতএব, আসুন আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রিয়নবী (সা.)’র অনুপম আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে শরিয়ত সমর্থিত পন্থায় ঈদ উদযাপন করি। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে সকল ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

‘‘একটি অন্যরকম ঈদের গল্প”

imagesরওশাতুল রিয়া

হাতিরপুলের হাতি,
বাসলে ভাল তুলি তাকে
একদমই নেই ক্ষতি।
হাতিরপুলের হাতি,
আজ নয় কাল বলবে তুলি,
তোমায় ভালোবাসি (হাতিকে)।
ক্লাস রুমে ঢুকেই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখাটি দেখে তুলির মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো। ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। রুমে তার বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ নেই। দাঁতে দাঁত পিসলো তুলি। এক থেকে একশ গুনতে থাকলো। এভাবে সে কান্না আটকায়।
কে এই অপূর্ব রচনার মহান শ্রষ্ঠা? সে চিৎকার করলো।
কোন জবাব এলোনা কারো কাছে থেকে।
তোরা কি আমার বন্ধু না শত্র“? কেন তোরা আমার জীবনটাকে হেল করে দিচ্ছিস?কি পেয়েছিস তোরা আমাকে? উফ! আমার আর একদন্ড বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মাথা চেপে ধরে একটা ডেক্সচেয়ারে বসে পড়লো তুলি।
রাসেল, মেরী, রুনা এগিয়ে আসলো। মাহাবুব আর নিতা ও ঘিরে বসলো তুলিকে।
রুনা: তুলিৃৃৃৃতোর কি হয়েছে?
রাসেল: তুই এতো সিরিয়াসলি নিবি জানলে এমন ইয়ারকি সত্যি করতাম না।
তুলি: হ্যাঁ…….. আমি সিরিয়াসলি বলছি, ওই বস্তুটাকে নিয়ে আমাকে কখনো কিছু আর বলবিনা।
মাহাবুব: ইমোশনাল হোস না। কিন্ত একটা মানুষকে তুই বস্তু বস্তু বলছিস! এটা কি ঠিক?
তুলি: কি বলবো তাহলে? আরো খারাপ কিছু আমার মুখে আসে না। আসলে বলতাম। জাম্বো সাইজের গোল আলু একটা!!!
রাসেল: বেচারা তোর প্রেমে পড়েছে বলে তুই তাকে যা ইচেছ তাই বলবি? তুলি, মানুষের বাহির না দেখে ভিতরটা দ্যাখ্…………বুঝলি? আমার উপদেশ শোন, তোর ভাল হবে।
তুলি: আমার ভাল তোকে করতে হবে না। রাসেল্যার বাচ্চা। মহাপুরুষ হয়েছে। তুই যখন বউ পছন্দ করবি তখন দেখবো তুই কত্তো ‘মন’ দেখে চুজ করিস। তখন দেখবো তোর মহাপুরুষগিরি। আর ডাম্বেল তোর কি লাগে রে? আমাকে বাদ দিয়ে তুই তাকে সাপোর্ট দিচিছস?
রাসেল: আমাদের দুলাভাই লাগে রে তুলি, দুলাভাই লাগে…………….
তবে রে বাঁদর…………….রাসেলের পিছে দৌড়াতে থাকে তুলি।
নিতা: থাম তোরা, অনেক হয়েছে। তুলি……….তোর পিছে লাগার প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ রাসেল এখন আমাদের সেলিম ভাইয়ের চটপটি খাওয়াবে!!!
বাকি সবাই হুররে বলে লাফ দিয়ে উঠলো।
মাহাবুব: তোর জন্য একটা খুশির খবর আছে তুলি……………আজ মিলোনায়তনে সন্ধ্যায় যে প্রোগ্রাম আছে সেখানে লেমন ভাই গিটার বাজাবে।
কথাটা শুনেই তুলি কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। ম্যাথে পড়–য়া এই ছেলেটাকে সে অস্বাভাবিক পছন্দ করে। কি হ্যান্ডসাম, কত লম্বাৃৃ.. আর যখন সে কথা বলে শুধু চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন হলিউডের আর্নল্ড………তুলি মনে মনে ভাবে।
রাসেল: আর আমাদের জন্য ঝাকানাকা নিউজ অডিটোরিয়ামে আজ জেমস গান গাইবে!!!
আবার সবাই এক সাথে উল্লাস ধ্বনি করে উঠলো।
‘পাগলা হাওয়ার তোড়ে, মাটির পিদিম নিভু নিভু করে, ওরে ওরে হাওয়া থামনারে বন্ধু আসবে বহুদিন পরে………’’হাত তালি আর গান চলতে থাকলো। সেই সাথে চলতে থাকলো মাহাবুবের সাম্বা। আসলেই ছেলেটা ভাল নাচে।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কাজী নজরুল ইসলাম মিলোনায়তনের পাশে শহীদ মিনারের কাছে দাঁড়িয়ে আছে তুলি। আকাশী শাড়ি, চুড়ি আর খোলা চুলে অসাধারণ দেখাচেছ তাকে। আর শেষ বিকেলের আলো যেন এই সৌন্দর্য্যকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিতে একটুও কার্পন্য করেনি।
রাসেল আর মেরী এগিয়ে আসছে। মেরীও শাড়ি পড়েছে।
রাসেলের হাসি আকর্ন বিস্তৃত হলো……………
আজ তোর সামনা সামনি হলে তো লেমন মিয়া টাসকি খাবে রে তুলি!
নে, তাড়াতাড়ি চল, আর ফোলাতে হবে না। আর সবাই কোথায়? তুলি তাড়া লাগালো।
সবাই ভিতরে। সিট পাওয়াই মুশকিল। চল যাই। মেরী, তুলি আর রাসেল অডিটোরিয়ামের দিকে হাঁটতে থাকলো।
কয়েকটা গানের পর এবার গিটারের পালা। নি:শ্বাস বন্ধ করে বসে রইলো তুলি। মিলোনায়তনের আলো আঁধারি পরিবেশে ছড়িয়েয়ে পড়লো গিটারের সুর মূর্ছনা। যেন এক অপার্থিব আবহ।
“এই রাত তোমার আমার
ঐ চাঁদ তোমার আমার
শুধু দুজনে…………..
ভয়ঙ্কর ভাললাগা যেন তুলিকে চারদিক থেকে চেপে ধরছে। শ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম ঘোর লাগা ভাব। চোখের সামনে যেন সহস্র রং এর দুলুনী।
সে শুধু বলতে পারলো………..
আমি যাইরে, শরীরটা খুব খারাপ করছে।
সে কিরে প্রোগ্রাম দেখবি না? মেরীসহ বন্ধুদের জিজ্ঞাসু অবাক দৃষ্টির সামনে দিয়ে বের হয়ে এলো তুলি। বের হয়ে ড্রাইভারকে রিং দিলো। সে আশেপাশেই আছে।
আননোন নম্বর থেকে কে জানি বার বার রিং দিচ্ছে। দিক রিং। সে সচরাচর অচেনা নম্বর ধরেনা।
বাড়ি ফিরে ফ্রেস হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় তুলি।সিডিতে দিয়ে দেয় সেই গান যেটা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বেজে চলেছে এখনোৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃ..
“এই রাত তোমার আমার
ঐ চাঁদ তোমার আমার
শুধু দুজনে
এই রাত শুধু যে গানের
ঐ চাঁদ এ দুটি প্রাণের
কুহু কূজনে..
তুমি আছো আমি আছি তাই
অনুভবে তোমারে যে পাই..
শুধু দুজনে..”
তুলি চোখ বন্ধ করে। ভেসে ওঠে লেমনের অবয়ব।তার মুখ। চোখ খোলে তুলি। আবার বন্ধ করে। হ্যাৃৃৃৃৃঁসেই চেহারা। এরই নাম কি মুগ্ধতা? ভালবাসা? প্রেম?
পৌনে বারটার দিকে রাসেলের ফোন
কি হলো তুলি, তোর লেমনের পারফরমেন্সের পর আর বুঝি থাকতে ইচ্ছে হলোনা? তবে খুব যে গলা ফাটিয়েছিলি জেমস জেমস করে!
না রে..শরীরটা হঠাৎ খারাপ করলো তাই চলে এলাম।
তোরই বা দোষ কোথায়? জানিসৃৃলেমন ভাইয়ের গীটারের পর আমারই আর থাকতে ইচ্ছে করছিলোনা। বাড়িতে এসে কিছুতেই সুরটাকে মাথা থেকে তড়াতে পারছিনা। কেমন যেন শরীরের মধ্যে ঝনঝন করছে..
রাসেল কথা বলে যাচ্ছে..
অবাক হচ্ছে তুলিসে তো ভাবছে শুধু তারই এমন হচ্ছে! রাসেলেরও একই অনুভূতি! এই অনুভূতি তাহলে মেরী, নিতা, শাওন, প্রভা, মাহাবুব, রুবেল, জয় সবার! সকল শ্রোতার! তারমানে এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার! ভাললাগার অনুভূতি..ভালবাসার নয়!
লাইব্রেরী থেকে কেবল বের হয়েছে তুলি, মেরী আর রাসেল………………
রাসেলের ইশারা……………..
তুলি, বায়ে তাকা, তোর লাড্ডু বসে আছে। হাতে আবার এক ঝুড়ি গোলাপ রে। প্রথম দিন একটা গোলাপ দিয়েছিলো। আজ যে এক ঝুড়ি! আর কদিন পরে ত্ইু এক ট্রাক গোলাপ পাবি রে তুলি…………………. আমাকে সেখান থেকে কয়েকটা দিবি কিন্ত………………………..।
রাসেল, থাম প্লিজ………..ডাম্বেলটা এদিকেই আসছে। এমন তুলোধুনো করবো না! প্রথম দিন ভদ্রভাবে রিফিউজ করেছি বলে লাই পেয়ে গেছে।
এক্সকিউজ মি……………….রাসেল আমি তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছি। তোমার কি সময় হবে? পলাশের সবিনয় জিজ্ঞাসা।
অবশ্যই…………পলাশ ভাই………………..বোকা বনে গেল রাসেল।
তুলি আর মেরীর অবাক চোখের সামনে দিয়ে রাসেলকে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে রওনা দিলো পলাশ। খানিক বাদে ‘টুকিটাকি’ কনফেকশনারীতে মেরী, তুলির সাথে দেখা করলো রাসেল।
এই নে তোর ফুলের ঝুড়ি। যতো ভ্যাবলা মনে করেছিলাম, তোর ডাম্বেল ততোটা না, তুলি……তবে তুই একশভাগ সিওর থাক, তার ভালবাসায় কোন খাদ নাই। হেভি ভালবাসেরে তোকে, দোস্ত…………
আমার মনে হয় রাসেল, তোকে হয় পানি পড়া না হয় মিষ্টি পড়া খায়িয়ে দিয়েছে লাড্ডুটা। তা না হলে ত্ইু এমনভাবে তার ফেভারে কথা বলছিস কেন? তুলি ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
শোন তুলি, সে বললো, তার এখন ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স চলছে। সামনে পরীক্ষা কিন্ত কোন কিছু সে পড়তে পারছে না। প্রতিদিন সে অন্তত: একবার হলেও তোর জান্তে বা অজান্তে তোকে দ্যাখে। তুই হয়তো জানিস না। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে তোর বাড়ির সামনে যেয়ে তোকে দেখে আসে।
কি বলছিস তুই? কি সাংঘাতিক………….তুলি আতঙ্কিত।
আরো বলছিলোৃৃৃ.সে যখন চোখ বন্ধ করে,সেই বন্ধ চোখে সে নাকি তোকে পরিস্কার দেখতে পায়! বললো রাসেল।
কি পাগলের মতো কথা বলছিস? বন্ধ চোখে পরিস্কার দ্যাখে? মেরীর উৎসুক প্রশ্ন।
হ্যাঁ বন্ধ চোখে পরিষ্কারভাবে তুলিকে দেখতে পায়, একারনে নাকি খুব প্রয়োজন ছাড়া সে চোখ খোলেনা।
তুই দয়া করে চুপ করবি? রেগে বললো তুলি।
রোজার মাঝামাঝিতে ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাবে। সে চিন্তা করছে কিভাবে সে তোকে না দেখে থাকবে? তার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে রে দোস্ত!
কেন? চোখ বন্ধ করে দেখবে। এখন বিটলামী বন্ধ করতো রাসেল, তার চিন্তা সে করুক। আমাকে তার সম্পর্কে কোন কথা বলিস না প্লিজ। বললো বটে কিন্ত তুলির মাঝে কেমন জানি শূন্যতা ভর করলো। সবকিছু কেমন জানি বিবর্ণ মনে হতো থাকলো।
দেখতে দেখতে ইউনিভার্সিটি বন্ধের দিন চলে আসলো।
তুলি বললো
তোরা সবাই ঈদের দিন প্রথমেই সকাল বেলাতেই আমাদের বাসায় যাবি, বুঝলি? আর যেন তেল দিতে না হয়। মাহাবুব তো দেশের বাড়ি যাবে। তাছাড়া সবাইকে যেন দেখি। আর ঈদের আগের দিন চাঁদরাতে তো আমরা মানে আমি, মেরি, নিতা, শাওন মেহেদি দিবো আর খুব মজা করবো।
আমরা কিন্ত সন্ধ্যার পরে পরেই চলে যাবো তোর বাড়ি……নিতা বললো।
অবশ্যই বন্ধু………তুলির জবাব
তোদের জন্য ঈদে কিন্তু একটা আইটেম আমি নিজে রাঁধবো। গরুর মাংসের ঝাল বিরিয়ানীর একটা রেসিপি পেয়েছি।
গলা খ্যাকারি দিয়ে রাসেল শুরু করলো……………..
মানে তুলি…………….বলছিলাম কি? ঈদের দিন কিনা…………….মুরুব্বীদের হাতের খাবার খাওয়াই ভালো। সেই খাবারের সাথে দোয়া মিশে থাকে। আর তোর তৈরী করা স্পেশাল পায়েস খেয়ে আমার গত ঈদে ডিসেন্ট্রি হয়ে একশেষ অবস্থা…………………………………………।
তোর আমি কিছু বলেছি………………..
তুলির চিৎকার শুনে সেখান থেকে এক ছুটে হাওয়া হয়ে গেল রাসেল।
……………………………………………………………………………………
চাঁদরাত আর মেহেদী সন্ধ্যার ঝলমলে উৎসব। তুলিদের বাসার ছাদে মেহেদী দিতে বসেছে সবাই। মৃদুমন্দ বাতাস আর মেহেদীর সোঁদা গন্ধে মুখরিত পরিবেশ আজ অতুলনীয়। তুলির বান্ধবী আর কাজিনরা মাতিয়ে রেখেছে সন্ধ্যা এবং রাত্রির এই মিলনকালটাকে। মেরী উপরে এসে তুলিকে বললো…………………..
তুলি……..তোদের বাসার সামনে এক ভ্যানগাড়ি, তাতে বিরাট ঝাঁকা ভর্তি গোলাপ। কার কাজ নিশ্চয় বুঝছিস!।
আমি দেখছি………………..
নিচে নেমে গেল তুলি, গেট খুলতেই দেখলো বড় ঝাঁকা ভরা গোলাপ নামিয়ে দিয়ে ভ্যানগাড়িওয়ালা উধাও। সে ঝাঁকাটি গোলাপসহ উল্টিয়ে ফেলে দিলো। সে সময় গোলাপের মাঝে একটি চিরকুট উকি দিলো। বেশ বড় বড় করে মার্কার পেনে লেখা “ভালবাসি”।
উপরে চলে এলো তুলি। কিন্ত কোন কিছুতেই আর মন বসাতে পারলোনা। দুটি চোখ সব সময় তাকে দেখছে…. ভাবতেই সারা শরীরে যেন শিহরণ বয়ে গেল। আতশবাজি আর ফুলঝরিতে আলোকিত হলো আকাশ। আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠলো সবাই। কিন্তু তুলি আজ বড্ড নিঃশব্দ, নজরকাড়া নিঃসাড়।
রাত হলো। একে একে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেলে। ক্লান্ত শ্রান্ত তুলি ঘুমোতে গেলেও ঘুম কিছুতেই আর এলোনা। গান শুনবেনা শুনবেনা করেও চালিয়ে দিলো………………..
“এই রাত তোমার আমার………………।
মানসপটে আজ খুব দেখতে ইচেছ হচ্ছে লেমনটাকে। এই গান শোনাটা যেন সেটারই প্রচেষ্টা, কিন্ত কি আশ্চর্য……. ……..সে কিছুতেই তুলির কল্পনায় আজ ধরা দিচেছ না। লেমনের জাদুকারী হাতের ছোঁয়ায় গিটারে সৃষ্ট এই গানের সুর মূর্ছনায় আপ্লুত হয়েছিল তুলি। তাইতো এই গান আর লেমন ছিল অবিচেছদ্য।
অথচ আজ……………
চোখ মুদলেই বন্ধ নয়ন মাঝে তুলি অনুভব করছে পলাশের উপস্থিতি। মোটু পলাশ, লাড্ডু পলাশ, ডাম্বেল পলাশের সরব বিচরণ। মাথাটা ধীরে ধীরে ডানে বায়ে করতে থাকে তুলি। তারপর সজোরে ঝাঁকি দেয়। চোখ খোলে। আবার বন্ধ করে। লাড্ডুটাকে তো ঝেড়ে ফেলতে পারেই না, লাভের লাভ হয় লাড্ডুটার সমস্ত চোখের পর্দা জুড়ে থাকা স্থির ও নির্বাক চিত্র চলমান এবং সবাক হয়ে ওঠে। তুলির দু’হাতে লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে সে যেন মৃদু কন্ঠে বলতে থাকে “ভালোবাসি……..ভালোবাসি…….ভালোবাসি…………….”
ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে তুলি।
ঘুম ভাঙ্গে মায়ের ডাকে……………………………………………….
তুলি ওঠ, আজ তুই কি একটা আইটেম রাঁধবি যেনো? রাঁধুনি আমার তাড়াতাড়ি উঠে পড়। এখুনি তোর বাবা ঈদের নামাজে যাবে। আর তোর বন্ধুরা আসলো বলে। ওহ…….হো, ছাতাটা বের করে দেতো, ঘনকালো মেঘ করেছে। বৃষ্টি আসতে পারে।
ছাতা তো মা তোমার আলমারিতে আছে। দেখি মা দেখি, তোমাকে এই নীল শাড়ীতে তো অস্পরীর মতো দেখাচ্ছে! বাবা কি আজ তোমাকে দেখেছে মা?
এত বড় হয়েছিস, ফাজলামী গেলোনা। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আইতো
রান্না শেষে গোসল সেরে পাট ভাঙা কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরেছে তুলি। কপালে ছোট কালো টিপ দিয়ে চোখে গাঢ় কাজলের প্রলেপ দিতে দিতে কেন যেন তার মনে হলো এই সাজ তার নিজের জন্য না, অন্য কারো জন্যে তো নয়ই…………এতো যতœ করে সে নিজেকে সাজাচ্ছে পলাশের জন্য। নিজের খেয়ালি ভাবনার জন্য সে নিজেই লজ্জাতে লাল নীল হতে লাগল।
কিন্তু কোন এক অমোঘ নিয়তির টানে পা পা করে তুলি এগিয়ে গেলো বাড়ির ছাদের দিকে।। ছাদে যেয়ে রেলিং এ সে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালো। চারিদিকে খুঁজতে থাকলো সে ……..তুলি যা খুঁজছিলো সহজেই তা দেখতে পেল।
বাসার সামনের রাস্তার ওপাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে পলাশ। হালকা বৃষ্টিতেও তার সাদা পাঞ্জাবী ভিজে জবজব করছে। রেলিঙে যে তুলি দাঁড়িয়ে, এটা বুঝতে তার কিছুটা সময় লাগলো। যখন বুঝতে পারলো তখন সে চোখ নামিয়ে নিল।
দ্রুত পায়ে উপর থেকে নেমে আসলো তুলি। গেট পেরিয়ে সে এগিয়ে গেল কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে। তুলির দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে পলাশ।
এর যে সুমো মহারাজ, অনেকক্ষণতো গাছতলায় থাকলেন এবার আমাদের বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়ে আমাকে ধন্য করুন………।
তুলির কথা যেনো পলাশের কানেই ঢুকছেনা। স্বপ্ন আর বাস্তব তার কাছে মিলেমিশে একাকার।
এই যে……………..চুপ করে তাকিয়ে না থেকে……….চলো, আমাদের বাসায় চলো। তার আগে বলো ……………..আমার গোলাপ কোথায়? বেছে বেছে আজই গোলাপ আনোনি?
না……..মানে………গোলাপ এনেছিলাম বৃষ্টিতে পাপড়ি ঝরে গেছে। আর আমি বুঝিনি………..আজই তুমি আমার কাছে আসবে! কথা বলবে!
ঠিক আছে, ঠিক আছে……..ওই গোলাপে আমার প্রয়োজন নেই, আমি তো গোলাপ বাগানের সন্ধান পেয়েছি! তুমি ঈদে বাড়িতে যাওনি?
তোমাকে ফেলে যেতে পারলাম না তুলি।
কথাটা শুনে তুলির চোখ ভিজে উঠলো
এখন ওঠো, বাসায় চলো, যা ভেজা ভিজেছো! তাড়াতাড়ি গা মুছে ফেলতে হবে। নইলে জ্বর হয়ে একশেষ হবে। আজ আমি বিরিয়ানি রান্না করেছি। তুমি প্রথমে টেষ্ট করবে…….ঠিক আছে? নিশ্চয় খুব ক্ষুধা পেয়েছে তোমার। কিন্তু আমার কাছে প্রমিস করো………..কাল থেকে কঠিন ডায়েটিং করবে তুমি! যতোই কষ্ট হোক!
একটি হাত দিয়ে তুলির হাত ধরলো পলাশ। আর একটা হাতের তর্জনী আলতো করে ছোঁয়ালো তুলির ঠোঁটে……………………………………………………………………………………………………………
শ……….শ…………….শ………….শ……. তুমি পাশে থাকলে কোন কষ্টকেই কষ্ট মনে হবে না আমার। প্রমিস………….।
তুলির বন্ধুদের হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। তুলি আর পলাশকে দেখে তারা তাদের দিকে এগুতে লাগলো।
অকারণে তুলির চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। উচ্ছ্বল এই মেয়েটি প্রথমবারের মতো চোখের পানি আটকে ফেলার কোন চেষ্টাই করলো না।

বাংলা সাহিত্যে ঈদ

অধ্যাপক এনায়েত আলী বিশ্বাস

ঈ দ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কম লেখালেখি হয়নি। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কবি সাহিত্যিকরা নানা ভাবে ঈদকে উপস্থাপন করেছেন তাদের লেখনীতে। বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে মুসলিম কবি সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যে ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টিতে বিশেষ তৎপর হয়ে ওঠেন। ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের কথা নিয়ে এ সময় কিছু পত্র, পত্রিকাও প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এর ফলে ইসলামী ঐতিহ্য ও চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বাংলা ভাষায় প্রাণ স্পন্দন জেগে ওঠে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নব-রূপায়ন ঘটে। ঈদ নিয়ে বিংশ শতাব্দীর আগে ব্যাপক রচনার হদিস পাওয়া না গেলেও ঈদ একেবারে অনুপস্থিত থাকেনি। বরং ঈদের প্রাণবন্ত আকর্ষণ মুসলিম জন জীবনে এনে দিয়েছে নানা বৈচিত্র্য। ঈদ তাই মুসলিম মানসে আনন্দের প্রতীকরূপে প্রতিভাত হয়েছে। ধর্ম ভিত্তিক প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব কিছু আনন্দ উৎসব রয়েছে। এসব আনন্দ উৎসবের সাথে দেশের সংস্কৃতির একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মুসলিম জাতির প্রধান দুটি উৎসব ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এর মধ্যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ও আনন্দ উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর। মহা বরকতের মাস বিদায় নিয়ে শাওয়ালের একফালি বাঁকা চাঁদ ঈদুল ফিতরের বার্তা নিয়ে আসে। ধর্মীয় জীবন ও কর্ম জীবন পরস্পর ঘনিষ্টভাবে সম্পর্ক যুক্ত। আর এর পুরোপুরি প্রতিফলন ফুটে ওঠে ঈদ উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে। মানুষের মধ্যে একটি মধুর সম্প্রীতি ও সামাজিকতা নির্মিত হয় এর মাধ্যমে। বস্তুত, এই ইদ উৎসব মহান আল্লাহর এক বিশেষ উপঢৌকন হিসেবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম-এক স্বভাব সুন্দর ধর্ম। সাম্য ও মৈত্রীর বাণী নিয়ে ইসলাম এসেছে পৃথিবীতে। এখানে আশরাফ-আতরাফ, আমীর-ফকির, ধনী-নির্ধনে যেমন ভেদাভেদ নেই, তেমনি উচ্ছৃঙ্খলতার কোন স্থান নেই। ঈদের মিলন বা আনন্দ উৎসবে তারই শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য আমরা খুঁজে পাই। বাঙালী কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত “নবনূর” পত্রিকায় সম্ভবত প্রথম ঈদ সংখ্যা প্রকাশ পায়। পর পর তিন বছরই “নবনূর” -এ ঈদ বিষয় লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। আর এ পত্রিকায় কবি কায়কোবাদ, বেগম রোকেয়া ও সম্পাদক স্বয়ং এ তিনজন ঈদ সংক্রান্ত কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন ১৯০৩ সালে। ১৯০৪ সালে সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী “ঈদ” শীর্ষক একটি কবিতা “নবনূর”-এ প্রকাশিত হয় এবং খুব সম্ভবত এটি মুসলিম বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঈদ কবিতা। কুহেলী তিমির সরায়ে দূরে/তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে/রাঙিয়ে প্রাত তরুণ শিরে/আজ কি হর্ষ ভরে/আজি প্রভাতের মৃদুল বায়ে/রঙ্গে নাচিয়া যেন করে যায়/মুসলিম জাহান আজি একতায় দেখো কত বল ধরে।” ঈদ যে কেবল মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এ চেতনা কবি কায়কোবাদের ঈদ বিষয়ক কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। “এই ঈদ বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান/হয় সিদ্ধ, বোঝে না তা স্বার্থপর মানব সন্তান/এ নয় শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধূলাখেলা/এ শুধু জাতিয় পুণ্য মিলনের এক মহাখেলা/ভুলে যাও হিংসা দ্বেষ, দলাদলি শত্র“তা ভীষণ/মোস্লেম জগতে আজি বিশ্বব্যাপী মহা সম্মিলন।” “ঈদ আবাহন” একই নামে কায়কোবাদ আরও দুটি কবিতা লিখেছেন। একটি তাঁর “অশ্র“মালা” কাব্যে, অন্যটি “অমিয় ধারা” গ্রন্থভুক্ত। দুটি কবিতাতেই ঈদ উপলক্ষে কবি ঘুমন্ত মুসলমানদের জাগরণের বাণী শুনিয়েছেন। “অমিয় ধারা”র ঈদ আবাহন কবিতায় তিনি লিখেছেন “আজি এ ঈদের দিনে/এ পবিত্র শুভক্ষণে/এসো ভাই এক প্রাণে হৃদয় বাঁধিয়া রক্ষিতে এস্লাম ধর্ম/সাধিতে আপন কর্ম/এসো ভাই কর্মক্ষেত্রে এসো হে ছুটিয়া।” ঈদ নামে ছোটদের কবিতাও তিনি “মন্দাকিনী ধারায়” লিখেছেন। “মোস্লেমের আজ ঈদ শুভময়/আজ মিলনের দিন/গলায় গলায় মাখামাখি/আমীর-ফকির/আজ সবারই হস্তপুত ধোয়া স্বরগ নীরে/তাইতো চুমর ভীড় লেগেছে নম্রনত শিরে।” কবি শেখ ফজলল করিম তার সম্পাদিত “বাসনা” পত্রিকায় আশ্বিন ১৩১৫ সংখ্যায় “ঈদ” কবিতায় লিখেছেন অলস-অধম মুসলিম সমাজকে মহাজাগরণের বাণী শুনিয়েছেন এভাবে “ অলস-অধম মোরা এখনও কি অবহেলে যাব রসাতলে ………. জীবন প্রভাত আজি বিস্ময়ে দেখরে চাহি মহাজাগরণ/সাহসে বাঁধিয়া বুক হও পথে অগ্রসর নতুবা মরণ।” কবি নজরুলের অব্যবহিত দুই পূর্বসূরি কবি শাহাদাৎ হোসেন ও কবি গোলাম মোস্তফা ঈদ বিষয়ক কবিতা রচনায় বাংলা সাহিত্যে শ্রীবৃদ্ধি সাধন করেছেন। শাহাদাৎ হোসেন “ঈদুল ফিতর” কবিতায় লিখেছেন- “কোথা মক্কা, মোয়াজ্জেমা, মদিনা কোথায়/প্রাণ কেন্দ্র এ মহা সাম্যের/কোথা আমি ভারতের প্রান্ততটে ক্ষুদ্র ঈদগাহে/………. সাম্যের দিশারী আমি, আমি মুসলমান/দেশ-কাল-পাত্র মোর সব একাকার। বহুত্বে একক আমি/আত্মার আত্মীয় মোর দুনিয়া জাহান। ” “বিশ্বনবী” রচয়িতা কবি গোলাম মোস্তফা “ঈদ উৎসব” একটি গীতিময় কবিতা “মাসিক সওগাত” ভাদ্র ১৩২৬ -তে প্রকাশিত হয়। কবিতাটি-“আজই সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা/মানবতা মূরতি লোভিয়াছে হর্ষে। আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়েছে, রাখতে হবে সারা বর্ষে/এই ঈদ হোক আজ সফল ধন্য নিখিল মানবের মিলনের জন্য/শুভচ্ছা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক/খোদার শুভাশিষ পর্শে।” ইসলাম শুধু মানুষের পারলৌকিক নয়, ইহলৌকিক মুক্তিরও একটি সত্য সুন্দর বিধান। এ চেতনার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় আধুনিক কালে মুসলিম কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীদের রচনায়। আর এইভাবে সব চেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে নজরুল ইসলামের কাব্যে। কবি নজরুল ইসলামের ঈদের কবিতা ও গানে যেমন প্রকাশ পেয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে ইসলামের মহান শিক্ষা মানবিক মূল্যবোধ ও সাম্যের কথা। মুসলিম সাহিত্যাঙ্গনে নজরুল রচিত ঈদ বিষয়ক কবিতা “ঈদ মোবারক” ১৩৩৪ সালের বৈশাখ মাসের “মাসিক সওগাত” পত্রিকাতে প্রকাশিত হয় এবং এটি ঈদ বিষয়ক তার প্রথম কবিতা। “ঈদ মোবারক” কবিতায় তিনি ইসলামের সাম্য শিক্ষার পূর্ণ প্রকাশ ঘটিয়েছেন-“আজই ইসলামের ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান/নাই বড়-ছোট সকল মানুষে এক সমান/রাজা-প্রজা নয় কারো কেহ/ইসলাম বলে সকলের তরে মোরা সবাই/সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেব সকলেই ভাই/নাই অধিকার সঞ্চয়ের/কারো আখি জলে কারো ঝাঢ়ে কিরে জ্বলিবে দীপ/দুজনার হবে বুলন্দ নসিব, লাখে লাখে হবে বদনসিব? এ নহে বিধান ইসলামের।” শুধু কবিতায় নয়, গানে, সুরে, ছন্দে নজরুল ঈদকে সর্বাধিক সমৃদ্ধ করেছেন। ঈদুল ফিতর মুসলিম চেতনার যে জাগরণের সূচনা করে তাকেই তিনি উজ্জীবিত করেছেন পথ চলার নির্দেশনা হিসেবে। নজরুল রচিত ঈদের সম্পূর্ণতম কবিতা, যেমন “ঈদ মোবারক” তেমনি ঈদুল ফিতরের সম্পূর্ণতম রচিত প্রথম ইসলামী গান যেমন-“ওমন রমজানের ঐ রোযার শেষে এলো খুসির ঈদ/তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ/তোর সোনা দানা বালা খানা সব রাহে লিল্লাহে/দে যাকাত, মুদ্রা, মুসলমানের আজ ভাঙাইতে নিদ/তুই পড়বি ঈদের নামাজরে মন মহান ঈদগাহে/যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ/আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন হাত মিলাও হাতে/তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্বনিখিল ইসলামে মুরীদ।” নজরুলের ঈদুল ফিতরের এ আগমনি বারতা চিরন্তন রূপ মাধুর্যে এক নূতন মাত্রা যোগ করেছে বাংলা সাহিত্যে-এ দেশের মন মানসে। নজরুল এ গানটি ১৯৩২ সালে এইচ-এম-ভি কোম্পানীর রেকর্ডে সুরশিল্পী আব্বাস উদ্দীনের কন্ঠে গীত হলে তা তখনকার ঘুমন্ত মুসলিম সমাজে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঈদের আনন্দ উদ্দীপনা নিয়ে মুসলমানদের ঘরে ঘরে জাগে এক নব উন্মাদনা। নজরুলের ঈদুল ফিতর বিষয়ক কাব্য কর্মের কথা ১৬ টির অধিক এবং তার অধিকাংশ কবিতাতেই মানবিক মূল্যবোধের চেতনা মূর্ত হয়ে উঠেছে সার্থকভাবে। ঈদের চাঁদ কবিতায় কবি বলেছেন-“রোযা রাখার ফল ফলেছে দেখরে ঈদের চাঁদ/সেহেরী খেয়ে কাটলো রোযা আজ সেহেরাবাঁদ/ওরে বাঁধ আমামা বাঁধ।” ঈদ মুসলিম জাহানের সার্বজনীন আনন্দ উৎসব। রমজানুল মোবারকের সাম্যবাদী কৃচ্ছ্রতা ও সংযমের মহা পরীক্ষার পথ অতিক্রম করে রোযাদার লাভ করে এই ঈদ। এটা তার কাছে আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। এর সাথে জড়িত হয় জান্নাতী সুখের আমেজ। কবি তাই বলেন-“ঈদ এসেছে দুনিয়াতে শিরণী-বেহেস্তী/দুশমনে আজ গলায় ধরে পাতাব ভাই দোস্তী/যাকাত দেব, ভোগ বিলাস আজ ও বদ মন্তী/ প্রাণের তশতরীতে ভরে বিলাবো তৌহিদ চল ঈদগাহে।” নজরুল ঈদ বিষয়ক বহু গান রচনা করেছেন। এসব গান শুধু আব্বাস উদ্দীন নয়, আব্দুল লতিফসহ অনেক শিল্পী গেয়েছেন। নজরুল ছাড়াও ঈদ নিয়ে কবিতা লিখেছেন বহু হিন্দু-মুসলমান কবী। এছাড়া ঈদ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন অসংখ্য নিবন্ধকার। তবে নজরুলের পরে ঈদকে নিয়ে লেখা কবিতায় ইসলামী চেতনার রূপকার কবি ফররুখ আহমদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ঈদকে দেখেছেন নানা অনুভবের ঔজ্জ্বল্যে। ঈদের চাঁদ, রমজান, ঈদ-এসবকে তিনি জীবনের সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত করে এক নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছেন। তারুণ্যকে উদ্দেশ্য করে কবি বলেছেন-“তোমার মৃত্যু-সমুদ্র মোহনার জীবনের আশ্বাস/তোমার জীবন রমজান সাধনার স্বপ্ন ঈদের চাঁদ।” সাহিত্যিক মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী তার “ঈদের লেখা” শীর্ষক প্রবন্ধে ঈদের ঈদুল ফিতরের সামাজিক অবস্থা বর্ণনা করেছেন। কবি মঈনুদ্দিন সাম্যবাদী পত্রিকায় (বৈশাখ ১৩৩১) “ঈদুল ফিতর” নামে কবিতা লিখেছেন। কবি আশরাফ আলী খানের “ঈদ” শীর্ষক কবিতাটি এক কালে বহুল প্রশংসিত হয়েছিল। কবিতাটি নিম্নরূপ- সাঁঝের আকাশে দেখা যায় চাঁদ/ঘরে ঘরে লাগে ধুম/সারারাত ধরে চলে উৎসব কারো চোখে নাই ঘুম। মওলোভী কন আল্লাহর সান/ঈদে হয় তাজা সকলের প্রাণ।” কবি তালিম হোসেন তার “ঈদ মোবারক” কবিতা লিখেছেন-ঈদ মোবারক হে বন্ধু খুসির দিন/নূতন সজ্জা, নব আনন্দ, নয়ালী চিন/প্রাণে ভবনে উৎসব করে তৃপ্তি মুখ/আজি জাগরণে নতুন দিনের ক্ষুণিœহীন ………..।” সাওয়ালের চাঁদকে নিয়ে সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন-সওয়ালের চাঁদ খুসির খবর নিয়ে দুনিয়ায়/জান্নাতী সুধা ঝরে যেন তার অপরূপ জোছনায়/নতুন ছন্দে সে খুসির বাণী/আকাশে-বাতাসে করে কানাকানি/ব্যথিত ধরণী খুসিতে আবার/ঈদের মহিমায়।” কবি সৈয়দ আলী আহসান এক ঈদের দিনকে নিয়ে লিখেছেন-এসেছে নতুন দিন/ভয় নাই প্রিয়, দ্বারে কর করাঘাত/সংখ্যা হরণ অভয় মন্ত্র শোন শোন কান পাতি/বনভূমি আজ চকিত হাসিতে হঠাৎ পেয়েছে সাড়া/সুর্মা মেখেছে আঁখির কোনায় কন্ঠে তুলেছে গান/পঙ্গু আহত বিমর্ষ দিন হঠাৎ পেয়েছে প্রাণ।” কবি বেগম সুফিয়া কামালের ঈদের কবিতায় ইসলামী সাম্যের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে এভাবে-“কাল ঈদগাহে ধনী-দরিদ্র মিলবে যে বুকে বুকে/ কাল ঈদগাহে ধনীর ধনের দীনও হবে ভাগীদার/পুরাতে হইব কত দিবসের খালি অঞ্জলি তার।” প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের কবি সাহিত্যিকরা ঈদুল ফিতর বিষয়ক রচনায় স্ব স্ব প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাদের সব ধরণের রচনার মধ্য দিয়ে মুসলীম মন ও মানসের স্বাভাবিক আশা আকাঙ্খাই ব্যক্ত হয়েছে। কবি সামছুর রহমান, সৈয়দ সামছুল হক, আল মাহমুদ, আহসান হাবীব, আবু জাফর ওবায়দুল্লা, আবুল হাসান, আব্দুল কাদির, শাহাদাৎ হোসেন, জসিম উদ্দিন, বন্দেআলী মিয়া, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সেকেন্দার আবু জাফর, কথা শিল্পী শওকত ওসমান, সামসুদ্দিন আবুল কালাম, মোঃ নুরুল হুদা, শাহাবুদ্দিন নাগরী, সোহরাব পাশা, আলতাফ হোসেন, খালেদ হোসাইন, রুদ্র মোঃ শহীদুল্লা, গোলাম কিবরিয়া, খন্দকার আশরাফ হোসেন, শাহনাজ মু্িন্ন, এ.কে আজাদ, কাজী রিয়াজুল ইসলাম, এনায়েত আলী বিশ্বাস, বোরহান বিশ্বাস, আ. স.ম. বাবর আলী, আকাশ আহম্মেদ, আলমগীর সরকার, এস. কামাল হোসেন, শামিমা খানম, ফারজানা আক্তার, মাহবুবা মাছুমা, হাবিবুর রহমান, মতিউর রহমান প্রমুখ কবি সাহিত্যিকরা তাদের রচনায় ঈদকে নানাভাবে দেখেছেন। এখনও নূতন প্রজন্মের কবি সাহিত্যিকরা ঈদকে নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করেন। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এই মহা মিলনকে ধরে রাখতে প্রচেষ্টার অন্ত নেই।

তোমাকে ঠিক চেয়ে নেব

সিনি মনি

522a23e0c4138-Untitled-21১ . খুব মেঘ করে বৃষ্টি নামার আগে রাতের আকাশ যখন অফুরন্ত উল্লাসে নিজেকে লালচে রঙ্গে সাজায়, তখন মাঝেমাঝে আমার মনে অদ্ভুত একটি ইচ্ছে জেগে উঠে । বোকা বোকা একটি ইচ্ছে , কিন্তু আমার কাছে এই ইচ্ছেটি ভীষণ প্রিয় । রাতের মেঘলা আকাশ দেখলে আমার কেন যেন নির্জন একটি দ্বীপ কিনে ফেলতে ইচ্ছে করে । ইচ্ছেমত সবুজ আর নীলচে রঙ করা সেই দ্বীপটিতে শুধু আমার একলা রাজত্ব হবে । আমার অনেকদিনের ইচ্ছে , মাঝরাতের আকাশ ভেঙ্গে সেখানে যখন ঝুম বৃষ্টি নামবে , সেই বৃষ্টিতে আমি তখন দুরন্ত নদীর মত উল্লাসে মেতে উঠব । সেই বৃষ্টির আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবার জন্যে কোন শাসনের জাল আমাকে বাঁধতে আসবেনা । আমার একলা দ্বীপে কেবল আমার মুগ্ধতায় মাখা বৃষ্টি বিলাস হবে । আর আমার সামনে থাকা ছোট্ট সমুদ্রতটে অবিরাম  দুলতে থাকবে রঙ্গিন কোন পানসি , হতে পারে সেটি অনেক দুরের কোন দ্বীপাঞ্চল থেকে ভেসে এসেছে , হতে পারে সেটি কোন খেয়ালি রাজপুত্রের বিলাসী ভ্রমণসঙ্গী । হয়ত সেই পানসিতে উদাস নয়নে বসে থাকবে সেই ভীষণ সাহসী বৃষ্টিমুগ্ধ রাজপুত্র । আর উন্মত্ত বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থেকে আমি দেখব সেই রাজপুত্রের চুলের সাথে বাতাসের যুদ্ধ , বৃষ্টির ছিটেতে ঝাপসা হয়ে যাওয়া তার চশমার কাঁচ । এই যা ! কি ভাবছি , রাজপুত্ররা বুঝি চশমা পরে ? আছে কোন রাজার পুত্র যে কিনা চোখে কম দেখে বলে চশমা পরত ? কি জানি !
নিজের অজান্তেই হেসে ফেললাম । আমার ভাবনা গুলি এত বাউন্ডুলে কেন হয় কে জানে ? ফুটপাথের উপর ধীর পা ফেলে এই ভরসন্ধ্যাবেলায় যখন আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি , তখন আমার এই অদ্ভুত কল্পনাবিলাসীতার কি কোন কারন থাকা উচিত ? না আকাশে কোন মেঘ আছে , না আছে ঝড়ো হাওয়া । তবে কেন যেন মনে হচ্ছে আজ রাতে বৃষ্টি নামবে , শরৎকাল তো সারপ্রাইজ দিতে ভীষণ পছন্দ করে বলেই জানি । হঠাত লক্ষ্য করলাম , একা একা হাসছি বলে কয়েকজন পথচারি ঘুরে আমার দিকে তাকাচ্ছে , সম্ভবত পাগল ঠাওরেছে আমাকে । সে যাকগে ,যার যা ভাবার তাই ভাবুক । কে কি ভাবল তা নিয়ে ইরা কিন্তু মাথা ঘামায় খুব কম সময়েই , হুম ।
ক্লিনিকটা ছোটখাট , ব্যক্তিমালিকানাধীন । আমাদের ছোট্ট এলাকার মানুষদের ভরসার স্থান । আর আমার মত রোগাপটকা হলে তো কথাই নেই , এই দুইমাসে আমি তৃতীয়বারের মত এখানে হানা দিলাম । এবারের এক্সকিউজ – কি বলা যায় ? আমি দুদিন হল আমার নাকের অস্তিত্ত টের পাচ্ছিনা , বাজে টাইপের বিচ্ছিরি লেভেলের সর্দিতে আমার নাক সম্ভবত বিলীন হয়ে গেছে । এই সমস্যাটি কিন্তু নতুন নয় , দুইমাস পরপরই আমার এই অবস্থা হয় । তবে সমস্যায় পড়তে হয় রুমাল খুঁজে পাওয়া নিয়ে । এত রুমাল কোথায় আর পাব ? বাসার মানুষজনের যাবতীয় পুরানো আধপুরানো জামাকাপড় আমার জন্যে বিশেষভাবে সংরক্ষন করা হয় । আমি এদের সদ্গতি করি নাকি দুর্গতি করি তা ঠিক জানিনা , তবে আমার সর্দি সমস্যার যে একটা গতি হয় তা কিন্তু সত্যি ।
এক ঘন্টা অপেক্ষার পর আমার সিরিয়াল যখন আসল , আমি তখন ঠিক ” পাইছিরে ” টাইপের ইমোতে ছিলাম । কিন্তু আমি দরজা খুলে ঢুকবার পরই আমার দিকে তাকিয়ে ডাক্তারের ১০০ ওয়াট বাল্বের মত চেহারা ২৫ ওয়াট বাল্বের মত হয়ে গেল । আমি এখানে এত বেশি হানা দেই যে ডাক্তার থেকে শুরু করে কম্পাউন্ডার পর্যন্ত সবাই আমার চেনা হয়ে গেছে ,এই ডাক্তার তো আরো এক কাঠি উপরে । ফিচলা হাসি হেসে ডাক্তার সাহেব বললেন ,” কি খবর তোমার ? আবার রোগ বাঁধিয়েছ ? তুমি বরং কাঁথা বালিশ নিয়ে হসপিটালে এসে পড় , তোমার ইন্টেন্সিভ কেয়ার প্রয়োজন ।” আমি কি বলব বুঝলাম না , সত্যি বলতে কি , এই ডাক্তারের মত বেয়াদব কিসিমের ডাক্তার আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি । আরে বেটা আমার অসুখ হলে আপনার কী ? আপনার তো অসুখি হবার কারন নেই , আপনার আরো টু পাইস ইনকাম হবে । তাও এত প্যাচালের কি মানে আছে ? আমার পুরো ছোটবেলা অবশ্য কেটেছে এই বেয়াদব ডাক্তারের বাবার চিকিৎসা নিয়ে , তিনি এখনও চিকিৎসা পেশাতেই আছেন , তবে অন্য হাসপাতালে বসেন । নিজের এই ক্লিনিকটাতে বসার আর এখন সময় পান না , কেন যেন বুড়ো বয়সেই ডাক্তার গুলি বিখ্যাত হয়ে যায় । এমন ভাল মানুষ ডাক্তারের ছেলে কিভাবে এমন ফিচলা বেয়াদব হল সেটা একটা ভাববার বিষয় । তবে আপাতত সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমি চেয়ারে দুপ করে বসে পড়লাম । মুখ গোমড়া করে সরু নেইমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলাম , যেখানে লেখা – ডাঃ ফারাবী আহসান ( হ্যান ত্যান ডিগ্রি ) ।
” এবার বল দেখি কি হয়েছে ?” আমি খ্যাসখ্যাসে গলায় বললাম ,” সর্দি জ্বর , গলাব্যাথা , দম নিতে পারিনা ।” আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বলল , ” তোমাকে ওষুধ হিসেবে আইসক্রিম দিয়ে দেই ?” মেজাজ বয়েলিং পয়েন্টে উঠে গেল , কিন্তু গলা ব্যথার কারনে কিছু বললাম না । ” ইরা ,তোমাকে মাঝেমাঝেই আইসক্রিম হাতে রিকশায় দেখা যায় , তাই বললাম । এখন বরং তুমি একটু সোফায় গিয়ে বস ,আর চারটা রোগী আছে , দেখে নেই । তুমি পুরানা রোগি তো , তোমার সাথে একটু আলাপ করব , ঠিক আছে ?” বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম , এতক্ষন ধরে বসে আছি , আরো বসে থাকতে বলে ? কত বড় সাহস , আরে আমার সময় কি আলুখেতে ধরে নাকি ? তারপরেও আমি হতাশার সাথে আবিষ্কার করলাম , রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আমি ঠিক সোফাতে গিয়েই বসেছি । ” কফি আনাই ?” আমি কিছুই বললাম না । বেয়াদব ছেলেদের সব কথার উত্তর দিতে নেই , তবে মিনিট পাঁচেক পরে আমাকে ঠিক গরম কফি হাতেই বসে থাকতে দেখা গেল ।
পাঠক কি ভাবছেন ? গরবল কিনা ? জি, ঠিকই ভাবছেন , এভরিথিং ইজ গরবল ।
গরবল টা যখন শুরু হয়েছিল সেটা অনেক অনেক আগের কথা । আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়তাম । আজকের ডাঃ ফারাবী তখন মেডিকেল প্রথম বর্ষের ছাত্র । এলাকায় মেয়েদের কাছে তিনি সেই লেভেলের হিট । বিশেষ করে কলেজে পড়ুয়া আপুদের কাছে তো তিনি তখন চোখের মনি । চোখে চশমা লাগিয়ে, হাতে বই, কাঁধে ব্যাগ আর গায়ে সাদা এপ্রন জড়িয়ে তিনি যখন বের হতেন আপুদের চেহারা তখন দেখার মতন হত । আপুরা ফারাবী ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত আর আমি আপুদের হা করা চেহারার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে স্কুলে যেতাম । আপুরা বায়োলজি বইয়ের ইম্পরট্যান্ট কোশ্চেন দাগাতে প্রায়ই ফারাবী ভাইয়ের শরনাপন্ন হত বলে আমি শুনতাম । এমন কি আমার বান্ধুবিরাও এই ছুতায় তার সাথে কথা বলত । আমাকে নিয়ে যাবার ও অনেক চেষ্টা করা হয়েছে , কিন্তু কথা হল বায়লোজি জিনিসটা আমার কোন কালেও পছন্দ ছিল না । ইম্পরট্যান্ট প্রশ্ন দাগিয়েও আমার লাভ হবেনা সেটা আমি জানতাম এবং যেহেতু সেই ” সো কল্ড ” ফারাবী ভাইয়ের প্রতি আমার কোন দুর্বলতা নেই তাই আমি কখনই আমার বান্ধুবিদের সাথে যাই নি । ফারাবী ভাইদের বিখ্যাত বাসাটা পর্যন্ত আমি সনাক্ত করিনি , শুধু তাদের গলিটা চিনতাম । ফারাবী ভাইয়ের প্রতি আমার এই অনাকাংখার কারন আমার বান্ধুবিরা প্রায়ই বুঝার চেষ্টা করত । আর এই ঝাউলা চুলের ঘুম ঘুম চেহারার আতেল ছেলের দিকে তাকিয়ে এনাদের এত প্রেম কোথা থেকে উৎপত্তি হত, আমি সেটা বুঝার চেষ্টা করতাম ।
কথা হল , আমি যেটা বুঝার চেষ্টা করতাম, দুই বছর পরে হঠাত করেই সেটা একদিন আমি বুঝে গেলাম ।
এস এস সি এক্সাম দিবার পর আমার তখন বিশাল অবসর । এত এত প্ল্যান , এটা করব ,ওটা করব , এখানে যাবো, ওখানে যাবো । কিন্তু ” হিট ” এরোসলের বিজ্ঞাপনের মতই আমার সব প্ল্যান ভেস্তে দিল একটা মশা , এক ডজন মশাও হতে পারে । বেশ কয়েকটা মশা না কামড়ালে আমার ওরকম বিচ্ছিরি জ্বর হবার কথা নয় । আমি আক্রান্ত হলাম ডেঙ্গুজ্বরে । অনেক বেশি দুর্বল হয়েছিলাম আমি , আমার ট্রিটমেন্টের জন্যে আব্বু ফারাবী ভাইয়ের বাবাকে বাসায় নিয়ে এসেছিল । চারদিন স্যালাইন দিতে হয়েছিল , আর সেটাই হল কাল । প্রথম দিন স্যালাইন দেবার সময় আমি দেখলাম , সুপারহিট ফারাবী ভাইয়া আমাদের বাসায় এসেছে তার বাবার কথামত । আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি থতমত খেয়ে যখন তার দিকে তাকিয়েছিলাম , সে ফিচলা হাসি দিয়ে বলেছিল , ” কি ইরা ? এইটুক একটা মশাই কাত করে দিল ?” এরপর স্যালাইন লাগাতে লাগাতে একটা প্রান খোলা হাসি । এখন আমি ভাবি , সেদিন সেই হাসি দেখে আমি তো আমি , যেই মেয়ে পাগল হতনা তার হার্ট নির্ঘাত রেইনফোরসড সিমেন্ট দিয়ে বানানো বলে ধরে নেওয়া যেত । অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ঐ একটা হাসি দেখেই আমার জ্বর অর্ধেক ভাল হয়ে গেল । আমি দুর্বল গলাতেই জবাব দিলাম , ” ওইটুক মশা আপনাকে কামড় দিলে আপনি শুধু কাত না , উপুড় হয়ে যেতেন ।” আবার সেই হাসি । মানুষ এত সুন্দর করে এরকম বিধ্বংসী হাসি দেয় কেমন করে ? মনে হল, নাহ আর বাচবনা বোধ হয় । আতেল একটা ছেলের হাসি দেখে তাৎক্ষনিক ভাবে পাগল হয়ে গেছি , ভাবা যায়না , কি বাজে অবস্থা !
সিনেমায় দেখতাম, ছেলেরা মেয়েদের হাসি দেখে এভাবে পাগল হয় , কিন্তু একটা মেয়ে হয়ে আমি এমন একটা ফিচলা আতেলের হাসি দেখে এভাবে পাগল হয়ে গেলাম , এইটা কি একটা কথা হল ? এইটা কেন হল ? কিভাবে হল ? এবং অতঃপর কি হবে ? কোনকিছুই আমার জানা ছিল না । আমার শুধু জানা ছিল , আমি শেষ । আমার নীরব পাগলামিতে কেটে গেল অনেকদিন । আমি এসে পড়লাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে আর তিনি এখন পুরোদস্তুর ডাক্তার সাহেব । ফারাবী ভাই পাঁচ মাস হল এই হসপিটালে বসে । এই পাঁচমাসে আমি লক্ষ্য করেছি অসুখবিসুখের সময় গুলি আমার বড়ই মধুর হয়ে যায় , এমনকি রোদের মাঝে আইসক্রিম খেয়ে জ্বর বাঁধাবার জন্যে আমি কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে যাই । বাসায় কারো ডাক্তার দেখাবার দরকার হলে টার্ম ফাইনালের আগের রাতেও আমি ধিংধিং করে তার সাথে হসপিটালে চলে যাই । এভাবে কেউ কারো প্রেমে পড়ে ? ” বাহ বাহ তুমি তো কফিমগ নিয়ে ভাল মডেলিং কর , কিন্তু আমি তো মডেলিং করার জন্যে এটা দিই নাই , তোমার গলার জন্যে দিয়েছি ” ফারাবী ভাইয়ার কথায় বাস্তবে ফিরে আসলাম , বললাম ,” আমাকে আর কতক্ষণ বসতে হবে ? ” ” এখানে এসে বস ” , সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিল । আমি সোফা ছেড়ে চেয়ারে আসতেই বলল ,” কি গরম দেখেছ ? একটা বৃষ্টি হওয়া উচিত কি বল ? কতদিন হয়না ।” ” কে বলেছে আপনাকে ? গত পরশু মাঝরাতে অসাধারণ একটা বৃষ্টি হয়েছে ” ” তাই নাকি ? আমি তো টের পেলাম না , তুমি মনে হয় স্বপ্নে দেখেছ ।” ” জি না , আমি কাটায় কাটায় সোয়া এক ঘন্টা ভিজলাম , আর আপনি বলেন আমি স্বপ্নে দেখেছি ?” বলতে বলতেই দেখলাম , ফারাবী ভাইয়া চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । এইরে ! আমি কি করলাম ,বৃষ্টিতে ভিজার কথা বলে দিলাম ? আমার জ্বর আর গলা ব্যাথার এটাই যে আসল কারন ! আবার তার পুরানো ট্রিক্সে আমি পা রাখলাম , জিভে একটা কামড় দিয়ে মাথা নিচু করলাম । ” তুমি এসব কেন কর ? হাসপাতালে আসতে খুব মজা ? হাসপাতালে চিকেন ফ্রাই পাওয়া যায় ?” আমি ফোস করে নিঃশ্বাস ফেললাম । আরে মাথামোটা ডাক্তার , হাসপাতালে ইরা ‘কি’ পায় আর ‘ কাকে’ পায় সেইটা তুই জীবনেও বুঝবিনা , তাই এখন বকবক না করে চুপ থাক । ” কি কথা বলনা কেন ?” ফারাবী ভাই একই ভাবে তাকিয়ে আছে । আমি তার মত দৃষ্টি দিয়েই বললাম , ” আপনি জানেন না আমার গলা ব্যথা ? আমার কথা বলতে কষ্ট হয় ?” ” সেইটা তো ডাক্তারের দোষ না , তুমি মাঝরাতে বৃষ্টিতে ভিজবা আর সর্দি কাশির সোহাগ সহ্য করবানা , তাই কি হয় ?” আমি বিরক্ত হয়ে চোখ নামালাম , এই মাথামোটার সাথে কথা বলার কোন মানে হয়না ।
প্রেস্ক্রিপশান নিয়ে উঠতে যাবো , তখন মহামান্য বললেন ,” আচ্ছা তুমি প্রাইভেট পড়াও ?” মনে মনে বললাম ,তোমারে পড়াব , রোমান্টিজম ,পড়বা ? এমনিতে মাথা নেড়ে বললাম ,” পড়াই না ।” ” পড়াবা একজনরে ? একটা মেয়ে ? ক্লাস এইটের ।” আমি দাঁত বের করে বললাম ,” আপনার বোন নাকি ?তাইলে পড়াবো ।” সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল ,” আমার বোন সেইটা নিশ্চিত হলে কেমন করে ? গার্লফ্রেন্ডের বোন ও তো হতে পারে ?তাইলে পড়াবা না ?” আমি লম্বা একটা শ্বাস নিতে গেলাম , কাশি চলে আসল । বেশ কিছুক্ষন পর কাশি থামলে তাকে বললাম ,” আপনার গার্ল ফ্রেন্ডের বোন কে আমি পড়াব কেন ?” ফারাবী ভাই মুচকি হেসে বলল ,” কেন ? ইঞ্জিনিয়ারিং এর পোলাপাইনরা কারো গার্ল ফ্রেন্ডের আত্মীয়স্বজন পড়ায় না নাকি ?” ” আমি দূরে গিয়ে পড়াব না , বাসায় কেউ রাজি হবেনা ।” ফারাবী ভাই একটা কাগজে কিছু একটা লিখে আমার দিকে বাড়িয়ে বলল ,” এই ঠিকানা , আমাদের এরিয়াতেই । পড়াবা না ?” এই ছেলের মত খারাপ ছেলে দুনিয়াতে দুইটা নাই । প্রেম করে , গার্ল ফ্রেন্ড আছে , সেইটা আমাকে শুনাল আবার শালী কে পড়ানোর অফার ও দিল , কি বাজে অবস্থা – ভাবা যায়না ! আমি আড়চোখে তার দিকে তাকালাম , মাথা জ্বলে যাচ্ছিল আমার , তার চোখের চশমাটা গুঁড়া করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল । কিন্তু সে মুখ করুন করে বলল ,” প্লিইজ ?” এরপরেও কি না বলা যায় ? এক মুহূর্ত পর কি যেন ভেবে বলে ফেললাম ,” ঠিক আছে ।” সে তার প্রাণখোলা হাসিতে আমাকে ভাসাতে ভাসাতে বলল ,” কাল বিকেলে গিয়ে তোমার ছাত্রীর সাথে দেখা করে এসো । আমি ওকে বলে দিব ।” ” ওকে ” বলে বের হয়ে আসলাম । ছেমড়া তোর গার্ল ফ্রেন্ডরে ইরা দেখে নেবে ! বের হওয়ার সময় একজন কম্পাউন্ডার আর দুইজন নার্সের সাথে দেখা হল । প্রত্যেকেই ” ম্যাম ভাল থাকবেন” ” শরীরের খেয়াল রাখবেন ” ইত্যাদি উপদেশ দিল । আরে আমি একটু আগে ছ্যাকা খেয়ে সুস্থ হয়ে গেছি । আমার গা থেকে কি ছ্যাকা খাওয়া পোড়া গন্ধ আসছে নাকি যে আমাকে ” খেয়াল রাখবেন ” ” ভাল থাকবেন ” এসব শুনাতে হবে ?
আমি দিব্যি আছি । ফারাবী ভাই আমাকে ছ্যাকা দিবে আমি সেটা জানি । কথা হল , আমি ছ্যাকা খেতে পারি ,তাই বলে ব্যাকা হব নাকি ?
২ . যে গলির সামনে দাঁড়িয়ে আছি , সেই গলিতেই ফারাবী ভাইয়াদের বাসা , কোন টা আমি জানিনা , তবে এই গলিতেই । আমি চাইলেই আমার বান্ধুবিদের কাছ থেকে জানতে পারতাম ফারাবী ভাই কোন বাসায় থাকে । কিন্তু আমি চাইনি , কারন আমি চাইনি কেউ জানুক আমি তাকে পাগলামির এবসলিউট পয়েন্টের কাছাকাছি লেভেলের পছন্দ করি । বড় আপুরা তার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেলেছেন , কয়েকজনের বিয়েও হয়ে গেছে , আমার বান্ধুবিদের ও একই দশা । বাকি ছিলাম আমি , সবার অগোচরে , হারাধনের এই শেষজন ও গতকাল ছ্যাকা খেয়েছে । ইহা ব্যক্তি যে নিজের বাসার আশেপাশের মেয়ের সাথে প্রেম করবে সেটা কে জানত ? বেটা মাথামোটা , প্রেম যে কর , ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে আমার কাছেই তুমি আসবা , এই আমি বলে দিলাম । তোমার সাথে কোন চিজ প্রেম করে সেইটা দেখতেই আমি পড়াতে আসছি ।
মেয়েটার নাম তিহা । দুই ঝুটি করা বাবু বাবু চেহারার মেয়েটাকে প্রথমেই আমার ভাল লেগে গেল । তিহাও আমাকে ” আপু আপু ” করে অস্থির করে দিল । কিন্তু এভাবে ভাল লাগলে তো হবেনা , এরা হল গিয়ে আমার ভিলেন , ভিলেন দের ভাল লাগলে কি হবে ? বাসায় এদিকে ওদিকে যেদিকেই তাকাই সেদিকেই তিহার আম্মাকেই দেখি । মোটাসোটা আন্টি রা যে কিউট টাইপের ভাল সেটা আরেকবার প্রমান হয়ে গেল । টিচার হিসেবে বাসায় এসেছি , পড়ানোর স্কিল সম্পর্কে আন্টি আমাকে কিছুই জিজ্ঞেশ করলেন না । বরং গরম গরম সিঙ্গারা সামনে এনে বললেন ,” এই মেয়ে , জলদি একটা খেয়ে বল তো কেমন হয়েছে । ভাল হলে আরও কয়টা বানাব ।” সিঙ্গারা টিঙ্গারা খেয়ে আমি যে ই বলতে যাচ্ছিলাম ,” আন্টি আমি তো তিহা কে পড়ানোর জন্য আসছিলাম , তা …… ” আন্টি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন ,” ফারাবী আমাকে বলেছে । তোমার নাম তো ইরা , তাইনা ?”
চিন্তায় পড়ে গেলাম । মা – মেয়ে যেরকম ভয়ংকর লেভেলের ভাল , তাতে আসল ভিলেন ও যে এদের কাছাকাছিই হবে , সেটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম । কিন্তু তাকে তো দেখছিনা । তিহার সাথেই কথা বলছিলাম । চলে আসব তার কিছুক্ষন আগে তিহা বলল , ” জানেন ইরাপু, ফারাবী ভাইয়া না একটা মিথ্যুক ।” ” তাই ? কেন কেন ?” ” আমাকে বলেছে , আপনি নাকি ভয়ানক রাগী । কত বড় মিথ্যুক , দেখেন ।” আমি দম আটকে বললাম ,” তোমার আপু মনে হয় অনেক শান্তশিষ্ট , তাইনা ?” ” আপু ?” ” হুম , কোথায় তোমার আপু ? দেখলাম না তো ।” ” আমার আপুর কথা জানলেন কিভাবে ?” ” তোমার ফারাবী ভাই ……” তিহা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল ,” বুঝছি ইরাপু ।” ” মানে ?” ” ওনার কথা আর বইলেন না । মিথ্যা কথা বলতে বলতে ঝানু হয়ে গেছে । আমার কোন আপুটাপু নাই ।” হা হয়ে যাওয়া কাকে বলে , আমার সামনে একটা আয়না থাকলেই আমি প্রাক্টিকালি দেখে ফেলতাম । ফারাবী ভাইকে ব্রাশফায়ার করার ইচ্ছেটাকে অনেক কষ্টে আটকে কোনমতে বললাম , ” তাহলে কয় ভাইবোন তোমরা ?” ” দুই ভাইবোন । আমি আর ভাইয়া ।ফারাবী ভাইয়া ।” আমি উঠে দাঁড়ালাম । আমার হাঁসফাঁশ অবস্থা হয়ে গেছে । আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাওয়াটাকেই ভাল সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করলাম । কারন এই বাসায় আরও দুই চার মিনিট থাকলে আরও কি কি যে শুনতে হবে সেটা ভেবেই আমি ভীত এবং একই সাথে আতংকিত হয়ে গেলাম !
গলির মাথায় যাবার সময় দেখলাম ফারাবী ভাই পকেটে হাত ঢুকিয়ে সেই রকম ভাব নিয়ে হেটে আসছে । কথা বলব না , কিছুতেই বলব না , হয়ত বলতাম ও না , কিন্তু কেউ ডাকলে কি কথা না বলে থাকা যায় ? ফারাবী ভাই আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল , ” তিহার সাথে কথা হয়েছে তোমার ?” ” হয়েছে ।” ” পড়াচ্ছ তাহলে ?” আমি নাক কান দিয়ে ধোঁয়া বের করতে করতে বললাম ,” আপনি এরকম কেন ? তিহা নাকি আপনার গার্ল ফ্রেন্ডের বোন ? আমাকে এভাবে বোকা বানালেন কেন ?” ফারাবী ভাই গোল গোল চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল । ” আচ্ছা আমি কিন্তু একবারও বলি নি আসলেই তুমি আমার গার্ল ফ্রেন্ডের বোনকে …… আচ্ছা ঠিক আছে ধরলাম আমি বলেছি , কিন্তু দেখ আমার বোন মানে আমার তো গার্ল ফ্রেন্ডের ননদ , ননদ আর বোন কি আলাদা ? ” কলার ধরে ঝাঁকাতে ইচ্ছে করছিল খুব । কিন্তু এই ছেলের সাথে কথা বলে আমি আগাতে পারবোনা , তাই বাই বলে চলে আসাটাকেই ফরজ মনে করলাম ।
আর আই পি প্রেম পিরিতি ।
৩ . পিথাগোরাসের বিশাল উপপাদ্যটা বুঝাতে বুঝাতে আমি আবিষ্কার করলাম , তিহার মনটা আজকে বেশ খারাপ । সে পড়ায় মন দিতে পারছে না । খুবই স্বাভাবিক , পড়ায় প্রতিদিন মন বসবে এমন কোন কথা নেই । মনের ও মুড বলে একটা ব্যাপার আছে । আমি পড়া থামিয়ে গালে হাত দিয়ে বললাম , ” উপপাদ্য টা ভীষণ পচা , তাইনা তিহা ? একদম বোরিং ।” তিহা ফিক করে একটু হাসল । ও আমার কাছে কখনো কিছু লুকায় না । এবারো লুকোল না , মলিন গলায় বলল , ” আপু , মন খারাপ থাকলে ভাল পড়াগুলিও বোরিং হয়ে যায় ।” কথা সত্য । কেন মন খারাপ সেটা জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতেই ও বলল , ” আপু জানেন , ভাইয়া না মাদ্রাজ যাচ্ছে আগামী মাসে , কি ডিগ্রি ফিগ্রি নিবে , আমি তো বুঝিনা । ভাইয়ার জন্যে অনেক খারাপ লাগবে আমার । ঝগড়া করলেও তো আমারই ভাইয়া ।তাই পড়াতেও মন দিতে পারছি না । ” কি বলে তিহা ? ফারাবী ভাই মাদ্রাজ কেন যাবে ? এত ডিগ্রি দরকার কেন তার ? আমার চোখ দুটো পিথাগরাসের উপপাদ্যের মাঝে অযথাই এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে লাগল । এতক্ষন শুধু ছাত্রীর মন খারাপ ছিল , তাও পড়া যা একটু আগাচ্ছিল , কিন্তু যখন আমার ও ভয়াবহ মন খারাপ হতে লাগল তখন আর পড়া কিভাবে আগায় ? ” তোমার মন যেহেতু খারাপ আজ বরং একটু রিল্যাক্স থাকো ,আমি আসি ” বলে আমি পালিয়ে গেলাম । কিন্তু নিজের কাছ থেকে নিজে তো পালানো যায় না ।
আমি জানতাম আমি ফারাবী ভাই কে পাব না , একদিন না একদিন আমাকে অনেক কিছু এই চোখেই দেখতে হবে । কিন্তু আমি তো একদিন একদিন করে বেঁচে থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছি , তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনই বেশিদূর ভাবতে পারতাম না । হাসতে হাসতে দিন কাটিয়ে কখন যে তাকে হারাবার দিন এগিয়ে এল সেটা টের ই পেলাম না । এখন সে চোখের আড়াল হবে , দুদিন বাদেই অন্য কারো সম্পদ হবে । আর আমি ফারাবী ভাইকে না পাওয়ার লিস্টে যুক্ত হব সবার চোখের আড়ালে । আমি কিন্তু অল্পতেই কেঁদে চোখ লাল করার মেয়ে , কিন্তু আজ আমি একটুও কাঁদলাম না । আজ আমি ভীষণ পরিনত ।
ছোটবেলা থেকেই রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনা আমি । খুব রাগ হলে চিৎকার করি , কিছুক্ষন পর যখন বুঝতে পারি যে চিৎকার করা ঠিক হয়নি তখন শব্দ না করে কাঁদি । আমার এতদিনের লুকোচুরি ভালবাসাটা হুট করে ভেঙ্গে যাওয়ায় যে কষ্ট আমার হচ্ছিল তা কিভাবে কিভাবে যেন রাগে রুপান্তরিত হয়ে গেল । সেই রাগে আমি না পারলাম চিৎকার করতে , না পারলাম কাঁদতে । ফলস্বরূপ পরদিন প্রচন্ড মাথাব্যাথায় ঘুম থেকে উঠলাম চোখ মুখ লাল করে । মাথাব্যাথায় রাতে এসে গেল সেই লেভেলের জ্বর । আমি প্যারাসিটামল নাপা ইত্যাদি ইত্যাদি সেবন করতে লাগলাম , এতদিনের অভিজ্ঞতা বলে তো একটা কথা আছে । পরের দিন সকালে কোন মাথাব্যাথা নেই , জ্বর নেই , কিন্তু এসিডিটির যন্ত্রণায় সোজা হতে পারলাম না । ভাবতে পারছিলাম না , কি পরিমান রাগটাই না করেছিলাম , মাথাব্যথা আর জ্বর দিয়ে বের হয়ে কুলাতে পারল না , এখন আবার এসিডিটি শুরু হয়েছে ! এরই মাঝে ডজনখানেক বার করে আম্মু আব্বু বলেছে ডাক্তারের কাছে যেতে , আমি ঘাড় বাকা করে বলেছি ,” এমনেই সেরে যাবে ।”
বিকেল বেলায় যখন ১০০ ডিগ্রি জ্বর , হালকা মাথাব্যথা আর এসিডিটি তিনটাই হাজির হল , আম্মু তখন ভয় পেয়ে বলল ,” রেডি হ ।” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম ,” মরার জন্য ?” ” থাবড়ায়া কানের পর্দাটা ফাটায় দিবো ।” ” আচ্ছা দিও ।” ” উঠতেছিস না কেন ? ডাক্তারের কাছে যাব চল ।” ঘ্যানর ঘ্যানর চলতেই লাগল । শেষমেশ উঠলাম , ভাবলাম লাস্ট বারের মত তাকে দেখে আসিগে । আজকের পর আর কক্ষনো তার কথা ভাববনা । আম্মু কে বললাম , আমি একাই যেতে পারব ।
একা একা যেটা শুরু করেছিলাম , আজ কে একা একাই তার শেষ দৃশ্য টা দেখে আসি ।
৪. ফারাবী ভাই গালে হাত দিয়ে চিন্তিত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল , ” এই অবস্থা হলে হবে ?” তার কথার টাইপ শুনলে মেজাজ তো আমার এমনি খারাপ ই হয় । অন্যদিন যদিও আড়াল করার চেষ্টা করি , আজ আর করলাম না , বললাম , ” সেটা দিয়ে আপনার কি ? ওষুধ লিখে দেন । চলে যাই ।” ” আচ্ছা ” , প্যাড হাতে নিতে নিতে বলল ,” মাদ্রাজ যাচ্ছি জানো তো ? ” ” নাহ , এলাকায় এই নিয়ে কোন ব্যানার দেখিনি ।” ” ও আচ্ছা তিহা বলেনি তোমাকে তাহলে । আমি মাদ্রাজ যাচ্ছি এই মাসের শেষে । আম্মা তো খুব করে ধরেছে , বিয়ে করে যেতে হবে । তা না হলে নাকি আমি একবার উড়াল দিলে আর ফিরে আসব না ।” আমি চুপ করে থাকলাম । মনে মনে বললাম ,” ছ্যামড়া তোর আসার জন্যে কে মরতেছে ?” হুম আমি ই তো মরতেছি । ” বিয়ে করে দূরে যাওয়ার ইচ্ছা আমার নাই , বুঝলা ইরা ? এঙ্গেজ করে রাখা যায় । তাতে রাজি হয়েছি । ” এবারো কিছু বললাম না । তবে মনে হতে লাগল , এর কাছে কি আমি সুস্থ হতে আসছি নাকি জলদি মরে যেতে আসছি ? এই ছেলে আমাকে এসব শুনাচ্ছে কেন ? ” দেশে আসার পরে জাঁকজমক অনুষ্ঠান করে বিয়ে করব । বিয়েতে তোমাকে একটা রোল দেওয়ার কথাও আমি ভেবে রেখেছি ।” আমি সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালাম ,” তাই , না ?” আমার তাকানোর ভঙ্গীতে ডাক্তার সাহেব ভড়কে গেলেন সেটা আমি বুঝতে পারলাম । কোনরকমে বলল , ” ইরা তোমার কি হয়েছে ? কি সমস্যা ? অসুস্থ লাগছে ?” নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে বলতে লাগলাম , ” এত কথা বলেন কেন আপনি ? আমার সমস্যা জানতে চান ? আমার সমস্যা কি সেইটা আপনি বুঝেন না ? মেডিকেল কলেজ থেকে কি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন ?মানুষের সাইকোলজি ধরতে পারেন না ? আমার কি সমস্যা সেটা কোন দিন বুঝবেন না আপনি , তাই প্লিজ জিজ্ঞেশ করবেন না । দয়া করে কোন কথা না বলে জ্বর আর এসিডিটির জন্য প্রেস্ক্রিপশান লিখেন ।” এতগুলি কথা এক নাগাড়ে বলে দেখি , ফারাবী ভাই তখনও নিঃস্পৃহ চোখে তাকিয়ে আছে । আমি কেন এসব বললাম জানিনা , কেন জানি প্রচন্ড কান্না পেতে লাগল । কান্না চেপে রাখতে গিয়েও পারলাম না , চোখের সীমানা ছাড়িয়ে একুয়াস হিউমারদের স্বাধীন আনাগোনা শুরু হয়ে গেল । তাড়াতাড়ি চোখ মুছে তাকিয়ে দেখি সে কলমের ক্যাপ খুলছে , প্রেস্ক্রিপশান লিখবে । লেখা হয়ে গেলে সে কাগজটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । আমি প্রেস্ক্রিপশানটার দিকে একবার তাকালাম ।
তাকিয়ে থাকলাম এবং তাকিয়েই রইলাম ।
” ইরা , তোমার অসুখের একমাত্র চিকিৎসা টা হল , রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠবার পর এবং রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ডা. ফারাবী আহসানের হাতে দুইটা করে কান মলা খাওয়া । এই ওষুধ লাইফটাইম চালাতে হবে । অন্যথায় রোগির জীবন মরন সমস্যা হবে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ডাক্তার সাহেবেরও জীবনের আশংকা ঘটবে । ”
প্রেস্ক্রিপশানের দিকে আমাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে আমার চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল , ” কি হল ? ” আমি বোকার মত তাকিয়ে বললাম , ” আপনার লেখা বুঝতে পারছি না ।” ফারাবী ভাই হতাশ হয়ে চুলে আঙ্গুল চালিয়ে বলল ,” জীবনে বুড়া বয়সে একটা লাভ লেটার লিখলাম , তাও লেখাটা বোধগম্য হল না । এই দুঃখ কোথায় রাখি ? তবে একান্তই না বুঝলে কি আর করা , ওষুধের দোকানদারকে দেখাইও ।” আমি ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললাম , ” আমি লেখাটা কোনরকমে পড়তে পেরেছি । কথা হল , এসব ফাজলামির মানে কি ? আমার সাথে সেই কবে থেকে আপনি কেবল ফাজলামিই করছেন ,এমনটা কেন করেন ? আমি একটা মানুষ ,আমার এত সহ্য হয়না । ” সে কয়েক মুহূর্ত একদম চুপ । আমি বললাম ,” কি ? কথা বলেন না কেন ?” ” কি বলব আমি ? এই ক্লিনিকের প্রতিটা স্টাফ , কম্পাউন্ডার , নার্স এমনকি দারোয়ান চাচা পর্যন্ত বুঝে যে আমি তোমার উপর ড্যাম খেয়ে আছি , আর তুমি বুঝলা না ? কি জন্য বুঝলা না , সেটা তো আমি বুঝলাম না । ”
আচ্ছা আসলেই কি আমার বুঝা উচিত ছিল ? আমার সাথে সে অনেক আজাইরা আলাপ করত , এগুলো কি ভালবাসত বলেই করত ? আসলেই মনে হয় আমার বুদ্ধি বয়সের সাথে ব্যাস্তানুপাতে বেড়ে যাচ্ছে ! আমি চোখ ছোট ছোট করে বললাম ,” আমাকে না বিয়েতে কি একটা রোল দিবেন ?” ” কেন ? কনের রোল ? কনে থাকতে হবে না ?”
৫. ফারাবী ভাই কে আমি এখন শুধু ফারাবী বলে ডাকি , যদিও সে আমার থেকে বয়সে ভালই বড় । কিন্তু কি আর করব , বাগদানের পরে তো ” ভাই” বলতে গিয়ে কানমলা খেলাম , সেই রিস্ক কি আবার নেয়া যায় ? যাই হোক , আমি এখন ফারাবীর সাথে বসে আছি । আমাদের মাঝে দূরত্বটাও আপেক্ষিক , হয়ত খুব কাছে আবার হয়ত অনেক দূরে । কারন মাঝখানে দেয়াল হয়ে আছে ল্যাপ্টপের স্বচ্ছ স্ক্রিন টা । ডাক্তার সাহেব বাগদান করেই মাদ্রাজে দৌড় দিয়েছেন কিনা তাই !
” ম্যাডাম খুব খেপে আছেন । কি হয়েছে ?” ” তোমার মস্তিষ্ক হয়েছে ।” ” কেন ? মাদ্রাজ চলে আসছি বলে আবার মেজাজ গরম? ” আমি দাঁত কিড়মিড় করে বললাম , ” একবার দেশে আসো , তোমার গায়ে আমি কালাসাবান ছুড়ে মারবো । এপ্রন থাকা অবস্থায় ই ।” ফারাবী করুন মুখে বলল ,” ঠিক আছে , আমি ঐ এপ্রন পরেই বাইরে যাব । সবাই বুঝুক জীবিত এবং বিবাহিতদের মধ্যে পার্থক্য ।” ” চুপপ ! ”
ফারাবী চুপ হয়ে মুচকি হাসতে লাগত । আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম , কালাসাবান আমি ছুড়ে মারবই । সাইজ করা দরকার ওকে । এপ্রন নোংরা হবে হোক । আমি যেহেতু নোংরা করব , আমিই পরিস্কার করব , সমস্যা না ।

উত্তরাধিকার

রেজওয়ানুর রজমান আবির

উত্তুরে শীতের বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে চাক্য। হাতে ধরা ধনুকটা ঠিক রাখতে পারছেনা। এতো করে মোষের তেল মালিশ করে এসেছে কিন্তু শীতের প্রকোপটা ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। দাঁতে দাঁত বাড়ি খাবার ঠক ঠক শব্দ শুনল সে পাশ থেকে। নুংগা পাশে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছে। এতো কাঁপছে মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যে হাঁটু ভেঙ্গে পড়েই যাবে। চাক্য বিরক্ত হয়ে পাথরের ছোরাটা নুংগার গলায় চেপে ধরল।
‘আরেকটা শব্দ করবি তো গলা নামিয়ে দিবো’।
পরিস্থিতি বুঝে নুংগাও নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করল।
ওরা ৫ জন। ঝোপের আড়ালে একটা ডোবার পাশে ধনুক হাতে ধনুকের ছিলার মতোই স্থির হয়ে আছে। স্থির নিবদ্ধ চোখ সামনের কিছু কুটিরের উপর। আলাদা গোত্র ঐ কুটির বাসীর, চাক্যদের গঞ্জে মেয়ে মানুষের সংখ্যা একদম কমে গেছে, বংশধর বাড়ানোর জন্য তাই আশেপাশের গোত্র থেকে এখন মেয়েদের কে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। এই গোত্র টাতে মাত্র কয়েক ঘর কুটির আর সবল পুরুষ মানুষগুলো অস্ত্রবিদ্যা তেমন জানেনা। তাই ৫ জন মিলেই আক্রমণ করবে বলে ঠিক করেছে। শীতের আকাশ হলেও এই ভোররাতে তা বেশ পরিষ্কার। ঝিঝি গুলোও যেন ক্লান্ত হয়ে ডাকা ছেঁড়ে দিয়েছে। চাক্য রক্তপাত চায়না। সে চুরি করে কোন মেয়েকে তুলে নিয়ে যেতে পারলেই খুশি।
তবে চাক্যর মন মতো কিছু হলোনা। নিজ গোত্রের মেয়েদের এমন বিপদ আসতে পারে ভেবে ওরা তৈরি ই ছিল। ধনুকের ব্যবহার অবশ্য জানেনা বলে ওদের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি ওরা পাথর আর বরশা মেরে। ৫ জন ৫ টা মেয়েকে ঘাড়ে তুলে রওনা দিল নিজেদের গঞ্জের দিকে। চিৎকার আর হাত পা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ করার জন্য মুখ আর পা পাকানো লতা দিয়ে কষে বেঁধে নিতে ভুললোনা।
সকাল হয়ে গেছে। শিশির ভেজা সিক্ত পথ। শালবনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। গাছ গুলো সব ন্যাড়া হয়ে আছে। লাল মাটিতে রুক্ষ শুকনো পাতা শিশিরের পানিতে চপচপে হয়ে শব্দ করছে ওদের পায়ের নিচে পড়ে। আর কিছু দূর এগুতেই গাং, ব্রহ্মের আশীর্বাদে এই নদের জলধারা ওদের জনপদের উপর দিয়ে গেছে বলে ওরা একে বলে ব্রহ্মপুতের গাং। ভীষণ তীব্র তার স্রোত, এই শীতকালেও অজস্র জলরাশি নিয়ে সে বয়ে চলছে দক্ষিণে, কোন আকাঙ্ক্ষায় কোন টানে তা ওদের কেউ জানে না। এমনকি ওদের গঞ্জে সবচেয়ে বেশি জানে যে বুড়ো সেও জানে না এর শেষ কোথায়। অনেক সাহসী কেউ কেউ কলাগাছের ডোঙ্গায় চেপে দক্ষিণে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওদের ভাগ্যে এরপর কি হয়েছে তা কেউ বলতে পারেনা। চাক্য ওর কাঁধের মেয়েটাকে ওর ডোঙ্গার উপর এনে ফেলল। তখন লড়াইয়ের জন্য চেহারা ভালো মতো দেখা হয়নি। কপালের উপর কালো চুল ছড়িয়ে পরেছে মেয়েটার। গায়ের রঙ চাপা আর দেহ সৌষ্ঠব অতুলনীয়। মেয়েটাকে কেন যেন সাধারণ মেয়েদের মতো মনে হয়না, স্বভাবও চড়া ওর; তুলে আনার সময় টের পেয়েছে চাক্য। অন্য মেয়েরা আগত ভবিষ্যৎ বুঝতে পেড়ে যখন কেঁদেছে আর এর হাত তখন চাক্যর পিঠে অনবরত আঘাত করে গেছে। শেষে হাত দুটোও বাধতে হয়েছে ওর।
ডোঙ্গা দিয়ে গাং পার হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেল। এখনো মুখটা ভালো করে দেখা হল না মেয়েটার। তাড়াহুড়ো নেই ভাবল চাক্য। ওকে ভালমতো দেখার জন্য অনেক সময় পড়ে আছে। গঞ্জে গিয়ে আগে খেতে হবে ওকে, তারপর ঘুম। মেয়েটাকে নিজের কুটিরে নিয়ে হাত পা খুলে দিল সে, ভেবেছিল এখানে আর ঐ মেয়ে কি করবে? কিন্তু হাত খুলার সাথে সাথেই চাক্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েটা। চাক্য প্রথমে চমকে উঠলেও সাথে সাথেই সামলে নিলো। আবার হাত বেঁধে দিল মেয়েটার। বেড়ার সাথে বেঁধে রাখল এবার। মেয়েটা এমনভাবে চুলগুলো সামনে এনে রাখে যে ওর চেহারা এবারো দেখা হল না। ‘থাক পড়ে দেখব’ ভেবে বাইরে খেতে চলে গেল সে।
গঞ্জের লোক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। শিশুদের কোনও হই চই নেই। কেমন একটা বিষাদ ভাব চারিদিকে। চাল সিদ্ধ আর বন মুরগি ঝলসানো দিয়ে খেয়ে দেয়ে নিজের মাচায় ফিরে আসলো চাক্য। মেয়েটার জন্য একটা কলা পাতায় আলু সিদ্ধ নিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দিনের আলোর বদলে চাঁদের আলো রাজত্ব শুরু করে দিয়েছে। চাক্যের মাচার বেড়া দিয়ে চুইয়ে এসে পড়ছে সেই চাঁদের আলো। এক অদ্ভুত সৌন্দর্য তা। এই সৌন্দর্যের কথা চাক্য যদি গোত্রের অন্য কাউকে বলে নেহাত পাগল ভাববে তাকে। ক্ষুধা আর জৈবিক চাহিদা নির্বাণেই ব্যস্ত সব, চোখ খুলে কিছু দেখার মন কোথায়?
মেয়েটা শুয়ে পড়েছে। দেহের ভাঁজগুলো চাক্যের চাহিদাকে জাগিয়ে তুললেও সে ঠিক মনের সাড়া পেল না। সে জানেনা একটা মেয়েকে নিজের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে এভাবে ব্যাবহার করা ঠিক কিনা? যদিও সবাই তাই করে। আশপাশের মাচাগুলো থেকে বোবা কান্না ভেসে আসছে, শব্দটা চাক্য কে আরও মনমরা করে তুলল। হটাত চোখ তুলে তাকাল মেয়েটা। চাক্য দৃশ্যটা দেখে এমন অনুভব করল যা সে নিশ্চিত আর কেউ আগে কখনো করেনি। এতো সুন্দর চোখ, চুলের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়া মুখমণ্ডলের সুষমা শুধু অনুভব করতে পারা যায়, কল্পনা করা যায়, ভাষায় বর্ণনা করা যায়না। এই কি দেবী? মাটির মূর্তি গড়ে, আগুনের সামনে রেখে ওরা যখন সন্তানের আশায় অবিনাশী মায়ের কাছে ভিক্ষা চায়, তখন চাক্য মনে মনে যেই সর্ব-দায়িনী প্রতীমারূপ কল্পনা করেছে, এই কি সেই রূপ? চাঁদের আলোর সৌন্দর্য তার কান্না ভেজা গালের উপর আরও চকচকে হয়ে উঠেছে। এই অনুভূতিকে কি বলে চাক্য জানেনা। কি আশ্চর্য, এমন রূপ তার ভিতর কোনও কামুকতা জাগায়নি, কোনও চাহিদা উথলে উঠেনি তার দেহের মাঝে; সে শুধু চোখ মেলে এভাবে চেয়ে থাকতে চেয়েছে। অনুভব করতে চেয়েছে মেয়েটার মনের ভাষা, আপন করার একটা প্রবল ইচ্ছা তার মাঝে আকুল হয়ে উঠেছে। একে কি বলে? চাক্য জানত না যে তার হাজার বছর পরেও হাজার হাজার মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে, কিন্তু এর কোনও দিশা করতে পারবেনা।
আলুসিদ্ধগুলো মেয়েটার সামনে রাখল চাক্য। ভয়ে আর রাগে একদম কুঁকড়ে আছে মেয়েটা। চাক্য ওর হাত খুলে দিল।
‘তুমি যাও তোমার গোত্রের কাছে ফিরে’
এবার রাগের বদলে মেয়েটার চোখে খেলা করল কৌতুক।
‘কার কাছে জাব? আমার মৃত বাপের কাছে?’
এই প্রশ্নের জবাব নেই চাক্যের কাছে। দুঃখে আর লজ্জায় তার ভিতরটা কুঁকড়ে যেতে থাকল শুধু।
মেয়েটা ওর মাচাতেই এরপর ৫ চাঁদ ধরে আছে। কিন্তু একবারও চাক্য ওকে স্পর্শ করেনি। মেয়েটা প্রথমে ভয় পেত এখন অবাক হয় ওর এই চেয়ে থাকা দেখে। চাক্য জানে মেয়েটা ওর চোখে অসভ্য আচরণের বদলে মুগ্ধতা দেখে বিস্মিত হয়, কিন্তু কিছু বলেনা। চাক্যের কাছে সে সৌন্দর্যের দেবী। আর মেয়েটার কাছে সে ঘৃণার পাত্র। এটাই স্বাভাবিক। নিজের বাপকে মেরে ফেলার পর সে খুনি পুতের কল্লা এনে মাচায় টানিয়ে রেখেছে হাড্ডি না শুকানো পর্যন্ত, আর প্রতিদিন থু দিয়েছে। মেয়েটা তো সেখানে কিছুই করছেনা। চাক্যের ভিতরটা শুকিয়ে থাকে সারাক্ষণ। শিকারে গেলে তার টঙ্কার আগের মতো প্রবল হয়না, তীর ও কোনও কিছুকে বিদ্ধ করেনা। তার মন পড়ে থাকে মাচায়। চোখের সামনে ভেসে থাকে মেয়েটার অসামান্য মুখ। কিন্তু এর মানে কি সে বুঝতে পারেনা। সেতো ইচ্ছা করলেই ঐ মেয়েকে নিয়ে যা খুশি তা করতে পারে। কিন্তু তার মন তাতেও সায় দেয়না। সে ভেবে পায়না কিছুই। সেকি পাগল হয়ে গেছে? পাগলের শাস্তি ভয়াবহ। ওদেরকে মনে করা হয় অশুভ শক্তির আধার। তাই কারো মধ্যে পাগলামি দেখলে ধরে বেঁধে কালো রঙের মা মূর্তির সামনে কল্লা নামিয়ে দেয়া হয়। কথাটা ভেবে শিউরে উঠে চাক্য। কিন্তু মেয়েটার চিন্তা মাথা দিয়ে নামাতে পারেনা।
১২ চাঁদ পেরিয়ে গেছে। সেই শীতের পর জগতে আবার শীতের তীব্র থাবা। চাক্য মেয়েটার জন্য ভালো বাকল আর পাতা এনে দেয়। শিমুল তুলা পাকিয়ে পাতার পরতে পরতে ঢুকায়, তারপর বাইরে থেকে সজারুর চামড়া দিয়ে কষে বেঁধে শীত তাড়ানোর মতো উপকরণ দেয় মেয়েটাকে। মেয়েটা সবকিছুই নেয়, কিন্তু তার হাত থেকে কক্ষনই সরাসরি নয়। এই ১২ চাঁদ মেয়েটা তার সাথে কথা বলেনি, কিছু জিগ্যেস করলে জিঘাংসা নিয়ে শুধু তাকিয়ে থেকেছে। তবে মেয়েটা তার মাচাটা গুছিয়ে রাখে। পানি এনে রাখে গাং থেকে। চাটাই দিয়ে বেড়া বুনে অন্য মেয়েদের মতো। কিন্তু তাকে সে সহ্য করতে পারেনা। ঘৃণায় মুখ বাঁকিয়ে নেয় চাক্যকে দেখলে। চাক্য ভিতরে ভিতরে মরে যায়।
শীত চলে যায়। উত্তুরে হাওয়ার জায়গায়ে ফুরফুরে বাতাস বয় রাতের বেলা। চাক্য মাচার এক কোণে গুটি দিয়ে শুয়ে থাকে। মেয়েটা আরেক কোণে চুপচাপ বসে থাকে। অষ্টমীর আধা চাঁদ অকাতরে আলো বিলাতে থাকে। হটাত করে প্রবল চিৎকার শুরু হয় আশেপাশে। আক্রমণ হয়েছে ওদের উপর। জীবনে প্রথমবারের মতো আনন্দে আর উত্তেজনায় মেয়েটার চোখ জ্বলতে দেখে চাক্য। অরুবালা অরুবালা ডাক শুনে মাচা থেকে লাফিয়ে নেমে যায় সে। শব্দের উৎসের দিকে তাকায় চাক্য। এক পুত। বাঁশের তৈরি এক নেংটি পড়ে মেয়েটাকে জড়িয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। চাক্যের বুকের ভিতর কেমন যেন করে উঠে। ধনুকটা হাতে নিয়েছিল সে, কিন্তু তাতে তীর পরানোর কোনও মানে সে খুঁজে পায়না। চাক্য অবাক হয়ে এদিক সেদিক তাকায়। দাউ দাউ আগুনে প্রত্যেকটা মাচা পুড়ছে। তার মাচাতেও আগুন ধরে গেছে। সে পালানোর মতোও শক্তি বোধ করেনা। কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো সামনে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটা যেখানে ঐ পুত টাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কানের কাছে কার চিৎকার শুনে সে সংবিৎ ফিরে পায়। নেমে আশে মাচা থেকে। কিন্তু লড়াই এ যোগ দেয়না। সে আস্তে আস্তে হেঁটে যায় গাং পাড়। আধা চাঁদের পূর্ণ আলো জলের উপর অদ্ভুত বিভ্রম সৃষ্টি করেছে। রাতের বেলা এদিক আসতে ওদের লোকেরা ভয় পায়। কিন্তু আজ তার একটু ও ভয় লাগছেনা। সে তন্ময় হয়ে দেখছে, আর ভাবছে মেয়েটা কি তাকে জাদু করেছে কিনা? সে কি আসলেই দেবী? হটাত হুটোপুটি শুনে পিছন ফিরে সে। ঐ পুতটা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তীর-ধনুক। এই ১২ চাঁদের মধ্যে এটার ব্যাবহার ওরাও শিখে গেছে। মৃত্যু সামনে ভেবেও চাক্য ভয় পায়না। ওর গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ, হুংকার কিছু আসেনা। সে অবাক হয়ে শুধু পুতের পাশের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার চোখ জিঘাংসায় জ্বলছে। তীর টাকে সুন্দর মতো ছুটে আসতে দেখে চাক্য, তার বুকে বিঁধার সময়টাও যেন তার কাছে অন্তহীন মনে হয়। গলগল করে রক্ত পড়ছে। কিন্তু তার মনের ব্যথা এই দৈহিক ব্যথার কাছে পাত্তা পাচ্ছেনা। সে উল্টা হয়ে পড়ে যায়। খোলা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিতে মরা গাঙের কুলকুল আওয়াজ, চাঁদের আলোর মায়া তার কানে-চোখে পরশ দিয়ে যায়। কিন্তু চাক্যের মন জুড়ে থাকে মেয়েটা। এ কেমন অনুভূতি? এখন তো সে মারা যাচ্ছে, দেবী কি এখনো তাকে এই জবাব দিবেনা? তার খোলা চোখ আকাশের মাঝে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে। রাতের হাওয়ার মাঝে এই বুক ভাঙ্গা কষ্টের মানে খুঁজে। গাঙের শব্দের মাদকতায় এই চাওয়ার অর্থ খুঁজে। পায়না। চাক্য জানেনা, সে যেখানে মারা যাচ্ছে, সেখানে পরে আরও অনেক চাক্য এইভাবে শুয়ে আকাশ দেখবে, এইভাবে শুয়ে বাতাসের, নদীর শব্দ শুনবে, কিন্তু এই অনুভূতির অর্থ খুঁজে পাবেনা। হাজার চাক্য এভাবে কোনও মেয়ের জন্য তাঁদের অদ্ভুত অনুভূতিগুলোকে বুকে কবর দিয়ে রাতের পর রাত, চাঁদের পর চাঁদ নির্ঘুম কাটিয়ে দিবে, কিন্তু সেই অনুভূতির সর্বগ্রাসী রূপ চাপা দিতে পারবেনা। ব্রম্মপুতের গাং হবে ব্রহ্মপুত্র। তাঁদের গঞ্জ হবে পুণ্ড্র নগরের উপনিবেশ। ভূমিকম্পে নদী সরে যাবে, নদীর পাশে বইবে রক্ত গঙ্গা। পুণ্ড্রও একসময় উজাড় হবে, এই গাঙের পাড় দিয়ে এরপর কত রাজা আসবে, কত রাজা পালাবে, কত ঘোড়া ছুটবে, সৈন্য দৌড়–বে, গাঙ্গের উপর চলবে কত কিসিমের ডোঙ্গা, দেশভাগ হবে, আবার লড়াই হবে, তীরের বদলে ছুটবে গুলি, সেই গুলিও বন্ধ হবে। গাঙের স্রোত কমে যাবে, ওদের গঞ্জ হবে বিশাল শহর, আলোর রোশনাই সেখানে চাঁদের আলো ঢেকে দিবে, কিন্তু তার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেউ দিতে পারবেনা। হাজার তরুণ, হাজার যুবক এভাবে রক্তক্ষরণ করতেই থাকবে করতেই থাকবে। বুকের রক্তের বদলে ঝরবে হৃদয়ের রক্ত তবু রহস্যময় চোখের ভাষা পড়তে পারবেনা, বুঝতে পারবেনা। অব্যক্ত ব্যথা নিয়ে কাটিয়ে দিবে দিন, আর নির্ঘুম চোখে অন্তহীন রাত।

ঈদ ও অনাথ শিশু

ডাঃ এমএম ওহিদুজ্জামান

নিলিমায় দেখ দেখ উঠিয়াছে শশী
একটি অনাথ শিশু ভাবিতেছে বসি।

সকলেই হবে ঈদ, খুশি ভরা দিন
আমার বদন খানি কেন যে মলিন।

পিতা নেই মাতা নেই, আমি যে অনাথ
দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে, চেয়ে খাই ভাত।

বস্ত্র যা আছে গায়ে, লজ্জা ঢাকার
ভিটা নেই বাড়ি নেই, মাথা গুজিবার।

সাবানও যে জোঠে নাকো, ময়লা গায়ে
পিছ ঢালা পথ চলি নাংগা পায়ে।

ছোট কুড়ে আছে এক পলিথিনে ঢাকা
তার মাঝে কোন মতে মাথা গুজে থাকা।

কেহ মোরে ডাকে নাকো আয় বাচা ধন
একা একা থাকি তাই ছোট থাকে মন।

আমার কুড়ের পাশে আছে বড় বাড়ী
মাংশ পোলাও তারা রাধে হাড়ি হাড়ি।

গায়ে জামা, হাতে ঘড়ি, পায়ে দিয়ে হিল
আমাকে যে দেখে তাঁরা হাঁসে খিল খিল।

কেন তারা বোঝে নাকো আমি যে অনাথ
আমারও সঙ্গ পেলে, যায় বুঝি জাত।

কেন মোরে দেখ নাকো বড় লোক ভাই
তোমার শতেক জামা, আমার যে নাই।

হৃদয়ের ঐ দর্পনে দেখ একবার
আমার মত যে লোক খোঁজ নেও তার। কত লোক অনাহারে কষ্টে কাটে দিন
এই ঈদে খোঁজ নাও শোধ কর ঋন।

অনাথের অশ্র“ তুমি মুছে দাও আজ
হাত ধরে পড় গিয়ে ঈদের নামাজ।

নামাজের শেষে তুমি করো কোলা-কুলি হৃদয়েতে রেখো নাকো কোন লুকো-চুরি।
ঈদের আনন্দ টা ভাগ করে নাও
এক সাথে ঘরে গিয়ে ভালো ভালো খাও।

ঈদ-উল-ফিতর

বিশ্বজিত ঘোষ

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে নতুন জাগায় আশা,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে একটি মাত্র ভাষা।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে একটি আশার আযান,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে জাগায় ভ্রাতৃত্বে সন্ধান।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে মায়ের আধো বুলি,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে বিশ্বের রংতুলি।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে রঙিন খুশির দিন,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে বাজায় খুশির বীণ।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে শান্তি পরস্পরে,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে মিলন সকল ঘরে ঘরে।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে আনন্দ চোখের জল,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে খুশির ঝলমল।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে একটি নামে ডাকা,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে নিজেকে আপন করে দেখা।

ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে পরশ দিয়ে গেলো,
ঈদ-উল-ফিতর বিশ্ব মাঝে আল-কোরআনের আলো।